#এক_মেঘলা_দিনে
#পর্ব_২৩
#আনিকা_আফসা
অন্ধকার ও স্যাঁতস্যাঁতে এক পরিবেশ। জেলের ভেতরের পরিবেশটা যেন এক অদৃশ্য ভারে চাপা। চারপাশে উঁচু ধূসর দেয়াল, দেয়ালের গায়ে সময়ের দাগ স্পষ্ট। লোহার মোটা শিকগুলোতে জমে আছে পুরোনো মরিচা, যেন বহু মানুষের দীর্ঘশ্বাস সেখানে আটকে আছে বছরের পর বছর। করিডোর জুড়ে ভেসে আসে ভারী বুটের শব্দ, মাঝে মাঝে শোনা যায় চাবির ঝনঝন আওয়াজ।
ভেতরের বাতাসে একধরনের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, পুরোনো দেয়াল, বন্ধ কক্ষ আর অব্যক্ত কষ্টের মিশ্রণ। ছোট ছোট কক্ষে মলিন আলো ঢোকে সরু জানালা দিয়ে। কোথাও কেউ চুপচাপ বসে আছে মাথা নিচু করে, কেউ দূরে তাকিয়ে আছে মুক্ত আকাশের আশায়।
সেখানে এক পুরোনো বেঞ্চির উপর বসে আছে রুদ্র। এখানে সে একা। মুখ মলিন ও চোখে উদাসীনতা। চোখের নিচে কালো হয়ে আছে যেন কত রাত ঘুমানো হয় নি। ঠোঁটে কাঁটা দাগ। এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বুক থেকে। তখনই কানে এলো এক পরিচিত কন্ঠের ডাক,
“রুদ্র।”
রুদ্র মাথা তুলে তাকাতেই দেখতে পেল নিহানকে। অপরাধী চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তাকে দেখতেই চোখ চকচক করে উঠলো রুদ্রের। দ্রুত উঠে জেলের শিকের কাছে দাঁড়ালো। দু হাতে দুটো শিক ধরে বলল,
“নিহান! তুই? ”
নিহান রুদ্রের মুখের অবস্থা দেখে করুণ চোখে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। চোখে জল চলে এলো বন্ধুর এমন দশা দেখে। কোনো উত্তর দিলো না রুদ্রের প্রশ্নের। রুদ্র তা দেখে আরো উতলা হয়ে বলল,
“নিহান, তুই সত্যি এসেছিস? কথা বলছিস না যে? তুইও কি সবার মতো আমাকে খুনী ভাবছিস?
নিহান দ্রুত মাথা নাড়ালো। চোখের কোণে জমে থাকা জলটা আড়াল করার চেষ্টা করে ভারী গলায় বলল,
“চুপ কর রুদ্র। তোকে আমি চিনি। তুই এমন কাজ করতে পারিস না।”
রুদ্রের বুকটা যেন হালকা কেঁপে উঠলো। এতদিন পর কেউ অন্তত তাকে বিশ্বাস করেছে। শিক শক্ত করে ধরে নিচু স্বরে বলল,
“বিশ্বাস কর নিহান, আমি কাউকে মারিনি। আমি জানি না কীভাবে সবকিছু এমন হয়ে গেল। সবাই শুধু আমার দিকেই আঙুল তুলছে।”
নিহান কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো। জেলের মলিন আলোয় বন্ধুর ভাঙা চেহারাটা তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠাচ্ছিল। যে ছেলেটা সবসময় শক্ত থেকেছে, আজ সে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত।
“আমি সব জানার চেষ্টা করছি রুদ্র। কিন্তু পরিস্থিতি খুব খারাপ। বাইরে সবাই তোকে দোষী ভাবছে।”
রুদ্র তিক্ত হেসে মাথা নিচু করলো এবং বলল,
“ভাববেই তো। প্রমাণ সব আমার বিরুদ্ধে।”
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর হঠাৎ ব্যাকুল হয়ে বলল,
“আনি কেমন আছে?”
প্রশ্নটা শুনতেই নিহান থমকে গেল। চোখ নামিয়ে নিলো সে। এই কয়দিনে আনির অবস্থা যে কতটা খারাপ হয়েছে, সেটা ভাষায় বোঝানো কঠিন।
রুদ্র উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলো।
“কি হয়েছে? ও ঠিক আছে তো? নিহান, কথা বল!”
নিহান ধীরে ধীরে বলল,
“শারীরিকভাবে ঠিক আছে,, কিন্তু মানসিকভাবে পুরো ভেঙে পড়েছে।”
রুদ্রের চোখ ছলছল করে উঠলো। ঠোঁট কেঁপে উঠলো অসহায়ভাবে ,
” ও আমাকে ঘৃণা করে তাইনা?”
“ঘৃণা?”
নিহান অবাক হয়ে তাকালো এবং বলল,
“আনি এখনও তোকে বিশ্বাস করতে চায় রুদ্র। কিন্তু চারপাশের পরিস্থিতি ওকে দুর্বল করে দিচ্ছে।”
রুদ্র নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করলো। বুকের ভেতরটা কেমন শূন্য লাগছে তার। নিহান মাথা নিচু করে বলল,
“আরেকটা কথা। ”
“কি?”
নিহান এক দম নিলো, তারপর মনে সাহস সঞ্চয় করে বলল,
“আনির অয়নের সাথে কাল বিয়ে, আজ ওদের গায়ে হলুদ ছিলো।”
কথাটা শুনতেই রুদ্রের ভাঁজ করা কপাল মসৃণ হয়ে গেলো। কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ হয়ে রইলো রুদ্র।
তারপর ধীরে ধীরে তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। চোখের ভেতরের অসহায়ত্বটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। বদলে সেখানে জমলো দমচাপা আগুন। শিক ধরে থাকা হাতের চাপ এতটাই বেড়ে গেল যে আঙুলের গাঁট সাদা হয়ে উঠলো।
“কাল বিয়ে?”
গলাটা অস্বাভাবিক ঠান্ডা শোনালো তার। নিহান বুঝতে পারলো, ঝড় হয়তো শুরু হয়ে গেছে।
রুদ্র ধীরে মাথা নিচু করে হাসলো। তবে সেই হাসিতে কোনো কষ্ট ছিল না, ছিল তীব্র বিদ্রুপ।
“বাহ। আমি এখানে পচে মরছি আর ওই অয়ন সুযোগ বুঝে বিয়ের পিঁড়িতে বসে গেছে?”
নিহান কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। রুদ্র এবার সরাসরি তাকালো তার দিকে। চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে রাগে । সেই রাগ নিয়েই দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আনি রাজি হয়েছে?”
নিহান বললো,
“আনি রাজি না , তবে আশেপাশের পরিস্থিতি ওকে তা মানতে বাধ্য করছে। বিশেষ করে ওর মা এই বিয়েতে চাপ দিচ্ছে ওকে।”
রুদ্র দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আমি বেঁচে থাকতে অয়ন আনিকে বিয়ে করবে, এত বড় সাহস ওর হলো কীভাবে?”
এই বলে শিকে এক প্রবল ঘুষি দিলো। রাগে চোয়াল কটমট করছে।
নিহান দ্রুত বলল,
“রুদ্র শান্ত হ,,,”
“শান্ত?”
রুদ্র তীক্ষ্ণ হেসে উঠলো এবং বলল,
“সবাই আমাকে শেষ ভাবছে তাই না? কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস নিহান, রুদ্র এখনও মরে যায়নি।”
তার চোখে তখন এমন এক দহন, যেটা দেখে নিহানের বুক কেঁপে উঠলো। রুদ্র ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে আবার শিক ধরলো। নিচু কিন্তু ভয়ংকর গলায় বলল,
“যে আমাকে ফাঁসিয়েছে, তাকে আমি খুঁজে বের করবো। আর অয়ন,,”
সে থামলো। ঠোঁটের কোণে বিপজ্জনক হাসি ফুটে উঠলো।
“ওকে বলে দিস, আনিকার গায়ে হাত দেওয়ার আগে যেন নিজের কবরটা দেখে নেয়।”
রুদ্র থেমে আবার বলল,”আমাকে যে ফাঁসিয়েছে তার সাথে অয়ন ঐ ব্লাডি বিস্ট এর সম্পর্ক যে আছে তা আমি নিশ্চিত। আর এখন আনিকে বিয়ে করে আমার থেকে আনিকে আলাদা করতে চাইছে? এটা তো হবার নয়। ”
রুদ্র নিহানের উদ্দেশ্যে বলল,”যত দ্রুত আমাকে এইখান থেকে বের কর নিহান। আনিকে আমার বোঝাতে হবে যে আমি ওর বাবাকে মারি নি। এগুলো সব হয়তো অয়নের কারসাজি।”
নিহান ধীরে বলল,
“আমিও এখন অয়নকে সন্দেহ করছি রুদ্র। সবকিছু খুব অদ্ভুত লাগছে। তোর বিরুদ্ধে প্রমাণগুলোও যেন খুব পরিকল্পনা করে সাজানো।”
রুদ্র ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সামনে। মাথার ভেতর যেন একটার পর একটা জিনিস মিলতে শুরু করেছে।
“আমি সেদিন অয়নের চোখ দেখেছিলাম নিহান। মানুষ রাগ লুকাতে পারে, হিংসা লুকাতে পারে,, কিন্তু লোভ? সেটা না।”
সে দাঁত চেপে আবার বলল,
“ও অনেক আগে থেকেই আনিকে চাইতো। আর এখন সুযোগ পেয়েছে। আমাকে সরিয়ে দিয়ে হিরো সাজার চেষ্টা করছে।”
নিহান উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“কিন্তু এখন সমস্যা হলো, কাল বিয়ে। সময় খুব কম।”
রুদ্র শিক ছেড়ে পিছিয়ে গেল। চোখে তখন তীব্র জেদ।
“আমি এই জেলের ভেতরে বসে নিজের ভালোবাসাকে অন্য কারও হতে দিবো না। যেভাবেই হোক, কালকের আগেই আমি বের হবো।”
নিহান হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো এবং বলল,
“তুই কি পাগল হয়ে গেছিস? এটা জেল রুদ্র!”
রুদ্র তীক্ষ্ণ হেসে বলল,
“ভালোবাসার মানুষকে হারানোর ভয় মানুষকে পাগল না, ভয়ংকর বানায়।”
তারপর সে একদৃষ্টিতে নিহানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুই শুধু একটা কাজ কর। যেকোনোভাবে আজ রাতের মধ্যে জামিনের ব্যবস্থা করতে হবে।”
নিহান ধীরে বলল,
“আর যদি জামিন না হয়?”
রুদ্রের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো এবং বলল,
“তাহলে এই জেলের দরজা ভেঙে বের হতে আমার এক সেকেন্ডও লাগবে না।”
**********
আশেপাশে হলুদের তোড়জোড় শেষ হয়ে গেছে। মেহমানরা চলে গিয়েছে। মানুষ কম এখানটায়। অয়ন সারাদিনে মোবাইল চেক করার সময় পায়নি। তাই খুললো অবশেষে ফোন এবং মোবাইল খুলতেই দেখলো তৃষার হাজারো কল ও মেসেজ। অয়ন বিরক্তির শ্বাস ফেললো। তখনই নজর পড়লো তৃষার লাস্ট মেসেজে। মেসেজে লেখা আছে:-
” ছাদে এসো এক্ষুনি নয়তো তোমার সব পর্দা ফাঁস করতে আমার দু মিনিটও লাগবে না।”
মেসেজটা এসেছে ৫ মিনিট আগে। অয়ন ক্রুর হাসলো। আশেপাশে তাকিয়ে খুঁজলো কাউকে। ওয়েটারকে দেখতেই ডাক দিলো সে। ওয়েটার কাছে আসতেই তার হাতের ট্রে এর উপর থেকে একটা জুস নিয়ে পাঠিয়ে দিলো তাকে। সবার আড়ালে কিছু মিশিয়ে দিলো। তারপর রওনা হলো ছাদের উদ্দেশ্যে।
#চলবে

