সাজেদা দেওয়ানের পাশে এসে দাঁড়ালো ঊর্মি। সাজেদা দেওয়ান একমনে রান্না করছেন। ঊর্মি যে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, টের পেয়েও নিরব। ভাবটা এমন রান্নাঘরে যে তৃতীয় কারো উপস্থিতি আছে, তার চোখে যেন পড়েইনি। ঊর্মি শাশুড়ি নামক মহিলাটির দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে এমন ব্যবহার করে, যেন সে খুব কঠোর।তবে উপরের শক্ত খোলসের ভিতরে এক মমতাময়ী স্নেহ আছে । এটা সে খুব আগেই টের পেয়েছে।
হঠাৎ সে সাজেদা বেগমের পথ আটকে দাঁড়ালো। এবার তিনি ঊর্মির দিকে সরাসরি তাকালেন। প্রশ্নাত্মকভাবে কিছু বলবেন, তার আগেই শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ঊর্মি। এই অপ্রত্যাশিত আচরণে তিনি খানিকটা হকচকিয়ে গেলেন।
এই মেয়ে তার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত করছে। এই তো তাকে জড়িয়ে ধরে নিরবে চোখের জল ফেলছে।তার মানে মেয়েটির মনে প্রাণ আছে। তবে হঠাৎ এমন আচরণ কেন? কী হয়েছে?
দু’হাত বাড়িয়ে মেয়েটিকে আগলে নিলেন তিনি। দুইজনেই নীরব।
একজন আগলে নিয়েছে, অপরজন মায়ের গায়ের গন্ধ কেমন হয়—তা অনুভব করছে। সাজেদা বেগম কোনো প্রশ্ন করে মুহূর্তটা নষ্ট করতে চাইলেন না।
তবে ঊর্মি নিজে থেকেই বলল—
—অবাক হবেন না, আম্মু। ‘আম্মু’ ডাকাতে রাগ করবেন না, প্লিজ। আমার কেন জানি না অদ্ভুত ফিলিংস হচ্ছে। ফিলিংসটা আসলে কী, বুঝতে পারছি না। আমার আজ খুব মায়ের কথা মনে পড়ছে। মায়ের গায়ের গন্ধ, ভালোবাসা কেমন হয় ? জানার খুব আগ্রহ। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার, এগুলো তো নতুন নয়; তবে আজ কেন এই অনুভূতির দোটানা? আপনার গায়ের গন্ধেই নিজেকে রাঙালাম। খুব আরাম লাগছে, সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়েছে। এখন মৃত্যু হলেও কোনো অভিযোগ থাকবে না।
ঊর্মির শেষ কথাটিতে সাজেদা দেওয়ান আঁতকে উঠলেন। সামান্য খামচে ধরলেন মেয়েটিকে। তার উদ্বিগ্নতা বুঝতে পেরে সামান্য হাসলো ঊর্মি । তাকে হারানোর ভয়ে কেউ তো ভয় পেলো।
নিজে থেকেই ধীরে শাশুড়িকে ছেড়ে দাঁড়ালো ঊর্মি। তার আঁচলে চোখ দুটি মুছে, আশেপাশে না তাকিয়েই চলে গেল। সাজেদা বেগম ডাকতে চেয়েও ডাকলেন না। অজানা আতঙ্কে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন তিনি। হঠাৎ ছেলেকে উপর থেকে নামতে দেখে খানিকটা শান্ত হলেন। তাকিয়ে রইলেন ছেলের বউয়ের চলার পথে—পিছনে ছেলের পথচলা।
কায়সার ঊর্মির পিছনে বের হলেও সামনে যায়নি। আজ কেন যেন ঊর্মিকে স্বাভাবিক মনে হয়নি। চাইলেও পারছে না মেয়েটিকে একা ছাড়তে। এমনকি অধিকার নিয়ে মেয়েটিকে আটকাতেও পারছে না। তাদের চলার পথ ভিন্ন হলেও মাঝে মাঝে ছায়া হলে দোষ কী? থাক তার অবস্থান পিছনে।
ঊর্মি বাড়ি থেকে বের হয়ে রিকশায় উঠলো। রিকশায় করে সামান্য গেলেই বাসস্টপ। সেখান থেকেই বাসে করে যাবে তার গন্তব্যে। ঊর্মি টের পেয়েছে কায়সার তাকে অনুসরণ করছে, তবে সে পিছু ফিরে নি। তার সময় পেছনে ফেরার নয় সবকিছু ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার।
রিকশাওয়ালা বলল
— —মা, পিছনের গাড়িটায় কি তোমার কোনো পরিচিত আছে?
ঊর্মি সামান্য মাথা নেড়ে নির্বিকারভাবে উত্তর দিল
— —না, চাচা।
প্রত্যুত্তরে রিকশাওয়ালা চাচাও যেন সামান্য হাসলো। মনে মনে হয়তো অন্য কিছু ভেবে মজা পাচ্ছেন। তবে তার ধারণার মতো কি তাদের সম্পর্ক?
বাস কাউন্টারের সামনে রিকশা থেকে নেমে পড়লো ঊর্মি। ভাড়া মিটিয়ে চললো পাশের ছাউনিতে, যেখানে তার মতো অনেক যাত্রী দাঁড়িয়ে। সেও নিরবে দাঁড়ালো সেখানে।
কিছুক্ষণ পরই বাস চলে এলো। সবাই তাড়াহুড়ো করে বাসে উঠছে নিজ গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়ায়। যেন সবাই চাইছে এই ব্যস্ত কোলাহলপূর্ণ শহর থেকে মুক্তি পেয়ে আপন নীড়ে ফিরে যেতে।
ঊর্মি উঠে বসল। বাস চালকের তিন সিট পেছনে, জানালার পাশে। তবে মানুষের কোলাহলে ভ্যাপসা গরম লাগছে। হঠাৎ কী মনে করে যেন জানালার বাইরে তাকালো। তার ধারণাই ঠিক—লোকটা এখনো আছে।
কী জানি, কেমন অনুভব হলো—তবুওঐদিকে পাত্তা দিল না সে।
বাসের দরজার দিকে চোখ আটকে গেল তার। একজন বাবা তার মেয়েকে কোলে নিয়ে উঠছে। সামনে একজন মহিলা তাড়াহুড়ো করে বাসের ভিতরে ঢুকছে—সম্ভবত লোকটির স্ত্রী। অসহ্যকর পরিবেশে এই দৃশ্যটি যেন পুরোই মুগ্ধতা ফিরিয়ে আনে।
চলতে শুরু করলো বাস, নিজ গতিতে। বাইরে দেখতে ইচ্ছে করলো ঊর্মির। নিজ ইচ্ছেকে দমালো সে। মাথাটা হালকা কাত করে রাখলো বাসের জানালায়। কখন যে চোখ লেগেছে, বুঝতে পারেনি সে।
বাসের হালকা ঝাঁকুনিতে নড়েচড়ে উঠলো। হালকা চোখে কোথায় আছে ঠাহর করার আগেই এক তীব্র ধাক্কা পুরো পরিবেশটাকে নিস্তব্ধ করে দিল। সময়টা যেন সেখানেই থমকে গেল।
কোথা থেকে কী হয়েছে, এটা বুঝার আগেই হয়তো কারো চোখ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। চারদিকে এক অদ্ভুত শব্দ। সেই শব্দকে ছাপিয়ে হঠাৎ শোনা গেল মানুষের চিৎকার, আর্তনাদ।
রাস্তার চারপাশ রক্তে রঞ্জিত। পুরনো রঙচটা বাসটি থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে, সাথে বিদঘুটে গন্ধ। বাসটির নিচে এক হাত বেরিয়ে আছে। মাথাটা কিছুটা বেরোনো। হাত দুটো রক্তে লাল।
ঐ তো, পিছন থেকে এক বলিষ্ঠ দেহের পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে—স্তব্ধ হয়ে। সে যেন আজ কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। অদ্ভুত শীতলতা। তার চোখের সামনেই তো হলো সবটা যা পুরোই দুঃস্বপ্ন। এটা কখনো বাস্তব হতে পারে না।
এই তো সে দেখলো—ঊর্মির বাসটি সামনের দিকে যাচ্ছে, সেও তার গাড়িটি নিয়ে পিছনে পিছনে যাচ্ছে। ঊর্মি দূরে থাকলেও যেন তাকে তার পাশেই অনুভব করছিল। কিন্তু হঠাৎ একটা ট্রাক…
না, এটা হতে পারে না।
চারদিকে এম্বুলেন্সের শব্দ
মুখটা দুই হাত দিয়ে ঢেকে ফেললো কায়সার। তবুও ভেসে উঠছে সেই বিভৎস দৃশ্য। ঐ যে ট্রাকটা ডান দিক থেকে ধাক্কা মারলো, আর তখনই সবকিছু স্তব্ধ।
মুখ থেকে হাত সরালো সে। ছুটতে চাইছে, তবে পা চলছে না। কাঁপা কাঁপা পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সামনে গেল সে । লোকজন ধোঁয়া ওঠা বাস থেকে পোড়া মানুষ বের করছে—কি বিভৎস দৃশ্য!
সবকিছুর মাঝে চোখ পড়লো কায়সারের সেই হাতটির দিকে। দুইটি ছেলে বের করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। কায়সার সেদিকে দৌড়ে গেল। হাত বাড়াতে গিয়ে হঠাৎ মনে পড়ে গেল সেদিনের কথা—
“তোমার ভাইকে বলবে, ঐ শরীরে যেন আমাকে স্পর্শ না করে। পরের বার কিন্তু আগুনে জ্বালিয়ে দিব।”
কায়সারের চোখ দিয়ে অশ্রু পড়ছে। কাঁপা কাঁপা হাতে বের করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। সে আজ পণ করেছে ঊর্মি আজ হাজার বারণ করুক, সে কিছুই শুনবে না। তাতে যদি সে তাকে জ্বালিয়ে দেয়, দিক। সে কি ভয় পায় নাকি? সে তো পুরুষ মানুষ!
কোমলভাবে হাত দুটো ধরলো সে। পাশের ছেলেদুটো কায়সারের কান্ড দেখে বুঝে নিয়েছে আপন কেউ। তাই আরেকজনকে ইশারা করে ধরিয়ে দিল। এতে যেন সে ক্ষেপে উঠলো। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে, তার মধ্যে আরো দুইজন তাকে আটকে নিয়েছে। আজব তো
—তাকে আটকাচ্ছে কেন?
হঠাৎ সে শান্ত হয়ে গেল।
ঐ তো বেরিয়ে এসেছে রক্তে রাঙানো, থ্যাতলানো মুখ।
কায়সারের হঠাৎ ঐ লাল রংটাকে ভীষণ বিশ্রী মনে হচ্ছে। এটা যেন সবচেয়ে জঘন্য রঙ। ঐ লাল রংটাই ঊর্মির কঠোর মুখটাকে ঢেকে রেখেছে। সে বুঝতে পারছে না কেন? তার ঊর্মির শান্ত অভিব্যক্তিটা কত সুন্দর।
দৌড়ে গেল সে। দুই হাতে মুখটা উঁচু করে ঊর্মির দিকে তাকালো। মাথাটা হাঁটুর উপর রেখে সামান্য কাত হয়ে হাউমাউ করে কাঁদছে কায়সার।
ঊর্মি হঠাৎ আধো আধো চোখ খুলেছে। ট্রমার ভিতরে থাকা কায়সার তা খেয়াল করেনি।
অস্পষ্ট চোখে ঊর্মি কারো কান্না দেখতে পেল। তার জন্য কে কাঁদছে ? অনুভব করতে পেরেও মায়া হলো না। অদ্ভুত তো! সে কি আসলেই পাথর হয়ে গিয়েছে? জীবনের শেষ সময়ে এসেও নিজের ইগো বজায় রাখছে!
লোকটা তার জন্য কাঁদছে, আর তার কোনো ফিলিংস হচ্ছে না।
হঠাৎ শুনতে পেল বাচ্চাটি মারা গেছে।
তখনই ঊর্মির চোখ দিয়ে আপনাআপনি পানি গড়িয়ে পড়লো। মনে পড়লো তখনকার ঘটনা। যখন সামান্য চোখ খুলেছিল, তখনই এক ধাক্কায় সবকিছু স্তব্ধ। সে ছিল ডান পাশের জানালার কাছে। ট্রাকটিও ধাক্কা দিয়েছে ডান পাশে। যার ফলে ডান পাশের যাত্রীরা উল্টে বাম পাশের মানুষের উপর দিয়ে সরাসরি নিচে পড়ে। সেই সময় বাচ্চাটির একটা চিৎকার শুনেছিল সে।
চোখ দুটো উপরের দিকে তা করে কান্নাভেজা অস্পষ্ট চোখে বিড়বিড় করে বলল
— —ইয়া আল্লাহ, এটা আপনি কেমন বিচার করলেন? ঐ মেয়েটাকে কেন নিয়ে নিলেন? আমি না হয় অভাগী আমার কিছুই নেই, তাই কষ্টও নেই। তবে ঐ মেয়েটির তো সব ছিল। কেন তাকে কেড়ে নিলেন?
তাহলে কি এই দুনিয়ায় কেউ পেয়েও সুখী হয় না? কী অদ্ভুত নিয়ম! এই অনিশ্চিত জীবনের তাগিদে আমরা কত কিছুই না করি…
ঊর্মি হঠাৎ সবকিছু অন্ধকার দেখতে লাগলো। নিভু নিভু চোখে কায়সারের দিকে তাকালো। এই শেষ সময়ে কায়সারের কান্না দেখে করুণা হলো তার। লোকটা এবার হয়তো বুঝবে—না পাওয়ার যন্ত্রণা কেমন।
চোখের সামনে ভালোবাসা মরে গেলে কেমন লাগে…
সেও তো এতদিন কষ্ট পেয়েছে স্বামীর ভালোবাসা না পেয়ে। আজ থেকে সে মুক্ত। আজ থেকে তার কষ্টগুলো একান্তই কায়সারের। খুব ভালো লাগছে এই শেষ সময়ে লোকটার অনুভূতি বুঝতে পেরে।
চারপাশে অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ। একে একে লাশগুলো তোলা হচ্ছে। হয়তো কয়েকজন বেঁচে থাকবে কিন্তু সেই বেঁচে থাকাও হবে কষ্টের।
ঊর্মি আল্লাহর কাছে মৃত্যু কামনা করে চোখ বন্ধ করলো।
সর্বশেষে সব অন্ধকার।
চলবে,,,,
#বৈরি_হাওয়া
#পর্ব_৩০
#ফারজানা_প্রণয়_চৌধুরি

