এক_মেঘলা_দিনে #পর্ব_২২

0
1

#এক_মেঘলা_দিনে
#পর্ব_২২
#আনিকা_আফসা

আশেপাশে গায়ে হলুদের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। আনিশা মনমরা হয়ে কিছু কাপড় ভাঁজ করছিলো। পাশে বসে কেয়া খেলছে তার খেলনা নিয়ে। তখনই নিহান প্রবেশ করলো, অফিসে চাপ এখন তাই কাল বাড়ি ফিরতে পারে নি সে। মাত্র ফিরলো তাই। এতো তোড়জোড় দেখে আনিশাকে জিজ্ঞেস করলো,

“এত আয়োজন কিসের? ”

আনিশা চমকে পিছু ফিরে বলল,”আরে তুমি? কখন এলে?”

নিহান বললো,”এইতো মাত্র। এখন বল এত আয়োজন কিসের?”

আনিশা একবার মেয়ের দিকে তাকালো। তারপর তাকে বলল,

“কেয়া!! মামণি একটু নানুর কাছে যাও তো। নানু তোমাকে ডাকছে।”

কেয়া মাথা নেড়ে তার পুতুল নিয়ে দৌড় দিলো। নিহানের দিকে তাকিয়ে অতঃপর বলল,

“গায়ে হলুদের জন্য আয়োজন করা হচ্ছে।”

নিহান ভ্রু কুঁচকে বলল,”গায়ে হলুদ? কার? বাবা তিনদিন হলো গত হয়েছে আর আজ এসব কি? কার গায়ে হলুদ?”

আনিশা থমথমে মুখে বলল,”আনির।”

নিহান বললো,”কিহ্? আনির? মানে কি? ও এখন বিয়ে করছে? এত তাড়াতাড়ি?”

আনিশা আবার নিজের কাজে মনোযোগী হয়ে বলল,”হুম, একদিন না একদিন তো করতেই হতো। তাই আজ গায়ে হলুদ এবং কাল বিয়ে।”

নিহান উতলা হয়ে বলল,”কিন্তু ও তো রুদ্রকে ভালোবাসে।”

রুদ্রর নাম শুনতেই আনিশা চোখ খিচে বন্ধ করলো। তারপর চোখ খুলে পিছনে ফিরে বলল,

“ভালোবাসতো। এখন না। আর নিশ্চয়ই কেউ তার বাবার খুনিকে ভালোবাসবে না।”

নিহান বলল,”তোর আদৌও মনে হয় রুদ্র এসব করেছে।”

আনিশা বললো,”আমার মনে হওয়া না হওয়ায় কিছু যায় আসে না নিহান। সবটা সবার সামনে পরিষ্কার। ”

নিহান আনিশাকে ধরে বলল,”কিন্তু এমনও তো হতে পারে কেউ ওকে ফাসানোর চেষ্টা করছে। ”

আনিশা নিহানের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে বলল,”সব পরিষ্কার নিহান। আমার বোন নিজের চোখে দেখেছে। আর রুদ্রের কথা বলছো তুমি? ও আমার বাবাকে মেরে ফেলেছে কারণ বাবা ওকে আনির সাথে বিয়ে দিবে না এইজন্য। এই সামান্য কারণের জন্য। আর তুমি ঐ ক্রিমিনালের সাইড নিচ্ছো? আর তারউপর ও অনেক অনৈতিক কাজের সাথেও জড়িত।”

নিহান বলল,”আমি রুদ্রকে চিনি। আমার মনে হয় না ও এসবের সাথে জড়িত। আর কে বলেছে এসব বানোয়াট কথা?”

আনিশা বলল,”অয়ন বলেছে। পুলিশ তদন্ত করে ওকে জানিয়েছে।”

নিহান ভ্রু কুঁচকে বলল,”কিন্তু পুলিশ বাড়িতে না জানিয়ে ওকে কেন জানাবে?”

আনিশা থমকে গেলো। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
“অয়ন বলেছে ওর পরিচিত একজন অফিসার আছে। তার থেকেই জেনেছে।”

নিহান ধীরে ধীরে মাথা নাড়লো। মুখটা কেমন গম্ভীর হয়ে উঠেছে তার।

“তোর কিছু অদ্ভুত লাগছে না আনিশা?”

“মানে?”

“সবকিছু খুব দ্রুত হচ্ছে। আঙ্কেলের মৃত্যু, রুদ্রের জেলে যাওয়া, তারপর হঠাৎ বিয়ের সিদ্ধান্ত,,,,আর মাঝখানে সবকিছুতেই অয়নের উপস্থিতি।”

আনিশা বিরক্ত হয়ে বলল,
“তুমি কি বলতে চাইছো?”

নিহান দীর্ঘশ্বাস ফেললো এবং বলল,

“আমি কিছু বলতে চাইছি না। শুধু বলছি, পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে স্বাভাবিক লাগছে না।”

আনিশা কাপড় ভাঁজ করতে করতে বলল,
“তুমি বেশি ভাবছো।”

“না, আমি বাস্তব ভাবছি। আনি এখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে আছে। এই অবস্থায় ওর বিয়ে দেওয়া ঠিক হচ্ছে?”

আনিশা এবার কিছুটা চুপ হয়ে গেলো। কারণ সত্যি বলতে সেও বুঝতে পারছে না সবকিছু ঠিক হচ্ছে কিনা। কিন্তু মায়ের অবস্থা দেখে কিছু বলতেও পারছে না।

নিহান আবার বলল,
“আর একটা কথা, আনি কি এই বিয়েতে রাজি?”

আনিশা ধীরে বলল,
“পুরোপুরি না। কিন্তু মা চাচ্ছে।”

“মা চাচ্ছে বলেই কি জোর করে বিয়ে দিবি?”

আনিশা বিরক্ত হয়ে বলল,
“তাহলে কি করবো? মা এখন শুধু ভয় পাচ্ছে। উনার মনে হচ্ছে রুদ্র বের হয়ে এলে আবার সমস্যা করবে।”

নিহান তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো।

“আর সেই ভয়টা অয়ন খুব সুন্দরভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিয়েটাও কি অয়নের সাথেই হচ্ছে?”

আনিশা এবার চুপচাপ নিহানের দিকে তাকালো।

নিহান ধীরে ধীরে বলল,
“তাইনা? অয়নের সাথেই হচ্ছে? ”

ঠিক তখনই বাইরে থেকে হাসির শব্দ ভেসে এলো। কয়েকজন মহিলা গায়ে হলুদের জিনিস নিয়ে উঠানে ঢুকছে।

পুরো বাড়িটা সাজানো হচ্ছে, অথচ বাড়ির ভেতরে যেন শোক আর অস্বস্তির ছায়া জমে আছে।

আনিশার দুই বাহু ধরে নিহান বলল,

“কোথাও খুব বড় একটা ঘাপলা আছে। আর এখন সেই ঘাপলা ঠিক করতে হবে।”

আনিশা বলল,”কি করতে চাইছো।”

নিহান বলল,”জানিনা কি করবো কিন্তু কোথাও খুব বড় একটা ভুল হচ্ছে তা বুঝতে পারছি। এমনও তো হতে পারে রুদ্র খুন করেনি। তাকে ফাঁসানো হচ্ছে এবং খুনী আমাদের মাঝেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। দু- দুটো জীবন নষ্ট হওয়ার পথে আর তা আমাকে আটকাতে হবে। আমি আসছি ,নিজের খেয়াল রাখিস।”

আনিশা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। নিহানের কথাগুলো মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে বারবার। বুকের ভেতর অজানা একটা অস্বস্তি ধীরে ধীরে আরও গাঢ় হয়ে উঠছে।
নিহান আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। আনিশা পিছন থেকে ডাক দিতেও পারলো না। শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলো দরজার দিকে।
নিহান সোজা নিচে নেমে এলো। পুরো বাড়িটা মানুষের কোলাহলে ভরে গেছে। উঠানে কয়েকজন মহিলা হলুদের গান গাইছে। কেউ ফুল সাজাচ্ছে, কেউ রান্নাঘরে ব্যস্ত। অথচ এই বাড়িতেই কয়েকদিন আগে শোকের মাতম চলছিলো।

__________________

হলুদের জন্য সুন্দর করে স্টেজ সাজানো হয়েছে। আশেপাশে অনেক চেনাজানা আত্মীয় স্বজন। কিন্তু সবকিছুর ভিতরে নিজেকে কেমন অদ্ভুত লাগছে। একটা কলের পুতুলের মতো লাগছে, যার চাবি নাড়লেই সে চলা শুরু করে। গায়ে হলুদের শাড়ি ও গয়নাসমেত আমিটাকে আজ অচেনা ঠেকছে। পাশ থেকে সানভি ও আনিশা আপু আমাকে স্টেজের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমিও চুপচাপ পা চালাচ্ছি। কিছু যে করার নেই ।

হলুদের জন্য পুরো উঠানটা যেন রঙিন স্বপ্নে বদলে গেছে। চারপাশে গাঁদা আর রজনীগন্ধার মালা ঝুলছে। হলুদ আর সোনালি কাপড়ে সাজানো স্টেজটার চারপাশে ছোট ছোট ফেয়ারি লাইট জ্বলছে। হালকা বাতাসে ফুলের ঘ্রাণ মিশে এক অদ্ভুত মায়াময় পরিবেশ তৈরি করেছে।

আমাকে নিয়ে যখন স্টেজের সামনে আসা হলো, তখন কিছুটা থমকে দাঁড়ালাম। গায়ে হলুদের হলুদ শাড়িটা যেন আমাকে আরও কোমল করে তুলেছে। মাথাভর্তি গাজরা, কপালে ছোট্ট টিপ আর চোখেমুখে অদ্ভুত এক নীরবতা।

ঠিক তখনই স্টেজের ওপাশ থেকে অয়ন ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। সোনালি কাজ করা পাঞ্জাবিতে তাকে বেশ পরিপাটি লাগছে। মুখে হালকা হাসি, তবে চোখদুটো স্থির ছিল শুধু আমার দিকেই।

স্টেজে ওঠার আগে অয়ন নিজের হাতটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো। চারপাশের কোলাহলের মাঝেও মুহূর্তটা কেমন থেমে গেলো।

আমি কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ সেই হাতের দিকে তাকিয়ে রইলো। আশেপাশে সবাই তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। সানভি পাশে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে।

অয়ন নরম গলায় বলল,

“হাত ধর আনি।”

আমি ধীরে ধীরে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিলাম তার দিকে। অয়ন শক্ত করে নয়, খুব যত্ন করে হাতটা ধরলো। কিন্তু তাতেও অস্বস্তি লাগলো আমার।

চারপাশে সাথে সাথে হৈচৈ শুরু হয়ে গেলো।

“মাশাআল্লাহ!”
“কি সুন্দর লাগছে দুজনকে!”
“নজর না লাগে!”

কেউ ফুল ছিটিয়ে দিলো, কেউ আবার ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।

আমার মা চোখে জলসমেত এসে প্রথমে হলুদ ছোঁয়ালো আমার গালে। তারপর সেই হাতে যখন অয়নের দিকে লাগাতে যাবে আমার কেন যেন সহ্য হলো না। রুদ্রের দেয়া সেই আংটিটা চেপে ধরলাম শক্ত করে। চোখে আবারো জল চলে এলো। আমি আর থাকতে পারলাম না, দ্রুত উঠে চলে গেলাম দৌড়ে।

চারপাশ মুহূর্তেই থমকে গেলো। সবার হাসি, গানের শব্দ, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, সব যেন একসাথে স্তব্ধ হয়ে পড়লো। আমি দ্রুত স্টেজ থেকে নেমে দৌড়ে ভেতরের দিকে চলে এলাম। পেছন থেকে অনেকেই ডাকছিলো,
“আনি!” “কি হয়েছে?” “আরে কোথায় যাচ্ছে মেয়েটা?”

কিন্তু আমি কিছুই শুনলাম না। শুধু বুকের ভেতরটা কেমন চেপে আসছিলো। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিলো।
নিজের রুমে ঢুকেই দরজাটা লাগিয়ে দিলাম। তারপর ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়লাম। হাত কাঁপছে আমার। গালে লাগানো হলুদ হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঘষলাম উঠিয়ে ফেলতে। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে।আঙুলের ভেতর এখনও শক্ত করে ধরা রুদ্রের দেয়া আংটিটা।
মনে পড়ছে সেই দিনটা—
“এটা আমার ভালোবাসা,কখনো হাত থেকে এটা খুলবি না।”

রুদ্রের হাসিমাখা মুখটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠতেই বুকটা আরও মোচড় দিয়ে উঠলো এবং বললাম,
“তুমি সত্যিই এমন করতে পারো রুদ্র?”

নিজেকেই প্রশ্ন করলাম আমি। কিন্তু মন থেকে উত্তর এলো না। ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়লো।
“আনিকা, কি হয়েছে?দরজা খোল মা।”

মায়ের কণ্ঠ। আমি চোখ মুছে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।
বাইরে থেকে আবারও মা বললেন, “এভাবে সবাইকে ফেলে চলে আসিস না মা। মানুষ কি বলবে?”

আমি তিক্ত হেসে ফেললাম। মানুষ কি বলবে, এই একটা কথার জন্যই তো আজ আমার পুরো জীবনটাই বদলে যাচ্ছে। এই জন্যই তো জোর করে বিয়ে করাচ্ছে আমাকে। কোনো সাড়া দিলাম না, পড়ে রইলাম ওইভাবে।

কিছুক্ষণ পর আবার অন্য একটা কণ্ঠ ভেসে এলো।
অয়নের কন্ঠ । সে বলছে,

“আনি,প্লিজ দরজা খোল। তুই অস্বস্তি ফিল করলে আমরা অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিবো। কিন্তু দরজা খোল”

তার গলায় নরম ভাব থাকলেও কেন যেন আমার ভেতরটা আরও অস্থির হয়ে উঠলো। আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
বাইরে দাঁড়িয়ে অয়ন কিছুক্ষণ চুপ রইলো। তারপর ধীরে বলল,
“আমি তোকে জোর করছি না আনি। তুই এমন করছিস কেন? একটা খুনির জন্য? আমি তোকে সামলাতে চেষ্টা করছি আর তুই ঐ খুনিকে নিয়ে এখনও ভাবছিস? কেন স্বাভাবিক হতে পারছিস না?”

আমি চোখ বন্ধ করে দেয়ালে মাথা ঠেকালাম।
স্বাভাবিক? যে মেয়েটা কয়েকদিন আগে নিজের বাবাকে হারিয়েছে, যে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না তার ভালোবাসার মানুষটা খুনি কিনা, যে নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে, সে কিভাবে স্বাভাবিক হবে? অয়ন বলল,

“তোকে আমি কি বলছি তুই শুনছিস? দরজা খোল প্লিজ, মানুষ নানা কথা বলছে।”

আমি চোখ মুছলাম। নিজেকে ধাতস্থ করে উঠে দাঁড়ালাম। দরজা খুলতেই অয়নের মুখ দেখতে পেলাম। আর কেউ নেই, হয়তো বুঝিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। অয়ন বলল,
“এসব কি আনি? আমার পরিবারও এখানে আছে। তুই তাদের এভাবে অসম্মান না করালেও পারতি। আর তুই এগুলো কার জন্য করছিস? রুদ্রের জন্য? ও কিন্তু একটা,,”

আমি গর্জে উঠে বললাম,”জানি খুনি, বারবার মনে করানোর দরকার নেই। আর তোর এসব কথা একদম আমার ভালো লাগছে না। তোকে আমি বলিনি আমায় বিয়ে কর। আমার শান্তি চাই অয়ন, আমি আর হলুদ ছোঁয়াবো না। যা , এখান থেকে।”

অয়নের ভ্রু কুঁচকে এলো। সে বলল,

“ঠিক আছে। তোর যেতে হবে না। থাক তুই তোর রুদ্রকে নিয়ে। আন্টি অসম্মানিত হোক তাতে কি যায় আসে তোর?”

অয়নের কথা শুনে আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম। বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আছে। বাইরে এখনও গানের শব্দ ভেসে আসছে, অথচ আমার কাছে সবকিছু অসহ্য লাগছে।

আমি ধীরে বললাম,

“আমি আর নিচে যাবো না অয়ন। প্লিজ আমাকে একটু একা থাকতে দে।”

অয়ন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে এলো।

“এখন নিচে না গেলে সবাই কি ভাববে জানিস?”

আমি ক্লান্ত গলায় বললাম, “মানুষ কি ভাবলো তাতে আমার কিছু যায় আসে না।”

অয়ন এবার হালকা হেসে বলল, “কিন্তু আন্টির যায় আসে।”

আমি থমকে গেলাম। অয়ন সুযোগটা নিয়েই আবার বলল,

“নিচে সবাই প্রশ্ন করছে। আন্টি একা একা সবার সামনে দাঁড়িয়ে সামলাচ্ছে। উনি কতটা অপমানিত হচ্ছেন বুঝতে পারছিস?”

আমি ঠোঁট কামড়ে চুপ করে রইলাম। অয়ন এবার আরও নরম গলায় বলল,

“আঙ্কেল নেই এখন। এই অবস্থায় যদি তুইও এমন করিস তাহলে আন্টি ভেঙে পড়বে আনি।”

আমার চোখে পানি চলে এলো, মাথা চেপে ধরলাম এবং বললাম,

“আমি পারছি না অয়ন, সত্যি পারছি না।”

অয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমার একদম সামনে এসে দাঁড়ালো।

“তুই ভাবছিস শুধু তোরই কষ্ট হচ্ছে?”

আমি কিছু বললাম না। সে আবার বলল,

“সবকিছু সবার ইচ্ছেতে হয়না আনি। বুঝতে চেষ্টা কর এটা বাস্তব।

তার গলাটা কেমন ভারী শোনালো। অয়ন আবার বলল,

“আমি শুধু চাইছি তুই আর আন্টি একটু শান্তিতে থাকিস। সবাই তোকে নিয়ে কথা বলুক সেটা আমি চাই না।”

আমি চোখ নামিয়ে ফেললাম। ঠিক তখনই অয়ন ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে আমার মুখটা নিজের দিকে ফেরালো।

“একটু নিচে চল। শুধু কিছুক্ষণ। তারপর তুই চাইলে আবার রুমে চলে আসবি। প্রমিস।”

আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম। অয়ন বুঝতে পেরে এবার শেষ আঘাতটা করলো,

“নাকি তুই চাইছিস সবাই বলুক, মেয়েটা এখনও খুনির জন্য কাঁদছে?”

কথাটা শুনে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো আমার।
অয়ন নিচু গলায় বলল,

“আন্টিও এসব শুনবে। ভালো লাগবে উনার?”

আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। বারবার রুদ্রের কথা মনে পড়তে লাগলো। তাও বুকের উপর পাথর চাপা দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমি ধীরে বললাম,

“ঠিক আছে।”

অয়নের ঠোঁটে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠলো এবং বলল,

“গুড।”

তারপর সে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“চল?”

আমি কিছুক্ষণ সেই হাতের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কেন জানি হাতটা ধরতে ইচ্ছে করছিলো না। তবুও মায়ের কথা ভেবে ধীরে ধীরে হাত বাড়ালাম।
অয়ন হাতটা শক্ত করে ধরে ফেললো। এতটাই শক্ত,যে আমার অস্বস্তি লাগলো।

সে দরজা খুলে আমাকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা দু-একজন আত্মীয় সঙ্গে সঙ্গে তাকালো আমাদের দিকে।

অয়ন তখন হালকা হেসে বলল,

“দেখলেন? একটু শরীর খারাপ লাগছিলো ওর। এখন ঠিক আছে।”

আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। মাথা ভিষণ ভারী লাগছে। এত কষ্ট কেন হচ্ছে? রুদ্র তো একটা খুনি। তার স্মৃতিরা এত কেন হানা দিচ্ছে? কেন মনে হচ্ছে সব ভুল হচ্ছে?

#চলবে

(নেক্সট পর্বে ধামাকা আছে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here