#বৈরি_হাওয়া
#পর্ব_৩
#ফারজানা_প্রণয়_চৌধুরী
ঊর্মির হাসির শব্দ চার দেয়ালের ভেতর এক অদ্ভুত ভারী পরিবেশ তৈরি করলো। নিজের প্রতি নিজের উপহাস ।এরুপ বিদ্রূপাত্মক হাসি আর সহ্য হলো না তার শাশুড়ির। দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলেন তিনি। নিজেকে আর সামলাতে না পেরে ঠাস্ করে এক চড় বসালেন ঊর্মির গালে।
চেঁচিয়ে উঠলেন,
—অনেক হয়েছে তোমার নাটক! নিজের দিকে একবার তাকিয়েছো? রূপ বলতে কিছু আছে? না রূপ আছে, না ছিলে বাবার আদরের দুলালি ! আমরা তো চেহারা না দেখেই এনেছি । তোমার বাবা সব জানতেন । সেটা আমরা জানিয়েছি । কিছুই গোপন ছিল না। সব জেনে-বুঝেই তোমাদের পরিবার তোমাকে দিয়েছে। এখন নাটক বন্ধ করো। সব ব্যাপারে নাক গলাতে নেই।
শাশুড়ির কথাগুলো পরিবেশটাকে আরও ভারী করে তুললো।ঊর্মির হাসি থেমে গেল।
থামলো বলা ভুল ।হাসিটা যেন নিঃশব্দে নিজেকেই গিলে ফেললো। শব্দ ফুরিয়ে এলো । কিন্তু ভেতরের আর্তনাদ থেকে গেল।ঠিকই তো বলেছেন।
আমি কেন বারবার ভুলে যাই?
দোষটা উনাদের নয়।দোষটা আমার ভাগ্যের।দোষটা
আমার নিয়তির।দোষটা মেয়ে হওয়া।
এই সমাজে মেয়ে মানেই সাদা চামড়া আর বাবার টাকা।না থাকলে কোনো মূল্য নেই।
ঘৃণায় শরীর কেঁপে উঠলো। এখনও আমরা এই অসুস্থ সমাজে বাস করি । যেখানে বিয়ের নামে পুতুলের মতো সাজিয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত মাপা হয় । খুঁত খোঁজা হয়।
ডাইনিং রুমে তখন কেউ নড়ছে না।স্বর্ণা আগুন চোখে তাকিয়ে আছে । ঘৃণায় ভরা দৃষ্টি।
শাশুড়ির মুখ শক্ত । ঠোঁটের কোণে বিরক্তির ভাঁজ।
আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না।
চিৎকার করে বলে উঠলাম,
—কি পেয়েছেন আপনারা আমাকে? আমি কি খেলনা? চাবি ঘোরাবেন, চলবো । বন্ধ করবেন, থেমে যাবো?
আপনিও তো একজন মেয়ে! আমার রূপ নিয়ে কথা বলেন কীভাবে? চেহারা না দেখে আনলে, দেখতে গিয়ে আমাকে গরুর মতো পরখ করলেন কেন? বউ থাকতে আমাকে আনার মানে কী? সন্তান না থাকলে ভাবতাম,শুধু সন্তান জন্মানোর যন্ত্র এনেছেন! সেটাও তো না!
গলা সামান্য কেঁপে উঠলো।
আপনি কি মেনে নিতেন—আপনার সঙ্গে এমন হলে? বিয়ে করে সৎ মেয়েসহ ঘরে ঢোকা, বাসর রাতে অপমান, সৎ মেয়েকে নিয়ে একই বিছানায় থাকা, আর প্রথম রাতেই স্বামীর বিদ্রুপ?
কায়সার এক মুহূর্ত ঊর্মির দিকে তাকিয়ে আবার মুখ ফিরিয়ে নিল । যেন এসব তার কাছে অর্থহীন।
কেউ পাল্টা উত্তর দিল না।
কেউ জিজ্ঞেস করলো না ।
–তুমি কী চাও?
পরিবেশ ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে গেল। মানুষ কমতে লাগলো।
ঊর্মি হাঁটু গেড়ে বসে রইলো। চোখে জল, কিন্তু মুখে কোনো শব্দ নেই। বুকের ভেতর জমে থাকা চাপটা হঠাৎ শূন্য হয়ে গেল।ভয়ংকর এক নিরবতা।
এই বাড়িতে আজ সে নিজের অবস্থান বুঝে নিয়েছে ।
এখানে কেউ কারো না।
শূন্য দৃষ্টিতে মেইন দরজার দিকে তাকালো ঊর্মি।
বড় আপু আর দুলাভাই দাঁড়িয়ে । হাতে নানা সামগ্রী। প্রথমবার কুটুমবাড়িতে আসা। আনতেই হয়। লোক দেখানোর দায়িত্ব।
আচ্ছা তারা অবাক কেন?সব তো জানা ছিল।
জেনে-শুনেই তো পাঠানো হয়েছে।
ঠোঁট কেঁপে উঠলো ঊর্মির। ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে কারো দিকে না তাকিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল। সবকিছু নীরবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন আরেকজন । বাড়ির বড় কর্তা, এমদাদ দেওয়ান। কায়সারের বাবা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিরতে গিয়ে দরজায় বউমার বড় বোনকে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। লজ্জিত ভঙ্গিতে এগিয়ে এলেন। বসালেন। আতিথেয়তায় কোনো ত্রুটি রাখলেন না।
ভেতরে ভেতরে উৎকণ্ঠা পাছে বউ মা না কিছু করে ।
শেষমেশ এমদাদ হক বুয়াকে ডেকে পাঠালেন। তাদের বউমার ঘরে নিয়ে যেতে বললেন।
ঊর্মির সামনে মাথা নিচু করে বসে আছে সাগরিকা।
ঊর্মি একবার বোন আর দুলাভাইয়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললো,
–মাথা নিচু করার কিছু হয়নি। দায়িত্ব ছিল ।পালন করেছো। দায়িত্ব শেষ। এখন যাও। আর দ্বিতীয়বার এসো না।
সাগরিকা কিছু বলতে চাইলে ঊর্মিলা থামিয়ে দিল।
আমাকে একটু একা থাকতে দাও।
ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাগরিকা বেরিয়ে গেল।
সোহাগ উঠে দাঁড়িয়ে ঊর্মিলার মাথায় হাত রাখলো।
আমি কিছুই জানতাম না। পরিস্থিতিতে তোমাকে রক্ষা করতে পারিনি। কিন্তু মনে রেখো ।তুমি একা না।
ঊর্মির চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো।
তবে কিছু বললো না।
___________
মেয়েদের জীবন নাকী সহজ কচু পাতার মতো,
তাদের জন্মই নাকী হয়েছে করতে মাথা নত।
শুনতে পাওয়া যায় তাদের জীবনের অধ্যায় গুলো সম্পূর্ণ শুখময়,,
জীবনটাই কাটায় তারা করে অভিনয়।
আসলেই কি তাই,,,
তাদের জীবন সম্পর্কে আমরা কজন জানতে চাই।
মেয়েদের সম্পর্কে আজ নাহয় আমি বলি,,,,
আমরা কতো অভিনয় করে সমাজে চলি।
উচ্চস্বরে হাসতে মানা বলেন গুরুজন,,
মনের কষ্টে কাদতে হলেও মানতে হয় নিয়ম।
তাইত তারা হাঁসি আটকায়,
কাদে নীরবে…
সেই কান্নাতে কষ্ট কি তাদের দূর হয় সহজে।
জন্ম হয় বাবার ঘরে,
বড় হয় কতো আদরে,
হঠাৎ শুনতে পায় এটা তাদের আসল ঘর নয়!
কষ্ট হলেও যেতে হবে মা বাবাকে ছেড়ে…,
কাদতে কাদতে যেতে হবে ঐযে শশুর ঘড়ে।
নিজের বলতে নেইকো ভাই তাদের কোনো বাড়ি,
ভাগ্য তাদের সহায় নয় কারন তারা নারী ।
~ফারজানা সিদ্দিকি 🖋️
মা বাবার কি একটু কষ্ট হলো না আমাকে এরকম পরিস্থিতিতে ফেলতে?মা বাবারা বুঝি এমন হয়?একমনে ভাবছিলো ঊর্মি।
মাম্মা…
মিমির কণ্ঠে চমকে উঠলো সে ।
মেয়েটা সামনে এসে হাত ধরে টানছে। পারলাম না মুখ ফিরিয়ে নিতে। বসে পড়লাম। কখন বসে পড়লাম, বুঝতেই পারিনি।
নরম হাত দুটো চোখের জল মুছে দিচ্ছে।
আঙুল তুলে বলছে,
—গুড গার্লরা কাঁদে না। আর কাঁদলে ভুট আনবো!
হাসি আর কান্না একসাথে এসে পড়লো। জড়িয়ে ধরলাম ওকে। এত নিঃসঙ্গতার ভেতর এক অপ্রত্যাশিত সঙ্গী। জরিয়ে ধরে নিজের সম্পূর্ণ উদাসীনতা মুছে ফেলার চেষ্টা।
কিন্তু এভাবে বসে থাকার সময় নেই। জানতে হবে ।আমি কেন এখানে? বউ থাকতে কেন আমি?কি উদ্দেশ্য?
পেছন থেকে কায়সারের কণ্ঠ,
–সৎ মেয়ে সৎ মেয়ে বলে মুখে ফেনা তুলা কচি সৎ মায়ের একি রুপ ।
কায়সারের বিদ্রুপে বিশেষ পাত্তা দিলো না ঊর্মি।মিমিকে সামনে এনে বলল,
–যাও। মাম্মার কাজ আছে।
মেয়েটি শান্ত ভাবে চলে গেলো।
ঘুরে তাকালো সেই দিকে। চোখে এবার প্রখরতা।
–আমি ভেঙে পড়তে পারি, মানিয়ে নিতে পারি ।কিন্তু অন্ধ থাকতে পারবো না।
বাইরে বৈরী হাওয়া আরও জোরে বইতে লাগলো।
এই হাওয়াতে আমি এক নিরব যুদ্ধে নামালাম।টিকে থাকার লড়াই।আমাকে অবলা ভাববেন না।একদম গুরিয়ে দিবো।
কায়সারের মুখে ফুটে উঠলো বাঁকা হাঁসি। সামনে এসে সামান্য নিচু হয়ে বিদ্রুপাত্মক কন্ঠে বললো,
আমি কায়সার দেওয়ান।তুমারি তো।পতির অমঙ্গল করা কিন্তু ভালো ম্যানার্স না। আল্লাহ পাপ দিবে।
উনার এমন কথায় গা জ্বলে উঠলো,একবার শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বাইরে চলে যাচ্ছিলাম।
কায়সার পিছন থেকে চেঁচিয়ে বললো,শুনো কচি বউ চোখের দেখা সব সত্যি নয়।শষ্যের ভিতরেও কিন্তু ভুত থাকে।
ঊর্মিলার পায়ের গতি হঠাৎ থমকে গেলো।
চলবে…
(ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।আপনারা আপনাদের মতামত জানাতে ভুলবেন।লেখার জগৎে নতুন আমি। আপনাদের মতামত আমি উৎসাহ পাই)

