রুমের পিনপতন নিরবতায় ভেসে আসছে ঊর্মির অস্পষ্ট ধ্বনি। পেছন থেকে চুল শক্ত করে ধরে ঝাঁকাচ্ছে কেউ। চোখ-মুখ কুঁচকে আসে তার।
পেছন থেকে ভেসে আসছে কারো হিসহিস শব্দ। এ যেনো জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। মুখ না দেখেও বুঝতে পারলো ব্যাক্তিটা কে ? নিজেকে ধাতস্থ করলো ঊর্মি। হাতের কনুই দিয়ে পিছনের ব্যাক্তিকে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে আঘাত করলো। খানিকটা কঁকিয়ে উঠলো সে । হাত কিছুটা শিথিল হলো তার । সেই সুযোগে ঊর্মি হেচকা টান দিয়ে সামনে নিয়ে আসলো তাকে। অবস্থান পুরো পাল্টে গেলো।
সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে স্বর্নার হাত মুচরে ধরলো ঊর্মি। পিঠের সাথে মিসিয়ে ঝাঁকি দিলো। ফলস্বরূপ অস্পষ্ট ধ্বনি তুললো স্বর্না। ব্যাথা মিশ্রিত কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো,
ছাড়ো বলছি। একদম শেষ করে ফেলবো।
প্রতি উত্তরে ঊর্মির মুখে ফুটে উঠলো রাগ। সে আরেকটু শক্ত করে ধরলো হাত। তেজি কন্ঠে বললো,
আমাকে ভালো ভেবে ভুল করেছো তুমি। প্রথম যেদিন দেখেছি সেদিনই চুল ধরে ঝাঁকাতে ইচ্ছে করেছিলো। কিন্তু ভদ্রতার খাতিরে কিছু বলেনি। যথেষ্ট দুরুত্ব বজায় রেখে চলেছি। তার প্রতিদানে তুমি আমার চুল ধরার সাহস করলে। হাউ ডেয়ার?
স্বর্নাও যেনো কোনো দিক দিয়ে কম না। অস্থিরভাবে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে চেচালো,
ছাড়ো মেয়ে। তুমি যা করছো একদম ঠিক করছো না। প্রথমত তুমি আমার সংসারে দখল করে বসে আছো।
তুমি কি এই বাড়ির?কিছুই না।
তোমার থেকে আমার অধিকার বেশি। আমি এই বাড়ির মেয়ে। এই বাড়ির বউ। এবং ঐ বাচ্চাটার মা । ও আমার সন্তান। যতই ডিভোর্স হোক। ঐ বাচ্চাটা আমাকে অবশ্যই নিয়ে আসবে। আমার রক্ত ও। এটা নিশ্চয়ই শুনেছো ,রক্ত কখনো বেঈমানি করে না।”
ঊর্মি সামান্য হাসলো। তাচ্ছিল্যের সুরে বললো, সত্যি মন থেকে হাসি আসছে। আমি যদি ইচ্ছে করি, আপনি এই বাড়ির মেয়ে হয়েও এ বাড়ি ছাড়তে বাধ্য। নেহাত সংসার করার ইচ্ছা নেই। নাহলে এতো দিনে আপনি এই বাড়ি থেকে আউট। বাচ্চাটা আপনি ধুয়ে পানি খেলেও কিচ্ছু করার ছিলো না।
ঊর্মির কথায় যেনো দানবীয় শক্তি পেলো স্বর্না। এক ঝাকিতে ঊর্মিকে ফেলে দিলো নিচে। ঊর্মিও যেনো প্রস্তুত ছিলো। স্বর্নাকে নিয়েই পড়লো। রাগের চরম পর্যায় পৌছে গেলো স্বর্ণা। ঘৃনা, রাগ, হিংসা সব কিছু একসঙ্গে মিশ্রিত করে ঊর্মির চুল ধরলো । ঊর্মিও বাদ যায় নি। সেও চুল মুস্টিবিদ্ধ করে ধরলো। ফলস্বরূপ দুইজন দুইজনের চুল এমন ভাবে ধরে, যেনো এটা কোনো প্রতিযোগিতা। যে বেশি টানবে। সেই বিজয়ী।
ওদের ঝগড়া মারাত্মক পর্যায়ে চলে গেছে। বাইরে থেকে কারো আসার শব্দ পেয়ে স্বর্ণার দিকে একবার তাকালো ঊর্মি। তারপর ধীরে চুলগুলো ছেড়ে দিলো। হঠাৎ এমন পরিবর্তনের মানে বুঝলো না স্বর্ণা। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ঊর্মির চোখে। এই সুযোগেই ঊর্মি তার নিজের কাজ সেরে ফেললো। এতো জোরেই টেনেছিলো বেচারির কিছু চুল চলে এসেছে। সেগুলো সন্তর্পণে স্বর্ণার হাতে দিয়ে দিয়েছে। এবং ইচ্ছে করেই কঁকিয়ে উঠছে। ব্যাপারটা এমন সে খুব নিরীহ। স্বর্ণার কাছে পরে পরে মার খাচ্ছে।
খানিকটা হকচকালো স্বর্ণা। দ্রুত উঠে পিছনে ফিরেই দেখতে পায় কিছু অবাক দৃষ্টি। একবার সামনে তো একবার নিচে শুয়ে থাকা ক্রন্দনরত ঊর্মিকে দেখছে। দুয়ে দুয়ে চার মিলালো সে।
মনে মনে ভাবলো, এই মেয়ের তো শেয়ালের মতো গিঁটে গিঁটে বুদ্ধি। যতটা সহজ ভেবেছিলাম এটা ততটা সহজ নয়।
তার ভাবনা চিন্তার মাঝেই ঠাসস করে চড় বসলো। রেহেনা দেওয়ান । খুব জোরেই মেরেছেন। তেজি স্বরে বললেন, “তুই তো নষ্ট আগে থেকেই ছিলি। কিন্তু ধীরে ধীরে অবাধ্যতা বেড়েই চলেছে। তর জন্য কোনো না কোনো অশান্তি লেগেই আছে। নষ্ট মেয়ে কোথাকার।”
স্বর্ণা যেনো বাকহারা হয়ে গেলো। কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বললো, তুমরা সবাই পেয়েছোটা কি? এটা কি গাল? নাকী রুটি বানানোর আটা যে যেভাবে পারছো চড়াচ্ছো।
ঊর্মির দিকে আবার তেড়ে যাবে তার আগেই আটকে দিলো হাসি। কোনোরকম মেয়েটাকে উঠালো। হাসি আর নিজেকে থামাতে পারলো না।
রেহেনার দিকে তাকিয়ে বললো, চাচিমা, ও দিন দিন সাইকো হয়ে যাচ্ছে।ওর থ্যারাপি দরকার। দেখেন ওর হাতে চুল। কোন ধরনের পাগল বুঝতে পারছেন।”
স্বর্ণার এবার সত্যি কান্না আসলো। রাগে ক্ষোভে কান্না করে দিলো সে। ক্ষোভ ঝড়া দৃষ্টিতে তাকালো ঊর্মির দিকে। প্রতিউত্তরে ঊর্মিও কান্নার অভিনয়ে বললো, “আপু, দারাতে পাচ্ছি না।”
হাসি উদ্বিগ্ন হয়ে গেলো। সাথে সাথে বিছানায় শুয়ালো তাকে।
কায়সার একবার স্বর্ণা তো একবার ঊর্মির দিকে তাকাচ্ছে। স্বর্ণার চুল যেভাবে জট পেকে আছে সেভাবে ঊর্মিরটা হয় নি। ঊর্মির ভাবভঙ্গিও খানিকটা সন্দেহজনক। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। সেই সময় ঊর্মিও কান্নাভেজা চোখে তাকালো। চোখ জলছল। কিন্তু দুষ্টু হাসি। যেনো তাকে ঐ চোখেই শাসাচ্ছে । চোখ দিয়েই হয়তো বলছে ,যদি পরেরবার লাগতে আসেন। স্বর্ণার যায়গায় আপনি থাকবেন।
তখনই বাচ্চাদের চিল্লানোর আওয়াজ ভেসে আসলো। মিমি এক নাগাড়ে চেঁচাচ্ছে,
বুট, বুট পাপা বুট এতেতে। স্বর্ণার দিকে তাকিয়ে ক্রমাগত চিল্লাচ্ছে ।
বেচারি কান্না করে কাজল লেপ্টে একাকার। উপন্যাসের নাইকি দের কাজল লেপ্টানো চোখে মায়াবি লাগে। তাই বলে কি তাকেও লাগবে নাকি! চুলগুলো একসাথে জট পেকে আছে। বড়রা দেখলেও তো ভয় পাবে, সেখানে ওরা তো বাচ্চা। নিজের মেয়ের মুখে এমন ডাক শুনে কোনোভাবেই সহ্য হলো না।চলে গেলো সে।
পেছনে পড়ে রইলো হতাশার শ্বাস। সবাই ঊর্মিকে নিয়ে ব্যস্ত।
সবাই তো আর এটা জানে না, সে একটা খেয়ে দশটা দেওয়ায় বিশ্বাসী। সে যে শুধু চুল টেনেছে তা না, এমন জায়গায় দিয়েছে, কাউকে দেখাতেও পারবে না।
লে মজা, আরো আসবি ।
____________________
শাশুড়ির মুখোমুখি বসে আছে ঊর্মিলা। কোলাহলপূর্ণ ঘরটিতে এখন নিরবতা। এই নিরবতা পছন্দ হলো না সাজেদা দেওয়ানের। ভেসে আসলো তীক্ষ্ণ কণ্ঠ,
কি চাচ্ছো তুমি?
মুক্তি।
এটা সম্ভব না।
কেনো?
বারবার আমার ছেলের গায়ে কলঙ্ক আসতে দিবো না। এটা আপনাদের ব্যাপার।
চোখ গরম করে তাকালেন তিনি। নিচু কণ্ঠে বললেন, বদনাম যে একা আমার ছেলের হবে তা না। যদি কারো সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়, তাহলে সেটা হবে তোমার। কারণ ছেলেদের গায়ে কলঙ্ক লাগে না। সোনার আংটি বাঁকা হলেও দামি।
তাহলে আরো ভালো। আমি আমার কলঙ্ক নিয়ে বাঁচি। আপনারা আপনাদের বাঁকা আংটি নিয়ে ফুটবল খেলেন।
উদ্দেশ্য কি তোমার?
নিজের মতো বাঁচার।
পারবে টিকে থাকতে?
ঐটা আমার ব্যাপার। কিছুক্ষণ নিরব থেকে আবার বললো, আপনার ছেলে আমার সাথে গেইম খেলছে। স্বর্ণাকে ইচ্ছে করে আমার উপর লেলিয়েছে। আমাকে নির্বোধ অবশ্যই ভাববেন না। আপনারা আমাকে ব্যাবহার করবেন। এবং আমি আনন্দের সাথে ব্যাবহার হব ।এই কল্পনা থেকে বেরিয়ে আসেন।
আমি আমার মতো করে বাঁচতে চাই। স্বপ্নগুলো পূরণ করতে চাই। এটা কি আমার অপরাধ?
আচ্ছা, মানলাম তুমি নিজের মতো বাঁচতে চাও। পরবর্তীতে কি বিয়ে করবে না?পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়লেন তিনি।
প্রতিউত্তরে ভেসে আসলো ঊর্মির নিরব শান্ত কন্ঠ,
প্রয়োজনে করবো না। তবুও আপনার ছেলের সাথে সংসার না। চরিত্রহীনের সাথে তো কোনোভাবেই সম্ভব না।
সাজেদা বেগম রেগে গেলেন। ঝাঁঝালো স্বরে বললেন, তুমি আমার সামনে আমার ছেলেকে চরিত্রহীন বলছো!
উফফ সরি। শুধু যে চরিত্রহীন তা না, লম্পট ও বটে।
ঘরের বাইরে থেকে সবটা শুনলো কায়সার। ফলস্বরূপ ফুটে উঠলো তার ঠোঁটে বাঁকা হাসি ।
চলবে,,,,,
#বৈরি_হাওয়া
#পর্ব_১০
#ফারজানা_প্রণয়_চৌধুরি
( প্রথমেই আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছি। তারজন্য আজ লেইট হয়ে গেছে। তবুও দেওয়ার চেষ্টা করেছি।কি লিখেছি?কেমন হয়েছে জানি না।ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
পরবর্তি পর্বগুলো আরেকটু বড় এবং গুছানোভাবে নিয়ে আসবো। ধন্যবাদ 🌸)

