পড়ালেখা করতে চাও—করবে। এতে আমার কোনো সমস্যা নেই।তবে বাড়ির বাইরে গিয়ে কেন? এখানে কিসের অভাব তোমার? কী সমস্যা?তোমাকে কি তোমার মতো থাকতে দিচ্ছি না? সুযোগ-সুবিধার কোনো কমতি আছে?তাহলে এই দাবি কেন, ঊর্মিলা?
এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল কায়সার।
আজ হঠাৎ করেই ঊর্মিলা গোঁ ধরেছে—এখানে সে থাকবে না। সে নিজের মতো বাঁচতে চায়।
কিন্তু কায়সার কিছুতেই এই দাবি মানতে নারাজ। এই নিয়েই দু’জনের মাঝে চলছে তর্ক-বিতর্ক।
ঊর্মিলা খানিকটা তেজি স্বরে বলল,
আপনার এখানে সবকিছুই আছে। তবুও আমি এখানে থাকতে পারছি না। স্বস্তি পাই না। কেন যেন দম বন্ধ হয়ে আসে। এই কেনোর উত্তর আমার জানা নেই।
একবার সুযোগ দেওয়া যায় না, ঊর্মিলা?
কণ্ঠে আকুতি। আগের সেই দম্ভ নেই ।আছে শুধু একরাশ অসহায়তা।
ঊর্মি তাকাল সেই মুখটার দিকে। বলতে বাধ্য, প্রথম দেখায় ভালোই লেগেছিল তাকে। এখনো তাকালে অদ্ভুত এক দুর্বলতা কাজ করে।
কিন্তু তাকে দুর্বল হলে চলবে না। অনেক তো হলো অবলা সেজে থাকা। অনেক তো হলো লোকের ভয়, সমাজের ভয়। এবার না হয় নিজের মতো বাঁচুক।
নিচু কণ্ঠে ঊর্মিলা বলল,
আচ্ছা… বাচ্চাটা কার?
কায়সার খানিকটা চমকাল। তবে বুঝতে দিল না। হতাশার এক নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল। শান্ত গলায় বলল,
এই প্রশ্ন করার মানে?
ভাবি কিছুটা আমাকে বলেছে। তবে পুরোটা জানি না। শুধু এটুকু জানতে চাই—মিমি কার সন্তান? আপনার… নাকি অবৈধ?
আগুন-চোখে তাকাল কায়সার।
ঊর্মি সেই চোখের দিকেই তাকিয়ে রইল। উত্তর পেয়ে গেল সেখানে। তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটল ঠোঁটে।
এক মুহূর্তের জন্য হলেও ভেবেছিল—মিমি হয়তো কায়সারের সন্তান নয়। কিন্তু এবারও সে হেরে গেল।
আচ্ছা, এখানে কি বলার মতো আর কিছু আছে?
কায়সার নিজেকে সামলাল। কাতর কণ্ঠে বলল,
মিমি আমার সন্তান। তবে তুমি সবকিছু শুনবে তো? আমার ওপর একবার বিশ্বাস রাখো। তাইলে তুমি বুঝবে—
ঊর্মিলা শুনতে না চাওয়ার ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল। তাড়াহুড়ো করে বলল,
আমি শুনতে চাই না। আগ্রহই পাচ্ছি না। এখন আপনি আসতে পারেন।কিছুক্ষণের জন্য ভেবেছিলাম—মিমি আপনার সন্তান নয়। কিন্তু আমি ভুল ছিলাম।
একটু থেমে আবার বলল,
বলুন তো, আমার জায়গায় আপনি থাকলে কী করতেন? সংসার করতে পারতেন? যদি আপনার মতো চরিত্র আমার হতো?
তার কণ্ঠ আরো কঠিন হয়ে উঠল।
যে ব্যক্তি একটি মেয়ের চরিত্র জানার পরও তাকে বিয়ে করে, তার সঙ্গে সংসার করে, সন্তানও জন্মায়—এটাকে চরিত্রহীনতা ছাড়া আমি আর কিছু বলতে পারি না।
এক নিশ্বাসে কথাগুলো ছুড়ে দিয়ে বলল,
আমি স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী আর তার মেয়েকে নিয়ে সংসার করে নিজের উদারতার প্রমাণ দিতে পারছি না।
কায়সার যেন আগেই এমন উত্তর অনুমান করেছিল। আর কিছু না বলে সে চলে গেল।
ঊর্মিও নিজের কাজে মন দিল।
কি বোকা সে! ক’দিনের জন্য নিজেকে এই পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। বাচ্চাটাকেও মেনে নিতে চেয়েছিল। সবার সঙ্গে একটা সখ্যতা তৈরি হয়েছিল।
এখন নিজেকেই ধিক্কার দিচ্ছে—কেন এমনটা করল? তার তো আরো আগেই বেরিয়ে যাওয়া উচিত ছিল।
তবে এখনো সময় আছে।
ফোন খুঁজল সে। হাতের কাছেই ছিল। কাঙ্ক্ষিত একজনের নাম্বার খুঁজে ফোন দিল। একবার বেজে কেটে গেল।
ঊর্মি হাল ছাড়ল না। একের পর এক কল দিতে লাগল। পঞ্চমবারে গিয়ে সাড়া পেল।
অপর প্রান্ত থেকে কণ্ঠ ভেসে এল,
ঊর্মি, ক্লাসে ছিলাম—তাই দেরি হলো। কোনো প্রবলেম?
উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল
আপু, আপনাদের হোস্টেলে কি সিট পাওয়া যাবে?
কি বলছো ঊর্মি? হোস্টেলের সিট দিয়ে তুমি কী করবে?
আমি উঠতে চাইছি। এডমিশনের এক্সাম তো সামনে।
তোমার তো বিয়ে হয়ে গেছে। নতুন বিয়ে।তারাকি মানবে?
আপু, তুমি শুধু একটা সিট ম্যানেজ করে দাও। পরে সবকিছু শুনবে।
কথা শেষ করে ফোন কেটে দিল ঊর্মি।
ঠিক তখনই পেছন থেকে কেউ হঠাৎ চুলের মুঠি টেনে ধরল।
চলবে…
#বৈরি_হাওয়া
#ফারজানা_প্রণয়_চৌধুরী

