#বোকামন
#পর্ব_১৯
#Tahsin_Atoshi
গভীর রাত। চারিপাশে নিস্তব্ধতার মাঝে দূর শিয়ালের ডাক ভেসে আসছে। অন্ধকার ঘরের মাঝে বসে আছে আহান। সামনে টেবিলে পাচ থেকে ছয়টা ওয়াইনের বোতল। দু’টো অলরেডি শেষ করেছে সে। এখন আরেকটা হাতে নিলো। কাজের মহিলাটা এসে নিজের কাজ করে আবার চলে যায়।
এক সপ্তাহ হলো এমন বন্দী জীবন কাটাচ্ছে আহান। বাইরের মানুষকে যে এখন সহ্য হচ্ছে না তার৷ সামনে স্ক্রিনে ঝলঝল করছে তার প্রেয়সীর ছবি। অথচ সে এখন অন্যের বউ। কি আজব তাইনা? যে কখনো কাউকে ভালোবাসেনি আজ সে এক মেয়ের জন্য এই হাল করেছে। রাগ হচ্ছে তার। স্ক্রিনে ছবিটা দেখলে আবার সেই রাগ কমেও যাচ্ছে। কিন্তু এখন সেই মানুষটা অন্যের বউ। আর সহ্য করতে পারলো না সে। হাতে থাকা ওয়াইনের বোতলটা ছুড়ে মারলো স্ক্রিনের দিকে। সাথে সাথেই নিভে গেল সব। রুমে যতটুকু আলো ছিল সেইটুকু নিভে গেল। তবুও অন্ধকারের মাঝে ভেসে এলো কারো হাসির সুর। হাসির মাঝেই ছিল কষ্টের ছাপ। যা শোনার জন্য কেউ নেই। এর মাঝে বন্ধুরা কয়েকবার এসেছে দেখা করতে। কিন্তু দরজার সামনে থেকেই ফিরে যেতে হয়েছে সবার। দরজা খোলেনি আহান এক মুহূর্তের জন্যও। কেউ বিরক্তও করেনি।
~★~
হুমায়রা চুপটি করে বারান্দার এক কোণে বসে আছে। বিরক্ত লাগছে সবকিছু। শুভর সাথে সবটা ঠিক করতে চেয়েও যেন পারছে না। দ্বিধা কাজ করছে মনে মাঝে। সেই সকালে অফিসে গিয়েছে শুভ। তাই হুমায়রা আর ঘর থেকে বের হয়নি। বাড়ির কেউ এই নিয়ে কোনো জোরজবরদস্তি করেনি। এই ক’দিনে ঘরের মানুষদের বুঝেছে সে। ঘরের সকলে মেনে নিলেও শুভর বাবা হুমায়রাকে মেনে নিতে পারেনি৷ এর কারণও সে জানে। স্মৃতির জন্য তো অনেক খারাপ ব্যবহার করেছে লোকটার সাথে। মেনে নিবেই বা কীভাবে? একা একা ঘরে থাকাও বিরক্তিকর হয়ে যাচ্ছে। হাজার হোক বাড়ির বউ সে। কোনো কাজ না করে কতদিনই বা ঘর বন্দী থাকবে। তাই কিছু একটা ভেবে নিচে চলে এলো।
স্মৃতি ড্রইং রুমে বসে বসে টিভি দেখছিল। হুমায়রাকে নামতে দেখে কিছুটা অবাক হয়৷ কাছে এসে জিজ্ঞেস করে কিছু লাগবে কিনা। হুমায়রাও না সূচক মাথা নাড়ায়। কিছু একটা ভেবে স্মৃতির হাত ধরে বলে,
-আমাকে একটা সাহায্য করবি প্লিজ।
-হুম বল। কি সাহায্য লাগবে?
-আ্… আহান..
-আবার আহানের নাম নিচ্ছিস কেন তুই? ভাইয়া শুনতে পেলে আবার রেগে যাবে।
-আমার কথাটা তো শোন প্লিজ।
-হুম বল।
-আ..আহান কেমন আছে একটু খোঁজ নিয়ে আমাকে বল না।.. আ্ আই প্রমিস আমি আর জানতে চাইবো না। যাস্ট একবার। প্লিজ।
স্মৃতি থামে। কিছু একটা ভেবে বলে,
-আচ্ছা এনে দিবো খবর। কিন্তু তুই প্রমিস কর ভাইয়ার সামনে ওর নাম তুলবি না।
-ও্ ওকে প্রমিস।
-আচ্ছা কাল আমি আহানের বাসায় যাবো। দেখা করে আসবো।
-ওকে।
কথা শেষে এবার হুমায়রা রান্না ঘরের কাছে পা বারায়। মৌমিতা ও তার ভাইয়ের বউ দু’জন মিলে কাজ করছে দেখে নিজেও সামনে এগিয়ে যায়৷ গলা থেকে কন্ঠ বের হচ্ছে না তার। তবুও নিজেকে সামলে ডাকে,
-আ্ আন্ আন্টি। আমাকে কোনো কাজ দিন না আমি করে দেই।
হুমায়রার কন্ঠ শুনে চমকায় মৌমিতা৷ এই এক সপ্তাহে খাবার খাওয়া ছাড়া ঘর থেকে বের হতে দেখেনি সে হুমায়রাকে। তাহলে হঠাৎ! তবুও ভেবে নেয় হয়তো সবটা মেনে নিচ্ছে ধীরে ধীরে। মুচকি হাসি দিয়ে হুমায়রার কাছে এসে দুই গালে হাত রেখে বলেন,
-কিছু করতে হবে না মা। যাও স্মৃতির সাথে গিয়ে টিভি দেখো। আমি তোমার আন্টি করছি তো।
মন খারাপ করে তাকায় হুমায়রা। বলে,
-না আন্টি আমাকে দিন আমি করি। সারাদিন সুয়ে বসে থেকেও বা কি করবো। আর মামনি বলেছে কাজ করতে৷
-আচ্ছা? তোমার মামনি আর কি বলেছে?
-শশুড় বাড়ির সবার কথা মেনে চলতে। এখন দিননা আমাকে কাজ। বসেই তো আছি। আর শিখতেও তো হবে। আমিতো কাজ পারি না।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৌমিতা। একটু গম্ভীর কন্ঠে বলে,
-আলু কাটতে পারো?
-একটু আধটু।
-আচ্ছা টেবিলে বসো।
মৌমিতা হুমায়রাকে বসিয়ে ছুড়িসহ ঝুড়িতে কয়েকটা আলু নিয়ে এলেন। নিজে একটা কেটে দেখিয়ে দিলেন কীভাবে কাটতে হয়। হুমায়রাও সেই অনুযায়ী কাটতে লাগলো। স্মৃতি এক নজর দেখে মুচকি হেসে টিভিতে মনোযোগ দিলো এবার। হুমায়রাও খুশি মনে কাটতে রইলো। কিছু একটা তো শিখেছে। কিন্তু সেটাও আর বেশিক্ষণ হলো না। হুট করেই আঙুল কেটে বসলো সে।
শুভ মাএই অফিস থেকে ফিরে ঘরে ঢুকছিল। হঠাৎ হুমায়রার চিৎকারে সেখানে দৌড়ে এলো। আঙুল কেটে রক্ত বের হচ্ছে হুমায়রার। সাথে সাথেই সেটা মুখে পুরে নিলো। ততক্ষণে ঘরের সকলে হাজির হয়েছে সেখানে। হঠাৎ শুভর আগমনে হুমায়রাও অবাক হয় কিছুটা। কারণ রাত ছাড়া শুভ বাসায় ফেরে না। তাহলে আজ?কিছু বলতে যাবে তার আগেই শুভ ধমক দিয়ে বলে,
-কাজ করতে কে বলেছে তোমাকে?
-আমি..
হুমায়রার কথা বলার মাঝে শুভ মৌমিতার দিকে তাকিয়ে উচ্চস্বরে বলে ওঠে,
-ওকে কাজ করতে দিয়েছ কেন? বলেছি না ওকে দিয়ে কোনো কাজ করাবে না?
-আমি নিজ থেকেই এসেছিলাম।
হুমায়রার কথায় থামে শুভ। এক নজর দেখে কোলে তুলে ঘরে নিয়ে যায়। হঠাৎ শুভর এমন কান্ডে বাড়ির সকলেই ভরকে যায়। হুমায়রার এই মুহূর্তে লজ্জা পাওয়া উচিত নাকি রাগ দেখানো উচিত সেটাই বুঝতে পারে না। শুভও কথা না বাড়িয়ে ঘরে নিয়ে বিছানায় বসিয়ে কিছু একটা খুজতে শুরু করে। তা দেখে হুমায়রা রাগ দেখিয়ে বলে,
-আমাকে এভাবে নিয়ে আসলেন কেন আপনি?
হুমায়রার কথায় ভ্রূক্ষেপ না করে নিজের মতো কিছু খুঁজতে ব্যস্ত। তা দেখে হুমায়রার আরো রাগ হলো। এবার উচ্চস্বরেই জিজ্ঞেস করে,
-কি হলো কি জিজ্ঞেস করছি আপনাকে?
শুভ তবুও প্রতুওর করলো না। কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি খুজে পেয়ে হুমায়রার সামনে এসে বসলো। হুমায়রা আবারো প্রশ্ন করতে যাবে তার আগেই শুভ ইশারায় চুপ করতে বললো। হুমায়রাও চুপ হয়ে গেল। শুভও ধীরে ধীরে হুমায়রার আঙুলে ব্যান্ডেজ করে জিজ্ঞেস করল,
-সকালে নাস্তা করেছিলে?
হুমায়রা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো এবার। শুভও চুপচাপ একটা ট্যাবলেট হাতে ধরিয়ে বলল,
-পেইন কিলারটা খেয়ে নেও।
শুভর কথায় বোকাবনে যায় হুমায়রা। সামান্য আঙুল কাটায় পেইন কিলার কে খায়! বোকার মতো তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-এইটুকু কেটে গেছে। এতে পেইন কিলার খাওয়ার কি আছে?
-আছে। খেতে বলেছি খাও। জোর করতে বাধ্য করবে না একদম।
এবার রাগ হলো হুমায়রার। দাঁতে দাঁত লাগিয়ে বলল,
-জোর করে সবকিছু করানো ছাড়া আর কি পারেন আপনি? বিয়ে তো করেছেন জোর করে। মন ভরেনি?
শুভ শান্ত চোখে তাকায় হুমায়রার দিকে। চোখেচোখ পরায় হুমায়রাও থেমে যায়। গম্ভীর কন্ঠে শুভ বলে,
-নিজের প্রিয় জিনিস অন্যকে দেয়ার মতো স্যাক্রিফাইস আমি করি না। স্পেশিয়ালি ভালোবাসার মানুষ।
তাচ্ছিল্যের স্বরে হাসে হুমায়রা। এরপর রাগ নিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে,
-আহানের কি দোষ ছিল। সেও তো ভালোবেসেছিল আমাকে। আর আমি…..
হঠাৎ শব্দে কেঁপে ওঠে হুমায়রা। ফার্স্ট এইড বাক্সটা মেঝেতে পরে আছে। জিনিসপত্র ছড়িয়ে একাকার। তা দেখেই কান্না চলে আসে হুমায়রার। ঠোঁট উল্টে কেঁদে ফেলে এবার। কান্না মাখা কন্ঠে বলে,
-এটা ভালোবাসা আপনার তাইনা? এখন এটা ছুড়ে মেরেছেন। দু’দিন পর আমার গায়ে হাত তুলতেও বাঁধবে না আপনার।
বলেই শব্দ করে কান্না করে দেয় হুমায়রা। কান্না করতে করতে বলে,
-মামনির কাছে যাবো আমি। আপনি খারাপ,পচা।
হুমায়রার এমন আচরণে বোকাবনে যায় শুভ। মাএই রাগ করছিল। সামান্য রাগ দেখাতেই কান্না! তারমধ্যে আবার মামনি মামনি করছে৷ কান্নাও যেন থামছে না। মাথায় হাত দিয়ে এবার ভাবতে থাকে কি করবে। উপায় না পেয়ে অসহায় কন্ঠে বলে,
-আ্.. আম্…আম সরি। কান্না কোরো না প্লিজ। আর রাগ দেখাবো না। এই যে কানে ধরছি।
তবুও কান্না থামে না হুমায়রার। আর উপায় না পেয়ে জড়িয়ে নেয় নিজের সাথে। একা একা বলতে থাকে,
-সরি তো। আর রাগ দেখাবো না সত্যি বলছি। কান্না কোরো না প্লিজ। আচ্ছা কাল তোমার মামনির কাছে নিয়ে যাবো। চলবে। এখন থামো।
থামে হুমায়রা। কান্নামাখা কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
-সত্যি নিয়ে যাবেন?
-হুম।
-ওকে।
বলে নিজের চোখ মুছে ফেলে। আর শুভ অবাক হয়ে ভাবতে থাকে এ কোন মেয়েকে বিয়ে করলো সে?
~★~
ভার্সিটির ক্লাস শেষে মাএ রাস্তার সামনে এসে দাড়ায় স্মৃতি । আজ ড্রাইভার আঙ্কেল আসবেনা। মূলত স্মৃতিই বারণ করেছে। হুমায়রাকে কথা দিয়েছে সে আহানের খোঁজ নিয়ে জানাবে৷ কথা ফেলেই বা কীভাবে। তাই চুপচাপ একটা রিকশা নিয়ে রওনা দেয় আহানের বাসার উদ্দেশ্যে।
প্রায় আধঘন্টার পথ অতিক্রম করে পৌছায় আহানের বাসায়৷ কিন্তু বাড়ির মেইন গেটের সামনে দাড়াতেই শরীরে কেমন একটা শিহরণ দিয়ে ওঠে। এর কারণটা সে জানে না। মনটাও মানছে না তার যাওয়ার জন্য৷ তবুও হুমায়রার কথা ভেবে পা বাড়ায়৷ পাশে বাগানের ফুলগুলো ফুটে আছে৷ দেখে ঠোঁটে হাসি ফুটে ওঠে। ইচ্ছে হয় একটা ছিড়ে হাতে নিতে। কিন্তু আর নেয়না। কারণ সে মনে করে গাছের ফুল গাছেই বেশি মানায়।
ধীরে ধীরে বাড়ির দরজার সামনে এসে মনে সাহস সঞ্চয় করে কলিংবেল বাজায় স্মৃতি৷ কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়না৷ ভয় হয় তার৷ আহান নিজের কোনো ক্ষতি করেনিতো! আরো কয়েকবার বাজায় কিন্তু ভেতর থেকে কোনো শব্দ পাওয়া যায়না৷ এরই মাঝে একজন মহিলা হাজির হয় সেখানে। কিছুটা ভরকে যায় স্মৃতি। তবে মহিলাটা কিছু বলে না৷ হাতে থাকা চাবিটা দিয়ে দরজা খুলে স্মৃতিকে ভেতরে আসতে বলে। অবাক হয় স্মৃতি৷ মহিলাটার সাথে পূর্ব পরিচিত না স্মৃতি। তাহলে? ভাবনার মাঝেই মহিলাটা প্রশ্ন করে বসে,
-আহান সাহেবের বন্ধু হও তুমি?
-জ্বী।
-নাম কি তোমার?
-স্মৃতি।
– ও আচ্ছা তাহলে তুমি সে?
-মানে?
মহিলাটা কোনো উওর দেয়না। স্মৃতি মহিলার প্রশ্নে অবাক হলেও আর প্রশ্ন করে না। চারপাশে চোখ বুলায় স্মৃতি। কিন্তু কাউকেই দেখতে পাচ্ছে না। ঘরগুলোও অনেকটা অগোছালো। কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
-আ্ আহান কোথায়?
মহিলাটা মুচকি হেসে বলে,
-আর কই থাকবো দেহো ওর ওই অন্ধকার রুমে আছে।
-মানে?
মহিলাটা হাতের ইশারা “It’s mine” নামক রুমটা দেখিয়ে দিলো। স্মৃতিও চুপচাপ রুমের দিকে পা বাড়ালো। হৃদপিণ্ডের ডিপ ডিপ শব্দ বেরেই যাচ্ছে। দরজার সামনে দাড়ালো খুব কষ্টে।
ভেতরে চোখ পরতেই চোখ কপালে ওঠার উপক্রম। দৌড়ে আহানের কাছে গিয়ে বসলো। সোফায় টানটান হয়ে সুয়ে আছে আহান। হাত দিয়ে রক্ত পরছে। ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো,ভেঙে একাকার হয়ে আছে। আহানকে দেখে কয়েকবার ডাকে। আহান কিছুটা গোঙ্গানির মতো শব্দ করে। এরপর আবার ঘুমিয়ে যায়। কিছু একটা ভেবে আহানের কপালে হাত রাখলো স্মৃতি৷ না জ্বর নেই। আরো কয়েকবার ডাকতেই উঠলো আহান। স্মৃতিকে দেখে অবাক হলেও শান্ত রইলো।
হাত কাটা দেখে কিছু সময়ের জন্য চুপ রইলো স্মৃতি । ভাবতে লাগলো কি করবে৷ আহানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-ফার্স্ট এইড বাক্স কোথায়?
-আমার রুমে বিছানার পাশের ড্রয়ারে।
আহানের শান্ত কন্ঠে উওর। ব্যাপারটা একটু অবাক হয় স্মৃতি৷ তবুও ভ্রুক্ষেপ করে না। ফার্স্ট এইড বাক্সটা নেয়ার জন্য রুম থেকে বাইরে আসতেই কয়েকজন মহিলা হাজির সেখানে। সাথে তিনজন পুরুষও আছে বটে। তা দেখে অবাক হয় স্মৃতি । এতো মহিলা হুট করে বাসায় এলো কীভাবে। আর আসলোই বা কেন।
#চলবে…

