#বোকামন
#পর্ব_২৪
#Tahsin_Atoshi
ঘরের মাঝে চুপটি করে বসে আছে হুমায়রা৷ তার সামনে অমিত, অনিল,অর্নি, তুলি ও তুহিন বসা। শুভ কিছু কাজের জন্য বাইরে গিয়েছে। বলেছে ঘন্টা খানেকের মাঝেই চলে আসবে। ততক্ষণে সকলে মিলে আড্ডায় ব্যস্ত। তুহিন এসেই জানতে পেরেছে স্মৃতির বিয়ের কথা। তখন থেকেই থম মেরে বসে আছে। কোনো কথা বলছে না। মনের মাঝে কি চলছে তা বোঝার উপায় নেই কারো। হুমায়রা পাশেই বসে আছে। কিন্তু কি বলে শান্তনা দিবে সে জানে না। ভালোবাসার মানুষকে হারানোর কষ্ট হয়তো অনেক। সেও ভালোবেসেছে। কিন্তু সেটা কিছুদিনের ছিল। এতে এতো বেশি কষ্ট হয় না তার। কিন্তু তুহিন! সে তো প্রায় এক বছর যাবৎ তার এই প্রেয়সীর জন্য অপেক্ষা করেছে। কিন্তু অপেক্ষার ফল হিসেবে কি পেল সে? অন্যের বউ হতে দেখা! সবার নিস্তব্ধতা ঠিক ভালো লাগে না অমিতের। গম্ভীর কন্ঠে বলে,
-তুহিন! যা হয়েছে হয়েছে। মেনে নে নিজের জীবন নতুন ভাবে শুরু কর।
অসহায় চোখে তাকায় তুহিন। তার বলার কিছু নেই৷ তবুও জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়.. তুলির অন্য কারো সাথে বিয়ে ঠিক হলে অমিতও কি ভুলে যেতে পারবে তুলিকে? মনে আসা প্রশ্ন মনেই থেকে যায়। সবাইকে এক পলক দেখে বাইরে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলে হুমায়রা থামিয়ে দেয়। মন খারাপ করে বলে,
-তুহিন ভাইয়া তুমি মন খারাপ কোরো না। আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে। দেখবে তোমার জীবনে আরো ভালো কাউকে এনে দিবে।
মুচকি হাসে তুহিন৷ হুমায়রার মাথায় হাত বুলিয়ে বাইরে চলে আসে সে। সিঁড়ি দিয়ে নামতেই শুভর সাথে দেখা হয়। তুহিনকে যেতে দেখে আটকায় শুভ। গম্ভীর কন্ঠে বলে,
-কোথায় যাচ্ছিস? আড্ডা দেয়া শেষ? আমি তো আসতেই পারলাম না।
-নাহ্ তোরা আড্ডা দে। আমার ভালো লাগছে না৷
-স্মৃতির বিয়ে হয়েছে দেখে মন খারাপ করে আছিস?
চমকায় তুহিন। শুভ কীভাবে জানে এটা? তুহিনকে অবাক হতে দেখে হাসে শুভ। গম্ভীর কন্ঠে বলে,
-স্মৃতি আমার বোন এটা জানার আগে তুই কিন্তু আমাকে বলেছিলি তুই যে ওকে ভালোবাসিস। ভুলে গেলি?
এবার আরো বেশি অসহায় মনে হয় তুহিনের। শুভ যেহেতু জানে তাহলে কেন আটকালো না? শুভ বুঝতে পারে তুহিনের মনে আসা প্রশ্নটা। হেসে বলে,
-আটকাতেই চেয়েছিলাম বিয়েটা৷ কিন্তু বোনটা রাজি হয়ে গেলো। বললো সে নাকি আহানের সাথে ভালো থাকবে। ঠিক মানতে পারছিলাম না। কিন্তু ওর ইচ্ছের বিরুদ্ধে যেতেও পারছিলাম না। তাই দিয়ে দিলাম বিয়ে।
থামে শুভ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
-আগে যদি স্মৃতিকে বলে দিতি তুই ওকে ভালোবাসিস তাহলে হয়তো ও ভাবতো তোর কথা। কিন্তু তুই বলিসনি। আমার মতো ভুল করে বসলি। কিন্তু আমি তো আমার ভালোবাসার মানুষকে ছিনিয়ে নিলাম। কিন্তু তুই পারলি না।
দু’জনের মাঝে আবারো নিস্তব্ধতা বিরাজ করে। সিঁড়ির সামনেই দাড়িয়ে রয়। দু’জনের মনে কি চলছে তা তারা এবং উপরওয়ালা ভালো বলতে পারবে। একজন নিজের ভালোবাসার মানুষকে ছিনিয়ে তো নিলো। কিন্তু ভালোবাসা পেলো না এখনো। আর অন্যজন? সে তে বলার সুযোগই পেলো না।
মৌমিতা মাএই সকলের জন্য নাস্তা নিয়ে উপরে যাওয়ার জন্য সিঁড়ির কাছে আসতেই চোখে পরে তুহিন ও শুভকে। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
-দুই বাদর সিঁড়ির মাঝে দাড়িয়ে আছিস কেন। ঘরে চল।
তুহিনের ধ্যান ভাঙে মৌমিতার কথায়। জোরপূর্বক মুচকি হাসি দিয়ে বলে,
-না আন্টি আমি বাসায় যাবো এখন। আসি…
তুহিন নিচে নামার জন্য পা বাড়াতেই শুভ আটকে দেয়। গম্ভীর কন্ঠে বলে,
-যা হয়েছে সেগুলো বাদ দিয়ে নিজের মতো থাকতে শিখ।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে তুহিন। ছোট্ট করে উওর দেয়,
-হুম।
-এখন চল সবার সাথে আড্ডা দিবি। বিকেলে আহানের বাসায় যাবো।
অবাক হয় তুহিন। বিস্ময়ের স্বরেই বলে,
-আহানের বাসায় যাবি মানে? ও কিন্তু…
তুহিনপর কথা শেষ করতে না দিয়েই শুভ হেসে বলে,
-প্রথমত ও আমার বন্ধু। দ্বিতীয়ত ও এই মুহূর্তে আমার বোনের হাসবেন্ড। তো যেতে কি সমস্যা? আর কতদিনই বা এভাবে কাটবে সব?যা হওয়ার হয়েছে।
-কিন্তু আহান কি?
-এতো সহজে সব ঠিক করার মানুষ ও না। তবে চেষ্টা করতে ক্ষতি কি?
তুহিন আর কথা বাড়ায় না। দু’জন মিলে আবারে উপরে চলে আসে। মৌমিতা খাবার দিয়ে চুপচাপ স্থান ত্যাগ করে। তুহিনকে দেখে হুমায়রা ভ্রু কুঁচকে বলে,
-চলে গেছিলে না। আবার আসছো কেন?
তুহিন অবাক হয়। তবে বুঝতে সময় লাগে না বোনের যে অভিমান হয়েছে। পাশে বসে বলে,
-চলে গেলে খুশি হবি?
-হ্যাঁ অনেক খুশি হবো। যাও চলে যাও। গিয়ে লাল পানি খাবা আর ছ্যাকা খাওয়া গান গাইবা৷ এই যেমন বোঝে না সে বোঝে না এই গান। বুঝলা। যাও এখন।
হুমায়রার কথায় হাসে সকলে। তুহিন হুমায়রার মাথায় হাত দিয়ে বলে,
-আচ্ছা! এমনটাই তো করা উচিত তাই না?
-একদমই না।
তুহিন ভ্রু কুঁচকায়। কৌতুহল নিয়ে বলে,
-তাহলে কি করবো?
-এই গান গাইবা…
বলে হুমায়রা একটু কাশি দিয়ে নেয়। তারপর গায়,
“তুমি নেই তাতে কি?
নতুন আরেকটা পেয়েছি..
তোমার থেকে অনেক সুন্দরী…! ”
হুমায়রার গাওয়া গানে এবার সকলেই হেসে ওঠে। অর্নি পাশ থেকে বলে,
– খারাপ বলোনি তো হুমু। আহানকেও সেইম এডভাইস দেয়া যাবে আজ।
আহানের কথা শুনতেই মুখটা ভার হয়ে যায় হুমায়রা। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস। আবার মনে মনে এই ভেবে শান্তনা দেয় আহান এখন তার বেস্ট ফ্রেন্ডের হাসবেন্ড। আর স্মৃতির সাথে সে খুশিই থাকবে। এই ভেবে আবারো ঠোঁটে হাসি ফুটে ওঠে।
সকাল থেকে ছাদে বসে গাছ লাগানোর কাজে লেগেছে স্মৃতি। কাঁদা-মাটি গায়ে লেগে একাকার। হাতে যখন কোনো কিছু দিয়ে ভর্তি থাকে ঠিক সে সময় শরীরে সমস্যা হবেই হবে। এবারও কম না। মাথা চুলকাতে গিয়ে কপালেও কিছু মাটি লেগে গেছে স্মৃতির। এতে অবশ্য তার কিছু যায় আসে না। কারণ সে কাদামাটির কাজে অভ্যস্ত। গ্রামে কম গাছ তো লাগায়নি সে। তাই আর সমস্যা হয়। প্রায় পাচটা গাছ লাগানো কমপ্লিট তার। আর দুইটা গাছ বাকি। সেই দুইটা গাছ লাগাতে পারলেই শান্তি। তাই মন দিবে আবার কাজে ব্যস্ত হয়ে পরে। দুপুরের রোদটাও পুরো মাথার উপরে পরেছে। এতে একটু সমস্যাও হচ্ছে স্মৃতির। কিন্তু সে তো নাছোড়বান্দা। গাছ লাগানো শেষ না করে এক পা নড়বে না সে।
আহানের মাএই ঘুম ভেঙেছে। ঘুম থেকে উঠে নিজ রুমে স্মৃতিকে না দেখে একটু অবাক হয়। ওয়াশরুম ও বাকি ঘরেও দেখে নেয় সে। কিন্তু না স্মৃতি নেই। কোথায় গেল সেটাও জানে না সে। কেন জানি ভয় হচ্ছে তার। গতরাতে তো স্মৃতি ডিভোর্স দিয়ে দেয়ার কথা বলেছিল। তাহলে কি সে চলে গেল? না আর ভাবতে পারছে না সে। দ্রুত ফোনটা নিয়ে কল করলো স্মৃতিকে। শব্দ পেতেই আবার বিছানার দিকে তাকায়। ফোনটা বিছানায় পরে আছে। তাহলে? আর ভাবতে পারে না আহান। কোনোরকম রেডি হয়ে উদ্যোত হয় বাইরে যাওয়ার জন্য। ঠিক দরজার কাছে গিয়ে দরজা খুলতে যাবে তখনই পেছন থেকে পরিচিত কন্ঠস্বর ভেসে আসে।
-সকাল সকাল কোথায় চললেন?
চমকে তাকায় আহান। ভ্রুঁ কুঁচকে দেখে স্মৃতিকে। হুট করেই মাথায় রাগ উঠে যায়। তেড়ে স্মৃতির কাছে আসতেই কাঁদা হাতে স্মৃতি দুইহাত উঁচু করে সামনে রেখে বলে,
-কাঁদা লাগিয়ে দিবো একদম। কি হয়েছে? রেগে আছেন কেন?
দূরে সরে আহান৷ কাঁদা দেখেই নাক ছিটকে দূরে সরে। গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
-কোথায় ছিলে সকাল থেকে?
-ছাদে। বাহ রে গাছ কিনে এনেছি। লাগাতে হবে না নাকি?
আহানের রাগ হয় আরো। রাগ দেখিয়ে উচ্চস্বরেই বলে,
-তাই বলে এই সকাল সকাল.!
-হুম আর নয়তো কখন লাগাবো?
-বিকেলে লাগাতে পারতে না। কি অবস্থা হয়ে আছে! যাও শাওয়ার নিয়ে এসো।
আহানের এমন রিয়েকশন দেখে মুখ ভেঙচি দেয় স্মৃতি৷ রুমের দিকে যেতে যেতে একা একা বিরবির করে বলে,
“আসছে লাখ সাহেবের বেটা..! একটু কাদা দেখেই নাক ছিটকায়। একে দিয়ে যদি আমি কাঁদা মাখানোর কাজ না করিয়েছি তাহলে আমার নামও স্মৃতি না হুহ..! ”
বলতে বলতেই ওয়াশরুমে ঢুকে স্মৃতি। এখন পরেছে আরেক জালায়। তোয়ালে জামাকাপড় কিছুই নেয়া হয়নি। এখন কি করবে তাই কুল পায়না। হালকা দরজা খুলে বাইরে তাকিয়ে দেখে আহান আছে কিনা। চারপাশে চোখ বুলাতেই বিছানায় আহানকে দেখে একটু স্বস্তি পায়। হালকা কাশি দিয়ে বলে,
-এই যে শুনছেন?
স্মৃতির ডাকে আহানের কোনো হেলদোল পাওয়া যায় না। তাই আবারো ডাকে,
-এই যে মিস্টার..?
তবুও আহান ফোনেই তার চোখ নিবদ্ধ রাখে। রাগ হয় স্মৃতির। এমনিতেই ভিজে আছে তার মধ্যে এই লোকের ঢং। রাগ দেখিয়ে এবার উচ্চস্বরেই বলে,
-এই যে নিমের বংশধর…? আমি ভিজে আছি। দয়া করিয়া কাবার্ড থেকে আমাকে জামা আর বারান্দা থেকে তোয়ালে দিবেন?
নিমের বংশধর শব্দটা শুনতেই আহান তেড়ে স্মৃতির দিকে যায়। কিন্তু আহান যেতে যেতে স্মৃতি আবারে দরজা বন্ধ করে ফেলে৷ ভেতর থেকে বলে,
-দেখুন গাছ লাগিয়ে ক্লান্ত। এখন ভিজে থেকে অসুস্থ হওয়ার ইচ্ছে নেই৷ একটা ড্রেস দিন না প্লিজ।ঝগড়া পরেও করা যাবে।
কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা কাটে দুজনের মাঝে। স্মৃতিও মন খারাপ করে দাড়িয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পর আহান দরজা নক করতেই দরজা খুলে হালকা উঁকি দেয় স্মৃতি। আহানের হাতে সাদা চুড়িদার। তা দেখে ঠোঁট উল্টায় স্মৃতি। সাদা জামা পড়তে তার একদমই ভালো লাগে না।গায়ের রঙ এমনিতেই শ্যামলা। সাদার মাঝে চেহারাটা তার কাছে মনে হয় পেতনি লাগবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত সে কখনো সাদা জামা পরে দেখেনি।
তবুও কথা বাড়ায় না স্মৃতি। চুপচাপ সাদা চুড়িদারটা নিয়ে দরজা আটকে দেয়। পাঁচ মিনিট পর বাইরে আসতেই রুম ফাঁকা পেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। চুপচাপ আয়নার সামনে দাড়াতেই নিজেকে দেখে থমকায়। ভালোমতো পরখ করে নিজেকে৷ এটা সে! এই কথাটাই বিশ্বাস হচ্ছে না তার। আজীবন ভেবে এসেছে সাদা চুড়িদারে তাকে পেতনির বংশধর লাগবে। কিন্তু এখন তো তার উল্টো লাগছে..! না চাইতেও ঠোঁটে হাসি ফুটে ওঠে। চুরিদারে কুচি অনেকটাই বেশি। মুখে হাসি নিয়ে গোল করে ঘুরে।
সকাল সকাল গাছ লাগিয়ে মন এমনিতেই ভালো তার। এখন এই ড্রেস পরে আরো ভালো হয়ে গেল। ঘুরার কারণে মাথার তোয়ালেটাও খুলে পড়ে গেছে। ভেজা চুলগুলোও ওর সাথে উড়ে বেড়ায়। হঠাৎ হাতে হেঁচকা টানে দেয়ালের সাথে মিশিয়ে নেয় স্মৃতিকে। ভরকায় স্মৃতি। মানুষটাকে দেখার জন্য ধীরে ধীরে চোখ খুলতেই আহানের রাগী চেহারাটা সামনে পরে৷ আহান দাঁতে দাঁত লাগিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে,
-হচ্ছে টা কি হ্যাঁ? এভাবে পাগলের মতো ঘুরছো কেন?
আহানের এতো কাছে আসাটা স্মৃতির ঠিক হজম হয়না। হার্টবিট বোধহয় হাজারে উঠে গেল তার৷ তবুও তেতলাতে তেতলাতে বলে,
-আ্ আম্ আমার ইচ্ছে হ্ হয়েছে তাই।
-আচ্ছা! তখন কি বলছিলে আমি কি?
-ক্ কি বলেছি?
-এখন কথা বের হয়না মুখ দিয়ে? তখন তো বলছিলে আবার বলো শুনি একটু।
-কক্ কি বলেছি আমি? আপ্ আপনাকে এ্ এতোবার ডাকছিলাম শুনছিলেন না দেখেই তো আ্ আমি ও্ ওটা বলেছি৷ আপ্ আপনি আৃ আসলেই নিম…!
আহানের কি হয় ঠিক জানা নেই স্মৃতিকে ছেড়ে দূরে সরে দাড়ায়। এদিক-সেদিক তাকিয়ে নিজেকে ঠিক রাখে। স্মৃতির দিকে তাকানোর সাহস হয়না কেন জানি৷ অন্য দিকে তাকিয়েই বলে,
-বিকেলে বন্ধুরা সকলে আসবে।
– ভাইয়া আর হুমুও?
স্মৃতির এক্সাইটমেন্ট দেখে রাগ হয় আহানের। গম্ভীর কন্ঠে বলে,
-হ্যাঁ সবাই।
বলেই স্থান ত্যাগ করে। স্মৃতির কৌতুহল হয়। একা একাই বিরবির করে বলে,
“ সবাই হঠাৎ আসবে কেন?আর আহানই বা আসতে দিলো? হুমায়রাকে শুভ ভাইয়ার সাথে দেখলে কি ওর কষ্ট হবে না? তাহলে? কেন আসতে দিচ্ছে? ”
#চলবে….

