#বৈরি_হাওয়া
#পর্ব_২
#ফারজানা_প্রণয়_চৌধুরী
“লিসেন—”
শব্দটা ঘরের ভেতর ভারী হয়ে ঝুলে রইলো। কণ্ঠের সেই প্রখরতা দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুললো। আমি তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। চোখে কোনো অনুনয় নেই, নেই অনুশোচনা, নেই জবাবদিহি করার তাগিদ। যেন সে কোনো অপরাধই করেনি; বরং আমি অকারণ ঝামেলা পাকাচ্ছি। এই নির্লিপ্ততা আমার বুকের ভেতর জমে থাকা শেষ শক্তিটুকুও ভেঙে দিল।
“আর কিছু বলার থাকলে বলুন,”
গলাটা আমার নিজেরই অচেনা লাগলো, “কারণ আজ যা শোনার ছিল, সবই তো শুনে ফেলেছি।”
তার কন্ঠে নেই সামান্যতম অনুশোচনা। বরং আরও শক্ত কণ্ঠে বললো,
—এই বাড়িতে নাটক করার দরকার নেই। এতই যখন সমস্যা ছিল, তখন কবুল বলার আগে ভালো করে ভাবা উচিত ছিল। কবুল যেহেতু বলেই ফেলেছো, সংসারের দায়িত্ব বুঝে নাও। নাটক-সিনেমার মতো বলবো না যে তুমি স্ত্রীর অধিকার পাবে না। তবে অধিকার নেওয়ার জন্য তোমাকে জোরও করবো না। যখন প্রয়োজন মনে হবে, পেয়ে যাবে। স্বাধীনতা পাবে, চাইলে পড়ালেখাও করতে পারবে। কিন্তু সবকিছু আমার নিয়ম অনুযায়ী। যেভাবেই হোক, আমার সঙ্গে যেহেতু জড়িয়ে গেছো, এখান থেকে মুক্তি নেই। বিলাসিতার কোনো অভাব হবে না।
দায়িত্ব, অধিকার, বিলাসিতা ,শব্দগুলো কানে ঢুকতেই হেসে ফেললাম। হাসিটা ছিল শুকনো, ফাটল ধরা।
“দায়িত্ব?”
আমি ধীরে ধীরে বললাম,
“আমাকে কিছু না জানিয়ে, জোর করে আমার কাঁধে একটা জীবনের ভার চাপিয়ে দেওয়াই দায়িত্ব? বিলাসিতা? একটা কিশোরী মেয়ের স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে, অন্য কারো সন্তানের দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া কি বিলাসিতা? অধিকার?” গলাটা কেঁপে উঠলো।
“যে বক্ষে আমার সুখ-দুঃখের অশ্রু ঝরার কথা ছিল, যেখানে আমার একান্ত অনুভবের অধিকার থাকার কথা ছিল । সেখানে তো আগেই কারো কর্তৃত্ব ছিল। সেই জায়গায় আবার কোন অধিকারের কথা বলেন?”
আমি থামলাম না। একই সুরে বলে উঠলাম
“হাসালেল সো কোল্ড পতি বাবু, আপনি যেমন নাটক-সিনেমার চরিত্র নন, আমিও তেমন না। আমি উদার হতে পারছি না। মানতে পারছি না। পারছি না সংসার-সংসার খেলতে। একটা সাধারণ মেয়ের জন্য এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া মোটেও সাধারণ কিছু না।”
সে বিরক্ত হয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। ভাবলেশহীন কন্ঠে বলল,
–এখন এসব আলোচনা অর্থহীন। কাল থেকে সংসার শুরু। নিজেকে গুছিয়ে নাও।
এই ছিল তার শেষ কথা। কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো ব্যাখ্যা নেই। আলো নিভিয়ে সে শুয়ে পড়লো। আর আমি বসে রইলাম অন্ধকারে। মনে হচ্ছিল, এই অন্ধকারটাই আমার নতুন পরিচয়।
কিছুক্ষণ পর দরজার ফাঁক দিয়ে হালকা শব্দ পেলাম। তাকিয়ে দেখি ,মিমি। ছোট্ট মেয়েটা পা টিপে টিপে এগিয়ে এলো। চোখ দুটো ঘুমে ঝাপসা, তবু আমাকে খুঁজে পেয়েছে। আমার সামনে এসে আঁচলটা শক্ত করে ধরলো।
“মাম্মা…”
শব্দটা কানে ঢুকতেই বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে গেল। আশ্চর্য! বাচ্চা ভালোবাসতে পারি বলে জানতাম, কিন্তু আজ কেন এই নিষ্পাপ মেয়েটাকে এত অসহ্য লাগছে? সৎ মা বলেই কি এমন? আমিও কি একদিন এই শিশুটার কাছে তথাকথিত সৎ মা হয়ে উঠবো?
আমি হাত বাড়ালাম না, আবার সরিয়েও নিলাম না। কী করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ওর চোখে কোনো কোনো অভিযোগ নেই ।শুধু নিখাদ নির্ভরতা। অথচ আমি নিজেই আজ আশ্রয়হীন।
ধীরে ধীরে ও বিছানায় উঠে এলো। আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লো। ছোট্ট নিঃশ্বাসে বুকটা ওঠানামা করছে। আমি ওর চুলে হাত বুলালাম। হাত কাঁপছিল। এই শিশুটার তো কোনো দোষ নেই ।তবু ও-ই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চোখের কোণে জল জমে উঠলো, কিন্তু কাঁদতে পারলাম না। মনে হলো, কান্নাটুকুও বিলাসিতা। এক মুহূর্তের জন্য মিমিকে ছুড়ে ফেলে দিতে ইচ্ছে করলো।কিন্তু পারলাম না। হয়তো মনুষ্যত্ব এখনও পুরোপুরি মরেনি। বাচ্চাটার কী দোষ? ও নিজেও তো আমার মতোই পরিস্থিতির শিকার। আমি যেমন হঠাৎ একজন সৎ মেয়ে পেলাম, ও নিজেও তো হঠাৎ একজন সৎ মা পেল।
এই সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি, টের পাইনি।
ঘুমের ভেতরেও টের পেলাম—দুটি মলিন চোখ আমাকে পরখ করছে। শব্দ না করেই সে আমার মাথাটা বালিশে ঠিক করে দিল, মিমিকে মাঝখানে শুইয়ে ব্ল্যাঙ্কেটটা গায়ে জড়িয়ে দিল।
ভোরের আজানের শব্দে ঘুম ভাঙলো। জানালা দিয়ে নতুন দিনের আলো ঢুকছে। পাশে তাকিয়ে দেখি, সে নেই। বিছানাটা গুছানো। বুঝলাম, আগেই বেরিয়ে গেছে। আমার অস্তিত্ব তার দিনের শুরুতেও জরুরি নয়।
মিমি তখনও ঘুমাচ্ছিল। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ একটা ভয় আমাকে গ্রাস করলো ।
আমি কি পারবো? এই সংসার, এই দায়িত্ব, এই প্রতারণার ভেতর নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে?
নাকি একদিন এই বৈরী হাওয়াতেই আমি নিঃশব্দে হারিয়ে যাবো?
বাইরে থেকে শাশুড়ির ডাক এলো,
“ঊর্মি, নাস্তা রেডি। মিমিকে স্কুলে দিতে হবে।”
আমি চোখ মুছলাম। আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম । কালকের ঊর্মি আর আজকের ঊর্মির মাঝে আকাশ–পাতাল তফাৎ। আজ আমি শুধু নববধূ নই; আমি একজন অঘোষিত মা, একজন প্রতারিত মেয়ে, আর এক নীরব যুদ্ধের সৈনিক।
দরজার দিকে পা বাড়ালাম।
ঠিক তখনই বৈরী হাওয়া আরও জোরে বইতে শুরু করলো।
— — —
ডাইনিং টেবিলে হঠাৎ ঠাস করে একটা শব্দ হলো। শব্দটা যেন দেয়ালের চারপাশে ঘুরে ঘুরে আছড়ে পড়তে লাগলো। মুহূর্তেই সবার চোখ আটকে গেল স্বর্ণার মুখে। তার গালে নিখুঁতভাবে বসে আছে পাঁচ আঙুলের লাল ছাপ। ছলছল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সে।
ঠিক তখনই কায়সারের থমথমে কণ্ঠ ভেসে এলো। ডাইনিং এরিয়ায় কারো উপস্থিতির তোয়াক্কা না করে সে গর্জে উঠলো,
“তোর সাহস হয় কী করে? রাতে আমার ঘরে উঁকি দেওয়ার! আমার অনুমতি ছাড়া আমার ঘরে ঢোকার! দিনদিন তর সাহস আকাশ ছুঁয়ে ফেলছে।
কিছুক্ষণ থেমে আবার চাঁপা স্বরে বলে উঠলো,
—-আমার সংসারের দিকে তাকালে এবার চোখ তুলে ফেলবো, স্বর্ণা।”
স্বর্ণাও আর চুপ করে থাকলো না। অপমান আর রাগ একসাথে বিস্ফোরিত হয়ে সে চেঁচিয়ে উঠলো,
—“কায়সার, আমি তোমার ওয়াইফ। তুমি আমাকে বাধা দিতে পারো না।”
কায়সার কিছু বলার আগেই ওপরতলা থেকে বিকট শব্দে কিছু পড়লো। সবাই চমকে উঠলো। একযোগে দৃষ্টি চলে গেল দোতলার রেলিংয়ের দিকে।
সেখানে দাঁড়িয়ে আছে ঊর্মি।
নেই কোনো উৎকণ্ঠা, নেই কোনো প্রতিক্রিয়া। যেন প্রাণহীন কোনো দেহ। নিচের ডাইনিং রুমের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ, অথচ চোখে জমে আছে শূন্যতা।
হঠাৎ ঊর্মি হাসতে শুরু করলো।
হাসিটা এমন, যেন এই মুহূর্তে সে ভয়ংকর কোনো মজার দৃশ্য দেখছে। বা কেউ যেন অদৃশ্যভাবে লাফিং গ্যাস ছেড়ে দিয়েছে। কোনোভাবেই সে হাসি আটকাতে পারছে না। হাসতে হাসতে চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে, শরীর কাঁপছে ।তবু হাসি থামছে না।
একসময় হাঁটু ভেঙে মেঝেতে বসে পড়লো ঊর্মি।
ডাইনিং রুমে তখন নিস্তব্ধতা। কেউ এগিয়ে এলো না। কেউ ডাকলো না। শুধু ঊর্মির ভাঙা, ক্ষতবিক্ষত, ভয়ংকর নিঃসঙ্গ হাসি ঘরের ভেতর ঘুরে বেড়াতে লাগলো।
চলবে…
(আপনাদের উৎসাহ পেয়ে একদিনে আরো একটি পর্ব নিয়ে আসলাম। গল্পটি পরে আপনাদের মন্তব্য জানাতে ভুলবেন না । আপনাদের সামান্য উৎসাহ পেলে আলাদা একটা আনন্দ কাজ করছ। ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। এবং সুধরে দেবার চেষ্টা করবেন। ধন্যবাদ 🌸)

