মিমি মাথা নাড়ল। ঠোঁট কামড়ে ধরেছে। কিছু বলতে চায়, কিন্তু পারছে না। শুধু ঠোঁট নাড়ছে।
মা… ধীরে কথা বলো,কায়সার ফিসফিস করে বলে, কেউ তাড়া দিচ্ছে না।
ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের দুজনের কথার মাঝেই স্বর্ণার উপস্থিতি চোখে পড়ল। বাচ্চাটির যেন হঠাৎ কিছু মনে পড়ে গেল। মুহূর্তেই সে ছটফট করতে লাগল। ডাক্তার একটু হকচকিয়ে গেলেন। কায়সারের দিকে তাকালেন প্রশ্নভরা চোখে।
কায়সার মেয়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে দরজার দিকে তাকাল। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে স্বর্ণা।
কায়সারের চোখ থেকে বেরিয়ে এলো একরাশ ঠান্ডা দৃষ্টি। সেই দৃষ্টি যেন ছুরি হয়ে বিঁধল স্বর্ণার গায়ে। সে জমে গেল। কোনো কথা না বলে, কোনো বাক্য বিনিময় ছাড়াই ঘুরে বেরিয়ে গেল।
ইনজেকশন লাগতেই মিমির চোখ ভারী হয়ে এলো। কিন্তু ঘুমিয়ে পড়ার ঠিক আগমুহূর্তে সে হঠাৎ খুব ক্ষীণ স্বরে বলে উঠল—
পাপা… সলনা ব্যাতা…
এই একটা বাক্যই।
কায়সারের চোখ বুঝে গেল । আর কিছু বোঝার বাকি রইল না। নার্স আলতো করে মিমির গায়ে চাদর টেনে দিল। ডাক্তার বেরিয়ে গেলেন। কেবিনে আবার নেমে এলো চাপা নীরবতা।
বাইরে করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে স্বর্ণা।
কায়সার বেরিয়ে এল। চোখে ক্লান্তির ছাপ নেই, আছে শুধু স্থিরতা। স্বর্ণা এক মুহূর্ত থমকে গেল। এই চোখ সে চেনে। এই চোখ মানেই যে বিপদ।
মিমি কেমন?
স্বর্ণা খুব সাধারণ গলায় জিজ্ঞেস করল।কায়সার তাকাল।
জ্ঞান ফিরেছে।
স্বর্ণার মুখে এক ঝলক অস্থিরতা খেলে গেল। খুব দ্রুত তা সামলে নিল।
আলহামদুলিল্লাহ…
হ্যাঁ,আলহামদুলিল্লাহ।
একটু থেমে যোগ করল,
কিন্তু তোমার তো খুব বড় ক্ষতি হয়ে গেল, তাই না?
স্বর্ণা শক্ত হয়ে গেল।কি বলতে চাও?
কায়সার এক পা এগিয়ে এল। কণ্ঠ নামিয়ে বলল,
আমি বলতে চাই ,মেয়েটা পড়ে যায়নি। আর ঊর্মিও কিছু করেনি।
স্বর্ণার চোখ কেঁপে উঠল।তুমি কী বোঝাতে চাও?
আমি বোঝাতে চাই,কায়সার ঠান্ডা গলায় বলল, “যারা এতদিন অভিনয় করে যাচ্ছে, তাদের অভিনয়ের সময় শেষের পথে।”
স্বর্ণা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াতে পারল না। তাড়াহুড়ো করে ঘুরে চলে গেল। করিডোরে তার পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল।
কায়সার তাকিয়ে রইল তার যাওয়ার দিকে। তারপর ধীরে শ্বাস ছাড়ল।
সে ফিরে তাকাল ঊর্মির কেবিনের দিকে। ঊর্মি চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। কিন্তু কায়সার জানে । এই মেয়েটা ঘুমাচ্ছে না।
আচ্ছা,কায়সার বিড়বিড় করল,
খুব কি ক্ষতি হতো সম্পর্কটা স্বাভাবিক হলে?
এক মুহূর্ত থামল। তারপর নিজেকেই বলল,
সম্পর্ক যেমনই হোক, থাকতে তো হবে আমার সাথেই।”
করিডোরের আলো নিভু নিভু।নীরবতার ভেতর ধীরে ধীরে জমে উঠছে ঝড়।
_______________
দু’দিন কেটে গেছে হাসপাতালের সাদা দেয়ালের ভেতর। ঘুম, ইনজেকশন, ড্রেসিং—সব মিলিয়ে সময়টা যেন থমকে ছিল। আজ সকালে ডাক্তার এসে শুধু একটাই কথা বলেছে,
বাচ্চাটাকে বাড়ি নিতে পারেন। তবে খুব সাবধানে।
এই কথাটুকুই যথেষ্ট ছিল।কায়সার নিজ হাতে ফর্মালিটিগুলো শেষ করল। নার্স শেষবারের মতো মিমির মাথার ব্যান্ডেজ ঠিক করে দিল। ছোট মুখটা ফ্যাকাশে, চোখে এখনো ভয় জমে আছে, তবে আগের মতো ছটফটানি নেই। কায়সার তাকে কোলে নিল। খুব আলতো করে। যেন একটু জোর হলেই ভেঙে যাবে।
ঊর্মি চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে, শরীর এখনো দুর্বল। তবু দৃষ্টি একবারও মিমির মুখ থেকে সরছে না। মেয়েটা চোখ তুলে তাকাল ঊর্মির দিকে। ঠোঁট নাড়ল—
মাম্মা…
শব্দটা অস্পষ্ট।ঊর্মির বুকটা কেঁপে উঠল। সে এগিয়ে এসে মিমির কপালে আলতো করে চুমু খেল।
হাসপাতালের করিডোর পেরিয়ে বাইরে এলো তারা। হালকা বাতাস বইছে। কায়সার গাড়ির দরজা খুলে মিমিকে ভেতরে বসাল।গাড়ি ছাড়ল তার গন্তব্যের পথে।ভেতরে নিস্তব্ধতা। শুধু ইঞ্জিনের শব্দ আর মাঝে মাঝে মিমির হালকা নিশ্বাস। মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমের মধ্যেও কায়সারের আঙুল আঁকড়ে ধরে আছে।
ঊর্মি জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। রাস্তাগুলো চেনা, তবু আজ সবকিছু আলাদা লাগছে। বাড়ির কথা ভাবতেই বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা চাপ উঠে আসে।
কায়সার ধীরে বলে উঠল,
আশা রাখি কিছুদিন স্বাভাবিক থাকবে। উল্টোপাল্টা কিছু করবে না। আর চাইলে হোস্টেলেও উঠতে পারো।
ঊর্মি তাকাল তার দিকে। কিছু বলল না। যেন কোনো আগ্রহই নেই।
বাড়ির গেটে গাড়ি থামতেই কায়সার আগেই নেমে গেল। মিমিকে কোলে তুলে ভেতরে ঢুকল, প্রতিটা ধাপ মেপে। ঊর্মি পেছনে পেছনে ঢুকল। ঘরে ঢুকেই চোখে পড়ল ।সবাই দাঁড়িয়ে আছে।
মিমিকে তার ঘরেই শুইয়ে দেওয়া হলো। নতুন চাদর, নরম বালিশ। জানালার পর্দা একটু ফাঁক করে দেওয়া হলো, যেন আলো আসে কিন্তু চোখে না লাগে।
মিমি চোখ মেলে তাকাল। চারপাশ চিনে নিতে একটু সময় নিল। তারপর খুব নিচু স্বরে বলল,
পা বালি…
কায়সার মাথা নাড়ল।
হ্যাঁ মা। বাড়ি।
বাইরে সন্ধ্যা নামছে।লিভিং রুমে মুখোমুখি বসে আছেন ঊর্মির দাদী , বাবা আর কায়সার। বাড়িতে ফেরার পর থেকেই কায়সারের অস্বস্তি কাটছিল না। তাই জরুরি তলবে শ্বশুরকে ডেকে পাঠিয়েছে। কিছু হিসাব আজ পরিষ্কার করতেই হবে।
নীরবতা ভাঙে কায়সারের তীক্ষ্ণ কণ্ঠ উঠল,
আপনার ঊর্মিলার সঙ্গে সমস্যা কী?
দাদি যেন আগেই জানতেন এই প্রশ্ন আসবে। মুখের ভঙ্গি না বদলিয়ে বললেন,
ওর সঙ্গে আমার কী সমস্যা হবে? ও তো আমার –
নাতনি। ওরে কি আমি শাসন করতে পারি না?
“শাসন অবশ্যই করতে পারেন। দাদি হিসেবে সেটা আপনার অধিকার। কিন্তু জুলুম করতে পারেন না,” কায়সার থামল না।
“আপনি কেন সাগরিকা আর ঊর্মিলাকে আলাদা চোখে দেখেন? কেন রিকশাচালক মজনুর সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার জন্য এত পাগল ছিলেন? আর কেনই বা আমার মতো এক বাচ্চার বাবার সঙ্গেও বিয়ে দিতে দ্বিধা করেননি?”
তিনি কোনো উত্তর দিলেন না।
এই নীরবতা কায়সারের ভালো লাগল না। সে আবার বলল,
“আপনি ভেবেছিলেন, আমার সঙ্গে বিয়ে হলে বাচ্চার দায়িত্ব যখন ওর ঘাড়ে চাপবে, সংসারে আটকে যাবে, তখন আপনি তৃপ্তি নিয়ে দেখবেন। এক বাচ্চার বাবা যেহেতু, সেহেতু আমি ভালো হবো না—এই ছিল আপনার হিসাব।”
একটু থেমে আবার বলল,
“কিন্তু এত কিছুর মাঝেও প্রশ্নটা একই—কেন এসব? ও তো আপনার ছেলের রক্ত। মেয়েটার পেছনে কেন এমন লেগে ছিলেন? যখন দেখলেন কিছুতেই কিছু হচ্ছে না, তখন কুটবুদ্ধি বাদ দিয়ে সরাসরি মাঠে নেমে পড়লেন।”
কায়সারের কোনো কথাই তাকে টলাতে পারল না। কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন তিনি—
চলবে…
#বৈরি_হাওয়া
#ফারজানা_প্রণয়_চৌধুরি
#পব_১২

