বৈরি_হাওয়া #পর্ব২৯

0
1

আফতাব সাহেবের মৃত্যুর পরে অনেক দিন চলে গেছে। সেদিনের সেই ঘটনাই ছিল ঊর্মির বাবার বাড়িতে শেষ কর্মকাণ্ড। আসার সময় দাদির ছলছল দৃষ্টি দেখলেও সে তাতে পাত্তা দেয়নি। পাপীদের প্রতি মায়া দেখানোটা তার কাছে নিরর্থক মনে হয়। তাই ওই মহিলার প্রতি দয়া দেখানো অর্থহীন। নিজের করা পাপের শাস্তি যে সবে শুরু।

আশ্চর্যজনকভাবে কায়সারের সাথেও সেদিনই শেষ দেখা হয়েছে। এরই মাঝে কতটা সময় কেটে গেছে। কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পেয়ে নিজ কলেজেই ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে অনার্সে ভর্তি হয়েছে সে। নিয়ম অনুযায়ী ক্লাসও চলছে। ঠিক কতদিন দেখা হয়নি, হিসাব করতে পারছে না । কিংবা করতে চাইছে না।

কলেজ ক্যাম্পাসের গোল উঁচু জায়গাটিতে বসে আছে ঊর্মি। সামনে খরস্রোতা নদীর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে, নানা হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত। তার ভাবনার মাঝেই কেউ এসে পাশে বসল। ঊর্মি টের পেলেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। তার আচরণই বলে দিচ্ছে—পাশের ব্যক্তি তার ধ্যান ভাঙতে পারেনি। পাশের ব্যক্তিও নিশ্চুপ। শব্দহীনভাবে যেন ঊর্মির নীরবতাকে পড়ে নিচ্ছে। চারপাশে শিক্ষার্থীদের কোলাহল থাকলেও তাদের মাঝে অদ্ভুত এক নীরবতা।

একসময় সেই নীরবতা ভেঙে পাশের ব্যক্তি বলল—

—“মিস টুনি, আপনার ক্যারেক্টারটা অদ্ভুত স্ট্রিক্ট। মেয়েদের কোমল স্বভাবের মাঝেও যে এমন কঠোরতা থাকতে পারে, আপনাকে না দেখলে বুঝতাম না। আমাদের মা-চাচিদের সব বৈশিষ্ট্যের ঠিক বিপরীত আপনি।

আচ্ছা, আপনি কি কখনো কাঁদেন না? আমার একটা অদ্ভুত শখ হয়েছে—আপনি কাঁদবেন, আর আমি এক দৃষ্টিতে দেখব। আপনার কান্নাও বোধহয় আপনার চরিত্রের মতোই চমৎকার হবে। প্লিজ রাগ করবেন না। সবাই আপনাকে হাসতে দেখতে চাইলেও, আমি আপনাকে কাঁদতে দেখতে চাই।

আপনি সবসময় সাদা-কালো পোশাক পরেন কেন? মনে হয় যেন শোক বয়ে বেড়াচ্ছেন। আমার আরো একটি শখ আছে—আপনাকে কমলা রঙে দেখার। কমলা শাড়িতে আপনাকে কেমন লাগবে? জানি, আমার মতোই আমার শখগুলোও উদ্ভট। তবে বিশ্বাস করুন, আপনাকে মন্দ লাগবে না। কোনো একদিন কমলার আভায় নিজেকে রাঙিয়ে দেখবেন?

কিছুক্ষণ থেমে আবার বললো,,

আচ্ছা, আপনাকে “মিস টুনি” কেন বলি—জানতে ইচ্ছে হয় না? আপনার জায়গায় অন্য কেউ হলে এই নামে ডাকলে অভিমানে গাল ফুলিয়ে বসে থাকত। আপনি পুরোই অদ্ভুত।

যাইহোক আপনাকে অভিমান করলে কেমন লাগে? আপনার অভিমান দেখার সৌভাগ্য কি কারো হয়েছে?

কিছুক্ষণ থেমে হতাস কন্ঠে বললো,,

কখন থেকে একটানা বলে যাচ্ছি, আর আপনি নিশ্চুপ।
কেন এত নীরবতা? আপনার কি প্রাণ খুলে শ্বাস নিতে ইচ্ছে করে না? চারপাশে দেখুন কত শিক্ষার্থী, কত চঞ্চলতা! সবাই কিছু না কিছু করে নিজের ক্লান্তি দূর করছে। আর আপনি রোবটের মতো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। কেন এত উদাসীনতা?

——কারণ হেতীর জামাইয়ের সাথে হেতীর দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। হেতী জামাইকে নিয়ে খুব আপসেট, উদ্ভট ভাই। আপনার কাব্যিক কথা কিছুই ওর কানে ঢুকছে বলে মনে হচ্ছে না।
আপনার মিস টুনি সুফিয়া কামালের মতো স্বামীর শোকে উদাসীন। পার্থক্য একটাই একজনের স্বামী জীবিত, আরেকজনের মৃত।

সাফোয়ান যেন চমকে উঠল। সামিয়ার কথা তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। এই তো সেদিন প্রথম তাদের বাসায় মেয়েটিকে দেখেছিল—লজ্জাজনক এক চোখাচোখি। ব্রাশ না করে, এলোমেলো মুখে বোকার মতো তাকিয়ে ছিল সে। সেদিন মেয়েটি আমলে না নিলেও তার নজর কেড়েছিল। কী যে তাকে আকৃষ্ট করেছিল—আজও সে উত্তর পায়নি।
তারপর থেকেই মেয়েটির নজরে পড়তে চেয়েছে। কিন্তু কোনোভাবেই সম্ভব হয়নি। কে জানত, সেদিন এই ছোট্ট বিচ্ছুটা এমন কিছু বলবে যে সে ধরা পড়ে যাবে!
বয়সে সে প্রায় তিন বছরের বড় হলেও মেয়েটিকে ভয় পায়। দেখা হতে হতে একদিন সাহস করে প্রপোজ করেছিল। কিন্তু মেয়েটি পুরোই নিশ্চুপ। কী কঠোরতা! এই ব্যক্তিত্বই তাকে আরও টেনেছে।
সেদিনের পর থেকে সে নিজের মনের নানান ইচ্ছে, স্বপ্ন বলে গেছে। ঊর্মি চুপ থাকলেও সে ভেবেছে—সবই বুঝছে। এতদিনে তো অনুভূতির গভীরতা বোঝার কথা! তাহলে এই নিষ্ঠুরতা কেন? উপহাস করার আর কোনো উপায় ছিল না?
চোখ দুটো লাল হয়ে উঠল। জল বেরোতে চাইছে, কিন্তু সে আটকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে।
সামিয়ার এবার মায়া হলো। জাকির কটমট করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মেয়েটা একেবারে আজব! ঊর্মি আবার কবে থেকে স্বামীর শোকে উদাসীন? উল্টো সেই তো স্বামীকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলে এসেছে।
যাই হোক, মেয়েটা যখন নিজের মতো বাঁচতে চাইছে, তখনই এই ছেলেটার আগমন। জাকিরের কাছে ছেলেটাকে খারাপ লাগেনি । দেখতে ভালো, চরিত্রও খারাপ নয়। কিন্তু সামিয়ার কাছে সে নাকি বলদ!
কীসব আজেবাজে দোষ—পারফিউম ভালো না, জুতার চয়েজ ভালো না! এই যুগে নাকি হলুদ জুতা কে পরে! ছেলেটা একটু উদ্ভট হলেও, ওর উদাহরণের মতো জঘন্য নয়। অযথাই ছেলেটার মন ভেঙে দিল।

ধ্যান ভাঙলো সালোয়ারের কথায়

—কেন করলেন এমনটা, মিস টুনি? সপ্তাহে একদিন হলেও নিজের অনুভূতিগুলো আপনার কাছে প্রকাশ করি। কতটা আবেগ নিয়ে আপনাকে চাই—বুঝাতে পারব না। একটুও কি মায়া হলো না? আপনি বিবাহিতাএকবার বললে কী হতো? অনুভূতি কি এতটা গভীর হতো? আমি ভেবেছিলাম আপনি এমনিই নিশ্চুপ থাকেন। কিন্তু আপনার নীরবতার কারণ যে ভিন্ন!
প্লিজ, একবার বলুন এই মেয়েটা মিথ্যা বলছে।
সামিয়ার দিকে আঙুল তুলে বলল—
একবার বলুন এই চার-চোখের ব্যাটারিটা মিথ্যা বলেছে! বিশ্বাস করুন, এটাকে এখানেই চড়িয়ে যাব। জীবনে আর মিথ্যা বলার সাহস পাবে না।

জাকির পুরো হতভম্ব। এত শোকের মাঝে এ কী কাণ্ড! এখন তো মনে হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে যাবে। খুব করে বলতে ইচ্ছে করছে—

কেন ভাই? নিজে থেকেই সাপকে বলছিস—দে, আমাকে কামড় দে। এবার বুঝ ঠ্যালা।

জাকির সামিয়ার দিকে তাকাল। মেয়েটার চোখ যেন বেরিয়ে আসার উপক্রম। এই মেয়ের ঝগড়ার ইতিহাস আছে—বাড়ির ছেলেদের সঙ্গে রামদা, ইট-পাটকেল নিয়ে দৌড়ানোর রেকর্ডও আছে। ঝগড়া করার সব টেকনিক ওর গিঁটে গিঁটে বাঁধা। ওর ভাইগুলো একেকটা ডাকাত। তারাই পারমিশন দিয়েছে

মেরে আসবি, বাকিটা আমরা সামলাবো। সেই হিসেবে এটা একটা জংলি। ভাগ্যের দোষে এই জংলির সঙ্গেই তাদের পরিচয়।

যেই সামিয়া এগোতে যাবে, জাকির ওর সামনে শুয়ে পড়ল। সামিয়া, সাফওয়ানসহ আশেপাশের সকলে হতভম্ব। এত বড় একটা ছেলের এ কী অবস্থা! আশেপাশের কেউ কেউ মির্কি মনে করে জুতা নিয়ে এগোতে চাইলে ঊর্মি উঠে দাঁড়াল। পরিবেশ উশৃঙ্খল হওয়ার আগেই সবটা সামলে নিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে আবার ওদের দিকে ফিরে এল।

জাকিরের দিকে না তাকিয়েই বলল,

—বাচ্চাদের মতো ড্রামা শেষ হলে দু’জনই নিজেদের কাজে যাও। মান-সম্মানহীন, কোথাকার!

তারপর সাফোয়ানের দিকে তাকিয়ে আগের জায়গায় বসে পাশে বসতে ইশারা করল।
সাফওয়ান তাই করল।

সামিয়া পাশ থেকে আড়ি পেতে শুনছে। জাকিরও একই কাজ করছে। সেখানেই বসে লুকানোর চেষ্টা করছে।
ঊর্মি ওদের দিকে তাকিয়ে সামান্য ঠোঁট বাঁকাল। সবটাই ছিল ওদের আড়ালে।

তারপরই বলল,,

—অনুভূতি, আবেগ—এই জিনিসগুলো খুব মূল্যবান। যার-তার প্রতি দেখাবেন না। সবাই যতই বলুক, ভালোবাসা নাকি এত কিছু ভেবে হয় না—আমি বলব, এই কথা মিথ্যা। যে ভালোবাসা হুট করে হয়ে যায়, সেই সম্পর্ক খুবই অস্থায়ী, নড়বড়ে। সেই সম্পর্কের দশটার মধ্যে দুটো টিকে, বাকি আটটাই ভেঙে যায়। কেন জানেন? একটা সময় তাদের মধ্যে বিবেক জেগে ওঠে। তখন তারা ভাবতে শুরু করে, হিসাব করতে শুরু করে। আফসোস করতে থাকে—কেন এমনটা করল? কেন আগে থেকে বুঝল না?
যাই হোক, এত বিস্তারিত না যাই। আমার ব্যাপারে আসি। যখন আপনি আমাকে দেখলেন, তখনই কিন্তু ভালোবাসা আসেনি ওটা ছিল ভালোলাগা। আমাদের অনেক কিছুই ভালো লাগে। আমরা কি সবকিছু পাই?
তারপর আপনি আমার খোঁজখবর না নিয়েই আমাকে ফলো করতে থাকলেন, একসময় প্রপোজ করলেন। আমি উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনই মনে করিনি। ভেবেছিলাম, এক-দুই-তিন দিন উত্তর না পেলে এমনিতেই সরে যাবেন। কিন্তু আপনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠলেন। প্রতিনিয়ত আবেগঘন কিছু কাব্যিক কথা বলতে লাগলেন যেগুলো আমার কাছে বিরক্তিকর লেগেছে।
আমি এ ব্যাপারে কিছু বলতে চাইনি। কী-ই বা বলব? যে ছেলে নিজেরই বোঝে না, তাকে কী বোঝাব? এখানে আমার কোনো ভূমিকা নেই। যা হয়েছে, সবটাই আপনার সিদ্ধান্ত। আমাকে দোষ দেওয়ার কিছুই দেখি না। আর দায়ী করলেও আমার কিছু যায় আসে না।
আশা করি, পরেরবার আমার সামনে এই ব্যাপারে কোনো প্রত্যাশা নিয়ে আসবেন না। ধন্যবাদ।
ঊর্মি উঠে দাঁড়াল।

মাথাটা হালকা ঝিমঝিম করে উঠল হঠাৎ হঠাৎ এমন হয় তার। কোনোমতে নিজেকে সামলে জাকির আর সামিয়ার কাছে এসে দাঁড়াল।

সামিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল—

—কিছু কিছু কথা মজা করে বললেও, তা বিষের মতো আঘাত করে। যে সম্পর্কের কোনো ভিত্তি নেই, সেই সম্পর্ককে মাঝখানে টানিস না। এই ছেলের থেকে বাঁচাতে গিয়ে ওই সম্পর্ক টানার কোনো দরকার ছিল না। আমি আগেও বলেছি এখনো বলছি—আমার পরিচয়, আমি ঊর্মি।

ঊর্মি নিজের মতো বলেই চলে গেল তার গন্তব্যে। কোনো প্রতিউত্তর, কোনো ব্যাখ্যা কিছুই শুনতে চাইল না।
পিছনে রয়ে গেল কারও নিচু মাথা, আর কারও ছলছল করা চোখ।

—————–

স্বর্ণা মামলা থেকে জামিনে এসেছে অনেকদিন হলো। এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি পায়নি সে। সময়মতো হাজিরা দিতে হয়। তবে আর যাই হোক, তার ডাক্তার স্বামীর লাইসেন্স বাতিল হয়েছে।
হুমায়ূন দেওয়ানের ক্যান্সার হয়েছে। গালের একপাশ ছিদ্র হয়ে বিভৎস অবস্থা। কিছু গিলতে পারছে না যা মুখে দেয়, গালের ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে পড়ে। এমন অবস্থায় বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুই যেন বেশি স্বস্তির।
রেহেনা দেওয়ানের আগের সেই দাপুটে ভাব আর নেই। থাকবেই বা কতদিন? মেয়ের উচ্ছৃঙ্খল জীবন, স্বামীর অসুস্থতা সব মিলিয়ে সে নাজেহাল। সে বুঝে নিয়েছে, এ তার পাপের ফল।

ঊর্মি আজ অনেক দিন পরে দেওয়ান বাড়িতে এসেছে। হঠাৎ কেন জানি মিমিকে দেখতে ইচ্ছে করছে। মেয়েটা প্রায়ই ফোন দিয়ে দেখা করার জন্য বায়না করে, কিন্তু সে-ই আর আসা হয় না। আজ হঠাৎ ইচ্ছে হলো। কেন হলো, সে নিজেও জানে না। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক হাঁসফাঁস কাজ করছে।
ড্রয়িংরুমে বসে আছে সে। বাড়ির অবস্থা পরখ করছে। প্রতিটা মানুষকে লক্ষ্য করছে। হাসি ভাবি কথা বলে গেল। সাজেদা বেগম আড়চোখে দেখে চলে গেলেন। কুশলাদি করারও প্রয়োজন মনে করলেন না। এমদাদ দেওয়ানের সাথেও দেখা হলো। বেশ কিছুক্ষণ ভালো-মন্দ কথাও হলো।
কিন্তু মিমি এখনো আসেনি। আসবে কীভাবে? সে তো এখনো স্কুলে। ঊর্মি সব জেনেও আগেই চলে এসেছে। ব্যস্ততার নিয়মমাফিক জীবন থেকে একটু মুক্তি চাইছে সে।

হঠাৎ কায়সারসহ মিমির বাড়িতে আগমন।
বুককটা কেমন ধক করে উঠল! ঊর্মির
হঠাৎ সবকিছু শূন্য মনে হচ্ছে। প্রথম দেখাতেই তো লোকটার জন্য কিছুটা অনুভূতি জেগেছিল। যতই হোক, পবিত্র সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ ছিল তারা। কী এমন দোষ হতো, যদি লোকটা একান্তই তার হতো? একটা ছোট সংসার হতো।
এই যে ঊর্মির রাতে ঘুমাতে এত কষ্ট হয় । হতাশা যখন চারদিক থেকে ঘিরে ধরে, তখন কি পারত না লোকটা তাকে বুকে টেনে নিতে? মাথাটা বুকে চেপে ধরে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে? সেও হয়তো তখন নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করে নিত।
কিন্তু বিধাতা যেন তার ভাগ্য লেখার সময় খুবই উদাসীন ছিলেন।

কায়সার এত দিন পরে ঊর্মিকে দেখে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এত দিন পর দেখে খানিকটা অবাকও হলো। ঊর্মির শারীরিক অবস্থা দেখে খারাপ লাগছে। শুকিয়ে চেহারার অবস্থা শোচনীয়।
ভাবতেই অবাক লাগে তার এত টাকা-পয়সা থাকা সত্ত্বেও তার স্ত্রী এভাবে কষ্টে জীবন যাপন করছে।
আচ্ছা, মেয়েটা কি পারত না সব ভুলে সংসারটা করতে? ভুল তো মানুষই করে। সেই ভুলগুলো ভুলে কি পারত না আমাদের বাবা-মেয়েকে আগলে রাখতে?
এখন খুব আফসোস হচ্ছে স্বর্ণার আগমন যদি তার জীবনে না হতো, তাহলে হয়তো এই মেয়েটির মাঝেই নিজের সমস্ত সুখ খুঁজে পেত।

ঊর্মিই ঠিক বলে—ভালোবাসায় আবেগ নয়, বিবেক কাজ করা উচিত।

কায়সার চোখ বন্ধ করে আবার তাকাল। সামনের দৃশ্য দেখে সে আবারও হকচকিয়ে গেল।
ঊর্মি মিমিকে জড়িয়ে বসে আছে। যেন কোনোভাবেই ছাড়তে চাইছে না।
কায়সারের খানিকটা খটকা লাগল। আচ্ছা, এই মেয়েটা কি কিছু করতে চাইছে? আবার কি নিজের জন্য কোনো বিপদ ডেকে আনছে?
একপর্যায়ে বিরক্ত লাগল। অতিরিক্ত বেয়াড়া মেয়েটা। একা ছেড়ে দিয়েছে—শান্তিতে থাকুক। তা না, অশান্তিই যেন তার পছন্দ।
একবার ওদের দিকে তাকিয়ে উপরে চলে গেল।

চারদিকে শীতল, স্নিগ্ধ পরিবেশ। সেই শীতলতার মাঝেই ঊর্মি দাঁড়িয়ে আছে কায়সারের রুমের বারান্দায়। দৃষ্টি সামনের উঁচু দালানগুলোতে।
কায়সার মাথা মুছতে মুছতে বারান্দায় এসে নারীর অবয়ব দেখে খানিকটা থমকে গেল। নারীটি কে বুঝতে পেরে সামান্য হাসল। এই মেয়েটি সত্যিই অদ্ভুত।

ঊর্মির পাশে গিয়ে দাঁড়াল সে। তার দিকেই তাকিয়ে বলল,

—তুমি আমার সব অভ্যাস আয়ত্তে রেখেছ, ঊর্মি। তবুও আমার প্রতি তোমার এত নিষ্ঠুরতা?

প্রত্যুত্তরে ঊর্মি বলল,

—আচ্ছা, সত্যি করে বলবেন—মিমি কি আপনার সন্তান?

হঠাৎ ঊর্মির দুর্বল কণ্ঠের এমন প্রশ্নে কায়সারের বুকটা যেন খামচে ধরলো। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে এই মেয়েটার ভেতরের অনুভূতিগুলো।

কোনোমতে নিজেকে সামলে বলল,

—আমি আগেও বলেছি, এখনো বলছি—মিমিকে এসবের মাঝে টানবে না, ঊর্মি।

কায়সারকে কথা শেষ করতে না দিয়েই ঊর্মি বলল,

—জানেন, আপনি আমার থেকেও বেশি রহস্যময়। আমার জীবনের সব রহস্যের পাতাগুলো আপনি পড়ে ফেলেছেন, কিন্তু আমি আপনার জীবনের শেষ পাতায় গিয়ে আটকে আছি। মনে হচ্ছে বইটা শেষ হয়েও শেষ হলো না। মাঝখানের একটা পৃষ্ঠা আপনি ইচ্ছা করে ছিঁড়ে রেখেছেন।

কায়সার অদ্ভুত এক হাসি হাসল। দুজনের মাঝেই গভীর হতাশা।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে ঊর্মি আবার বলল,

—আজ খুব ইচ্ছে করছে আপনাকে জড়িয়ে ধরতে। স্বামীর গায়ের গন্ধ কেমন, তা অনুভব করতে। নিজের পবিত্র মানুষটাকে জড়িয়ে ধরলে কেমন লাগে—জানতে ইচ্ছে করছে। বুক কি ধকধক করে? জড়িয়ে ধরলে কি আবেশে আপনাআপনি চোখ বন্ধ হয়ে যায়?
আজ আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে।
কিন্তু আমার হাত বাঁধা। চাইলেও পারছি না শুধু আপনার জন্য। যেভাবেই হোক, আপনি আমার সবচেয়ে বড় সুখটা কেড়ে নিয়েছেন।
কেন অন্যের হয়ে আমার জীবনে এলেন? কেন সেই দুই হাতকে হেফাজতে রাখতে পারলেন না? কেন এভাবে ঠকালেন?কায়সারের মাথা নিচু।

মেয়েটার কথা আর আচরণ আজ অন্যরকম লাগছে। মনে হচ্ছে জমে থাকা সব কষ্ট অভিযোগ হয়ে বেরিয়ে আসছে।

কিন্তু এই মেয়েটা তো এমন না… হঠাৎ কী হলো?
তার খুব ইচ্ছে করছে—মেয়েটার দুই গাল ধরে, শক্ত করে কাছে টেনে, ধমক দিয়ে বলতে—

“এই মেয়ে, একদম কাঁদবে না। তুমি কাঁদলে আমার বুকে ব্যথা করে।”কিন্তু সে নিরুপায়।

দুইজন মানুষের অনুভূতি এক, অথচ অতীতের ভুলের কারণে দুজনের মাঝেই শুধু শূন্যতা

ঊর্মি হঠাৎ কিছু না বলেই হাঁটা শুরু করল। কায়সার তাকিয়ে আছে সেদিকে। ওর চলে যাওয়া দেখে আজ এত কষ্ট হচ্ছে কেন? অন্য সময় তো এমন অনুভূতি হয় না।

কায়সারের হঠাৎ খুব বলতে ইচ্ছে করল—

আমি প্রথমজনকে আবেগে ভালোবাসলেও, তোমাকে কিন্তু বিবেক দিয়ে ভালোবেসেছি।

কিন্তু তুমি তো থামবে না। একবার কি পিছনে ফিরে তাকানো যায় না?
তার ধারণাই ঠিক । সে পিছনে ফিরে তাকায়নি।

চলবে,,,

#বৈরি_হাওয়া
#পর্ব২৯
#ফারজানা_প্রণয়_চৌধুরি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here