চারপাশে শুধু সাইরেনের শব্দ। একটার পর একটা অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালের সামনে এসে থামছে। রক্ত, পোড়া গন্ধ আর মানুষের আর্তনাদে পুরো পরিবেশ ভারী হয়ে আছে। কেউ নিজের স্বজনকে খুঁজছে, কেউ ডাক্তারদের পা জড়িয়ে ধরে বাঁচানোর আকুতি করছে। এই একটা সময়ে মানুষ ডাক্তারকে আল্লাহর পরেই ভরসা করে। মানুষ যখন মৃত্যুর ভয়ে পাগলপ্রায় হয়ে যায়, তখন খোদার দেখা না পেলেও আল্লাহর পাঠানো বাঁচার উছিলাকে আঁকড়ে ধরতে চায়। সেইভাবেই মৃত্যু যেন আজ হাসপাতালের করিডোরে নিরবে হেঁটে বেড়াচ্ছে।
ঊর্মিসহ আরো অনেক পরিচয়হীন আহতকে দ্রুত স্ট্রেচারে করে ভিতরে নেওয়া হচ্ছে। চারপাশের চিৎকার, চেঁচামেচি আর হাহাকার যেন থামছেই না। থামবেই বা কিভাবে? যার আপন মানুষ হারায়, সেই-ই বুঝে আসলে কী হয়েছে। আর তা যদি হয় এমন বিভৎস মৃত্যু!
ঊর্মির শরীরের বিভিন্ন জায়গা রক্তে ভেজা। মাথার ডান পাশটা থেঁতলে গেছে। এখনো নিভু নিভু শ্বাস চলছে। কয়েকজন নার্স দ্রুত স্যালাইন লাগাচ্ছে। ডাক্তারদের কণ্ঠে তাড়াহুড়ো—
—পালস খুব উইক! —ওটি প্রস্তুত করুন! —ব্লাড লাগবে ইমিডিয়েটলি!
কায়সার যেন কিছুই বুঝতে পারছে না। তার হাত দুটো এখনো রক্তে ভেজা। সেই রক্ত শুকিয়ে গিয়ে গাঢ় হয়ে গেছে। হাসপাতালের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে। তার চোখ বারবার অপারেশন থিয়েটারের দিকে চলে যাচ্ছে, যেখানে অবস্থান করছে সেই কঠিন মেয়েটি।
শ্যামলা গড়নের কঠোর চেহারাটা একসময় ছিল আলাদা আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। অথচ আজ সেই মুখটাই কী ভয়ংকর বিভৎস অবস্থায় পড়ে আছে!
খোদা নিজের হাতে কী সুন্দর, নিখুঁতভাবে মানুষটাকে বানিয়েছিল। তাহলে কেন এত নিষ্ঠুরতার সাথে এই মেয়েটার ভাগ্য লিখলো?
কায়সারের নিজের প্রতি ভীষণ ঘৃণা হচ্ছে। কেন সে এই মেয়েটিকে আগলে রাখতে পারলো না? কেন জোর করে নিজের বাহুডোরে আটকে রাখতে পারলো না? কেন বলতে পারলো না—
“ঊর্মি, আগে যা হয়েছে ভুলে যাও। চলো, আমরা নতুন করে সবটা শুরু করি।”
মানলাম, সে হয়তো তার মিষ্টি কথায় কখনো গলতো না। হয়তো তাকে জোর করার কোনো সুযোগও দিত না। কিন্তু একবার চেষ্টা করে দেখলে কী এমন ক্ষতি হতো?
সাজেদা দেওয়ান ছেলের পাশে এসে দাঁড়াতেই কায়সার হঠাৎ মায়ের দিকে তাকালো। চোখ দুটো লাল। ভাঙা গলায় বলল—
—মা… ও মা, ওকে একটু বলো না চোখ খুলতে। মানলাম, আমার দোষ ছিল। আমি অপরাধী। তাহলে ও কেন শুয়ে আছে বলো? ওখানে তো আমার থাকার কথা। অপরাধ যারা করে, শাস্তি তো তাদেরই হওয়ার কথা। তাহলে শাস্তিটা আমি না পেয়ে ও কেন পাচ্ছে?
আমার খোদার এ কেমন বিচার? কেন তিনি নিরপরাধকে শাস্তি দেন?
ওকে তাড়াতাড়ি উঠতে বলো। ওর এখনো অনেক কিছু জানার বাকি। ও তো স্ট্রং, তাই না? আমি অযথাই পাগল হচ্ছি। ওই মেয়ের কিছু হবে না।
দেখা যাবে উঠে বলছে—
“দেখুন, আপনার এই কান্না অসহ্যকর। অন্য কোথাও গিয়ে দেখান। এই কুমিরের কান্নায় আর যাই হোক, আমার কিছু যায় আসে না।”
ঊর্মির মতো করে বলার চেষ্টা করে নিজমনেই হেসে নিল কায়সার। তারপর আবার তাকালো ওটি রুমের দিকে। একরাশ বিষণ্নতা এসে তাকে আঁকড়ে ধরলো।
এবার কিছুটা শক্ত হলো সে। নিজেকে সামলে নিল। এখন তো ঘাবড়ালে চলবে না। তাকে চেষ্টা করতে হবে। বাকিটা খোদাই ভালো জানেন—তিনি এই অসহায় এতিম মেয়েটির কপালে কী লিখে রেখেছেন।
কায়সার দ্রুত রক্ত জোগাড়ের জন্য বের হলো।
সাজেদা দেওয়ান ছেলের যাওয়া দেখছেন। অদ্ভুতভাবে তিনিও কাঁপছেন। তার সাথে তো কখনো ঊর্মির মাখামাখি সম্পর্ক ছিল না। তাহলে এতটা কষ্ট কেন হচ্ছে? তবে কি এই মেয়ে সত্যিই ম্যাজিক জানে? কী সুন্দর করে তার মনেও গোপনে জায়গা করে নিয়েছে!
এই তো বুকের ভিতরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেও যে মেয়েটা তাকে জড়িয়ে ধরে ক্লান্তি দূর করছিল, সেই মেয়েটাই এখন মৃত্যুর সাথে লড়ছে! সেই মুহূর্তটা যদি আবার কোনোভাবে ফিরে পেতেন, তাহলে কখনোই ওকে বেরোতে দিতেন না। কানে ধরে বসিয়ে রাখতেন।
তিনি দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করলেন। ঠোঁট কাঁপছে—
—ইয়া আল্লাহ… এতিম মেয়েটাকে আর কষ্ট দিয়ো না। এই মেয়ের কিছু হলে সবার মাঝেই না-পাওয়ার একটা দুঃখ থেকে যাবে।
কায়সার হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার আগেই সামনের মানুষটিকে দেখে থমকে গেল।
নিজমনেই বিড়বিড় করলো—
ঊর্মির দাদি!
খানিকটা অবাক হলো কায়সার। তবে আমলে না নিয়ে পাশ কাটাতে চাইল। কিন্তু তার পরিকল্পনা ব্যর্থ করে ঊর্মির দাদি কায়সারের হাত চেপে ধরলেন। হঠাৎ বুড়ির এই আচরণে খানিকটা অবাকের সাথে বিরক্ত হলো সে। কিছু বলতে যাবে, তার আগেই তিনি বলে উঠলেন—
—হুনো, ভাব দেখাইবা না। ঊর্মিই তোমার ভাব গুনায় ধরে নাই। আমি ধরমু ভাবলা কেমনে?
ঐ মাইয়া এত সহজে মরবো না। রক্ত লাগবো, না? খোঁজার দরকার নাই। আমার লগে মিলবো। আমি দিতাছি। ওরে জন্ম দেওয়া আমার আফতাবের ছিল এক অপরাধ। আর এহন রক্ত দিয়া বাঁচানোডা হইবো আমার অপরাধ।
কায়সারের শরীরে যেন কেউ এসিড ছুড়ে মারলো। এই মহিলাকে ডেকেছে কে? নিজে থেকে এসে আবার এই মুহূর্তেও আজাইরা প্যাঁচাল বন্ধ হচ্ছে না!
কায়সার আবার পাশ কাটাতে চাইলে তিনি আবার বললেন—
—ঊর্মির মতোই ত্যাড়া। আল্লাহ জোড়া মিলাইয়াই পাডাইছে। হুনো, যেইডা দরকার হেইডা করো। দুর্ঘটনার রোগীদের জন্য রক্তের অভাব পরবো না। তয় আমি চাই না আমার আফতাবের মাইয়া অন্যের রক্ত পাক। ব্যবস্থা করো।
কায়সার আর বাড়াবাড়ি করলো না। যাই হোক, সামান্য রক্ত নিয়েই হোক এ বুড়িটা ক্লান্ত হোক।
কায়সার ডাক্তারের কেবিনের দিকে যাবে, তার আগেই ঊর্মির দাদি আবার বললেন—
—আর হুনো, ও যদি বাঁচে, তাইলে ভুলেও কইবা না আমার রক্ত। যেই ত্যাড়া, প্রয়োজন হলে রক্ত বাইর কইরা দিবো। তবুও আমার রক্ত গায়ে মাখবো না।
খানিকটা বিরক্তের সুরে বললেন—
—ঘাড়ত্যাড়া মাইয়া।
কায়সার বুঝতে পারছে না বুড়ির অভিব্যক্তি। তার কাছে মনে হচ্ছে, ঊর্মি এই মহিলারই বৈশিষ্ট্য পেয়েছে।
কায়সার চলে গেল সবকিছু ম্যানেজ করতে। রয়ে গেল এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন—
পরবর্তীতে কী হয়েছিল? ঊর্মির কী হয়েছিল? সে কি বেঁচেছিল, নাকি সময়ের কালস্রোতে হারিয়ে গিয়েছিল?
যদি বেঁচেও থাকে, তবে কী হয়েছিল? ঊর্মির সাথে কি কায়সারের মিল হয়েছিল?
মিমি উত্তেজিত হয়ে উঠলো ডায়েরির পরের পৃষ্ঠাগুলো না পেয়ে। হঠাৎ চিৎকার করে কেঁদে উঠলো সে। সে তো ঊর্মির মতো স্ট্রং না। ও তো ছিঁচকাদুনে। যাই হবে, কান্না করেই দিবে।
কেন মাম্মাম আর পাপার স্টোরির শেষটা লিখে রাখা হলো না? কষ্টের সাথে বিরক্তিও লাগছে চাচ্চুর উপর। গর্দভটা লেখক হলো কিভাবে? ও কি জানে না, গল্প অস্পষ্ট রাখলে মানুষের কী অবস্থা হয়? এই তো তার এখন চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।
এবং সে তাই করলো।
বাড়িতে আবার কান্নার হিড়িক উঠলো। বাড়ির সবাই এড়িয়ে যেতে চাইলেও মাথা ধরে গেছে। এ যেন রোজকার ব্যাপার। খাবার বেশি হলেও কান্না, আবার কোনো কারণে চোখ দিয়ে পানি পড়লেও নিজের কান্না দেখে আরো জোরে চেঁচাবে।
বাড়ির সকলে ওর অভ্যাসে অভ্যস্ত হলেও নিঝুম পারে নি। ওর কান্নার শব্দ শুনলেই মনে হয় ব্রেইনে শর্ট সার্কিট হয়ে গেছে। খাওয়া রেখেই দৌড়ে উপরে গেল সে।
নিঝুমের দৌড় দেখে বাড়ির সবাই বুঝে গেল—আরো একটা সার্কাস শুরু হতে যাচ্ছে।
এবং তাই হলো।
ঊর্মির স্মৃতি তারা নিজেদের মাঝে না রাখলেও, সেদিনের চুল ধরাধরির দৃশ্যটা ঠিকই আয়ত্তে চলে এসেছে। কিছু হোক বা না হোক, এটা তারা করবেই।
ফলস্বরূপ দু’জন দু’জনের চুল ধরে ঝুলে আছে।
—এই বেয়াদব! একটা চড় মারবো। ছোটবেলা থেকে মাথা খেয়ে আসছিস। ভ্যা ভ্যা কান্না বন্ধ করবি, নাকি ব্যালকনি দিয়ে ছুঁড়ে ফেলবো?
—চুপ কর, চামচিকা! আমার ইমোশনের দফারফা না করলে তোর হয় না? দিলি তো আমার কষ্টের বারোটা বাজিয়ে!
—বাজে না বকে বল, কী হয়েছে?
—খুব মন দিয়ে একদিন ধরে ঊর্মি আর কায়সারের স্টোরি পড়ছিলাম। কিন্তু চাচ্চু শেষের অংশ কেটে রেখেছে। তার জন্যই তো কাঁদছি!
নিঝুম মিমির চুল ছেড়ে সোজা হয়ে বসলো। খানিকটা বিরক্তির সাথে বললো—
—সাধেই গর্দভ বলি? তোর অনেক আগেই আমি এই ডায়েরিটা পড়েছি। চাচ্চু এই গল্পটার নাম দিয়েছে “বৈরী হাওয়া”। তবে চাচ্চুর সব বই প্রকাশ হলেও এটা অস্পষ্ট, অপ্রকাশিত রেখেছে। আর এটা নাকি কায়সার চাচ্চুই বলেছিল। আমাদের অজানা রাখতে চেয়েছিল। তবে কোনোভাবে ডায়েরিটা আমার হাতে পড়ে। আমিও পরের কাহিনী জানার জন্য উদ্বিগ্ন ছিলাম। আয়াশ চাচ্চুর কাছেও গিয়েছিলাম, কোনো লাভ হয়নি।
তাই তো নিজের চিন্তাগুলো তোর কাছে কনভার্ট করলাম। আয়, এখন দু’জন মিলে চিন্তা করি।
মিমি নিঝুমের দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে আবার খানিকটা বিষণ্ন হয়ে গেল। আনমনেই বলে উঠলো—
—আচ্ছা, তোর কি মনে হয় না, এই সবকিছুর পিছনে আমার উপস্থিতিটাই ছিল জঘন্য? এই সবকিছুর পিছনে কি আমি দায়ী?
নিঝুম উঠে দাঁড়ালো।
—মাথামোটা, অবাস্তব কাহিনী সাজাবি না। চাচ্চু বোধহয় আগেই জানতো তুই এমন গর্দভ হবি। তাই তো আমাদের থেকে লুকানোর সব ব্যবস্থা করে গেছে।
খানিকটা শাসনের সুরে বললো—
—এটা ঊর্মির জীবনের বৈরী হাওয়ার গল্প। এটা তাদের একান্ত সিদ্ধান্ত। অবাস্তব কোনো কাহিনী গড়ে নিজের সাথে তাদের ছোট করবি না।
নিঝুম চলে গেল মিমিকে রেখেই। মিমি পড়ে রইলো সেই “বৈরী হাওয়া”-র অপ্রকাশিত লাইনের মাঝে।
কি হয়েছিল ঊর্মির?
আর যাই হোক, বাবার সাথে তো তার মিল হয়নি। তবে কি হারিয়ে গিয়েছিল?
কেন জানি মনে হচ্ছে—ঊর্মি এখনো কোথাও আছে।
এই রহস্য তাকে খুঁজতেই হবে।
#বৈরি_হাওয়া
#প্রথম_পরিচ্ছের_সমাপ্তি
#ফারজানা_প্রণয়_চৌধুরি
( প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আশা করি সবাই আমাকে বুঝবেন। বিভিন্ন ব্যাস্ত তার কারনে অনিয়মিত ছিলাম। একসময় লেখার প্রতি অনিহা তৈরি হয়। বিশেষ করে বৈরি হাওয়া গল্পটি আমি যেভাবে চিন্তা করে রেখেছি সেভাবে সাজাতে পারছিলাম না। তাই আজকের পর্বে প্রথম পরিচ্ছেদ শেষ করলাম। আমি আবারও লেখা শুরু করবো। চিন্তা করেছি কিছুদিন নতুন একটি গল্প লেখবো,,
তবে বৈরি হাওয়াটা খুব শিঘ্রই লিখবো।
কোনোভাবে রাইটিং ব্লকটা কাটিয়ে উঠতে পারলেই আবারো ফিরে আসবো ঊর্মিকে নিয়ে। আশা করি আপনারা আমাকে বুঝবেন। ধন্যবাদ 🌸)

