—প্লিজ মিস, অ্যাকসেপ্ট হিম। আপনি যদি একবার রাজি হন, তাহলে আমাদের অনেকগুলো টাকা বেঁচে যাবে। আমি ওই টাকায় কতগুলো রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি কিনতে পারবো!
ঊর্মি যেন একের পর এক ধাক্কা খাচ্ছে। এই বাচ্চাটা আসার পর থেকেই আজেবাজে কী সব বলছে! তার ওপর পাশের ফ্ল্যাটের ওই ছেলেটার উদ্ভট কাণ্ড। সব মিলিয়ে মাথা গরম হয়ে গেল।
ভ্রু কুঁচকে, একটু রাগী গলায় বলল,
—একটা চড় দিবো কিন্তু, ফাজিল ছেলে! আসার পর থেকে যা-তা বলছো। কিসে রাজি হবো আমি? আর আমার রাজি হওয়ার সাথে রিমোট কন্ট্রোল গাড়ির কী সম্পর্ক? আর ওই পাগল ছেলেটাই বা কে?
বাচ্চাটা ভয়ে থতমত খেয়ে গেল। দ্রুত একটু ঝুঁকে এসে মুখে আঙুল দিয়ে চুপ করতে ইশারা করল। খুব নিচু স্বরে বলল,
—মিস, আস্তে বলুন… মা শুনলে আমাকে বকবে! ঐটা পাগল ছেলে না । আমাদের উদ্ভট ভাইয়া। উনি হলেন বাড়িওয়ালা আঙ্কেলের ইউনিক প্রোডাক্ট, মানে একমাত্র পুত্র। বাড়িওয়ালা আন্টি তো প্রায় “খাইস্টা” বলে ডাকে। তবে আমরা ভাড়াটিয়া বাচ্চাগণ উনাকে উদ্ভট বলেই ডাকি। যতসব উদ্ভট কাজ!
একটু দম নিয়ে আবার শুরু করল,
—জানেন মিস, বাড়ি ভাড়া নিয়ে উনি যে কী প্যারা দেয়! মাস শেষ হলেই হাজির। কোনো প্রবলেম শুনবে না। টাকা দিতে দেরি হলে ঘর থেকে ঝাঁটা দিয়ে বের করা যাবে না। তার একটাই কথা, কিছু প্রয়োজন ,ঘর আছে নিয়ে আসবেন। পেট ভরে খেয়ে আসবেন।বাট বাড়ি ভাড়া নিয়ে নো কম্প্রোমাইজ।একদম হাড়কিপ্টে।
এত টাকা থাকা সত্ত্বেও ময়লা জামাকাপড় পরে ঘুরবে। কিন্তু আমরা নোটিশ করেছি,আপনি আসার পর থেকে কেমন যেন সাজুগুজু করে থাকে। কেমন একটা হিরো-হিরো ভাব নেয়! তাই ভাবলাম, আপনার ওপর হয়তো লাড্ডু ফুটেছে।
বাচ্চাটা চক্রান্তকারীর মতো খানিকটা ঝুঁকে এসে বলল,
—এতে আমাদের লাভ মিস! খুশি হয়ে ভাড়া নাও নিতে পারে। প্লিজ মিস, রাজি হয়ে যান । আপনাকেও কিন্তু কিছু কমিসন দেবো! সো নো টেনশন।
ঊর্মি মনোযোগ দিয়ে সব শুনল। বাচ্চাটার পাকা পাকা কথায় তার মেজাজ আরও গরম হয়ে গেল।কোনোভাবে নিজেকে সামলে চোখ রাঙিয়ে পড়তে ইশারা করল।
বাচ্চাটাও মিসের রাগ বুঝে একদম চুপ।
দীর্ঘ দুই ঘণ্টা পড়িয়ে বের হলো ঊর্মি। গেট থেকে বের হওয়ার পরই চোখে পড়ল সেই “পাগল” ছেলেটা।
আজ খেয়াল করল ।আসলেই তো, প্রতিদিনই দেখে তাকে। শুধু এতদিন গুরুত্ব দেয়নি।আজ যেন হঠাৎ করেই নজরে পড়ছে।
ছেলেটা এমন ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেন ফোনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মহাভারত অশুদ্ধ করছে। কিন্তু হাত-পা কাঁপছে । গর্দভটা হয়তো নিজেই বুঝতে পারছে না!
ঊর্মি আর ভাবল না।
এমন গাধা দুই-একটা থাকবেই। তার জন্য কি নিজের চলাফেরা বন্ধ করবে?একদম না।
———————-
—এই হতিন, ফোন ধরিস না কেন? কখন থেকে কল দিচ্ছি!
—লাইফে আমার অলরেডি একটা হতিন আছে। ওইটাকেই আউট করতে পারছি না, তুই আবার কোথা থেকে টপকালি?
—ঊর্মি, সিরিয়াস কথায় আয় দোস্ত! ভাই, আমাদের তো ভাগ্যগুণে কোনো পাবলিকে চান্স আসেনি। আমি, জাকির—কেউই না। প্রাইভেটে পড়ার মতো অবস্থাও নেই। এখন কী করবো বল?
বাড়ি থেকে তো মনে হয় বিয়ে দিয়ে দেবে! দোস্ত, আমি কিন্তু বড়লোক না পটিয়ে বিয়ে করব না। প্লিজ, পাতলুর মতো একটা আইডিয়া দে না!
তুই তো জানিস—“খালি পেট, মেরে দিমাগ কি বাত্তি নেহি জলতি!”
ঊর্মি বিরক্ত হয়ে বলল,
—সামু, আজেবাজে বকা বন্ধ কর। আমার সাথে এসব ছাগলামী করবি না। বিয়ে দিলে করে নিবি। না করতে চাইলে পড়ালেখা কর। সেটাও তো করিস না। ওটা ধরে রেখেছিস শুধু বিয়ের ভয়ে । পড়ালেখা তো একটা অজুহাত!
আর এমন ভাব নিচ্ছিস যেন জ্ঞানের ভারে মগজ গলে পড়ছে!
সামিয়া তেড়ে উঠল,
—দেখ, দেওয়ানের কচি খুকি, ইনসাল্ট করবি না! ইগোতে লাগে কিন্তু! মানলাম পড়ালেখা করি না । তাই বলে বিয়ে করতেই হবে নাকি?
বাবা তো ধরে কোনো এক বিদেশির সাথে বিয়ে দেবে! ইম্পসিবল! আমি এটা হতে দেব না। আমার বড়লোক চাই—মানে চাই!
সামিয়ার কথায় ঊর্মি পুরো অতিষ্ঠ।
সকাল থেকেই যেন শনি নাচছে জীবনে। একের পর এক পাগল-ছাগলের সাথে দেখা হচ্ছে। যত শান্ত পরিবেশ চায়, ততই এদের মুখোমুখি হচ্ছে।
টিউশন শেষে বাসায় ফিরেই ব্যাগ থেকে ফোন বের করে দেখে এতগুলো মিসকল। জরুরি কিছু ভেবেই কলব্যাক করেছিল।
কিন্তু এই মেয়েটা আবার শুরু করেছে তার আজগুবি কথা!
একটাও কথা না বাড়িয়ে খট করে ফোনটা কেটে দিল ঊর্মি।এখন তার দরকার শান্তি।
দিনভর নিজেকে সামলে রাখলেও রাতটা শুধু তার।তার কষ্টগুলোর।সে চায়, সেগুলোকে মনে রাখতে।
কারণ, ওগুলো ভুলে গেলে নিজের অস্তিত্বই মিশে যাবে।
____________________
রাতের নিস্তব্ধতা চারদিকে এক অদ্ভুত ভুতুড়ে পরিবেশ তৈরি করেছে। অচেনা পোকামাকড়ের ডাক যেন সেই নীরবতাকে আরও ভারী করে তুলছে। চাঁদবিহীন আকাশের নিচে খোলা ছাদের উপর বসে আছে কায়সার। ছাদের মাঝখানে স্থির হয়ে আছে সে। আকাশে চাঁদ নেই, তবু তার দৃষ্টি সেখানেই নিবদ্ধ । যেন কিছু একটা খুঁজছে। অথচ এই অমাবস্যার রাতে সেখানে খোঁজার মতো কিছুই নেই।
আয়াশ ছাদের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ ভাইকে দেখছিল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে এসে কায়সারের পাশে বসলো। কায়সার তার উপস্থিতি টের পেলেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। কিছুক্ষণ নীরবতা চলল। চারপাশে শুধু পোকামাকড়ের শব্দ।
হঠাৎ সেই নীরবতা ভেঙে আয়াশের কণ্ঠ ভেসে এলো,
—ভালোবাসো ঊর্মিকে?
কায়সার নড়ল না। কোনো উত্তর দেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করল না।
আয়াশ যেন আগেই বুঝেছিল এমনটাই হবে। তাই আবার বলল,
—ভাইয়া, আমি তোমাকে কোনোভাবেই বুঝতে পারি না। তোমার চরিত্রটা আসলে কী? তোমাকে ঠিক কী বলে আখ্যায়িত করা উচিত?
তোমার জীবনে দুটো চরিত্র । স্বর্ণা আর ঊর্মি। যদি আমি জিজ্ঞেস করি, তুমি কাকে ভালোবাসো? ঊর্মি, না স্বর্ণা? তুমি কি উত্তর দিতে পারবে? একসাথে কি দু’জনকে ভালোবাসা যায়?
ভালোবাসা… ভালোবাসা… ভালোবাসা! সত্যিই কি ভালোবাসা বলে কিছু আছে? থাকলে তুমি এত একা কেন?
কায়সার তবুও নিশ্চুপ। সব শুনেও প্রতিক্রিয়াহীন।
আয়াশ কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল,
—ভাইয়া, মিমিকে আমাদের কাছে রেখে ঊর্মিকে নিয়ে নতুন করে একটা সংসার শুরু করা যায় না?
এই কথাটা যেন কায়সারের ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা পশুটাকে জাগিয়ে দিল। মুহূর্তেই বিস্ফোরিত হলো সে। নিজেকে আর সামলাতে পারল না। সর্বশক্তি দিয়ে মেঝেতে ঘুষি মারল। রাগ তাকে এতটাই গ্রাস করল যে ব্যথাটাও অনুভব করল না।
চিৎকার করে উঠল—
—ড্যাম ইট! হাউ ডেয়ার ইউ! এই কথা বলার সাহস হলো কীভাবে? এসবের মাঝে আমার মেয়েকে কেন টানছিস? আমি কতবার বলেছি ,ও আমার ফুল! আমার ফুলকে কোনো কলঙ্কে জড়াবি না। আই রিপিট ডোন্ট ডেয়ার!
তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে।
—ভালোবাসা কী বুঝিস তুই? ভালোবাসা নিয়ে প্রশ্ন করার আগে সেটা অনুভব করতে শিখ! আমার কাউকে দরকার নেই। যে নারী আমাকে বুঝতে পারেনি… যাকে আমি অন্ধের মতো বিশ্বাস করেছি… যে আমাকে দিনের পর দিন ধোঁকা দিয়েছে… তার জন্য তুই ভালোবাসাকে প্রশ্ন করিস? যে ভালো সে সে বুঝে ঐ জিনিসটা আসলে কি? সেই সুধা যে একবার পান করে সে সত্যিই গর্দভে পরিনত হয়। সবার কথা আমি জানি না। তবে আমি হয়েছিলাম।
নিজের কথাতেই যেন নিজেকে বিদ্ধ করল সে।
—আমি চরিত্রহীন? ঠিক আছে, আমি চরিত্রহীনই! ঊর্মির ভাষায় আমি বলদ । ওর ধারণাই ঠিক!
একটু থামল। কণ্ঠ ভেঙে আসছে।
—আর ঊর্মি… ওর কথা কিছুই বলব না। এত শক্ত চরিত্রের মেয়ে । কিন্তু সেই শক্তি কি থাকত, যদি ওর জীবনটা অন্যরকম হতো?
প্রথম দিন ওকে দেখে আমার মায়া লেগেছিল। বিয়ের আগে সব বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ওর পরিবারের আচরণ দেখে বুঝেছিলাম । ওর ভাগ্যে কী লেখা ছিল। ও কি নিজের বিয়ে আটকাতে পারত? আমার সাথে না হলেও, অন্য কোনো নিকৃষ্ট মানুষের সাথে বিয়ে হতোই।
আমি জানি না কীসের ঘোরে বিয়েটা করেছিলাম। যদি না করতাম, তাহলে এত কিছু হতো না।
আমি এক প্রশ্নবোধক চিহ্নে আটকে গেছি…
এই অনুভূতিটার নাম কী, সেটাই বুঝতে পারছি না।
ওর সাথে ভালো করে কথা হয়েছে—এমনও মনে পড়ে না। তবুও ভিতরে এক অদ্ভুত শূন্যতা।একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস।
—আসলেই আমি চরিত্রহীন…
হঠাৎ কণ্ঠ ভেঙে গেল।
—আমি আর পারছি না… আমার কাউকে দরকার নেই… আমি তোদের সবাইকে ছেড়ে দেব… কিন্তু আমার মেয়েকে নিয়ে একটা বাজে কথাও বলবি না!
হঠাৎই কায়সার ভেঙে পড়ল। বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে এলো। সেই কান্নায় জমে থাকা বছরের পর বছর চাপা যন্ত্রণা, অভিযোগ, অপরাধবোধ—সব একসাথে বেরিয়ে আসছে।
আয়াশ স্থির হয়ে গেল। যেন জমে গেছে।
কায়সার পাগলের মতো বিড়বিড় করতে লাগল—
—আমার কাউকে লাগবে না… ঊর্মিকে ডিভোর্স দেব… ওই মেয়েটা ভালো কিছু ডিজার্ভ করে … ঊর্মির অধ্যায় শেষ না হলে আমার মেয়েটা ভালো পরিবেশ পাবে না… আবার ঊর্মিও শান্তি পাবে।আমার মিমি নিজেকে দোষী ভাববে । ঊর্মিও কোথাও আটকে যাবে। ওদের জন্যই আমাকে যেতে হবে।
শ্বাস কেঁপে উঠছে।
—আমার মেয়ে কিছু বোঝার আগেই আমি সব শেষ করে দেব… সি ডিজার্ভস বেটার…
বিড়বিড় করতে করতেই একসময় শরীর নিস্তেজ হয়ে এল।
ধীরে ধীরে অন্ধকারে ডুবে গেল কায়সার।
চলবে,,,,,,
#বৈরি_হাওয়া
#পর্ব_২৬
#ফারজানা_প্রণয়_চৌধুরি

