#বোকামন
#পর্ব_৩২_প্রথমাংশ
#Tahsin_Atoshi
জ্ঞান ফিরতেই নিজেকে একটা অন্ধকার ঘরে আবিষ্কার করে হুমায়রা। কিছুক্ষণ বোঝার চেষ্টা করে সে এখানে কীভাবে এলো এবং কি হয়েছিল। কিন্তু তা আর বেশিক্ষণ হয়ে ওঠে। অন্ধকারের মাঝেই কেমন বাচ্চাদের কান্নার শব্দ ভেসে আসে। চোখের সামনে আসে কিছু লোক। আর তারই মতো দেখতে একটা ছোট বাচ্চা। দ্রুত সে নিজের মাথা চেপে ধরে। আশেপাশে একটু আলো খোঁজে। কিন্তু না পুরো রুম অন্ধকার হয়ে আছে। কোথাও আলোর ছিটেফোঁটাও নেই। আর থাকতে পারে না সে। চিৎকার করতে থাকে বের হওয়ার জন্য। কিছুক্ষণের মাঝেই দরজা খুলে যায়। দরজা দিয়ে ঢোকে তিনজন লোক৷ চেহারা স্পষ্ট দেখা মুশকিল। কৌতুহল নিয়েই জিজ্ঞেস করে হুমায়রা,
-ক্ কে? কারা আপনারা? আমাকে এখানে কেন নিয়ে এসেছেন?
এরই মাঝে একজন হাঁটু গেড়ে বসে সামনে। হাতের ইশারা করে কাউকে। সাথে সাথেই রুমে লাইট জ্বলে ওঠে। সাথে সাথেই চোখ বন্ধ করে নেয় হুমায়রা। আবারো পিটপিট করে খুলে সামনের মানুষটাকে দেখার চেষ্টা করে। কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে দেখে বিস্ময়ে তাকায় সে। অস্ফুট স্বরে বলে,
-র্.. রোদ..!
মুচকি হাসে রোদ। হুমায়রার গালে হাত দিয়ে বলে,
-হেই কিউটি। আমাকে মনে আছে তাহলে হুম? খুব জ্বালিয়েছ। এখন একটু ধরা দাও।
-ম্ মানে? কি বলতে চান কি আপনি হ্যাঁ?
-কি বলতে চাই বলো। শুনলাম তোমার বিয়ে হয়ে গেছে। হুম সত্যি নাকি? শ্লা*র.. তোমার বরটা না খুব জ্বালিয়েছে আমাকে জানো তো। তোমার দিকে কি একটু হাত বারিয়েছিলাম। হাতটাই ভেঙেদিল। তুমি জানো পুরো দুই মাস লেগেছে আমার সুস্থ হতে। কি অবস্থা করেছিল বলো তো।
-ভা্… ভালো করেছে। ঠিক করেছে। আপনার সাথে এমনটাই হওয়া উচিত। আপনি… আপনি একটা শ’য়’তা’ন। ছাড়ুন আমাকে।
-ছেড়ে দিলে তো হলোই। ছেড়ে দেয়ার জন্য এনেছি নাকি তোমায় হুম?
-ছাড়ুন আমায়। শু.. শুভ ছাড়বে না আপনাকে। ঠিক খুঁজে বের করবে।
-সে তো আমি চাই বেবি। যাতে সে খুঁজে বের করুক। ওর সামনেই তো আমি তোমাকে ভালোবাসবো বেবি।
পাশ থেকে একটা চেয়ার নিয়ে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথার পেছনে হাতদুটো ভাজ করে বলে,
-নো চিন্তা বেবি খুব দ্রুত চলে আসবে। ম্যাসেজ করে ঠিকানা বলে দিয়েছি যে আমি।
হঠাৎ থামে হুমায়রা৷ পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে গভীরভাবে পরখ করে দেখতে থাকে৷ চোখের সামনে আবারো ঝাপসা কিছু চলে আসে। কিছু মুহূর্ত … কিন্তু অপরিষ্কার। মাথা ধরে আবারো চিৎকার করে ওঠে। সবকিছু এলোমেলো লাগছে। রোদ পরোখ করে সবটা। ঠিক বুঝে উঠতে পারে না বিষয়টা। মজার ছলে বলে,
-পেছনে কারা দাঁড়িয়ে আছে জানো আমার বাবা আর তার সঙ্গী। ভাবছি তোমার সাথে সময় কাটানো শেষ হলে তাদের কাছে ধরিয়ে দিবো। তাদের আবার খুব ভালো ব্যবসা আছে জানো তো। মেয়ে পাচার,বাচ্চা পাচারের। কেমন হবে বলো তো?
কথাটুকু বলতে বলতেই হাসে তিনজন৷ পেছন থেকে লোকটাও এগিয়ে আসে। হাঁটু গেড়ে হুমায়রার সামনে বসে বলে,
-জানো তো তোমার মুখটা আমার পরিচিত এক মুখের সাথে মিলে যায়। কিন্তু আফসোস সেই বোকা মেয়েটা আমার কাছ থেকে পালাতে গিয়ে এক্সিডেন্টেই মা’রা গেল!
ভ্রুঁ কুঁচকায় হুমায়রা৷ কৌতুহল নিয়ে বলে,
-ক্ কে? কে মা’রা গেছে?
– সে তুমি চিনবে নাকি মেয়ে? সামান্য মা’রা যাওয়ার কথা শুনে এই হাল!
পরপরই রোদের দিকে তাকায় তিনি৷ কৌতুহল নিয়ে বলে,
-তুই তো বলেছিলি মেয়েটা সাহসী। কিন্তু এতো দেখছি তার উল্টো!
-আরে বাবা…! সাহসী তো। যখন ওর ফ্রেন্ডটা কাছে থাকে। আর ভাইগুলো। সব কটা বজ্জাত। আসছে ওর বর। দেখি কেমন বাঁচায়।
এরই মাঝে বাইরে থেকে চিৎকারের আওয়াজ ভেসে আসে। হুমায়রা কৌতুহল নিয়ে তাকায়। শুভ এসেছে? হ্যাঁ তার কন্ঠের মতোই শোনা যায়। কিন্তু মন যেন সেটা বিশ্বাস করতে চাইছে না। হয়তো এটাও কোনো ভ্রম। নাহ্ ভ্রম না তা সে বুঝতে পারে রোদের চেহারায় ভয়ের ছাপ দেখে। এবার জোরপূর্বক হাসে সে। হেসে বলে,
-কি শুভর কন্ঠ শুনেই ভয়ে চুপসে গেলেন নাকি? আগের মা’র খাওয়ার কথা মনে পরে গেছে?
রাগে হুমায়রার মাথার চুল মুঠো করে ধরে রোদ। রাগ দেখিয়ে দাঁতে দাঁত লাগিয়ে বলে,
-কথা ফুটে গেছে দেখছি। ওর সামনে আজ তোর সাথে যা করার করবো। আর তোর সামনে ওকে মারবো। দেখি কেমন বাঁচাতে পারিস।
এবার ভয় হয় হুমায়রার। লোকটা নিশ্চয়ই একা এসেছে। একা কীভাবে এদের সাথে লড়াই করবে। দ্রুত ওঠার চেষ্টা করে এবার। সাথে সাথেই সজোরে একটা থাপ্পড় মারে রোদ। হুমায়রার চোয়াল শক্ত করে ধরে বলে,
-কি সাহস বেড়ে গেছে দেখছি। থাক তুই এখানে। তোর স্বামীকেও একটু আপ্যায়ন করে আসি।
-আপনি..আপনি ওনার কিছু করবেন না। আমাকে ছাড়ুন। আমি শুভর কাছে যাবো। প্লিজ ওনার কিছু করবেন না।
বলেই ঢুকরে কেঁদে ওঠে হুমায়রা। শুভ শুভ বলেও কয়েকবার ডাকে। কিন্তু না তার কন্ঠ শুভর কান পর্যন্ত আর পৌছায় না। রোদসহ সকলে চলে যায় আবারো দরজা আটকে। অন্ধকার রুমটা আবারো পুরোনো কিছু স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। ভয় পেয়ে চুপসে যায় হুমায়রা। চিৎকার করে ওঠে কয়েকবার। কিন্তু শোনার মানুষ নেই। বেশিক্ষণ আর নিজের সাথে লড়াই করে থাকতে পারে না সে। কিছুক্ষণের মাঝেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
★
অপারেশন রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সকলে। ভেতরে ডাক্তাররা স্মৃতিকে নিয়ে ব্যস্ত। অপারেশন হবে স্মৃতির। আহান চুল মুঠো করে ধরে আছে। নিজের উপর রাগ হচ্ছে তার। কেন রাগ দেখাতে গেল স্মৃতির উপর। সব ওর দোষ। রাগ না দেখালে স্মৃতিও বাসা থেকে বের হতো না। আর না আজ এই পরিস্থিতি হতো। শুভ এখানে এসেছে কিছুক্ষণ হলো।
হঠাৎ একটা ম্যাসেজ আসায় বেরিয়ে যায়৷ ফোনটা দিয়ে যায় অমিতের হাতে। অমিতের খুব একটা বোধগম্য হয়না বিষয়টা। ফোনটা নিজের পকেটেই রেখে দেয়।এদিকে হুমায়রার চিন্তা তো আছেই। অনিল এক নজর দেখে গেছে হাসপাতালের অবস্থা। এই সাইড দেখতে গেলে হুমায়রাকে খোঁজা হবে না। তাই অমিতকে রেখে যাওয়া। কিন্তু কোথায় খুঁজবে তাই ভেবে পাচ্ছে না সে। শুভও যাওয়ার আগে কিছুই বলে যায়নি।
সবদিক থেকে ঝামেলা যেন একসাথেই বেঁধেছে। অর্নি আহানের পাশে বসে আছে চুপচাপ। কি বলে শান্তনা দিবে ঠিক জানা নেই। কাঁধে হাত রেখেই বসে আছে শুধু। মৌমিতা আসার পর থেকে রুমের দরজার সামনেই দাড়িয়ে আছে। মেয়েটাকে একবার দেখতে চাইছে সে। কিন্তু কেউ দেখতে দিচ্ছে না৷ অপারেশনের মাঝে দেখা করতে দেয়ই বা কীভাবে তারা। আসিফ ইসলাম মৌমিতার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন৷ চেষ্টা করেছেন কয়েকবার সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু পারেনি। তাই আর ব্যর্থ চেষ্টা করলেন না তিনি।
অপারেশন শেষ হতেই ডাক্তার বাইরে বের হলেন। সকলে মিলে ঘিরে ধরেছে তাকে। স্মৃতির কি অবস্থা সেটা জানাই জরুরি সবার৷ ডাক্তার সকলে আস্বস্ত করে বলেন,
-অপারেশন সাকসেসফুল। কিন্তু..!
সকলেই কৌতুহল নিয়ে তাকায়। ডাক্তার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
-জ্ঞান না ফেরা পর্যন্ত সঠিক অবস্থা বলতে পারছি না। উপরওয়ালার কাছে দোয়া করুন।
চলে যায় ডাক্তার। বাইরে দরজা থেকে সকলে এক নজর দেখে নেয় স্মৃতিকে। এই মুহূর্তে কাউকেই ভেতরে ঢুকতে দেয়া হবে না৷ তবুও স্মৃতিকে দেখে সবাই মনে প্রাণ ফিরে পায়। হঠাৎ মৌমিতার খেয়াল হয় শুভর কথা।
-কোথায় গেল ছেলেটা?
কৌতুহল নিয়েই প্রশ্ন করে আসিল ইসলামকে। আসিফ ইসলাম কিছু বলার আগেই অমিত বলে,
-শুভ বাইরে গেছে হুমুকে খুঁজতে। ফোনে কোনো একটা ম্যাসেজ এলো তাই দেখেই। ফোনটা রেখে গেছে আমার কাছে।
অমিতের কথায় কৌতুহল নিয়ে তাকায় আহান৷ ভ্রুঁ কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
-মায়রাকে খুঁজতে গেছে মানে? কোথায় মায়রা?
-রাগ করে বাসা থেকে চলে গিয়েছিল।
কৌতুহল হয় আহানের। স্মৃতি কি তাহলে তখন মায়রাকে বাঁচাতে গিয়েই এক্সিডেন্ট করেছে। সাথে সাথেই চমকে তাকায়। দ্রুততার সাথে বলে,
-শুভকে কল কর জলদি।
-ওর ফোন আমার কাছে।
-ফ্ ফোনটা আমাকে দে। ফাস্ট।
আহানের কথামতে অমিতও ফোনটা বের করে আহানের হাতে দেয়। আহান ফোন নিয়ে ঘাটাঘাটি করে কিছুক্ষণ। এরপর মৌমিতার উদ্দেশ্যে বলে,
-আন্টি আপনি স্মৃতির কাছে থাকুন। আ্ আমি আসছি।
বলেই চলে যেতে নিলে পিছু ডাকে অমিত। আহান এক নজর অমিতকে দেখে নেয়। দু’জন মিলে বের হয় ম্যাসেজের সেই জায়গার উদ্দেশ্যে। মাঝ পথেই আহান থামায়৷ গম্ভীর কন্ঠে বলে,
-তুই এক কাজ কর তুই পুলিশ নিয়ে আয়। আমি যাচ্ছি। শুভ একা পারবে না। অনিলকে কল করে বলে দে ওখানে যেতে৷
-কিন্তু তোরা দু’জন….!
-কিছু হবে না। তোকে যা বলছি কর।
কথা বাড়ায় না আহান দ্রুত চলে যায় গন্তব্য স্থানে। অমিত কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে থাকে। আহানের এতোটা উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণটা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না সে। ভাবনা থেকে বের হয়ে অনিলকে কল করতে করতেই পুলিশ স্টেশনের দিকে এগিয়ে যায় সে।
#চলবে…..
(নোট:- নীরব পাঠিাকদের উদ্দেশ্যে বলছি… দেরিতে গল্প দেয়ায় যেমন আপনাদের পড়ার আগ্রহ থাকে না তেমনি আপনারা যে নিরবে গল্প পড়ে চলে যান রিয়েক্ট, কমেন্ট করেন না এতে আমাদেরও গল্প লেখার আগ্রহটা কমেই যায়। মানুষের সাপোর্ট পেলে কোনোকিছু করতেও ভালো লাগে। আশা করবো আপনারা রিয়েক্ট কমেন্ট করে গল্প লেখার জন্য আরেকটু উৎসাহিত করবেন এবং পাশে থাকবেন।)

