#বৈরি_হাওয়া |
পর্ব–৫
লেখা: ফারজানা প্রণয় চৌধূরী
চারপাশ জুড়ে হাসির রিনঝিন শব্দ। অদ্ভুত এক মুগ্ধতা। বাচ্চা দুটো যেন আকাশের চাঁদ পেয়ে গেছে। ঊর্মিলার চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে উচ্ছ্বসিত হয়ে নাচছে তারা। বাচ্চাদের কোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠল পুরো বাড়ি। একে একে সবাই বেরিয়ে এলো। এই অপ্রত্যাশিত দৃশ্য দেখে সবার চোখে ছড়িয়ে পড়ল বিস্ময় আর মুগ্ধতা।
এ যেন একেবারেই অন্য ঊর্মিলা। কেই-বা বলবে, এই মেয়েটাই সকালবেলা এমন হুলুস্থুল কাণ্ড ঘটিয়েছিল! কী শান্ত, কী স্নিগ্ধ তার মুখ। সাজেদা বেগমের মনে হালকা অনুতাপের ঢেউ খেলল। সকালে মেয়েটাকে তিনি অনেক কথা শুনিয়েছেন । যা আদতে বলতে চাননি। আসার পর থেকেই একের পর এক অদ্ভুত আচরণ, তার ওপর সংসারের চাপ ।সব মিলিয়ে সহ্য করতে পারেননি। তাই তো হাত উঠেছিল।
কিন্তু এখন তাকিয়ে মনে হচ্ছে, তিনি ভুল করেছিলেন। মেয়েটার গায়ের রং খানিকটা চাপা হলেও, এক অদ্ভুত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। হাসলে গালে ছোট্ট একটা টোল পড়ে। সেই ক্ষুদ্র গহ্বর যেন সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দেয়। ঠোঁটের পাশে ছোট্ট একটি তিল, এলোমেলো চুল।দেখলেই বোঝা যায়,খুব বেশি পরিপাটি নয়। তবুও এক আলাদা আকর্ষণ। তাই বলেই তো, সে দেওয়ান বাড়ির বউ।
হঠাৎ করেই হাসির শব্দ থেমে গেল। সবার উপস্থিতি টের পেয়ে ঊর্মিলা চুপ করে গেল। সামনে তাকাতেই কায়সারের চোখের সঙ্গে চোখ পড়ল। মুহূর্তেই সে চোখ ফিরিয়ে নিল।
কায়সারের মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই—সে মুগ্ধ নাকি বিরক্ত।
ঊর্মিলার হাসি থামায় বাচ্চা দুটোর একদমই পছন্দ হলো না। ভেসে এলো মিমির শাসনের স্বর,
“মাম্মা, হাতো তো! তামলে কেন? হাতো, হাতো!”
মিমির কথায় নিঝুম বিরক্ত হয়ে উঠল।
“উফফ, মিমি! এই উল্টোপাল্টা কথা বন্ধ করবি কবে? কিসের হাতো? আমাদের একটু রহম কর। আমরা তো তোর মতো ইংরেজি মিডিয়ামে পড়ি না!”
নিঝুমের কথা মিমির একদম ভালো লাগল না।
গাল ফুলিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল সে।
–বউমা, আরেকটু হাসো না। খুব ভালো লাগছিল।
নিঝুমের কথায় ঊর্মিলার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল। সে বাচ্চা দুটোকে সামনে এনে হাঁটু গেড়ে বসল।
“আর না বাবা। বেশি হাসলে মাম্মা কষ্ট পাবে। আরেকদিন, ঠিক আছে?”
দুজনেই মাথা নাড়ল।
এই ফাঁকে কায়সার সবকিছু পরখ করতে করতে ঘরের দিকে যেতে উদ্যত হলো। হঠাৎ করিডোরের দিকে নজর পড়তেই থমকে গেল সে। এক জোড়া মুগ্ধ চোখ ঊর্মিলার দিকে তাকিয়ে আছে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আয়াশ দেওয়ান। মনে হলো, এইমাত্র এসে পৌঁছেছে।
দীর্ঘদিন ভ্রমণে ছিল আয়াশ। স্বভাবে সে উড়নচণ্ডী—নিজের ইচ্ছেমতো চলে, বাড়ির ব্যাপারে বিশেষ মাথা ঘামায় না। ফোন পেয়েই সফরের প্ল্যান বাতিল করে ফিরে এসেছে। ফিরে এসে এই দৃশ্য দেখে সে সত্যিই হতবাক।
বিস্ময়ভরা চোখে ঊর্মিলার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ঊর্মিলা… আপনি?”
ঊর্মিলা শান্ত চোখে তাকাল। কোনো অবাক হওয়ার ছাপ নেই । যেন সে এমনটাই আশা করেছিল।
পাশ থেকে হেসে উঠল হাঁসি।
—ছোট ভাইয়া, তুমি ঊর্মিলাকে চেনো?
—হ্যাঁ ভাবি। খুব ভালো করেই চিনি। গত বছর কক্সবাজারে দেখা হয়েছিল। সেবার তো জানোই, বাড়ির গাড়ি নেইনি। বাসে যাচ্ছিলাম—উনার সিট আমার পাশেই ছিল।
—তবে উনি এখানে কেন?
ঠিক তখনই মিমি বলল,
–তাত্তু আমাল মাম্মা।
এই কথায় বিস্ময়ের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছাল আয়াস। একবার ভাইয়ের দিকে, একবার ঊর্মিলার দিকে তাকাল। মাথার ভেতর হাজারো চিন্তা ঘুরপাক । এমন ছ্যাঁকা খাবে—সে ভাবতেও পারেনি।
চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছিল—
—না! আমি বিশ্বাস করি না! এটা অন্যায়!একেই বুঝি বলে ক্রাশ যখন ভাবি। কষ্টের সাগরের ডুবে যাওয়ার মূহুর্তে।
কায়সারের গলা খাঁকারির শব্দে কল্পনার জগৎ ভেঙে গেল আয়াশের।
—এখন যাও। ফ্রেশ হও।
ভাইয়ের কথায় মাথা নিচু করে চলে গেল আয়াস।
–বউ মা, চা দিয়ে যাও।
শ্বশুরের ডাকে তড়িঘড়ি করে রান্নাঘরের দিকে গেল হাসি। স্বর্ণা এসেই আবার চলে গেছে। ঊর্মিলাকে সহ্য হয় না তার ।গা জ্বলে ওঠে। চাচি রেহেনাও রান্নাঘরে ঢুকে পড়ল। পেছনে রইল শুধু সাজেদা বেগম।
ধীর পায়ে চলে যাচ্ছিল ঊর্মিলা।
হঠাৎ শাশুড়ির কণ্ঠে থমকে গেল সে।
–সংসারের দিকে নজর দিচ্ছো। স্বাভাবিক হচ্ছো। ভালোই লাগছে।
ঊর্মিলা ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টানল।
–আপনার এটা কেন মনে হলো?
সাজেদা বেগম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। চোখের দৃষ্টিটা ভারী ।
ঊর্মিলা আবার বলল,
–শুনুন, আকাশকুসুম ভাবার দরকার নেই। মেয়ে হয়েছি মানে দুর্বল নই। আর এখানে কোনো সিরিয়াল চলছে না। যা হবে, মেনে নেবো। মাটি কামড়ে পড়ে থাকবো ।
সাজেদা বেগম হেসে উঠলেন। সেই হাসিতে মায়া নেই, আছে অভিজ্ঞতার ভার। নিরট কণ্ঠে বললেন,
—বাস্তবতা বোঝো, মেয়ে? এই সমাজে একা থাকা কি এত সহজ?
ঊর্মিলা এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর কণ্ঠ নামিয়ে, অথচ দৃঢ়ভাবে বলল,
—সহজ কিছুই না। কিন্তু কঠিন জীবন মানেই তো হার মানা না।
একটু থেমে আবার যোগ করল,
–কেন জানি না, এই বাড়িতে আমি রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি। তবে ভয় নেই। এত তাড়াতাড়ি যাচ্ছি না। দাবার শেষ চালটা দিয়েই যাব।
এই বলে ‘ডোন্ট কেয়ার’ ভঙ্গিতে নির্বিঘ্নে হাঁটতে লাগল সে।
পেছনে না তাকিয়েও বুঝতে পারল—
শাশুড়ির কটমট দৃষ্টি এখনো তার উপরে নিবদ্ধ।
—————————–
–কচি কিশোরীর পায়ের ধুলো তাহলে এখানে পড়ল?
কায়সারের বিদ্রুপে ঊর্মিলা পাত্তা দিল না। সে নিজের মনে বিছানা গুছাচ্ছিল। হঠাৎ পেছনে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে ঘুরতেই কারো বুকে ধাক্কা খেল।
মাথা তুলে দেখল । শ্যামবর্ণের সেই পুরুষ। কায়সার।
সে একটু ঝুঁকে ঊর্মিলার চোখের দিকে তাকাল। কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
–ভালো করে শুনে রাখো, কচি বালিকা। অতিরিক্ত চালাকি বোকারাই করে। বেশি চালাকরা পদে পদে ভুল করে। এই লিলিপুট বুদ্ধি নিয়ে আমার সঙ্গে লড়তে এসেছ?
ঊর্মিলা জমে গেল। কায়সারের দাড়ির হালকা স্পর্শে শরীর শিহরে উঠল।
কেলো করেছে!
ইবলিশটা বুঝে ফেলেছে। আরো সাবধানে চলতে হবে। মেপে পা ফেলতে হবে। মালটা খুব ধূর্ত।এটা আসলে যা দেখায় তা নয়।এমন সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে পিছোতে গিয়ে হঠাৎ পা ফসকে পড়ে গেল সে। বাঁচার খুঁটি হিসেবে কায়সারকে ধরতে চেয়েছিল, কিন্তু মুহূর্তেই কায়সার সরে যায় ।
ফলে—ঊর্মিলা এখন মেঝেতে।কায়সারের ঠোঁটে বাঁকা হাসি।
–কি ভেবেছিলে? তুমি পড়ে যাবে, আমি নায়ক হয়ে ধরবো?তারপর এক অপরের চোঁখের দৃষ্টি বিনিময়। ঘন্টার পর ঘন্টার তাকিয়ে থাকবো। বিশ্বাস করো অতো ধৈর্য্য আমার নেই। সাহসীরা কখনো বাঁচার খুঁটি খুঁজে না।বরং নির্বিঘ্নে হোঁচট খায়। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উঠে।
ঠাট্টার সুরে যোগ করল,
উফ! সো সরি, কচি বউ! আজ আমার নায়ক না হওয়ার কারণে আপনার অবস্থান নিচে।
ঊর্মিলার রাগে ইবলিশটার চুল ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করল। আগুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
—আপনি একটা যাতা। কুচোটে মহিলাদের মতো ঝগড়ুটে।
–ওই হ্যালো! ঝগড়া কি শুধু তোমাদের একার কাজ নাকি? নাকি নিজের নামে দলিল করে নিয়েছ?
ঊর্মিলা আর কথা বাড়াল না। কমরে হাত দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ব্যথা ভালোই পেয়েছে। আর এক মুহূর্তও এই ঘরে থাকবে না।
বালিশ আর কাঁথা নিয়ে গেস্ট রুমের দিকে হাঁটা ধরল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে ডাক,
–শুনো, কচি মেয়ে…
ঊর্মিলা বিরক্ত হয়ে মনে মনে গজগজ করল।
কি আশ্চর্য! বাসর রাতে রাগের মাথায় বলা কথাটাই এখন নিজের ওপর ভারী হয়ে পড়ছে। জানলে কখনোই ‘কচি’ শব্দটা ব্যবহার করতাম না। লোকটা তারপর থেকে নামটাই পাল্টে দিয়েছে। কচি, কচি করে —মাথা খাচ্ছে।
শালা, দেখবি একটার পর একটা বউ যাবে। আগে স্বর্ণা গেছে, এবার আমি যাব। তারপর আবার বিয়ে করবে। ইতর লোক!
বিরক্ত হয়েই পেছনে ফিরল সে। একবার কায়সারের হাতে, একবার নিজের দিকে তাকাচ্ছে সে।
ছিঃ! এতক্ষণ এই চরিত্রে সমস্যা থাকা লোকটার সামনে ওড়না ছাড়া ছিলাম!
লজ্জায় মাটি ফেটে ঢুকে যেতে ইচ্ছে করল।
কায়সারের মুখে দুষ্টু হাসি। ঠাট্টার সুরে বলল,
—“আরে, আমরা আমরাই তো। এত লজ্জা পাওয়ার কী আছে?”
সে আরও কিছু বলার আগেই ঊর্মিলা হাত থেকে ছোঁ মেরে ওড়নাটা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।লজ্জায় আর পেছনে তাকাল না ।তাকালে হয়তো দেখতে পেত—
কারো মোহমুগ্ধ দৃষ্টি।
চলবে…
কী হতে যাচ্ছে?ঊর্মিলা আর কায়সারের গল্প কি মিলনের দিকে যাবে,নাকি এই বৈরি হাওয়ায় ভেঙে পড়বে সম্পর্কের সব সমীকরণ?এই বাড়ির অন্ধকারে কি লুকিয়ে আছে আরও গভীর কোনো রহস্য?নাকি ভালোবাসার নামেই লেখা হবে সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা?
সব উত্তর জানতে হলে—অপেক্ষায় থাকুন।
আর আজকের পর্বে আপনাদের ভালোবাসা ও মতামত যদি পাশে পাই,
তাহলে এই গল্পের আগুনে
একটি বোনাস পর্ব যোগ করার চেষ্টা করবো। ধন্যবাদ 🌸

