#বোকামন
#পর্ব_১৩
#Tahsin_Atoshi
কেটে গেছে প্রায় এক সপ্তাহ। হুমায়রা আগের থেকে অনেকটাই সুস্থ। তবে এখনো ভার্সিটি যেতে দিচ্ছে না কেউ। এরমাঝে অমিত একটা ফোনও কিনে দিয়েছে। কিন্তু ফোনটা সেই বিছানার কোনেই পরে থাকে। কি করবে কিছুই জানে না। ফেইসবুক নেই, ম্যাসেঞ্জার নেই করবে কি। খুলে দিতে বললেও খুলে দেয়না কেউ। এতেই মন খারাপ করে বসে আছে। প্রতিদিন বিকেলের মতো আজও সকলে মিলে আড্ডা দেয়াটা যেন বাদ যায় না। অনিলের রুমটা আড্ডা খানা হয়ে আছে। আর হুমায়রা পাশে মন খারাপ করে বসে আছে। তাতে কারো কিছু যায় আসে না। সকলের মাঝ থেকে তুলি এক্সাইটেড হয়ে বলল,
-আহান দোস্ত! এখন লাইফ নিয়ে একটু সিরিয়াস হ। আর কত প্রেম করবি।
আহান গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
-এসব ভালোবাসা আমার দ্বারা হয়না দোস্ত। ভালোবাসা মানে ধোঁকা, অবহেলা আর না পাওয়ার এক তৃষ্ণা। আর আমি এই তৃষ্ণায় মরতে চাই না৷ না ধোকা খেতে চাই।
পাশ থেকে স্মৃতি বলল,
-বিয়ে করে ফেলুন তাহলে!
আহান হাসলো এবার। গভীর শ্বাস ফেলে বলল,
– বিয়ে করার জন্যও তো ভালোবাসার মানুষ জরুরি। সকলে বিয়ে করতে চায় আমার সম্পদের জন্য। কিন্তু আমি তো চাই এমন একজনকে যে আমাকে চাইবে। কখনো হাত ছেড়ে দিবে না। না কখনো অবহেলা করবে।
অর্নি এবার আহানের কাঁধে হাত রেখে বলল,
-ঠিক আছে মানছি তোর বাবাকে তোর মা ধোঁকা দিয়েছে ৷ তাই বলে তোরও যে এমন হবে তা তো না৷ লাইফে সিরিয়াস হ দোস্ত। এবার সিরিয়াস হয়ে একটা প্রেম কর।
আহান বোকার মতো অর্নির দিকে তাকালো। কিছু একটা ভেবে বলল,
-সিরিয়াস হবো? ওকে নো প্রবলেম। যাহ আজ থেকে আমি সিরিয়াস। হেই মায়রা প্রেম করবে আমার সাথে?
আহানের কথায় সকলে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকালো। তুহিন আহানের মাথায় একটা গাট্টা মেরে বলল,
-দোস্ত লাইফে সিরিয়াস হতে বলেছি। মজা করতে না।
-আরে ইয়ার আই এম সিরিয়াস।
এরপর হুমায়রার দিকে তাকিয়ে বলল,
-আমার ভালোলাগে তোমাকে। ওইসব নায়কদের মতে কাব্যিক ভাবে প্রপোজ করা আমার ডিকশনারিতে নেই। তাই ডিরেক্ট বললাম৷
হুমায়রা শুধু বোকার মতো একবার আহানকে দেখছে আরেকবার অমিত অনিলের দিকে তাকাচ্ছে। ওর আসলে কি বলা উচিত সেটাই ও বুঝতে পারছে না। মুখ থেকে কথা বের হচ্ছে না তার৷ অনিল পাশ থেকে আহানকে একটা চ’র দিয়ে বলে,
-আমার সামনে বসে আমার বোনকেই প্রপোজ করছিস শা*লা।
অনিলের মুখে শা*লা শব্দটা শুনে আহান গম্ভীর ভাবে বলল,
-দোস্ত আমি তোর শা*লা না। তোর বোনকে আমি বিয়ে করলে তুই আমার শা*লা ও সরি সম্বন্ধি হবি ইয়ার৷ তোরা শুধু হ্যা বলে দে।
হুমায়রা এবার অমিত অনিলের উওরের অপেক্ষায় বসে আছে৷ তার ভাইয়েরা এই মুহূর্তে আসলে কি বলবে। এরই মাঝ থেকে অমিত বলল,
-বোনটা আমার খুবই আদরের। যেহেতু তুই আমাদের ফ্রেন্ড । সাত বছর ধরে তোকে চিনি৷ তো হ্যা বলাই যায়৷ কিন্তু…
কিন্তু শব্দটা শুনেই আহান অসহায় কন্ঠে বলল,
-হ্যাঁ বলছিস যখন হ্যাঁ-ই বল না। সাথে আবার কিন্তু কেন এড করছিস দোস্ত?
অনিল গম্ভীর কন্ঠে বলল,
-হুমু আমাদের একমাত্র বোন এবং খুবই আদরের। তো ওর চোখে পানি আসলে দোস্ত তুই শেষ।
-আরে ইয়ার একফোটা পানিও আসবে না৷ শুধু হ্যাঁ বলে দে আর তোর বোনের সাথে প্রেম করি।
হুমায়রা স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে আছে। ও আসলে কি বলবে৷ আহান হুমায়রাকে চুপ থাকতে দেখে এক্সাইটেড হয়ে জিজ্ঞেস করল,
-মায়রা তুমি বলো। তুমি কি রাজি?
হুমায়রা সবার দিকে এক নজর তাকিয়ে মুখ বিক্রিত করে বিস্ময়ের স্বরে বলল,
-সিরিয়াসলি!
বলেই স্থান ত্যাগ করে নিজের ঘরে এসে দরজা আটকাবে সেই মুহূর্তেই আহান ঘরে এসে হাজির। তা দেখে বিরক্তি নিয়ে বলল,
-কি চাই?
-তোমাকে চাই।
– যান তো আপনি৷ মাথা গরম করবেন না৷
-তোমার কি আমাকে ভালো লাগে না?
-কোনো মেয়ে অবশ্যই দশ বারোটা প্রেম করা ছেলের সাথে প্রেম বা বিয়ে করতে চাইবে না।
-তোমাকে কে বললো আমি দশ-বারোটা প্রেম করেছি।
-সবাই তো বলল। আ্… আর্.. আর্ সেদিন রেম্প ওয়াকেও দেখেছি কীভাবে মেয়ে দুটোর কোমড় জড়িয়ে ধরে ছিলেন। তো আর কি?
-এতেই বুঝে গেলে আমি প্লে-বয়?
হুমায়রা কিছু না বলে বাইরে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলেই আহান দরজা আটকে হুমায়রাকে দরজার সাথে মিশিয়ে নিলো। হুমায়রা দুই হাত নিজের হাতে মুষ্টিবদ্ধ করে আবারো জিজ্ঞেস করল,
-কখনো কোনো মেয়ের সাথে একা দেখেছ আমাকে?
ভয়ে হুমায়রার গলা শুকিয়ে আসছে। মুখ থেকে আর কথা বের হচ্ছে না। মাথা নিচু করে শুধু মাথা নাড়িয়ে না বুঝালো। আহান আবার বলল,
-তোমার কি মনে হয় আমি প্লে-বয় হলে তোমার ভাইয়েরা রাজি হতো?
হুমায়রা এবার কৌতুহল নিয়ে তাকায়। সত্যিই তো সে এটা ভেবে দেখেনি। হুমায়রাকে ভাবনায় পরে থাকতে দেখে আহান এবার কোমড় জড়িয়ে আরো কাছে টেনে নিলো। কপালে কপাল ঠেকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-তো এখনও কি আপওি আছে?নাকি আমি দেখতে সুন্দর না কোনটা?
হুমায়রা এবার গম্ভীর কন্ঠে বলল,
-আমাকে ছাড়ুন।
আহানও ছেড়ে দিলো। নিজের হাত পেছনদিকে নিয়ে হালকা ঝুঁকে হুমায়রার মুখোমুখি হয়ে জিজ্ঞেস করল,
-তো ম্যাম আমি কি হ্যাঁ ধরে নিবো?
এবার হুমায়রা আহানের চোখে চোখ রাখলো। ভালোমতো পরখ করতে লাগলো আহানকে। ফর্সা মুখে গোলাপি ঠোঁট, চোখের কোনে কাটা দাগ, মাথার কিছু চুল কপালের কাছে নেমে আছে। অদ্ভুদ একটা শিহরণ হলো যেন দেহের মাঝে। ইচ্ছে হলো চুলগুলো ছুয়িয়ে দিতে। তবুও চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে বলল,
-প্রেম টেম আমার দ্বারা হয়না। আর আপনি প্লে-বয় নাকি না তা দেখার বা জানার ইচ্ছে নেই আমার। যদি পরে বিরক্ত হয়ে ছেড়ে যান তখন? ডিরেক্ট যদি বিয়ে করেন তাহলে রাজি আছি।
হুমায়রার কথায় সোজা হলো আহান। একটু ভাবুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
-উমমম…ওকে ম্যাম তাহলে তাই হোক? বিয়ে করছি আমি আপনাকে।
আবারো হালকা নিচু হয়ে নাকের সাথে নাক ঘষে বলল,
-খুব শীঘ্রই আপনি এই সারফারাজ আহানের বউ হতে চলেছেন। এখন চলি।
বলেই ঘর থেকে বের হয়ে গেল। হুমায়রা চুপচাপ যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো। ঠোঁটের কোনে ফুটে উঠলো এক চিলতে হাসি। হাসির কারণটা তার কাছে অজানা। চুপচাপ বিছানায় গিয়ে সুয়ে পরলো। উপরের সিলিং দেখতে দেখতেই উদ্ভট কথা ভাবছে ও নিজে নিজেই লজ্জা পাচ্ছে সে। হঠাৎ স্মৃতি এসে পাশে সুয়ে পরলো। হুমায়রাকে ধাক্কা দিয়ে বললো,
-মন মে লাড্ডু ফুটা কেয়া?
স্মৃতির প্রশ্নে হুমায়রা লজ্জায় মুখ ঢেকে নিলো।
স্মৃতি আবারো খুশি হয়ে বলল,
– ওহ ইয়ার ফাইনালি আমার বান্ধুবীর বিয়ে হবে আর আমি বেয়াই পাবো। ইশ.. কি মজা হবে রে।
স্মৃতির এমন কথায় হুমায়রা বোকাবনে গেল। অবাক হয়ে বলল,
-আমার বিয়ে হবে তাতে তুই খুশি নাকি বেয়াই পাবি, মজা করবি সেই জন্য বল তো!
স্মৃতি এবার একটু কাশি দিয়ে বলল,
-আরে দোস্ত বিয়ে তোর হবে। তুই খুশি হবি। আমার কি তাতে। আমি অবশ্যই বেয়াই পাবো তাতে খুশি হবো।
স্মৃতির এমন কথায় হুমায়রা উঠে বসলো। স্মৃতির গায়ের উপরে উঠে মারতে মারতে বলল,
-স্মৃতুর বাচ্চা .. মানুষ বান্ধুবীর বিয়ে হয়ে গেলে কষ্ট পায়। আর ও বেয়াই পাওয়ার আশায় নাচছে।
স্মৃতিও হুমায়রার মা’র থেকে নিজেকে বাঁচাতে বাচাতে বলল,
-আরে ইয়ার দোস্ত তোর বিয়ে হলে আমি কষ্ট কেন পাবো ইয়ার। তোর পরে আমিও বিয়ে করে নিবো তো। থাম ইয়ার ব্যথা লাগছে।
অমিত,অনিলসহ বাকিরা মাএই হুমায়রার রুমে এসেছে। ওদের মা’রা’মা’রি দেখে সবাই থমকে দাঁড়িয়ে রইলো। শুভ হালকা কাশি দিয়ে বলল,
-কি হচ্ছে এখানে। হুমু তুমি আমার বোনকে মা’রছো কেন?
হঠাৎ শুভর কন্ঠ শুনে থামে হুমায়রা। সবাইকে দেখে জোরপূর্বক হেসে স্মৃতির উপর থেকে নেমে বসে। স্মৃতির এবার হাফ ছেড়ে বাঁচে যেন। ধীরে ধীরে উঠে বসে হাঁপাতে লাগলো। অনিল কৌতুহল নিয়ে বলল,
-হুমু তুই ওকে মারছিলি কেন?
হুমায়রাও চোর ধরা পরার মতো হাসি দিয়ে বলে,
-কিছু না এমনি।
কেউ আর কথা বাড়ায় না। শুভ স্মৃতির দিকে তাকিয়ে বলে,
-চল বাসায় যাবো। কাল ভার্সিটিতে দেখা হবে সবার সাথে।
ধীরে ধীরে সকলে স্থান ত্যাগ করে। হুমায়রাও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বারান্দায় গিয়ে দাড়ায়। আকাশটা মেঘে ঢাকা। বৃষ্টি হবে হয়তো। মনে মনে ঠিক করলো রাতে বৃষ্টি হলে ভিজবে সে। হঠাৎ পাশে কারো উপস্থিতি পেয়ে ভয়ে দূরে সরে যাবে তার আগেই মানুষটা কোমড় জড়িয়ে কাছে টেনে নিলো। হালকা নিচু হয়ে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
-বিয়ের আগেই এতো ভয়! বিয়ের পরে কি হবে মায়রা!
হুমায়রার হার্টবিটটা বেড়ে গেছে অনেকটা। শ্বাসটাও দীর্ঘ হয়ে উঠেছে। এই মুহূর্তে কি করা উচিত সেটাও সে জানে না। ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেয়ার মতো শক্তিটাও হয়তো তার নেই। স্ট্যাচুর মতো দাড়িয়ে রইলো শুধু। আহান তা দেখে হালকা হাসলো। কোমড় জড়িয়ে আরো কাছে টেনে বলল,
-রেডি তো আমার বউ হওয়ার জন্য? ভালোবাসি। প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ে গেছি তোমার। কিন্তু মনের মাঝের দ্বীধার জন্য আর বলা হয়নি। আজ বলছি ভালোবাসি, ভালোবাসি মায়রা। খুব ভালোবাসি। আমার এই বোকামনও যে কারো প্রেমে পড়তে পারে তুমি না আসলে হয়তো বুঝতাম না।
হুমায়রা তখনও স্তব্ধ। আহান আর কিছু বললো না। হুমায়রাকে ছেড়ে দূরে দাড়ালো একটু। হুট করে কিছু একটা মাথায় আসতেই হুমায়রার ঠোঁটের দিকে এগিয়ে গেলো। তা দেখে হুমায়রা চোখ খিঁচে বন্ধ করে রেখেছে। আবার কিছু ভেবে থামলো আহান। চুপচাপ হুমায়রার গালে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুয়িয়ে স্থান ত্যাগ করলো সে।
কিছুক্ষণ পর শান্ত হয়ে চোখ খুলে সামনে তাকাতেই দেখে আহান হাওয়া হয়ে গেছে। ভালোমতো আশেপাশে পরখ করে দেখলেও কাউকে পেলো না। তা দেখে নিজেই ভাবনায় পরে গেল। একা একা বিরবির করতে লাগলো নিজের মতো,
“আমি কি প্রেমে পড়েছি? মুভিতে তো দেখায় প্রেমে পড়লে মানুষ সব জায়গায় একজনকেই দেখে আমারও কি তাই। নাকি জ্বীন ছিল? আল্লাহ জ্বীনই ছিল হয়তো। এ্যা…জ্বীন আমাকে ওদের দেশে নিয়ে গেলে তখন?আমার কি হবে! মামনি…..”
বলেই হুমায়রা এক দৌড়ে নীলা বেগমের ঘরে এসে হাজির হয়। এখানে এসে আবার স্তব্ধ হয়ে যায়। অমিত, অনিল,অনুরাগ সাহেব সকলেই এখানে উপস্থিত। মূলত ওর বিয়ে নিয়েই আলোচনা করছে তারা। হুমায়রাকে দেখে ওরা চুপ হয়ে যায়। অনিল গম্ভীর কন্ঠে বলে,
-এখানে কি? ঘরে যা।
-ভয় করছে একা। আমি মামনির কাছে থাকবো।
বলেই নীলা বেগমের কাছে এসে কোলে সুয়ে পরে। অমিত অনিলও দীর্ঘশ্বাস ফেলে। অমিত গম্ভীর কন্ঠে বলে,
-তোমরা রাজি কিনা বলো?
অনুরাগ সাহেব হেসে বলে,
-আহান ছেলে হিসেবে ভালো এবং ভদ্র। তো অমত করার প্রশ্নই আসে না।
এরই মাঝে নীলা বেগম বলে,
-ঠিক আছে কিন্তু এই মেয়ে তো রান্নার ‘র’ জানে না। তাহলে বিয়ে দিয়ে কি হবে?
তা শুনে হুমায়রা উঠে বসে। অনুরাগ সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলে,
-বাবাই কি দেখে বিয়ে করেছিলে বলো তো।
অনুরাগ সাহেবও হেসে বলে,
-বয়সের খেলা মা।
-দূর…এটা আমার মামনি হতেই পারে না।
বলেই বাবাইয়ের কোলে মাথা রাখে হুমায়রা৷ আর নীলা বেগম বোকার মতো তাকিয়ে থাকলেন। সত্যি কথা বললেও দোষ হয়ে যায় তার!
#চলবে…..
(দুঃখিত। অসুস্থতার জন্য লিখতে পারছি না। তাই গতদিন দিতে পারিনি 🥲। সুস্থ হলে রেগুলার হওয়ার চেষ্টা করবো।)

