বৈরি_হাওয়া
পর্ব_৪
ফারজানা_প্রণয়_চৌধূরি
—স্বর্ণার সঙ্গে কায়সারের ডিভোর্স হয়ে গেছে । মিমির বয়স তখন মাত্র এক বছর। মিমি জানেই না, স্বর্ণাই তার জন্মদাত্রী মা।
স্বর্ণা ভাবির মুখে কথাগুলো শুনে আমি যেন আশ্চর্যের চরম শিখরে পৌঁছে গেলাম। কৌতূহল আর উত্তেজনায় গলা সামলাতে পারলাম না। খানিকটা চেঁচিয়েই বলে উঠলাম,
কি! ডিভোর্স হয়ে গেছে? তাহলে উনি এই বাড়িতে কেন? আর তখন নিজেকেইবা কেন বউ বলে দাবি করলেন ?
প্রতিটা বাক্য যেন আমাকে আরও গভীর এক গোলকধাঁধায় আটকে দিচ্ছে। সময় যত এগোচ্ছে, মাথার ভেতর তত প্রশ্ন জমছে। আমার অস্থিরতা বুঝে ভাবি একবার আমার দিকে তাকালেন ।তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন—
—-স্বর্ণা আসলে এই বাড়িরই মেয়ে। সম্পর্কের দিক থেকে কায়সারের চাচাতো বোন। কায়সার এই বাড়ির মেজো ছেলে। এটা যৌথ পরিবার । এতক্ষনে হয়তো বুঝে গিয়েছ। আমাদের শ্বশুররা দুই ভাই। শ্বশুর এমদাদ দেওয়ান । আর চাচাশ্বশুর হুমায়ূন দেওয়ান। কায়সাররা তিন ভাই ।বড় আমার স্বামী কায়াস দেওয়ান, মেজো কায়সার, আর ছোট আয়াশ। স্বর্ণা এই বাড়ির একমাত্র মেয়ে । বাড়ির দুই ভাইয়ের সংসারের এক টুকরো নূর।
ভাবির কণ্ঠে হালকা দীর্ঘশ্বাস।
ছোটবেলা থেকেই কায়সার আর স্বর্ণার মধ্যে আলাদা এক বন্ধন ছিল। বাকি ভাইদের থেকে কায়সারই ওকে বেশি আগলে রাখতো। ওদের এই ঘনিষ্ঠতা দেখে দাদি ছোটবেলাতেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে কায়সার বদলাতে শুরু করে। প্রাণচঞ্চল ছেলেটা ধীরে ধীরে গম্ভীর, রূঢ় হয়ে ওঠে। পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ে। অথচ স্বর্ণার ওপর ওর অধিকারবোধ বেড়েই চলে। স্বর্ণাকে সে নিজের মতো করে চালাতে চাইতো ।বন্দি করে রাখতে চাইতো।
স্বর্ণা তখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে, আর কায়সার সদ্য অনার্সের ছাত্র। পড়াশোনার সুবিধার জন্য সে ভার্সিটির কাছে আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে থাকতে শুরু করে। নিজের জগতে পুরোপুরি ডুবে যায়।
কায়সার বাড়ি ছাড়তেই স্বর্ণা যেন হঠাৎ মুক্তির স্বাদ পেয়ে যায়।
ভাবি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
–কায়সারের শাসন ওর কাছে তখন বিরক্তিকর লাগতো। খারাপ বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করে। সবাই ভেবেছিল এই বয়সে এমনটা হতেই পারে। কেউ গুরুত্ব দেয়নি। কায়সার বাড়ি এলে স্বর্ণা মামার বাড়ি চলে যেতো। ধীরে ধীরে দুজনের মাঝখানে দূরত্ব তৈরি হয়।
কায়সার পড়াশোনা শেষ করে বাড়ির ব্যবসায় যুক্ত হয়। কিন্তু স্বর্ণাকে নিয়ে তার আগের মতো কোনো মাথাব্যথা দেখা যায় না। আচরণে যেন ইচ্ছাকৃত এড়িয়ে যাওয়া।
“হঠাৎ একদিন,
ভাবির কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো।
–স্বর্ণা বিদ্ধস্ত অবস্থায় বাড়ি ফেরে। সারাদিন ঘর বন্ধ। কোনো সাড়া নেই। সবার মনে ভয় ঢুকে পড়ে। অথচ কায়সার নির্বিকার। সবাই যখন দরজা ভাঙার কথা ভাবছে,
তখন কায়সার উপহাসের সুরে বললো
—দরজা ভাঙো। হাত বেশি কাটেনি। মরবে না। মরার হলে ফ্যানেই ঝুলত।
ভাবি একবার আমার দিকে তাকিয়ে আবার বলতে শুরু করল
–আমি তখন সদ্য বউ। শ্বশুর রেগে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন ।কায়সার, সীমা ছাড়িয়ো না।
প্রতি উত্তরে কায়সার শুধু বাঁকা হাসলো। পকেটে হাত ঢুকিয়ে শিষ বাজাতে বাজাতে চলে গেল।
দরজা ভাঙা হলো। ভেতরের দৃশ্য দেখে সবার চোখ কপালে। স্বর্ণার কাটা রগ থেকে রক্ত ঝরছে। পাশেই রক্তমাখা ছুরি। কায়াস কোলে তুলে দৌড়ে বেরোল। কায়সারকে ডাকলো।
“ভাই, গাড়ি বের কর!”
কায়সার এসে কৌতূহলের স্বরে বললো,
–উফ, সো স্যাড! ছুরি নিতে দেখে ভেবেছিলাম বেশি কাটবে না। পুঁটি মাছের কলিজা কিনা।যাইহোক শেষ মুহূর্তে খানিকটাই কেটেছে । আরেকটু হলে ভালো হতো।
তারপর নির্বিকারভাবে বলে গেল,
ভাইয়া, আমার কাজ আছে। চিন্তা করো না ।কই মাছের জান। এত সহজে মরবে না। কায়সারের ভাবলেশহীন উত্তর বাড়ির সবাই হকচকিয়ে উঠেছিলো। তবে এত বেশি আমলে নেয় নি কেউ।
তাড়াহুড়ো করে হাসপাতালে নেওয়া হল। অনেক ক্রিটিক্যাল সিচুয়েশন ফেস করে অপারেশন সফল হলো। বেঁচে গেল স্বর্ণা। কিন্তু বেড রেস্টে থাকতেই জানা গেল ,ও গর্ভবতী ছিল। যে ছেলের সাথে অবৈধ সম্পর্কে ছিল ছেলেটা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেছে।
সবাই স্তব্ধ। যেনো সব তাদের মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।ছোট চাচি রাগে অস্থির। চাচা তখন মাথা নিচু করে কায়সারের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
–বাবা, আমাকে বাঁচা… সমাজে মুখ দেখাতে পারবো না।
কায়সার শান্ত গলায় বললো,
–চাচ্চু, বাচ্চাটা আর নেই।
আরো একটি বাজ পড়লো।আজ যেনো সবার চমকে যাওয়ার পালা। তাঁদেরকে আরো চমকে দিয়ে নির্লিপ্তভাবে জানালো—
স্বর্ণা নিজেই গর্ভপাত করিয়েছে। অস্তিত্ব আসার আগেই শেষ করে ফেলেছে ঐ জালিমটা।
সবার চোখ তখন কায়সারের দিকে নিবদ্ধ।ভাবতে লাগলেন এটা তাদের ঘরে কি জন্মালো?কি শুনছেন তারা?
মেয়েকে মানুষ করতে না পারার তাড়নায় সম্পূর্ণ ভেঙে পরেছিলেন চাচ্চু।দু পা পিছিয়ে গেলেন।পিছনে একবার চাচির দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে চলে গেল বাইরে।পিছনে পরে রইলো সকলের দীর্ঘশ্বাস ।চাচির ছলছল দৃষ্টি।
–হাঁসি,,,
কায়াস ভাইএর ডাক শুনে আমাদের ঘোর কাটালো।ভাবি তাড়াহুড়ো করে কমল স্বরে বললো, ঊর্মিলা তোমার ভাইয়া ডাকছে।এবার আসি।পরে একসময় সবটা বলবো।চিন্তা করো না। ঠিক আছে।
মাথার ভেতর প্রশ্নের পাহাড়। এত কিছুর পরেও বিয়ে কীভাবে হলো? ডিভোর্স বা কেন হলো?আর মিমি?
হঠাৎ মনে পড়লো । তখন বলা কথাটি।
–শষ্যের মাঝেও ভুত থাকে।
তখন পাশ কাটিয়ে যাওয়া সময় এমন কথা শুনে চলা থামিয়েছিলাম। খানিকটা পিছু ফিরে তাকানোর পর
ইবলিশটা বাঁকা হেসে, চোখ টিপে দিয়ে ফ্লাইং কিস দেখায়—-রাগে তখন রক্ত গরম হয়ে উঠেছিল।বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে চলে এসেছিলাম। তাই তার সেই কথার আসল মর্মার্থ বুঝার অবস্থায় ছিলাম না।
ঘর থেকে বের হয়ে ছাঁদে যাচ্ছিলাম।তখন ভাবির সাথে দেখা।টানতে টানতে নিয়ে আসেন ছাদে । এবং বলতে লাগলেন স্বর্ণা এবং কায়সারের অতিত।
আর পারছি না নিতে।আমার মতো নির্ভেজাল মেয়ের সাথেই কেনো এমন। যেভাবেই হোক যাই হোক।বিয়ে হয়েছিলতো ওদের?একটা মেয়েও আছে।যা আমার সহ্য সিমার বাইরে। মানলাম মেয়েটা ছোটো। তবুও
এই সংসার আমার জন্য নয়। এই পরিবার হলো আমার জন্য কারাগার। আমাকে মুক্তি পেতেই হবে। যেভাবেই হোক।আগে নিজের একটা যায়গা করতে হবে।আর কারো উপরে নির্ভরতা নয়।আমার লড়াই আমাকেই লড়তে হবে।
আর এক মিনিট!আমিই বা কেনো ঐ মেঝ ইবলিশ দেওয়ানের সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি?কেনো ঐ ইবলিশটাকে জন্য আগ্রহ দেখাচ্ছি?না উর্মি না।দুর্বলতা নয়।শক্ত হও।এ দুনিয়া শক্তের ভক্ত নরমের জম। যা ইচ্ছে হোক ঐ ইবলিশটার লাইফে।তাতে তর কি?আমার কোনো ইচ্ছে নেই ঐটার সেকেন্ড ওয়াইফ হিসেবে নিজেকে পরিচয় করাতে।
সবকিছুর মাঝে একটা কষ্ট অপূরণীয়।বাবা কেনো আমাকে এমন জাহান্নামে পাঠালো?এতই বোঝা ছিলাম যে এভাবে ঠকালো!
নিজ মনে বিড়বিড় করতে লাগল,
ঠকতে শিখেছি, ঠকাতে নয়। ভাঙতে এসেছি অনেক কিছু । নিজেকে নয়। অন্ধকারের চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে, বৈরী হাওয়ার মধ্যেই চলবে আমার টিকে থাকার নীরব যুদ্ধ।
———
“পাপা টুডলিংপং!”
মিমির এমন কন্ঠে থমকে গেল কায়সার। অফিস থেকে ফিরেই এই দৃশ্য। মেয়ে উচ্ছাসিত কন্ঠে উক্ত বাক্যটি ছুঁড়ে দিয়েছে তার দিকে।
পাশ থেকে নিঝুম বলছে,
—আরে বুদ্ধু ওটা টুডলিং নয় চুদলিংপং।
—আরে বুডো না তেন ঐটাই তো বললাম টুডলিং পং
কায়সারের টুডলিংপং এর আসল মানে বুঝতে কিছুটা সময় নিল। যখন বুঝতে পারলো তারাতারি ছোটো দুই দেওয়ানের কাছে আসলো । উত্তেজিত সুরে বললো,
—মিমি, নিঝুম এসব কোন ধরনের ভাষা। এগুলো কোথা থেকে শিখেছো তুমরা?
নিঝুম স্বগর্ভে বলে উঠলো,
—চাচ্চু আমি ফোনে দেখেছি এক ভাইয়া বলছে এটা নাকি জাতীয় ভাষা।
কায়সার নির্বাক দর্শকের মতো তাকিয়ে রইলো। বুঝে গেল ,মোবাইলের বাজে প্রভাব পরছে ওদের উপর।
ওদেরকে এসব থেকে দূরে রাখতে হবে।না হলে এই বাড়ি সার্কাসে পরিণত হতে বেসি দেরি নেই।
পিছন থেকে ভেসে আসলো কারো উচ্চ স্বরে হাসির শব্দ
চলবে…
অনেক ব্যাস্ততার মাঝেও গল্পটি দিলাম।তবে আমি আশাহত। সারাদিনের ব্যাস্ততায় সময় বের করে গল্প লিখার চেষ্টা করি। কিন্তু আপনারা নিরব থাকেন।আপনারা যদি সামান্য উৎসাহ দিলে লিখার জন্য খুব আগ্রহ পাই। আপনাদের সাড়া পেলে রেগুলার গল্প দেওয়ার চেষ্টা করবো। এবং পর্বগুলো বড় করে দিবো।
তাড়াহুড়ো করে লিখেছে।ভুল হলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাইকে ধন্যবাদ।

