এক_মেঘলা_দিনে #পর্ব_৬

0
2

#এক_মেঘলা_দিনে
#পর্ব_৬
#আনিকা_আফসা

__________________

কাল তো কালো শাড়ি পড়েছিলাম, আজ কোন শাড়ি পড়বো? ভাবতে ভাবতেই অয়নের ফোন এলো। আমি কাজ করছিলাম। তাই ফোন রিসিভ করে টেবিলে রেখে লাউডে দিলাম। অয়ন বলল,

“তুই শাড়ি পড়েছিস?”

আমি চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে ঠোঁট উল্টে বললাম,
“না রে!”

অয়ন উৎফুল্ল হয়ে বলল,”গ্রেট!”

আমি আয়নার দিকে তাকিয়েই অবাক হয়ে বললাম,”গ্রেট কেন?”

অয়ন বললো,”এমনিই। শোন তুই নিশ্চয়ই শাড়ির রং পছন্দ করা নিয়ে ফ্যাসাদে পড়েছিস?”

আমি চিরুনি রেখে বললাম,”তুই কি করে জানলি?”

অয়ন হালকা হাসলো মনেহয় তারপর বললো,”জানা আছে। তোর না একটা আকাশি রঙের শাড়ি আছে তৃষা যে তোকে জন্মদিনে দিয়েছিল?”

আমি একটু মনে করে বললাম,”আছে তো!”

অয়ন বললো,”তুই ঐটা পড়ে আসবি?”

আমি খানিক ভেবে বললাম,”ঐটা পড়ে আসবো বলছিস?”

“হুম!”

“ঠিক আছে, ফাইন। এটাই ফাইনাল। আমিও অনেক ফ্যাসাদে পড়ছিলাম কোন শাড়ি পড়বো এই নিয়ে। যাইহোক, থ্যাংকস তোকে।”

“আচ্ছা রাখছি, তুই জলদি রেডি হ”

আমি ফোন কেটে চুলগুলো খোঁপা করে নিলাম। হঠাৎ মনে হলো কেউ দেখছে আমায় , আমি পিছন ফিরে তাকালাম কিন্তু বিশেষ কাউকেই দেখলাম না। মাথা নেড়ে নিজেকে বোঝালাম ভুল ধারণা আমার। আলমারির কাছে গিয়ে অয়নের বলা ঐ শাড়িটা বের করলাম, সেটা বিছানায় রেখে ওয়াশরুমে গেলাম মুখটা ফ্রেশ করতে।

মুখ ধুয়ে টাওয়াল দিয়ে মুছতে মুছতে বের হলাম ওয়াশ রুম থেকে। তারপর তা বেলকনিতে গিয়ে রেখে আসলাম শুকোনোর জন্য। শাড়ি পড়বো তাই দরজা আটকে নিলাম, বিছানার কাছে আসতেই চোখ ফেটে রসগোল্লা। আকাশি শাড়িটার জায়গায় একটা নীল রঙের শাড়ি। এই শাড়ি তো আমি বের করিনি । ঠোঁটের উপর এক আঙ্গুল চেপে ধরে বিড়বিড় করে বললাম,

“এইটা এখানে হাঁটি হাঁটি পা করে কিভাবে আসলো আলমারি থেকে? আর ঐ শাড়ি গেলো কই?”

এই বলে বিছানার নিচে থেকে শুরু করে পুরো রুম খুঁজলাম। নাহ্, কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে দেরীও হয়ে যাচ্ছে, শেষমেষ বাধ্য হয়ে ঐ নীল রঙের শাড়িই গাঁয়ে জড়ালাম।নিজেকে একটু এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে দেখলাম। খারাপ লাগছে না, বরং অদ্ভুত রকম সুন্দর লাগছে।

হঠাৎ রুদ্রের কথা মাথায় এলো। উনি কি আছেন না চলে গেছেন? আমি মাথা নেড়ে নিজেকে ধমকে বললাম,

“আবার ওনার কথা ভাবছিস? থাকুক বা চলে যাক তোর তাতে কি? তোর জীবনে তার জন্য কোনো ভাবনার স্থান নেই”

__________

রেডিসেডি হয়ে রুম থেকে বের হলাম। নজর আমার ফ্লোরের থেকে শাড়ির দিকেই বেশি। কালকেরটা সুতির হলেও আজকেরটা পিওর সিল্ক। মনে হচ্ছে এইতো খুলে যাচ্ছে। আমি শাড়ির দিকে তাকাতে তাকাতে হাঁটতেই দিন দুনিয়া এমনভাবে ভুলে বসেছি যে হঠাৎ করেই কাঁধে কারো সাথে জোরসে ধাক্কা খেলাম। এতো জোরে ধাক্কাটা ছিল যে আমি তাল সামলাতে না পেরে পড়েই যাচ্ছিলাম তখনই কেউ ধরলো আমায়। শাড়ির আঁচল ভেদ করে তার ঠান্ডা হাত আমার উদর স্পর্শ করতেই শিউরে উঠলাম। আমার হাত সেই ব্যাক্তির দুই কাঁধ খামচে ধরেছে এবং আমার শরীর ঐ ব্যক্তির যেকোনো এক কাঁধে হেলে আছে । পড়ে যাওয়ার সময়ই চোখ খিচে বন্ধ করে নিয়েছিলাম এবার সেটা পিটপিট করে খুললাম। খুলতেই আকাশ থেকে ধপ করে মাটিতে পড়লাম এমন অবস্থা, মুখ হা করে রুদ্রের মুখের দিকে চেয়ে রইলাম। মুখ গম্ভীর কিন্তু চোখ হাসছে। আমার চোখে চোখ রেখে দেখছে আমায়। আমি থমকে গেলাম। রুদ্র আস্তে করে আমার কাজল মাখা চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“বিউটিফুল!!”

রুদ্র কি বলল তা আমার কানে গেল না। আমি এখন অবাকের চরম পর্যায়ে গিয়ে আসমানের তারাদের সাথে খেলছি। একেতো রুদ্রের এতো কাছে আসায় দম বন্ধ হয়ে আসছে তারউপর তাকে এসময় এখানে দেখে। আমি ভেবেছিলাম নিকি আপুর সাথে এইটাও চলে গেছে কিন্তু নাহ্ যায় নি। মনে মনে বললাম,
“ডায়নোসরের বাচ্চা তাহলে যায় নি?”

এসব ভাবতে ভাবতেই আমার উদরের রুদ্রের ছোঁয়া আরো গাঢ় হলো। আমি চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে কোমড় থেকে রুদ্রের হাত ঝটকা দিয়ে সরালাম তারপর রুদ্রকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দ্রুত দুই কদম পিছিয়ে এলাম। হৃদযন্ত্রের ধামধাম আওয়াজ নিজেই শুনতে পাচ্ছি। বিরক্ত লাগে মাঝে মাঝে নিজেরই ওপর এসবের জন্য। তখনই রুদ্র ভাইয়ের কথা শুনতে পেলাম , সে বলছে,

“এভাবে পেত্নী সেজে কোথায় যাচ্ছিস?”

আমি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে নিজের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বললাম,

“আমি পেত্নী?”

রুদ্র ভাই দেয়ালে হেলান দিয়ে হাত দুটো আড়াআড়িভাবে ভাঁজ করে মাথা নাড়লো। আমি ক্রোধে ফেটে পড়লাম যেন। আমি দাঁতে দাঁত চেপে হাত মুঠ করে বললাম,

“ওকে ফাইন। আমি পেত্নীই ঠিক আছি। আপনাকে দেখতে হবে না”

রুদ্র আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে বললেন,

“আমি তো দেখছি না ”

আমিও রুদ্রের মতো হাত ভাঁজ করে অন্যদিকে তাকিয়ে বললাম,”গুড”

তখনই রুদ্র ঠোঁট কামড়ে হেঁসে আবার বলল,

“শুধু দেখছি গলার বাম পাশের কালো কুচকুচে তিলটা আমায় দেখছে।”

আমি রুদ্রের দিকে হা করে তাকালাম। কি বলবো বুঝে আসলো না আমার। অজান্তেই সেখানে হাত গেলো আমার। গলা ও কাঁধের সংযোগস্থলে তিলটি। । চোখের পাতা হালকা কেঁপে উঠলো। রুদ্রের বেহায়া মার্কা কথায় রাগ উঠলো। দাঁত কিড়মিড় করে রেগে বললাম,

“বিদেশ থেকে এসে অসভ্য হয়েছেন আপনি”

রুদ্র অবাক কন্ঠে বলল,”আমি তো শুধু তিলের প্রশংসা করেছি, এতে খারাপ কি হলো?”

আমি কিছু বললাম না। ক্ষীপ্ত চোখে তাকিয়ে পিছু ফিরে চলে এলাম ধপাধপ পা ফেলে। আমার যাওয়ার দিকে তাকিয়েই রুদ্র মাথা চুলকে হাঁসলো তারপর সোজা হয়ে শিষ বাজাতে বাজাতে চলল কোথাও।

—–

রাগে মাথা গরম হয়ে গেছে আমার। রুদ্রের এমন আজব ব্যবহার ও ওনার জন্য আমার শাড়িটা এলোমেলো হয়ে গেছে। এই রুদ্রকে অচেনা লাগছে। নিশ্চয়ই লন্ডন থেকে পাগল হয়ে এসেছে । অসভ্য ছেলে। একে সহ্য হয় না, ডায়নোসরের বাচ্চা আমার শাড়ি খারাপ করে দিলো।

তখনই পথে আপুর দেখা মিলল। আপুর কাছে গিয়ে কোনো কথা বাদে জিজ্ঞেস করলাম ,

“রুদ্র ভাই এখনো এখানে কেন?”

আপু আমার কথা শুনে অবাক হলো। জিজ্ঞেস করলো,

“কেন?”

“কেন মানে কি? সারাজীবন কি এখানে থাকবে?”

আপু থমথমে মুখে বলল,”এটা কেমন কথা আনি? রুদ্রের বাবাতো এখানে থাকে না আর ওর মাও তো নেই যে ও ওনার কাছে থাকবে। এখানে আপন বলতে আমরা তাই আম্মু ও আব্বু জোড় করেই রেখে দিয়েছে। কেন, তোর কোনো সমস্যা?”

আমি রেগে বললাম,”নাহ্ আমার কোনো সমস্যা না, তোমরা যা ইচ্ছা তাই করো। আমার আর কি? আমি গেলাম , টাটা। তুমি তোমার রুদ্র কে নিয়ে থেকো”

এই বলে ধুপধাপ পা ফেলে চলে গেলাম। আপু মাথা নেড়ে হেঁসে বলল,”পাগলি একটা”

_____________

রাগি রাগি মুখ নিয়েই শাড়ি ধরে বাসা থেকে বের হলাম। অয়ন এসে পড়েছে ইতিমধ্যে। ওকে দেখে মুখটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে ওর দিকে এগিয়ে গেলাম। আমাকে দেখেই দেখলাম অয়নের মুখ মলিন হলো। আমি ওর সামনে দাঁড়িয়ে অপরাধী কন্ঠে বললাম,
“সরি রে অয়ইন্না। তোর বলা শাড়িটা পড়া হয়নি। ঐটা খুঁজেই পাচ্ছি না। রাগ করিস না প্লিজ”

অয়ন আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে বলল,”তোকে কে বলল আমি রাগ করবো? এটাতেও তোকে অনেক সুন্দর লাগছে। কিন্তু কুঁচির এই অবস্থা কেন?”

আমি ঠোঁট উল্টে বললাম,”এলোমেলো হয়ে গেছে। সমস্যা নেই সানভির থেকে ঠিক করিয়ে নিবো।”

অয়ন হালকা হেঁসে বলল,”কেন আমাকে চোখে পড়ে না তোর?”

এই বলে ও ঝুঁকে কুঁচিতে হাত দিতে নিতেই আমি এক পা পিছিয়ে গিয়ে ইতস্তত হয়ে বললাম,

“না, না । তোর ঠিক করা লাগবে না। আমি বললাম তো সানভি করে দিবে!”

অয়ন বসে থেকেই ভ্রু কুঁচকে বলল,”কেন ? তুই আমাকে বন্ধু ভাবিস না?”

“না , তেমন না। ঐ আসলে,,”

“কোনো আসলে নকলে নেই। আমি ঠিক করে দিবো ব্যস!”

এই বলে কুঁচি গুছিয়ে দিতে লাগলো। আমিও কথা বাড়ালাম না। আমার কাছে ওরা চারজন সকলেই এক। কুঁচি ঠিক করা হতেই অয়ন বিজয়ের হাসি দিয়ে উঠে দাঁড়ালো তারপর বাইকে উঠে আমাকে উঠতে ইশারা করলো। আমিও উঠে পড়লাম অয়নের কাঁধে হাত রেখে। অয়ন বাইক স্টার্ট করে আমাকে নিয়ে রওনা দিলো।

দূর থেকে জানালায় দাঁড়িয়ে এসব অবলোকন করলো রুদ্র। হাতে থাকা কফির মগটা শক্ত হাতে চেপে ধরলো। হাতে রগ ফুটে উঠলো সহসা।
অন্য হাতে থাকা ফোনে রুদ্রের বাবা হ্যালো হ্যালো করে যাচ্ছেন। এতক্ষণ ধরে তার সাথেই কথা বলছিল রুদ্র। রুদ্র ফোন কানে নিয়ে বলল,

“তোমার সাথে পড়া কথা বলবো ড্যাড। এখন রাখছি”

এই বলে অপর পাশের ব্যাক্তিকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ফোন কেটে বিছানায় ছুড়ে মারলো।

____

বাইকটা থামতেই আমি অয়নের কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে নামলাম। জায়গাটা একটা রেস্টুরেন্টে। চারপাশে হালকা মেঘলা আবহাওয়া, ঠান্ডা বাতাস বইছে। অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করছে ভেতরে, কেন জানি রুদ্রের কথা না চাইতেও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।

অয়ন হেলমেট খুলে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কি রে, চুপ হয়ে গেছিস কেন?”
আমি জোর করে হেসে বললাম,
“কিছু না,এমনি।”

আমি অয়নের সাথে মিলে ভেতরে প্রবেশ করলাম। সানভি ও রিয়াদ ছিলো আগে থেকেই। ক্যাটারিং এর লোকের সাথে কথা বলছে। তৃষা এখনো আসে নি। চারপাশে বেলুন ও মরিচ বাতি দিয়ে সাজানো। সানভি বললো,

“তুই এসেছিস বইন? এই রিয়াদটা আমার মাথা খারাপ করে দিচ্ছে। একটা কাজ যদি ঠিক মতো পারতো। বলদ পোলা কোথাকার!!”

রিয়াদ গর্জে উঠে বলল,”তুই এক নাম্বারের বলদি। এহ্ আসছে বলতে আমি কোনো কাজ পারিনা। একটু আগে নিজে কি কাজ করছিলি? আফসু জানিস কেকটা ফেলে দিতো একটু হলে!”

সানভি চোখ কুঁচকে বলল,”আমার জন্য না তোর জন্য কেকটা খারাপ হতে যাচ্ছিল!”

রিয়াদও সানভির মতো চোখ কুঁচকে বলল,”হ্যাঁ, কারণ তখন তুই তোর ফাঁটা বাঁশের আওয়াজের মতো টেপ রেকর্ডার চালু করেছিলি তাই আমার মাইন্ড এলোমেলো হয়ে গিয়েছিলো!”

সানভি কোমড়ে দুই হাত রেখে বলল,”আমারটা ফাঁটা বাঁশ? আমার এতো সুন্দর আওয়াজকে তুই এমন বললি? তোর নিজেরটা কাকের আওয়াজ। কথা বললেই কাকের মতো কা,, কা শোনা যায়!”

রিয়াদ ভাব নিয়ে বলল,”আমার কন্ঠ কাকের নয়। ময়ুরের কন্ঠ আমার। যখন আমি গান গাই লোকেরা আমার পিছনে ছুটে আসে আমার গান শোনার জন্য ”

সানভি তাচ্ছিল্য হেঁসে বলল,”তোর গান শুনতে ছুটে না, তোকে লাঠিপেটা করতে ছুটে আসে”

রিয়াদের হাঁসি দপ করে নিভে গেল। আমি আর অয়ন একবার সানভি তো একবার রিয়াদের দিকে তাকাচ্ছি। দুজন এখনো সমান তালে ঝগড়া করছে। ওয়েটাররাও তাদের দেখছে। আমি আর অয়ন একে অপরের দিকে তাকালাম তারপর দুজন একসাথে চিল্লিয়ে উঠলাম।

“চুউউউউউপ!!”

এতো জোরে দুজন চিৎকার করলাম। ওরা দুজন ভয় পেয়ে লাফ দিয়ে উঠলো। অয়ন ওদের বলল,

“কি শুরু করেছিস? বাচ্চাদের মতো ঝগড়া কেন করছিস? নার্সারিতে পড়িস এখনো? বড় হয়েছিস বাতাসে!!”

আমি হাতের ঘড়ি দেখে বললাম, “দেখ এখন আর ঝগড়া করিস না । এখন তৃষু এসে পড়বে। সানুভ আর রিয়াইদ্দা একেবারে দুইটা মুখে আঙ্গুল দে। ঝগড়া করবি না একদম। নাহলে তোদের দুটোকে আমি , অয়ন ও তৃষা মিলে ময়লা ডোবায় চুবাবো!”

ওরা দুজন একসাথে মুখে আঙ্গুল গুঁজলো। আমি চলে গেলাম অন্যদিকে। আমি যেতেই দুইটায় চোখ দিয়ে একে অপরকে শাসিয়ে সানভি আমার সাথে আর রিয়াদ অয়নের সাথে চলল।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here