#Tell_me_who_I_am
(#বলোতো_আমি_কে?)
#পর্ব_১
#আয়সা_ইসলাম_মনি
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
__________________________________________☞
সৌন্দর্য এক গভীর অনুভূতি, যা ভাষার সীমা পেরিয়ে যায়। বিশ্বসংসারের প্রতিটি কণায় এর নিবিড় উপস্থিতি রয়েছে—কখনো বাহ্যিক দীপ্তিতে বা কখনো অন্তর্লীন মহিমায়। স্নিগ্ধ সূর্যোদয় বা ফুটন্ত ফুলের পাপড়িতে প্রকৃতি আমাদের তার রসে ভিজিয়ে দেয়। অথচ বাহ্যিক মোহে আমরা তার গভীর রহস্য উপেক্ষা করি। সৌন্দর্য কারো কাছে পবিত্র, কারো কাছে নিষ্পাপ, আবার কারো কাছে অপার মায়া। কিন্তু যখন এই মোহ সীমা ছাড়ায়, তখন আমরা নিজের অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে সেই মোহময় ঘোরে ডুবে থাকি, যেখানে ভালো-মন্দের সব বিভাজন বিলীন হয়ে যায়।
আব্দুর রহমান হাওলাদার ঢাকার একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গত চব্বিশ বছর যাবত একটি খ্যাতনামা কলেজে বাংলা সাহিত্যের আলো ছড়াচ্ছেন। সহজ-সরল, নম্র-ভদ্র এবং জ্ঞান-গম্ভীর এই মানুষটির শিকড় বরিশালের খাস মাটিতে হলেও, দুই দশক আগে পৈতৃক ভিটা ছেড়ে ঢাকার মতিঝিলে নিজের নতুন ঠিকানা গড়ে তুলেছেন। তার স্ত্রী আনোয়ারা মমতাজ বেগম এক গভীর ধৈর্যের প্রতিমূর্তি, যিনি ঠান্ডা মাথায় সংসারটিকে পরম মমতায় আগলে রেখেছেন। মমতাজের রূপের মোহ তার শৈশব থেকেই তাকে মায়াবী জগতে বন্দী করে রেখেছে। অপার সৌন্দর্যের অধিকারিণী মমতাজকে ঘিরে সমাজে ছিল নানাপ্রকার আলাপচারিতা। একজন নারীকে যখন অনেক পুরুষের আকর্ষণ লক্ষ্য করে, তখন তা তার মায়ের মনে গভীর উদ্বেগের সঞ্চার করে, কারণ এই পরিস্থিতি মেয়ের উপর অপ্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে পারে।
অত:পর মমতাজের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমেনার সেই ভয়ও তীব্র হতে থাকে। তাই এসএসসি পরীক্ষা শেষ হতেই মমতাজকে আব্দুর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করেন। অর্থাৎ কন্যার রূপকে সুরক্ষিত রাখার একটি উপায় খুঁজে পান।
মমতাজের দুই কন্যা; আইদাহ আহসান মিরা ও ইলিজা আহসান মাহিমা–দুই ভিন্ন মেরুর প্রতীক। মিরার রূপ বর্ণনায় ভাষা হারিয়ে যায়, সে হলো আকাশ থেকে নেমে আসা একটি উজ্জ্বল তারা, যার মুখমণ্ডলের মায়ায় মুগ্ধ হয়ে কেউ অনন্তের পথে হারিয়ে যেতে পারে। তার অপরিসীম সৌন্দর্য মমতাজকে শৈশব থেকে ভীত করে রেখেছে। মমতাজ মিরাকে সর্বদাই পর্দার আড়ালে রেখেছেন, যেন সেই ভয়ংকর সৌন্দর্য কারো মনে অস্থিরতা তৈরি না করে। মিরা নিজেও মা-বাবার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধাশীল, বিনয়ী এবং ধর্মপরায়ণ, এমন এক মেয়ে যার মধ্যে শান্ত নদীর প্রবাহ বহমান।
অন্যদিকে মাহিমা স্বভাবতই উচ্ছল, চঞ্চল— যে কোনো নিয়মকানুন মানার তোয়াক্কা করে না। তার চলনে-বলনে বিক্ষিপ্ততা আর নিজস্ব এক ধরনের স্বাধীনতা তাকে আলাদা চরিত্রে রূপ দিয়েছে। মায়ের মতো রূপবতী হলেও মাহিমার মধ্যে রয়েছে স্বাধীন আত্মার স্পর্শ, যা তাকে পরিবারের অন্য সদস্যদের থেকে পৃথক করে রেখেছে।
মমতাজ মিরাকে নিজের জীবনের মতো আগলে রেখেছেন, জানেন যে অতিরিক্ত সৌন্দর্য যেমন আশীর্বাদ, তেমনই তা অভিশাপও বটে। সেই রূপ যেন মিরার জীবনের কোনো বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেইজন্য মমতাজ চিরকাল মিরার রূপকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন।
মতিঝিলের শান্ত কোণে দাঁড়িয়ে আছে মায়াবী ‘মিরা মঞ্জিল’। বড়সড় বা কোনো জাঁকজমক নেই। মার্বেল পাথরে নির্মিত এই বাড়িটির প্রতিটি কোণে নির্মলতার ছোঁয়া। প্রবেশদ্বারে কাগজফুলের গাছ নীরবে স্বাগত জানায়।
__________
২২ জানুয়ারি, ২০১৬। ঘড়ির কাঁটা ভোর আটটা ছুঁয়েছে। বাড়ির ছোট কন্যা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখে পাউডারের কোমল ছোঁয়া দিতে ব্যস্ত। আজ তার বিদ্যালয়ে একটি ছোটখাটো অনুষ্ঠান রয়েছে, সে সেখানে গানের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছে। যদিও তার মন নাচের প্রতিযোগিতায়ও অংশ নিতে চেয়েছিল, তবে বড় বোনের নিষেধে সেই ইচ্ছেটি পূর্ণ হয়নি।
স্কুলের ফর্মাল পোশাকে সেজে, কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই মাহিমার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“আম্মু পানির পটটা দাও তো, দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
মাহিমা খাবার টেবিলের কাছে পৌঁছাতেই পানির পট ধরিয়ে দিয়ে মমতাজ বিলাপ জুড়ে দিল, “কত বলি যে একটু আগে আগে ওঠ। তা না মরার মতো ঘুমিয়ে থাকবি। খেয়ে যা, টেবিলে খাবার রেখেছি।”
মাহিমা বিরক্ত কণ্ঠে বলে, “মা, আবার শুরু করো না তো। টাকাটা দাও, বাহির থেকে কিছু খেয়ে নেব। তাড়াতাড়ি করো।”
“হবে না। তোর বাবা কোনো টাকা দিয়ে যায়নি।”
মাহিমা ভ্রুকুটি করে শুধালো, “তাই না? ঠিকাছে লাগবে না টাকা। প্রাইভেটের টাকা মেরেই কাজ চালিয়ে নিব। গেলাম গেলাম,” বলে হাসতে হাসতে গটগট পায়ে বেরিয়ে গেল।
মমতাজ রুষ্ট কণ্ঠে বলেন, “আসিস বাসায়। আবার টাকা দেব তোমায়,” বলে কাজে মনোযোগ দিল।
___________
অপরাহ্ণের সময় পেরিয়ে প্রায় গোধুলির দিকে মিরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়িতে ফিরে এল। পরনে কালো বোরকা, সঙ্গে কালো নেকাব। বোরকার উপরে শরীরটা রঙিন একটি চাদরে আবৃত। বাড়িতে ঢুকেই হাঁসফাঁস করতে করতে নেকাব খুলে নিজ কক্ষে প্রবেশ করল। কনকনে শীতের মধ্যে সারাদিন ক্লাস শেষে ফিরে এসে অ্যাসাইনমেন্টের জন্য হন্যে হয়ে বসতে হয়। সন্ধ্যের দিকে গোসল করা তার জন্য আরেক নতুন শাস্তি।
মিরা কক্ষে ঢুকে দ্রুত গোসল সেরে নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে চুল মুছতে লাগল। ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল মমতাজ ধোয়া ওঠা চা হাতে কক্ষে দাঁড়িয়ে আছেন।
মিরা মৃদু হাসি দিয়ে বলে, “দাও মা। খুব দরকার ছিল। উফ, এই হিম ধরা ঠান্ডায় ক্লাসে যাওয়া আর ভালো লাগে না।”
চায়ের কাপটি হাতে নিয়ে সে কিছুক্ষণ একটানে খেতে থাকে।
মমতাজ মিরার মাথায় হাত নেড়ে কোমল সুরে বলেন,
“আর তো মাত্র একটা বছর। তারপর তো চাকরি করবি।”
“এতো সহজ না মা। চাকরি পেতে আবার হাজার কষ্ট! চলো, এসব বাদ দাও। বাবা কোথায়?”
“কোথায় আবার? কলেজ থেকে ফিরে আবার চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে বেরিয়েছে।”
“আর মাহি?”
মমতাজ কপালের ভাঁজে চিন্তার রেখা ফুটিয়ে বলেন,
“সে তো রাজরানীর মতো শুয়ে শুয়ে গেম খেলছে।”
মিরা হেসে ফিসফিস করে বলে, “আচ্ছা মা। তুমি যাও তাহলে।”
“হুম। খাবার বেড়ে রেখেছি টেবিলে,” বলে মমতাজ সেখান থেকে চলে যান।
___________
রাতের খাবার শেষ করে মিরা মাহিমাকে ডাকার উদ্দেশ্যে তার ঘরে প্রবেশ করল। প্রবেশ করতেই দেখল, মাহিমা একনজরে ল্যাপটপে কোরিয়ান নাটক দেখায় ব্যস্ত। মাহিমার মনে মনে কোরিয়ান ছেলেরা সবসময়ই বাসা বেঁধে রেখেছে। তার ইচ্ছা, পড়ালেখা শেষ করে বড় হয়ে কোরিয়া গিয়ে কোরিয়ান কোনো নায়ককে বিয়ে করবে; নায়ক না হলেও কোরিয়ান কোনো ছেলেকে তো বিয়ে করবেই, এই আত্মবিশ্বাসে ভরপুর মাহিমা।
মিরা কিঞ্চিৎ হাসতে হাসতে পিছন থেকে মাহিমার পিঠে হালকা চাপড় মেরে ধমকের সুরে বলে, “কি রে, খেতে হবে না?”
মিরার আকস্মিক আহ্বান শ্রবণ করে মাহিমা ভূত দেখার মতো ভয় পেয়ে বুকের মধ্যে থু থু দিল।
তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে শঙ্কিত গলায় বলে, “ওরে মা! (মিরাকে দেখে শান্ত গলায়) মিরু আপু, তোমার কি ভালো লাগে সবসময় আমাকে ভয় দেখাতে? উফফ, আর একটু হলেই যাচ্ছিলাম!”
“খারাপ লাগে না। এখন বল, রাত নেই দিন নেই, কি এতো ড্রামা দেখা শুরু করেছিস তুই?”
তারপর টেবিলে রাখা ল্যাপটপটি বন্ধ করে পুনরায় বলল, “আগে খেয়ে নিবি, তারপর ড্রামা।”
মাহিমা বিরক্তি নিয়ে ভ্রূ কুঁচকে বলে, “এর জন্যই আব্বুকে বললাম আমাকে একটা ল্যাপটপ কিনে দাও। তা তো দিবে না। ধুর ধুর।”
“হয়েছে? আমার ল্যাপটপটা তো আপনার কাছেই থাকে। আবার কি?”
“খোঁটা দিলে?” মাহিমা ক্ষুণ্ন গলায় বলে।
“না রে বাপ। খেতে আয়,” বলে মিরা জোর করে মাহিমাকে কেদারা থেকে তুলে নিচে নিয়ে গেল।
____________
শীতের প্রকোপ আগের থেকে কমে এলেও, বাইরে গেলে হালকা শীতল বাতাস এখনো গায়ে লাগে। যদিও ঘরের ভেতরে সেই শীতের আমেজ নেই কারণ দরজা-জানালা বন্ধ রাখা। আবার এদিকে শীতের মৃদু হাওয়ার সঙ্গে মিলেমিশে আছে পুরোনো দিনের আলমগীর-সাবানার চলচ্চিত্রের মাধুর্য। আজকে মিরার বিশ্ববিদ্যালয়ও বন্ধ। এমন মনকাড়া পরিবেশে, মিরা নিজকক্ষে বাদাম খেতে খেতে পুরোনো সিনেমার জগতে হারিয়ে গেছে।
একটু আক্ষেপের স্বরে বলে উঠল, “এখনকার মুভি যতই সুন্দর হোক না কেন, আগের মুভিগুলোর মতো সিনেমা কখনোই হবে না। যদিও কিছু কিছু সিনেমা এখনো সুন্দর বানায়, আর সেই জন্যই সিনেমা জগৎটা টিকে আছে।”
কিঞ্চিৎ সময়ের পর, মাহিমা সহসা ঘরে ঢুকে মিরাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল।
মাহিমা মৃদু স্বরে বলল, “কি করছো আপু?”
মিরা ঈষৎ হাসি দিয়ে বলল, “দেখছিস তো মুভি দেখছি। হুম, এবার বল তো ব্যাপারটা কি? কারণ ছাড়া তো তোকে কখনো জড়িয়ে ধরতে দেখিনি!”
মাহিমা জানে, মিরাকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কিছু বলার চেষ্টা বৃথা। বোন তার মতলব ঠিকই রপ্ত করতে পেরেছে।
মাহিমা ইনিয়ে-বিনিয়ে বলে, “আরেহ না না, তেমন কিছু না। শুধু আম্মুর থেকে ৩০০ টাকা এনে দেও না আপু। প্লিজ প্লিজ।”
মিরা মুচকি হেসে বলল, “তাই তো বলি, কাহিনি কি! আমি পারব না। আর টাকা দিয়ে কি করবি তুই?”
“সামনেই বার্থডে, ওদের ট্রিট দেব।”
“তুই বললেই তো হয়।”
মাহিমা আকুতি করে বলে, “না না, তুমি বলো। তোমার কথা আম্মু শোনে। আমি বললে দিবে না।”
মাথা চুলকাতে চুলকাতে মনে মনে বলে, “অলরেডি সেদিন সেইম কথা বলে টাকা নেওয়া হয়ে গেছে। এখন আবার নিলে সব ক’টা বেতের বাড়ি পিঠ বরাবর পড়বে।”
“ঠিক আছে, আমি ৫০০ টাকা চাইব। বলবো তোর স্কুলের জন্য লাগবে। সেখান থেকে তোর ৩০০ আর আমার ২০০,” বলে ভ্রূ উঁচিয়ে বিছানার দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে মিটিমিটি হাসল।
মাহিমা ভ্রুকুঞ্চিত করে বলে, “কি? তুমি কেন টাকা নিবে?”
মিরা অবহেলায় নড়ে চড়ে বসে বলে, “ঠিকাছে, নিব না। আর বলবোও না।”
মাহিমা এবার মিরার গা ঘেঁষে বসে মিনমিনে গলায় বলে, “না না, ঠিকাছে ঠিকাছে।”
বোনকে রাজি করিয়ে বিছানা থেকে উঠে বেরোতে যাবে। কিন্তু দু’পা পিছিয়ে ফিরে প্রশ্ন করল, “মিরু আপু, ফ্রিজের ক্যাডবেরিটা কার?”
মিরা সিনেমায় ডুবে থেকে বলে, “কার আবার! আমার। একদম হাত দিবি না কিন্তু।”
“ঐটা না, আমি ভুল করে খেয়ে ফেলেছি। (যেতে যেতে গলা উঁচিয়ে) বাবাকে বলে আনিয়ে দিব,” বলে হাসতে হাসতে প্রস্থান করে।
মিরা সচকিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “মাহির বাচ্চাআআ!”
এ দুই বোনের সম্পর্ক এমনই। প্রতিনিয়ত দুষ্টুমি আর খুনসুটির মধ্য দিয়েই দিন কাটে অথচ একে অপরকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারে না।
____________
মো. আসাদ চৌধুরি শহরের প্রভাবশালী অভিজাতদের মধ্যে প্রথম সারির নাম। ধন-সম্পদের ভাণ্ডার এবং ক্ষমতার দাপট নিয়ে বিশাল সাম্রাজ্যের মালিক, যার দৃষ্টান্তস্বরূপ ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে বিস্তীর্ণ জমিতে গড়ে উঠেছে আলিশান এক বাংলো। বাংলোতে গৃহের প্রতিটি সদস্যের জন্য রয়েছে একটি করে বিলাসবহুল গাড়ি।
তার পিতা মো. মুস্তাফা কামাল চৌধুরিও ছিলেন একাধারে বিত্তবান ও প্রভাবশালী।
আসাদের অনুজ, মো. ইসহাক চৌধুরি পুলিশ বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অর্থাৎ ডিআইজি। আর তার জ্যেষ্ঠ পুত্র আরিয়ান চৌধুরি এতদিন ধরে দেশের বৃহত্তম শিল্পপ্রতিষ্ঠান ‘কে.ছি টেক্সটাইল কোম্পানি’ পরিচালনা করে আসছিল। আসাদের কনিষ্ঠ পুত্র কারান চৌধুরি, যার বুদ্ধিমত্তা ও দৃঢ়তা ছোটবেলা থেকেই তাকে আলাদা করে তুলেছে।
কারানের জীবনের এক গভীর ক্ষত তার মায়ের চলে যাওয়া। মাত্র আট বছর বয়সে তার মা হঠাৎ ঘর ছেড়ে চলে যান; কেন যান, সে রহস্য আজও অজানা। কিন্তু পিতা তাকে বুঝিয়েছিলেন, তার মা অন্য কারো হাত ধরে পালিয়েছে। সেই তিক্ততা থেকে কারানের মনে তার মায়ের প্রতি এবং সমস্ত নারী জাতির প্রতি তীব্র ঘৃণা জমে ওঠে। এরপর মাত্র দশ বছর বয়সে সে আমেরিকায় পাড়ি জমায়, যেখানে সে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ওপর পড়াশোনা করে এবং নিজেকে বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের মালিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
আজ বহু বছর পর কারান দেশের মাটিতে ফিরে আসছে। কে.ছি টেক্সটাইল কোম্পানির আসল অধিকারী সে-ই। নিজের হাতে আবার নিজের সাম্রাজ্যের হাল ধরতে সে ফিরছে, এক আত্মপ্রত্যয়ী এবং জেদি মন নিয়ে, যার জীবনে কোনো আপোষ নেই।
ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান থেকে নামার মুহূর্তে কারান গভীর নিশ্বাস নিল। দীর্ঘ বছর পর নিজের দেশের মাটিতে পা রেখে সেই পরিচিত বাতাস বুকের ভেতর টেনে নিল। আকাশে মিশে থাকা সোনালি আলোয় একবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিয়ে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি এঁকে দিল।
বিমানের সিঁড়ি দিয়ে নামতেই পাহারাদাররা নীরবে তার পেছনে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার পরনে একখানা ধূসর ওভারকোট, ভিতরে কালো শার্ট-প্যান্ট, হাতে হ্যাবলট বিগ ব্যাং-এর ঝকঝকে ঘড়ি। চুলগুলো ঘাড় ছুঁই ছুঁই করে ছাঁটা, স্টাইলিশ অথচ ব্যক্তিত্বময়। তার মুখাবয়ব জুড়ে ফুটে আছে এক অনন্য আকর্ষণ, তার উপস্থিতি বাতাসকেও থমকে দিতে সক্ষম।
বিমানবন্দরে উপস্থিত সকলের দৃষ্টি কারানের ওপর আটকে গেল। এরই মধ্যে একজন তরুণী তার বান্ধবীকে উচ্ছ্বাস ভরা কণ্ঠে বলল, “হু ইজ হি ইয়ার? উফফ!”
পাশে দাঁড়ানো আড়িয়া, কারানের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়েই জবাব দিল, “হি ইজ দ্য মোস্ট স্ট্রাইকিং অ্যান্ড চার্মিং ম্যান, কারান চৌধুরী।”
তরুণীটি বিস্ময়ের সুরে বলল, “এই জিনিস বাংলাদেশের মাটিতে আসলো কি করে, বেবি? ভাইইই!”
বিমানবন্দরের যাত্রীদের দাঁড়ানোর স্থানে দাঁড়িয়ে আছে আরিয়ান চৌধুরি, কারানকে দেখেই হাত নাড়ল। কারানও মাথা নেড়ে তাকে সায় জানালো।
কাছে যেতেই কারান গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, “হোয়াট’স নিউ ভাই?”
“এই তো, সব ঠিকঠাক। চল, সামনে যাই।”
তাদের দুজনের পদক্ষেপ এগিয়ে চলল। একটু হাসির ছলে আরিয়ান বলল, “এয়ারপোর্টের সবাই তোর দিকে তাকিয়ে আছে, দেখতে বেশ মজাই লাগলো।”
কারান ভারী গলায় ভাবলেশহীনভাবে শুধালো, “লেটস ড্রপ দ্য সাবজেক্ট। বাট আই ডিডেন্ট এক্সপেক্ট ইউ টু কাম। ড্যাড কোথায়?”
“এভাবে বলছিস কেন? আমি কি আসতে পারি না? ড্যাড একটা কাজে ব্যস্ত আছেন। চল, গাড়িতে ওঠ।”
গাড়ির কাছে গিয়ে কারান গায়ে জড়ানো কোটটা খুলে হাতে নিল। ঠিক তখনই আঠারো কি উনিশ বছরের এক মেয়ে দৌড়ে আসতে আসতে বলে উঠল, “কে.ছি স্যার, ওয়ান মিনিট।”
মেয়েটাকে দেখে কারান দাঁড়িয়ে গেল। মেয়েটি দৌড়ে কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “স্যার, আ’ম লীনা। আই ক্যান্ট বিলিভ ইট’স রিয়েলি ইউ! নিউজে যখন আপনার স্পিচ দেখি, আমি শুধু আপনার দিকেই তাকিয়ে থাকি। আ’ম ইয়োর হিউজ ফ্যান। স্যার, ক্যান আই প্লিজ হ্যাভ আ সেলফি?”
ওদিকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই দুই তরুণী নিজেদের মধ্যে আলাপ চালাচ্ছে, “মামা ঐ মেয়ে যদি সিরিয়াসলি পিক তুলতে পারে, তারপরেই আমি যাব। কোনোভাবেই এই চান্স মিস করা যাবে না। ভাব, যদি কারান চৌধুরীর সাথে পিক তুলে এফবিতে আপ দেই, ফলোয়ার্স কত বাড়বে! ওরেএএ মামা!”
কারান ঠোঁটের কোণে তীক্ষ্ণ হাসি ঝুলিয়ে বলল, “বাট আ’ম নট আ সেলিব্রেটি।”
লিনা উত্তরে বলল, “ইউ মে নট সি ইয়োরসেলফ অ্যাজ আ সেলিব্রিটি, বাট ফর আস, ইউ’র ট্রুলি এন ইন্সপিরেশন। আমার পুরো ফ্রেন্ড সার্কেল আপনার আইডি ফলো করে। স্যার, জাস্ট একটা পিক। প্লিজ স্যার।”
কারান ঠান্ডা গলায় “এক্সকিউজ মি,” বলে গাড়িতে উঠে বসল।
মেয়েটি করুণ স্বরে বলে উঠল, “স্যার, প্লিজ।”
এর মধ্যেই পাহারাদাররা মেয়েটিকে সরিয়ে দিল।
গাড়ি চলতে শুরু করেছে। আরিয়ান কপাল কুঁচকে বলল, “মেয়েটা এতো রিকোয়েস্ট করল, একটা পিক তুলতে সমস্যা কোথায় ছিল?”
কারান ফোনের দিকে তাকিয়ে টাইপ করতে করতে আওড়ায়, “আশেপাশে তাকিয়ে দেখেছিস? আই ডোন্ট হ্যাভ মাচ টাইম টু ওয়েস্ট।”
আরিয়ান চারপাশে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ, তাও তো ঠিক। একজনকে সুযোগ দিলে বাকিরাও ঝাঁপিয়ে পড়তো। তবে তোর দেশে না ফিরলেও চলতো। এদিকটা তো আমি সামলাচ্ছিলামই।”
কারান ফোনের পানে তাকিয়েই ঠান্ডা স্বরে বলল, “এর জন্যই আসতে হলো।”
এটা শুনে আরিয়ান আড় চোখে কারানের দিকে তাকালো। অর্থাৎ কারান যে আরিয়ানকে বিদ্রুপ করে কথাটা বলেছে সেটা আরিয়ান ভালোভাবেই রপ্ত করেছে।
___________
চৌধুরি বাড়ির পরিবেশে এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাস বিরাজ করছে। কারণ কারান ফিরে এসেছে। আশমিনি আলিঙ্গন করে গলা চড়িয়ে বলে, “আমার বাবাটা কতদিন পর বাড়িতে পা রাখলি! দেখ, চেহারার কি অবস্থা হয়েছে!”
ইসহাক সিঁড়ি থেকে নেমে এসে উজ্জ্বল মুখে গলাটা উঁচু করে বলেন, “ওয়েলকাম, মাই সান! কেমন আছিস তাই বল?”
আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে, কারানের পিঠে চাপড় দিয়ে জানান দেয়, তিনি ঠিক কতটা খুশি। কারান মৃদু হেসে বলে, “আলহামদুলিল্লাহ, কাকাই। তোমার খবর বলো?”
ইসহাক হেসে বলেন, “সবই চলছে। এবার ফ্রেশ হয়ে নে। আশমিনি, খাবার রেডি করো!”
“ওকে কাকি, ফ্রেশ হয়ে নিচে আসছি,” বলে কারান উপরের দিকে উঠে চলে যায়।
___________
রাতে আসাদ চৌধুরি বাড়িতে ফিরে নিজ কক্ষে প্রবেশ করেন। জামাকাপড় পরিবর্তন করে কারানের কক্ষে গিয়ে দেখতে পান, কারান ল্যাপটপে কাজ করছে। কানে ব্লুটুথ ইয়ারপিস গুঁজে একের পর এক কথা যোজন করছে। আসাদ এসে সোফায় বসে কারানের কাঁধে হাত রাখেন।
হাত রাখতেই কারান কলে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে বলে, “ওকে ইমন, সব ফাইলগুলোর কপি আমাকে ই-মেইল করে দিও,” বলে কল কেটে দিল।
আসাদ শান্ত গলায় বলেন, “এসেই কাজ শুরু করে দিলি? বল, কী অবস্থা?”
“আলহামদুলিল্লাহ, চিল ড্যাড। তবে মনে হয় না বেশিদিন এই খুশিতে থাকতে পারব। অফিসের কোনো খবর রাখো?”
“আরিয়ান তো ঐ দিকটা দেখছেই। চিন্তা করিস না। কিন্তু বল, এখন প্ল্যান কি?”
কারান কিঞ্চিৎ হেসে বলে, “প্ল্যান আর কি! সবে তো আসলাম। এখন অফিসের কাজ গুছিয়ে নেব।”
“ওদিকের কথা বলছি না। তা বিয়ে শাদি করবি না নাকি?”
বিয়ের কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে অচিরেই কারানের মুখের হাসি ম্লান হয়ে যায়। গম্ভীর হয়ে বলল, “ড্যাড, আজকেই তো আসলাম। এর মধ্যেই মেজাজ খারাপ না করলে চলতো না?”
আসাদ ঠান্ডা স্বরে বলেন, “কুল ডাউন, কুল ডাউন। আচ্ছা, তাহলে রেস্ট নে। কাজটা এখন একটু রাখ, বুঝলি?” বলে প্রস্থান করলেন।
এভাবে টানা কয়েকদিন আসাদ ইনিয়ে-বিনিয়ে কারানকে বিয়ের কথায় উসকাতে থাকলেন। কিন্তু প্রতিবারই কারান কোনো না কোনো ভাবে কথা ঘুরিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে গেল বা রাগ দেখিয়ে চলে গেল।
___________
প্রভাতের কোমল আলোয় কারান অফিসে যাওয়ার জন্য কোট, প্যান্ট, শার্টে নিজেকে প্রস্তুত করেছে। সিঁড়ি থেকে নামতেই, সামনে আসাদ চৌধুরীর পরিচিত আক্রমণ শুরু হলো।
আসাদ বলল, “ওয়েট কর।”
ধীর পদক্ষেপে কারানের কাছে এগিয়ে এলেন। কারান একেবারে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। কণ্ঠে অসহিষ্ণু ক্রোধ ঢেলে বলে উঠল, “আবার কিন্তু বিয়ের কথা বলো না। তাহলে গেলাম আমি।”
আসাদ বিন্দুমাত্র দমলেন না, বরং নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, “আচ্ছা বিয়ে করতে সমস্যা কোথায়, সেটা তো ক্লিয়ার করবি।”
কারান কথাটা শুনে আর শোনার দরকার নেই এমন ভাব করে সামনে পা বাড়াল।
“রাতে ফিরে বলবো। বাই ড্যাড,” বলেই বেরিয়ে গেল।
আসাদ চৌধুরি কিছুটা চিন্তিত মুখে দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বিড়বিড় করে বললেন, “ওকে যেকোনো মূল্যে রাজি করাতেই হবে।”
কিন্তু জানে, কারান নাছোড়বান্দা। একবার যখন না বলেছে, তা আর পাল্টাবে না। আসাদ জানেন, সরাসরি চেষ্টা ফলপ্রসূ হবে না। তাই কূটবুদ্ধি আর অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে নতুন ছক কষলেন, যেখানে কারানের জেদ এবং না বলার স্পর্ধা, দুটোই বুদ্ধির কাছে হার মানবে।
____________
রাতে কারান নিজ কক্ষে অফিসের ফাইলগুলো নিয়ে গভীর মনোযোগে কাজ করছে, ঘরের নির্জনতা ভেদ করে হঠাৎ আসাদ চৌধুরীর আগমন ঘটে। তিনি গভীর এক পরিকল্পনা নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছেন, লক্ষ্য একটাই; কারানকে বিয়েতে রাজি করানো। আসাদ স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “ডিনার করেছিস?”
“হুম,” আসাদের দিকে না তাকিয়ে কোনো উত্তেজনা ছাড়াই কারান উত্তর দিল।
“আচ্ছা, তাহলে এবার বল, বিয়ে করতে সমস্যা কোথায়?”
কারান চোখ তুলে আক্রোশ মিশ্রিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
“ড্যাড, আর ইউ স্টার্টিং দিস এগেইন? তুমি তো জানো, হাউ মাচ আই ডিসপাইজ (অবজ্ঞা) গার্লস অ্যান্ড উইমেন।”
আসাদ হাসতে হাসতে বলে উঠলেন, “কি বলিস? তাহলে তো চিন্তায় পড়ে গেলাম! তুই কি ছেলেদের পছন্দ করিস নাকি? বাহিরে গিয়ে এই হাল তোর!”
এমনটা কর্ণগোচর হতেই কারান অসহায়ের মতো আসাদের দিকে তাকাল।
আসাদ মজা থামিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন, “চল মজা বাদ দেই, সিরিয়াস টপিকে আসি। তোর জন্য একটা অফার ছিল।”
কারান আবারও ফাইলের দিকে মনোযোগ দিয়ে প্রশ্ন করল, “কীসের অফার?”
“তুই যদি বিয়ে করতে রাজি থাকিস, তাহলে আমেরিকার কে.ছি টেক্সটাইল কোম্পানির সঙ্গে মিস্টার জন জ্যাকসনের ডিলটা হয়ে যাবে। আমি ব্যবস্থা করে দেব।”
কারান কিছুটা বিস্মিত হয়ে আসাদের দিকে তাকাল। “হোয়াট? জেনুইনলি ড্যাড?”
“শাওনকে চিনিস তো?”
“হুম, শাওন আঙ্কেল; তোমার ফ্রেন্ড না?”
“হ্যাঁ, ওরই ফ্রেন্ড জন। ও জনকে বললেই ডিলটা কনফার্ম হয়ে যাবে উইদাউট এনি ইনকনভিনিয়েন্স।”
“ড্যাড, সিরিয়াসলি? এটা তুমি আমাকে এতদিন পর জানাচ্ছো।”
আসাদ মৃদু হেসে বললেন, “আমি নিজেই তো কাল শাওনের সঙ্গে কথা বলার পর জানতে পারলাম।”
“উফফ! এতোদিন ধরে এটা নিয়ে কতটা সাফার করেছি জানো?” কারান স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়ে দিল।
আসাদ হাসিমুখে বললেন, “হুম, কিন্তু যেটা বললাম সেটা বুঝেছিস তো?”
কারান একটু ভ্রূ কুঁচকে বলে উঠল, “কোনটা?”
“আমি তখনই কথা বলব, যদি তুই বিয়ে করতে রাজি থাকিস।”
কারান হাসি মিশ্রিত কণ্ঠে বলল, “দিস ইজ রিডিকিউলাস (হাস্যকর), ড্যাড। তুমি তোমার ছেলের সাথে ডিল করছো?”
আসাদ হাসতে হাসতে বললেন, “উপায় নেই। কি করবো?”
“তুমি মিস্টার জন জ্যাকসনের সঙ্গে কথা বলো, আর এসব বিয়ের ঝামেলায় আমি নেই। সো ফরগেট ইট।”
“ঠিক আছে। তাহলে তোর কোম্পানি আরও পাঁচ ছয় মাস খাটুক। তারপর তো এমনিতেই কনফার্ম করেই ফেলবি।”
কারান বিরক্তি প্রকাশ করে ঠোঁটের কোনে আঙুলের সহিত চুলকাতে চুলকাতে বলল, “সুযোগ নিচ্ছো তুমি?”
আসাদ শান্ত গলায় বললেন, “তুই শুধু বিয়ে করতে রাজি হয়ে যা।”
কারান খানিক বিরক্ত হয়ে বলল, “ওকে, তোমার সাথে পরে কথা বলছি। কাজ করছি। এখন যাও।”
“না না, তোকে তো চিনি। এখনই বল, নাহলে পরে আবার তোর মাইন্ড চেঞ্জ হয়ে যাবে।”
কারান কণ্ঠে নিস্তেজ স্বর এনে বলল, “ওকে, ডান। তুমি শাওন আঙ্কেলের সঙ্গে কথা বলো, আমি বিয়ে করবো।”
আসাদ খুশিতে গদগদ হয়ে বললেন,”দ্যাট’স মাই সান।”
“হুম, কিন্তু আমার কিছু কন্ডিশন আছে। মেয়ে হতে হবে নম্র, ভদ্র, সুশীলা। আমার কথায় উঠবে আর বসবে।”
আসাদ হাসতে হাসতে বললেন, “তুই কি প্ল্যান করছিস বলতো? ইউএসএ-তে থেকেছিস, তোর তো এমন মেয়ে পছন্দ হওয়ার কথা না। আর এই যুগে এমন মেয়ে পাবি না বললেই চলে। এই জেনারেশনের মেয়েরা কারো কথাই শোনে না।”
কারান গম্ভীর মুখে বলল, “তাহলে বিয়ের চিন্তা বাদ দাও।”
“তোর মতলব কি, সেটা বল? আসলেই এমন মেয়ে চাইছিস? আই মিন মর্ডান, চঞ্চল টাইপ না?”
কারান হালকা হাসি দিয়ে বলল, “অবভিয়াসলি মর্ডান, স্মার্ট হবে, কিন্তু আমার কথা শুনবে। মানে ঐ সুশীলা, স্বামী ভক্ত টাইপের।”
আসাদ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন, “আচ্ছা, ঠিকাছে। এমন মেয়ে হলে তুই বিয়ে করবি, শিওর তো?”
“ইয়েস, ড্যাড।”
তবে মনে মনে ধূর্ত হাসি দিয়ে বলল, “বিয়েটা তো শুধু ডিল কনফার্ম করার একটা ওয়ে মাত্র। বিয়ের পর ঐ মেয়েকে এমনিতেই ডিভোর্স দিতে বাধ্য করবো।”
____________
অপরাহ্ণের আলো ম্রিয়মাণ হয়ে আসছে, এমন সময় আসাদ চৌধুরি তার পুরোনো বন্ধু আব্দুর রহমানকে ফোন করলেন। প্রফুল্লচিত্তে কথোপকথন শুরু হলো।
“আসসালামু আলাইকুম, কী হে আব্দুর রহমান, কেমন আছিস?” আসাদের কণ্ঠে উচ্ছ্বাসের ঝলক।
অপর প্রান্ত থেকে আব্দুর রহমান হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে সাড়া দেন, “ওয়ালাইকুমুস সালাম। সেই যে গত মাসে কথা হলো তারপর তো তোর আর কোনো খোঁজ-খবরই নেই।”
“আর বলিস না! কিছুদিন ধরে খুব ব্যস্ততার মধ্যে যাচ্ছি রে।”
এভাবে খানিকক্ষণ দুই বন্ধুর মধ্যে কথাবার্তা চললো। একে অপরের খোঁজখবর নিতে নিতে আড্ডার আবহ তৈরি হলো।
একপর্যায়ে আসাদ হঠাৎ বললেন, “কারান দেশে ফিরেছে রে!”
“কি বলিস? এটা তো দারুণ খবর! কবে ফিরলো?”
“এই তো, কিছুদিন হলো। এখন ওর বিয়ের জন্য মেয়ে খুঁজছি। তোর জানাশোনা কোনো ভদ্র, শিক্ষিত মেয়ে আছে নাকি?”
আব্দুর রহমান হেসে বললেন, “এমন বললে তো নিঃসন্দেহে নিজের মেয়ের কথাই বলতে হয়।”
আসাদের গলায় আনন্দের ঝিলিক ছড়িয়ে পড়ল।
“কি বলিস! তাহলে তো ছক্কা লেগে গেল। তোর মেয়ে যদি আমার ঘরে আসে, আমার চেয়ে খুশি আর কেউ হবে না।”
আব্দুর রহমান একটু থমকে গিয়ে বললেন, “হ্যাঁ। তবে শোন, মিরাকে এখন বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে নেই। মেয়েটা পড়ছে, পড়ুক।”
“আরে, ও চাইলে বিয়ের পরও পড়তে পারবে। এতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু একবার দেখে আসলে ক্ষতি কি? তোর মেয়ে মানে নিঃসন্দেহে সে খাঁটি সোনা হবে।”
আব্দুর রহমানের কণ্ঠে খানিক দ্বিধা ফুটে উঠল, “সেটাই তো আরেক সমস্যা রে। আমার মেয়েটা ছোটবেলা থেকেই ঘরকুনো, মানুষের সামনে সহজে যায় না। আমি কারানের জন্য অন্য মেয়ে খুঁজে দিব, যেমন তুই চেয়েছিস। কারানের জন্য বেস্টটাই দেখবো।”
আসাদ হাসতে হাসতে বললেন, “আরে শোন, একবার দেখে তো আসি! চিন্তা করিস না। মিরা ঘরে রাজরানীর মতোই থাকবে, এই ভরসা আমি তোকে দিতে পারি।”
“কিন্তু…”
আসাদ কথা কেটে বলেন, “কিন্তু মিন্তু কিছু না। কথাটা তবে থাকলো। তুই বাড়ির সবার সাথে কথা বল। কবে দেখতে যাবো, জানাবি।” এই বলে হাসতে হাসতে ফোন রেখে দিলেন।
অপর প্রান্তে আব্দুর রহমান গভীর নিশ্বাস ফেললেন। আপনমনে বললেন, “মিরা কি রাজি হবে? মেয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও তো মেয়েকে বিয়ে দিতে পারি না।”
____________
মিরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে এসে নিজের আলয়ে মনোযোগ সহকারে অ্যাসাইনমেন্টের কাজ করতে লাগলো। একসময় মমতাজ কক্ষে ঢুকে আলতো করে বিছানায় বসে পড়লেন।
“কিছু বলবে মা?” মিরা চোখ তুলে মায়ের দিকে তাকাল।
মমতাজ কণ্ঠে স্নেহ ধরে বললেন, “না না, তুই কিছু খাবি? এনে দিব?”
“না মা, লাগলে মজিদা খালাকে বলবো।”
এবার মমতাজ একটু রয়ে সয়ে শুরু করলেন, “তুই এখন পড়া রেখে রেডি হয়ে নে তো, মা।”
“মা, আমি কিছুক্ষণ আগেই ভার্সিটি থেকে ফিরলাম। এখন কোথাও বের হওয়ার ইচ্ছে নেই। তোমরা গেলে যাও।”
“বের হবো না রে। তুই রেডি হয়ে নে। ভালো দেখে সুন্দর একটা শাড়ি পড়বি, যেন পরী লাগে আমার মেয়েটাকে।”
মিরার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে তিনি পুনরায় বললেন, “যদিও আমার মেয়ে তো এমনিতেই পরী।”
এর মধ্যে মাহিমা ঘরের ভিতরে এসে বললো, “মা হেডফোনটা কোথায়? পাচ্ছি না তো।”
“হেডফোন পরে নিবি, তুই পাশে বস,” শান্ত গলায় মমতাজ বললেন।
মিরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, “হঠাৎ শাড়ি পড়বো কেন? কি ব্যাপার, বলো তো?”
এবার মমতাজ গলা কিছুটা নরম করে বললেন, “আজকে তোকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে, মা। তোর বাবা সেই কখন আমাকে বলেছে।”
অকস্মাৎ বিয়ের কথা শুনে মিরার হুঁশ উড়ে গেল। তার চোখে-মুখে স্পষ্ট ক্রোধ প্রকাশ পেল।
“মা, মজা করো না তো। তুমি তো ভালো করেই জানো, অনার্স শেষ না করে আমি বিয়ে করছি না। যাও তো তুমি। দিলে তো মাথাটা বিগড়ে।”
এদিকে মাহিমা খুশি হয়ে ভ্রূ উঁচিয়ে আপনমনে বললো, “ওত্তরিইই! তার মানে মিরু আপুর বিয়ে হবে। আহা, কতদিন এই দিনটার ওয়েট করলাম। সেই মজা হবে। আবার মিরু আপু গেলে বিন্দাস লাইফ কাটাবো। অন্তত একজন তো বকা দেওয়ার মানুষ কমবে।” এসব চিন্তা করে মুখ টিপে হাসলো মাহিমা।
মমতাজ স্নেহের সহিত মিরার শরীর পোঁছাতে পোঁছাতে বললেন, “রাগ করিস না, মা। আমিও কি জানতাম নাকি? তোর বাবা ঠিক করেছে। তাছাড়া আজকে তো শুধু দেখতে আসবে। দেখলেই কি বিয়ে হয়ে গেল? আর ছেলে নাকি অনেক সুন্দর, লম্বা। বড় বিজনেস কোম্পানি আছে। আমেরিকা থেকে পড়াশোনা করে এসেছে, বুঝলি?”
“মা, তুমি থাকো তোমার আমেরিকান ছেলে নিয়ে। আমি এখন বিয়ে টিয়ে করছি না। আমার কিন্তু কনসেন্ট্রেশন নষ্ট হচ্ছে।”
মাহিমা অবাক হয়ে ভ্রূ উঁচিয়ে বলে, “ওরে বাবা! আমেরিকান ছেলে। আম্মু আপু রাজি না হলে সমস্যা নাই, আমি রাজি আছি। যদিও কোরিয়ান হলে বেশি ভালো হতো, তবে মানিয়ে নিব,” বলে লাজুক মুখ করে কিঞ্চিৎ হাসতে থাকলো।
মমতাজ ভ্রূ কুঁচকে মাহিমার কান মলা দিয়ে বললেন, “পাজি মেয়ে, একটা দিব। যা গিয়ে পড়তে বস।”
মাহিমা কানে হাত দিয়ে বললো, “উফফ, লাগছে তো। শুধু আমার সাথেই পারো।”
“যাবি? নাকি বেতটা আনবো।”
মাহিমা চোখ-মুখ কুঁচকে, “যাচ্ছি যাচ্ছি,” বলে যেতে যেতে ব্যঙ্গ করে মুখ বাঁকিয়ে বিড়বিড়িয়ে বললো,
“বেতটা আনবো? ধুরো,” বলে কক্ষ থেকে চলে গেল।
মিরা বিরক্তি নিয়ে বললো, “তোমার মাথা থেকে এসব বিয়ের ভূত নামাও বুঝছো। এখন সুন্দর করে কেটে পরো তো।”
ঠিক তখনই আব্দুর রহমান মিরার কক্ষে ঢুকতে ঢুকতে আনন্দিত গলায় বললেন, “কই গো, আমার মা রে তৈরি করছো?”
“তুমি তোমার মেয়ের সাথে কথা বলো। অনেক কাজ আছে। আমি নিচে যাই,” বলে মমতাজ বের হয়ে গেলেন।
আব্দুর রহমান নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, “কিরে মা, যা তৈরি হয়ে নে। ছেলে পক্ষ তো চলে আসবে।”
মিরা নতজানু হয়ে জিজ্ঞেস করলো, “বাবা, বিয়েটা কি এখনই করা খুব দরকার?”
“বুঝতে পেরেছি। তোকে না জানিয়ে আমার এই ডিসিশন নেওয়া উচিত হয় নাই। কিন্তু ছেলে আমার চেনা। আমার ছোটবেলার বন্ধু আসাদের ছেলে। মা শিক্ষিত, সুদর্শন ছেলে। আশা করি তোরও দেখলে পছন্দ হবে।”
মিরা বিড়বিড়িয়ে আওড়ালো, “কিন্তু বাবা, আমি তো গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে একটা জব করতে চেয়েছিলাম। এত কষ্ট করে পড়ালে কি বিয়ে দিয়ে দেওয়ার জন্য?”
আব্দুর রহমান স্নেহের সহিত অনুনয় করে বললেন, “বিয়ে তো একদিন দিতেই হতো। আচ্ছা, বুঝতে পেরেছি। আমার কাছে ছেলের ছবি আছে। এটা দেখ। তারপর না হয় তোর সিদ্ধান্ত জানাস। কিন্তু মা, একবার শুধু ওদের সামনে যা। আমার সম্মানটা রাখ। কিছুক্ষণ পর তো ওরা চলে আসবে।”
ছেলের ছবি মিরার ফোনে পাঠিয়ে দিয়ে পুনরায় বললেন, “তোকে ছেলের ছবি পাঠিয়েছি। দেখ কেমন মনে হয়। ওর নাম কারান। তুই তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে। আমি যাই, দেখি তোর মায়ের একটু সাহায্য করি,” বলে প্রস্থান করলেন।
মিরা বাবার মুখের ওপর আর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানোর সাহস পেল না।
_____________
মিরা কক্ষে এদিক-ওদিক পায়চারি করতে করতে বললো, “এটা কিছু হলো? এভাবে তীরে এসে তরী ডুবতে দেওয়া যায়? কত স্বপ্ন ছিল; জব করে মা-বাবাকে খুশি করবো, নিজের মতো করে জীবনটাকে গুছিয়ে নিব। এখন বিয়ে হয়ে গেলেই তো সব শেষ।”
মুখ ভেংচিয়ে বলল, “হবে তো একটা বুড়া ব্যাটাই। আচ্ছা, বাবাকে বলে দিব ছেলে পছন্দ হয় নাই, তাহলেই তো হয়। (থেমে) কি?

