Soulmate_to_Enemy #পর্ব_৩

0
2

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৩
লেখনীতে:#মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

শরতের মেঘমুক্ত আকাশটা হঠাৎ করেই যেন গুমোট হয়ে এল। সেন্ট জুড হাই স্কুলের করিডোর দিয়ে যখন জেনিন নুরশাদ হেঁটে যাচ্ছিল, তখন তার পদক্ষেপে সেই চিরচেনা চপলতা ছিল না। তার কাঁধের ব্যাগটা একপাশে ঝুলে আছে, চুলগুলো অবিন্যস্ত। আজ জেনিনের মন ভালো নেই। বাড়িতে বাবার সাথে তার চরম অশান্তি হয়েছে। জেনিনের বাবা চান জেনিন এখনই বিদেশের কোনো বোর্ডিং স্কুলে চলে যাক, যাতে তার এই ‘উচ্ছৃঙ্খল’ সঙ্গ ত্যাগ হয়। কিন্তু জেনিন জানে, তার এই সঙ্গ মানেই হলো নানামি জায়দান। নানামিকে ছাড়া সে এক মুহূর্তও টিকে থাকার কথা ভাবতে পারে না।

করিডোরের শেষ মাথায় জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল নানামি। সে হাতে একটা ছোট ডায়েরি নিয়ে কিছু লিখছিল। জেনিন গিয়ে তার পাশে ধপ করে বসে পড়ল। নানামি তার দিকে একবার তাকালো, জেনিনের বিষণ্ণ চেহারা দেখে সে বুঝতে পারল ভেতরে বড় কোনো ঝড় বয়ে গেছে।

“আবার কি আঙ্কেলের সাথে ঝামেলা?” নানামি নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল।

জেনিন কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। মাঠের এক কোণে নোবারা আকারি তার বান্ধবীদের সাথে গল্প করছিল।

নোবারার সেই মুক্তোঝরা হাসি আজ জেনিনের কানে মধুর বদলে বিষের মতো লাগছে। কারণ সে জানে, সে যদি শহর ছেড়ে চলে যায়, তবে এই হাসি দেখার অধিকারও সে হারাবে।

“তোকে একটা কথা বলি? যদি আমি কোনোদিন এই শহর ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাই, তুই কি খুশি হবি?” জেনিন হঠাৎ নানামির চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করল।

নানামি স্তব্ধ হয়ে গেল। তার হাত থেকে কলমটা মেঝেতে পড়ে গেল। সে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে জেনিনের দিকে তাকিয়ে বলল, “এসব কী ধরনের রসিকতা? তুই ছাড়া আমার এই স্কুলে আর কে আছে? তুই জানিস না আমি তোকে কতটা আগলে রাখি?”

“আগলে রাখিস বলেই তো সমস্যা রে!” জেনিন একটা তিক্ত হাসি হাসল। “সবাই ভাবে আমি তোকে নষ্ট করছি। আমার বাবা মনে করেন তোর মতো ভালো ছেলের সাথে থাকলে আমি আরও খারাপ হয়ে যাচ্ছি। তাই তিনি আমাকে পাঠিয়ে দিতে চান। কিন্তু, আমি কোথাও যাব না। আমি এই নরকেই থাকব, কিন্তু তোকে ছেড়ে যাব না।”

জেনিনের এই পজেসিভনেস বা আগলে রাখার জেদটা নানামিকে একদিকে যেমন শান্তি দিত, অন্যদিকে এক অজানা আশঙ্কায় ডুবিয়ে দিত। নানামি জানত জেনিন জেদি, কিন্তু এই জেদ যখন কারো ওপর পড়ে, তখন তা আর সাধারণ থাকে না।

টিফিন পিরিয়ডে আজ জেনিন কাউকে সাথে নিল না। সে একা একা পেছনের দেওয়ালে গিয়ে বসে রইল। নানামি তাকে খুঁজতে খুঁজতে সেখানে পৌঁছাল। দেখল জেনিন একটা ছোট কাঠি দিয়ে মাটিতে কিছু আঁকছে।

নানামি হেসে ফেলল। “চল, নোবারা ডাকছে। ও আজকে বাসা থেকে পিঠা নিয়ে এসেছে, তোকে খেতে বলেছে।”

নোবারার নাম শুনতেই জেনিনের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে এক লাফে দেওয়াল থেকে নেমে নানামির সাথে ক‌্যান্টিনের দিকে দৌড়াল।

ক্যান্টিনে নোবারা বসে ছিল। তার সামনে রাখা টিফিন বক্স। জেনিন গিয়ে কোনো কথা না বলে একটা পিঠা তুলে মুখে পুরল।

“উমম! দারুণ হয়েছে নোবারা! তুমি তো দেখি রান্নায় ওস্তাদ!” জেনিন তৃপ্তির সাথে বলল।

নোবারা হাসল। “ধন্যবাদ জেনিন ভাইয়া। কিন্তু নানামি ভাইয়াকে তো দিলেন না, সব আপনিই খাচ্ছেন!”

জেনিন হঠাৎ থেমে গেল। তার চিবানো বন্ধ হয়ে গেল। সে দেখল নোবারা খুব আগ্রহ নিয়ে নানামির দিকে তাকিয়ে আছে। নানামিও লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে হাসছে। জেনিনের বুকের ভেতরে একটা চিনচিনে ব্যথা শুরু হলো। এক অদ্ভুত ঈর্ষা তাকে গ্রাস করল। সে যে নানামিকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে, সেই নানামির সাথে নোবারার এই নৈকট্য সে মেনে নিতে পারছে না। আবার নোবারাকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি চায়, এই ত্রিমুখী আবেগের লড়াই জেনিনকে অস্থির করে তুলল।

“ও খাবে না। নানামি মিষ্টি খুব একটা পছন্দ করে না,” জেনিন রুক্ষ স্বরে বলে উঠল।

নানামি অবাক হয়ে তাকালো। সে তো মিষ্টি পছন্দ করে! কিন্তু জেনিনের মেজাজ দেখে সে আর প্রতিবাদ করল না। সে বুঝতে পারল জেনিন আবার তার পজেসিভ মোডে চলে গেছে। জেনিন চায় না নোবারার সাথে নানামির কোনো বিশেষ সম্পর্ক গড়ে উঠুক, আবার সে নানামিকেও ছাড়তে চায় না।

সেই বিকেলে স্কুল ছুটির পর জেনিন জেদ ধরল সে নানামির বাসায় যাবে না। সে আজ একা থাকবে। নানামি তাকে অনেক বোঝালো, কিন্তু জেনিন শুনল না। সে তার সাইকেল নিয়ে শহরের অন্ধকার গলিগুলোর দিকে চলে গেল।

নানামি চিন্তিত হয়ে পড়ল। জেনিন যখন এভাবে একা চলে যায়, তখন সে নিশ্চিত কোনো ঝামেলা পাকায়। নানামিও তার পিছু নিল। দেখল জেনিন শহরের এক কুখ্যাত মাস্তান ‘কালা মানিক’-এর আড্ডায় গিয়ে বসে আছে। জেনিন সেখানে বসে সিগারেট ফুঁকছে, যেটা সে আগে কখনো করেনি।

“নুরশাদ! কী করছিস তুই এখানে? চল বাসায়!” নানামি চিৎকার করে উঠল।

জেনিন নির্লিপ্তভাবে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “আমি বলেছি না আজ আমি একা থাকব? তুই যা এখান থেকে। তোর মতো ভালো ছেলের এই জায়গায় আসা মানায় না।”

নানামি দেখল সেই বখাটে ছেলেগুলো জেনিনকে উস্কানি দিচ্ছে। নানামি জেনিনের হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিল। “আমি বলছি চল! তুই কি জানিস আঙ্কেল যদি জানতে পারেন তুই এখানে, তবে তোর পিঠের চামড়া রাখবে না?”

“রাখবে না তো রাখবে না! আমি তো কারো পরোয়া করি না!” জেনিন গর্জে উঠল।

কালা মানিক নামের ওই লোকটা নানামির দিকে তেড়ে এল। “এই ছোকরা! আমাদের মেহমানকে ডিস্টার্ব করছিস কেন? যা এখান থেকে!”

নানামি ভয় পেল না। সে জেনিনের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “ও আমার বন্ধু। ওকে আমি এই নরকে ফেলে যাব না।”

জেনিন অবাক হয়ে নানামির দিকে তাকালো। সে দেখল এই শান্ত, লাজুক ছেলেটা তার জন্য আজ নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একদল গুণ্ডার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। জেনিনের বুকের ভেতরে জমে থাকা সব অভিমান এক নিমেষে জল হয়ে গেল। সে সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়াল।

“চল!” জেনিন শান্ত স্বরে বলল।

রাস্তায় ফেরার পথে দুই বন্ধু পাশাপাশি সাইকেল চালাচ্ছিল। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। স্ট্রিট ল্যাম্পের হলুদ আলোয় তাদের ছায়াগুলো দীর্ঘ হয়ে পড়ছে। জেনিন হঠাৎ সাইকেল থামিয়ে নানামির দিকে তাকালো।

“তুই কেন আমার জন্য এত করিস? আমি তো সবসময় তোকে বিপদেই ফেলি।”

নানামি জেনিনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “কারণ তোকে ছাড়া আমি নিজেকে কল্পনা করতে পারি না। তুই ভবঘুরে হতে পারিস, উশৃঙ্খল হতে পারিস, কিন্তু তুই আমার ভাই। আর ভাইয়ের জন্য ভাই তো করবেই।”

জেনিন হঠাৎ নানামিকে জড়িয়ে ধরল। মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে দুই কিশোর একে অপরকে জাপটে ধরে রইল। জেনিনের চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা জল নানামির শার্টে পড়ল। জেনিন ফিসফিস করে বলল, “আমাকে ছেড়ে যাস না কোনোদিন জায়দান। আমি হয়তো তোর যোগ্য বন্ধু নই, কিন্তু তুই ছাড়া আমি মরে যাব।”

নানামি জেনিনের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল, “আমি কোথাও যাচ্ছি না নুরশাদ। আমি সারাজীবন এভাবেই তোর পাশে থাকব।”

কিন্তু নিয়তি যেন আড়ালে দাঁড়িয়ে হাসছিল।

<><><><><><><><><>

শহরের অভিজাত এলাকায় জেনিনদের বিশাল অট্টালিকা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় সুখ আর প্রাচুর্যের স্বর্গ, কিন্তু ভেতরের বাতাসটা সবসময় হিমশীতল। জেনিন নুরশাদের বাবা, জনাব আশফাক নুরশাদ, একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং কড়া মেজাজের ব্যবসায়ী। তার কাছে জীবন মানেই হলো নিয়ম, শৃঙ্খলা আর ক্ষমতা। জেনিনের মতো উশৃঙ্খল ছেলে তার ইমেজের জন্য এক বড় কলঙ্ক।

সেদিন রাতে জেনিন যখন বাড়ি ফিরল, ডাইনিং রুমে পিনপতন নীরবতা। তার বাবা টেবিলের মাথায় বসে গম্ভীর মুখে কফি খাচ্ছিলেন। জেনিন নিঃশব্দে পাশ কাটিয়ে ওপরে নিজের ঘরে যাওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু বাবার ভারী কণ্ঠস্বর তাকে থামিয়ে দিল।

“কোথায় ছিলে এতক্ষণ?” আশফাক নুরশাদের চোখ দুটো জেনিনের দিকে আগুনের মতো জ্বলছে।

জেনিন দেয়ালের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “নানামির বাসায় ছিলাম।”

“মিথ্যে বলবে না!” আশফাক নুরশাদ টেবিল চাপড়ে উঠে দাঁড়ালেন। “আমার কাছে খবর আছে তুমি আজ বিকেলে ওই ‘কালা মানিক’-এর আড্ডায় গিয়েছিলে।”

জেনিন কথা না বাড়ালেও আশফাক বলতে থাকেন,
“জেনিন নুরশাদ, তুমি কি জানো তুমি কার ছেলে? তোমার এই নোংরামি আমার ব্যবসার ক্ষতি করছে। কাল থেকে তোমার স্কুল যাওয়া বন্ধ। আমি তোমাকে সিঙ্গাপুর পাঠানোর ব্যবস্থা করছি।”

জেনিন এবার বাবার চোখের দিকে সরাসরি তাকালো। তার চোখে কোনো ভয় নেই, বরং আছে একরাশ ঘৃণা। “আপনি তো সবসময় ব্যবসাই বোঝেন। কোনোদিন কি বোঝার চেষ্টা করেছেন আপনার ছেলেটা কেন ঘরে ফিরতে চায় না? এই বিশাল বাড়িতে আমার জন্য একটা মানুষও নেই যে আমাকে একটু জিজ্ঞেস করবে আমি কেমন আছি। মা মারা যাওয়ার পর থেকে আপনি শুধু আমাকে শাসনই করে গেছেন, কোনোদিন ভালোবাসেননি।”

“বেয়াদবি করবে না!” আশফাক নুরশাদ জেনিনের গালে কষে একটা চড় মারলেন।

চড় খেয়ে জেনিনের মাথাটা ঘুরে গেল, কিন্তু সে পড়ল না। সে তার ঠোঁটের কোণে জমা রক্তটুকু মুছে এক অদ্ভুত হাসি দিল। এই চড়টা তার জন্য নতুন কিছু নয়। শৈশব থেকেই সে দেখে আসছে, কোনো ভুল করলেই তার ওপর নেমে আসে অমানুষিক শাসন। জেনিন নুরশাদের ভেতরের যে কোমলতাটুকু ছিল, তা এই চড় আর অপমানে বারবার ক্ষতবিক্ষত হয়েছে।

“আপনি আমাকে পাঠাতে চান পাঠিয়ে দিন। কিন্তু মনে রাখবেন, আপনি আমাকে যত দূরে পাঠাবেন, আমি তত বেশি আপনার অবাধ্য হব।” জেনিন ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

বাইরে তখন প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জেনিন কোনো রেইনকোট বা ছাতা নিল না। সে ভিজতে ভিজতে নানামির বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। রাত তখন প্রায় একটা। নানামির জানালার নিচে এসে সে একটা ছোট পাথর ছুড়ল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই জানালা খুলে গেল। নানামি জেগে ছিল, সে জানত আজ জেনিনের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে যাবে।

নানামি নিচে নেমে এসে পেছনের দরজা খুলে দিল। জেনিন ভেতরে ঢুকেই নানামিকে জাপটে ধরল। তার সারা শরীর কাঁপছে, বৃষ্টির ঠান্ডায় নয়, বরং অপমানে আর ক্ষোভে। নানামি তাকে দ্রুত নিজের ঘরে নিয়ে এল। একটা তোয়ালে দিয়ে জেনিনের মাথা মুছে দিতে দিতে দেখল জেনিনের গালে পাঁচ আঙুলের দাগ বসে আছে।

“আবার মেরেছেন আঙ্কেল?” নানামির গলায় এক গভীর হাহাকার।

জেনিন বিছানায় বসে পড়ল। “আমার এই শরীরটা ব্যথার আর ভয় পায় না রে। কিন্তু ভেতরের জগতটা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। আমার বাবা চায় আমি রোবট হই। কিন্তু আমি মানুষ হতে চাই। আমি এমন একটা জগত চাই যেখানে কেউ আমাকে শাসন করবে না।”

নানামি জেনিনের পাশে বসল। “রাগ করিস না। আঙ্কেল হয়তো তোর ভালোর জন্যই…”

“ভালোর জন্য?” জেনিন চিৎকার করে উঠল। “তোর বাবা-মা তোকে ভালোবাসে জায়দান। তোকে আগলে রাখে। আর আমার বাবা আমাকে কেবল ব্যবহার করতে চায় তার নামের উত্তরাধিকারী হিসেবে। তুই জানিস না, আজ ওই আড্ডায় যখন আমি সিগারেটটা হাতে নিলাম, আমার মনে হলো আমি আমার জীবনের সব যন্ত্রণাকে পুড়িয়ে দিচ্ছি। আমি জানি ওটা ভুল, কিন্তু ওই ভুলটাই আমাকে শান্তি দিচ্ছে।”

নানামি শিউরে উঠল। সে জেনিনের দুহাত ধরে বলল, “তুই ভুল পথে যাচ্ছিস নুরশাদ। এই অন্ধকার তোকে গিলে খাবে। আমি তো আছি। আমি তোর বন্ধু, তোর ভাই। আমাকে কি তোর যথেষ্ট মনে হয় না?”

জেনিন নানামির চোখের দিকে তাকালো। নানামির চোখে এক নিদারুণ মমতা। জেনিন শান্ত হলো। সে নানামির কাঁধে মাথা রেখে বলল, “তুই আছিস বলেই তো আমি এখনো বেঁচে আছি। কিন্তু আমি ভয় পাই। আমি ভয় পাই যে একদিন তুইও আমাকে ছেড়ে যাবি। তুইও একদিন বড় অফিসার হবি, তোর সুন্দর একটা জীবন হবে, তখন কি তুই আমার মতো এই বখাটে বন্ধুকে পাশে রাখবি?”

“কীসব আজেবাজে কথা বলছিস!” নানামি ধমক দিল। “আমি তোকে ছেড়ে কোথাও যাব না। আমরা একসাথে থাকব।”

জেনিন সেদিন নানামির ঘরে ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু তার স্বপ্নে হানা দিল বিভীষিকা। সে দেখল সে এক বিশাল অন্ধকারের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে, আর তার চারপাশ থেকে সবাই হারিয়ে যাচ্ছে। সে চিৎকার করছে কিন্তু কেউ তাকে শুনতে পাচ্ছে না। একমাত্র নানামি দূর থেকে হাত বাড়িয়ে আছে, কিন্তু সে নানামিকে ছুঁতে পারছে না।

পরের দিন স্কুল যাওয়ার পথে জেনিনের মেজাজ ছিল মারাত্মক খিটখিটে। সে ক্লাসে ঢুকে বেঞ্চে লাথি মারল, টিচারদের সাথে মুখে মুখে তর্ক করল। জেনিন নুরশাদ এখন আর শুধু বাউন্ডুলে নয়, সে রীতিমতো বিদ্রোহী। নানামি তাকে বারবার সামলানোর চেষ্টা করল, কিন্তু জেনিন আজ কারোর কথা শুনছে না।

টিফিন পিরিয়ডে জেনিন ছাদের কার্নিশে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নিচে শত শত ছাত্রছাত্রী। জেনিন এক পা বাইরে বাড়িয়ে দিয়ে নিচে তাকাচ্ছিল। নানামি যখন ছাদে গেল, তার বুক কেঁপে উঠল।
“নুরশাদ! সরে আয় ওখান থেকে! কী করছিস তুই?”

জেনিন হাসল। এক বিষণ্ণ, রহস্যময় হাসি।
“ওপর থেকে দেখলে সব মানুষকে কত ছোট মনে হয়? মনে হয় আমি চাইলে ওদের সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। এই যে মানুষগুলো নিয়মের জালে বন্দি, এদের থেকে আমি কত আলাদা!”

ঠিক সেই মুহূর্তে নোবারা আকারি ছাদে এল নানামির খোঁজে। জেনিনকে কার্নিশে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নোবারা চিৎকার করে উঠল। “জেনিন ভাইয়া! নেমে আসুন প্লিজ! আপনার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?”

নোবারার কণ্ঠস্বর শুনে জেনিন নেমে এল। নোবারার চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। জেনিন অবাক হয়ে নোবারার কাছে গেল। “তুমি কাঁদছো কেন নোবারা?”

“আপনি কেন এমন করেন? আপনি কি জানেন আপনার কিছু হয়ে গেলে নানামি ভাইয়ার কী হবে? আমাদের কী হবে?” নোবারা রেগে গিয়ে বলল।

জেনিন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে দেখল নোবারা তার জন্য দুশ্চিন্তা করছে। জেনিনের পাথুরে হৃদয়ে যেন এক ফোঁটা বসন্তের বৃষ্টি পড়ল। সে মৃদুস্বরে বলল, “আমি তো জাস্ট চেক করছিলাম নিচে পড়লে কতক্ষণ সময় লাগে। তুমি চিন্তা করো না, জেনিন নুরশাদ এত সহজে মরে না।”

নোবারা আর কোনো কথা না বলে রাগে গজগজ করতে করতে চলে গেল। নানামি জেনিনের পাশে এসে দাঁড়াল। “দেখলি তো? শুধু আমি নই, নোবারাও তোকে নিয়ে কতটা ভাবে। তুই কি চাস আমাদের সবাইকে কাঁদাতে?”

জেনিন কিছু বলল না। সে দূরে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হতে লাগল, এই আকাশটা যেমন অসীম, তার ভেতরের অন্ধকারটাও তেমনই বাড়ছে। বাবার ঘৃণা, একাকীত্ব আর এই অপ্রাপ্তিগুলো তাকে এমন এক পথের দিকে নিয়ে যাচ্ছে যেখানে ফিরে আসার কোনো রাস্তা নেই। সে বুঝতে পারছিল, সে আর ওই ‘আদর্শ’ জেনিন হয়ে ফিরতে পারবে না।

জেনিনের এই মানসিক পরিবর্তন তাকে ধীরে ধীরে স্কুলের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাইরের জগতের অপরাধীদের সাথে জড়িয়ে ফেলছিল। সে এখন শুধু সিগারেট নয়, মাঝেমধ্যে ছোটখাটো ছিনতাই বা মারামারিতেও নেতৃত্ব দেয়। সে নিজের ক্ষমতা যাচাই করতে চায়। নানামি তাকে আগলে রাখতে চায়, কিন্তু জেনিন বারবার সেই সুতা ছিঁড়ে বেরিয়ে যায়। বন্ধুত্বের এই টানাপোড়েন আর জেনিনের চারিত্রিক পতন, সব মিলিয়ে এক অস্থির সময় পার করছিল তারা।

<><><><><><><><><>

শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে, শান্ত এক গলির শেষে নানামি জায়দান-দের বাড়ি। বাড়িটি খুব বেশি বড় নয়, কিন্তু এর প্রতিটি ইটে যেন এক অদ্ভুত শান্তি আর আদরের প্রলেপ মাখানো। জেনিনের বাড়ি যেমন রাজপ্রাসাদ হয়েও ছিল এক জীবন্ত কবরস্থান, নানামির বাড়ি ঠিক তার বিপরীত, এক চিলতে উঠোন আর জানালার কার্বেটিংয়ে রাখা মানিপ্ল্যান্টের লতাগুলোও এখানে কথা বলে। নানামির বাবা একজন হাই স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, আর মা একজন গৃহিণী। তাদের পৃথিবীটা ছোট, কিন্তু সেই পৃথিবীতে ভালোবাসার কোনো কমতি নেই।

সেদিন ভোরে নানামির ঘুম ভাঙল তার মায়ের হাতের স্নিগ্ধ ছোঁয়ায়। নানামির মা প্রতিদিন ভোরে তার মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম থেকে জাগান। নানামি চোখ মেলতেই দেখল তার মা মৃদু হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন।

“জেগেছ বাবা? এই যে তোমার লিকার চা। পড়তে বসো, সামনের পরীক্ষাগুলো তো খুব কাছে।”

নানামি উঠে বসে চায়ে চুমুক দিল। চায়ের কাপের সেই পরিচিত সুবাস তার সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে দেয়। নানামির এই সুশৃঙ্খল জীবনের কারিগর তার বাবা। নানামি যখন পড়তে বসে, তার বাবা পাশের চেয়ারে বসে কোনো এক ক্লাসিক উপন্যাসে ডুবে থাকেন। মাঝে মাঝে নানামির কোনো জটিল অংকের সমাধান করতে না পারলে তার বাবা ডায়েরি রেখে চশমাটা ঠিক করে বুঝিয়ে দেন। এখানে কোনো ধমক নেই, কোনো শাসন নেই, আছে কেবল এক পরম মমতা।

“বাবা, জেনিন কি কাল রাতে এসেছিল?” নানামির বাবা ডায়েরি থেকে মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন।
নানামি একটু থমকে গেল। সে জানে তার বাবা জেনিনকে পছন্দ করেন, কিন্তু জেনিনের উচ্ছৃঙ্খলতা নিয়ে তিনি চিন্তিত। নানামি মাথা নিচু করে বলল, “হ্যাঁ বাবা, এসেছিল। ওর বাড়িতে একটু সমস্যা হয়েছে।”

নানামির বাবা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ছেলেটা আসলে সোনার টুকরো, কিন্তু সঠিক পালিশ পাচ্ছে না। ওর বাবার উচিত ছিল ওকে একটু সময় দেওয়া। তোমার কাছে অনন্ত ছেলেটা একটু শান্তি পায়।”

নানামি জানালার বাইরে তাকালো। সকালের মিষ্টি রোদে একটা পাখি গাইছে। নানামির মনে হলো, তার বাবা ঠিকই বলেছেন। সে যদি এই শান্তির নীড় থেকে জেনিনকে ভাগ না দিত, তবে জেনিন হয়তো অনেক আগেই হারিয়ে যেত। নানামির মা তখন রান্নাঘর থেকে গরম পরোটা আর আলুর ভাজির সুগন্ধ ছড়াচ্ছিলেন। নানামির জীবনে কোনো অভাব নেই, কোনো অপ্রাপ্তি নেই। আর এই পূর্ণতাই তাকে এক বিশাল হৃদয়ের অধিকারী করে তুলেছে।

নানামির ঘরটা ছিল বইয়ে ঠাসা। প্রতিটি বইয়ের ভাঁজে ভাঁজে তার যত্নের ছাপ। কিন্তু সেই পরিপাটি ঘরের এক কোণে জেনিনের জন্য সবসময় একটা আলাদা জায়গা বরাদ্দ থাকে। জেনিনের অগোছালো খাতা, তার ভাঙা ঘড়ি, সবই নানামি পরম মমতায় আগলে রাখে। নানামি যখন পড়তে বসে, তার মা মাঝেমধ্যে এসে এক গ্লাস দুধ দিয়ে যান। নানামি যদি পড়ার চাপে একটু ঝিমিয়ে পড়ে, তার মা তার চুলে বিলি কেটে দেন।

“তুমি পড়াশোনা নিয়ে এত চাপ নিও না বাবা। তোমার চোখ দুটো ডেবে যাচ্ছে,” মা কপালে হাত দিয়ে আদর করে বলেন।

নানামি মায়ের হাতটা ধরে বলে, “মা, নুরশাদ কি আমাদের সাথে কয়েকদিন থাকতে পারে? ওর বাড়িতে খুব অশান্তি।”

নানামির মা হাসলেন। “অবশ্যই থাকতে পারে। জেনিন তো আমার আরেক ছেলের মতো। ও এলে বাড়িটা বেশ জমজমাট থাকে। তুমি ওকে আজই বলে দিও চলে আসতে।”

এই যে অকৃত্রিম ভালোবাসা, এটাই নানামি জায়দানকে একজন ধীরস্থির এবং আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে। সে জানে মানুষকে কীভাবে সম্মান করতে হয়, কীভাবে ক্ষমা করতে হয়।

নানামির বাবা তাকে শিখিয়েছেন, “আসল ক্ষমতা গলার জোরে নয়, বরং চরিত্রের মাধুর্যে থাকে।” আর নানামি সেই শিক্ষাটাই তার জীবনে ধারণ করে।

বিকেলের দিকে নানামি তার বাবার সাথে বাগানে জল দিচ্ছিল। গাছে গাছে নতুন কুঁড়ি এসেছে। নানামির বাবা জবা গাছের ডাল ছাঁটতে ছাঁটতে বললেন, “মানুষের মনটাও এই গাছের মতো নানামি। যত্ন না নিলে আগাছা জন্মে যায়। তোমার বন্ধু জেনিনের মনেও অনেক আগাছা জন্মেছে। তুমি মালী হয়ে সেই আগাছাগুলো উপড়ে ফেলবে।”

নানামি এক বালতি জল নিয়ে গাছের গোড়ায় ঢালতে ঢালতে ভাবল, সে কি সত্যিই পারবে? জেনিন তো আগুনের মতো, আর নানামি কেবল এক ঘড়া জল। আগুন কি কোনোদিন জলকে মানবে?

নানামির বাড়িটা যেন এক অভয়ারণ্য। সেখানে রাগ নেই, ঘৃণা নেই। রাতে যখন পুরো পরিবার একসাথে ডিনার করতে বসে, নানামির বাবা মজার মজার গল্প বলেন। নানামির মা জোর করে নানামিকে আরেকটু তরকারি তুলে দেন। এই তুচ্ছ আনন্দগুলোই নানামির জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। সে যখন নিজের বিছানায় শুতে যায়, তখন সে পরম শান্তিতে ঘুমাতে পারে, কারণ সে জানে তার মাথার ওপর এক জোড়া আশীর্বাদী হাত আছে।

কিন্তু নানামির এই নিস্তরঙ্গ জীবনেও একটা ভয় কাজ করে। সে জানে তার এই শান্তির নীড় জেনিনকে ক্ষণিকের আরাম দেয়, কিন্তু স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না। জেনিন যখন তার বাড়ি ফিরে যায়, তখন সে আবার সেই একই নরকে পড়ে। নানামি মাঝেমধ্যেই প্রার্থনা করে যেন জেনিনের বাবা একটু নরম হন, যেন জেনিন একটু সুস্থ জীবন পায়।

নানামি জায়দান একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। সে স্বপ্ন দেখে সে অনেক বড় একজন অফিসার হবে, মানুষের সেবা করবে। আর তার পাশেই জেনিন থাকবে তার প্রধান শক্তি হয়ে। সে জানত না যে তার এই পরিবার, এই আদর্শ জীবনই একদিন জেনিনের মনে অবচেতনভাবে এক ধরনের হীনমন্যতা বা ঈর্ষার জন্ম দেবে। জেনিন হয়তো মনে মনে চাইবে নানামির মতো হতে, কিন্তু হতে না পেরে সে আরও বেশি ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠবে।

সেই রাতে নানামি জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। নক্ষত্রগুলো ঝিকঝিক করছে। সে মনে মনে জেনিনের জন্য দোয়া করল। নানামির আদর্শ পরিবার তাকে শিখিয়েছে ধৈর্য ধরতে, কিন্তু সময়ের স্রোত যে অনেক বেশি শক্তিশালী। নানামি তার পবিত্র বন্ধুত্ব দিয়ে জেনিনকে আগলে রাখতে চায়, কিন্তু বাইরের জগৎটা অনেক বেশি নিষ্ঠুর।

চলবে ইংশাআল্লাহ……..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here