ওনাকে মারলেন কেনো?
ঊর্মির শান্ত স্বাভাবিক কন্ঠে সামনের ব্যাক্তি হকচকালেন । হাত পা কাঁপছে সমান তালে। বিপদের পূর্বাভাস খুব ভালোই টের পেলো । ঊর্মি নির্বিকার। পাশের ব্যাক্তির অস্থিরতা টের পেয়েও কোনো ভাবান্তর নেই । একমনে তাকিয়ে আছে শায়িত নাম মাত্র বাবার কবরের দিকে।
উর্মির সৎমা ঘাবড়ে গেল। এই মেয়েকে ইদানিং তার খুব ভয় করে। কেমন প্রাণহীনের মতো আচরন।এই মেয়ে তো এমন ছিল না।তার কাছেই তো বড় হওয়া। তাহলে মেয়েটির হঠাৎ এমন পরিবর্তনের কারন কি? এত চতুর, বিচক্ষণতাও কি সম্ভব ? যেখানে এতো এতো মানুষের চোখে পড়লো না সেখানে এই মেয়েটা ঠিক বুঝে ফেলেছে। নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলেন তিনি। স্বাভাবিক স্বরে বলতে চাইলেও কন্ঠ জড়িয়ে আসলো,
–কি বলছো এসব? এমন ভিত্তিহীন কথার মানে কি?
ঊর্মি এবার সরাসরি তার দিকে তাকালো। বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে কিছুটা ব্যাঙ্গার্থ কন্ঠে বললো,,
— উফ আপনার অভিনয় আর নিতে পারছি না। আসল মামলাটা কি ঝেরে কাসেন। যেই স্বামীর অন্যায় দেখেও অন্ধ ছিলেন। একের পর এক অন্যায় করেছেন সেখানে এই নাটকের মানে কি? ভয় নেই বর্তমানে আমি কোনো ঝামেলা করছি না।ভুলবসত ঐ লোকটার রক্ত আমার শরিলে থাকলেও বিন্দু পরিমাণ মায়া তার প্রতি আমার নেই। তাই তার খুন নিয়েও আমার মাথা ব্যাথা নেই।তবে একটা ব্যাপার খুব জানতে ইচ্ছে করছে। মারলেন কেনো? প্রথম স্ট্রোক তারপর প্যারালাইসিস এবং পরে সরাসরি খুন।এতো কাহিনীর মানে কি?
ভিতরের সবকিছু বের করে দিন।এই ফ্যামেলি ড্রামা ভালো লাগছে না। এখান থেকে একেবারে বের হতে চাইছি। সব ঝামেলা চুকিয়ে যাবো।
উর্মির সৎ মায়ের ঘাবড়ানোর মুখটায় ফুটে উঠলো এক হিংসাত্মক দৃষ্টি। হঠাৎ সে ফুঁসে উঠলো,,
— ঊর্মি, ঊর্মি,ঊর্মি আমাকে একদম শেষ করে দিলো। আর পারছি না অভিনয় করতে। ভাগ্যিস তোর মা বেঁচে নেই। নাহলে আজকে তর মায়েরও একই পরিণতি হতো।
আমার ছেলেটা মরেছে। শুধু মাত্র তোদের জন্য। আমি খুনি হলে তোরা কি? তোরাও খুনি। ঐ লোকটাও খুনি। চেয়েছিলাম তো তারপরেও সবকিছু ভুলে থাকতে। কিন্তু হলো কি তোকে ঝুলিয়ে দিলো। তথাকথিত সৎ মায়ের দায়িত্ব। প্রথম প্রথম তো লোকটা তোকে সহ্যই করতে পারতো না। গাছাড়া ভাব করতো।যেন তোকে গিলতেও পারছে না আবার উগড়াতেও পারে না। তবে দেখা গেলো দ্বায়িত্বের দিকে কোনো অবহেলা নেই। আমার সাগরিকা যা পেয়েছে তার সব তুই পেয়েছিস। কেনো পাবি তুই? একটা জারজ সন্তান হয়ে এতো সুখ? খুব কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতাম। শুরু করলাম মা মা নাটক। বিশ্বাস কর তোকে দেখলেই খুন করতে ইচ্ছে করতো কিন্তু আমি নিরুপায় ছিলাম। আমি তখন থেকেই ভেবে রেখেছিলাম মেরে ফেললে তো সব শেষ। সেটাতে তৃপ্তি হবে না। আমি তৃপ্তি পাবো তর কষ্ট দেখে।তুই একটু একটু করে কষ্ট পাবি আর আমি একটু একটু করে শান্তি পাবো। আর এসবের মাঝে ব্যাবহার করলাম আমার শাশুড়িকে। কিন্তু বুড়িটা অতিরিক্ত বুঝে। তোকে বিয়ে দিতে চাইলো মেট্রিক ফেইল রিক্সা চালকের সাথে। আমার ব্যাপারটা মোটেও পছন্দ হলো না। আরে এতে তোর শাস্তি কি হতো? ঠিকই তো মানিয়ে নিতি। আমি তো তোকে খুব ভালো করে চিনি।আমি চেয়েছিলাম তোর সবচেয়ে দুর্বল যায়গায় লাগুক। হঠাৎ করে কায়সারের বাড়ির সমন্ধটা আসলো।আমার কেনো যেন মনে ধরে গেল।এটাই তোর জন্য বেস্ট হবে ভেবেছিলাম। ছেলেটার ফ্যামিলি সম্পর্কে জেনেই আমি পাগল হয়ে গেলাম। এটার থেকে ভালো আর কিছু হতে পারে না। তোকে যদি কোনোভাবে প্রতরনা করে বিয়েটা দেওয়া যায় তাহলে কোনোমতেই মেনে নিবি না।তিলে তিলে শেষ হবি। স্বামীর ভালোবাসার জন্য কাতরাবি। নরম মনের নারী ধুঁকে ধুঁকে মরবি। তাইতো সবাইকে ফুঁসলিয়ে পালিয়ে বিয়েটা দিলাম।তোর বাবার তো বিয়ের দিন দরদ উথলে পরছিলো। প্রথমবারের মতো কান্না করছিল।যতসব ন্যাকামো। যাইহোক যেটার জন্য তোকে এভাবে বিয়ে দিলাম ।কিন্তু হলো একদম উল্টো। আমার এতো দিনের পরিশ্রম শেষ করে দিলি। কষ্ট তো দেখা হলোই না।উল্টো তুই নরম থেকে গরম হয়ে উঠলি। সেই ছোটো বেলার মতো আবারো আমার বিপদ । তর হঠাৎ পরিবর্তনে যেই লোকটা তোকে সহ্য করতে পারতো না ঐ লোকটারি প্রিয় হয়ে উঠলি। হঠাৎ অপরাধবোধ যেগে উঠলো। নিজেকে দায়ী করতে থাকে। তুই বল এটা কি আমি মানতে পারি? সে তো তার অপরাধবোধের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে। নিজের সবকিছু তর নামে লিখে দিতে চাইলো?উকিলের সাথে পরামর্শ পর্যন্ত করে ফেলেছে।কি আশ্চর্য।যেই মেয়ের জন্য আমার ছেলেটা মরলো তাকেই নাকি সব লিখে দিবে। বুঝাতে চাইলামা, কিন্তু ফলাফল শূন্য। হঠাৎ করে জারজ মেয়ের জন্য ভালোবাসা উতলে উঠলো। নিজের রক্ষিত,,,
কথাটা শেষ করার আগেই ঊর্মি গলার টুঁটি চেপে ধরলো। হঠাৎ এমন আক্রমণে তিনি খানিকটা পিছিয়ে গেলেন। ঊর্মির চোখ হঠাৎ লাল হয়ে উঠলো। শান্ত মানুষের রাগ ভয়ঙ্কর হয়। সহজে রাগ হয় না তবে একবার রাগ মাথাচাড়া দিলে খুন চেপে বসে । এবার যেনো তাকে আটকানো মুশকিল। উর্মির সৎ মায়ের দম বন্ধ আসার জোগার। হঠাৎ কেউ তাকে জোড়ে সরিয়ে নিল।এতে যেনো ঊর্মির রাগ আরো মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। সামনে তাকিয়ে কায়সারকে সৎ মায়ের সামনে দাঁড়ানো দেখে নিজেকে একেবারে খুইয়ে ফেললো।ঠাস করে চড় দিয়ে বসলো কায়সারকে। এটা ছিলো পুরোই অপ্রত্যাশিত। সে তোর এই মেয়েটির কঠোর রুপ দেখে অভ্যস্ত। এমন উসৃঙ্খল ঊর্মি তো সে দেখেনি। গালটা জ্বলে যাচ্ছে। গালে এক হাত দিয়ে বেকুবের মতো তাকিয়ে আছে কায়সার। তার ভাবনা চিন্তা করার মাঝেই ঊর্মি কায়সারের স্বজরে ধাক্কা দিলো। এতে কায়সার খানিকটা পিছিয়ে গেল। তার মাঝে জ্বরের ক্লান্ত দেহ। ঊর্মির উদ্দেশ্য বুঝে ফেললো কায়সার। কিছু করার আগেই ঝাঁপটে ধরলো ঊর্মিকে। নিজেকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ দেখে আরো খেপে উঠলো সে। কায়সার মনে মনে হাঁফ ছাড়ল ভাগ্যিস কবরস্থানে কেউ নেই । আয়াশকে বাইরে দার করিয়ে এসেছিল । ঊর্মি কে যখন কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছিল না তখন সে করে বসলো এক অপ্রত্যাশিত কান্ড। ঊর্মিকে স্বজোরে জ্বরিয়ে ধরলো বুকের মাঝে।এক হাতে শক্ত করে কোমর জরিয়ে আরেক হাত মাথায় রাখল। এতেই কাজ হলো। মেয়েটা হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল। নিজের অজান্তেই এই সামান্য স্নেহ টুকু নিলো।হয়তো এভাবে কেউ কখনো ভরসা দেয় নি। যখন ঊর্মি বুঝতে পারলো কি হয়েছে সাথে সাথে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো। কোনোদিকে না তাকিয়ে আবার থাপ্পড় মারার জন্য উদ্যত হলে হাত মাঝ পথেই থামিয়ে দেয় কায়সার।
চোঁখে কঠোর দৃষ্টি রেখে বুঝিয়ে দেয়,
এই সাহস আর না করার।
ঊর্মি নিজেকে শান্ত করলো। কিছুক্ষণ আগে নিজের এই অস্বাভাবিক আচরনে জন্য রাগ হচ্ছে। তার সাথে এই আচরণ কোনোভাবেই যায় না? যে ব্যাক্তি নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে পারে না।সে কখনো নিজের লক্ষ্যে পৌছাতে পারে না। তাকে আরো কঠোর হতে হবে।
ঊর্মি কায়সারের থেকে ধ্যান সরিয়ে কাতরাতে থাকা মহিলার দিকে তাকালো।
সামান্য বাঁকা হেসে বললো,
— ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন। আপনি একটা বোকার মতো কাজ করেছেন।তবে আপনি একটা না অনেকগুলোই করেছেন। তবে সর্বশেষ বোকামো করেছেন মিস্টার আফতাব সাহেব কে মেরে। আপনি আপনার সায়কোগিরীতে এতোটাই বিভোর ছিলেন যে আফতাব সাহেবের কোনো সম্পত্তি ছিলোই না এটাই ভুলে গেলেন। বর্তমানে আপনার শাশুড়ি সবকিছুর মালিক। যতটুকু বুঝলাম উনি উনার পুত্রের নির্মম মৃত্যুর কথা জানে। বুঝতে পারছি না এখন কি হবে? এক কাজ করেন তাকেও মেরে দেন।আই ডোন্ট মাইন্ড। তবে মাইন্ড তখনি করবো যখন কণিকা নিয়ে কিছু বলবেন। আর আমি যদি একবার নাক গলাতে শুরু করি তাহলে কি হবে তা হয়তো এতো দিনে বুঝে গেছেন। বেস্ট অফ লাক।
ঊর্মি একবার কায়সারের দিকে বিরক্তিকর চোঁখে তাকিয়ে সামনের দিকে এগোতে শুরু করলো। কিছুটা পথ গিয়ে হঠাৎ থেমে গেলো। ঘাড় সামান্য বেঁকিয়ে বললো,,
— আমার পরিচয় আমি ঊর্মি। না কারো মেয়ে,আর না কারো বউ। সো আমাকে সাস্তি দেওয়ার জন্য এদের কে ব্যাবহার করবেন না। এরা মরলো কি বাঁচলো তাঁতে আমার যায় আসবে না।আর আমার কষ্ট দেখা আপনার স্বপ্নই থেকে যাবে। তবে আপনার ধ্বংস দেখা আমার অবশ্যই হবে।
কথাই তো আছে, আল্লাহ ছাড় দেন ছেড়ে দেন না। সবচেয়ে বড় উদাহারণ আফতাব সাহেব।
আর এক মুহূর্তও দেরি না করে বেরিয়ে গেলো ঊর্মি। কায়সার এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে সেই দিকে। ক্লান্ত ঠোঁটে সামান্য হাসলো। তার জীবনের সবগুলো নারীই বিপদজনক। প্রতিটি নারীর আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এই নারীটি আলাদা।
বিপদজনক তবে ইন্টারেস্টিং।
—
কবরস্থান থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে আয়াশের সাথে চোখাচোখি হলো ঊর্মির। এতে আরো বিরক্ত হলো সে । আচ্ছা এরা কি দল ছাড়া চলতে পারে না।
এটা এখন শুরু করবে মাথা খাওয়া। পাশ কাটাতে চাইলেও আয়াশ সামনে এসে হাজির। অবাক করা চাহনি।ঊর্মি ব্রু কুঁচকে ইশারা করলো
সমস্যা কি?
আয়াশ এবার অবাক চোঁখেই জিগ্গাসা করলো,
— ভাইয়াকে মারলে কেনো?
ঊর্মি আর নিতে পারলো না। পা চালিয়ে হাঁটা শুরু করলো।
আয়াশ পিছন থেকে চেঁচিয়ে বললো,
–কেউ আগলে রাখতে চাইলে জরিয়ে ধরতে হয়। ইগোর কারনে সেই সুখ মিস করছো। একবার সুযোগ দিয়ে দেখো ভাইয়ের সাথে ভালোই থাকবে। সাথে দেবর পাবে রসগোল্লা।
ঊর্মি থামলো তবে পিছনে না ফিরেই বললো,,
— যদি সুখী না হওয়ার কারন হয় ইগো তাহলে আমার ধ্বংসই শ্রেয়। আর রইলো বাকী জরিয়ে ধরার কথা। জরিয়ে ধরতে নিজস্ব বুকের প্রয়োজন। কিন্তু ঐ দেহে যে ছিল অন্যের বাস। এখন যদি বলো ভালোবেসে সে কি পাপ করেছে? আমি বলবো পাপ পূণ্যের ব্যাপার সেটা একান্তই তার। এর দায়ভার আমার কেনো হবে?
তাকে সাবধান করবে অন্যের বিশ্রী গন্ধে লেপ্টানো শরিলে যেন আমাকে স্পর্শ না করে। তাহলে ঐ বলিষ্ঠ শরির আগুনে পুড়াতে দ্বিতীয়বার ভাববো না।
আশেপাশে আর না তাকিয়েই চলে গেলো উর্মি। আয়াসের অদ্ভুত তাকানোর মাঝেই কায়সার উপস্থিত হলো। পিছনে পিছনে ঊর্মির সৎ মাও আসলো। তাকে দেখে আয়াশের ইচ্ছে করছে ঊর্মি যেভাবে স্বর্ণার চুলগুলো টেনেছে সেভাবেই টানতে। তবে ভাই সামনে দেখে নিজের ইচ্ছে দমালো। তবে অবাক না হয়ে পারছে না।কিভাবে একটা মানুষ খুন করে বসে আছে। কিন্তু কেউ টের পর্যন্ত পেলো না।
নারী তুমি ভয়ঙ্করি।
ঐ ডেঞ্জারাস মহিলার থেকে চোখ সরিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকালো আয়াশ। সাথে সাথে চমকে উঠলো। সাদা পাঞ্জাবিতে রক্তের দাগ। কায়সার গাড়ির দিকে যেতে যেতে ভাইকে উদ্দেশ্য করে বললো,,
— অবাক হওয়ার কিছু নেই। ঐ মিনি খেক শেয়াল জরিয়ে ধরার অপরাধে খামচিয়ে গেছে।
কেনো যেনো মনে হচ্ছে এটা ট্রেনিং প্রাপ্ত। ভেবেছিলাম জরিয়ে ধরাতে ভরসা পেয়ে শান্ত হচ্ছে। কিন্তু ঐ খেক শেয়াল আসলে শান্ত হয়েছে আমার রক্ত চুষে।
পুরোই বিরক্তিকর তবে ইন্টারেস্টিং!
চলবে,,,,,,
#বৈরি_হাওয়া
#পর্ব_২৮
#ফারজানা_প্রণয়_চৌধুরি

