বোকামন #পর্ব_১৪

0
2

#বোকামন
#পর্ব_১৪
#Tahsin_Atoshi

আজ এক সপ্তাহ পর ভার্সিটিতে আসতে পারায় মনে একটা উৎফুল্ল অনুভব করছে হুমায়রা। কিন্তু ভয়ও যেন কাটছে না। আবারও সেই রোদের মুখোমুখি হয়কিনা ;সেই ভয়ই তার মাঝে কাজ করছে৷ এখনো স্মৃতি আসেনি। ভয়ে ভয়ে চুপচাপ ক্লাসে এসে বসলো হুমায়রা৷ বুকের মাঝে হার্টবিটটা বাড়ছেই। শরীর কাপছে তার।

হঠাৎ কাঁধে কারে স্পর্শ পেতেই কেঁপে উঠলো হুমায়রা৷ পাশে তাকাতেই দেখলো স্মৃতি। তা দেখেই শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। স্মৃতিরও বুঝতে বাকি রইলো না হুমায়রার ভয় পাওয়ার কারণ। নিজের সাথে জড়িয়ে শান্তনা দিতে রইলো। ক্লাসে টিচার আসায় দুজনই এবার ঠিক হয়ে বসলো। কিন্তু পড়ায় মন বসছে না তার। সেদিন রাতের ঘটনাটা মাথায় ঘুরছে শুধু। স্মৃতির দিকে তাকাতেই দেখলো ও পড়ায় মনোযোগ দিয়ে আছে। ভালো লাগছে না কিছু।

আর থাকতে না পেরে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলো ও। দ্রুত বাসা উদ্দেশ্যে রওনা দিতেই হুট করেই কারো বুকের সাথে ধাক্কা খেয়ে পরে যেতে নিলো। কিন্তু পরে যাওয়ার আগ মুহূর্তেই কোনো শক্ত পোক্ত হাত ধরে ফেলল তাকে। হুমায়রাও ভালোমতো মানুষটাকে দেখতেই দেখলো আহান। এবার যেন একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলল। আহান কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

-এত দ্রুত কোথায় যাচ্ছিলে?

-বাসায় যাবো।

-মাএই তো এলে।

-আ্ আম্ আমার ভালো লাগছে না। বাসায় যাবো।

এইটুকু বলতেই হুমায়রার গলা ধরে এলো। আহান কৌতুহল নিয়ে কিছুক্ষণ হুমায়রাকে পর্যবেক্ষণ করে বলল,

-ঘুরতে যাবে?

হুমায়রা তৎক্ষনাৎ দ্রুত মাথা নেড়ে না বুঝালো। আহান কিছু না বলে হাত ধরে মাঠের এক কোণে বসালো হুমায়রাকে। নিজেও হাঁটু ভাজ করে বসলো ওর সামনে৷ জিজ্ঞেস করল,

-রোদের বিষয়টা নিয়ে ভয় পাচ্ছো?

হুমায়রা চুপচাপ জলভরা চোখে তাকালো আহানের দিকে কিন্তু কোনো উওর দিলো না। আহানও বুঝতে পেরে বলল,

-ওকে নিয়ে চিন্তা নেই আমরা সব সামলে নিয়েছি। আর রোদ? ওকে ভার্সিটি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আর আসবে না।

এইটুকুকেই হুমায়রার চোখ চকচক করে উঠলো। উৎফুল্ল হয়ে জিজ্ঞেস করল,

-সত্যি?

হুমায়রার কাহিনীতে আহান হাসলো কিছুটা। প্রেয়সীর চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,

-হুম সত্যি।

-আচ্ছা আমি ক্লাসে যাই। টা টা।

বলেই হুমায়রা উঠে দাঁড়িয়ে ক্লাসে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো। পরপরই আহান হাত ধরে থামিয়ে দিয়ে বলল,

-মাএই না বাসায় যেতে চাচ্ছিলে?

-এখন আর যাবো না।

বলেই দাঁত কেলিয়ে হাসলো হুমায়রা। তা দেখে আহানও এবার শব্দ করে হেসে দিলো। হুমায়রার দুই গাল ধরে কপালে কিস করতে যাবে তার আগেই হুমায়রা থামিয়ে দিয়ে বলল,

-বিয়ের আগে এসব ঠিক না।

আহান বোকাবনে গেল এবার। বোকার মতো তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

-কপালেই তো কিস করতে যাচ্ছিলাম ম্যাম। তাহলে ঠিক না কেন?

-জানি না। কিন্তু বিয়ের আগে এমনটা করা ঠিক না। আমাদের গ্রামের সকলে বলে।

আহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কথা না বাড়িয়ে বলল,

-ওকে আপনি যা বলবেন ম্যাম। এখন ক্লাসে যেতে পারেন। ক্লাস শেষে আবার এখানে আসবেন এক জায়গায় নিয়ে যাবো।

-কোথায়?

-আমার বাসায়।

-কেন?

-গেলেই দেখতে পাবেন।

হুমায়রাও আর পাল্টা প্রশ্ন করলো না। চুপচাপ আবারো ক্লাসে এসে বসলো। ক্লাসের স্যার এক নজর দেখে নিলেন হুমায়রাকে। কিন্তু কোনো প্রশ্ন করলেন না। স্মৃতি পাশ থেকে খোঁচা দিয়ে জিজ্ঞেস করল,

-কোথায় গিয়েছিলি?

-বাইরে।

-ক্লাস রেখে বাইরে কি হ্যাঁ? বরের সাথে দেখা করতে নাকি।

‘বর’ শব্দটা শুনতে হুমায়রা একটু লাজুক হাসি দিলো। তা দেখে স্মৃতির চোখ কপালে। তবুও আর কিছু বললো না। না হয় টিচারের বকা খেতে হবে। দুজন মিলে চুপচাপ ক্লাসগুলো শেষ করে আহানের বলা সেই জায়গায় এসে হাজির হলো। আহানকে দেখে এক্সাইটেড হয়ে স্মৃতির হাত ধরে বলল,

-চল এখন।

স্মৃতিকে দেখে আহানের মুখটা মলিন হয়ে গেল। হালকা গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,

-স্মৃতিও যাবে আমাদের সাথে?

হুমায়রাও হাসি মুখে বলল,

-হ্যাঁ।

স্মৃতি কি বলবে বুঝতে পারছে না। এক জোড়া কাপলের মধ্যে সে কাবেব হাড্ডি হয়ে যাবে সেটা ঠিক মেনে নিতে পারছে না। কোনো একটা বাহানা দিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যত হতেই হুমায়রা থামিয়ে বলল,

-কি হয়েছে? কোনো বাহানা দিবি না। তুইও যাচ্ছিস আমাদের সাথে।

স্মৃতি চুপচাপ জোরপূর্বক হেসে তাকালো আহানের দিকে। আহানও অসহায় মুখ করে হাসি দিয়ে গাড়ির দিকে রওনা দিলো।
.
তিনজন মিলে পৌছে গেল আহানের বাসায়। আহানের বাড়িটা তেমন বড় না হলেও স্মৃতির কেন জানি বাড়িটা ভালো লেগেছে। হাসিমুখে বাড়িতে ঢুকতেই কেমন একটা শান্তি অনুভব হলো মনে। চারপাশটা পরোখ করে দেখতে রইলো। ঘরে ঢুকতেই ছোট্ট একটা ড্রইং রুম। তার বাম দিকে একটা ঘর। বাইরে দরজা থেকে যতটুকু দেখা যায় সেখানটা কাচ সিস্টেম। হাতের ডানপাশেই রান্নাঘর। আহান কফি বানাচ্ছে দুজনের জন্য। রান্না ঘর থেকে ডানে পাশাপাশি দুটো রুম। তার থেকে কিছুটা দূরে আরো একটা৷ তা দেখে স্মৃতি বোকার মতো তাকায়৷ তবে বাড়িটা তার বেশ ভালো লেগেছে। আহানও কফি বানিয়ে ওদের সামনে রাখলো। জোরপূর্বক একটা হাসি দিয়ে বলল,

– রুমগুলো ঘুরে দেখবে?

হুমায়রাও এক্সাইটেড হয়ে বলল,

-হুম দেখান।

আহানও দুজনকে উদ্দেশ্য করে বললো তার সাথে যেতে। প্রথমেই নিয়ে গেল কাচ সিস্টেম সেই ঘরটায়। ঘরের পাশে ছোট্ট করে নাম লেখা “It’s mine”। কৌতুহল হয় স্মৃতির। তবুও চুপ হয়ে থাকে। ঢুকতেই স্মৃতির চোখ কপালে। বাড়িটা ছোট হলেও সেখানকার জিনিসপএ খুবই দামি তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। রুমটার এক সাইডে কয়েকটা বিয়ারের বোতল সাজানো। অন্যসাইডে মিউজিক ইন্সট্রুমেন্ট। ধীরে ধীরে পা বাড়িয়ে কাচের সামনের পর্দাটা সরিয়ে দিতেই পুরোরুম ঝলমলে হয়ে উঠলো। এর ফলে আহান একটু বিরক্ত হলো। আবারো পর্দা টেনে বলল,

-এই রুমটা এরকম হালকা অন্ধকারই ঠিক আছে।

স্মৃতি বোকার মতো তাকালো এবার। কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

-কেন?

-এমনি আমার পছন্দ।

স্মৃতি আর প্রশ্ন না করে হুমায়রাকে খুজতেই দেখলো সে বুক সেল্ফের সামনে দাঁড়িয়ে বই দেখছে। যা স্মৃতির চোখে পরেনি। বইয়ের শেষ নেই সেলফে। আহান কথা ছাড়া ঘরের মাঝে সোফায় বসে ওদের কাহিনী দেখা শুরু করল। স্মৃতি হালকা ঠোঁট উল্টে বলল,

-ঘর সাজানোটা সুন্দর হয়নি।

স্মৃতির কথায় আহান বিস্ময় নিয়ে বলল,

-আচ্ছা!

স্মৃতিও এবার এক্সাইটেড হয়ে বলল,

-হুম। আপনার বিয়ারের এই বোতলগুলো বুক সেলফের এখানে রাখলে আর বইলো ওখানে রাখলে সুন্দর হতো। এরপর সোফাটা উওর-দক্ষিণে না দিয়ে পূর্ব-পশ্চিমে ঘুরিয়ে রাখলে একদম বেস্ট।

স্মৃতি কথায় আহান কৌতুহল নিয়ে দেখলো নিজের ঘরটা। তবে কোনো কথা বললো না। হুমায়রা স্মৃতির মাথায় গাট্টি মে’রে বলল,

-তুই তোর ঘর সাজানোর ভুত আর ঘর সাজানো নিজের বাড়ি আর শশুড় বাড়িতে করিস। ওনার যেমন পছন্দ তেমন থাকুক।

ওদের কাহিনীতে আহান হাসলো কিছুটা। এরপর বলল,

-চলো বাকি রুমগুলোও দেখাই।

তিনজন মিলে ধীরে ধীরে অন্য রুমগুলোতে ঢুকলো এবার৷ আহান প্রথমরুমটায় দেখিয়ে বলল,

-এটা আমার বাবা-মায়ের রুম।

স্মৃতি একটু মুচকি হাসলো। এই রুমটা তার মন মতোই সাজানো। আহান কথা না বাড়িয়ে এবার পাশের রুমটা বাদ দিয়ে দূরের রুমটাতে নিয়ে গেল৷ তা দেখে স্মৃতি কৌতুহল নিয়ে তাকালেও কিছু বললো না৷ চুপচাপ অন্যরুমে গেল।আহান হালকা হেসে বলল,

-এটা আমার রুম।

তা দেখে স্মৃতি এবার হালকা গম্ভীর হয়ে বলল,

-আচ্ছা আপনি কি অগোছালো? নাকি রুম কীভাবে সাজাতে হয় জানেন না?

আহান কৌতুহল নিয়ে তাকালো। স্মৃতি আবারে বলল,

-আপনার বাবা মায়ের রুমটা কতসুন্দর করে সাজানো। আর আপনার রুম ইশ কেমন!

আহান আবারে হাসলো। জিজ্ঞেস করল,

-কেমন হলে সুন্দর হতো?

স্মৃতিও এক্সাইটেড হয়ে নিজের মতো বললো। আহানও মুচকি হাসি দিয়ে বলল,

-ঠিক আছে করে দেখবো না হয় একদিন। তবে আমার এভাবেই বেশি ভালো লাগে।

স্মৃতি আর কথা বাড়ালো না। কিছুক্ষণ গল্প করার পর স্মৃতি সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে স্থান ত্যাগ করলো। এখন বাসায় শুধু আহান ও হুমায়রা৷

হুমায়রার কিছুটা অস্বস্তি বোধ হয় ব্যাপারটায়। আহানও ধীরে ধীরে হুমায়রার পাশে এসে বসলো। তা দেখে হুমায়রা দূরে সরে গেলো এবার। জোরপূর্বক হাসি দিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই আহান হুমায়রার ঠোঁটে আঙুল দিয়ে থামিয়ে দিলো। কোমড় জড়িয়ে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বলল,

-তুমি কি জানো আজকে আমাদের বিয়ের তারিখ ঠিক হয়েছে।

হুমায়রা অবাক হয়ে বলে,

-কবে, কখন,কীভাবে? আর কত তারিখে?

হুমায়রার প্রশ্ন আহান হাসলো। বলল,

-আজ সকালেই আমার বাবা তোমাদের বাড়ি গিয়ে তারিখ ঠিক করে এসেছে। আর এই সপ্তাহের মাঝে বিয়েটাও হয়ে যাবে।

-এতো জলদি! কি্ কিন্তু আঙ্কেল তো আমাকে দেখেনি।

-ছবিতে দেখেছে। আর, আর, আর.. উনি দেখে কি করবে। আমি তো দেখেছি আমার বউকে তাতেই অনেক।

হুমায়রা এবার জোরপূর্বক হেসে বলল,

-বাসায় যাবো।

-সন্ধ্যার আগে যেতে পারছেন না ম্যাম।

-কিন্তু বিয়ের আগে ছেলে-মেয়ে এভাবে মেলামেশা ঠিক না।

-সেটা গ্রামে। শহরে এর কোনো চল নেই ম্যাম।

-কিন্তু..

হুমায়রাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে আবারো ঠোঁটে আঙুল দিয়ে থামালো আহান। হাত ধরে নিজের ঘরে নিয়ে গেল। এতে হুমায়রার মাঝে ভয়টা আরো বেশি হানা দিচ্ছে। তা দেখে আহান হেসে বলল,

-রিল্যাক্স ম্যাম। বিয়ে আগে কিছু করবো না আপনার সাথে। গল্প তো করাই যায় তাই না?

হুমায়রাও এবার হেসে মাথা নাড়ায়৷ আহান এবার পাশে এসে বসে। কৌতুহল নিয়ে বলে,

-স্মৃতি তো কতকিছু বললো ঘর নিয়ে। তোমার কিছু বলার নেই?

-ন্ নাহ। কি বলবো?

-পছন্দ হয়েছে ঘর?

-হুম সুন্দর।

-শুধু সুন্দর?

হুমায়রা এবার উঠে কার্টেন ওয়ালের সামনে গিয়ে দাড়ালো। বাইরের দিকে তাকিয়ে বলল,

-হুমম। আমাদের গ্রামের থেকে সুন্দর এটা। আমার তো খুব ভালো লেগেছে।

হঠাৎ কোমড়ে কারো স্পর্শ পেতেই কেঁপে উঠলো হুমায়রা৷ একটা শুকনো ঢোক গিলে নিলো। আহানও ধীরে ধীরে হুমায়রার ঘারে মুখ গুজে প্রশ্ন করল,

-আমাকে পছন্দ তোমার? বিয়েতে সত্যিই রাজি তো? নাকি কোনো জোর জবরদস্তি আছে?

হুমায়রার কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে। গলা থেকে স্বর বের হচ্ছে না। তবুও একটা ঢোক গিলে বলল,

-হ্ হুম। রা্ রাজি আমি। রাজি।

এইটুকুতেই হুমায়রার নাজেহাল অবস্থা দেখে হাসতে হাসতে ওকে ছেড়ে দূরে সরলো আহান। হাসি থামিয়ে বলল,

-এইটুকুতেই এই অবস্থা ম্যাম? বিয়ের পরে আমার অত্যাচার সহ্য হবে তো?

-বাসায় যাবো।

আহান আবারো হাসলো। হেসে বিছানায় বসে বলল,

-আরেকটু পরে যাই?

-না এখন।

-ওকে…।

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here