#বোকামন
#পর্ব_৩২_শেষাংশ
#Tahsin_Atoshi
শুভ একা আশার দরুণ সবার সাথে পারাটাও মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। তবুও সে লড়াই করছে নিজের মতো। চোখদুটো খুঁজে চলেছে হুমায়রাকে এক নজর দেখার জন্য। কিন্তু না হুমায়রা আশেপাশে কোথাও নেই। রাগ হয় তার। দাঁতে দাঁত লাগিয়ে বলে,
-হুমায়রা কোথায়?
-বাব্বাহ বউকে নিয়ে এতো চিন্তা!! এতোটা বউ পাগল হওয়া ভালো না দোস্ত।
রাগ হয় শুভর৷ দ্রুততার সাথে এগিয়ে আসে রোদের দিকে। তার আগেই দুটো লোক এসে আটকে দেয়। লড়াই করতে ইচ্ছে হলেও থামে শুভ। তার জন্য হুমায়রার ক্ষতি হোক এটা সে কখনোই চায়না। আবারো প্রশ্ন করে,
-হুমায়রা কোথায় রোদ? ওকে ছেড়ে দে। তোর শএুতা আমার সাথে । আমার ফ্রেন্ডদের সাথে। হুমায়রাকে কেন টানছিস মাঝে?
-ইউ আর রাইট ইয়ার। বাট বাট বাট… ওকে যে ভালো লেগেছে ইয়ার। আই লাইক হিম । বেশি না যাস্ট একটা রাত তারপর..
সঙ্গে সঙ্গেই গালি দিয়ে বসে শুভ। রাগ নিয়েই বলে,
-ওর কিছু হলে তোকে আস্ত রাখবো না আমি বলে রাখলাম। ছাড় ওকে। কোথায় ও?
হাসে রোদ। মজার ছলে হালকা ঝুঁকে শুভর মুখোমুখি হয়ে বলে,
-তা কি করবি তুই? মুভির হিরোদের মতো সবার সাথে একা লড়াই করবি নাকি? উফ.. ভয় পেয়েছি ইয়ার।
এবার একটু সিরিয়াস হয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে,
-এই যে লোকগুলো দেখছিস সবগুলো প্রোফেশনাল। তার কাছে তুই কিছুই না।
-তাহলে তুই বোধহয় এটা ভুলে গেছিস আমি মারামারিতে কতটা ওস্তাদ!
হঠাৎ পেছন থেকে কোনো কন্ঠ শুনে সকলেই সেদিকে তাকায়। আহান ও তুহিন দাঁড়িয়ে আছে। ভ্রুঁ কুঁচকায় রোদ। শুভর দিকে তাকিয়ে বলে,
-তোকে বলেছিলাম একা আসতে। তাহলে ওরা কেন এসেছে?
-কেন ভয় হচ্ছে খুব? মা’র গুলো এতো জলদি ভুলে গেলি?
হাসে রোদ। চোখে ভয় স্পষ্ট। তবুও হাসতে হাসতেই বলে,
-তোরা তিনজন কি করবি আমার? এদের সাথে পেরে উঠবি তোরা? তোদের সামনে হুমায়রার সাথে রাত কা’টা’বো আমি। আর তোরা তাকিয়ে দেখবি শুধু।
-ডে ড্রিম শব্দটা শুনেছিস তো নাকি? তোর অবস্থা এমন। তা তুই বোধহয় ভুলে যাচ্ছিস ক্যারাটে চ্যাম্পিয়ন আমি। এসব চুনোপুঁটির কাছে হেরে যাবো এর জন্য শিখেছি নাকি হুম?
আহানের কথায় আবারো হাসে রোদ। বলে,
-তো দেখা যাক কে কত পারে। রেডি?
এরই মাঝে তুহিন বলে,
-তোর মত কাপুরুষ সত্যি বলতে একটাও দেখিনি। এতো লোকের পেছনে লুকিয়ে আছিস। তবুও দেখ তোর চোখে ভয় স্পষ্ট।
কথা বাড়ায় না রোদ। চোখের ইশারায় নিজের লোকদের বলে ওদেরকে মারার জন্য। শুরু হয় সবার মাঝের মারামারি। কিন্তু খুব একটা লাভ হয়না। আহান একাই যেন সবার সাথে লড়াই করে চলেছে। আর শুভ? মা’রা’মা’রির ফাঁকে তার চোখ দুটো খুঁজে চলেছে নিজের প্রেয়সীকে। হঠাৎ চোখ পরে একটা বন্ধ রুমের দিকে। যখন সে এসেছিল তখন রোদ সেই রুম থেকেই বের হয়েছে। তাহলে হুমায়রা কি সেখানে? চোখে চোখ পরে তুহিনের সাথে৷ ইশারায় বুঝায় সেই রুমের দিকে যাওয়ার কথা। তুহিনেরও বুঝতে সময় লাগে না। ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় সেই রুমের দিকে। কিন্তু বাধা হয়ে দাড়ায় রোদ। একটু হাসি দিয়ে বলে,
-বোকা মনে হয় আমাকে?
সাথে সাথেই একটা ঘু’ষি মারে তুহিনের নাক বরাবর। বিষয়টার জন্য প্রস্তুত ছিল না তুহিন৷ হঠাৎ এমন ঘটনায় ভরকায় একটু। আবার নিজেকে সামলে নেয়। মাথা উচু করে দাড়াবে সেই মুহূর্তেই হঠাৎ ছুরি নিয়ে এগিয়ে আসে রোদ। সাথে সাথেই ধরে ফেলে তুহিন৷ হাত কেটে রক্ত বেরিয়ে যায়। আহান শুভ তখনও বাকি লোকদের সাথে লড়াই করে যাচ্ছে। খুব একটা সমস্যা হয়না আহানের এদের সাথে লড়াই করতে। কেটে যায় কিছুক্ষণ এদের মাঝে লড়াইয়েই। এক পর্যায়ে সকলেই ঘায়েল হয়৷ শুধু থেকে যায় রোদ ও তার বাবা৷ আহান তাকায় শুভর বাবার দিকে। চোখ ছোট ছোট করে বলে,
-শুনেছি বাবা-মায়েরা ছেলে-মেয়েকে সুশিক্ষা দেয়। কিন্তু আপনি নিজে তো কুশিক্ষায় বড় হয়েছেন। ছেলেকেও তাই বানালেন। ঠিক হজম হলো না বিষয়টা। এখন জেলের ভাত খাওয়াটাও জরুরি কি বলেন?
কথাটুকু বলেই নাক বরাবর ঘুষি মারে একটা। মাহতাব গাঙ্গুলিও তেড়ে আসেন এবার৷ বৃদ্ধ হলেও তেজ কম নয় তার। এত বছরের অভিজ্ঞতার কাছে এসব ফিকেই। তিনি লড়াই করতে শুরু করেন। লড়াই করতে করতেই তিনি বলেন,
– তোমার মতো চুনোপুঁটি কি আমার সাথে পারবে? এমনি এমনি কি এই প্রোফেশনে এসেছি বাছা?
হাসে আহান। হাসতে হাসতেই মাহতাব গাঙ্গুলির পেট বরাবর লাথি মেরে মেঝেতে ফেলে দেয়। এরপর বলে,
– সে আপনি আন্ডার গ্রাউন্ডের কিং-ই বা হন না কেন এটাও মাথায় রাখবেন বাপেরও বাপ থাকে। আর আপনার বাপ আমি। অনেকদিন যাবৎ-ই নজরে ছিলেন আমার। আর নজরে এসেছেন আপনার ছেলের কারণেই। সব ইনফরমেশন জোগাড় করাও শেষ৷ এখন শুধু শাস্তির পালা। ভেবেছিলাম নিজেই শাস্তি দিবো। কিন্তু কি বলুন তো…
ঠোঁট উল্টায় আহান। চ্যাহ শব্দ করে বলে,
-দশটা না পাঁচটা না একটা মাএ বউ বাসায়। তার সাথে সংসার করাটাও তো জরুরি। তোর মতো নরপিশাচকে মেরে হাত নোংরা করে জেলে যাওয়ার ইচ্ছে নেই। বউটা তাহলে খুব রাগ করবে। খুব জেদি কিনা।
শুভ ততক্ষণে রুমটার সামনে গিয়ে পৌছেছে। দরজা খুলতে যাবে সেই মুহূর্তেই পেছন থেকে একজন এসে বাধা দেয়৷ শুরু হয় তার সাথে লড়াই। এরই মাঝে গুলির শব্দে সবাই সেদিকে তাকায়। থমকে যায় সকলে।
অমিত, অনিল পুলিশ নিয়ে এসেছে। এদের মা’রা’মা’রি দেখেই মূলত তারা উপরের দিকে গুলি করেছে। পুলিশদের দেখে হাসে মাহতাব গাঙ্গুলি। হাসতে হাসতেই নিজের শরীরের ময়লা ঝারতে ঝারতে বলে,
-খুব দেরি করে এলেন আপনারা৷ বাংলাদেশের পুলিশগুলো সব সময় কেন শেষ সময়ে আসে বলুন তো। সে যাইহোক। এরেস্ট করুন এদের।
মাহতাব গাঙ্গুলির কথায় হাসে পুলিশ ইন্সপেক্টর । হাসতে হাসতে বলে,
-ওদের এরেস্ট করবো? কিন্তু স্যার আমরা তো আপনাকে এরেস্ট করতে এসেছি।
-আমাকে? খুব সাহস দেখছি তোমাদের! জানো আমি কে?
-Yes sir. We all know you very well. আপনি একজন স*ন্ত্রা*সী, বাচ্চা পা’চা’র’কা’রী এবং রে*পি*স্ট। অনেকদিন যাবৎ তথ্য খুজছিলাম আপনার বিরুদ্ধে। আর অবশেষে পেয়েও গেলাম। তো যাওয়া যাক? আপনাকে আমি কথা দিচ্ছি ফাঁসি ছাড়া অন্যকোনো রায় আপনাকে শোনানো হবে না৷
বলেই বাকিদের ইশারা করে এদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। বাকিরা কথামতো তাই করলো। আর শুভ গেল হুমায়রাকে খুজতে। রুমটা বাইরে থেকে লক করা ছিল। তাই আর উপায় না পেয়ে ভাঙতেই হলো। ঢুকতেই চোখে পরলে হুমায়রার সেই নিথর দেহ। কাছে গিয়ে ডাকলো কয়েকবার। কিন্তু কোনো সারা নেই। ঠোঁটের কোনে রক্ত শুকিয়ে আছে। আর অপেক্ষা করে না সে। দ্রুত হুমায়রাকে নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়৷ পুলিশ ইন্সপেক্টর এক নজর শুভর যাওয়ার পানে তাকিয়ে এরপর আহানের সাথে হাত মেলায়। মুচকি হেসে বলে,
-অনেকটা সাহায্য করেছেন আমাদের। তার জন্য ধন্যবাদ।
এরপর সে অমিত ও অনিলের দিকে তাকায়। মুচকি হেসে বলে,
-এখন আপনারা বিপদ মুক্ত। নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন।
বলে পুলিশ অফিসার স্থান ত্যাগ করে। সকলের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস। চোখে চোখ পরে সকলের। মুচকি হেসে চারজন মিলে বাইরে বের হয়।
★
হুমায়রাকে নিয়ে হাসপাতালে মাত্র পৌছেছে শুভ। ডাক্তার চেকআপ করে গেছে একবার। অন্ধকার ও পুরোনো স্মৃতিগুলো ঝাপসা মনে পরার দরুণ ব্রেনে চাপ সৃষ্টি হয়। যার ফলে জ্ঞান হারিয়েছে। নীলা বেগম পাশেই বসে আছে। হুমায়রার কাছে কিছুক্ষণ বসে শুভ গিয়েছে স্মৃতির কাছে। নিস্তেজ হয়ে সুয়ে আছে মেয়েটা। এখনো জ্ঞান ফেরেনি তার। আহান একটা চেয়ারে বসে আছে চুপচাপ। সবাইকে খাবার খেতে পাঠিয়ে সে বসেছে একটু। ইচ্ছে করছে স্মৃতির হাতটা ছুয়ে দিতে। কিন্তু মনে কোনো একটা বাধা কাজ করছে। কিসের বাঁধা? সে তো বিয়ে করা বউ তার। ছুয়ে দিলে কি হবে? তবুও দূরেই থাকে আহান। শুভ একনজর আহানকে দেখে তার পাশে একটা চেয়ার নিয়ে বসে। গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
-খেয়েছিস কিছু?
আহান এক পলক দেখে নেয় শুভকে। কিন্তু কোনো উওর দেয়না। শুভ আবারো জিজ্ঞেস করে,
-স্মৃতুর এক্সিডেন্ট হয়েছে কীভাবে?
-জানি না।
-মানে…!
-রাগ করে বাসা থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। এরপর খুঁজতে বের হতেই দেখি…
বোকার মতো তাকায় শুভ। কিছু সেকেন্ডের জন্য মনে হয় দুই বান্ধুবী প্ল্যান করেছিল আজ রাগ দেখিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যাবে। আবার নিজের ভাবনার উপরই রাগ হয় তার। সিরিয়াস সময়ও এমন আজব কথা মাথায় আসে কীভাবে তাই ভেবে পায়না৷ কৌতুহল নিয়ে আবারো জিজ্ঞেস করে,
-রাগ করেছিল কেন?
দীর্ঘশ্বাস ফেলে আহান৷ একনজর শুভকে দেখে আবারো স্মৃতির দিকে তাকায় । গম্ভীর কন্ঠে বলে,
– আমাদের দু’জনার কথা আমাদের মাঝেই থাকুক। তৃতীয় ব্যক্তি না ঢোকাই বেটার৷
কথা বাড়ায় না শুভ। চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলেও দরজার কাছে গিয়েও আবার থেমে যায়। পিছু না ঘুরেই আবারো বলে,
– কিছু খেয়ে নে যা।
আহান প্রতুওর করে না কোনো। স্মৃতির মুখটার দিকেই তাকিয়ে রয়। এছাড়া কোনো কাজ নেই তার। স্মৃতি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত গলা থেকে খাবার নামবে না তার। তবুও বাইরে যায় একটু। নামাজটা তো পড়াই যায়। তাতে তো আর বাঁধা নেই। স্মৃতি বহুবার বলেছে নামাজের জন্য৷ কিন্তু সে কখনো পরেনি। মনের মাঝে অজানা রাগ পুশে রেখেই আল্লাহর সাথে এতো বিচ্ছেদ তার। মনে পরে যায় স্মৃতির কথা। স্মৃতি নামাজ পরতে বললেই আহান বলতো,
“নামাজ পরে কি হয় বলতে পারো? সব তো কেড়ে নিয়েছে। আছে কি আমার। মা? বাবা? না ভালোবাসার মানুষ? সব ছিনিয়ে নিয়েছেন তিনি। ”
আহানের কথার প্রতুওরে হাসে স্মৃতি। মুচকি হেসে বলেছিল,
“আল্লাহ উওম পরিকল্পনাকারী৷ তার কাজই বান্দার কাছ থেকে প্রিয় জিনিস ছিনিয়ে নেয়া। খুশির সময় কম বান্দা দুঃখের সময় তাকে স্বরণ করে বেশি। আর সবকিছুর মাঝেই কল্যাণকর কিছু লুকিয়ে থাকে। এমনও তো হতে পারে আপনি যা চান, যাকে চান তা আপনার জন্য কল্যাণকর নয়। আল্লাহ তো বলেছেনই তার থেকে বেশি যাকে আপনি ভালোবাসবেন আল্লাহ তাকেই আপনার কাছ থেকে কেরে নিবে। একবার সিজদাহ্ করে আল্লাহর কাছে চেয়ে দেখুনই না। যদি কল্যাণকর হয় তবে অবশ্যই পাবেন। ”
স্মৃতির বলা কথাটা সেদিন উপলব্ধি না করলেও আজ উপলব্ধি করেছে বেশ৷ ইচ্ছে হয় খুব সিজদাহ্ পরে আল্লাহর কাছে কিছু চাইতে, কাঁদতে। এবারও কি ফিরিয়ে দিবেন? জানে না সে। তবে এবার সে যায় মসজিদে। আল্লাহ নিকট কিছু চাইতে। স্মৃতিকে চাইতে।
★
তুহিন হাতে ব্যান্ডেজ করে দরজার কাছে এসেও আবার থেমে যায়। মনের মাঝে বাঁধা সৃষ্টি হয় অজানা কারণে। দরজা থেকেই স্মৃতির মলিন মুখটা দেখে। ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। একা একা বিরবির করেই বলে,
-আমার না হওয়া প্রেয়সী হয়েই না হয় থেকো। অন্য কাউকেই ভালোবেসো। আমি না হয় দূর থেকেই দেখে যাবো তোমায়৷ প্রথম ভালোবাসা পূর্ণতা পাবে এর তো মানে নেই। আমার আল্লাহ উওম পরিকল্পনাকারী। তিনি আমার জন্য সঠিকটাই রেখেছেন। আমার ভেতরের দীর্ঘশ্বাস অভিশাপ স্বরূপ না তোমার জন্য দোয়া হিসেবেই ঝরে পরুক। তবুও সুস্থ হয়ে যাও তুমি। ভালোবাসি তোমায় আমার না হওয়া প্রেয়সী।
এইটুকু বলতেই গলা আটকে আসে তুহিনের। মন খারাপ করেই আবারো স্থান ত্যাগ করে।
#চলবে….

