#এক_মেঘলা_দিনে
#পর্ব_১৭
#আনিকা_আফসা
আরফান মির্জা বাসায় এসে সোফায় বসতেই আনিশা এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিলো। সোফার অপর পাশেই নিতু মির্জা (আমার মা) বসা। আরফান খেয়াল করলেন বাসার পরিস্থিতি ভালো না, অবশ্য কারণটা তার জানা। আরফান একবার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আনিশার দিকে তাকালেন। আনিশা তার দিকেই তাকিয়ে আছে। আরফান এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“আনিকা কোথায়?”
“ওর রুমে”
আনিশা ধীরস্থির হয়ে জবাব দেয়। আরফান মির্জা কিছু ভাবলেন , তারপর বললেন,
“যাও ডেকে নিয়ে এসো। সাথে রুদ্রকেও।”
আনিশা মাথা নেড়ে চলে গেল। নিতু কপাল কুঁচকে মেয়ের যাওয়া দেখলেন তারপর স্বামীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“কি ব্যাপার? ওদের ডাকছো যে? আনির মন এমনেই ভালো নেই”
আরফান মির্জা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,”জানি, তবে আমার একটা সিদ্ধান্ত আছে। সবার থাকা প্রয়োজন।”
ততক্ষনে নিহান চলে আসলো। আরফান মির্জা তাকে তার পাশের সোফাটায় বসতে বললেন এবং কিছু আলাপ আলোচনা সাড়লেন। ততক্ষনে আপু আমাকে ও রুদ্রকে ডেকে নিয়ে এনেছে। আমি বাবাকে দেখেই দৌড়ে তার কাছে গিয়ে কেঁদে জড়িয়ে ধরলাম। বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং আমাকে কাঁদতে নিষেধ করলেন। আমি বাবার কথাশুনে শান্ত হয়ে বসলাম। নিহান ভাইয়াকে আপু আগেই ফোনে বলেছে সব। নিহান ভাইয়া বললেন,
“চিন্তা করিস না আনি, যে তোর বিড়ালকে মেরেছে তার উচিত শিক্ষা হবে। সে নির্ঘাত বিড়ালের হাতেই মারা যাবে অথবা বিড়ালের গাড়ির তলায় চাপা পড়বে। দেখিস, আমার দোয়া না লাগলেও বদদোয়া সবসময় লাগে।”
আমি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। রুদ্র নিহান ভাইয়ার মাথায় চাটা মারলেন উল্টাপাল্টা কথা বলার জন্য। নিহান ভাইয়া বললেন,
“কি ভাই!! বিয়ে হয়েছে আমার। এভাবে যখন তখন মারবি না। রেসপেক্ট মি , ওকে?”
রুদ্র বাঁকা হেঁসে বলল,”হুম, বিয়ে তো হয়েছেই। কিন্তু কার সাথে? আমার ফ্রেন্ড নিশার সাথেই তো হয়েছে। আমি না মারলে কি হয়েছে? নিশা তোকে আচ্ছামতো ধোলাই দিবে ,তাই না নিশা?
আপু হালকা হাসলেন। আমি এদের কথা শুনছি। নিহান ভাইয়া তেতে উঠে বললেন,
“তোর বন্ধু, আমার কি নাবন্ধু? আর কোনোভাবে যদি আমার বউকে তুই ফুঁসলিয়ে ফাঁসলিয়ে আমার বিরুদ্ধে করিস তো কি হবে জানিস? আমার শালীকে দেখছিস? তোকে আছাড় দিবে।”
আমি হতবাক হলাম। এই লম্বা হাতির মতো মানুষ, ডায়নোসরের বাচ্চাকে আমি আছাড় দিবো? আমি তো চাপা পড়ে মরবো। নিহান ভাইয়া কি আমাকে অকালে মারতে চায়? তখনই আমার নজর গেল রুদ্রের দিকে। রুদ্র ভ্রু নাচালো। অর্থাৎ— নিহানের কথা সত্যি কিনা? আমি ভেংচি কাটলাম। কিছুক্ষণের জন্য কিটির কথা ভুলেই বসলাম।
বাবা তখনই গলা ঝেড়ে বললেন,
“আচ্ছা অনেক হয়েছে। এখন থামো। আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তোমাদের সবাইকে এই বিষয়ে জানাতে চাই। আর সিদ্ধান্তটা আনিকার বিষয়ে”
আমি অবাক হলাম। আমার বিষয়ে? আমার বিষয়ে আবার কি সিদ্ধান্ত? আমি রুদ্রের দিকে তাকালাম, সেই সময় রুদ্রও ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকালো। বাবা উঠে দাঁড়িয়ে একবার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আমি চাই আগামী সপ্তাহেই আনিকার বিয়ে দিতে।”
আমি কেঁপে উঠলাম । আমার বিয়ে ? তাও আগামী সপ্তাহেই? কার সাথে ঠিক করেছে বাবা? রুদ্রও আমার দিকে প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। তার দৃষ্টি এলোমেলো এবং অবাক হওয়া ভাব। আপু বলল,
“এতো তাড়াতাড়ি? এই সিদ্ধান্ত? কোনো সমস্যা হয়েছে বাবা?”
বাবা মাথা নেড়ে বললেন,”নাহ্, কোনো সমস্যা হয়নি। আমি আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলাম। তোমাদের জানিয়ে দিলাম”
রুদ্র জিজ্ঞেস করলো,”কার সাথে বিয়ে ঠিক করেছেন ওর?”
বাবা রুদ্রের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“করেছি কারো সাথে।”
“কার সাথে? নাম কি?”
রুদ্রের কন্ঠ কেমন যেন লাগছে। বাবা কপাল কুঁচকে বলল,
“তোমার এত জানার ইচ্ছে কেন?”
রুদ্র আরো দৃঢ় গলায় বলল,
“কারণ আপনি যারতার সাথে ইনফ্যাক্ট কারো সাথেই ওর বিয়ে ঠিক করতে পারেন না!”
আমার বাবা সেভাবেই বললেন,”মানে কি? আমি ওর বাবা , আমি চাইলেই পারি।”
রুদ্র জোর গলায় বলল,”না , আপনি চাইলেই পারেন না। কারণ, ও আমাকে ভালোবাসে। আস্ক হার।”
আশেপাশের পরিবেশ যেন কিছুটা বিগড়ে গেল। রুদ্র সোফা পেরিয়ে আমার কাছে এসে আমার কনুই টেনে ধরে দাড় করালো এবং বলল,
“বল , তুই আমাকে ভালোবাসিস।”
আমি অবাকের পর অবাক হচ্ছি। বাবার দেয়া ঘোষণায় আর রুদ্রের আচরণে। রুদ্র কেমন যেন করছে, জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে, হাত কাঁপছে যেন। রুদ্র আমাকে ঝাঁকিয়ে বললেন,
“কি হলো, বলছিস না কেন? বল, বলতে বলছি তো তোকে”
আপু বললেন,”রুদ্র ওকে একটু সময় দে।”
আম্মুও কিছু বললেন। রুদ্র আবার বললেন,
“বল ভালোবাসিস তুই আমায়”
আমার কন্ঠ যেন বুজে এলো। মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছেই না। ভয় ও নার্ভাস লাগছে। বাবা , মা পুরো পরিবারের সামনে কিভাবে বলবো এই কথা? আমি মাথা নিচু করে রাখলাম। রুদ্র হঠাৎ আমার হাত ছেড়ে দিয়ে বললেন,
“ভালোবাসিস না আমায়?”
আমি ঝট করে তার দিকে তাকালাম। রুদ্র নজর ফিরিয়ে চলে যেতে নিলো। রাগ করেছে? আমিই কেমন মানুষ? ভালোবাসি অথচ রুদ্রের মতো সবার সামনে বলার সাহস নেই? রাগ তো করারই কথা। আমি তৎক্ষণাৎ মিনমিনিয়ে বললাম,
“বাসি”
রুদ্র আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,”কি বাসিস?”
বাবার সামনে বলতে আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল। আমি আমতা আমতা করে বললাম,”ভা-ভালো বা-বাসি”
আমার কথা শুনে আপু ও নিহান ভাই এক গাল হাসলেন। রুদ্র আমার হাত ধরে বলল,”বল তোর বাবাকে, তোর বিয়ে ঠিক করেছেন উনি।”
আমি বাবার দিকে তাকালাম। মনে মনে সাহস সঞ্চয় করলাম। নিচু কন্ঠে বললাম,
“বাবা, আমি , ঐ আসলে। অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারবো না। অন্য কাউকে বিয়ে করা আমার পক্ষে অসম্ভব।”
রুদ্র যেন এক প্রাণভরে শ্বাস নিলো। আমার কনুই ধরে টেনে বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“দেখেছেন। আপনার মেয়ে আমাকে ভালোবাসে। আমিও আপনার মেয়েকে ভালোবাসে। আপনি তাকে অন্যত্র বিয়ে দেয়ার ব্যাপারে ভাবতে পারলেন কি করে? বিয়ের কথা তো আমাদের চলছিলো তাইনা? তাহলে আপনি কার সাথে আনির বিয়ে ঠিক করেছেন? আপনার মেয়ের ভালোবাসার গুরুত্ব নেই আপনার কাছে?”
বাবা খানিক হাসলেন এবং বললেন,
“অবশ্যই গুরুত্ব আছে, আর আছে বলেই আমি তোমার সাথেই ওর বিয়ে ঠিক করেছি।”
বসার ঘরে একটা বোম ফাটলো যেন। আমি ঝট করে তাকালাম। রুদ্র তাজ্জব হয়ে গেল। নিহান ভাইয়া ও আপু চোখাচোখি করলো, তারপর দু মিনিট পর এক ঘর কাঁপিয়ে হাঁসি হাসলো দুজন। রুদ্র অবাক হয়ে বলল,
“কিহ্? আমার সাথে? কখন?”
বাবা একবার আম্মুর দিকে তাকিয়ে তারপর রুদ্রের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“হুম, তোমার সাথেই ওর বিয়ে ঠিক করেছি। তোমার বাবার সাথে কথা হয়েছে আমার। তিনি এ বিষয়ে ইতিবাচক মতামত জানিয়েছেন। তাই আগামী সপ্তাহেই তোমাদের বিয়ে। তোমাদের দুজনের কারো আপত্তি আছে?”
আমি আর রুদ্র দুজন দুজনের সাথে চোখাচোখি করলাম। একটু আগের ঘটনায় লজ্জা পেলাম খানিক। রুদ্র বিব্রত হলো। আমার হাত তখনো ধরেছিল। ছেড়ে দিলো সেটা। হাত ছাড়া পেয়ে দাড়িয়ে রইলাম। বাবা আমাকে বললেন,
“তোমার কোনো আপত্তি আছে আনিকা?”
আমি একবার রুদ্রের দিকে তাকালাম। রুদ্র আমাকে বলতে ইশারা করলো। আমি মাথা নিচু করেই ডানে বামে মাথা নাড়লাম। বাবা তারপর রুদ্রকে জিজ্ঞেস করলেন তার সমস্যা আছে কিনা। রুদ্র কিছু বলার আগেই নিহান ভাইয়া বললেন,
“কি যে বলেন বাবা? সমস্যা তাও আবার রুদ্রের? ও তো পারলে আজকে , না না এখনই বিয়ে করে ফেলবে। ”
রুদ্র চোখ রাঙালো। আমি দৌড়ে চলে গেলাম রুমে। নিহান ভাইয়াও মাঝে মাঝে এমন কথা বলে। অফিস থেকে এসে এত শক্তি ও মনে ফূর্তি কোথা থেকে পায়? আমি যেতেই রুদ্র মাথা চুলকে বলল,
“না, আমার কোনো সমস্যা নেই আঙ্কেল। আপনার যা সুবিধার হয়। আর একটু আগের জন্য, সরি!”
এই বলে নিজেও চলে এলেন ওখান থেকে। চলে আসাই উচিত, যেটুকু ইজ্জত অবশিষ্ট নাহলে নিহান ভাইয়া সেটুকুও পাংচার করে দিত।
রুমে ঢুকেই দরজা লাগিয়ে দিলাম। বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে তাকালাম। গালদুটো টকটকে লাল হয়ে আছে।
“ধুর! কি বললাম আমি! সবার সামনে,,”
বিছানায় ধপ করে বসে পড়লাম। মাথায় বারবার সেই মুহূর্তটা ঘুরছে,
“ভা-ভালো বা-বাসি…”
চোখ বন্ধ করতেই নিজেই নিজের মুখে হাত চাপা দিলাম। লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছে!
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়লো।
আমি চমকে উঠলাম। দৌড়ে দরজার কাছে গেলাম,
“কে?”
“আমি,,,”
রুদ্রর কণ্ঠ শুনেই আবার বুক ধুকপুক শুরু হলো।
আমি দরজার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। খুলবো? না খুলবো না? আবার টোকা পড়লো।
“আনিকা, দরজা খুল,, প্লিজ।”
ওনার কণ্ঠটা কেমন নরম লাগছে আজ।আমি ধীরে ধীরে গিয়ে দরজা খুললাম। দরজা খুলতেই দেখি রুদ্র দাঁড়িয়ে আছে, মুখ একদম স্বাভাবিক। তবে ভেতরে হয়তোবা অস্বস্তি হচ্ছে। চোখের চাহনি দেখে এটুকু বুঝলাম।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ। তারপর রুদ্র গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“এই যে,, একটু আগে যা হলো,,”
আমি সাথে সাথে বললাম,
“ভুলে যান!”
রুদ্র ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কি?”
আমি মুখ ঘুরিয়ে বললাম,
“মানে,, কিছুই হয়নি, ঠিক আছে?”
রুদ্র একটু এগিয়ে এসে বলল,
“কিছুই হয়নি?”
আমি চুপ। হঠাৎই উনি আমার সামনে এসে দাঁড়াল। এতটাই কাছে যে আমার শ্বাস আটকে গেল।
“তুই একটু আগে কি বললি, আবার বল তো?”
আমি চোখ বড় বড় করে বললাম,
“না! আর বলবো না!”
রুদ্র হালকা হেসে বলল,
“কেন? একটু আগে তো বেশ সাহস ছিল!”
আমি রাগ দেখিয়ে বললাম,
“আপনি জোর করছিলেন তাই বলেছি!”
রুদ্র হঠাৎ সিরিয়াস হয়ে গেল।ধীরে ধীরে বলল,
“জোর না করলে বলতিস না?”
আমি থমকে গেলাম। কি বলবো বুঝতে পারছি না।রুদ্র নিচু গলায় বলল,
“আমি তো অনেকদিন ধরেই শুনতে চাচ্ছিলাম,,”
আমার বুক কেমন করে উঠলো।আমি ধীরে বললাম,
“সব কথা সবার সামনে বলা যায় নাকি?”
রুদ্র একটু ঝুঁকে আমার দিকে তাকাল এবং বলল,
“তাহলে এখন বল,, শুধু আমার জন্য।”
আমার গলা শুকিয়ে গেল। চোখ নামিয়ে ফেললাম।
“না,,”
রুদ্র হালকা হেসে বলল,
“ঠিক আছে, তাহলে আমিই বলি।”
আমি তাকালাম।রুদ্র ধীরে ধীরে বলল,
“আমি তোকে ভালোবাসি,,অনেক বেশি।”
মুহূর্তেই সবকিছু থেমে গেল যেন।ওর চোখদুটো সরাসরি আমার চোখে। এত সত্যি, এত গভীর,
আমার ঠোঁট কাঁপলো। বলতে নিলাম,
“আমিও,,”
এর মাঝেই বাইরে থেকে নিহান ভাইয়ার গলা শোনা গেল,
“ওইইই! দরজা বন্ধ করে কি চলছে হ্যাঁ? আমরা কিন্তু সব বুঝি!”
রুদ্র আমার জবাব শুনতে তাকিয়ে ছিলো। আমিও বলতে চাইছিলাম যে আমিও আপনাকে ভালোবাসি কিন্তু নিহান ভাইয়ার হঠাৎ কন্ঠে আমি চুপ হয়ে গেলাম। তা দেখে রুদ্র দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“মাঝে মাঝে মন চায় এর মাথা ফাটাই। সবসময় ভুল টাইমে এসে ভুলভাল কথা বলে।
আমি হেসে ফেললাম।ঠিক তখনই নিচ থেকে আপুর আওয়াজ এলো,
“আনি! নিচে আয়, বিয়ের শপিং নিয়ে কথা হচ্ছে!”
আমি চমকে উঠলাম, অবাক হয়ে বললাম,
“এত তাড়াতাড়ি?”
রুদ্র মুচকি হেসে বলল,
“হুম, ম্যাডাম, এখন আর পালানোর উপায় নেই।”
আমি চোখ রাঙালাম এবং বললাম,
“আমি পালাবো কেন?”
রুদ্র একটু ঝুঁকে কানে কানে বলল,
“কারণ তুমি আমার হতে যাচ্ছো, অফিসিয়ালি।”
আমার শরীর কেঁপে উঠলো। রুদ্রের মুখে প্রথমবার তুমি ডাক শুনে মন জুড়িয়ে গেল। মন জুড়ে ছুটে গেল ভালো লাগারা। এতো সুন্দর করে কেউ ডাকে? এতো সুন্দর করে ডাকলে তো আমার হৃদস্পন্দন-ই থেমে যাবে।
উনি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“চল, নিচে যাই।”
আমি মাথা নেড়ে দরজার দিকে এগোলাম। বের হওয়ার আগে একবার পিছনে তাকালাম।রুদ্র তখনো আমার দিকেই তাকিয়ে আছে।
চোখাচোখি হতেই ও হালকা করে চোখ টিপলো।
আমি তাড়াতাড়ি মুখ ফিরিয়ে নিলাম এবং যেতে যেতে মেকি রাগ দেখিয়ে বললাম,
“ডায়নোসর একটা,,”
মুখে বললাম, কিন্তু ঠোঁটের কোণে হাসি ঠিকই লেগে রইলো
ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই দেখি একদম মেলা বসে গেছে। আপু, আম্মু, নিহান ভাইয়া,সবাই সোফায় বসে বিয়ের শপিং নিয়ে আলোচনা করছে।আমি চুপচাপ গিয়ে এক কোণায় বসলাম।
নিহান ভাইয়া আমাকে দেখেই বলল,
“এই যে আমাদের লজ্জাবতী কনে আসছে! কেমন লাগছে ম্যাডাম? এক সপ্তাহ পরেই মিসেস হয়ে যাবেন!”
আমি চোখ রাঙালাম,
“তুমি চুপ করবে?”
আপু হেসে বললেন,
“ঠিক আছে ঠিক আছে, এখন সিরিয়াস কথা বলি। কালকেই আমরা শপিংয়ে যাবো। ড্রেস, জুয়েলারি,সব কিনতে হবে।”
আম্মু মাথা নেড়ে বললেন,
“হ্যাঁ, সময় তো একদম কম।”
ঠিক তখনই রুদ্র এসে আমার পাশে বসল।আমার দিকে না তাকিয়েই বলল,
“আমি কিন্তু যাবো।”
নিহান ভাইয়া সাথে সাথে বলল,
“তুই কেন যাবি? মেয়েদের শপিং, তোর কাজ কি ওখানে?”
রুদ্র ঠান্ডা গলায় বলল,
“আমার বউয়ের শপিং, আমি যাবো না?”
আমি কাশতে লাগলাম। রুদ্র আমার মাথায় হাত বুলিয়ে পানি এগিয়ে দিলো। আমি ঝটপট পানি খেয়ে রুদ্রের দিকে তাকালাম। নিহান ভাইয়া বলল,
“কি?!”
সবাই হেসে উঠলো।আপু মুচকি হেসে বললেন,
“ঠিক আছে, তুই আসতে পারিস। কাজে লাগবে।”
রুদ্র আমার দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচালো।
আমি মুখ ঘুরিয়ে নিলাম।
পরদিন,,
শপিং মলে ঢুকতেই চারদিকে আলো ঝলমল করছে। এত মানুষ! আমার মাথা একটু ঘুরে উঠলো।
আপু বললেন,
“চল, আগে ব্রাইডাল শাড়ি দেখি।”
আমি মাথা নেড়ে তাদের সাথে এগোলাম। রুদ্র একটু দূরে দাঁড়িয়ে ফোন দেখছিল। আপু একটা শাড়ি ট্রাই করতে দিলো আমাকে। আমি চেঞ্জিং রুমে গিয়ে শাড়িটা পড়ে বের হলাম।সবাই তাকিয়ে রইলো।
আপু বললেন,
“ওমা! একদম পুতুল লাগছে!”
আমি লজ্জা পেলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম, রুদ্র চুপচাপ দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ সরাচ্ছে না।
আমি ভ্রু নাচিয়ে বললাম,
“কি?”
রুদ্র ধীরে বলল,
“এইটাই নে।”
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম,
“এতো তাড়াতাড়ি?”
“হুম। আর কিছু দেখার দরকার নেই।”
নিহান ভাইয়া বলল,
“ওরে বাবা! এত তাড়াতাড়ি ডিসিশন? প্রেমে পড়লে মানুষ এমনই হয় বুঝি!”
সবাই হেসে উঠলো।ঠিক তখনই পাশ থেকে এক সেলসম্যান এসে বলল,
“ম্যাডাম, আপনি চাইলে আমি আরও কিছু ডিজাইন দেখাতে পারি।”
সে আমার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলো।
আমি ভদ্রভাবে বললাম,
“জি, দেখান।”
লোকটা একের পর এক শাড়ি এনে দেখাতে লাগলো। আমি দেখতে লাগলাম। লোকটা আমার হাতে একটা শাড়ি দিয়ে বলল,
“ম্যাম এটা দেখুন, আপনার গায়ে অনেক সুন্দর মানাবে। আপনাকে পরী লাগবে একেবারে ”
হঠাৎ পাশে দাঁড়ানো রুদ্রর গলা শুনলাম,
“এইটা দরকার নেই।”
আমি তাকালাম।রুদ্র কপাল কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে।
সেলসম্যান একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
“স্যার, ম্যাডাম যদি,,”
রুদ্র ঠান্ডা গলায় বলল,
“আমি বলেছি দরকার নেই। আর আপনি আপনার কাজে যান।”
সেলসম্যান মাথা নেড়ে চলে গেল। আমি অবাক হয়ে বললাম,
“আপনি এমন করছেন কেন?”
রুদ্র আমার হাত ধরে পাশে টেনে নিয়ে গেল।
নিচু গলায় বলল,
“ওর দিকে তাকিয়ে এত হাসছিলি কেন?”
আমি হতভম্ব হয়ে বললাম,
“কি?! আমি হাসলাম কোথায়?”
“দেখেছি আমি।”
আমি হেসে ফেললাম এবং ভ্রু নাচিয়ে বললাম,
“আপনি সিরিয়াসলি জেলাস হচ্ছেন?”
রুদ্র একটু চুপ করে রইলো।তারপর মুখ ফিরিয়ে বলল,
“না।”
আমি আরো হাসলাম এবং রুদ্রের মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম
“মিথ্যা বলছেন!”
রুদ্র বিরক্তিতে “চ” সুচক আওয়াজ করে বলল,
“যা খুশি ভাব।”
আমি একটু ঝুঁকে বললাম,
“আপনি জেলাস হচ্ছেন, তাই না?”
রুদ্র আমার দিকে তাকালো।কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীরে বলল,
“হ্যাঁ। হচ্ছি। সমস্যা?”
ওনার চোখদুটো এত সিরিয়াস হলো যে আমার হাসি থেমে গেল। উনি বললেন,
“আমার ভালো লাগে না, অন্য কেউ তোকে ওইভাবে দেখুক। ঐ সেলসম্যানটার নজর খারাপ ছিল। তোর দিকে কিভাবে তাকিয়ে ছিল। হাসছিলও কেমন। তোকে কেন দেখবে এভাবে?”
আমার বুক কেমন করে উঠলো।আমি ধীরে বললাম,
“তাহলে আপনি দেখেন না।”
রুদ্র ভ্রু তুলল এবং বলল,
“মানে?”
আমি মুচকি হেসে বললাম,
“আমাকে দেখার রাইট তো শুধু আপনারই।”
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর হঠাৎ হেসে ফেলল।
“তুই মেয়েটা দিন দিন বিপজ্জনক হয়ে যাচ্ছিস।”
আমি মুখ ফুলিয়ে বললাম,
“আমি এমনই!”
রুদ্র আমার দিকে তাকিয়ে হালকা করে বলল,
“ভালোই,, আমার জন্য এমনই থাক।”
আমি চুপ করে গেলাম।লজ্জা লাগছে আবার ভালোও লাগছে।
দূর থেকে নিহান ভাইয়ার গলা শোনা গেল তখনই,
“এই লাভ বার্ডস! শপিং শেষ করতে হবে জলদি। এখানেই থাকবি তোরা? তাহলে বল এখানেই বিয়ে দিয়ে দিই?”
আমি চমকে উঠলাম।রুদ্র দাঁত চেপে বলল,
“একদিন না একদিন এইটাকে আমি,,,”
আমি হেসে ফেললাম। রুদ্র আমার হাত ছেড়ে দিয়ে বলল,
“চল, শাড়িটা বিল করি।”
আমি মাথা নেড়ে তার পাশে হাঁটতে লাগলাম। আমি রুদ্রের দিকে তাকালাম। এত ভালো লাগা কাজ করে লোকটার প্রতি, মনে হয় যেন সবসময় সামনে বসিয়ে রাখি লোকটাকে। লোকটা আমার উপরে কারো দৃষ্টিও সহ্য করতে পারে না। আমি প্রাণভরে শ্বাস নিলাম।
মনে হচ্ছে, এই এক মেঘলা দিনের গল্পটা ধীরে ধীরে রঙিন হয়ে উঠছে। তবে এই সুন্দর মেঘলা দিনে আবার ঝড়ের আবির্ভাব হবে না তো?
#চলবে

