ভাইয়ের হঠাৎ এমন জ্ঞান হারানোতে ঘাবড়ে গেল আয়াশ। দৌড়ে গিয়ে ভাইকে ধরতেই আঁতকে উঠল। জ্বরের তাপে শরীরে হাত রাখা যাচ্ছে না। কায়সারের এই জ্বরটা ভীষণ মারাত্মক—সহজে আসে না, কিন্তু একবার এলে ভোগান্তির শেষ থাকে না।
একা তাকে নিচে নামানোর মতো শক্তি আয়াশের নেই। তাই সেখান থেকেই জোরে জোরে সবাইকে ডাকতে লাগল। শব্দ শুনে একে একে সবাই ছাদে উঠে এলো। সামনে দৃশ্যটা দেখে মুহূর্তেই থমকে গেল সবাই।
এই তো কিছুক্ষণ আগেও ছেলেটা একদম সুস্থ ছিল। আর এখন—এ কী অবস্থা!
ভাবার সময় নেই। সবাই মিলে কায়সারকে ধরে দ্রুত নিচে নামানো হলো। এক মুহূর্ত দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে।
ছোট্ট মিমিকে কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। বাবার হাত শক্ত করে ধরে চিৎকার করে কাঁদছে। কান্নায় চোখ-মুখ লাল হয়ে গেছে।
হঠাৎ সেদিকে তাকালো আয়াশ। আর ঠিক তখনই মনে পড়ে গেল তার নিজের বলা কথাটা—
“তাহলে তুমি কেন একা?”
আয়াশের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
কোথায় কায়সার একা? এই তো এটাই তার সব। এই মেয়েটাই তো তার পৃথিবী।
মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিল সে আর কখনো স্বর্ণা কিংবা ঊর্মির কথা তুলবে না। ভাইয়াকে তার মতো থাকতে দেবে। জোর করে কারো জীবন বদলানো যায় না।
—ও তাত্তু… পাপাকে বলো না দুষ্টু না করতে। আমি কিন্তু বকবো… মিমির ভয় করছে…
মেয়ের আধো আধো বুলিতে ধ্যান ভাঙল আয়াশের। পাশে তাকিয়ে ছোট্ট মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে নিল সে। শক্ত করে আগলে রেখে নরম গলায় বলল—
—হ্যাঁ মা, তোমার পাপা খুব দুষ্টু। তুমি তো জানো, দুষ্টুদের ইনজেকশন দেখালে কেমন ভয় পায়, আর দুষ্টুমি করে না।
একটু থেমে ভাতিজির কপালে চুমু খেল সে।
—এখন তোমার পাপাকেও ইনজেকশন দেখাবো। দেখবে, তোমার পাপা আবার গুড বয় হয়ে যাবে।
মিমি বাবার হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল। যেন এই ছোট্ট হাতটাই বাবাকে ধরে রাখার শেষ ভরসা।
—————————
মাঝরাতে ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল ঊর্মির।
এই অসময়ে ফোন পেয়ে বিরক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু ঊর্মি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মোবাইলের দিকে। পলকহীন চোখে পরখ করছে সেটাকে। ফোন রিসিভ করার কোনো তাড়াহুড়ো নেই তার।
এই যান্ত্রিক শব্দটা অদ্ভুতভাবে ভালো লাগছে তার কাছে।
মন বলছে এই ফোন কোনো ভালো খবর নিয়ে আসেনি। কোথাও না কোথাও কোনো দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছে। তবুও সে শান্ত। খারাপ যা হওয়ার, তা তো হয়েই গেছে। এখন আর নতুন করে ভেঙে পড়ার কিছু নেই।
ফোনটা বাজতে বাজতে থেমে গেল।
ওপারের মানুষটা হয়তো বিরক্ত হয়ে কল কেটে দিয়েছে।আবার চারপাশ নিস্তব্ধ।
ঊর্মি ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নামল। নিঃশব্দ পায়ে হাঁটতে হাঁটতে জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। চৈত্রের বাতাস চারদিকে অদ্ভুত এক মাদকতা ছড়িয়ে দিয়েছে।
হঠাৎ করেই চারপাশের কৃত্রিম আলো নিভে গেল।
বিদ্যুৎহীন শহরটা নিমেষেই অন্ধকারে ডুবে গেল।
বাতাসের সাথে হালকা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামল। দূরে কোথাও এক-দুটি বাড়িতে আলো জ্বলছে। মাঝে মাঝে ভেসে আসছে গাড়ির হর্নের শব্দ।
সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত সুন্দর, অথচ বিষণ্ন দৃশ্য।
আকাশে শব্দহীন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে । যেন কোনো না বলা দুঃখের ভাষা। যেন কিছু বলতে চাইছে।
ঊর্মি মৃদু হাসল।
“আকাশ, তুমি কি জানো না—এখন আর কোনো কষ্ট আমাকে ছুঁতে পারে না?”
মনে মনে বলল সে।
“তাহলে কেন এই অভিমান? কেন এই নীরব বজ্রপাত?”
ঠিক তখনই আবার বেজে উঠল ফোন।
এবার আর অপেক্ষা করল না ঊর্মি। ধীরে ফোনটা তুলে কানে নিল।
ওপাশ থেকে ঝাঁঝালো কণ্ঠ ভেসে এলো—
—এই মেয়ে, তুই এত হারামি কবে থেকে হলি?বাবা মারা গেছে। ইচ্ছে হলে দেখে যাস।
সামান্য পরিমাণও বিচলিত হলো না ঊর্মি। যেন আগেই ধারণা করেছিল। দীর্ঘক্ষণ চুপ থেকে স্বাভাবিক স্বরে বলল,
—ওহ্।
এই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াটা যেন সাগরিকার সহ্য হলো না। হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল সে,
—সামান্য “ওহ্” বলেই সব শেষ, ঊর্মি? দাদী যা বলে, ঠিকই বলে। তুই আসলেই বেঈমান। হাজার হলেও তোর জন্মদাতা পিতা। তার প্রতি তোর এ কেমন আচরণ?
ঊর্মি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কণ্ঠের স্বাভাবিকতা অটুট রেখেই বলল,
—উনার জন্য কান্না করার মতো এমন কোনো কাজ তিনি করেননি। আর জন্ম দেওয়ার কথা বলছো? আমাকে জন্ম দিয়ে সবচেয়ে বড় পাপটাই করেছেন সে। আমি কাঁদলেই তিনি জান্নাতে যাবেন না। আমার আফসোস একটাই উনার কাতরানো অবস্থাটা আমি দেখতে পারিনি। উনার তো এত স্বাভাবিক মৃত্যুর প্রাপ্য ছিল না।
আমি অবশ্যই আসব। উনার লাশের পাশে দাঁড়িয়ে আমি আমার মাকে অনুভব করব।
সাগরীকাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ফোন কেটে দিল ঊর্মি।
—————————-
কায়সারদের বাড়িতে ঊর্মির বাবার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়েছে। ছেলের এমন অবস্থার মধ্যে এই সংবাদ যেন পুরো পরিবেশটাকে আরও ভারী করে তুলেছে। জোহরের নামাজের পর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
কায়সারের জ্বর একশ পাঁচ ডিগ্রিতে উঠেছিল। ডাক্তার দেখিয়ে স্যালাইন দেওয়া হয়েছে। ডাক্তার বলেছে, চিন্তার কারণ নেই। জ্ঞান ফিরলেই স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারবে। আবহাওয়া পরিবর্তন আর হঠাৎ মানসিক উত্তেজনার কারণেই এমনটা হয়েছে।
সাজেদা দেওয়ান ছেলের কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। ছেলের পাশাপাশি আরেকজনের চিন্তাও তাকে গ্রাস করছে।
ঐ পাথর-হৃদয়ের মেয়েটা কি কাঁদছে?
যত খারাপই হোক, বাবা তো! কিন্তু ঐ মেয়ে তো কাঁদবে না। আচ্ছা, মেয়েরা কি এতটা কঠোর হতে পারে? মেয়েরা তো কোমল হৃদয়ের হয়… তবে এই মেয়ের ভেতর এমন কঠিনতা কোথা থেকে এলো?
—————
ঊর্মি খবরটা শোনার পর আর ঘুমায়নি। এমনকি তখনই যাওয়ার প্রয়োজনও মনে করেনি। তাড়াহুড়ো করার ইচ্ছে জাগেনি।
আজ তার কল্পনা করতে ইচ্ছে করছে। সে তার মাকে কল্পনা করতে চায়।
আচ্ছা, সব বাবারা কি একরকম হয়?
আজ যদি তার মা বেঁচে থাকত, তবে কি সে মানুষটার জন্য কাঁদত? হয়তো কাঁদত। কারণ সে তো ছিল কোমল হৃদয়ের মানুষ। যে মানুষটা তার সাথে সবচেয়ে খারাপটা করেছে, তার জন্যও হয়তো সে আহাজারি করত।
———————
—ঐ দেখ, আফতাবের মাইয়াডা আইছে। বাপটা মরছে, আর আইছে এখন! দেহো, পোলাডা এইডা কী ছেরি জন্ম দিলো! হুদাই এত বড় করল। ছোটবেলায় লাথি মাইরা ফালাইয়া দিলেই হইতো!
চারপাশে নানা কথার ঝড়। কেউ আফতাবের পক্ষ নিচ্ছে, কেউ তাকে নিয়েই নিন্দা করছে। আবার কেউ ঊর্মিকে নিয়েও বিশ্লেষণে মত্ত।
মানুষ সত্যিই অদ্ভুত। নিজের ভেতর হাজার অপূর্ণতা থাকলেও অন্যের দোষ খুঁজতে একটুও দেরি করে না। এমনকি মৃতের ঘরও সমালোচনার হাত থেকে রেহাই পায় না। এটাই নিয়ম।
দুই দিনের এই দুনিয়ায় আমরা মিথ্যে মায়ায় বেঁচে থাকি। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও অনিশ্চিত জীবনের জন্য কত ছুটোছুটি!
ঊর্মি নীরবে সব পর্যবেক্ষণ করছে। সবার দৃষ্টি তার দিকে। একেকজনের একেক মতামত। কিন্তু এতে তার ভেতরে কোনো ঢেউ ওঠে না।
তবে আশ্চর্যের বিষয় আজ দাদী নীরব।
সে ভেবেছিল, বাড়িতে ঢুকতেই শুরু হবে কটূক্তি, অপমান, দোষারোপ। কিন্তু আজ উল্টো দৃশ্য। দাদী চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে আছে।
সৎ মায়ের কান্নাটাও কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগছে। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি চিৎকার, বেশি নাটকীয়তা। মাটি চাপড়াচ্ছে কিন্তু তাতে সত্যিকারের শোকের চেয়ে অভিনয়ের ছাপ বেশি।
ঊর্মি সময় মেপেই এসেছে জানাজার পনেরো মিনিট আগে। পাঁচ মিনিট এমনই কেটে গেল।
হঠাৎ ডাক পড়ল শেষবারের মতো দেখার।
এক এক করে সবাই গেল। ঊর্মিও নীরবে এগিয়ে দাঁড়াল।
ঐ তো… কী নিষ্পাপ একটা মুখ!
হঠাৎ ঊর্মির চোখ আটকে গেল বাবার গলায়। নীলচে রঙের সূক্ষ্ম একটা দাগ।
সে চমকে উঠল।সাথে সাথে দাদীর দিকে তাকাল। চোখাচোখি হতেই বুঝে গেল দাদী যেন এই দৃষ্টির অপেক্ষাতেই ছিল।
ঊর্মি সেই শীতল দৃষ্টির অর্থ খুব সহজেই বুঝে নিল।
ভেতর থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো দীর্ঘশ্বাস—
—হায় বিধির লিখন, যায় কি খণ্ডন?
এই জন্যই বলে ধৈর্য ধরো। আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী। তিনি তার বিচার সঠিক সময়ে, জীবিত অবস্থাতেই করে দেন।
এই ভিড়ের মাঝেও কায়সারের দৃষ্টি ছিল ঊর্মির দিকেই। মেয়েটির এই তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তায় মনে মনে মুগ্ধ না হয়ে পারল না।
মনে মনে বলল—
—সো ইন্টেলিজেন্ট।
চলবে,,,,,
#বৈরি_হাওয়া
#পর্ব_২৭
#ফারজানা_প্রণয়_চৌধুরি

