এক_মেঘলা_দিনে #পর্ব_২৫

0
1

#এক_মেঘলা_দিনে
#পর্ব_২৫
#আনিকা_আফসা

নিস্তব্ধ রাতের প্রথম প্রহর। টাইলসের মেঝেতে বসে বিছানা আঁকড়ে চোখের জল ফেলছি। এছাড়া উপায় আছে? কাল এক অন্যরকম সকাল হবে। সেই সকাল আমার চাইনা। মনের ভেতর অস্থিরতা পিছু ছাড়ছে না। একটা বড় বেড়াজালে আটকে গেছি তা বুঝতে পারছি। চোখ বরাবর রুদ্রের সেই আংটি। রুদ্রর এই আংটি নিয়ে অন্যজনের নামে কবুল বলবো কিভাবে? আমার দ্বারা যে হবে না।

কাঁপা হাতে আংটিটা স্পর্শ করলাম। মনে পড়ে গেল রুদ্রের সেই কথাগুলো। রুদ্র বলেছিলো,

“যেদিন আমি তোমার পাশে থাকবো না, সেদিনও এই আংটিটা তোমাকে মনে করিয়ে দেবে যে কোথাও একজন মানুষ আছে, যে তোমাকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।”

কথাগুলো মনে হতেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। চোখের পানি আর বাঁধ মানলো না। কেন এমন হলো? কেন আমার জীবনটা এভাবে বদলে গেল?
হঠাৎ দরজায় টোকা পড়লো। আমি তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়ালাম। আম্মু এসেছে, আমাকে দেখে বললেন,

“এখনো ঘুমাসনি?”

আমি কিছু বলবো তখনই আম্মুর নজর পড়লো হাতের আংটির উপর। আম্মু আমার কাছে এগিয়ে এসে বলল,

“হাতে এটা কিসের আংটি নিয়ে বসে আছিস?”

আমি হাতটা অপর হাত দিয়ে ঢেকে নিজের কোলে রেখে অন্যদিকে তাকিয়ে বললাম,

“কিছু না।”

আম্মু টেনে বলল, “দেখি।”

এই বলে হাত টেনে ধরলো। আংটি দেখে তার চোখ সরু হয়ে গেলো। আমাকে বলল,

“এটা কার দেয়া?”

আমি বললাম,”বাদ দেও না আম্মু।”

আম্মুর মুখটা মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল এবং বলল,

“বাদ দেও মানে? আমি যা জিজ্ঞেস করছি তার উত্তর দে। এটা কার দেওয়া আংটি?”

আমি ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে রইলাম। গলাটা যেন আটকে এসেছে । আম্মু আবার বললেন,
“বল আনি।”

আম্মুর কণ্ঠে এবার কঠোরতা স্পষ্ট। আমি ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বললাম,
“রুদ্রের।”

নামটা উচ্চারণ হতেই ঘরের পরিবেশ যেন আরও ভারী হয়ে উঠলো। আম্মু কয়েক সেকেন্ড নির্বাক হয়ে রইলেন। তারপর গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
“ও একটা খুনি, তোর বাবার খুনি। এখনো ওর স্মৃতি নিয়ে বসে আছিস? তুই চাচ্ছিসটা কি? কাল তোর বিয়ে অয়নের সাথে। অয়ন সবকিছু জেনেশুনে তোকে আপন করতে , আমাদের সবাইকে মেনে নিতে চেষ্টা করছে। আর তুই কি করছিস? নিজের বাবার খুনির দেয়া জিনিস পড়ে এখনো বসে আছিস?”

চোখের কোণ বেয়ে আবার জল গড়িয়ে পড়লো আমার। নিষ্প্রাণ গলায় বললাম,
“আমি চেষ্টা করেছি আম্মু। অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারিনি।”
“পারতে হবে।”

আমি মাথা তুলে তাকালাম এবং বললাম,
“কেন? কেন পারতে হবে? সবাই শুধু আমাকে ভুলে যেতে বলে। কিন্তু কেউ কি একবারও ভেবেছে আমি কী চাই?”

আম্মু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন এবং বললেন,
“জীবন সবসময় নিজের ইচ্ছেমতো চলে না, আনি।”

আম্মুর চোখেও জল চিকচিক করে উঠলো। কিন্তু তিনি নিজেকে সামলে নিলেন এবং বললেন,

“কাল তোর বিয়ে। এখন এসব ভেবে নিজেকে শেষ করিস না।”

আমি তাড়াতাড়ি মাথা নাড়লাম এবং বললাম,
“আমি পারবো না আম্মু। অন্য একজনের নামে কবুল বলতে পারবো না।”

কথাটা শুনে তিনি কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইলেন।
তারপর আমার হাত থেকে আংটিটা খুলতে এগিয়ে এলেন।
আমি চমকে উঠে হাত সরিয়ে নিলাম এবং বললাম,
“না!”

“আনি!!!”

আম্মু বললেন,”এই আংটি ঐ খুনির চিহ্ন আমি তোর হাতে দেখতে চাইনা। এক্ষুনি খুলে ফেল এটা।”

আমি মাথা নেড়ে বললাম,”প্লিজ আম্মু নিয়ো না এটা আমার থেকে।”

আম্মুর চোখে এবার রাগের সাথে হতাশাও স্পষ্ট হয়ে উঠলো।
“প্লিজ? তুই আমাকে প্লিজ বলছিস আনি? যে ছেলেটা আমাদের পরিবারটাকে ধ্বংস করে দিয়েছে, তার দেওয়া জিনিস বুকে আগলে রাখছিস?”

আমি কাঁপতে কাঁপতে মাথা নাড়লাম এবং বললাম,
“আমি জানি না আম্মু। আমি শুধু এটুকু জানি, আমি ওকে ভুলতে পারছি না।”

“ভুলতে পারছিস না, নাকি ভুলতে চাইছিস না?”

প্রশ্নটা শুনে আমি থমকে গেলাম।
আম্মু ধীরে ধীরে আমার সামনে বসে পড়লেন এবং বললেন,
“তোর বাবার লাশটা যখন দেখেছিলাম, তখন মনে হয়েছিল আমিও বাঁচবো না। তুই কি ভাবিস শুধু তুই কষ্ট পেয়েছিস? আমরা কেউ পাইনি?”

আমার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগলো।
“আমি জানি আম্মু,,,”

“না, তুই জানিস না। যদি জানতিস, তাহলে আজও সেই ছেলেটার স্মৃতি নিয়ে বসে থাকতিস না।”

কথাগুলো শুনে বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠলো।
আমি আংটিটা শক্ত করে ধরে বললাম,

“সবকিছু এত সহজ না আম্মু। আমি চাইলেই কি আমার অনুভূতিগুলো মুছে ফেলতে পারবো?”

আম্মু চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। তারপর হঠাৎ আমার হাতটা ধরে আংটিটা খোলার চেষ্টা করলেন।
“আম্মু না! প্লিজ!”
আমি হাত সরিয়ে নিলাম। আম্মু বললেন,
“আনি, জেদ করিস না।”

“আমি জেদ করছি না। এটা শুধু একটা আংটি না।”
“তাহলে কি?”
আমি কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলাম। আম্মু আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর ক্লান্ত গলায় বললেন,

“ঠিক আছে, রেখে দে এখন। কিন্তু, কাল যদি এটা তোর হাতে দেখেছি ভাবতে পারছিস না আমি কি করবো। খুব খারাপ হয়ে যাবে। রুদ্র আমার স্বামীকে খুন করেছে, আর ওর দেয়া জিনিস আমার মেয়ে পড়ে এভাবে ড্যাংড্যাং করে ঘুরবে তা আমি হতে দিব না।”

আমি ঠোঁট চেপে কাঁদলাম। আম্মু দুইহাত দিয়ে আমার দুই গাল আগলে নিলেন এবং চোখে জল সমেত বললেন,

“দুনিয়াটা মরিচিকার মতো মা। রুদ্র তোর জীবনের একটা মরিচিকা। তাকে সত্যি ভাবিস না। ভুলে যা। কাল তোর বিয়ে, সেটাতে মনোযোগ দে। রুদ্রের ছায়াও তোর উপর পড়তে দিবো না আমি। ”

এই বলে কপালে আলতো চুমু খেয়ে উঠে গেলেন। আমি বিছানায় মাথা ঠেকালাম। সবকিছু এত অসহ্য লাগছে যে মরে যেতে ইচ্ছে করছে। দুর্বল গলায় বললাম ফিসফিস করে,

“কেন রুদ্র? কেন এভাবে আমার জীবনে এসে, আমার জীবনকে এমন বিষাক্ত করে দিলেন? আপনি কেন করলেন এমন? কেন?”

********

পরেরদিন,

সকালের আলো ফুটেছে। রাতভর দৌড়াদৌড়ি করেও নিহান কিছুই করতে পারেনি। এদিকে রুদ্র শান্তিতে বসতে পারছে না। মাথার ভেতর শুধু আনির চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। কি করছে, কেমন আছে এসব বিষয়ে। জেলের একপাশ থেকে অন্যপাশ পায়চারি করছে। কখন যে এই খাঁচা থেকে বের হবে আর কখন যে মিট করবে আনির সাথে। এই অপেক্ষার অবসান কবে হবে?

এইসব ভাবতে ভাবতেই নিহানকে দেখতে পেল রুদ্র। রুদ্র এগিয়ে এসে জেলের শিক মুঠোবন্দী করলো এবং নিহানকে বলল,
“জামিনের সব ব্যবস্থা হয়েছে?”

নিহানের মুখে ক্লান্তির ছাপ। সারারাত দৌড়াদৌড়িতে চোখ লাল হয়ে আছে এবং বেশ উষ্কুখুষ্ক লাগছে তাকে। নিষ্প্রাণ গলায় বলল,

“আমি পারছি না। অয়ন খুব চালাক। একটার পর আরেকটা কেস লাগিয়ে দিয়েছে। মার্ডার, স্মাগলিং সমস্ত কেস লাগিয়ে দিয়েছে তোর উপর। আমি আমার লয়ার নিয়ে সারারাত ছোটাছুটি করেও পারছি না। ”

রুদ্রের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। শিকগুলো আরও জোরে চেপে ধরলো সে এবং বলল,

“মানে? তুই বলতে চাচ্ছিস আমি এখানেই আটকে থাকবো?”

নিহান হতাশ চোখে তাকালো। সে বলল,

“আমি সেটা বলছি না। আমি এখনো চেষ্টা করছি। কিন্তু সময় খুব কম, রুদ্র।”

রুদ্র এক ঝটকায় শিক ছেড়ে পিছিয়ে গেল এবং মাথা চেপে বলল,

“সময় কম? আজ ওর বিয়ে নিহান!”

তার কণ্ঠে জমে থাকা অসহায়তা স্পষ্ট।

“আজ যদি আমি বের হতে না পারি, তাহলে সব শেষ হয়ে যাবে।”

নিহান চোখ নামিয়ে নিল। সে জানে রুদ্র যা বলছে তা মিথ্যা নয়। আজকের দিনটা পার হয়ে গেলে হয়তো আর কিছুই আগের মতো থাকবে না।

কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে নিহান বলল,

“আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছি না।”

“কি?”

“অয়ন এত শক্তিশালী হলো কবে থেকে? সে যেন আগে থেকেই সব পরিকল্পনা করে রেখেছিল। তোর বিরুদ্ধে প্রমাণ, সাক্ষী, কাগজপত্র সবকিছু এমনভাবে সাজানো যে মনে হচ্ছে অনেকদিন ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিল।”

রুদ্র ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তারও একই প্রশ্ন মাথায় ঘুরছে। তখনই একটা কনস্টেবল এলো হাতে চাবি। সে এসে সোজা লকাপের তালা খুলতে লাগলো । রুদ্র ও নিহান একে অপরের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। কনস্টেবল জেলের দরজা খুলে বলল,

“আপনার জামিন হয়ে গেছে।”

নিহানের মুখে হাঁসি ফুটে উঠলো। কিন্তু রুদ্র কুঁচকে বলল,

“কিন্তু কে করালো আমার জামিন?”

কনস্টেবল বলল,
“একজন ভদ্রলোক এসেছেন, তিনিই করিয়েছেন। আপনি আসুন, বাইরেই আছেন উনি।”

রুদ্র জলদি বাইরে বের হলো এবং সেদিকে ছুটলো । নিহানও নিলো তার পিছু।

(কে এই ভদ্রলোক? 🤔🤔)

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here