বোকামন #পর্ব_১২

0
2

#বোকামন
#পর্ব_১২
#Tahsin_Atoshi

~~সময় ২০১৮,

হুমায়রা তখন মাএ বারো বছর। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মাএই পি.এস.সি রেজাল্ট হাতে পোয়ে সারা বাড়ি এক করে ফেলেছে হুমায়রা। কারণ সে পি.এস.সি. রেজাল্টে A+ পেয়েছে। উপস্থিত সকলেই খুশি এতে। শুধু খুশি না তার ভাই অমিত । কারণ সে পিএসসিতে A+পায়নি। তাই গম্ভীর মুখে নিজ ঘরে বসে আছে। তাতে কারো কিছু যায় আসে না। সবাই পরে আছে বাড়ির মেয়েকে নিয়ে। সেই উপলক্ষে একটা ছোট অনুষ্ঠানের আয়জন করা হয়েছে। অনুষ্ঠান বললে ভুল হবে শুধু খাওয়া দাওয়া ও গল্পগুজব বললেই চলে। হুমায়রাও খুশি মনে অমিতের ঘরে চলে আসে। হাসি মুখে বলে,

-ভাইয়া তুমি এখানে বসে আছো কেন? আমার রেজাল্টে কি তোমরা খুশি না?

অমিত এবার রাগ দেখিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,

-কাটা গায়ে নুনের ছিটা দিতে এসেছিস নাকি হ্যাঁ? যা এখান থেকে।

হুুমায়রা এবার আরো বেশি কাছে চলে এলো। অমিতের গায়ের সাথে ঘেঁষে বসে বলল,

-কাটা গায়ে নুনের ছিটা কীভাবে দেয়? এতে কি ব্যথা লাগে?

হুমায়রার কথায় অমিতের আরো বেশি মাথা গরম হয়ে যায়। বিরক্তি নিয়ে হুমায়রাকে এক ধাক্কায় ঘর থেকে বের করে দরজা আটকে দেয়। হুমায়রা নিজেকে সামলাতে না পেরে মেঝেতে পরে যায়। সেই মুহূর্তেই নীলা বেগমের আভির্ভাব ঘটে। হুমায়রাকে নিচে পরে থাকতে দেখে জলদি ওর কাছে চলে আসে। হুমায়রাকে ধরে ভালোভাবে পরখ করে দেখে ব্যথা পেয়েছে কিনা। নাহ ব্যথা পায়নি৷ তা দেখে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে প্রশ্ন করে,

-কিরে পরে গেলি কীভাবে মা?

-অমিত ভাইয়া ধাক্কা দিয়েছে আম্মু। ভাইয়া পঁচা।

বলেই কান্না শুরু করে দিলো। নীলা বেগম আর কিছু বললেন না। হুমায়রাকে নিয়ে নিজ ঘরে চলে এলেন। কান্না থামিয়ে ঘুম পারিয়ে দিলেন তিনি।

সন্ধ্যা হতেই কিছু কাছের মানুষজন এলো তাদের বাসায়। কাছের মানুষ বললে ভুল হবে এরা হলো বিজনেস পার্টনার। হুমায়রা নিজের মতো খেলতে রইলো। এরই মাঝে একজনের কুদৃষ্টি পড়লো হুমায়রার উপর। সে হলো অনুরাগ সাহেবের বিজনেস পার্টনার মাহতাব গাঙ্গুলি।
হাসিমুখে হুমায়রাকে ডেকে নিজের কোলে বসায়। ব্যাপারটা পরিবারের মানুষ সহজভাবে নিলেও হুমায়রা নিতে পারেনি। ছোট হলেও মানুষের স্পর্শের ধরণ তার অজানা নয়। তাই কোনোমতে ছাড়া পেয়ে নিজ ঘরে এসে দরজা আটকে বসে থাকে। রাতে আর কেউ তার সাথে দেখা করতে পারেনি। হাজার ডাকায়ও সে দরজা খোলেনি।

কেটে যায় কিছুদিন। এরমাঝে অনেকবারই বিজনেসের বাহানায় এসেছে মাহতাব গাঙ্গুলি। আর হুমায়রাকে প্রত্যেকবারই সহ্য করতে হয়েছে এর স্পর্শ।

মায়ের সাথে বিষয়টা শেয়ার করলেও তারা বিশ্বাস করেনি। এরই মাঝে একদিন চার-পাঁচজন গার্ড নিয়ে হাজির হয় মাহতাব। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সামনে রেখে দেয় একটা কাগজ। অনুরাগ সাহেবও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। কি বলবেন তিনি? না পড়ে কাগজে সই করার ফল তার মেয়ে ভোগ করবে হয়তো। কাগজে লেখা আছে,
“বিজনেসের দায়ে যদি কখনো লস হয় বা সময়মতো ঋণ শোধ করতে না পারে তাহলে এর পরিবর্তে সে তার মেয়েকে দান করবে। মেয়ে মা*রা গেলে সেক্ষেএে মাফ করা গেলেও জীবিত থাকলে মেয়েকে দান করতে হবে তাদের কাছে।”

এটা যে মাহতাব গাঙ্গুলির চাল ছিল তা বুঝতে খুব একটা সময় লাগেনা কারো। তাদের ভুলের বলির পাঠা হয় হুমায়রা। দু’জন লোক এসে হুমায়রাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেই বাধা দেয় অনুরাগ সাহেব। আরো কিছুদিন সময় চায় এর জন্য। কিন্তু কোনো লাভ হয়না।

জোর পূর্বক ঘরে গিয়ে হুমায়রাকে নিয়ে আসা হয়। হাজার বাধায়ও আটকে রাখা যাচ্ছিলো না দেখে অমিত এবার বোনের ঢাল হয়ে সামনে দাড়ায়। এক প্রকার ধ*স্তা*ধ*স্তি শুরু হয় এদের মাঝে। এরই মাঝে গার্ডদের মধ্যে কেউ একজন গুলি করে বসে অমিতকে। তাতেই পুরো ঘর স্তব্ধ হয়ে যায়। মেয়েকে ছেড়ে এবার সকলে ছেলের জন্য চিন্তা করে। মেয়ের চিৎকার হয়তো তাদের কান পর্যন্ত পৌছায়নি।

এইটুকু বলে থামে অমিত। পাশ থেকে তুলি কৌতুহল নিয়ে বলে,

-তারমানে হুমু তোমার আপন বোন?

-হ্যাঁ।

তুহিন কিছুটা কৌতুহল নিয়ে প্রশ্ন করে,

-তাহলে ও তোর মা কে মামনি আর তোর বাবাকে বাবাই কেন বলে?

-এক্সিডেন্টে স্মৃতি শক্তি চলে যাওয়ার পর ওর কিছুই মনে নেই। সকলে জানে আমার বোন মারা গেছে অনেক আগে। আর বিপদ এখনো কাটেনি। তাই ওর পরিচয়টাও বদলে গেছে।

আহান এতক্ষণ সবই শুনছিল। এবার ঠিক হয়ে বসে হুমায়রার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

-ওখান থেকে ও বেঁচে ফিরলো কীভাবে?

– জানি না। সেটা হুমুই বলতে পারবে। কীভাবে বেঁচে গেছে,কি হয়েছিল সব।

-ওর স্মৃতি ফেরানোর চেষ্টা করিসনি?

-ডাক্তার বলেছে ব্রেনে অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ না করতে। এতে বিপরীত হতে পারে। ওর মৃত্যু ঝুকি আছে এতে।

-এর জন্য একটু আগে ও ভয় পেয়ে দৌড়ে এসেছিল?

-হুম।

এবার শুভ জিজ্ঞেস করে,

-সেই গু*লি করার কারণেই কি তোর দুই বছর লস গিয়েছিল?

অমিত হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায় শুধু।

আহানের মাঝে তবুও কৌতুহল থেকেই যায়। স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ বসে ভাবতে থাকে হুমায়রা বেঁচে ফিরলো কীভাবে? মাঝ থেকে অর্নি কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে,

-অনিল তুমি কোথায় ছিলে তখন?

অর্নির প্রশ্নে অনিল একটু ভরকে যায়। অমিত হেসে বলে,

-এখন যেমন সাপ ভেজির মতো ঝগড়া করে তখনও আরো বেশি করতো। তাই মা-বাবা মিলে ওকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দিয়েছিল।

অর্নি কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলো আবারো,

-হুমু কীভাবে বেঁচে ফিরলো জানার খুব ইচ্ছে। তখন তো অনেক ছোট ছিল তাহলে?

এরই মাঝে স্মৃতি বলতে শুরু করলো,

মাহতাব গাঙ্গুলি একজন বাচ্চা পাচারকারী। বিদেশে বাচ্চা পাচার করেই মূলত উনি টাকা ইনকাম করে। সেবারও ওনার পঞ্চাশ জন বাচ্চা পাচার করার কথা ছিল। পঞ্চাশ জন বাচ্চা জোগাড় হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু এদের অত্যাচার, না খেয়ে থাকার কারণে হঠাৎ করে একজন মারা যায়। তাতেই উনি পাগল হয়ে ওঠে আরেকটা বাচ্চা জোগাড় করার জন্য।

ঠিক সেদিনই হুমায়রাকে নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে। অজ্ঞান অবস্থায় বাচ্চাদের মাঝে রেখে যায় লোকগুলো। বাচ্চারা সকলে কৌতুহল নিয়ে শুধু তাকিয়ে থাকে। এতোটা অপরুপ সুন্দর, নিখুঁত হয়তো কাউকে দেখেনি৷ কান্না করার ফলে চোখমুখ ফুলে আছে। সব ছেলে মেয়েদের মাঝ থেকে স্মৃতি ধীরে ধীরে হুমায়রার কাছে এসে বসে। পাশে থাকা কলসি থেকে একটু পানি নিয়ে মুখে ছিটিয়ে দিতেই জ্ঞান ফিরে হুমায়রার। নিজেকে বন্দী দশায় দেখে আবারো চিৎকার করতে যাবে তার আগেই স্মৃতি মুখ চেপে ধরে। হুমায়রাও শান্ত হয়।

পাঁচজন মেয়ে একসাথে মিলে ঠিক করে এখান থেকে পালাবে। কিন্তু বাকিরা মৃত্যুর ভয়ে পিছপা হয়ে যায়। পাঁচজন মিলে প্লান করতে থাকে কীভাবে কি করতে হবে। কিন্তু ওদের ছোট মস্তিষ্কে এতোটা বড় প্ল্যান করা তো আর সম্ভব না৷ তবুও নিজেরা নিজেদের মতো ঠিক করে নেয়। এরই মাঝে একজন লোক এসে সবার জন্য একে একে রুটি দিয়ে যায় খাওয়ার জন্য।

রুটি দেয়ার মাঝেই একটি মেয়ে কৌশলে লোকটার পকেট থেকে ফোনটা নিয়ে নেয়। এরপর হয় তাদের আসল কাজ। চুপচাপ ৯৯৯ এ কল করে সবটা বলে। এখন ফোনটা তাদের কাছে রাখা যাবে না৷ তাই সামনে থাকা ছোট ফাঁকা দিয়ে ফোনটা দূরে ফেলে দেয়। কিন্তু কপাল তাদের সহায় হয় না।

বাংলাদেশের পুলিশ বলে কথা সময় মতো তারা কখনো এন্ট্রি নিতে পারে না। এবারও পারেনি। ধীরে ধীরে সব বাচ্চাকে গুনে গুনে গাড়িতে তোলা হয়। বাইরে ঝড় বৃষ্টির কারণে সকলেই বিপাকে পরেছে। তবুও যেন ছোট একটা রাস্তা পায় তারা। ওয়াশরুমে যাওয়ার বাহানায় ঢুকে যায় ওয়াশরুমে। বাকিরা তখনও গাড়িতে বসে আছে।

লোকগুলো নিজেদের মাঝেই কথা বলছে কীভাবে কি করবে। এই ঝড়ের মাঝে গাড়ি চালানোটাও রিস্কি। কিন্তু বাচ্চাগুলো আজ রাতেই ডেলিভারি করতে হবে তাদের। এসব আলোচনায় ব্যস্ত থাকায় বাচ্চাদের দিকে আর খেয়াল করা হয়না তাদের। সেই সুযোগটাই কাজে লাগায় সেই পাঁচজন৷ তাদেরকে রাখা হয়েছে গাড়ির গেরেজের ভিতরে। সেখানেই আছে একটা গোপন পথ ; এক কথায় মৃত্যু পুরী। বাচ্চাদের আটক করে সেই গেরেজের নিচে গড়ে ওঠা জগৎটাতেই আটকে রাখা হয়।

এতে তাদের সুবিধা হয় আরো বেশি। ধীরে ধীরে পাঁচজন মিলে ঢুকে পরে কয়েকটা গাড়ির পেছনের ডেস্কের ভিতরে। পাঁচজনের গন্তব্য হয় ভিন্ন ভিন্ন।

থামে স্মৃতি। আহান অবাক হয়ে বলে,

-তুমিও সেখানে ছিলে?

-হুম।

-এরজন্যই কি তোমরা বেস্টফ্রেন্ড নাকি?

-ওর সেসব কিছুই মনে নেই। আমাকে মনে রাখবে কীভাবে? তবে হ্যাঁ আমি নিজ থেকে ওর সাথে বন্ধুত্ব করি ওই ঘটনার পরই।

-আপনারা এতো ছোট হয়েও কীভাবে পালালেন? এতো বুদ্ধি কোথা থেকে আসলো?

তুহিনের কথায় হাসলো স্মৃতি। বললো,

-আল্লাহ সাহায্য করেছে তাই। ওখানে থাকলে যে জীবনটা নরক হতো।

-হুমায়রা এক্সিডেন্ট করলো কীভাবে?

-তা জানি না। হয়তো যে গাড়িতে ছিল সেই গাড়ির কোনোভাবে এক্সিডেন্ট হয়েছে।

হঠাৎ হুমায়রার গোঙানির শব্দে সকলে সেদিকে তাকালো। ঘুমের মাঝেই কিছু বকে যাচ্ছে হুমায়রা কিন্তু তা কেউই বুঝতে পারছে না। এবার অমিত ধীরে ধীরে হুমায়রাকে ডেকে জাগিয়ে তুললো। হুমায়রা চুপচাপ অনিলের কাঁধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে বসে রইলো। তার মাথায় এখনো কিছুক্ষণ আগের ঘটনা ঘুরছে। সে স্পষ্ট দেখেছে কিছু লোক তাকে নিয়ে যেতে এসেছে। ঘরের পরিবেশটাও ভিন্ন ছিল। তাহলে সব বদলে গেলো কীভাবে।
হুমায়রাকে ভাবনায় ডুবে থাকতে দেখে অনিল মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল,

-কি ভাবছিস?

অনিলের কথায় এক নজর তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে না বুঝালো। নিচু স্বরে বলল,

-ক্ষুধা লেগেছে।

-আম্মু আব্বু তো বাসায় নেই। কি খাবি বল বাইরে থেকে নিয়ে আসি।

-ভাত খাবো।

ভাতের কথা শুনে অনিল দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সে জানে এই মুহূর্তে খাবার দিলেও ওকে খায়িয়ে দেয়া লাগবে। যা অনিল করতে চায় না। তবুও দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজ হাতেই ভাত নিয়ে খাওয়ানোর জন্য আসতেই অর্নি বলল,

-আমি খায়িয়ে দিচ্ছি। বসো তুমি।

যেই কথা সেই কাজ। অনিলও যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। বলতে দেরি ভাতের থালাটা অর্নিকে দিতে দেরি হলো না। অর্নিও চুপচাপ খায়িয়ে দিলো। ততক্ষণে নীলা বেগম ও অনুরাগ সাহেবও হাজির হয়েছেন বাসায়।

#চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here