#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_২২
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
জেনিন নূরশাদ আজ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, সেই ঘুম যা অনেক বছর তার চোখে ছিল না। নোবারাকে সম্পূর্ণ নিজের করে পাওয়ার এক পৈশাচিক তৃপ্তি তার চেহারায় এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দিয়েছে। তার ডান হাতটি এখনো নোবারার কোমরের ওপর কর্তৃত্বের সাথে রাখা, যেন ঘুমের ভেতরেও সে মেয়েটাকে হাতছাড়া করতে চায় না।
কিন্তু নোবারার চোখে ঘুম নেই। সে অন্ধকারের ভেতর স্থির দৃষ্টিতে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। জেনিনের প্রতিটি ভারী নিঃশ্বাস তার কানে তপ্ত সিসার মতো বিঁধছে। তার সারা শরীরে জেনিনের সেই উগ্র পারফিউমের গন্ধ আর মেকি ভালোবাসার স্পর্শ লেপ্টে আছে। নোবারা খুব সন্তর্পণে, অত্যন্ত সাবধানে জেনিনের ভারী হাতটি নিজের ওপর থেকে সরিয়ে দিল। জেনিন ঘুমের ঘোরে একবার অস্ফুট শব্দ করল, কিন্তু জেগে উঠল না। জেনিন হয়তো কোনোদিন ভাবতেও পারেনি যে, যে মেয়েটিকে সে আজ নিজের নামের শিকল পরিয়েছে, সেই মেয়েটিই এই মুহূর্তে তার ধ্বংসের নীল নকশা তৈরি করছে।
নোবারা বিছানা থেকে নিঃশব্দে নেমে এল। সে ধীর পায়ে আলমারির দিকে এগিয়ে গেল। ড্রয়ারের এক কোণে লুকানো সোনালী চাবিটি তার হাতে ঠান্ডা এক শিহরণ জাগালো। জেনিন তাকে এই চাবিটি দিয়ে তার জীবনের সবচাইতে বড় ভুলটি করেছে, সে তার দুর্গ খুলে দিয়েছে তার শত্রুর জন্য।
নোবারা রুমের দরজা খুলে করিডোরে বেরিয়ে এল। বাইরে পাহারায় থাকা বডিগার্ডরা জেনিনের বিশেষ নির্দেশে আজ এই ফ্লোর থেকে দূরে সরে গেছে, যাতে তাদের ব্যক্তিগত মুহূর্তে কোনো বিঘ্ন না ঘটে। এই সুযোগটিই নোবারা চেয়েছিল। সে দ্রুত পায়ে জেনিনের ব্যক্তিগত স্টাডি রুমের দিকে এগিয়ে গেল। বিশাল ওক কাঠের দরজার ওপাশে অন্ধকার ঘাপটি মেরে আছে। নোবারা চাবি দিয়ে লকারটি খুলল।
ভেতরে সাজানো একগুচ্ছ হার্ড ড্রাইভ আর এনক্রিপ্টেড ফাইল। নোবারা একটি ছোট পেনড্রাইভ বের করল যা সে আগে থেকেই জোগাড় করে রেখেছিল। সে জেনিনের পার্সোনাল কম্পিউটারে একটি ড্রাইভ প্লাগ করল। স্ক্রিনের নীল আলোয় নোবারার মুখটা এক ভয়ংকর সুন্দর দেখালো। সে ফাইলগুলো স্ক্রল করতে লাগল। জেনিনের ‘জেড’ সত্তার প্রতিটি অন্ধকার দিক এখানে উন্মোচিত, অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালান, প্রভাবশালী মন্ত্রীদের সাথে গোপন চুক্তি, আর সবচাইতে ভয়ংকর হলো ‘প্রজেক্ট ওমেগা’, যা আগামী সপ্তাহে জাপানের এক কুখ্যাত মাফিয়া সিন্ডিকেটের সাথে জেনিনের একটি বড় ডিল।
নোবারার হাত কাঁপছিল, কিন্তু তার চোখে ছিল অটল জেদ। সে বুঝতে পারল এই ডিলটি জেনিনের সাম্রাজ্যের মেরুদণ্ড। যদি এই শিপমেন্টটি কোনোভাবে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া যায়, তবে জেনিন নূরশাদকে আর কেউ বাঁচাতে পারবে না। নোবারা দ্রুত তথ্যগুলো কপি করতে শুরু করল।
“আপনি এখানে কী করছেন, ম্যাম?”
একটি যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর নোবারার রক্ত হিম করে দিল। সে চট করে ঘুরে তাকালো। দরজার কাছে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে ইউজি। ইউজির হাতে একটি লেজার সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল। তার চোখে সেই পুরনো সন্দেহ আর সতর্কতা।
নোবারা এক মুহূর্তের জন্য থমকাল, কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিল। সে পেনড্রাইভটি নিজের ব্লাউজের ভাঁজে লুকিয়ে ফেলে ধীরস্থিরভাবে ইউজির দিকে তাকালো। “ইউজি, আমি এখন এই বাড়ির মালকিন। আপনার বস আমাকে এই রুমের চাবি দিয়েছেন। আপনি কি আমার কাজে বাধা দেওয়ার স্পর্ধা দেখাচ্ছেন?”
ইউজি এক পা এগিয়ে এল। তার চোখে অবিশ্বাস। “বস আপনাকে বিশ্বাস করেছেন ঠিকই, কিন্তু আমি করিনি। আপনি বিয়ের রাতেই বসের স্টাডি রুমে ফাইল ঘাঁটছেন, এটা কোনো স্বাভাবিক স্ত্রীর কাজ নয়।”
“স্বাভাবিক স্ত্রী?” নোবারা এক বিদ্রূপের হাসি হাসল। সে ইউজির চোখের দিকে তাকিয়ে এক পা এগিয়ে গেল। “আপনার বস কি আমাকে কোনো স্বাভাবিক উপায়ে বিয়ে করেছেন? আমি এখন ওনার পার্টনার, ইউজি। জেনিন নিজেই আমাকে বলেছেন ওনার প্রতিটি ডিল সম্পর্কে জানতে। আপনি কি বসের আদেশের ওপর কথা বলবেন?”
ইউজি পিস্তলটি নামালো না। সে টেবিলের ওপর রাখা ফাইলগুলোর দিকে তাকালো। “আপনি এই ফাইলগুলো নিয়ে কী করবেন?”
নোবারা এবার পুরোপুরি অপ্রতিরোধ্য। সে ইউজির পিস্তলের নলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। “আমি যা খুশি তা-ই করব। আপনি যদি মনে করেন আমাকে মেরে ফেলবেন, তবে মেরে ফেলুন। কিন্তু মনে রাখবেন, জেনিন যদি জানতে পারে যে আপনি আমাকে স্পর্শ করেছেন, তবে রহমত চাচার চেয়েও করুণ দশা হবে আপনার।”
ইউজির হাত সামান্য কাঁপল। সে জানে জেনিন এখন নোবারার প্রেমে উন্মাদ। যদি নোবারা জেনিনের কাছে কোনো নালিশ করে, তবে জেনিন এক সেকেন্ডও ভাববে না ইউজিকে শেষ করে দিতে। ইউজি দাঁতে দাঁত চিপে পিস্তলটি হোলস্টারে পুরল।
“আপনি আগুন নিয়ে খেলছেন, মিস আকারি, দুঃখিত, মিসেস নূরশাদ। এই আগুনেই আপনি নিজে পুড়ে ছাই হবেন।” ইউজি খুব নিচু স্বরে বলল।
“আমি তো অনেক আগেই ছাই হয়ে গেছি, ইউজি,” নোবারা খুব শীতল গলায় উত্তর দিল। “এখন কেবল জেনিনকে সেই ছাইয়ের নিচে জীবন্ত কবর দেওয়ার পালা।”
নোবারা ইউজির পাশ দিয়ে দম্ভের সাথে বেরিয়ে গেল। ইউজি পেছনে দাঁড়িয়ে নোবারার সেই চলে যাওয়া দেখল। সে বুঝতে পারছে জেনিন নূরশাদ তার নিজের ধ্বংসের চাবি একটি বিষধর সাপের হাতে তুলে দিয়েছে।
নোবারা আবার বেডরুমে ফিরে এল। জেনিন তখনও ঘুমে। সে বিছানায় গিয়ে জেনিনের পাশে শুয়ে পড়ল। জেনিন ঘুমের ঘোরে নোবারাকে আবার জড়িয়ে ধরল। নোবারার মনে হলো তার শরীরে কোনো বিষাক্ত লতা পেঁচিয়ে ধরছে। সে মনে মনে হাসল। সে জানে, এই বাহুডোর খুব শীঘ্রই হাতকড়াতে পরিণত হবে।
সকালবেলা যখন জেনিনের ঘুম ভাঙল, সে দেখল নোবারা তার দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসছে। জেনিন আনন্দিত হলো। সে ভাবল নোবারা হয়তো সত্যিই তাকে মেনে নিয়েছে।
“শুভ সকাল, আমার স্বপ্নকন্যা,” জেনিন নোবারার কপালে চুমু দিয়ে বলল। “আজ থেকে আমাদের এক নতুন জীবন শুরু হলো।”
“হ্যাঁ। এক নতুন জীবন,” নোবারা ফিসফিস করে বলল। “আজ বিকেলেই তো আপনার জাপানিজ ক্লায়েন্টদের সাথে সেই প্রিলিমিনারি মিটিং আছে না? আমি কি সাথে থাকতে পারি?”
জেনিন একটু অবাক হলো, কিন্তু তার খুশির অন্ত ছিল না। “অবশ্যই! আমি তো এটাই চেয়েছিলাম। আপনি পাশে থাকলে আমার প্রতিটি ডিল সফল হবে।”
<><><><><><><><><>
নূরশাদ ভিলার প্রতিটি কক্ষ এখন যেন এক একটি নীরব সাক্ষী। ভোরের আলো কাঁচের জানালা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেও ড্রয়িংরুমের গুমোট ভাবটা কাটে না। নোবারা এখন এই বাড়ির আইনত মালকিন, কিন্তু তার মনের ভেতরের লড়াইটা আজ অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি তীব্র। জেনিন তাকে যে বিশ্বাসের চাবি তুলে দিয়েছে, তা নোবারার হাতে তপ্ত আগুনের মতো পুড়ছে।
নোবারা জেনিনকে ঘৃণা করে রহমত চাচার রক্তপাতের জন্য, তার নিষ্ঠুরতার জন্য; কিন্তু সেই গভীর ঘৃণার নিচেই কোথাও একটা চোরাবালি আছে, যেখানে জেনিন নূরশাদ নামের সেই কিশোরটি এখনো বাস করে। নোবারা চায় না জেনিন মরে যাক, কিন্তু সে চায় জেনিন তার এই ‘জেড’ সত্তাকে বিসর্জন দিয়ে সাধারণ জীবনে ফিরে আসুক। আর সেই ফেরার পথ তৈরি করতেই নোবারা এখন এক বিপজ্জনক খেলায় মেতেছে।
জেনিন তখন শাওয়ার নিচ্ছিল। নোবারা খুব দ্রুত নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে করিডোরের শেষ মাথায় জেনিনের সেই গোপন লাইব্রেরিতে ঢুকল। এই ঘরটি জেনিনের দুর্গের হৃদপিণ্ড। চারদিকে হাজার হাজার বইয়ের মাঝে একটি দেয়াল আছে যা কেবল জেনিনের আঙুলের ছাপ আর একটি এনক্রিপ্টেড কোডে খোলে। নোবারা গতরাতেই জেনিনের অবচেতন মনের অসতর্কতায় সেই কোডটি মুখস্থ করে ফেলেছিল। সে খুব সাবধানে কোডটি প্যানেলে টাইপ করল। একটি মৃদু শব্দে দেয়ালের একটি অংশ সরে গিয়ে একটি সরু আলমারি বেরিয়ে এল।
ভেতরে কোনো হীরা-জহরত নেই, আছে জেনিন নূরশাদের পাপের খতিয়ান। ছোট ছোট মাইক্রোচিপ, ব্লু-প্রিন্ট আর কিছু পুরনো ডায়েরি। নোবারা একটি ডায়েরি টেনে নিল। সে দেখল প্রতিটি পাতায় জেনিন তার প্রতিটি খুনের হিসাব রেখেছে, কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, প্রতিটি নামের পাশে সে কারণও লিখেছে—কে তার ব্যবসার ক্ষতি করতে চেয়েছিল, কেউ চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, আর কে নোবারার নিরাপত্তার জন্য হুমকি ছিল। নোবারার চোখ ভিজে এল। জেনিন যতটা নিষ্ঠুর, ততটাই সে তার এই অন্ধকার জগতের অতল গহ্বরে ডুবে আছে।
নোবারা তার ফোন বের করল। সে দ্রুত প্রতিটি চিপের সিরিয়াল নাম্বার আর ফাইলগুলোর ছবি তুলতে শুরু করল। সে চায় জেনিনকে এই সব প্রমাণ দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করতে। নোবারার উদ্দেশ্য জেনিনকে ধ্বংস করা নয়, বরং তাকে শুদ্ধ করা। কিন্তু সে জানে না, জেনিনের মতো একজন মানুষের কাছে বিশ্বাসঘাতকতা হলো ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ, তা সে ভালোবাসার মানুষই হোক না কেন।
হঠাৎ পেছনে কারো উপস্থিতি অনুভব করে নোবারার রক্ত হিম হয়ে গেল। সে দ্রুত আলমারিটি বন্ধ করে পাশে রাখা একটি বই তুলে নিল। সে দেখল ইউজি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। ইউজির চোখেমুখে এক অশুভ তৃপ্তি। সে অনেকদিন ধরেই নোবারাকে হাতেনাতে ধরার সুযোগ খুঁজছিল।
“বই পড়ার শখটা আপনার হঠাৎ করেই খুব বেড়ে গেল না, মিসেস নূরশাদ?” ইউজি খুব শীতল গলায় বলল।
নোবারা ঘুরে দাঁড়ালো। তার বুকে হৃদপিণ্ডটা যেন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে, কিন্তু সে তার মুখে এক মুহূর্তের জন্যও ভয়ের রেখা ফুটতে দিল না। সে বইটির পাতা উল্টাতে উল্টাতে বলল, “এই বাড়িতে একাকীত্ব কাটানোর জন্য বই ছাড়া আর কী-ই বা আছে ইউজি? আপনার বস তো সারাদিন রক্তের নেশায় বাইরে থাকেন। আমি ভাবলাম অন্তত ওনার সংগ্রহের বইগুলো দেখি।”
ইউজি এক পা এগিয়ে এল। সে লকারটির দিকে তাকালো। “আপনি লকারের কোড জানেন, এটা আমি আগেই সন্দেহ করেছিলাম। কিন্তু আপনি কি জানেন এই লকারের ভেতর যা আছে, তা যদি একবার বসের অনুমতি ছাড়া কেউ স্পর্শ করে, তবে বস তার আঙ্গুলগুলো কেটে ফেলেন?”
নোবারা এবার ইউজির চোখের দিকে তীক্ষ্ণভাবে তাকালো। সে তার আভিজাত্য বজায় রেখে বলল, “ইউজি, আপনি ভুলে যাচ্ছেন আমি এখন আপনার বসের স্ত্রী। এই বাড়িতে জেনিনের যা কিছু আছে, তার অর্ধেক আমার। আমি যদি এই লকার খুলিও, তবে জেনিন আমাকে কিছু বলবে না। কিন্তু জেনিন যদি জানতে পারে যে আপনি আমাকে এভাবে হেনস্তা করছেন, তবে আপনার পরিণাম কী হতে পারে তা আপনি ভালো করেই জানেন।”
ইউজি দাঁতে দাঁত চিপল। সে জানে নোবারা এখন জেনিনের জীবনের দুর্বলতম অংশ। জেনিন এখন নোবারার প্রেমে এতটাই উন্মাদ যে সে নিজের যুক্তিবোধ হারিয়ে ফেলেছে। ইউজি আর কথা না বাড়িয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল, কিন্তু সে তার নজরদারি সরাল না। সে জানে নোবারা কিছু একটা লুকাচ্ছে।
নোবারা যখন ঘরে ফিরে এল, সে দেখল জেনিন তৈরি হয়ে গেছে। তার পরনে নেভি ব্লু স্যুট, চোখে সেই চিরচেনা তীক্ষ্ণতা। সে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ঘড়িটা পরছিল। নোবারাকে দেখে জেনিন হাসল। সে এগিয়ে এসে নোবারাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। নোবারা জেনিনের বুকের উষ্ণতা অনুভব করল, যে বুকে গতকাল রাতে সে মাথা রেখেছিল।
“আজ বিকেলে আমাদের সেই বড় মিটিংটা মনে আছে তো? জাপানিজরা আসবে। আমি চাই আপনি পাশে থাকুন। আপনার উপস্থিতি আমার জন্য লাকি,” জেনিন নোবারার কাঁধে মুখ রেখে মৃদু স্বরে বলল।
নোবারা জেনিনের আয়নায় জেনিনের চোখের দিকে তাকালো। এই চোখদুটোতে আজ কেবল মায়া। নোবারা ভাবল, ‘কেন আপনি আমাকে বাধ্য করছেন এই প্রমাণগুলো জোগাড় করতে? কেন আপনি এই নোংরা জগত ছেড়ে আমার সাথে সাধারণ হয়ে বাঁচতে পারেন না?’
“আচ্ছা আমি আসব। কিন্তু আমার একটা অনুরোধ আছে,” নোবারা খুব নিচু স্বরে বলল।
“বলুন। আপনার জন্য আমি সব করতে পারি,” জেনিন তার চিবুকটা নোবারার মাথায় রাখল।
“আজকের পর এই প্রজেক্ট ওমেগা শেষ হলে আপনি কি এই সব ডিল থেকে বিরতি নিতে পারেন না? আমরা কি কোথাও দূরে চলে যেতে পারি না, যেখানে জেনিন নূরশাদকে কেউ ‘জেড’ বলে চিনবে না?”
জেনিন হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তার হাত দুটো নোবারার কোমর থেকে সামান্য শিথিল হয়ে এল। সে নোবারাকে নিজের দিকে ঘোরালো। জেনিনের চোখের মায়া নিমেষেই মিলিয়ে গিয়ে সেখানে এক কঠোর বাস্তবতা ফুটে উঠল। “নোবারা, এই জগত থেকে বের হওয়ার কোনো রাস্তা নেই। হয় আপনি থাকবেন উপরে, না হলে কবরে।”
নোবারা কোনো উত্তর দিল না। সে বুঝল জেনিন তার এই ক্ষমতার নেশায় এতটাই ডুবে গেছে যে সে সুরক্ষাকে অপরাধের সাথে গুলিয়ে ফেলেছে। নোবারা তার ব্যাগে থাকা সেই লুকানো ফোনের কথা ভাবল। সে প্রমাণ জমা করেই যাবে। সে জেনিনকে এই পথ থেকে ফিরিয়ে আনবে, এমনকি যদি তাকে জেনিনের সবচাইতে বড় শত্রু সাজতে হয় তবুও।
পুরোটা দিন নোবারা এক অদৃশ্য উত্তেজনার মাঝে কাটাল। সে জেনিনের অফিসের প্রতিটি কোণে চোখ রাখল। সে দেখল ইউজি কীভাবে জেনিনকে প্রতিটি মুহূর্তের আপডেট দিচ্ছে। নোবারা অনুভব করল জেনিন তাকে অনেক বড় একটা দায়িত্ব দিয়েছে আজ বিকেলের মিটিংয়ে। নোবারার কাজ হবে জাপানিজ ক্লায়েন্টদের সাথে ট্রান্সলেটর হিসেবে কথা বলা। নোবারা জাপানি ভাষা জানে, যা জেনিন আগে থেকেই জানত।
মিটিংয়ের ঠিক আগে নোবারা যখন ওয়াশরুমে গেল, সে তার লুকানো ফোনটি বের করল। সে কোনো মেসেজ পাঠালো না, কিন্তু সে কল রেকর্ডার চালু করে সেটি তার শাড়ির ভাঁজে আটকে দিল। সে চায় এই মিটিংয়ের প্রতিটি কথা রেকর্ড করতে। এটি হবে জেনিনের বিরুদ্ধে তার সবচাইতে বড় অস্ত্র।
মিটিং রুমে ঢোকার পর নোবারা দেখল পরিবেশটা খুব গম্ভীর। জাপানিজ প্রতিনিধিরা জেনিনকে ‘জেড’ বলে সম্বোধন করছে। জেনিন খুব শান্তভাবে ডিলটা ফাইনাল করছিল। শত কোটি টাকার অস্ত্র আর নিষিদ্ধ ড্রাগসের সেই কারবার। নোবারা যান্ত্রিকভাবে অনুবাদ করে যাচ্ছিল, কিন্তু তার ভেতরটা যেন পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিল।
মিটিং শেষ হওয়ার পর জেনিন খুব খুশি। সে প্রতিনিধিদের বিদায় দিয়ে নোবারার হাতটা ধরল। “আপনি দারুণ করেছেন মিসেস নুরশাদ। আজ থেকে ওরা জানল নূরশাদ সম্রাজ্যের রানী কতটা বুদ্ধিমতী।”
নোবারা হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু তার ঠোঁট কাঁপছিল। সে জানে তার আঁচলের নিচে থাকা ফোনটি এইমাত্র জেনিনের পতন রেকর্ড করেছে। জেনিন নোবারাকে তার বাহুডোরে নিয়ে নিল। সে দেখতে পেল না নোবারার চোখে তখন একরাশ অপরাধবোধ আর ভালোবাসা মিশে আছে।
<><><><><><><><><>
জেনিন নূরশাদ তার বর্তমানের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কাঁচের ঘরে বসে জানালার ওপাশে ঢাকার ব্যস্ত যানজট দেখছে। মিটিং শেষে সবাই চলে গিয়েছে, কর্মচারীরা যে যার কাজে ব্যস্ত, কেবল জেনিন একা একা নিজের সাথে নিজে কথা বলছে আজ। কিন্তু তার চোখের আয়নায় ভেসে উঠছে ১৫ বছর আগের সেই স্টেশনের দৃশ্য। সে ডায়েরি বা অতীত নিয়ে বিলাপ করার মানুষ নয়, কিন্তু আজ তাকে নিজের শিকড়ের হিসাব মেলাতে হচ্ছে। কেন নানামি তাকে খুঁজে পেল না? কেন নোবারা নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল? এই রহস্যের জটগুলো আজ একে একে খুলতে শুরু করেছে।
১৫ বছর আগে, জেনিনকে যখন তার বাবা আশফাক নূরশাদ লন্ডনে পাঠিয়েছিলেন, তখন তার পাসপোর্ট থেকে শুরু করে নাম পর্যন্ত সব বদলে দেওয়া হয়েছিল। আশফাক জানতেন, জেনিনের ভেতরে যে খুনে প্রতিভা আর জেদ আছে, তা ঢাকা শহরের সাধারণ জীবনে বিকশিত হবে না। লন্ডনের অন্ধকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রভাবশালী ‘ছায়া মানবের’ যার সাথে রিমান্ডে থাকাকালীন জেনিনের দেখা হয়েছিল, তার কাছে জেনিনকে সঁপে দেওয়া হয়। সেখানে জেনিনকে নাম দেওয়া হয় ‘Z’ (জেড)।
লন্ডনের সেই কনকনে ঠান্ডায় জেনিনকে শেখানো হয়েছিল আবেগ বিসর্জন দিতে। সে সেখানে অর্থনীতি আর অপরাধতত্ত্ব, দুটোতেই ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করে। কিন্তু তার আসল শক্তি ছিল তার কৌশল। সে অল্প সময়েই ইউরোপের ড্রাগ ও আর্মস সিন্ডিকেটের অঘোষিত সম্রাট হয়ে ওঠে।
তবে তার হৃদয়ে ঢাকা শহরের সেই ধুলোবালি মাখা স্মৃতিগুলো টাটকা ছিল। সে তার বাবার ‘নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজ’কে বিশ্বের দরবারে এক বৈধ কর্পোরেট সাম্রাজ্য হিসেবে দাঁড় করানোর আড়ালে নিজের মাফিয়া নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। গত তিন বছর আগে জেনিন নুরশাদ ‘সিইও জেনিন নূরশাদ’ পরিচয়ে পূর্ণ শক্তিতে ঢাকা শহরে পা রাখে। কিন্তু সে তার পরিচয় এতটাই গোপন রেখেছিল যে, এমনকি ইন্টারপোলও জানত না ‘জেড’ আর জেনিন নূরশাদ একই ব্যক্তি।
এদিকে, জেনিন চলে যাওয়ার পর নোবারা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। এসএসসির রেজাল্ট বেরোনোর পর পরই নোবারার বাবা হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ঋণের দায়ে তাদের পৈত্রিক ভিটা বিক্রি হয়ে যায়। নোবারার মা তাকে নিয়ে গ্ৰামের বাড়ি চলে যান, যেখানকার ঠিকানা এমনকি নানামিও জানত না।
নোবারা তার জীবনের সেই অন্ধকার সময়ে কেবল জেনিন আর নানামিকেই মনে করত। সে কষ্ট করে পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছিল, যাতে কোনোদিন কারো দয়ার ওপর বাঁচতে না হয়। সে নূরপুর গ্রামে তার মায়ের সাথে গিয়ে থাকতে শুরু করে। কিন্তু নিয়তি তাকে টেনে আনে জেনিনেরই অফিসে।
নানামি জায়দান ও কোনোদিন জেনিন আর নোবারাকে ভুলে থাকেনি। জেনিন চলে যাওয়ার পর সে প্রতি রবিবার ওই স্টেশনে গিয়ে বসে থাকত। সে পুলিশের চাকরিতে জয়েন করেছিল কেবল এই জন্য, যাতে তার প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে জেনিন আর নোবারাকে খুঁজে বের করতে পারে। সে ঢাকার প্রতিটি থানায় খোঁজ নিয়েছে, প্রতিটি হাসপাতালের রেকর্ড ঘেঁটেছে।
কিন্তু নানামি কেন খুঁজে পেল না? এর পেছনে ছিল আশফাক নূরশাদের নিখুঁত পরিকল্পনা। তিনি জেনিনের সব রেকর্ড সিভিল ডাটাবেস থেকে মুছে দিয়েছিলেন। আর ‘জেড’ বা জেনিন নূরশাদ যখন ঢাকায় ফিরল, তখন তার প্রোফাইল এতটাই হাই-প্রোফাইল ছিল যে সাধারণ কোনো তদন্তে তার অতীত বের করা অসম্ভব ছিল। নানামি ‘জেড’ নামে এক মাফিয়া ডনের কথা জানত, যাকে ধরার জন্য সে দিনরাত এক করে ফেলছিল। কিন্তু সে স্বপ্নেও ভাবতে পারবে না যে তার ছোটবেলার বন্ধু, সেই প্রিয় জেনিনই হলো এই কুখ্যাত অপরাধী।
আজ জেনিন নূরশাদ বুঝতে পারছে কেন নানামি তাকে খুঁজে পায়নি, কারণ জেনিন নিজেই নিজেকে বদলে ফেলেছিল। জেনিন তার ডেস্কে থাকা একটি গোপন ফাইল খুলল। সেখানে নানামির পুরো পুলিশি ক্যারিয়ারের রেকর্ড আছে। জেনিন দেখল নানামি তার প্রতিটি ডিল নষ্ট করার চেষ্টা করেছে।
“তুই আমাকে খুঁজছিলি তো জায়দান? আজ আমি তোর খুব কাছে। অথচ আমাদের দেখা করার উপায় নেই!” জেনিন ম্লান হেসে বিড়বিড় করল।
নোবারা তখন ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে জেনিনের এই একা কথা বলা শুনছিল। সে জানত না নানামি এখনো তাকে খুঁজছে। সে জানত না জেনিন আর নানামি আজ দুই বিপরীত মেরুর যোদ্ধা। নোবারার হাতে থাকা সেই গোপন প্রমাণগুলো আজ জেনিন আর নানামি, উভয়কেই ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে।
এই ১৫ বছরের ব্যবধান কেবল সময় নয়, এটি ছিল তিনটি জীবনের তিনটি ভিন্ন পথের যাত্রা। জেনিন হয়ে উঠেছে এক দানব, নানামি হয়েছে আইনের রক্ষক, আর নোবারা হয়েছে তাদের মাঝখানের সেই পিষ্ট হওয়া আত্মা। আজ তারা একই শহরে, অথচ একে অপরের থেকে আলোকবর্ষ দূরে।
চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।

