Soulmate_to_Enemy #পর্ব_৯(বর্তমান)

0
2

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৯(বর্তমান)
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

পনেরোটি বছর। একটি দীর্ঘ সময়, যা পাহাড়কে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে কিংবা একটি শান্ত নদীকে করে তুলতে পারে প্রলয়ঙ্করী। সময়ের এই নিষ্ঠুর চক্রে শহর বদলেছে, বদলেছে মানুষের যাতায়াতের পথ, কিন্তু নূরশাদ সাম্রাজ্যের আকাশছোঁয়া অট্টালিকাটি আজও দম্ভের সাথে দাঁড়িয়ে আছে। এই অট্টালিকার বিশতলায় যে ঘরটি, সেখান থেকে পুরো শহরটাকে মনে হয় একদল নগণ্য পিঁপড়ের বাসা। আর সেই ঘরের বিশাল কাঁচের জানালার ওপাশে দাঁড়িয়ে যে মানুষটি নিচের ক্ষুদ্র পৃথিবীকে অবজ্ঞাভরে দেখছে, সে আর কেউ নয়, জেনিন নূরশাদ।

পনেরো বছর আগের সেই উশৃঙ্খল কিশোরটি আজ আর নেই। তার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে এক দীর্ঘকায়, সুঠাম দেহের মানুষ, যার চোখেমুখে এখন আর রাগ নেই, আছে এক গভীর এবং শীতল গাম্ভীর্য। জেনিনের পরনে এখন ইতালিয়ান স্যুট, হাতে প্লাটিনাম চেইন স্ট্রিপ ঘড়ি, আর ঠোঁটের কোণে সবসময় ঝুলে থাকে এক ধরণের তাচ্ছিল্যের হাসি। সে এখন নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের একমাত্র সিইও (CEO)। তার বাবা আশফাক নূরশাদ অবসর নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু জেনিন তার ইগো আর রুক্ষতাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, তার বাবার কঠোরতাও এখন জেনিনের সামনে ম্লান মনে হয়।

সকাল দশটা। অফিসের করিডোরে পিনপতন নিস্তব্ধতা। জেনিন যখন তার চেম্বারের দিকে হেঁটে যায়, তখন দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কর্মচারীরা নিশ্বাস নিতেও ভয় পায়। জেনিন নূরশাদ মানেই এক জীবন্ত আতঙ্ক। তার কাজ চাই নিখুঁত, তার সময় চাই কাঁটায় কাঁটায়। সামান্যতম বিচ্যুতি মানেই চাকরি থেকে বরখাস্ত কিংবা তার বিষাক্ত বাক্যবাণে ক্ষতবিক্ষত হওয়া।

চেম্বারে ঢুকে জেনিন তার রিভলভিং চেয়ারে বসল। তার সামনে রাখা বিশাল ওক কাঠের টেবিলটা একদম পরিষ্কার। সে বিশৃঙ্খলা পছন্দ করে না। তার ল্যাপটপটা খুলতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল শত শত ইমেইল। কিন্তু জেনিনের মন সেদিকে নেই। সে চেয়ারে হেলান দিয়ে জানালার বাইরে তাকালো। তার মনের ভেতর পনেরো বছর আগের সেই ট্রেন স্টেশনের হুইসেলটা আজও বাজে। সে আজও অনুভব করতে পারে সেই বৃষ্টির দিন, নানামির সেই রক্তাক্ত অঙ্গীকার আর নোবারার সেই আর্তনাদ।

কিন্তু জেনিন সেই স্মৃতিগুলোকে লোহার সিন্দুকে বন্দী করে রেখেছে। সে নিজেকে বিশ্বাস করিয়েছে যে, সে একাই এই পৃথিবীর রাজা, আর আবেগ হলো এক ধরণের বিলাসিতা যা তাকে দুর্বল করে দেয়।

“স্যার, মে আই কাম ইন?”

দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা এইচআর ম্যানেজার কাঁপছে। জেনিন মাথা না তুলে শুধু ইশারা করল ভেতরে আসার জন্য।

“বলুন।” জেনিনের কণ্ঠস্বর যেন পাথরে পাথর ঘষার মতো কর্কশ।

“স্যার, আপনার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট (PA) পদের জন্য আজও দশজন ইন্টারভিউ দিতে এসেছে। আপনি কি সময় দেবেন?”

জেনিন ল্যাপটপ থেকে চোখ সরাল না। “গত তিন মাসে পনেরোজন পিএ আমি ফায়ার করেছি। আপনারা কি এক ফোঁটা ঘিলুওয়ালা কাউকে খুঁজে পান না? নাকি এই শহরে শিক্ষিত মানুষের আকাল পড়েছে?”

“আসলে স্যার, আপনার স্ট্যান্ডার্ড অনেক হাই…” ম্যানেজার ঢোক গিলল।

“আমার স্ট্যান্ডার্ড হাই নয়, আপনাদের কাজের মান লো। যাদের পাঠিয়েছিলেন তারা ফাইল সাজাতে জানে না, কফি বানাতে জানে না, এমনকি আমার মেজাজটা পর্যন্ত পড়তে পারে না। যান, যাদের এসেছে তাদের বসিয়ে রাখুন। আমি যখন ডাকব তখন আসবে।”

ম্যানেজার চলে যাওয়ার পর জেনিন একটা সিগারেট ধরাল। ধোঁয়াগুলো কুণ্ডলী পাকিয়ে এসির বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। জেনিন এখন খুব রুড, খুব ইগোস্টিক। সে মনে করে টাকা দিয়ে সব কেনা যায়। সে তার বাবার সেই শিক্ষাটাকে নিজের জীবনের মূলমন্ত্র করে নিয়েছে, ‘ক্ষমতা থাকলে লোকে তোমাকে ভয় পাবে, আর ভয় পেলে কেউ তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার সাহস করবে না।’ কিন্তু জেনিন জানে না, ভয় ভালোবাসা তৈরি করে না, শুধু দূরত্ব তৈরি করে।

আজ জেনিনের মনটা কেন যেন অস্থির। সে টেবিলের ড্রয়ারের গোপন চাবি দিয়ে নিচের একটা খোপ খুলল। সেখানে একটি পুরনো সিল্কের রুমাল রাখা। রুমালটি এখন জীর্ণ, তাতে পনেরো বছর আগের রক্তের দাগগুলো কালচে হয়ে গেছে। জেনিন সেই রুমালটির ওপর হাত বোলালো। এটি নানামির দেওয়া সেই রুমাল। এই এক টুকরো কাপড়ই জেনিনের একমাত্র সংযোগ তার অতীতের সাথে। জেনিন রুমালটা নাকের কাছে ধরল। কোনো ঘ্রাণ নেই, শুধু এক বিষণ্ণ শুষ্কতা।

“জায়দান…” জেনিন নিচু স্বরে বিড়বিড় করল। “তুই নিশ্চয়ই এখন কোনো থানার বড় সাহেব হয়েছিস। তুই হয়তো ভাবছিস আমি মরে গেছি। কিন্তু আমি বেঁচে আছি জায়দান, আমি এক বিশাল পাথুরে হৃদয় নিয়ে বেঁচে আছি।”

জেনিন রুমালটা আবার ভেতরে রেখে দিল। মুহূর্তের মধ্যে তার চেহারার কোমলতা উধাও হয়ে গেল। সে আবার সেই প্রস্তর-হৃদয় সিইও। সে বেল টিপলে ইন্টারভিউ দিতে আসা প্রথম প্রার্থী ভেতরে ঢুকল। মেয়েটি সুন্দরী, আধুনিক পোশাক পরা। সে জেনিনের সামনে এসে বসতেই জেনিন তার ফাইলটা এক নজরে দেখে টেবিলে ছুড়ে মারল।

“আপনি কি জানেন আপনার এই ফাইলে তিনটি স্পেলিং মিস্টেক আছে?” জেনিন খুব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল।

মেয়েটি হকচকিয়ে গেল। “সরি স্যার, আমি খেয়াল করিনি।”

“অফিসিয়াল ফাইলে আপনি খেয়াল করেন না? তার মানে আপনি মনযোগী নন। গেট আউট। এই কোম্পানির জন্য আপনি উপযুক্ত নন।”

মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেল। জেনিনের চোখে কোনো মায়া নেই। এক এক করে আরও চারজন এল এবং জেনিন তাদের প্রত্যেকের কোনো না কোনো খুত বের করে বের করে দিল। কেউ ফাইল সাজাতে ভুল করেছে, কেউ অতিরিক্ত পারফিউম মেখে এসেছে, কেউ বা কথা বলার সময় তোতলাচ্ছে। জেনিন নূরশাদের কাছে এগুলো ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। জেনিন তার চেয়ারে বসে ফাইল চেক করছিল। তার মাথার ভেতরে তখনো একটা অদ্ভুত সুর বাজছে। সে যেন কার জন্য অপেক্ষা করছে। পনেরো বছর ধরে সে যাকে খুঁজছে, যাকে পাওয়ার জন্য সে তার বাবার সবটুকু সম্পদ ব্যবহার করেছে, কিন্তু যার কোনো হদিস সে পায়নি। সেই নোবারা আকারি। জেনিন নূরশাদ নামের এই ক্ষমতার আড়ালে যে মানুষটি আছে, সে আজও প্রতি রাতে বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদে সেই মেয়েটির জন্য। কিন্তু দিনের আলোয় সে এক নিষ্ঠুর শাসক।

অফিসের কর্মচারীরা আড়ালে বলাবলি করে, “স্যার কি আদৌ মানুষ? উনার কি মন বলে কিছু নেই?”
জেনিন সব জানে। সে জানে সবাই তাকে ঘৃণা করে। কিন্তু সে এই ঘৃণাটা উপভোগ করে। সে চায় মানুষ তাকে দানব ভাবুক। কারণ সে দেখেছে, ভালো মানুষদের পৃথিবীটা কত সহজে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। সে আর ভাঙতে চায় না। সে চায় নিজেকে এমন এক ইস্পাতের বর্মের ভেতর আটকে রাখতে, যেখানে কোনো বিষাদ তাকে ছুঁতে পারবে না।

বিকালে জেনিনের ডেস্কে একটা ফোন এল। তার সেক্রেটারি জানালো, “স্যার, লাস্ট একজন ইন্টারভিউ দিতে এসেছে। ওর সিভিটা অনেক ভালো, কিন্তু ও একটু দেরি করে ফেলেছে।”

জেনিন ঘড়ির দিকে তাকালো। পাঁচটা বেজে দশ মিনিট। “দেরি? আমার ডিকশনারিতে দেরি মানেই ডিসকোয়ালিফাইড। ওকে যেতে বলো।”

“কিন্তু স্যার, ও বলছিল ও অনেক দূর থেকে এসেছে। আর ওর রেজাল্টগুলো এক্সট্রাঅর্ডিনারি।”

জেনিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “ঠিক আছে, পাঠিয়ে দাও। এটাই আজকের শেষ।”

জেনিন জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে চায় না এই নতুন প্রার্থীকেও সে নিরাশ করুক, কিন্তু তার ভেতরের ইগো তাকে নমনীয় হতে দেয় না। সে মনে মনে ঠিক করে রেখেছে, এই মেয়েটিকেও সে কোনো কঠিন প্রশ্ন দিয়ে ঘাবড়ে দেবে।

দরজায় মৃদু টোকা পড়ল। “আসতে পারি স্যার?”

কণ্ঠস্বরটি শুনে জেনিনের শরীরটা বিদ্যুতস্পৃষ্ট হওয়ার মতো কেঁপে উঠল। এই স্বর, এই মাধুর্য, এই টোন, পনেরো বছর ধরে সে এই শব্দটির প্রতিধ্বনি তার স্বপ্নে শুনে আসছে। জেনিন ধীরে ধীরে তার রিভলভিং চেয়ারটা ঘোরাল।

সে দেখল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণী। সাদা একটি কামিজ, চোখে হালকা কাজল, চুলে খুব সাদামাটা একটা বাঁধন। পনেরো বছরে রূপ বদলেছে, কৈশোরের সেই চপলতা বদলে গিয়ে এক গভীর স্নিগ্ধতা এসেছে, কিন্তু সেই চোখের চাহনি আজও সেই আগের মতো।

জেনিনের হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তার গলার কাছে কী যেন একটা দলা পাকিয়ে এল। সে চেয়ার থেকে উঠতে চাইল, কিন্তু তার পা দুটো যেন অসাড় হয়ে গেছে। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আর কেউ নয়, নোবারা আকারি। সেই নোবারা, যাকে সে একদিন ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে দেখে চলে গিয়েছিল। সেই নোবারা, যার কথা ভেবে সে হাজার হাজার রাত নির্ঘুম কাটিয়েছে।

কিন্তু জেনিন নিজেকে সামলে নিল। সে এখন এক দুর্ধর্ষ কর্পোরেট জায়ান্ট। সে তার আবেগ প্রকাশ করতে পারে না। সে তার চোখের সেই আকস্মিক ঔজ্জ্বল্য ঢেকে ফেলল এক কৃত্রিম কঠোরতায়। সে ফাইলের ওপর ঝুঁকে পড়ে নামটা দেখল, নোবারা আকারি।

“আপনি দেরি করেছেন মিস আকারি।” জেনিনের গলার স্বর কাঁপে নেই, কিন্তু তার ভেতরে তখন এক প্রলয় চলছে।

নোবারা জেনিনের চোখের দিকে তাকালো। সে কি চিনতে পেরেছে? জেনিনের চেহারায় এখন ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি, চোখে দামী ফ্রেমের চশমা, আর পরনে আভিজাত্য। পনেরো বছর আগের সেই বখাটে ছেলেটির সাথে এই সিইওর কোনো মিল নেই।

নোবারার চোখে কোনো চেনার চিহ্ন দেখা গেল না। সে শুধু পেশাদারিত্বের সাথে মাথা নিচু করে বলল—
“আই অ্যাম সরি স্যার। ট্রাফিক জ্যাম ছিল।”

জেনিন তার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। তার চোখ এখন নোবারার মুখের প্রতিটি ভাজ পর্যবেক্ষণ করছে। সে ভাবছে, কোথায় ছিলে তুমি এতদিন? কেন তোমাকে আমি খুঁজে পাইনি? কিন্তু সে মুখে বলল—
“সরি দিয়ে আমার কাজ চলে না মিস আকারি। তবে আপনার একাডেমিক রেকর্ড বলছে আপনি মেধাবী। আপনি কি জানেন এই পদের জন্য আপনাকে কী কী স্যাক্রিফাইস করতে হতে পারে? আমি খুব রুড মানুষ, আমার মেজাজ সবসময় চড়া থাকে। আপনি কি তা সহ্য করতে পারবেন?”

নোবারা আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল, “আমি কাজ করতে এসেছি স্যার, মানুষের মেজাজ বিচার করতে আসিনি। আপনি যদি আমার কাজে সন্তুষ্ট হন, তবে আপনার মেজাজ আমার ওপর পড়ার কথা নয়।”

জেনিন মনে মনে হাসল। সেই একই তেজ। সেই একই জেদ। পনেরো বছর পরও নোবারা বদলায়নি। জেনিনের ইচ্ছে করল ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতে, কিন্তু তার ইগো তাকে আটকে দিল। সে ফাইলটা বন্ধ করে দিল।

“ঠিক আছে। আপনাকে তিন মাসের জন্য প্রবেশনে নেওয়া হচ্ছে। কাল সকাল নয়টা থেকে জয়েন করবেন। যদি এক মিনিটও দেরি হয়, তবে ওই দিনই আপনার শেষ দিন হবে। মনে থাকবে?”

নোবারা মাথা নিচু করল। “মনে থাকবে স্যার। ধন্যবাদ।”

নোবারা যখন ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, জেনিন অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। নোবারা যখন দরজাটা বন্ধ করে দিল, জেনিন তার চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়ল। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে।

জেনিন নূরশাদের ইগো এখন এক নতুন যুদ্ধের মুখে। সে নোবারাকে পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু সে জানে না এই পাওয়াটাই তার পতনের শুরু কিনা। সে জানে না নোবারা কেন এতদিন পর তার কাছে এল। সে কি স্রেফ চাকরির জন্য এসেছে? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য আছে?

নূরশাদ সাম্রাজ্যের সেই বিকেলের বাতাসটা এখন এক নতুন গন্ধে ভারি হয়ে উঠল। জেনিন নূরশাদের রুক্ষ জীবনের মরুভূমিতে এক ফোঁটা বৃষ্টি নেমেছে, কিন্তু সেই বৃষ্টি কি তাকে শান্তি দেবে? নাকি সেই বৃষ্টির তোড়ে তার সাজানো বাগান ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে?

<><><><><><><><><>

সূর্যের প্রথম কিরণ যখন নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের কাঁচের দেয়ালে আছড়ে পড়ল, তখন পুরো ষাটতলা ভবনটি যেন এক রুপোলি দুর্গের মতো জ্বলজ্বল করছিল। অফিসের বিশাল ঘড়িতে যখন কাঁটায় কাঁটায় নয়টা বাজল, ঠিক সেই মুহূর্তে লিফটের দরজা খুলে বেরিয়ে এল নোবারা আকারি। তার পরনে আজ হালকা ধূসর রঙের একটি কুর্তি এবং দোপাট্টা। মার্জিত কিন্তু সাধারণ। তার হাতে একটি ছোট নোটবুক আর চোখে এক অদ্ভুত স্থিরতা।

নোবারা যখন সিইও-র চেম্বারের দিকে এগোচ্ছিল, সে লক্ষ্য করল তার দিকে সবার চাহনি। অফিসের কর্মচারীদের চোখেমুখে করুণা। সবাই জানে, এই সিইও-র ব্যক্তিগত সহকারী হওয়া মানে হলো জীবন্ত নরকে পা রাখা। গত তিন মাসে পনেরোজন পিএ-র চোখের জল এই করিডোরের ধুলোয় মিশে আছে।

চেম্বারের দরজার কাছে পৌঁছাতেই ভেতর থেকে সেই গম্ভীর, কর্কশ কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
“মিস আকারি, আপনি দুই মিনিট চল্লিশ সেকেন্ড আগে এসেছেন। আপনার পাংচুয়ালিটি প্রশংসনীয়, কিন্তু আমার রুমে ঢোকার আগে আপনাকে পারমিশন নিতে হবে—তা সে এক সেকেন্ড আগেই হোক না কেন।”

নোবারা থমকে দাঁড়ালো। দরজার কাঁচের ওপাশে জেনিন নূরশাদ বসে আছে। তার চোখের সামনে তিনটি কম্পিউটার স্ক্রিন খোলা, হাতে এক কাপ কালো কফি। জেনিন আজ নেভি ব্লু কালারের একটি স্যুট পরেছে‌। চোখে মুখে কাঠিন্য।

“আসতে পারি স্যার?” নোবারার কণ্ঠে কোনো ভয় নেই, কেবল পেশাদারিত্ব।

“আসুন।” জেনিন মাথা তুলল না।

নোবারা ভেতরে ঢুকে জেনিনের টেবিলের উল্টো দিকে দাঁড়ালো। জেনিন একটা ফাইল তার দিকে ছুড়ে দিল। ফাইলটা টেবিলের ওপর দিয়ে পিছলে গিয়ে ঠিক নোবারার পেটের কাছে এসে থামল।
“এটি আজকের শিডিউল। দশটা থেকে মিটিং শুরু। বারোটায় ইনভেস্টরদের সাথে লাঞ্চ। আর এই ফাইলটিতে গত তিন বছরের অডিট রিপোর্ট আছে। আমি চাই আপনি পরবর্তী এক ঘণ্টার মধ্যে এর একটি সামারি তৈরি করবেন। মনে রাখবেন, একটি সংখ্যাও যদি ভুল হয়, তবে আপনার প্রথম দিনই শেষ দিন হবে।”

নোবারা ফাইলটা তুলে নিল। “জি স্যার।”

“অপেক্ষা করছেন কেন? আপনার ডেস্ক বাইরে। যান।” জেনিনের গলার স্বর এতটাই রুক্ষ যে সাধারণ কেউ হলে হয়তো সেখানেই কেঁদে ফেলত।

নোবারা বেরিয়ে যাওয়ার পর জেনিন চেয়ারে হেলান দিল। তার ভেতরের ইগো তাকে বারবার বলছে, ওকে কষ্ট দে জেনিন। ওকে বুঝিয়ে দে তুই এখন আর সেই বখাটে ছেলেটি নোস যাকে সে দয়া করত। জেনিন তার হাতের আঙুলগুলো মটকালো। সে এক ধরণের পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছে নোবারাকে শাসন করে। কিন্তু অবচেতনে সে চায় নোবারা যেন তার প্রতিটি আদেশ মুখ বুজে সহ্য করে তার পাশেই থেকে যায়।

এক ঘণ্টা পার হলো। নোবারা ঠিক এগারোটার সময় চেম্বারে ঢুকল। তার হাতে তিন পাতার একটি নিঁখুত রিপোর্ট। সে জেনিনের সামনে সেটা রাখল। জেনিন খুব খুঁটিয়ে প্রতিটি লাইন দেখল। সে চেয়েছিল একটা ভুল বের করতে, যাতে সে চিৎকার করতে পারে। কিন্তু নোবারার কাজ ছিল নিখুঁত। একবারে নির্ভুল।

জেনিন রিপোর্টটা সরিয়ে রেখে নোবারার দিকে শীতল চোখে তাকালো।
“রিপোর্ট ঠিক আছে। কিন্তু আপনার দাঁড়ানোর ভঙ্গি আমার পছন্দ হয়নি। পিএ হিসেবে আপনাকে সবসময় সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। আর শুনুন, আমার কফি চাই। চিনি ছাড়া, একদম কড়া ব্ল্যাক কফি। তাপমাত্রা যেন ঠিক সত্তর ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়। যান।”

নোবারা কফি নিয়ে এল। জেনিন এক চুমুক দিয়েই কফিটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল।

“এটা বেশি গরম। সত্তর ডিগ্রি মানে সত্তর ডিগ্রিই। আমি আপনাকে সায়েন্সের থিওরি শোনাতে আসিনি। আবার যান।”

পুরো দিন ধরে জেনিন নোবারাকে দিয়ে অমানুষিক খাটুনি খাটালো। একবার ফাইল রি-অ্যারেঞ্জ করানো, একবার পুরোনো আর্কাইভ থেকে দশ বছরের পুরনো রিপোর্ট খুঁজে আনা, এমনকি জেনিনের ব্যক্তিগত গাড়ি পরিষ্কার করার তদারকি পর্যন্ত। জেনিন চেয়েছিল নোবারা যেন ভেঙে পড়ে, সে যেন জেনিনের সামনে এসে হাতজোড় করে বলে, ‘স্যার, আমি আর পারছি না।’ কিন্তু নোবারা এক ফোঁটা চোখের জলও ফেলল না। সে প্রতিটি কাজ করল রোবটের মতো নিঁখুতভাবে।

লাঞ্চের সময় জেনিন তাকে বাইরে যেতে দিল না। সে নোবারাকে তার চেম্বারে দাঁড়িয়ে থেকে ফাইল রিড করতে বাধ্য করল, যখন জেনিন নিজে দামী লাঞ্চ করছিল। এটি ছিল চরম এক অবমাননা।
“মিস আকারি, আপনি কি ক্ষুধার্ত?” জেনিন একটি মাংসের টুকরো মুখে তুলে জিজ্ঞেস করল।

“না স্যার। কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমার ক্ষুধা লাগে না।” নোবারার উত্তর ছিল সটান।

জেনিন হাসল। এক বিদ্রূপাত্মক হাসি। “বাহ! বেশ তেজ দেখছি। দেখা যাক এই তেজ কতদিন থাকে। আমার এই অফিসে আবেগ বা ব্যক্তিগত জীবনের কোনো স্থান নেই। আপনার বাড়ির কেউ যদি মরেও যায়, অফিস আওয়ার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনি বের হতে পারবেন না। ক্লিয়ার?”

নোবারা শুধু বলল, “ক্লিয়ার স্যার।”

অফিস ছুটি হওয়ার পর রাত আটটা। সবাই চলে গেছে। শুধু জেনিনের চেম্বারের আলো জ্বলছে। নোবারা তখনো তার ডেস্কে বসে টাইপ করছে। জেনিন তার ঘর থেকে বেরিয়ে এল। সে দেখল নোবারার চোখ দুটো ক্লান্তিতে লাল হয়ে গেছে, কিন্তু তার হাত চলছে দ্রুত গতিতে।

জেনিন ধীর পায়ে নোবারার ডেস্কে গিয়ে দাঁড়ালো। সে তার পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে নোবারার কি-বোর্ডের ওপর রাখল। এটি কোনো মায়ার দান নয়, এটি জেনিনের এক ধরণের ‘পাওয়ার প্লে’।

“সারাদিন তো কিছুই খেলেন না। এটা খান। কাল যেন আবার অসুস্থ হয়ে ছুটি না চান।” জেনিনের কণ্ঠে তখনো সেই ইগোর সুর।

নোবারা চকলেটের দিকে তাকালো না। সে উঠে দাঁড়ালো। “ধন্যবাদ স্যার। কিন্তু আমার ডিউটি শেষ। কাল সকাল নয়টায় আবার দেখা হবে।”

নোবারা ব্যাগ নিয়ে লিফটের দিকে চলে গেল। জেনিন একা দাঁড়িয়ে রইল অন্ধকার করিডোরে। তার নিজের দেওয়া চকলেটটি টেবিলের ওপর পড়ে আছে, ঠিক যেমন তার শৈশবটা অবহেলায় পড়ে ছিল। জেনিনের হঠাৎ মনে হলো, সে যত বেশি নোবারাকে আঘাত করছে, আঘাতটা আসলে তার নিজের বুকেই এসে লাগছে।

সে তার চেম্বারে ফিরে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। সে দেখল তার চেহারায় আভিজাত্য আছে, ক্ষমতা আছে, কিন্তু ভেতরে সেই পুরনো জেনিনটা ডুকরে কাঁদছে। সে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবিকে লক্ষ্য করে বলল—
“কেন ও একবারও প্রতিবাদ করল না? কেন ও একবারও বলল না যে আমি বদলে গেছি? ও কি তবে সত্যিই আমাকে চিনতে পারেনি?”

জেনিনের এই রুড বিহেভিয়ার আসলে এক ধরণের আত্মরক্ষা। সে জানে, যদি সে একবার নরম হয়, তবে নোবারার প্রতি তার সেই পজেসিভ ভালোবাসা তাকে আবার নিয়ন্ত্রণহীন করে দেবে।

পরের দিনগুলোতে জেনিন তার অত্যাচারের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিল। সে নোবারাকে দিয়ে অফিসের ড্রয়িং রুম পরিষ্কার করালো, তাকে দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৃষ্টিতে ভিজে ট্যাক্সি ডাকালো, এমনকি মাঝরাতে ফোন করে অপ্রয়োজনীয় ফাইলের খোঁজ নিতে থাকল। জেনিন দেখতে চাইল নোবারার ধৈর্য কতটা।

কিন্তু জেনিন যা জানত না, তা হলো নোবারার এই ফিরে আসার পেছনে কেবল চাকরি ছিল না। নোবারার শান্ত চোখের গভীরে ছিল এক বিশাল রহস্য। সে যখন জেনিনের ধমক শুনছিল, তখন সে মনে মনে জেনিনের প্রতিটি চলাফেরা, তার লকারের পাসওয়ার্ড আর তার অফিসের গোপন ফাইলগুলোর হদিস নিচ্ছিল।

একদিন জেনিন লক্ষ্য করল নোবারা তার টেবিলের ওপর রাখা সেই পুরনো সিল্কের রুমালটা সরিয়ে রাখছে ফাইল রাখার জন্য। জেনিন চিতার মতো গর্জে উঠল। সে নোবারার কব্জি চেপে ধরল।
“হাত সরাও! এই রুমাল ছোঁয়ার সাহস তোমাকে কে দিয়েছে?” জেনিনের চিৎকার পুরো ফ্লোরে প্রতিধ্বনিত হলো।

নোবারা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল, কিন্তু তার চোখে এবার এক পলকের জন্য একটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি খেলে গেল।
“আমি শুধু ফাইল রাখছিলাম স্যার। এই সামান্য ময়লা কাপড়ের জন্য আপনি আমার গায়ে হাত দিচ্ছেন?”

“এটা ময়লা কাপড় নয়! এটা আমার জীবন!” জেনিন তার ইগো ভুলে এক মুহূর্তের জন্য আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল। সে সাথে সাথে নোবারার কব্জি ছেড়ে দিয়ে রুমালটা বুকের কাছে জাপটে ধরল।

নোবারা তার লাল হয়ে যাওয়া কব্জির দিকে তাকালো। সে খুব ধীর গলায় বলল, “আপনি বড্ড অদ্ভুত মানুষ স্যার। আপনি মানুষকে ভালোবাসতে পারেন না, কিন্তু পুরনো রক্তমাখা কাপড়কে বুকে জড়িয়ে রাখেন। আপনার কি কোনোদিন মনে হয় না যে আপনি আসলে খুব একা?”

জেনিন স্তব্ধ হয়ে গেল। পনেরো বছর পর কেউ তাকে এই প্রশ্নটি করল। সে নোবারার দিকে তাকালো। নোবারার চোখে এখন আর ভয় নেই, আছে এক গভীর করুণা। জেনিনের ইগোতে এই করুণা তীরের মতো বিঁধল।

“একা? আমার হাতে ক্ষমতা আছে, টাকা আছে। আমার এক ডাকে শত শত মানুষ জীবন দিতে পারে।” জেনিন দম্ভের সাথে বলল।

“মানুষ জীবন দিতে পারে ভয়ে, ভালোবাসায় নয়।” নোবারা শান্তভাবে ফাইলগুলো গুছিয়ে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

জেনিন তার চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়ল। তার পুরো শরীর কাঁপছে। নোবারার প্রতিটি শব্দ তার পাথুরে হৃদয়ে ফাটল ধরাচ্ছে। জেনিন বুঝতে পারল, সে যত বেশি নোবারাকে তার ক্ষমতার খাঁচায় বন্দী করতে চাইছে, নোবারা তার চেয়েও বেশি তাকে সত্যের আয়নায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।
সেদিন রাতে জেনিন ঘুমাতে পারল না। তার মাথায় কেবল নোবারার সেই কথাগুলো ঘুরছিল, ‘আপনি আসলে খুব একা।’ জেনিন চিৎকার করে তার হাতের গ্লাসটা ফ্লোরে আছড়ে ভাঙল।

“আমি একা নই! আমি একা হতে পারি না! নোবারা, তুমি আমার কাছে ফিরে এসেছো, তোমাকে আমি বুঝিয়ে দেব জেনিন নূরশাদ কী জিনিস। তুমি আমাকে ঘৃণা করবে, তুমি আমাকে ভয় পাবে, কিন্তু তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে পারবে না!”

জেনিন সিদ্ধান্ত নিল, সে নোবারাকে আরও বেশি কষ্ট দেবে। সে তাকে এমন এক পরিস্থিতির মুখে ফেলবে যে নোবারা বাধ্য হবে জেনিনের কাছে মাথা নত করতে। জেনিন নূরশাদের ইগো এখন এক জেদে পরিণত হয়েছে। সে আর প্রেম চায় না, সে চায় আত্মসমর্পণ।

পরদিন সকালে জেনিন অফিসে এল এক নতুন পরিকল্পনা নিয়ে। সে ঠিক করল নোবারাকে সে তার ব্যক্তিগত ভিলায় নিয়ে যাবে ‘অফিস কনফারেন্স’-এর দোহাই দিয়ে। সেখানে নোবারা থাকবে জেনিনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে।

<><><><><><><><><>

নূরশাদ ভিলা। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, সমুদ্রের নোনা বাতাস আর ঘন পাইন গাছের আড়ালে ঢাকা এক বিশাল প্রাসাদ। এই প্রাসাদটি জেনিন নূরশাদের নিজের হাতে গড়া, বাইরে থেকে রাজকীয়, কিন্তু ভেতরে এক হিমশীতল শূন্যতা। জেনিনের ইগো আর আভিজাত্যের চূড়ান্ত প্রতিফলন এই বাড়িটি। এখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষেধ। এমনকি জেনিনের অফিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও এখানে আসার অনুমতি পায় না। কিন্তু আজ এই ভিলার গেট খুলে দেওয়া হয়েছে কেবল একজনের জন্য, নোবারা আকারি।

জেনিন তার ব্ল্যাক মার্সিডিজের পেছনের সিটে বসে ছিল। তার পাশে নোবারা। গত চল্লিশ মিনিটের যাত্রায় জেনিন একটি কথাও বলেনি। সে শুধু ল্যাপটপে ফাইল দেখছিল, কিন্তু তার পুরো মনোযোগ ছিল নোবারার ওপর। নোবারা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। তার শান্ত মুখচ্ছবি দেখে জেনিনের ভেতরে একটা অদ্ভুত ক্রোধ জন্ম নিচ্ছিল। কেন ও ভয় পাচ্ছে না? কেন ও আমাকে একবারও জিজ্ঞেস করছে না আমরা কোথায় যাচ্ছি?

গাড়ি যখন ভিলার পোর্টিকোয় এসে থামল, জেনিন ধীর পায়ে নামল। সে নোবারার দিকে না তাকিয়েই বলল, “নামুন। আজকের বাকি কাজগুলো এখানেই হবে। আমার কিছু কনফিডেনশিয়াল ফাইল আছে যা অফিসের ভিড়ে হ্যান্ডেল করা সম্ভব নয়।”

নোবারা নেমে দাঁড়িয়ে প্রাসাদের দিকে তাকালো। “এটি কি আপনার আবাসন, স্যার?”

“এটি আমার দুর্গ,” জেনিন তীক্ষ্ণ স্বরে বলল। “আর আজকের পর থেকে এটিই আপনার কর্মস্থল। অফিসের পিএ পদের চেয়েও বড় একটি দায়িত্ব আমি আপনাকে দিতে যাচ্ছি। আমার ‘পার্সোনাল এক্সিকিউটিভ’। যার অর্থ, আপনি চব্বিশ ঘণ্টা আমার অধীনে থাকবেন। আমার ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতের ডিনার পর্যন্ত প্রতিটি শিডিউল আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। বিনিময়ে আপনার বেতন হবে দশগুণ।”

নোবারার চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় খেলে গেল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। “চব্বিশ ঘণ্টা? আমার কি কোনো ব্যক্তিগত জীবন থাকবে না?”

জেনিন নোবারার খুব কাছে এগিয়ে এল। তার শরীরের দামী পারফিউমের কড়া ঘ্রাণ নোবারার নাসারন্ধ্রে ধাক্কা দিল। জেনিন নোবারার চোখের গভীরে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল, “নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিতে যারা কাজ করে, তাদের ব্যক্তিগত জীবন বলে কিছু থাকে না। আর আপনি তো আমার বিশেষ সহকারী। আপনার ব্যক্তিগত জীবন হবে কেবল আমার এই শিডিউলগুলো। ক্লিয়ার?”

জেনিনের এই পসেসিভনেস এখন আর স্রেফ অফিসের বসগিরি নেই। এটি এক ধরণের আধিপত্য বিস্তার। সে চায় নোবারাকে এই বিশাল দুনিয়া থেকে আলাদা করে তার এই প্রাসাদে বন্দি করতে। নোবারা কিছু বলতে চেয়েও থেমে গেল। সে জেনিনের পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকল।

ভিলার ভেতরটা আরও বেশি গম্ভীর। প্রতিটি দেয়ালে দামী তৈলচিত্র, কিন্তু সেগুলোর রঙ অন্ধকার। জেনিন নোবারাকে তার স্টাডি রুমে নিয়ে গেল। সেখানে মেহগনি কাঠের বিশাল টেবিল আর চারদিকে বইয়ের তাক। জেনিন টেবিলের ওপর একটি লাল রঙের ফোল্ডার রাখল।
“এটি আপনার চূড়ান্ত নিয়োগপত্র। এখানে সই করার মানে হলো, পরবর্তী দুই বছর আপনি এই ভিলা এবং আমার অফিস ছাড়া কোথাও যেতে পারবেন না। আপনার ফোনটি এখন থেকে আমার কাছে জমা থাকবে। আপনার যোগাযোগের জন্য আমি একটি বিশেষ ডিভাইস দেব, যা কেবল আমার সাথে কানেক্টেড থাকবে।”

নোবারা ফাইলটা হাতে নিল। “এটি তো চাকরির চুক্তি নয় স্যার, এটি তো দাসত্বের দলিল।”

জেনিন শব্দ করে হাসল। এক নিষ্ঠুর, শীতল হাসি। “দাসত্ব? না মিস আকারি, এটাকে বলে এক্সক্লুসিভিটি। আমি সাধারণ জিনিস পছন্দ করি না। আমার যা কিছু প্রিয়, তা আমি একান্ত নিজের কাছে রাখতে পছন্দ করি। আপনি মেধাবী, আপনি নিঁখুত। আর আমার এমন কাউকেই প্রয়োজন যে আমার এই একাকীত্বের সাম্রাজ্যে আমার ছায়া হয়ে থাকবে।”

জেনিন নোবারার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। তার লম্বা ছায়াটা নোবারার ওপর পড়ল। “সই করুন। নতুবা কাল থেকে এই শহরে আপনার জন্য কোনো দরজা খোলা থাকবে না। আমি চাইলে আপনাকে এক মুহূর্তের ভেতর রাস্তা নামিয়ে দিতে পারি, আবার চাইলে এই প্রাসাদের রানী করে রাখতে পারি। সিদ্ধান্ত আপনার।”

জেনিনের এই রুড ব্যবহার ছিল এক ধরণের পরীক্ষা। সে দেখতে চাইছিল নোবারা তার এই চরম প্রস্তাব মেনে নেয় কি না। নোবারা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর সে কলমটা তুলে নিল। জেনিন ভাবল নোবারা হয়তো তর্কে জড়াবে, কিন্তু নোবারা খুব নিঁখুতভাবে চুক্তির প্রতিটি পাতায় সই করল।
জেনিনের ইগোতে এক ধরণের প্রশান্তি এল। সে সফল। সে নোবারাকে তার সীমানার ভেতর আটকে ফেলেছে। কিন্তু সে লক্ষ্য করল নোবারার হাতটা কাঁপছে না। সই করার পর নোবারা ফাইলটা জেনিনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল—
“আমি সই করেছি স্যার। কারণ আমার এই চাকরিটা খুব প্রয়োজন। কিন্তু মনে রাখবেন, আপনি আমাকে খাঁচায় রাখতে পারেন, কিন্তু আমার চিন্তাকে নয়।”

জেনিন ফাইলটা এক ঝটকায় কেড়ে নিল। “আপনার চিন্তা নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই মিস আকারি। আমার প্রয়োজন আপনার উপস্থিতি। এখন যান, আপনার রুম উপরের তলায়। বাম দিকের শেষ ঘরটি। সেখানে আপনার প্রয়োজনীয় সব কিছু রাখা আছে। রাত নয়টায় ডিনার টেবিলে আপনার সাথে আমার দেখা হবে। সেই সময় আমাদের আগামীকালের রোডম্যাপ নিয়ে আলোচনা হবে।”

নোবারা চলে যাওয়ার পর জেনিন তার চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়ল। সে জাঁকজমকপূর্ণ এই ঘরে আজ নিজেকে খুব বিজয়ী মনে করছে। পনেরো বছর আগে যে ছেলেটি ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে হেরে গিয়েছিল, আজ সে জিতেছে। সে নোবারাকে তার প্রাসাদে নিয়ে এসেছে। এখন থেকে সে প্রতিদিন নোবারাকে চোখের সামনে দেখবে।

রাতের ডিনার টেবিল। পনেরো ফুট লম্বা টেবিলের দুই প্রান্তে দুজন বসে আছে। জেনিন দামী ওয়াইন গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে আর নোবারা তার সামনের প্লেটের দিকে তাকিয়ে আছে। চারদিকে নিস্তব্ধতা। কেবল কাঁটা-চামচের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।

“খাবার পছন্দ হয়নি?” জেনিন নীরবতা ভাঙল।
“আমি সাধারণ খাবার পছন্দ করি স্যার। এই রাজকীয় আয়োজন আমার সহ্য হয় না।”

“অভ্যেস করে নিন। নূরশাদ ভিলার প্রতিটি জিনিসই রাজকীয়। এখানে দারিদ্র্যের কোনো স্থান নেই। এমনকি আপনার চিন্তা ভাবনাকেও এখন থেকে দামী করতে হবে।” জেনিন গ্লাসটা নামিয়ে রেখে বলল।

“দামী চিন্তা মানে কি মানুষের ওপর আধিপত্য বিস্তার করা স্যার?” নোবারার প্রশ্নে বিদ্রূপ ছিল।
জেনিন তার চেয়ার থেকে উঠে নোবারার দিকে হেঁটে এল। সে নোবারার ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো। তার হাত দুটো নোবারার চেয়ারের হাতলে। সে ঝুঁকে পড়ে নোবারার কানের কাছে মুখ নিয়ে গেল।

“আধিপত্য নয় মিস আকারি, এটাকে বলে নিয়ন্ত্রণ। আমি যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, তা আমি ধ্বংস করে দেই। আপনি এখন আমার নিয়ন্ত্রণে। তাই সুস্থভাবে বাঁচতে চাইলে আমার অবাধ্য হবেন না। কাল সকাল আটটায় আমার জিম সেশনে আপনার উপস্থিতি চাই। আমার ওয়ার্কআউট ডায়েরি আপনাকে মেইনটেইন করতে হবে।”

নোবারা ঘাড় ঘুরিয়ে জেনিনের দিকে তাকালো। তাদের দূরত্ব এখন কয়েক ইঞ্চির। জেনিন দেখল নোবারার চোখে রাগ নয়, বরং এক ধরণের রহস্যময় হাসি।

“আপনি বড্ড একা জেনিন নুরশাদ। আপনার এই প্রাসাদ, এই ক্ষমতা, সবকিছুই আসলে একটা বিশাল দেয়াল যা আপনি নিজের চারপাশে তুলেছেন যাতে কেউ আপনার ভেতরে পৌঁছাতে না পারে।”

জেনিন স্তব্ধ হয়ে গেল। পনেরো বছর পর কেউ তাকে নাম ধরে ডাকল, ‘জেনিন নুরশাদ’। তার পুরো শরীরে একটা শিহরণ বয়ে গেল। কিন্তু সে তার ইগোকে হারতে দিল না। সে নোবারার চুলগুলো এক হাত দিয়ে একটু সরিয়ে দিল।
“আমার ভেতরে পৌঁছানোর রাস্তা আমি অনেক আগেই বন্ধ করে দিয়েছি। এখন শুধু আমি অন্যদের ভেতরে ঢুকি। কাল সকাল আটটা। মনে থাকে যেন।”

জেনিন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার বুকটা তখন হাপরের মতো ওঠানামা করছে। নোবারার মুখে নিজের নাম শুনে সে যেন পনেরো বছর আগের সেই স্টেশনে ফিরে গিয়েছিল। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। সে নিজেকে মনে করিয়ে দিল যে সে এখন আর সেই জেনিন নয়। সে এখন নূরশাদ সাম্রাজ্যের অধিপতি।

অতীতের সেই বন্ধুত্বের রেশ এখন এক বিষাক্ত পসেসিভনেসে পরিণত হয়েছে। জেনিন নূরশাদ এখন এক নিষ্ঠুর বাজপাখি, যে তার শিকারকে আগলে রেখেছে নিজের নখর দিয়ে। আর নোবারা? সে কি স্রেফ এক বন্দি পাখি? নাকি সে এই প্রাসাদের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য আসা এক অদৃশ্য শক্তি?

চলবে ইংশাআল্লাহ…….

(খেলা তো এখন শুরু হবে বিচ্ছুরা🔥 রেসপন্স আশা করছি কিন্তু!)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here