Soulmate_to_Enemy #পর্ব_২০

0
2

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_২০
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

জেনিন নূরশাদ আজ অস্বাভাবিকভাবে শান্ত। সে তার প্রিয় ইজি চেয়ারে বসে একটি পুরনো রেকর্ড প্লেয়ারে ভিনাইল ডিস্ক চালিয়ে দিয়েছে। ঘরের বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে বেঠোফেনের এক বিষাদময় সুর। জেনিনের হাতে কোনো বন্দুক নেই, কোনো ফাইল নেই, আছে কেবল এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি। কিন্তু তার চোখের সেই নীলচে আভা আজ অন্যদিনের চেয়েও বেশি তীক্ষ্ণ, যেন সে কোনো শিকারের শেষ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছে।

নোবারা রান্নাঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিল রহমত চাচাকে। এই বৃদ্ধ মানুষটি এই ভিলায় জেনিনের বাবার আমল থেকে আছে। নোবারার কাছে রহমত চাচা কেবল একজন রাঁধুনি নন, বরং তিনি এই নির্দয় প্রাসাদের একমাত্র মায়াবী আশ্রয়। নোবারা যখনই মন খারাপ করে রান্নাঘরে যেত, রহমত চাচা তার জন্য নিজের হাতে দুধ-চা বানিয়ে দিতেন আর বলতেন, “বেটি, এই পাথুরে শহরে মায়া হারাস না।” নোবারা এই বৃদ্ধ মানুষটির মধ্যে তার হারানো বাবার ছায়া খুঁজে পায়। আজ রহমত চাচা খুব মনোযোগ দিয়ে জেনিনের প্রিয় সুপ বানাচ্ছেন। তার হাত কাঁপছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।

ইউজি আজ জেনিনের পাশে নেই, সে রান্নাঘরের দরজার আড়ালে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটি ট্যাবলেট পিসি, যেখানে কিছু অডিও ফাইল আর সিসিটিভি ফুটেজ লুপে চলছে। ইউজির চোয়াল শক্ত। সে জেনিনের নির্দেশের অপেক্ষা করছে। সে জানে, নূরশাদ ভিলার পবিত্রতায় যখনই কেউ বিষ মেশায়, জেনিন নূরশাদ তাকে এই পৃথিবীর আলো দেখতে দেয় না। কিন্তু এবারের শত্রুটা বাইরের কেউ নয়, ভেতরের সবচাইতে বিশ্বস্ত মানুষ।

নোবারা হাসিমুখে রান্নাঘরে ঢুকল। “চাচা, আজ সুপে একটু গোলমরিচ বেশি দিয়েন তো। আমাদের স্যারের বোধহয় সর্দি লেগেছে।”

রহমত চাচা চমকে উঠলেন। তার হাতের চামচটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। তিনি ম্লান হেসে বললেন, “দিব রে বেটি, সব ঠিকঠাক দিব। তুই যা, স্যারের পাশে গিয়ে বোস।”

নোবারা রহমত চাচার অস্থিরতা খেয়াল করল না। সে জেনিনের ড্রেসিং রুম থেকে একটা শাল নিয়ে ড্রয়িংরুমে এল। জেনিন তখনো সেই একই ভঙ্গিতে বসে। নোবারা শাড়ি সামলে জেনিনের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো এবং তার কাঁধে শালটা জড়িয়ে দিল।
“আপনি কি অসুস্থ? আজ কেন জানি খুব ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে আপনাকে,” নোবারা খুব নিচু স্বরে বলল। তার কণ্ঠে আজ কোনো ঘৃণা নেই, বরং এক বিচিত্র মমতা।

জেনিন কফির কাপটা টেবিলে রাখল। “আমি অসুস্থ নই নোবারা, আমি কেবল আজ এক অদ্ভুত সত্যের মুখোমুখি। আপনি জানেন কি, এই পৃথিবীতে সবচাইতে বিষাক্ত জিনিস কোনটি?”

নোবারা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। “কী? সায়ানাইড?”

জেনিন হাসল। এক করুণ, ভয়ংকর হাসি। “না। সবচাইতে বিষাক্ত হলো ‘লবণ’। যে মানুষের নুন আপনি খেয়েছেন, সেই মানুষটিই যদি আপনার খাবারে বিষ মিশিয়ে দেয়, তবে সেই লবণের স্বাদ সায়ানাইডের চেয়েও বিষাক্ত হয়।”

নোবারা জেনিনের কথাগুলো বুঝতে পারল না। সে ভাবল জেনিন হয়তো ব্যবসায়িক কোনো বিশ্বাসঘাতকতার কথা বলছে। ঠিক তখনই রহমত চাচা ট্রলি করে সুপ আর হালকা নাস্তা নিয়ে ঢুকলেন। তার মুখটা ফ্যাকাশে, হাত কাঁপছে। জেনিন এক দৃষ্টিতে রহমত চাচার দিকে তাকিয়ে রইল। সেই চাউনিতে এত বেশি আতঙ্ক ছিল যে রহমত চাচা ট্রলিটা রাখতে গিয়ে হোঁচট খেলেন।
“স্যার… আপনার সুপ,” রহমত চাচা মাথা নিচু করে বললেন।

জেনিন সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। সে সুপের বাটিটার দিকে একবার তাকালো, তারপর রহমত চাচার চোখের দিকে। “চাচা, আপনি এই বাড়িতে কত বছর আছেন?”

“পঁচিশ বছর সাহেব। আপনার বাবার সময় থেকে,” রহমত চাচা কাঁপা গলায় উত্তর দিলেন।

“পঁচিশ বছর।” জেনিন সুপের বাটিটা হাতে নিল। “অনেকটা সময়! একটা মানুষের ওপর বিশ্বাস তৈরি হওয়ার জন্য পঁচিশ বছর যথেষ্ঠ সময়। তাহলে জেকলিন্সের সাথে আপনার এই গোপন সখ্যতা কতদিনের?”

শব্দটা শোনামাত্র নোবারার পায়ের তলার মাটি সরে গেল। নোবারা অবিশ্বাসে রহমত চাচার দিকে তাকালো। রহমত চাচা ধপ করে মেঝেতে বসে পড়লেন। তার শরীর থরথর করে কাঁপছে।
“সাহেব… আমি… আমার নাতিটা হাসপাতালে। ওরা ওকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিল। ওরা আমাকে এক প্যাকেট সাদা গুঁড়ো দিয়ে বলেছিল এটা আপনার সুপে মিশিয়ে দিতে। আমি জানতাম না এটা বিষ! আমি ভেবেছিলাম ওটা কেবল আপনাকে অসুস্থ করার জন্য,” রহমত চাচা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।

জেনিনের চোখে এখন সেই আদিম মাফিয়া সত্তা জেগে উঠেছে। সে জগতের সকল অন্যায় অবিচার সহ্য করতে পারে, তবে বিশ্বাসঘাতকতা কখনোই না! সে ইউজিকে ইশারা করল। ইউজি পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে এল এবং টেবিলের ওপর ট্যাবলেটটি রাখল। সেখানে একটি অডিও রেকর্ড বাজছে, রহমত চাচা জেকলিন্সের এক এজেন্টের সাথে কথা বলছেন।
“আমি সব করে দেব, শুধু আমার নাতির অপারেশনটা হতে দিন। জেনিনরে মারতে পারলে কি আপনারা নোবারা বেটিকে ছেড়ে দেবেন? ও তো কোনো দোষ করেনি।” রেকর্ডিংয়ে রহমত চাচার কণ্ঠ পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে।

ওপার থেকে উত্তর এল, “জেড মরলে নোবারা আমাদের কোনো কাজে লাগবে না। ওকে আমরা জেনিনের কবরের পাশেই পুঁতে দেব।”

রেকর্ডিংটা শোনার পর নোবারা স্তম্ভিত হয়ে গেল। সে দেখল রহমত চাচা তার নিরাপত্তার কথা ভেবে জেনিনকে মারতে রাজি হয়েছিলেন, কিন্তু পরক্ষণেই সে বুঝতে পারল রহমত চাচা আসলে এক ভয়ংকর ফাঁদে পা দিয়েছেন। তিনি জেনিনকে বিষ খাওয়ানোর চেষ্টা করেছেন।

“শুনলেন তো মিস আকারি?” জেনিন খুব শান্তভাবে রহমত চাচার সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। সে পকেট থেকে একটি ছোট খঞ্জর বের করল। “এই মানুষটি যাকে আপনি ‘চাচা’ ডাকেন, সে আজ আমার খাবারে বিষ মিশিয়েছে। আর সেই বিষের লক্ষ্য কেবল আমি ছিলাম না, লক্ষ্য আপনিও ছিলেন। কারণ আমি মরলে আপনাকে রক্ষা করার মতো এই পৃথিবীতে কেউ অবশিষ্ট থাকবে না।”

নোবারা চিৎকার করে উঠল। “না! ওনাকে মারবেন না! ওনাকে পুলিশে দিন, তবুও নিজ হাতে রক্ত মাখবেন না!”

জেনিন নোবারার দিকে তাকালো। তার চোখে এক ফোঁটা জলও নেই। “মাফিয়াদের জগতে কোনো দ্বিতীয় সুযোগ নেই মিস আকারি। বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি কেবল একটিই।”

জেনিন রহমত চাচার চুল মুঠি করে ধরল। রহমত চাচা আর্তনাদ করে উঠলেন। নোবারা ইউজির দিকে তাকালো সাহায্যের জন্য, কিন্তু ইউজি নির্লিপ্তভাবে তাকিয়ে আছে। তার কাছে জেনিনের আদেশই শেষ কথা।

“ইউজি, ড্রয়িংরুমের দরজা বন্ধ করো। নোবারা যেন বাইরে যেতে না পারে,” জেনিন গর্জে উঠল।

নোবারা দরজার দিকে দৌড়ালো, কিন্তু ইউজি তার পথ আগলে দাঁড়ালো। নোবারা ইউজিকে ধাক্কা দিল, তাকে কামড়ে দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু ইউজি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। সে নোবারাকে পেছনে সরিয়ে দিয়ে দরজা লক করে দিল।

ড্রয়িংরুমের ভেতর এখন এক বিভীষিকাময় পরিবেশ। জেনিন রহমত চাচার গলার কাছে খঞ্জরটা রাখল। নোবারা দুই হাতে কান চেপে মেঝেতে বসে পড়ল। সে শুনতে পাচ্ছিল রহমত চাচার সেই কাতর অনুনয় আর জেনিনের সেই শীতল নিশ্বাস।

“দয়া করুন! আমি আপনার পায়ে পড়ছি!” নোবারা চিৎকার করে কাঁদছিল। “আপনি যদি ওনাকে মারেন, তবে আমি আপনাকে কোনোদিন ক্ষমা করব না! আমি আপনাকে ঘৃণা করব জেনিন!”

জেনিন থামল না। সে রহমত চাচার কানে কানে ফিসফিস করে বলল, “চাচা, আপনি আমার নুন খেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু আপনি আমার ভালোবাসায় হাত দিয়েছেন। আপনার নাতি ভালো থাকবে, আমি কথা দিচ্ছি। কিন্তু আপনাকে আজ মরতে হবে।”

এক নিমেষে জেনিনের হাতের খঞ্জরটি রহমত চাচার গলার শিরা এফোঁড় ওফোঁড় করে দিল। রহমত চাচা কোনো শব্দ করার সুযোগ পেলেন না। কেবল গরম রক্ত ফিনকি দিয়ে জেনিনের সাদা শার্টে আর মেঝের ওপর ছড়িয়ে পড়ল। জেনিন রক্তমাখা হাতেই রহমত চাচার মৃতদেহটা মেঝেতে শুইয়ে দিল।

নোবারা হাত সরালো। সে দেখল মেঝেতে রহমত চাচার নিথর দেহ পড়ে আছে। রহমত চাচার সেই হাসিমাখা মুখটা এখন রক্তাক্ত এবং বীভৎস। যে মানুষটা একটু আগে তাকে চা বানিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিল, সে এখন এক তাল মাংসপিণ্ড। নোবারার মনে হলো তার চারপাশের আকাশটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। সে স্তব্ধ হয়ে সেই রক্তস্নাত জেনিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

জেনিন উঠে দাঁড়ালো। তার সারা মুখ আর হাত রক্তে মাখামাখি। সে নোবারার দিকে এগোতে চাইল। “ও আপনার ক্ষতি করতে চেয়েছিল, আর আমি..”

নোবারা পিছিয়ে গেল। তার চোখে এখন এক বিশাল আতঙ্ক। সে জেনিনকে দেখছে না, সে দেখছে এক পৈশাচিক দানবকে। “নিকৃষ্ট! আপনি এক জঘন্য নিকৃষ্ট খুনি! আপনি আপনার পঁচিশ বছরের বিশ্বস্ত লোকটাকে এভাবে মারলেন?”

নোবারার এই আর্তনাদ ড্রয়িংরুমের প্রতিটি কোণে হাহাকার তৈরি করল। জেনিন রক্তমাখা হাতটা বাড়িয়ে নোবারার গাল ছুঁতে চাইল, কিন্তু নোবারা সজোরে জেনিনকে একটা থাপ্পড় মারল। সেই রক্তমাখা থাপ্পড়টি জেনিনের মুখে নোবারার ঘৃণা হিসেবে লেপ্টে রইল। জেনিন চোখ বড় বড় করে তাকালো নোবারার দিকে। এই প্রথম কেউ তার গালে থাপ্পড় মারলো, তাও নোবারা! জেনিনের রাগ হলেও নোবারার ক্ষেত্রে সে তা সংযত করে নিল।

“আমাকে স্পর্শ করবেন না! আপনার শরীরে এখন রহমত চাচার রক্ত! আপনি আমাকেও মেরে ফেলুন জেনিন, তবুও এই পৈশাচিকতা আমি সহ্য করতে পারছি না!” নোবারা হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে মেঝের ওপর এলিয়ে পড়ল।

জেনিন নূরশাদ তার রক্তমাখা হাতটার দিকে তাকালো। সে নিজেকে সঠিক মনে করলেও নোবারার এই চোখে তাকে আজ পৃথিবীর সবচাইতে জঘন্য মানুষ বলে মনে হচ্ছে। ইউজি এগিয়ে এসে মৃতদেহটা সরিয়ে নেওয়ার তোড়জোড় করল, কিন্তু জেনিন তাকে থামিয়ে দিল।

জেনিন নূরশাদ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে, তার সাদা শার্টের আস্তিন থেকে টপটপ করে তাজা রক্ত মেঝেতে পড়ছে। তার মুখে নোবারার সেই চড়টির দাগ এখনো রক্তিম হয়ে ফুটে আছে। জীবনের সবচাইতে কঠিন লড়াইয়েও জেনিন কোনোদিন এমন অপদস্থ বোধ করেনি, কিন্তু নোবারার হাতের সেই আঘাতটি আজ তার ভেতরের মাফিয়া সম্রাটকে এক নিমেষে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।

নোবারা তখনো মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে আছে। তার চোখের জল রহমত চাচার লাশের পাশে জমা হওয়া রক্তের সাথে মিশে এক বীভৎস পরিবেশ তৈরি করেছে। তার শরীর কাঁপছে, আর কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসছে এক অমানুষিক আর্তনাদ। এই সেই রহমত চাচা, যে এই পৈশাচিক বাড়িতে নোবারার একমাত্র কথা বলার মানুষ ছিল। যে মানুষটি তাকে বাবার মতো যত্ন করত, আজ তার শরীরটাই জেনিনের খঞ্জরে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে আছে।

নোবারা হঠাৎ মাথা তুলল। তার চোখে এখন আর ভয় নেই, আছে এক অসীম ঘৃণা আর প্রতিবাদের আগুন। সে টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালো। জেনিন এক পা এগোতে চাইল, কিন্তু নোবারার সেই তীব্র চাউনি তাকে স্থির করে দিল।

“কাছে আসবেন না!” নোবারার কণ্ঠস্বর ড্রয়িংরুমের দেয়ালগুলোতে আছড়ে পড়ল। “আপনার এই রক্তমাখা হাত নিয়ে আমাকে ছোঁয়ার দুঃসাহস করবেন না জেনিন নূরশাদ! আপনি কি নিজেকে কি ভাবেন? কার প্রাণ থাকবে আর কার থাকবে না, সেই ফয়সালা করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?”

জেনিন খুব শান্তভাবে তার খঞ্জরটা টেবিলের ওপর রাখল। তার কণ্ঠস্বর ছিল ভাঙা এবং বিষাদগ্রস্ত। “নোবারা, ও বিষ মিশিয়েছিল। ও আমার শত্রুর সাথে হাত মিলিয়েছিল। আমি যদি আজ ওকে না মারতাম, তবে কাল সকালে আপনি বা আমি এই পৃথিবীতে থাকতাম না। মাফিয়াদের জগতে কোনো ক্ষমা নেই।”

“মাফিয়াদের জগত! বা|লের জগত!” নোবারা চিৎকার করে উঠল। সে মেঝের ওপর পড়ে থাকা একটি কাঁচের ফুলদানি তুলে নিয়ে সজোরে দেয়ালে আছড়ে মারল। কাঁচের টুকরোগুলো জেনিনের পায়ের কাছে ছড়িয়ে পড়ল। “আপনি তো কাপুরুষ জেনিন! আপনি একজন নিরস্ত্র বৃদ্ধ মানুষকে মারলেন? আপনি যদি এতই শক্তিশালী হতেন, তবে আপনার ঐ বা|লের শত্রুদের সরাসরি ধরতেন। রহমত চাচা নিরুপায় ছিলেন। ওনার নাতিকে ওরা জিম্মি করেছিল। উনি আপনাকে মারতে চাননি, উনি ওনার নাতিকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। আর আপনি? আপনি তো কেবল রক্ত চোষেন!”

ইউজি এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। সে নোবারার এই ধৃষ্টতা সহ্য করতে পারছিল না। সে এক পা এগিয়ে এসে বলল, “মিস আকারি, মুখ সামলে কথা বলুন। বস আপনার জান বাঁচিয়েছেন। ওই সুপটা আপনিও খেতে পারতেন..”

“আপনি মুখ বন্ধ করুন ইউজি!” নোবারা এবার ইউজির দিকে ফিরে গর্জে উঠল। “আপনি আর জেনিন নূরশাদ, দুজনেই একই মুদ্রার দুই পিঠ। আপনারা মানুষের লাশ দিয়ে নিজেদের রাজপ্রাসাদ সাজান। এই যে রহমত চাচার লাশটা দেখছেন, এটা কি আপনার চোখে কেবল একটা ডেটা? একটা ভুলের সংশোধন? উনি পঁচিশ বছর আপনাদের সেবা করেছেন! পঁচিশ বছর!”

নোবারা আবার জেনিনের দিকে ফিরল। সে জেনিনের খুব কাছে চলে এল, একদম তার বুকের কাছাকাছি। জেনিন দেখল নোবারার শাড়ির আঁচলেও রহমত চাচার রক্তের ছিটে লেগেছে। নোবারা জেনিনের শার্টের কলার খামচে ধরল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল নামছে, কিন্তু কণ্ঠস্বরে কোনো কম্পন নেই।

“জেনিন নূরশাদ, আপনি আজ আমার সেই পুরনো জেনিন ভাইয়াকেও চিরতরে মেরে ফেলেছেন। পনেরো বছর ধরে আমি যে জেনিনের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বেঁচে ছিলাম, সেই জেনিন আজ এই রক্তের বন্যায় ডুবে মরেছে। আপনি আমার চোখে একজন নিকৃষ্ট খুনি ছাড়া আর কিছু নন।”

জেনিন নোবারার হাতদুটো নিজের রক্তাক্ত হাতের ভেতরে নিতে চাইল। “নোবারা, আমি যা করেছি আপনার নিরাপত্তার জন্য করেছি। আমি সহ্য করতে পারব না কেউ আপনার সামান্যতম ক্ষতি করুক…”

নোবারা এক বিদ্রূপের হাসি হাসল। “আপনার এই নিরাপত্তার চেয়ে মৃত্যু অনেক বেশি সম্মানের। আপনি আমাকে খাঁচায় বন্দি করে রেখেছেন, আপনি আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছেন, আর এখন আপনি আমার আপনজনদের রক্ত ঝরাচ্ছেন। এর নাম নিরাপত্তা নয়, এর নাম সন্ত্রাস। আমি আপনার এই বাড়িতে আর এক মুহূর্তও থাকব না। আপনি আমাকে মারলে মেরে ফেলুন, কিন্তু আপনার এই ছায়ায় আমি আর নিশ্বাস নিতে পারছি না।”

নোবারা জেনিনকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। সে রহমত চাচার লাশের সামনে গিয়ে শেষবারের মতো বসল। সে চাচার সেই ঠান্ডা হয়ে আসা হাতটা ধরল। “চাচা, আপনি আমায় মাফ করে দিয়েন।”

জেনিন দেখল নোবারা নিজের ব্যাগ বা অন্য কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে সদর দরজার দিকে হাঁটা দিল। জেনিনের ইগো আজ চুরমার হয়ে গেছে, কিন্তু তার ভেতরের সেই পসেসিভ সত্তাটা এখনো জেগে আছে। সে ইউজিকে ইশারা করল।

“ইউজি, ওকে আটকাও।” জেনিনের গলাটা ফ্যাঁসফ্যাঁসে শোনালো।

ইউজি দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। নোবারা থামল না। সে ইউজির বুকের ওপর ধাক্কা মারল। “সরুন আমার পথ থেকে! না হলে আজ আমি নিজেকে শেষ করে ফেলব এই দরজার সামনে!”

জেনিন দৌড়ে এল। সে নোবারাকে পেছন থেকে জাপটে ধরল। নোবারা ছটফট করতে লাগল। সে জেনিনকে খামচে ধরল, তার রক্তমাখা শার্টে কামড় বসালো, কিন্তু জেনিন তাকে ছাড়ল না।

“আমাকে ছেড়ে দিন! আপনি কি মানুষ না সাইকো?” নোবারা আর্তনাদ করে উঠল।

“আমি সাইকোই নোবারা!” জেনিন এবার গর্জে উঠল। তার কণ্ঠে সেই আদিম উন্মাদনা। “আমি সাইকো বলেই আপনাকে এই জগত থেকে আগলে রাখি। আপনি বাইরে গেলে আমার শত্রুরা আপনাকে ছিঁড়ে খাবে। আমি আপনাকে যেতে দেব না। আপনি আমাকে ঘৃণা করেন? করুন। আপনি আমাকে অভিশাপ দেবেন? দিন। কিন্তু এই ভিলাই আপনার জগত।”

জেনিন নোবারাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। নোবারার কান্নায় পুরো ভিলা কাঁপছে। সে জেনিনের বুকে কিল-ঘুষি মারতে লাগল। জেনিন সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে লাগল। তার শার্টের রক্ত নোবারার গায়ে লেগে যাচ্ছে, যেন জেনিন তার অপরাধের কালি নোবারার গায়েও মাখিয়ে দিতে চাইছে।

জেনিন নোবারাকে তার ঘরে নিয়ে এসে বিছানায় ছুড়ে দিল। সে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বাইরে থেকে দরজা লক করে দিল। নোবারা দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল, তার চিৎকারে জানালার কাঁচগুলো যেন কেঁপে উঠছিল।
“জেনিন নূরশাদ! আমি আপনাকে কোনোদিন মাফ করব না! আমি মরতে চাই! আমাকে মেরে ফেলুন!”

জেনিন দরজার বাইরে দেয়ালে পিঠ দিয়ে বসে পড়ল। তার সারা শরীর রক্তে ভেজা। সে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল। ঘরের ভেতর থেকে নোবারার কান্নার শব্দ আসছিল, আর ড্রয়িংরুমের নিচতলা থেকে রহমত চাচার লাশ সরানোর শব্দ। জেনিন নিজের হাতদুটো দেখল। এই হাত দিয়ে সে কত মানুষকে মেরেছে তার কোনো হিসাব নেই। কিন্তু আজ প্রথমবার তার মনে হলো, সে নিজের আত্মাটাকেই নিজের হাতে খুন করেছে।

ইউজি উপরে উঠে এল। তার হাতে এক গ্লাস পানি। “বস, কাপড়টা বদলে নিন। পুলিশ আসার আগেই আমরা বডি ডিসপোজ করে দেব।”

জেনিন পানির গ্লাসটা নিল না। সে ইউজির দিকে তাকিয়ে খুব শান্তভাবে জিজ্ঞেস করল, “ইউজি, আমি কি সত্যিই খুব খারাপ?”

ইউজি এক মুহূর্ত থমকে গেল। সে কোনোদিন জেনিনকে এমন প্রশ্ন করতে দেখেনি। “বস, আপনি যা করেন তা আমাদের সার্ভাইভালের জন্য আর্জেন্ট। মাফিয়া হয়ে সাধারণ মানুষের মতো নীতিবাক্য শোনানো যায় না।”

“কিন্তু ও তো আমাকে মানুষ ভাবত ইউজি,” জেনিন ধরা গলায় বলল। সে নোবারার দরজার দিকে একবার তাকালো। “আজ থেকে ও আমাকে কেবল ভয় পাবে। ঘৃণা করবে। আমি কি কোনোদিন ওর সেই পুরনো জেনিন হতে পারব না?”

ইউজি কোনো উত্তর দিল না। সে জানে, জেনিন নূরশাদ আজ তার রাজত্বে সবচাইতে একাকী মানুষ। সে ক্ষমতা দিয়ে দুলারি কেনে, কিন্তু মমতা পায় না।

<><><><><><><><><>

নোবারা আকারি এক অন্য ধাতুতে গড়া। তার ঘরের ভেতর থেকে যে কান্নার শব্দ আসছিল, তা হঠাৎ থেমে গেছে। নোবারা মেঝের ওপর পড়ে থাকা ভাঙা ফুলদানির একটি ধারালো কাঁচ তুলে নিয়েছে। সে নিজের হাতে আঘাত করতে চায়নি, বরং সে এই খাঁচা ভাঙার সংকল্প করেছে। সে বুঝতে পেরেছে, জেনিন নূরশাদের ভালোবাসা মানেই মৃত্যু। সে যদি আজ না পালায়, তবে জেনিন একে একে তার সমস্ত আপনজনকে শেষ করে দিবে।

নোবারা তার আলমারি থেকে একটি কালো চাদর বের করল। সে তার দামী গয়না, জেনিনের দেওয়া উপহার, সবকিছু মেঝের ওপর ছুড়ে ফেলে দিল। সে কেবল তার মায়ের একটি ছোট ছবি আর ব্যাগে থাকা সামান্য কিছু টাকা নিল। তার ঘরটি ভিলার দ্বিতীয় তলায়। নিচে কড়া পাহারা, ইউজি নিজে মেইন গেটের মনিটরিং রুমে বসে আছে। কিন্তু নোবারা জানে, আজ রাতে জেনিনের ইগো তাকে দুর্বল করে দিয়েছে। জেনিন ভাবছে নোবারা অভিমানে ভেঙে পড়েছে, সে পালানোর কথা ভাবার শক্তি পাবে না।

নোবারা জানালার পর্দাগুলো ছিঁড়ে একটি লম্বা দড়ি তৈরি করল। তার হাত কাঁপছে, কিন্তু মনের ভেতরে রহমত চাচার সেই রক্তাক্ত মুখটা তাকে সাহস দিচ্ছে। সে জানালার গ্রিল দিয়ে সাবধানে দড়িটা বাঁধল। বাইরের বৃষ্টি আবার শুরু হয়েছে, যা নোবারার জন্য এক আশীর্বাদ হয়ে এল। বৃষ্টির শব্দে তার নড়াচড়া আড়াল হয়ে যাচ্ছে।

নোবারা যখন জানালা দিয়ে নিচে নামছে, তার পা পিচ্ছিল হয়ে যাচ্ছিল। তার পাতলা শাড়িটা বাতাসে উড়ছে। সে যখন মাটির কাছাকাছি পৌঁছাল, সে দেখল পেছনের বাগানের দিকে কোনো গার্ড নেই। জেনিন সাধারণত মেইন গেট আর ফ্রন্ট ইয়ার্ডে পাহারা দেয়, কারণ সে জানে নোবারা পেছনের জঙ্গলের দিকে যাবে না। নোবারা কর্দমাক্ত মাটির ওপর দিয়ে দৌড়াতে শুরু করল। তার পায়ে জুতো নেই, পাথরের আঘাতে তার তলা ছিলে যাচ্ছে, কিন্তু সে থামল না।

পেছনের জঙ্গলটা ঘন এবং অন্ধকার। নোবারার মনে হচ্ছিল প্রতিটি গাছ যেন জেনিন নূরশাদের একেকটা হাত, যা তাকে ধরার জন্য এগিয়ে আসছে। সে যখন জঙ্গলের কিনারে পৌঁছাল, তখন সে ভিলার লাইটগুলো দূর থেকে দেখতে পাচ্ছিল। হঠাৎ ভিলার সাইরেন বেজে উঠল।

“পালিয়েছে! মিস আকারি ঘরে নেই!” ইউজির চিৎকার জঙ্গল পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হলো।

জেনিন নূরশাদ নিজের ঘর থেকে গর্জন করে বেরিয়ে এল। “ইউজি! যদি ওকে খুঁজে না পাও, তবে আমি এই শহরের প্রতিটি ইঞ্চিতে আগুন ধরিয়ে দেব! ডগ স্কোয়াড বের করো! প্রতিটি রাস্তা ব্লক করো!”

জেনিনের কণ্ঠে আজ এক আদিম ভয়। সে বুঝতে পারছে তার হাতের মুঠো থেকে তার পৃথিবীটা ছিটকে যাচ্ছে। সে নিজেই একটি রাইফেল হাতে নিয়ে জঙ্গলের দিকে দৌড়ালো।

নোবারা তখন জঙ্গলের মাঝখানে একটি বড় গর্তের আড়ালে লুকিয়ে আছে। সে শুনতে পাচ্ছে জেনিনের বডিগার্ডদের বুটের শব্দ। টর্চের আলো বনের অন্ধকার চিরে নোবারার খুব কাছাকাছি চলে আসছে। নোবারা নিজের নিশ্বাস বন্ধ করে রাখল। তার চোখের সামনে দিয়ে ইউজি চলে গেল, হাতে তার সেই ভয়ংকর রিভলভার।

“মিস আকারি! আপনি একা এই রাত পার করতে পারবেন না! ফিরে আসুন!” ইউজির কণ্ঠস্বর বনের প্রতিটি পাতায় কাঁপন তুলল।

নোবারা সেখান থেকে উঠে অন্য দিকে দৌড়াতে শুরু করল। তার সামনে এখন হাইওয়ে। সে দেখল দূরে একটি ট্রাক আসছে। নোবারা মরণপণ দৌড় দিল। সে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুহাত নেড়ে ট্রাকটি থামানোর চেষ্টা করল। ট্রাক ড্রাইভার কড়া ব্রেক কষল।

“ভাই, দয়া করে আমাকে নিয়ে যান! আমার প্রাণ বিপন্ন!” নোবারা আর্তনাদ করে উঠল।

ট্রাক ড্রাইভার কিছু বোঝার আগেই নোবারা লাফ দিয়ে পেছনের খোলা অংশে উঠে পড়ল। ট্রাকটি আবার চলতে শুরু করল। ঠিক সেই মুহূর্তে বনের ভেতর থেকে জেনিন নূরশাদ বেরিয়ে এল। সে দেখল হাইওয়ে দিয়ে একটি ট্রাক দ্রুতবেগে চলে যাচ্ছে। জেনিনের চোখের ইনফ্রারেড চশমায় সে ট্রাকের পেছনের অংশে একটি পরিচিত ছায়া দেখতে পেল।

“নোবারা!” জেনিন এক ভয়ংকর চিৎকার দিল। সে ট্রাকের দিকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে চাইল, কিন্তু সে পারল না। যদি নোবারার গায়ে লাগে? জেনিন রাইফেলটা ছুড়ে মারল। সে রাস্তার ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার সারা শরীর বৃষ্টিতে ভেজা, দুচোখ দিয়ে অঝোরে জল নামছে।

“আপনি যেতে পারবেন না নোবারা! আমি পুরো দুনিয়া জ্বালিয়ে দেব, তবু আপনাকে খুঁজে বের করব!” জেনিনের এই গর্জন বৃষ্টির শব্দের সাথে মিশে এক ভৌতিক পরিবেশ তৈরি করল।

নোবারা ট্রাকের ভেতর বসে ভিলার সেই লাল বাতিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। সে দেখল জেনিন নূরশাদের সেই বিশাল সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে। সে আজ মুক্ত, কিন্তু এই মুক্তি এক চরম বিষাদে ঘেরা। তার মনে হলো সে জেনিনকে ছেড়ে যায়নি, সে আসলে নিজের একটি অংশকেও সেই রক্তাক্ত ভিলায় ফেলে এসেছে।

জেনিন নূরশাদ আজ রাতে তার রাজত্বের সবচাইতে ক্ষমতাহীন মানুষ। সে তার সমস্ত সৈন্য দিয়েও একটি মেয়েকে আটকে রাখতে পারল না। ইউজি জেনিনের পাশে এসে দাঁড়ালো।

“বস, ট্র্যাকার কাজ করছে না। ও সব ফেলে গেছে। এখন কী করব?”

জেনিন ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার চোখে এখন কোনো বিষাদ নেই, আছে এক ভয়ংকর সংকল্প। “শহর সিল করে দাও। আর শোনো, এবার আমি আর জেনিন হয়ে খুঁজব না। এবার আমি ‘জেড’ হয়ে নামব। নোবারা যদি এই শহর থেকে বের হতে চায়, তবে ওকে আমার লাশের ওপর দিয়ে যেতে হবে।”

চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।।।।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here