এক_মেঘলা_দিনে #পর্ব_১৬

0
2

#এক_মেঘলা_দিনে
#পর্ব_১৬
#আনিকা_আফসা

এক শুভ্র সকাল। লাচ্ছির একেরপর এক ডাকে আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলাম। চোখ মুখ বুজে রইলাম কিছুক্ষণ। মুচকি হেঁসে লাচ্ছির দিকে চাইতেই ভ্রু কুঁচকে এলো। লাচ্ছির গাঁয়ে ফোঁটা ফোঁটা লাল রঙ কে ফেলেছে? দেখতে রক্তের মতো লাগছে। আমি বিছানা থেকে নেমে লাচ্ছির দিকে এগোতে নিলেই ও ছুটলো কোথাও। আমিও ছুটলাম ওর পিছুপিছু আর বলতে লাগলাম,

“লাচ্ছি দাঁড়া, এই শোন তো। গাঁয়ে কি লেপ্টে আছে তোর?”

কিন্তু মহাশয় আমাকে কোনো পাত্তা দিলোই না। নিজের মতো ছুটতে লাগলো কোথাও। আমি কত ডাকলাম কিন্তু কোনো সাড়া দিলো না। আশেপাশে কিটিকে নজরে আসছে না। দুটোই তো একসাথে থাকে। লাচ্ছির পিছনে হাঁটতে হাঁটতে গার্ডেন এরিয়ায় চলে এসেছি বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে। হঠাৎ আমার কদম থমকে গেল। চোখ ফেটে বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। সামনের দৃশ্য দেখে রুহু কেঁপে উঠলো আমার। লাচ্ছি ম্যাও ম্যাও করতে করতে সামনে গাছের নিচে পড়ে থাকা কিটির নিথর দেহের পাশে দাঁড়ালো। আমি চিৎকার দিয়ে উঠলাম,

“কিটিইইইইই”

_____________

মায়ের বুকে মুখ গুঁজে কাঁদছি। এখনো সেই গার্ডেনেই দাঁড়িয়ে। সামনে রুদ্র কিটিকে দেখছে তো একবার আমাকে দেখছে। আপু অসহায় চোখে চেয়ে আছে। আমার চিৎকার শুনে সবাই এসেছে।

ছোটবেলা থেকেই বিড়ালদের প্রতি এক আলাদা ভালোবাসা আছে আমার। অন্য কোনো রাস্তার বিড়াল বিপদে পড়লেও মায়া অনুভব করতাম , তাদের সাহায্য করতাম। সেই জায়গায় নিজের বিড়ালের সাথে এমন হওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। কেউ অনাবরত ছুরি দিয়ে আঘাত করেছে , কুপিয়ে মেরেছে আমার কিটিকে। সুন্দর ফকফকে সাদা পশমগুলো এখন আর সাদা নেই, তরল রক্তে লাল হয়ে গেছে। মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

“মা , বাসায় চল। এখানে থাকার দরকার নেই।”

আমি মাথা নেড়ে কেঁদে বললাম,”আমার কিটিকে ছাড়া যাবো না। ওর এই অবস্থা কে করলো? কালকেও কি সুন্দর খেললো আমার সাথে, আমি ওকে আদর করলাম কতো আর আজ,,

এই বলে আবারো কেঁদে উঠলাম। রুদ্র কাউকে একটা ফোন করলো। তারপর আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলল,

“কাঁদিস না আনি, ওর আয়ু এই পর্যন্তই। কাঁদিস না প্লিজ। চল বাসায় চল। কিটিকে কবর দেয়ার ব্যবস্থা করেছি, তখন আবার আসিস।”

আমি কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়লাম অর্থাৎ আমি যাবো না। রুদ্র হতাশ শ্বাস ফেলে আম্মুকে বললো,

“আন্টি আপনি ছাড়ুন আমি দেখছি।”

আম্মু ছেড়ে দিলো আমায়। রুদ্র আমার কনুই টেনে উঠালো , তারপর আমার কোমর পেঁচিয়ে ধরে কোলে তুলে নিয়ে গেল আমায় সেখান থেকে। অন্যসময় হলে পরিবারের মাঝে এমন করায় আমি লজ্জা পেতাম কিন্তু আজ আমার নিজেকে অনুভূতিহীন লাগছে। আমি রুদ্রের বুকে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগলাম। রুদ্র আমার ঘরে এনে আমাকে বেডে যখন বসালো তখন চোখ খুললাম। চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। রুদ্র আমাকে বেডে বসিয়ে নিজে আমার সামনে হাঁটু গেড়ে ফ্লোরে বসে আমার কোলে থাকা দুই হাত আঁকড়ে বলল,

“কাঁদিস না সুইটহার্ট। ডেথ ইজ কমন টু অল”

আমি মাথা নাড়ালাম তারপর ভাঙ্গা গলায় বললাম,

“আমি জানি রুদ্র । কিন্তু এটা সাধারণ মৃত্যু হলে এতোটা কষ্ট লাগতো না, যতটা এখন লাগছে। কেউ আমার কিটিকে কুপিয়ে মেরেছে রুদ্র। কিভাবে পারে মানুষ এতোটা পাষাণ হতে?”

আমি শ্বাস নিলাম চোখ বন্ধ করে। তারপর আবার চোখ খুলে ছলছল চোখে রুদ্রের দিকে তাকিয়ে বললাম,

“ওটা আপনার দেয়া ভালোবাসার প্রথম উপহার ছিল রুদ্র। অল্প দিনেই অনেক মায়ায় পড়ে গেছিলাম। আমার লাচ্ছির সাথেও অনেক ভালো বন্ডিং হয়ে গেছিল। দুজন দুজনকে ছাড়া বুঝতো না। এখন আমার লাচ্ছি খেলবে কার সাথে? আমার ভিষণ কষ্ট হচ্ছে রুদ্র। ভিষণ কষ্ট হচ্ছে।”

এই বলে আবারো ফুঁপিয়ে উঠলাম। রুদ্র দুই হাত আমার কানের সাথে চেপে ধরে দুই হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে আমার দুই চোখের গড়িয়ে পড়া পানি মুছে দিয়ে বলল,

“কাঁদিস না সুইটহার্ট। আমি বিদেশে গেলে তোর জন্য আরো অনেকগুলো বিড়াল নিয়ে আসবো”

আমি কান্নারত অবস্থায় চোখ ফ্লোরে রেখে মাথা নেড়ে বললাম,

“কারো জায়গা অন্য কেউ নিতে পারে না রুদ্র। আমার অন্য কোনো বিড়াল লাগবে না। আর আপনিও আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবেন না। বিদেশে তো দূরের কথা, আমায় ছেড়ে এই বাড়ির গন্ডীও আপনাকে পার হতে দেবো না আমি।”

রুদ্র আমার মাথা ঝুঁকিয়ে কপালে চুমু খেলেন এবং বললেন,

“ঠিক আছে, যাবোনা তোকে ছাড়া।”

আমি রুদ্রের গলা জড়িয়ে ধরলাম। রুদ্র সেভাবেই উঠে বিছানায় এলো তারপর লম্বা হয়ে শুয়ে আমাকে টান দিয়ে তার বুকের উপর শুইয়ে দিলো। আমিও চুপচাপ পড়ে রইলাম রুদ্রের বুকে। কিছু ভালো লাগছে না। দুজনই চুপচাপ শুয়ে আছি এবং আমাদের ভাবনাও এক। কে মারলো কিটিকে?

*****

“অয়ন?”

অয়ন মাথার ক্যাপে হাত দিয়ে ঠিকঠাক করে বলল,

“জ্বি আঙ্কেল!”

আমার বাবা উপর থেকে নিচ পর্যবেক্ষণ করলেন অয়নকে। মুখে মাস্ক ও মাথায় ক্যাপ। আমার বাবা জিজ্ঞেস করলেন,

“তা হঠাৎ আমার অফিসে এসে এতো জরুরি তলব করলে যে?”

অয়ন আমার বাবার মুখোমুখি সোফায় বসলো এবং বলল,

“আমি আঁকাবাঁকা লাইন বলে শব্দের অপচয় করিনা। যা বলি সোজাসুজি বলি। আপনার সাথে আমার অনেক কথা আছে আঙ্কেল। আর সবথেকে বড় কথা হলো আমি আপনার ছোট মেয়েকে ভালোবাসি এবং বিয়ে করতে চাই।”

আমার বাবা অবাক হলেন খানিক। অয়নের সাথে এই প্রথম সাক্ষাৎ তার। প্রথম সাক্ষাৎ-এ এমন কথা একটু অবাকেরই বিষয়। আমার বাবা স্পষ্ট বললেন,

“কিন্তু আমার মেয়ের বিয়ে আমি ঠিক করে ফেলেছি ।”

অয়ন হালকা হাসলো এবং বলল,”জানি আর জানি বলেই আপনাকে সতর্ক করতে এসেছি।”

আমার বাবা ভ্রু কুঁচকে বললেন,”কিসের সতর্কতা?”

অয়ন ক্রুর হেঁসে বলল,

“প্রথমত আপনি যাকে জামাতা করতে চাইছেন সে সেটার যোগ্য-ই না। রুদ্র আফতাব চৌধুরী সম্পর্কে আমার কাছে একটা মসলাদার খবর আছে। আপনার মেয়ে তাকে পাগলের মতো ভালোবাসে, অথচ সে শুধুমাত্র টাইমস্পেন্ড করছে।”

আমার বাবা ভ্রু কুঁচকে বলল,”মানে?”

অয়ন বলল,”আপনি তো অনেক বোকা আঙ্কেল। যাকে মেয়ের জামাই বানাবেন তার সম্পর্কে একটু খবর রাখা তো জরুরি তাইনা? সমস্যা নেই যেহেতু আমি আনিকে ভালোবাসি, ওর জীবন নষ্ট হতে কিছুতেই দিতে পারি না, তাই আমিই আপনাকে বলছি আসল খবর।”

অয়ন থামলো এবং আবারো বলল,

“রুদ্র আফতাব চৌধুরী নারীদের টিস্যুর মতো ইউজ করে তারপর ফেলে দেয়। বিদেশে ওর অনেক গার্লফ্রেন্ড আছে। গার্লফ্রেন্ড বোঝেন তো? এর বাংলা অর্থ প্রেমিকা। আর আপনার নিশ্চয়ই ধারণা আছে এই প্রেম কতদূর পর্যন্ত যায়? রুদ্রের এমন নারীসঙ্গের কথা আরো অহরহ আছে। রাতে নাইট ক্লাব, পার্টি , ড্রিংকস এসব ছাড়া চলে না। এখন আনির মন জয় করতে ভালো সেজে থাকে, আসলেও কিন্তু অতটা ও ভালো না ও আঙ্কেল। আমি জানি আপনার আমার মুখের কথা বিশ্বাস হবে না, কারণ সত্য সবসময় অবিশ্বাস্য কিন্তু আসলে ওটা সত্য। একটা কথা আছে না? সত্য তেতো হলেও সত্য ? তেমনই। আমার কাছে আমার কথা প্রমাণের জন্য প্রমাণ আছে”

আমার বাবা ভ্রু কুঁচকে বললেন,”কিসের প্রমাণ?”

অয়ন পকেট থেকে ফোন বের করলো এবং কিছু একটা বের করে আমার বাবার মুখের সামনে ধরতেই বাবা চোখ সরিয়ে নিলো। রুদ্রের অন্য মেয়ের সাথে একটা ঘনিষ্ঠ ছবি দেখিয়েছে অয়ন। অয়ন মোবাইল সরিয়ে নিলো এবং বলল,

“দুঃখিত আঙ্কেল, আমি আপনাকে এমন ছবি দেখাতে চাইনি। কিন্তু আমি বাধ্য হলাম নয়তো আনির জীবনটা আপনার অজান্তেই নষ্ট হয়ে যেত , এমন লম্পট ও মেয়েবাজ লোকের পাল্লায় পড়ে।”

আমার বাবা কপাল কুঁচকে বললেন,

“রুদ্র ছেলেটা এতোটা খারাপ? সত্যিই জানা ছিল না। এখন আমার কি করা উচিৎ? ”

অয়ন বললো,”কি আর করবেন? এমন মেয়েবাজ লোকের সাথে নিশ্চয়ই মেয়ের বিয়ে দেবেন না। তো বিয়েটা ভেঙ্গে দিন। আমি আনিকে সত্যিই অনেক ভালবাসি আঙ্কেল। আমার ওমন খারাপ রেকর্ডও নেই। আপনি চাইলে আমি আনিকে বিয়ে করতে পারি। কথা দিচ্ছি রানির মতো রাখবো, সুখের চাদরে মুড়িয়ে রাখবো।”

আমার বাবা কপাল কুঁচকে থেকেই মাথা নাড়লেন এবং বললেন,

“বুঝলাম।”

অয়ন বাঁকা হাঁসলো। আমার বাবা হঠাৎ অয়নের দিকে তাকিয়ে বলল,

“শোনো অয়ন, আমি এটাই বুঝলাম যে রাগ ও হিংসা মানুষের অধঃপতনের কারণ। তাই আমাদের এসব থেকে দূরে থাকতে হবে। এসবের কারণে আমরা অনেক ভুল পথে হাঁটি। আমাদের ওসব এড়িয়ে চলতে হবে। নয়তো একদিন এগুলো আমাদের ধ্বংস ডেকে আনবে।”

অয়ন ভ্রু কুঁচকে বলল,”মানে।”

আমার বাবা বললেন,”মানে তোমার কি মনে হয়? আরফান মির্জা কাঁচা খেলোয়াড়? নামে ব্যবসায়ী হই নি অয়ন। লাভ ও ক্ষতি দু’টোর সাথে মোকাবেলা করেই এতদূর এসেছি। আমি জানি কে আমার বন্ধু এবং কে নয়। আরফান মির্জা একজনকে জামাই বানাবে তার সম্পর্কে না জেনেই। আনিকা যেমন আমার কন্যা, তেমন রুদ্রও আমার সন্তান। ওকে আমি সেই ছোটবেলা থেকেই চিনি, ওর বাবার সাথেও আমার বেশ পুরনো সম্পর্ক। তাই সেই হিসেবে নিজের ছেলেকে চিনবো না আমি? আর যদি খোঁজ নেয়ার কথার বলো তো বলবো, ওর প্রতি সেকেন্ডের খোঁজ খবর আমি রাখি। ওকে আজ আমি জামাতার চোখে দেখিনি , সাত বছর পূর্বের পরিকল্পনা এটা। তখন থেকে এখন পর্যন্ত, ওর বিদেশে থাকা সময় পর্যন্ত ওর খবর আমার আছে। আর আমি জানি রুদ্র আমার মেয়েকে ভালোবাসে। আশা করি তোমার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছ। আমি এই বিয়ে ভাঙছি না, কোনো মিথ্যা বিষয়ে তো একদমই না।”

অয়ন ফোন দেখিয়ে বলল,”কিন্তু এই ছবি? ছবিটা কি মিথ্যা বলছে?”

আমার বাবা হাত উঁচিয়ে থামালেন অয়নকে এবং বললেন,
“যেই ছবিটা নিজেই মিথ্যা সে আর কি সত্য বলবে? আমি আরফান মির্জা। আমার নজর এত তীক্ষ্ণ যে তুমি ভাবতে পারবে না। কোনটা আসল , কোনটা নকল দেখলেই বলতে পারি।”

অয়ন আরো কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে নিলো তবে তার আগে আমার বাবা বললেন,

“অনেক বলেছো অয়ন, আমার অনেক সময় অপচয় করেছো। এখন কি তুমি নিজে যাবে? নাকি গার্ডস্-দের ডেকে রাস্তা চেনাতে হবে তোমায়? আর আমার মেয়ের থেকে দূরে থাকো। ছায়াও যাতে না পড়ে তোমার।”

এই বলে আমার বাবা উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন,

“নিজের ভেতরের হিংসা ও রাগকে কন্ট্রোল করতে শেখো নয়তো বিপদে পড়বে।”

এই বলে বাবা চলে গেলেন। অয়ন তাকিয়ে রইলো তার যাওয়ার দিকে। আস্তে আস্তে মুখের চোয়াল শক্ত হলো। হাত মুঠ করে সজোরে ঘুষি মারলো টেবিলে। হাত ফেটে রক্ত বের হলো কাঁচের টেবিলের কোণা লেগে। হাত মুঠ করে সেই রক্ত বের করলো অয়ন। এই আঘাতের থেকেও বেশি তাকে অপমান করায় আঘাত পেয়েছে অয়ন। মাথার রাগ হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো । রক্তিম চোখ নিয়ে ভাবলো কিছু, তারপর এক হাঁসি দিয়ে উঠে চলে গেলো সেখান থেকে।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here