এক_মেঘলা_দিনে #পর্ব_২১

0
1

#এক_মেঘলা_দিনে
#পর্ব_২১
#আনিকা_আফসা

আশেপাশে এক অদ্ভূত নিরবতা। বাইরের প্রকৃতি যেন অদ্ভুত এক নিরবতাকে বেছে নিয়েছে। যেই বাড়ির প্রতিটি ইটে খুশির ছোঁয়া ছিলো ,এখন তা সম্পূর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে। বাড়ির সামনের দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের জিপটার সামনে এসে দাঁড়ালো রুদ্র। হাতে সেই হাতকড়া। বাড়ির দারোয়ান চাচা উদাসীন চোখে তাকিয়ে তার দিকে। আহারে ছেলেটাকে তো ভালোই লেগেছে। তার সাথেও কি অমায়িক ব্যবহার তার। এমন এক কাজ করতে পারে কিছুতেই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। তিনি মাথা নিচু করে রইলেন। রুদ্রকে যখন জিপে উঠাতে যাবে পুলিশেরা তখন একটা আওয়াজ এলো। সবাই তাকিয়ে দেখলো অয়ন এগিয়ে আসছে। কাছে আসতেই পুলিশদের বলল হালকা হেঁসে,

“আমার একটু কথা আছে এর সাথে।”

পুলিশ হালকা সরে গেলো। রুদ্র ছোট ছোট চোখ করে তাকালো অয়নের দিকে। কি বলতে চায় আবার? অয়ন রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ছিহ্, শেষমেষ মেরে দিলেন? এত জঘন্য একটি কাজ কিভাবে করতে পারলেন আপনি? এটা আপনার থেকে আশা করিনি। আমি তো আরো ভেবেছিলাম আপনার বিয়ে খেতে আসবো, একেবারে কব্জি ডুবিয়ে খাবো কিন্তু এখন দেখছি আঙ্কেলের চল্লিশা খাওয়ার আয়োজন করে দিলেন আপনি।”

বলেই থামলো অয়ন। আরেকটু এগিয়ে গিয়ে বলল,

“বলেছিলাম না, বেশি উড়বেন না? দাবার চাল পাল্টে যেতে কতক্ষন? দেখলেন তো , কিভাবে মুখ থুবড়ে একেবারে মাটিতে পড়লেন আপনি? আহ্, তবে চিন্তা নেই। আমি আনির সম্পূর্ণ খেয়াল রাখবো, পুরো ভালোবেসে।”

রুদ্র দাঁতে দাঁত চেপে অয়নের কলার চেপে বলল,”ইউ ব্লাডি।”

তখনই পুলিশেরা টেনে কোনোমতে ছাড়ালো তাকে। অয়ন কলার ঝেড়ে হেঁসে বলল,

“আরে আরে , রাগ করছেন দেখি। এত রাগলে চলে? আচ্ছা আপনি এখন যান, আমার আনিকে সামলাতে হবে তো?”

এই বলে পুলিশদের ইশারা করতেই , পুলিশেরা রুদ্রকে টেনে নিয়ে গেলো। জিপে উঠিয়ে দিলো তাকে। সিনিয়র পুলিশ অফিসার যে ছিলো অয়ন আড়ালে তার হাতে টাকা গুঁজে বলল,

“সব প্ল্যান অনুযায়ী হচ্ছে, পরেও যাতে গড়বড় না হয়। এমন সব কেসে ফাসাবি যাতে ঐ চার দেয়ালের জেল থেকে আর ছাড়া না পায়। কিছু গড়বড় হলে তোকে আমি ছাড়বো না আরিফ।”

আরিফ হেঁসে বলল,”এইযে পকেট গরম করে দিলেন, হবে না স্যার।”

অয়ন হেঁসে বলল,”নিয়ে যা একে, একটু খাতিরদারি কর । কাজ হলে আরো টাকা পাবি। ”

আরিফ মাথা নেড়ে উঠে বসলো জিপে। বাকিরাও উঠে বসলো। চোখের পলকে জিপ নিয়ে রওনা হলো তারা। রুদ্র চোখ বুজে রইলো। কিছু যে বলার নেই তার।

_________

দুইদিন পর,

অয়নের এখন আসা যাওয়া লেগে থাকেই এই বাসায়। সবার ইতিমধ্যেই প্রিয় হয়ে উঠেছে সে। আজও সেইভাবেই আমাদের বাসায় প্রবেশ করছিলো তখনই মোবাইল বেজে উঠলো। অয়ন দেখলো তৃষার ফোন, কিন্তু দেখেও কেটে দিয়ে মোবাইল বন্ধ করে রাখলো। তারপর মোবাইল পকেটে ঢুকিয়ে বাসায় প্রবেশ করলো। বাসার ভেতর ঢুকতেই একটা অদ্ভুত নিরব বাসাকে দেখলো। সোফায় বসে আছেন আমার মা। পড়নে সাদা শাড়ি, চোখ মুখ অনেক শুকনো ও ফ্যাকাশে। হাতে একটা তসবিহ। তার পাশে বসে আমার খালা মণি। সব আত্নীয় স্বজন চলে গেলেও, খালামণি ও আপু এখনো আছেন। অয়ন তাদেরকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

“মুখ এতো শুকিয়ে গেছে আন্টি? খাওয়া দাওয়া করেন না? এভাবে হলে চলবে? আঙ্কেল কিন্তু খুব কষ্ট পাবেন আপনাকে এভাবে দেখলে।”

বাবার কথা উঠতেই মায়ের চোখে জলেরা হানা দিলো। চোখের জল মুছে কথা কাটাতে বলল,

“পরিবারের সবাই ভালো আছে বাবা?”

অয়ন বলল,”মা প্রতিদিনই আপনার কথা জিজ্ঞেস করে। আসবে বলেছিলো কিন্তু জানেনই তো মা অসুস্থ। ”

মা মাথা নাড়লেন। অয়ন বলল,

“আন্টি আপনাদের একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে চাই।”

মা খালামণির দিকে তাকালো, তখনই সেও তাকালো। দুজন মুখ চাওয়াচাওয়ি করে মা বলল,

“কি কথা?”

অয়ন বলল,”দেখুন রুদ্র জেলে গিয়েছে, জানেনই তো ওর বাবার পাওয়ারের কথা। কোনদিন বের হয়ে আসে বলা যায় না। এসে যদি রাগে আনিকে আবার বিয়ে করতে চায় তো? যদি কিডন্যাপ করে তুলে নিয়ে যায়? অথবা আরো খারাপ কিছু?”

মা ভাঙ্গা গলায় বললেন,”এসব কেনো হলো বলোতো? রুদ্রকে তো আমি আমার ছেলের মতো দেখতাম, ও এমন কিভাবে করতে পারলো? কেন করলো?”

অয়ন বললো,”আমি কিন্তু জানি আন্টি।”

“কি বলো? কেন করেছে এমন?”

” আসলে আন্টি , কিভাবে যে বলি। রুদ্র আগে থেকেই অনেক অনৈতিক কাজের সাথে জড়িত। শোনা গেছে ও নাকি কালোবাজারি করে। মানুষকে মেরে ফেলাও ওর বাঁ হাতের কাজ। ভাগ্যক্রমে এসব আঙ্কেল জানতে পেরে যায়। আর এমন লোকের সাথে নিশ্চয়ই কোনো বাবা তার মেয়েকে দিবে না। তাই রুদ্রের সাথে কথা বলে বিয়ে ভেঙে দিতে চায়। আর আনিকে তো ও ভালোবেসে। তাই এই কথা শুনে রাগের বশে আঙ্কেল কে,,,,,”

আর কথা বলার আগেই থেমে যায়। আমার মা চোখ বুজে হা করে শ্বাস নেয়। শ্বাস নিতে মনে হয় কষ্ট হচ্ছিল তখন‌ । বুকে কম্পন অনুভব করে। অয়ন আবার বলে,

“এসব শুধু আনির জন্য করেছে ও। ভাবুন আনিকে পাওয়ার জন্য ও তাহলে কি কি করতে পারে। যদি আরো বড় কোনো ক্ষতি করে দেয় তো? ”

আমার মা চোখ বুজে হা করে শ্বাস নেয়। শ্বাস নিতে মনে হয় কষ্ট হচ্ছিল তখন‌। বুকের ভেতরটা যেন ধড়ফড় করে উঠছে বারবার। খালামণি তাড়াতাড়ি মায়ের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
“আপা, শান্ত হন। বেশি চিন্তা কইরেন না।”

অয়ন সাথে সাথে পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলল,
“আন্টি, আমি শুধু আপনাদের সাবধান করার জন্যই বলছি। কারণ আমি চাই না আনির কোনো ক্ষতি হোক।”

মা কাঁপা হাতে পানি খেলেন। চোখদুটো লাল হয়ে আছে কান্নায়। বাবার মৃত্যুর শোক যেন তাকে কয়েকদিনেই অনেক বুড়ো করে দিয়েছে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে মা ধীরে বললেন,
“তাহলে এখন কি করবো আমরা?”

অয়নের চোখে তখন এক অদ্ভুত চকচকানি ফুটে উঠলো। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে সে বলল,

“আনিকে নিরাপদ রাখতে হলে যত দ্রুত সম্ভব ওর বিয়েটা দিয়ে দিতে হবে।”

খালামণি ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“এখনই বিয়ে?”

“হ্যাঁ। কারণ রুদ্র যদি বের হয়ে আসে, তখন পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়ে যাবে। আর সমাজের মানুষও তো কম কথা বলছে না। আনির ভবিষ্যতের জন্য হলেও একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার।”

মা চুপ হয়ে গেলেন। চোখ বেয়ে আবারও জল গড়িয়ে পড়লো। বাবার মৃত্যুর পর যেন সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। মা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

“তুমি ঠিক বলছো। কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি কিভাবে কি করবো? ছেলে খুঁজব কি করে?”

অয়ন মাথা তুলে বলল,”আপনারা যদি চান আমি চাই আনিকে বিয়ে করতে।”

তখনই আনিশা এলো সেখানে। অয়নের কথা শুনে দাঁড়িয়ে গেলো।

পুরো ঘরটা যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেলো। খালামণি আর মা একে অপরের মুখের দিকে তাকালেন। অয়ন মাথা নিচু করে বসে আছে, যেন খুব ভদ্র আর নম্রভাবে প্রস্তাবটা দিয়েছে।

মা কাঁপা গলায় বললেন, “তুমি,,,তুমি আনিকে বিয়ে করতে চাও বাবা?”

অয়ন বললো,”হ্যাঁ আন্টি। আমি আনির খুব ভালো বন্ধু, ওকে বুঝি আমি। ওর আর আপনাদের কথা চিন্তা করে আমি সব করতে পারি। ওকে আমি পছন্দও করি। আর আমার সম্পর্কে আপনাদের কি বলবো? সব তো জানেনই আপনারা। আমি প্রস্তাব দিয়েছি আনির ভবিষ্যতকে সুন্দর করতে ও রুদ্র নামক বেড়াজাল থেকে ওকে বাঁচাতে।”

খালামণি বললেন,”বুঝতে পারছি, কিন্তু এখন এই বাড়ির অবস্থা আর জানোই তো আনির মনের অবস্থা। আনি কি রাজি হবে? ও তো রুদ্রকে পছন্দ করতো।”

মা উদাসী হয়ে বলল,”হ্যাঁ, কত স্বপ্ন সাজিয়েছিলো আমার মেয়েটা। সব এক মুহুর্তে কেমন অন্যরকম হয়ে গেলো।”

অয়ন বললো,”আমি জানি , তবে চিন্তা করবেন না সবকিছু আনির মতেই হবে। ওকে আমি রাজি করাবো। ”

আনিশা বললো,”কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে,,,, না মানে কেমন যেন হয়ে গেল না? দুদিন আগেই বাবা মারা গেলেন আর তারমধ্যে এসব? একটু বেশিই জলদি হচ্ছে না?”

মা বললেন,”আমি চাই না আনি আবার ঐ রুদ্রের মায়ায় পড়ুক, ঐ রুদ্রের থেকে যত দূরে রাখা যায় তত ভালো। আর তার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো বিয়ে। বিয়ে করলে রুদ্র কিছু করতে পারবে না।”

মায়ের কথায় ঘরের পরিবেশটা আরো ভারী হয়ে উঠলো। খালামণি কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। অয়নের ঠোঁটের কোণে তখন চাপা এক তৃপ্তির হাসি।

খালামণি ধীরে ধীরে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। পরিস্থিতি যে কতটা জটিল হয়ে উঠেছে সেটা বুঝতে পারছেন তিনিও। কিন্তু তারপরও কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে তার।
“কিন্তু আপা, এতো তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা ঠিক হবে? মেয়েটা এখন মানসিকভাবে একদম ভেঙে পড়ে আছে। ভাইয়ার শোকই তো এখনো সামলাতে পারছে না।”

মা চোখ মুছতে মুছতে বললেন, “আমি মা হয়ে বুঝি না নাকি? কিন্তু কি করবো বলো? চারপাশে যা হচ্ছে, ,,, আমার ভয় লাগে। রুদ্র যদি সত্যিই ফিরে এসে খারাপ কিছু করে?”
অয়ন সাথে সাথে গম্ভীর গলায় বলল, “আপনার ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক আন্টি। কারণ জেলে গেলেই সব শেষ হয়ে যায় না। টাকার জোরে মানুষ অনেক কিছুই করতে পারে।”

খালামণি এবার অয়নের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি কি নিশ্চিত রুদ্র এমন কিছু করবে?”

অয়ন কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল, “আমি কাউকে ছোট করছি না। কিন্তু যেই মানুষ নিজের রাগের জন্য একটা খুন করতে পারে, তার পক্ষে আর কিছু করা অসম্ভব না।”

মা চোখ বুজে তসবিহ আঁকড়ে ধরলেন এবং বললেন,
“আল্লাহ্, আমি কাকে বিশ্বাস করবো এখন?”

অয়ন একটু নরম গলায় বলল, “আপনি শুধু আনির ভবিষ্যতের কথা ভাবুন। বাকিটা আমার উপর ছেড়ে দিন।”

খালামণি ভ্রু কুঁচকে বললেন, “তোমার পরিবার কি রাজি হবে? এভাবে হঠাৎ?”

অয়ন হালকা হাসলো এবং বলল,
“মা আগে থেকেই আনিকে খুব পছন্দ করে। আর আমি যদি কিছু চাই, পরিবার কখনো না করে না।”

খালামণি বললেন, “কিন্তু মানুষ কি বলবে? বাবার মৃত্যুর এতো দ্রুত পরে মেয়ের—”

“মানুষ তো যেকোনোভাবেই কথা বলবে আন্টি। আজ বলবে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়েছেন, কাল বলবে মেয়েকে সামলাতে পারেননি। সমাজের মুখ বন্ধ করা যায় না।”

খালামণি চুপ হয়ে গেলেন। আনিশার কেমন মন যেন খচখচ করছে। মা বললেন,

“তাহলে আমি রাজি। আনির বিয়ে যেভাবে হচ্ছিলো সেভাবেই হবে। কাল গায়ে হলুদ পড়ে বিয়ে। অনেক ধুমধাম করে আমার মেয়ের বিয়ে দিবো আমি। আনির বাবার খুব শখ ছিলো অনেক বড় করে মেয়ের বিয়ে দেবেন।”

অয়ন ধূর্ত হাসলো। অতঃপর বললো,

“চিন্তা করবেন না আন্টি, আপনি একদম ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আনি কোথায়? আমি ওর সাথে একটু কথা বলে আসি।”

মা বললেন,”ও নিজের ঘরে আছে, বাবার শোকে মেয়েটা পাথর হয়ে গিয়েছে। ঘর থেকে বের হয় না এখন বেশি। ঘরে গেলেই পাবে ওকে।”

অয়ন মাথা নেড়ে উপরে চলে গেলো। মনে মনে হাসলো বোধহয়।

______________

অয়ন দরজা ঠেলে প্রবেশ করতেই দেখলো একটা অগোছালো রুম। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো কেউ নেই। এদিক সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎ বেলকনিতে নজর পড়লো। এগিয়ে গেলো সেদিকে। দেখতে পেলো আমাকে, চুল ছেড়ে দাঁড়িয়ে আছি চুপচাপ। বাতাসে কোমড় সমান চুলগুলো উড়ছে। অয়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

“কাঁদছিস আনি?”

আমি কারো কথা শুনতেই চটপট করে চোখের জল মুছলাম। অয়ন কে জিজ্ঞেস করলাম,

“এখন এই সময়ে তুই? কোনো দরকার ছিলো?”

অয়ন বলল,”হ্যাঁ, তোকে কিছু কথা বলতে চাই।”

“হুম শুনছি।”

অয়ন বলল,”আমি জানতে পেরেছি রুদ্র কেন তোর বাবাকে মেরেছে।”

আমি চোখ খিচে বন্ধ করে বললাম,”আমি এসব বিষয়ে শুনতে চাই না অয়ন।”

অয়ন বললো,”তাও তোর শুনতে হবে, এই বিষয় তুই সম্পর্কিত।”

আমি চুপ হয়ে গেলাম। অয়ন বলে গেলো ওর নিজের মতো, একটু আগে যেটা আমার মাকে বলেছে। আমি কথাগুলো শুনে অবাক হয়ে বললাম,

“কিহ্? ও এই তুচ্ছ কারণে আমার বাবাকে,,,”

আমি মুখে হাত চেপে ধরলাম। অয়ন বলল,”হ্যাঁ, এই কারণেই। আমি চাইনা ও তোর আরো ক্ষতি করুক। তাই আমি আর আন্টি ইনফ্যাক্ট সবাই মিলে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

“কি সিদ্ধান্ত?”

অয়ন বললো,”কাল আমাদের গায়ে হলুদ আনি, তারপর বিয়ে।”

এতক্ষণে আমি পিছন ফিরে অয়নের দিকে তাকালাম এবং বললাম,

“কিহ্? তুই কি পাগল? আমার বাবা মারা গেছে, তুই এসব ভাবতে কি করে পারলি?”

অয়ন বলল,”আমি এজন্যই ভাবতে পেরেছি কারণ আঙ্কেল মারা গেছে। ভাব একবার রুদ্র জেল থেকে বের হলে কি হবে? তোকে উঠিয়ে নিয়ে যেতে দুবার ভাববে না।”

আমি উল্টোদিকে ফিরে আঙ্গুলে রুদ্রের দেয়া সেই আংটি চেপে ধরে বললাম,

“তাও আমি তোকে বিয়ে করতে পারবো না অয়ন।”

অয়ন মুহুর্তেই যেন অগ্নিরুপ ধারণ করলো। আমাকে টেনে ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে বলল,

“কেন পারবি না? বল কেন পারবি না? এখনো ভালোবাসিস তুই রুদ্রকে?”

আমি এদিক সেদিক তাকিয়ে বললাম,”এমন কিছুই না।”

অয়ন গর্জে বলল,”এমন কিছুই আনি, এমন কিছুই। যে লোকটা তোর বাবাকে এত নিষ্ঠুরভাবে মেরেছে তার জন্য এখনো কেন ভাবছিস তুই? ”

আমি অয়নের হাত ছাড়িয়ে বললাম,”এটা তোর ভুল ধারণা। আমি কাউকে নিয়ে ভাবছি না।”

অয়ন বলল,”এটা নিজেকে বোঝাচ্ছিস না আমাকে?”

আমি চুপ করে রইলাম। বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুত ভারী লাগছে। বাবার কথা মনে পড়লেই দম বন্ধ হয়ে আসছে। তারমধ্যে এসব বিয়ে, সম্পর্ক, অভিযোগ, সবকিছু যেন একসাথে মাথার উপর ভেঙে পড়ছে।
অয়ন কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর একটু শান্ত গলায় বলল,
“দেখ আনি, আমি তোকে জোর করতে চাই না। কিন্তু পরিস্থিতি বুঝতে চেষ্টা কর। সবাই তোকে নিয়ে চিন্তায় আছে। আন্টি কতটা ভেঙে পড়েছে দেখছিস না?”

আমি বললাম,”দেখ আমার কিছু ভালো লাগছে না, প্লিজ এসব বিষয়ে কথা বলিস না।”

অয়ন বলল,”কেন? কেন বলবো না ? তুই এখনো রুদ্রকে পছন্দ করিস?”

“তেমন কিছু না। ‘

অয়ন এবার ধীরে ধীরে আমার কাছে এগিয়ে এলো এবং বলল,
“তাহলে বিয়েটা করে ফেল। সব সমস্যার শেষ হয়ে যাবে।”
আমি মাথা নেড়ে বললাম, “আমার পক্ষে এখন বিয়ে করা সম্ভব না।”

“কেন সম্ভব না?”

“কারণ আমি এখনো বাবার মৃত্যুই মানতে পারছি না।”

আমার গলাটা কেঁপে উঠলো। চোখের কোণে আবারও জল জমে গেলো। অয়ন বললো,

“ফাইন তোর লাগবে না বিয়ে করা। আরে আমি তো তোর কথা আর তোর পরিবারের কথা চিন্তা করে মরছি আর তুই এসবে কোনো পাত্তাই দিচ্ছিস না। ঠিক আছে লাগবে না বিয়ে করা। সেদিন তো বিয়ের বিপক্ষে আঙ্কেল ছিলো, আর আজ পুরো পরিবার। রুদ্র আঙ্কেলকে মেরে ফেলেছে, এখন যদি পুরো পরিবারকে মেরে ফেলে? তখন খুব ভালো হবে তাইনা?”

অয়নের কথাটা শুনে আমি থমকে গেলাম। বুকের ভেতরটা কেমন হিম হয়ে এলো। অয়ন এবার একটু শান্ত হয়ে গভীর শ্বাস ফেললো। তারপর নিচু গলায় বলল,

“আমি তোকে ভয় দেখাচ্ছি না আনি। আমি শুধু বাস্তবতা বোঝানোর চেষ্টা করছি।”

আমি ধীরে ধীরে বললাম,
“রুদ্র এমন না।”

অয়ন তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো এবং বলল,

“এখনো বিশ্বাস করিস ওকে?”

আমি কিছু বললাম না। কারণ সত্যি বলতে আমিও জানি না কি বিশ্বাস করবো। চারপাশের সবকিছু এত দ্রুত বদলে গেছে যে নিজের চিন্তাগুলোও এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।

অয়ন আবার বলল,
“দেখ, আমি তোকে ছোটবেলা থেকে চিনি। তোর একটা আঁচড় লাগলেও আমি সহ্য করতে পারি না। আর আজ তুই এমন একজনের জন্য কাঁদছিস, যে তোর বাবাকে,,,,”

“স্টপ ইট!”

আমি হঠাৎ চিৎকার করে উঠলাম। অয়ন থেমে গেলো। আমার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। গলাটা কাঁপছে ভীষণ।

“প্লিজ, বাবাকে নিয়ে আর একটা কথাও বলিস না। আমি আর নিতে পারছি না।”

অয়নের মুখটা কিছুটা নরম হলো। সে ধীরে ধীরে আমার কাছে এসে বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে। শান্ত হ।”

আমি মুখ ঘুরিয়ে চোখের জল মুছলাম। চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। শুধু বাইরে বাতাসের শব্দ।
কিছুক্ষণ পর অয়ন আবার বলল,

“কাল গায়ে হলুদ হবে। আন্টি সব ঠিক করে ফেলেছে।”

আমি অবাক হয়ে তাকালাম এবং বললাম,

“এত তাড়াতাড়ি?”

“হুম।”

“কিন্তু আমি তো এখনো রাজি হইনি।”

অয়ন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,

“আন্টির অবস্থা দেখছিস তো। উনি এখন আর কোনো রিস্ক নিতে চাইছেন না।”

আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। অয়ন এবার ধীরে ধীরে আমার হাতটা ধরলো।

“বিশ্বাস কর আনি, আমি তোকে কখনো কষ্ট দিবো না।”

আমি তৎক্ষণাৎ হাত সরিয়ে নিলাম।

“আমার এখন এসব ভালো লাগছে না।”

অয়নের চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠলেও সে নিজেকে সামলে নিলো।

“ঠিক আছে। তুই রেস্ট নে।”

এই বলে সে ঘুরে দাঁড়ালো। কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে আবার থেমে গেলো।

পেছন ফিরে না তাকিয়েই বলল,

“বিয়ের জন্য তৈরি হ আনি, রুদ্রকে ভুলে যা, সে তোর বাবার খুনি। ”

আমার বুকটা ধক করে উঠলো।আমি কিছু বলার আগেই অয়ন দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো। রুমটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। আমি ধীরে ধীরে বিছানার পাশে বসে পড়লাম। হাতের আঙুলে থাকা রুদ্রের দেওয়া আংটিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।চোখের কোণ বেয়ে নীরবে জল গড়িয়ে পড়লো।
কেন জানি মনে হচ্ছিল,,,, কোথাও খুব বড় একটা মিথ্যা লুকিয়ে আছে।

#চলবে

(নেন দিলাম। দেয়ার ইচ্ছা ছিল না কিন্তু দুইটা আপু খুব রিকোয়েস্ট করেছে তাই দেয়া)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here