#বোকামন
#পর্ব_১০
#Tahsin_Atoshi
অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে প্রায় অনেকক্ষণ। টিচাররা নিজেদের মতো বক্তব্য দিচ্ছেন। ভার্সিটির নিয়মনীতি বলছেন। প্রধান শিক্ষক এসে নিজের বক্তব্য দিয়ে গেছেন। এর মাঝে কিছু সিনিয়র নতুন স্টুডেন্টদের হাতে একে একে গোলাপফুল দিয়ে গেছে। নাচ, গান আড্ডায় পুরোটা হলরুমে সবাই মাতিয়ে রেখেছে। সবশেষে রেম্প ওয়াক এর পালা। প্রথমেই আহান এসেছে। তার সাথে ওয়েস্টার্ন ড্রেস পড়া দুটো মেয়ে। তা দেখে হুমায়রা স্মৃতির কানে কানে বলে,
– এই আহান সত্যি সত্যি প্লে-বয় নাকি রে।
-হলেই বা কি?
-না এমনি জিজ্ঞেস করলাম। দেখ মেয়ে দুটোর কোমড় ধরে আছে কীভাবে। মেয়েগুলোও কেমন ড্রেস পরেছে ইয়ার। বাজে লাগছে।
-শহুরে মানুষ এমনই হয় হুমু। নতুন দেখছিস নাকি।
-না। নতুন কেন দেখবো।
ওদের কথার মাঝেই ফোন রিং হওয়ায় স্মৃতি চুপচাপ ফোনটা বের করে। ফোনের উপরে ঝলঝল করে ওঠে নামটা আসিফ। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিসিভ করে,
-আসসালামু আলাইকুম।
-ওয়ালাইকুম আসললাম। কে বলছেন?
-আ্.. আমি স্মৃতি।
-মৌমিতা কোথায়? ওর ফোন তোমার কাছে?
-আমাকে দিয়েছে। ভার্সিটিতে নিয়ে আসার জন্য।
-ও আচ্ছা ঠিক আছে। কিছু লাগলে আমাকে কল করো কেমন। রাখি।
-জ্বী আচ্ছা।
ফোনটা আবার ব্যাগে রাখতেই হুমায়রা বলে,
-বাব্বাহ ফোনও কিনে ফেলেছিস নাকি ইয়ার!
-নাহ। শুভর মায়ের ফোন।
-শুভর মা কি হ্যাঁ? তুই মা বলতে পারিস না নাকি?
-প্রয়োজন নেই।
-দূর তোর ইচ্ছে। আমার যে কবে একটা ফোন হবে। ভার্সিটির সকলের ফোন আছে আমারই নেই।
-তো বলবি কিনে দিবে।
-ঝাটা দিবে।
কথা শেষে আবারো সামনের রেম্প ওয়াকে মনোযোগ দিলো সবাই। অমিত ও তুলি একসাথে এসেছে এবার। তার পেছনে এসেছে অনিল ও অর্নি।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো তখন যখন রোদ এলো সবার সামনে। হুমায়রা চটজলদি স্মৃতির হাত আকড়ে ধরলো। স্মৃতিও আশ্বাস দিলো কিছু হবে না।
অনুষ্ঠান শেষে সকলে মিলে বাইরে এলো বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে। স্মৃতি দাঁড়িয়ে আছে হুমায়রার অপেক্ষায়। মাএই একটা মেয়ে এসে ডেকে নিয়ে গেছে কোনো এক কাজে। দূর থেকে শুভ ইশারায় ওদের কাছে আসতে বলেছে। কিন্তু হুমায়রাকে রেখে একা একা যেতেও ইচ্ছে করছে না। তাই চুপচাপ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো।
এরই মাঝে হঠাৎ হাত ধরে কেউ টেনে দেয়ালের সাথে মিশিয়ে নেয়ায় ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললো স্মৃতি। লোকটার নিশ্বাস স্মৃতির মুখের উপর পরছে। মনের মাঝের ভয়টাকে জয় করে এবার পিট পিট করে তাকালো স্মৃতি। সামনে থাকা মানুষটাকে দেখে রাগ যেন আরো চওড়া হলো। বিরক্তি নিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই সামনের ছেলেটা মুখে হাত দিয়ে বলল,
-আরে স্মৃতি বেবি রাগ করছো কেন। আজ কি রাগ করার দিন বলো। তোমাকে খুব কিউট লাগছে আজ। নিজেকে আটকে রাখতেই পারলাম না।
স্মৃতি উম উম করে কয়েকবার কথা বলার চেষ্টা করতেই ছেলেটা হাত সরিয়ে দিয়ে বলল,
-আমাকে কেমন লাগছে সেটা বলতে চাও নাকি?
কথাটুকু শেষ করতেই সজোরে একটা থাপ্পড় দিলো গালে। রাগ দেখিয়ে বলল,
-রোদের বাচ্চা তোর একবার মা’র খেয়ে হয় না নাকি? আমাকে টাচ করার সাহস পেলি কোথা থেকে?
থাপ্পড় খেয়েও রোদ এবার হাসলো একটু। স্মৃতির কোমড় জড়িয়ে আরো কাছে টেনে বলল,
-তোমার নরম হাতে থাপ্পড়টাও ভালো লাগে। আরে একটা রাত তো। তাহলেই হয়। এরপর আর ডিস্টার্ব করবো না প্রমিস।
একটা রাত শব্দটা শুনতেই কেমন একটা ভয় কাজ করলো স্মৃতির মাঝে। পুরোনো ভয়টা চোখের সামনে ভেসে উঠলো যেন। কিন্তু এই মুহূর্তে সে এই ভয়কে প্রশ্রয় দিতে চায় না। আর কোনোকিছু না ভেবেই রোদের স্পর্শ কাতর স্থানে একটা লাথি মে’রে সেখান থেকে দৌড়ে শুভদের কাছে চলে এলো। শাড়ি পরে দৌড়ানোটাও যুদ্ধের থেকে কম না৷ স্মৃতিকে এমন দৌড়ে আসতে দেখে সকলেই বোকার মতো তাকালো। শুভ কৌতুহল নিয়ে বলল,
-শাড়ি পরে হাটতে পারিস না। দৌড় দিলি কীভাবে?
স্মৃতি তখনও চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিচ্ছে। শুভর হাতটা শক্ত করে ধরে আছে। তা দেখে সবাই প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। চোখ থেকে দুই ফোঁটা জল গড়িয়ে পরলো স্মৃতির। তা দেখে তুহিন বলল,
-স্মৃতি অল ওকে? কিছু কি হয়েছে?
-রোদ…
শুভ এবার গম্ভীর কন্ঠে বলল,
-রোদ আবার কি করেছে?
-পরে বলছি। হুমু কোথায়? এখনো আসেনি?
-তোর সাথেই তো ছিল।
-হুম.. একটা মেয়ে ডেকে নিয়ে গেল কি কাজে। এতক্ষণে তো চলে আসার কথা।
সবাই এবার একে অপরের দিকে তাকালো। এতরাতে কার কি কাজ থাকতে পারে হুমায়রার সাথে এই প্রশ্নই যেন সবার মনে জাগছে। আহান সকলকে আশ্বাস দিয়ে হুমায়রাকে খোঁজার জন্য চলে গেল। প্রায় পনেরো মিনিট পর আবার এসে দেখলো হুমায়রা এসেছে কিনা। কিছু একটা ভেবে স্মৃতি বলল,
-রোদ ওর কিছু করেনি তো?
এরই মাঝে শুভ বলে,
-ওর যা আদর করেছি এতো সাহস মনে হয়না হবে।
-তাহলে আমাকে আমাকে টাচ করার সাহস কীভাবে পেল?
স্মৃতির এমন কথায় শুভর রাগ আরো বাড়লো। গম্ভীর কন্ঠে বলল,
-তোকে টাচ করেছে মানে! ওকে তো আমি দেখে নিবো।
অমিত তুহিনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
-তুহিন তুই অর্নি,তুলি আর স্মৃতিকে বাসায় দিয়ে আয়। রাত হয়েছে অনেক। আমরা খুঁজছি হুমুকে।
তুহিনের মন না মানলেও সম্মতি জানালো। কিন্তু স্মৃতি যেতে নারাজ। হুমায়রাকে না নিয়ে সে যাবে না। তবুও শুভর কথায় যেতে হলো। সকলে মিলে একে একে পুরো ভার্সিটি খুঁজতে লাগলো হুমায়রাকে। তুহিনও ওদেরকে বাসায় দিয়ে আবারো এসেছে। পুরো ভার্সিটির কোথাওই নেই হুমায়রা। ক্লাসগুলোও চেক করা হয়েছে। গেট থেকে বের হলেও দাড়োয়ান দেখতে পেতো। কিন্তু গেট থেকে বের হয়নি। আরকিছু না ভেবে আহান বলল,
-মায়রার নাম্বার তো নেই। অমিত ওকে একটা কল কর না।
-হুমুর ফোন নেই।
কথাটা শুনে রাগটা আরো বারলো আহানের৷ বিরক্তি নিয়ে বলল,
-আরে ইয়ার ভার্সিটিতে উঠেছে এখনো ফোন ছাড়া কে থাকে আজব! আর কোথায় খুঁজবো ওকে?
অনিল কিছু একটা ভেবে বলল,
-লাইব্রেরি! লাইব্রেরীতে খোঁজা হয়নি৷ ওখানে গিয়ে দেখি না।
আহান এবার একটা গালি দিয়ে বলল,
-লাইব্রেরীতে কেন নিবে ইয়ার। আচ্ছা চল চেক করে দেখি থাকতেও পারে।
কথা মতো সকলে মিলে লাইব্রেরীর সামনে এসে হাজির হলো। ঢোকার জন্য দরজায় হাত দিতেই বুঝতে পারলো ভেতর থেকে দরজা বন্ধ। এতেই কৌতুহলটা গাড়ো হলো । কয়েকবার দরজায় নক করে খুলতে বললেও দরজা না খোলায় আর উপায় না পেয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকলো সকলে।
রোদসহ তিনটা ছেলে উপস্থিত আছে সেখানে। হুমায়রাকে চেয়ারে বাঁধা অবস্থা দেখে রাগটা আরো বেশি মাথায় উঠলো যেন। আহান,শুভ,তুহিন ও অনিল মিলে এলোপাতাড়ি মারতে শুরু করলো সবগুলোকে। অমিত ধীরে ধীরে হুমায়রার কাছে গিয়ে বাঁধন খুলে কয়েকবার ডাকলো। কিন্তু জ্ঞান ফেরার নাম নেই বললেই চলে। ঠোঁটের কোণে রক্ত লেগে আছে। গালে পাঁচ আঙুলের দাগ স্পষ্ট।
শাড়ির আঁচলটা হুমায়রার গায়ে ভালোমতো দিয়ে নিজের সাথে জড়িয়ে নিলো অমিত। বাকিরাও রোদ ও তার ছেলেদের মে’রে স্থান ত্যাগ করলো। এখন চিন্তায় পরেছে কোথায় যাবে। বাসায় গেলে নীলা বেগমের চিন্তার শেষ থাকবে না। সবশেষে আহান বললো তার বাসায় যাওয়ার জন্য। কেউ আর দ্বিমত পোষণ করলো না। সকলে মিলে রওনা দিলো আহানের বাসার উদ্দেশ্য। এই ফাঁকে শুভ স্মৃতিকে কল করে বলে দিলো হুমায়রাকে পেয়েছে তারা।
~★~
সকাল সকাল জ্ঞান ফিরতেই হুমায়রা আসেপাশে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো সে এখন কোথায় আছে। মাথাটা ঝিম দিয়ে আছে এখনো। তার একটু দূরে অমিত বিছানায় হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে আছে,অনিল পায়ের কাছে সুয়ে আছে। তুহিন টেবিলে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পরেছে। শুভ আর আহান সোফায় ঘুমানো। এসব দেখে একটু হাফ ছেড়ে বাচলো। ধীরে ধীরে পাশে থাকা ছোট ওয়ারড্রবটা ধরে উঠতে যাবে তখনই হাত লেগে গ্লাসটা পরে ভেঙে যাওয়ায় সকলেরই ঘুম ভাঙলো। হুমায়রাও উঠে বসলো এবার। গ্লাসটা ভেঙে গেছে দেখে আরো বেশি মন খারাপ হলো। এখন নিশ্চয়ই সকলে বকবে। কিন্তু ওর ভাবনাকে ভুল প্রমাণিত করে অমিত পাশ থেকে বলল,
-কিরে বনু ঠিক আছিস? শরীর খারাপ লাগছে?
হুমায়রাও মাথা নাড়িয়ে বুঝালো সে ঠিক আছে। ধীরে ধীরে ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য মেঝেতে পা ফেলতেই ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলো। তা দেখে অনিল একটা ধমক দিয়ে বলল,
-দেখছিস গ্লাস ভেঙে গেছে সেখানে পা রাখতে গেলি কেন হ্যাঁ। কাটলো তো পা।
অনিলের ধমক শুনেই মাথা নিচু করে কান্না করে দিলো হুমায়রা। তা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললো অমিত৷ আর কি-ই বা করবে। কপালে জুটেছে এক বোন কথায় কথায় শুধু কান্না করতে থাকে। তা দেখে অমিত পাশে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
-পা ওখানে রাখতে গেলি কেন। দেখলি তো কেটে গেছে।
হুমায়রাও এবার নাক টেনে নিচু স্বরে বলল,
-এই কাচ দিয়ে পা কাটেনি। র্ রোদ গতরাতে মদ খেয়ে বোতল ভেঙেছিল তখনই কেটেছিল।
রোদের নামটা শুনতেই সকলের মাথায় রক্ত উঠে গেল। চুপচাপ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো সকলে।
তুহিন ধীরে ধীরে হুমায়রার পাশে বিঁধে থাকা কাচের টুকরোটা বের করে দিলো। এর মাঝেও হয়েছে আরেক যুদ্ধ। পা ব্যথা হওয়ায় হুমায়রা পা ধরতে দিচ্ছিলো না। এক প্রকার সকলে ধরেই কাচটা বের করেছে। কাচ বের করতে না করতেই সেখান থেকে রক্তের বন্যা বইতে লাগলো। হুমায়রাও এবার শব্দ করে কান্না করে দিলো। তা দেখে অমিত নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে বলল,
-এই বনু কিছু হয়নি্। ব্যান্ডেজ করে দিলেই দেখবি ঠিক হয়ে যাবে। বড় হয়েছিস না। এতো কান্না করলে চলে?
অমিতের কথায় থামলো হুমায়রা। নিজের মতো করে ভাবতে রইলো,
“সত্যিই তো আমি বড় হয়েছি। এতো কাঁদি কেন? না না তাহলে সকলে ছিচকাদুনে বলবে। আর কান্না করা যাবে না। আই এম স্ট্রং গার্ল।”
এইটুকু ভেবে কান্না থামালো। আহান পাশে বসে হুমায়রাকে ভালোমতো চেক করে বলল,
-ঠিক আছো?
-হুম।
– কাল কি হয়েছিল?
-কাল…?একটা মেয়ে আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল টিচার নাকি আমাকে ডাকছে তাই…আ..আ.. আমাকে স্টেজের পেছনে নিয়ে যায়। সেখানে দুটো ছেলে ছিল….তারপর হুট করে আমাকে ধরতেই চিৎকার করবো তার আগেই মুখ চেপে ধরে লাইব্রেরীর দিকে নিয়ে যায়।
-তারপর?
-নিয়েই আমাকে বেঁধে ফেলে আগের মতো। তবুও কান্নাকাটি করেছিলাম দেখে আমাকে থাপ্পড় মারে। তখনই রোদ চলে আসে।
-এরপর?
-তারপর….? তারপর….. একটা ইনজেকশন দিয়েছিল। আর তো মনে নেই।
-তোমার কি সঠিক মনে নেই? এতো ভাবার কি আছে? যা হয়েছে তাই বলো না? নাকি কিছু লুকাচ্ছো? আর আগের মতো মানে? এর আগেও এমনটা হয়েছিল?
-না মনে নেই। ঝাপসা মনে আছে। আর এর আগে হয়েছিল তো। কিন্তু…..
-কি?
-জানি না মনে পরছে না। কিন্তু হয়েছিল এমন।
বলে মনে করার চেষ্টা করলো হুমায়রা। কিন্তু তার মনেই পরছে না কবে হয়েছিল। তা দেখে অমিত বলে,
-আচ্ছা আচ্ছা হুমু এমনি মনে হয়েছে হয়তো। এই যে দেখ আমরা কথা বলছি আমারও মনে হচ্ছে আগে এভাবে কথা বলেছি। তেমন কিছুই হয়নি।ওকে?
এবার শান্ত হলো হুমায়রা। আহান সবাইকে বসিয়ে সবার জন্য খাবার নিয়ে আসতেই অমিত সাহায্য করার জন্য গেল।
#চলবে…

