#এক_মেঘলা_দিনে
#পর্ব_৮
#আনিকা_আফসা
রিসিভ করে কানে দিলাম তখনই অপাশ থেকে আওয়াজ এলো,
“আনিকা বলছো?”
আমি সালাম দিয়ে বললাম,”জ্বি, আপনি কে?”
অপর পাশের ব্যাক্তি সালামের উত্তর নিয়ে বলল,”আমি মঈনুল ইসলাম, তোমার ভার্সিটির প্রফেসর”
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,”স্যার? আপনি? হঠাৎ আমাকে কি মনে করে? কোনো দরকার স্যার?”
“হ্যাঁ, পরশু স্বাধীনতা দিবস হিসেবে আমাদের ভার্সিটিতে একটা বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন আছে জানোই তো। ওখানে আমরা এক বড় বিজনেসম্যানের ছেলে যে আমাদের ভার্সিটি থেকেই মেধার সাথে উত্তীর্ণ হয়েছে তাকে প্রধান গেস্ট হিসেবে ইনভাইট করেছি। তো তার খেয়াল ও যত্নের জন্য তোমাকে ও অয়নকে নিযুক্ত করেছি। অয়নের সাথে আমার কথা হয়েছে। ও বলেছে তুমি যা বলবে তাই। তা, তোমার কি কোনো আপত্তি আছে এতে?”
আমি খানিক অবাক হলাম। তারপর বললাম,”না স্যার। এটা আমার জন্য ভাগ্যের এবং শিক্ষণীয়। এতে আমার আপত্তি নেই।”
“যাক, খুশি হলাম। তাহলে সেদিন সময়মতো এসে পড়ো কেমন?”
“জ্বি নিশ্চয়ই!”
স্যার ফোন রেখে দিলেন। আমি ফোন রেখে দিয়ে আমার বিড়ালগুলোকে কোলে তুলে নিলাম। এদেরকে খাওয়াতে নিয়ে যেতে হবে এখন । ।
_______
আমি গেটের সামনে মালা হাতে দাঁড়িয়ে আছি গেস্টকে বরণ করার জন্য। পাশে অয়ন দাঁড়ানো।। আজকেই স্বাধীনতা দিবস। তখনই সানভি আর রিয়াদ এলো। সানভি আমাকে বলল,
“তুই আজ শাড়ি পড়ে আসিসনি?”
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম,”সবসময় কি শাড়ি পড়বো আমি? শাড়ি সামলাতে হিমশিম খেতে হয় তাই আজ এই গাউন পড়েই এসেছি”
সানভি বললো,”ওহ্, কিন্তু বলনা আমরা কি করবো?”
“কি করবি মানে?”
সানভি হতাশ কন্ঠে বলল,”তোরা প্রধান অতিথির খাতির- যত্ন করবি.। তৃষা স্টেজ পারফর্ম করবে। আমরা কি করবো?”
এই বলে ঠোঁট উল্টে তাকালো। অয়ন হেঁসে বলল,
“তোরা ঝগড়া কর। ঐটাই তোদের ইন্টারন্যাশনাল কাজ”
রিয়াদ বললো,”মানে কি? আমরা কি শুধু ঝগড়া করি?”
আমি আর অয়ন মাথা নাড়লাম। রিয়াদ এবার সানভির দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমরা কি শুধু ঝগড়াই করি সানুভ?”
সানভিও মাথা নাড়লো। রিয়াদ খপ করে সানভির অন্যপাশের কাঁধ ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলল,
“ওকে ফাইন, এখন থেকে আমরা প্রেম করবো। তখন আবার তোরা জ্বলে পুড়ে যাস না আমাদের মাখো মাখো প্রেম দেখে”
আমি হেঁসে বললাম,”তোদের প্রেম কতদূর যাবে জানা আছে। চার বছরের বন্ধুত্ব আর দুই বছরের রিলেশনে তোদের প্রেম যে আবার ঝগড়াতে এসেই থামবে আমরা জানি”
অয়ন হেঁসে দিলো। রিয়াদ গলা ঝেড়ে বলল,
“ঝগড়াও প্রেম করার একটা অংশ। ঝগড়া না থাকলে সম্পর্ক তেতো লাগে । চল চান্ভি , আজ তোর সাথে আর ঝগড়া করবো না। প্রেমের ক্লাস শিখে আসি চল তৃষার কাছ থেকে”
এই বলে রিয়াদ সানভিকে টেনে নিয়ে গেল। ওরা যেতেই প্রিন্সিপাল স্যার ও মঈনুল স্যার এলেন। আমরা তাদের দেখে সালাম জানাই। সালামের উত্তর দিয়ে প্রিন্সিপাল হালকা হাসলেন এবং আমাদের উদ্দেশ্যে বললেন,
“বাহ্ , তোমাদের দুজনকে সুন্দর লাগছে। আমি আশা করছি প্রধান অতিথির অ্যাপায়নও এমন সুন্দর হবে। উনি আমাদের ভার্সিটিতে প্রচুর ফান্ড দিবে তাই তার খাতির যত্নে কোনো খামতি যেন না থাকে।”
আমি হালকা হেঁসে বললাম,”আপনি চিন্তা করবেন না স্যার। আমরা আপনার ও ভার্সিটির সম্মান বজায় রাখবো”
তখনই আমার পিছন থেকে একটা গাড়ির শব্দ এলো। প্রিন্সিপাল স্যার বললেন,
“ঐতো উনি এসে গেছেন”
আমি মুচকি হেঁসে পিছু ফিরলাম। পিছু ফিরতেই কালো গাড়িটি দেখে হালকা অবাক হলাম। গাড়িটা কালকের ঐ গাড়িটার মতো না? অয়ন তখন আমাকে ছেড়ে এগিয়ে গেলো। দরজা খুলে দিতেই আমাকে আরো হতবাক করে দিয়ে কালো কোর্ট ও জিন্স পড়া রুদ্র সেখান থেকে বেরিয়ে এলো। আমার হাত থেকে ফুলের মালাটা পড়ে যেতে নিয়েও পড়লো না। এই তাহলে স্যারের প্রধান অতিথি? রুদ্র আমার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসলো যা বুঝলাম। অয়ন ও উনি একসাথে এগিয়ে এসে আমার সামনে দাঁড়ালেন। আমি এখনো তার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। অয়ন দুবার ডাকলেও আমি এখনো ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছি। রুদ্র আমাকে দেখে হালকা হেসে আমার সামনে তুড়ি বাজালো। আমি যেন হুশ ফিরে পেলাম। উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“কি ব্যাপার মিস? এভাবে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আমাকে দেখে কি একটু বেশিই অবাক হয়েছেন?”
রুদ্রের কথায় কোনো জবাব না দিয়ে তার গলায় মালাটা পড়িয়ে দিলাম। তারপর তার থেকে দূরে সরে এলাম। হাত কচলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম। রুদ্র আমার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেঁসে সামনের দিকে চলে গেল। আমি তার যাওয়ার পানে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলাম। এতো দাঁত কেলায় কেন ইদানিং?
অয়ন আমার কাঁধে ধাক্কা দিয়ে বলল,
“কিরে? কোথায় হারিয়ে গেলি? চল!!”
আমি মাথা নেড়ে অয়নের পিছুপিছু চললাম। প্রিন্সিপাল স্যার ও মঈনুল স্যারের সাথে রুদ্র তখন একটা রুমে ঢুকেছে। প্রিন্সিপাল স্যার একটা চেয়ারে এসে বসলেন। রুদ্রও স্যারের অনুমতি নিয়ে স্যারের সামনের চেয়ারে বসলো। আমি ও অয়ন দাঁড়িয়ে আছি তাদের পিছনে। প্রিন্সিপাল স্যার মঈনুল স্যারকে কোন কাজে পাঠালেন যেন। প্রিন্সিপাল স্যার কিছু কুশলাদি জিজ্ঞেস করে রুদ্রকে বললেন আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে। এই বলে তিনি নিজের কাজে চললেন। একটু পরেই অনুষ্ঠান আয়োজিত হবে তাই তিনি ব্যস্ত। রুদ্র অয়নকে ও আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“তোমাদের দুজনের নাম কি?”
আমি হা করে তাকিয়ে রইলাম। আমার নাম জানতে চাইছে? অয়ন হালকা হেঁসে বলল,
“অয়ন শিকদার”
রুদ্র এবার হাতের দুই আঙ্গুলে এক কলম নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলল,
“আর তোমার? তোমার নাম কি?”
আমি দাঁতে দাঁত চেপে বললাম,”জরিনা”
অয়ন অবাক হয়ে তাকালো আমার দিকে। রুদ্র হেঁসে উঠলেন শব্দ করে। অয়ন হালকা হেঁসে বলল,
“ও মজা করছে স্যার। ওর নাম আনিকা । ”
রুদ্র হাঁসি থামিয়ে আমার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বললেন,
“আমার সাথে মজা? ইন্টারেস্টিং!!”
আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম। নাটক করে সবজায়গায়। একটু শান্তির জন্যে ভার্সিটিতে আসি , এখানে এসেও অশান্তি সৃষ্টি করতে হবে লোকটার? রুদ্র নিজের শার্টের কলার আঙ্গুল দিয়ে নেড়ে- চেড়ে মুখ কুঁচকে বলল,
“এখানে খুব গরম। গলা শুকিয়ে গেছে। মিস , আপনি একটু নিজের হাতে আমার জন্য শরবত বানিয়ে আনতে পারেন? আসলে আমি বাইরের শরবত খাই না তো তাই”
আমি দাঁতে দাঁত চেপে বললাম,”আনছি ।”
এই বলে চলে গেলাম। আমি যেতেই রুদ্র উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে অয়নকে জিজ্ঞেস করলো,
“তোমরা একে অপরের কি হও?”
অয়ন সৌজন্য হেঁসে বলল,”এইতো ফ্রেন্ড স্যার”
রুদ্র হেঁসে উঠে বললেন,”কাম অন অয়ন। আমার থেকে লুকিয়ো না। আমি রুদ্র আফতাব চৌধুরী। চোখের নকশা দেখে ঠিকানা বলে দিতে পারি। আর তোমার চোখের নকশা বারবার ঐ মেয়েটার দিকেই পড়ছে। এম আই রাইট?”
অয়ন মাথা নেড়ে হাসলো । অতঃপর বলল,
“জ্বি স্যার। ঐ আসলে মেয়েটাকে ভালোলাগে আমার। আই থিংক আমি ওকে ভালোবাসি। মেয়েটার মধ্যে আলাদা একটা ভাব আছে যা আমায় টানে ”
রুদ্র হালকা হেঁসে বলল,”ভালোবাসা খারাপ না তবে অন্যের জিনিসের দিকে নজর দেয়া খারাপ অয়ন”
অয়ন ভ্রু কুঁচকে বলল,”মানে স্যার? ঠিক বুঝলাম না”
রুদ্র অয়নের কাঁধ আকড়ে ধরে বলল,”আসো দেখাচ্ছি তোমায়”
এই বলে রুমের বাইরে নিয়ে গেল অয়নকে সাথে করে রুদ্র। অয়ন ভ্রু কুঁচকে রুদ্রের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। রুমের বাইরে যেতেই আমার দেখা পেল তারা। আমাকে একটা মেয়ে আটকে ধরে কথা বলছে। রুদ্র সেদিকে তাকিয়ে আঙ্গুল উঁচিয়ে আমাকে দেখিয়ে বলল,
“ওটা”
তারপর সেই আঙ্গুল নিজের দিকে তাক করে অয়নের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার ”
অয়ন আশ্চর্য হলো। ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থেকেই বলল,
“মানে? আনিকা আপনার কি করে হয়?”
রুদ্র বাঁকা হেঁসে বলল,” আমার আট বছরের ভালোবাসা আর পাঁচ বছরের অপেক্ষা আমার আনি। তুমি হয়তো চিনো না আমায় তবে আনি আমায় চিনে। আফটার অল ওর ভালোবাসা আমি। পাঁচ বছর আগে এই আমাকে ভালোবাসার কথা বলেছে ও এবং আমি জানি আজও আমাকেই মনে প্রাণে ভালোবাসে। সেবার কিছু কারণে ওকে নিজের মনের কথা জানাতে পারিনি। তবে এবার কিন্তু একই ভুল আমার হবে না। তখন আম আর দুধ মিশে যাবে আর তুমি কিন্তু আঁটি হয়ে গড়াগড়ি খাবে। তাই তোমাকে ছোট্ট একটা কথা বলি, ওর দিকে নজর দিও না কারণ এতে তোমার লাভ নেই। এর থেকে ভালো ওকে ভাবীর নজরে দেখো। এটা যদি পসিবল না হয় তো মায়ের নজরে দেখো। কিন্তু ওকে নিয়ে অন্যসব চিন্তা আমি বরদাস্ত করবো না ব্রো। তুমি ভালোবাসো তাই বুঝিয়ে বললাম। আশা করি আমি ক্লিয়ার করেছি সব”
এই বলে উনি চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে অয়নকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল । আর অয়ন দাঁড়িয়ে রইলো সেখানেই। চোখ গেল দূরের আমার দিকে। অজান্তেই হাত মুঠ হয়ে গেল। সহসা ফুটে উঠলো হাতের রগগুলো।
———-
আমি শরবত বানিয়ে নিলাম ভালোকরে। এই প্রথম রুদ্র আমার হাতে কিছু খেতে চেয়েছেন খারাপ যেন না হয় সেটাই খেয়াল রাখার বিষয়। তবে তার থেকে বেশি প্রিন্সিপাল স্যারের সম্মান জড়িয়ে এখানে নাহলে আমি তারজন্য করলার জুসও বানাতাম না। যাইহোক, শরবত নিয়ে এক লম্বা শ্বাস নিয়ে ঐ রুমের দরজায় নক করলাম। ভেতর থেকে উত্তর এলো,
“আয়!”
আমি দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখলাম রুদ্র চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে পড়ে আছেন। আমি চিন্তিত হলাম, খারাপ লাগছে নাকি? আমি গ্লাস তারদিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম,
“স্যার, আপনার শরবত!!”
রুদ্র চোখ খুলে তাকালেন আমার দিকে। শরবতটা দেখে বললেন,
“এতো দেরি কেন? এই বুঝি আপনাদের আতিথেয়তা? ”
আমি দাঁতে দাঁত চেপে বললাম,”সরি। লেট হয়ে গেছে। আমি তো আর মেশিন নই ”
রুদ্র বললেন,”ওকে , এইবারের মতো সরি এক্সসেপ্ট করলাম মিস”
এই বলে আমার হাত থেকে শরবত নিজের হাতে নিলেন রুদ্র। গ্লাসটা নেয়ার সময় আমার আঙ্গুলে তার হাতের স্পর্শ অনুভব করলাম। রুদ্র গ্লাস নিতেই আমি ঝটপট হাত সরিয়ে নিলাম। রুদ্র আমার দিকে তাকিয়েই গ্লাসে চুমুক দিলো। আমি উৎসুক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। রুদ্র শরবতে চুমুক কেটেই মুখ কুঁচকে নিলো তারপর তা মনে হলো বহুত কষ্টে গিলল। আমি হা করে তাকিয়ে রইলাম, এতো খারাপ বানিয়েছি শরবত? এতো খারাপ হয়েছে খেতে যে উনি গিলতেই পারছেন না?
রুদ্র শরবত খেয়ে বলল,”এসব কি শরবত বানিয়েছিস আনি? চিনি কোথায়?”
আমি অবাক হয়ে বললাম,”চিনি দেইনি? আমি তো দিয়েছিলাম চিনি।”
রুদ্র দাঁড়িয়ে আমার দিকে শরবত এগিয়ে বললেন,
“দেখ , তুই খেয়ে দেখ । আজব, আমি কি মিথ্যা বলছি?”
আমি রুদ্রের কথামতো শরবতে চুমুক কেটে টেস্ট করলাম। চিনি তো ঠিকই আছে আর শরবতও মজা হয়েছে। আমি রুদ্রের দিকে তাকিয়ে বললাম,
“চিনি তো ঠিকই আছে রুদ্র ভাই”
রুদ্র আমার হাত থেকে গ্লাস নিয়ে আবার চুমুক কেটে বললেন,
“উমমমম, হ্যাঁ। এবার ঠিক আছে”
আমি হা করে তাকিয়ে রইলাম। আমি যেখানে চুমুক কেটেছি লোকটা সেখানে চুমুক কাটলো না? হ্যাঁ, ঐতো আমার লিপস্টিক এর কালার লেগে আছে। আমি তাজ্জব কন্ঠে বললাম,
“এসবের মানে কি?”
রুদ্র পুরো শরবত খেয়ে বলল,”কোনসব?”
তখনই দরজায় কড়া নাড়লো কেউ। আমি আর কিছু বললাম না। অনুষ্ঠান শুরু হবে তাই প্রিন্সিপাল স্যার রুদ্রকে ডাকতে এসেছে। রুদ্র প্রিন্সিপালের সাথে চললো। আমিও একা এখানে দাঁড়ালাম না, ছুটলাম তাদের পিছু। আশেপাশে তাকিয়ে অয়ইন্নাকে খুঁজতে থাকলাম। বেটা লাপাত্তা হয়ে গেছে কখন ধরে।
——–
অনুষ্ঠানটা শেষ হলো তৃষার চমৎকার স্টেজ পারফর্মেন্সের দ্বারা। আমি রিয়াদের থেকে জানলাম অয়ন বাড়ি চলে গেছে, ওর নাকি শরীর খারাপ লাগছে তাই। আমিও আর কথা বাড়ালাম না। বাসায় গিয়ে কল করবো। এই ছেলে এখানে আমাকে একা ফাঁসিয়ে চলে গেছে। আর এই রুদ্র তার সুবিধা লুটছে। এটা সেটা বলে আমাকে খাটিয়ে মারছে। কখনো টিস্যু দেও, কখনো পানি। আমাকে পিয়ন পেয়েছে নিজের? যত্তসব, জ্বালা!!!
অনুষ্ঠান শেষ হতেই আমরা চারজন একসাথে বের হলাম। রিয়াদ তার কথা রেখেছে, আজ কোনো ঝগড়া করেনি দুজন। আমি আর তৃষা সেটা নিয়েই কথা বলছি আর ওদের হালকা লেগপুল করছি। তখনই একটা হর্ণের আওয়াজ আমার মনোযোগ আকর্ষণ করলো। পিছনে তাকিয়ে দেখলাম রূদ্রের সেই গাড়ি। আমি তাকাতেই দুই আঙ্গুল উঁচিয়ে ডাকল আমায়। আমি একবার আমার বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে ওনার কাছে এগিয়ে যাই। রুদ্রের সামনে এসে দাঁড়াতেই রুদ্র বলল,
“জলদি উঠে পড় আনি, কুইক!”
কন্ঠে তার ভিষণ তাড়া। বারবার হাতঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন। আমি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলাম। আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রুদ্র ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“কি? এভাবে দাঁড়িয়ে আমার মুখ দেখছিস কেন? দেখলে ভালো করে আমার পাশের সিটে বসে দেখ। উঠে আয় জলদি”
আমি দাঁতে দাঁত চেপে বললাম,” আমি আপনার সাথে যাব না”
রুদ্র এদিকে সেদিকে তাকিয়ে বললেন,”পুরনো কথা নতুন কিছু বল”
আমি ভ্রু কুঁচকে নিলাম ,”এই আপনি এখানে আমার জন্য দাঁড়িয়ে কেন আছেন? আজকেও কি আপু আমাকে আপনার সাথে যাওয়ার জন্য বলেছে?”
রুদ্র আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,” না, কিন্তু আমি একা বাড়ি গেলে সেটা ভালো দেখায় না। আর এতো জেদ কেন তোর? চুপচাপ উঠে বস নাহলে আমি নামলে কাঁদলেও কুল পাবি না”
আমি দু হাত আড়াআড়ি ভাঁজ করে বললাম,”আমি যাবো না, যাবো না। আপনার সাথে কিছুতেই যাবো না”
বলা শেষ করে থামতেই রুদ্র বাঘের মতো আমার ঘাড়ে নিজের থাবা বসিয়ে আমাকে কাছে টেনে নিলো ঘাড় ধরে। আমি গাড়ির কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলাম, আকষ্মিক কান্ডে গাড়ির সাথে শরীর মিশিয়ে দাঁড়ালাম। রুদ্র আমার মুখের দিকে ঝুঁকে বলল,
“কি যেন বলছিলি? আবার একটু বল তো শুনি ”
আমি রুদ্রকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলাম কিন্তু লোকটা এমন রাক্ষসের মতো চেপে ধরে আছে যে পারলাম না। তারউপর লোকটার তপ্ত শ্বাস আমার মুখে পড়ছে। আমি মুখ কুঁচকে বললাম,
“ছাড়ুন অসভ্য লোক, আমার লাগছে। এসব কিরকম কাজকারবার?”
রুদ্র বলল,”ছেড়ে দিবো । আগে বল আমি আপনার সাথে চুপচাপ ভদ্র মেয়ের মতো গাড়ি করে যাবো”
আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম। এটা দেখে রুদ্র ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“তুই আমাকে ভয় পাস না, তাই না আনি? ”
আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম রুদ্র আমার দিকে আরো ঝুঁকে আসছে। রুদ্রের দিকে তাকাতেই দেখলাম তার নজর অন্যকোথাও, আমার ঠোঁটের দিকে। আমি আঁতকে উঠলাম, উল্টাপাল্টা কোন কাজ করবে না তো? এমনিই বিদেশ থেকে পাগল হয়ে ফিরেছে। আমার ভাবনার মাঝেই রুদ্র আরো নিকটে এলো আমার। আমি চোখ খিচে বন্ধ করে নিয়ে বললাম দ্রুত,
“আমি রাজি, রাজি। আপনার সাথে যেতে রাজি”
রুদ্র বাঁকা হেঁসে আমার মুখে ফুঁ দিলেন তারপর ছেড়ে দিলেন আমার ঘাড়। আমি তার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে ঘাড় ঢললাম। তারপর পিছনে তাকাতেই দেখলাম আমার বন্ধুরা একটাও নেই। রুদ্র বলল,
“ওরা কথা বলতে বলতে চলে গেছে”
আমি ঠোঁট উল্টালাম। আমাকে এই ডায়নোসরের মুখে ফেলে ওরা চলে গেল? কোনো বাক্য ব্যয় না করে তাই আমি অন্যপাশের ফ্রন্ট সিটে বসে পড়লাম। বুকের ভেতর এখনো টিপটিপ করছে। এই রুদ্রের মাথা আসলেই খারাপ হয়ে গেছে। নাহলে, কেউ এমন করে?
“আমার মাথা খারাপ না, সেটা তোর খারাপ আনি। আর এতো ভাবার দরকার নেই, আমি শুধুমাত্র ভয় দেখিয়েছি , নাথিং এলস্ । আমার এতো ও খারাপ দিন আসেনি। ”
এই বলে রুদ্র গাড়ি স্টার্ট দিলো। আমি হা করে তাকিয়ে রইলাম। এখন কি মনে মনে কথাও বলতে পারবো না? এটা বুঝে যায় কিভাবে? বুঝি সব, সবই আমাকে জ্বালানোর ধান্দা। শ্লা ডায়নোসরের বাচ্চা!!!
#চলবে

