#এক_মেঘলা_দিনে
#পর্ব_৭
#আনিকা_আফসা
__________________
তৃষা ঢুকতেই একটা অন্ধকার রেস্টুরেন্ট দেখতে পেল। আমরা ওকে ইনভাইট করেছি। আমাদের উদ্দেশ্য করে চেঁচিয়ে বলল,
“কিরে সব গেলি কই আর আমাকে কি কোনো ভূতের ভানুপ্রিয়া হোটেলে দাওয়াত দিলি? চোখে আন্ধার দেখি কেন?”
আমরা ওর কথা শুনে মিটিমিটি হেসে দিলাম। আমি পাশ থেকে অয়নকে খোঁচা দিয়ে বললাম,
“যাহ্, যাহ্ । তাড়াতাড়ি যাহ্”
অয়ন অবাক হয়ে বলল,”কিন্তু আমিই কেন?”
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম,” কারণ তোকেই ঠিক করেছি এই কাজে। যা তো এখন কথা না বলে”
অয়ন হাতে একটা লাল কাপড় নিয়ে চলে গেল। কৌশলে দাঁড়ালো তৃষার পিছনে। তৃষা তখনো আমাদের খুঁজে চলেছে। আমরা আছি মজা দেখার অপেক্ষায়। অয়ন লাল কাপড়টা দিয়ে হঠাৎ তৃষার চোখ বেঁধে দিলো। তৃষা অবাক হয়ে বলল,
“আরে আরে , কি করছিস? ছাড় আমায় ! কে তুই?”
অয়ন মুখ লটকে বলল,”চুপ থাক পেত্নী। একটা কথা বললে ঘাড় মটকে রেখে দেব এখানে”
তৃষা হেঁসে বলল,”আমাকে পেত্নী বলে আমার ঘাড় মটকানোর ব্যবস্থা করছিস অয়ন বেদ্দপ?”
অয়ন কথা বললো না। তৃষার হাত ধরে টেবিলের সামনে নিয়ে এলো যেখানে ওর জন্য কেক সাজানো হয়েছে। আমি গিয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে দিলাম দ্রুত। অয়ন তৃষাকে টেবিলের সামনে দাঁড় করিয়ে ওর পাশে দাঁড়ালো তারপর ওর চোখের থেকে লাল কাপড় সরিয়ে দিলো। তখনই লাইট জ্বলে উঠলো। চারপাশের আসল সৌন্দর্য্য ফুটে উঠলো এবার। তৃষা আশেপাশে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলো। আমরা সবাই মিলে বলে উঠলাম,
“হ্যাপি পয়দা দিবস তৃষু”
তৃষা হেঁসে উঠল। আমাদের উইশ করার কায়দা ওর জানা আছে। আমরাও হেঁসে উঠলাম এটা বলে। আমি গিয়ে তৃষাকে জড়িয়ে ধরে বললাম,
“তোর প্রত্যেকটা পয়দা দিবস শুভ হোক তৃষু”
তৃষু হেঁসে বলল,”ধন্যবাদ ”
রিয়াদ বলল,”হইছে ভাই , এবার কেক কাট। আমার পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে কেকটা দেখে। না জানি কত টেস্টি হবে!”
সানভ মুখ কুঁচকে বলল,”তুই একটা জন্মের রাক্ষস রিয়াদ। বার্থডে গার্লের সামনে তো একটু এই গুণটা লুকিয়ে রাখ ”
সানভের কথা শুনে সবাই হেঁসে উঠলো। রিয়াদ মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“আরে ভাই, সত্যি কথাই তো বলছি! কেকটা দেখেই তো আমার মন গলে গেছে!”
সানভি হাই তুলে বললো,”হয়েছে বুঝেছি। তোর মন গলে একেবারে পানি পানি হয়ে গেছে।
রিয়াদ কিছু বলতে যাবে তার আগেই আমি বললাম,
“হয়েছে এবার থাম নয়তো আবার ঝগড়া লেগে যাবি দুজনে। তৃষা কেক কেটে ফেল নাহলে এরা তোর কেক আস্ত রাখবে না”
তৃষা অবশেষে ছুরি হাতে নিলো কেক কাটার উদ্দেশ্যে। আমরা টেবিল ঘিরে দাঁড়ালাম। তৃষাকে আজ পরী পরী লাগছে। হালকা মোমবাতির আলোয় মিষ্টি মেয়েটাকে আরো মিষ্টি লাগছে। তৃষা কেকে ছুরি চালালো। এক পিস কেটে সেটা হাতে সর্বপ্রথম সেটা ধরলো অয়নের মুখের সামনে। অয়ন চমকে বলল,
“আগে আমি ?”
তৃষা হালকা হেঁসে বলল,”প্রতিবার জন্মদিনে কেক কেটে তো প্রথমে তোর মুখেই দেই । নে চুপচাপ ”
অয়ন হালকা হেঁসে কেক মুখে তুললো। আমরা সবাই হাত তালি দিয়ে উঠলাম। অয়নও কেক থেকে একটু অংশ আলাদা করে তৃষার মুখের সামনে ধরলো। তৃষা অয়নের দিকে তাকিয়ে তা মুখে পুড়ে নিলো। তারপর হঠাৎ আঙ্গুল উঁচিয়ে বাম পাশে তাক করে বলল,
“অয়ন দেখ ঐটা কি?”
অয়ন সেদিকে তাকাতেই তৃষা অয়নের গালে কেকের ক্রিম লাগিয়ে দিলো। অয়ন চমকে তাকিয়ে বলল,
“এটা কি করলি?”
তৃষা হেঁসে দিলো। আমরাও হেঁসে দিলাম। তৃষা তখনই আমার আর রিয়াদের গালেও লাগিয়ে দিলো। আমি অবাক হয়ে বললাম,
“আমাকেও লাগিয়ে দিলি?”
তৃষা বলল,”আজ কেউ সেফ না”
এই বলে সানভির দিকে তাকালো। সানভি এই চাহুনি দেখে এক পা পিছাতে পিছাতে বলল,
“একদম না তৃষু। আমার মেকাপ নষ্ট হয়ে যাবে”
এই বলে যেই পালাতে নিবে রিয়াদ ওর হাত চেপে ধরে বলল,
“এসব বলে লাভ নেই চান্দু। আমাদের মাখিয়েছে তোমাকে ছাড় দিবে? উঁহু, কখনো না”
এই বলে ডেভিল হাঁসি দিয়ে তৃষাকে বলল,”নে তৃষা, করে নে নিজের ইচ্ছে পূরণ। মুহা হা,,,,”
তৃষাও সুযোগের সৎ ব্যবহার করে মাখিয়ে দিলো ক্রিম সানভির গালে। রিয়াদ ওর হাত ছেড়ে দিতেই সানভি টিস্যু নিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলল,
“তোরা বন্ধু নামের শত্রু ”
তৃষা হাসতে লাগলো। তখনই সে দেখলো রিয়াদ, অয়ন ও সানভির তার উপর দেয়া দৃষ্টি সুবিধার না। তৃষা হালকা হেসে বলল,
“কি হয়েছে? এভাবে কি দেখছিস? আমি তো মজা করছিলাম”
অয়ন হাতে ক্রিম নিয়ে বললো,”এখন আমরাও মজাই করবো”
তৃষা অবস্থা বেগতিক দেখে ছুটলো সহসা। অয়নও ছুটলো এবং তার পিছন পিছন সানভি ও রিয়াদও। আমি ওদের কান্ড দেখে হাসতে লাগলাম। তখনই আমার মোবাইল বেজে উঠলো। আমি হাতে নিয়ে দেখলাম আপুর ফোন এসেছে। একপাশে গিয়ে তা রিসিভ করে কানে তুলতেই আপু বলল,
“তৃষার কেক কাটা শেষ?”
আপুর হঠাৎ এই প্রশ্নে আমি একটু অবাক হলাম। নিজেকে ধাতস্থ করে বললাম,
“হ্যাঁ, কেন?”
আপু বললো,”না, এমনিই। শোন , এখন তুই বাসায় ফিরে আয়। আমার শরীরটা ভালো লাগছে না আর কেয়া জ্বালাচ্ছে। আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। তুই তাড়াতাড়ি চলে আয় প্লিজ”
এই বলে আপু ফোন কেটে দিলো। আমি ফোনের দিকে ঠোঁট উল্টে তাকালাম। আমার কথা তো কিছু শুনলোই না। তখনই ওরা আমার কাছে এসে দাঁড়ালো। তৃষার মাথায়ও কেক ভরিয়ে দিয়েছে ওরা। তৃষা জিজ্ঞেস করলো,
“কিরে? কিছু হয়েছে?”
আমি বললাম,”নাহ্, কিন্তু আমাকে এক্ষুনি বাসায় যেতে হবে। আপুর শরীরটা ভালো নেই।”
তৃষা মুখ লটকে বলল,”সবাই একসাথে খাবার খাবো না?”
আমি হেঁসে বললাম,”তোর বিয়ের খাবার একেবারে খাবো নি তৃষা। একদম সবাই একসাথে মিলে, ঠিক আছে?”
অয়ন বলল,”ঠিক আছে, চল। আমি তোকে পৌঁছে দিয়ে আসি”
আমি হাত উঁচিয়ে বললাম,”একদম না। একেতো আমি চলে যাচ্ছি তারউপর তুইও চলে গিয়ে ওর মন খারাপ আরো বাড়িয়ে দিবি অয়ন? আর তাছাড়া আপু গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। এসে যাবে হয়তো”
তখনই গাড়ির হর্নের আওয়াজ শোনা গেল। আমি বললাম,
“ঐ দেখ, হয়তো এসে পড়েছে। আমি যাই। আর অয়ন তুই এখানেই থাক”
এই বলে সবার থেকে বিদায় নিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বাইরে চলে আসলাম। কালো একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে রোডে। আমি গাড়ির পিছনের দরজা খুলে ভিতরে উঠে পড়লাম। দরজা লাগাতেই সামনের থেকে কেউ বলে উঠলো,
“আমি কারো ড্রাইভার নই, অতএব সামনে বসুন।”
আমি রুদ্রের কথা শুনে চমকে তাকালাম। তাকাতেই দেখতে পেলাম ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা রুদ্রকে। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
“আপনি এখানে কি করছেন?”
রুদ্র পিছে ফিরে বলল,”কেন? অন্য কাউকে আশা করেছিস বুঝি?”
“মানে?”
“মানে কিছু না। চুপচাপ সামনে এসে বস”
আমি বললাম,”আমি আপনার সাথে যাব না”
“বুঝেছি , এখন সামনে এসে বসে পড়”
আমি ভ্রু কুঁচকে চিল্লিয়ে বললাম,”বললাম না যাব না?”
“তো যাস না, আমি তোকে নিয়ে যাব। তাড়াতাড়ি সামনে এসে বসবি নাকি আমি নিশাকে ফোন দিবো?”
আমার আর ঝামেশা বাড়াতে মন চাইলো না। তাই চুপচাপ ফ্রন্ট সিটে চলে এলাম। কিন্তু লোকটা এমন করছে কেন? আগে তো এমন ছিল না। আমি যেই জায়গায়ই বসি তার কি? আজ আজব রকম সব ব্যাপার -স্যাপার করছে না লোকটা?
এসব ভাবতে ভাবতেই রুদ্র বলে উঠলেন,
“তোর বাবার কি গাড়ির অভাব পড়েছে আনি?”
আমি চমকে বললাম,”কেন?”
রুদ্র গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,”তাহলে আঙ্কেলের এতো গাড়ি থাকতেও অন্য ছেলের বাইকে করে তোকে কেন আসতে হলো?”
আমি চোখ ছোট ছোট করে বললাম,”ও কোনো অন্য ছেলে নয় ও আমার বন্ধু। আর বলতে গেলে আপনার বাবার , ইভেন আপনারও তো অনেক বাড়ি তো কার জন্য আমাদের বাড়িতে পড়ে আছেন?”
রুদ্র আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,”যার জন্য পড়ে আছি সে তো বোঝে না তাহলে বলে কি লাভ?”
রুদ্রের চাহনিতে আমি চোখ নামিয়ে নিলাম তারপর বললাম,
“কার জন্য পড়ে আছেন?”
রুদ্র গাড়ি চালাতে চালাতে বলল,”তোর!”
আমি ঝট করে রুদ্রের দিকে তাকালাম, তখনই রুদ্র বলল,
“তোর মায়ের”
আমি কপাল কুঁচকে বলল ,”মানে?”
রুদ্র ড্রাইভ করতে করতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,”হুম, আন্টি আমাকে অনেক ভালোবাসে তাই সেই লোভ সামলাতে পারি না । তাই তার জন্যেই আসি বারেবারে। এক মিনিট, ওয়েট ,ওয়েট তুই কি ভেবেছিলি? তোর জন্য আমি পড়ে আছি?”
আমি কপাল কুঁচকে বললাম,”আমি সেই কথা কখন বললাম?”
রুদ্র বাঁকা হেঁসে বলল,”আমি শুনতে পেয়েছি। তোর মনের খবর জানা আছে আমার। কিন্তু ব্যাড লাকের বিষয় হচ্ছে, রুদ্র আফতাব চৌধুরীর এতোটাও খারাপ দিন আসেনি যে তোর জন্য আমি ঐ বাড়িতে পড়ে থাকবো”
আমি হালকা হেঁসে বললাম,”আমি তা আশাও করিনা ।”
এই বলে অন্য দিকে ফিরলাম। রুদ্র আমাকে আবার বলল,
“তোর গালে ক্রিম কেন? কে লাগিয়েছে?”
আমি রুদ্রের দিকে তাকিয়ে একটু রেগে জিজ্ঞেস করলাম,
“আপনার সমস্যা টা কি বলতে পারেন?”
রুদ্র বলল,”তুই পুরোটাই সমস্যা। নাউ উত্তর দে কুইক”
আমি চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। লোকটার সাথে কথা বলতে চাইছি না তবুও এই ডায়নোসরের বাচ্চা কথা থামাচ্ছেই না। আমি চোখ খুলে বললাম,
“আমার বান্ধবী লাগিয়েছে”
রুদ্র ছোট্ট করে বলল,”ওহ্”
তারপর একটা টিস্যু এগিয়ে দিয়ে বলল,”এটা দিয়ে মুছে ফেল। বিচ্ছিরি লাগছে দেখতে”
আমি সেটা ঠেলে দিয়ে বললাম,”আমাকে দেখতে বিচ্ছিরিই লাগে। আপনার দেখার দরকার নেই আর আপনার টিস্যু আপনি রাখুন , আমার প্রয়োজন নেই। আপনি মনোযোগ ড্রাইভিং এ দিন দয়া করে!”
রুদ্র গাড়ি থামিয়ে দিলো আমার কথা শুনে। আমি অবাক হয়ে আবারো রুদ্রের দিকে তাকালাম। রুদ্র হঠাৎ আমার কাছে এসে তার এক হাত দিয়ে আমার গাল চেপে ধরলো। বেশি জোরে না তবে বেশি আস্তেও না। তারপর আমার গালে লেপ্টে থাকা ক্রিম টিস্যু দিয়ে যত্ন সহকারে মুছে দিতে লাগলো। আমি পুরো ফ্রিজ হয়ে গেলাম। এটা রুদ্র কিনা আদৌও তা নিয়ে এখন প্রশ্ন জাগছে। রুদ্র আমার গালের দিকে নজর রেখেই বলল,
“প্রশ্ন জাগিয়ে লাভ নেই। আমিই সে, রুদ্র আফতাব চৌধুরী। নামটা মনে রাখিস । আর এতো অবাধ্য হোস না এটা তোর জন্য ক্ষতিকর। এইবার টিস্যু দিয়ে মুছে দিলেও পরেরবার টিস্যু ইউজ করবো না”
_______________
ফ্যান ও এসি একসাথে ছেড়ে দিয়ে তার নিচে বসে আছি। পাশে আমার দুটো বিড়াল ঘোরাঘুরি করছে। শাড়ি পাল্টিয়ে নিয়েছি। মাথার ভিতর রুদ্রের করা আজকের আজব কাজকারবার ও কথাবার্তা ঘোরাফেরা করছে। আমি মাথা চেপে ধরে বললাম,
“নাহ্ , এই রুদ্র আগের রুদ্র নয়। আচ্ছা ঐ রুদ্র আবার এক্সচেঞ্জ হয়ে যায়নি তো? ধুর, উল্টাপাল্টা ভাবছি আমি আবার। আচ্ছা এতকিছুর পরও উনি আমার সাথে এত স্বাভাবিক কি করে? আমার জন্য কি একটু খারাপ লাগাও তার কাজ করে না? লাগলে কি আর আমার সামনে এতোবার আসতো? বোঝে না , ওনাকে সামনে দেখলে যে আজও অস্থির লাগে আমার? তবে এখন অস্থিরতার জায়গায় অস্বস্তিটা বেশি হয় আমার। কেন আসে সামনে এতোবার?”
এই ভেবে এক দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আর যাইহোক, উনি আমার প্রথম ভালোবাসা। এতো সহজে কি তাকে ভুলে যাওয়া যায়? তারপরও আমি চেষ্টা করেছি। নিজেকে গুছিয়েও নিয়েছি তাহলে আবার কেন এলো রুদ্র? কেন আবারো আমার জীবন এলোমেলো করতে এলো?
চোখ দিয়ে অশ্রুকণা গড়িয়ে পড়লো। আমি মুছে নিলাম তা সঙ্গে সঙ্গে। তখনই একটা কল এলো মোবাইলে। আমি মোবাইল হাতে নিয়েই দেখলাম একটা আননোন নাম্বার। রিসিভ করে কানে দিলাম তখনই,,,
#চলবে
জয়েন হোন আমার কুট্টু কুহেলিকায়:-
https://www.facebook.com/share/g/14UHkSeTVmc/

