#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_২৩
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
নূরশাদ ভিলার ভূগর্ভস্থ ফ্লোরে আজ এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। এই ফ্লোরটি জেনিন নূরশাদের ব্যক্তিগত ট্রেনিং জোন এবং অস্ত্রাগার। চারদিকের দেয়ালে সাউন্ডপ্রুফ প্যাডিং, মেঝের ওপর রাবার ম্যাটিং আর কৃত্রিম আলোয় এক ধরণের নীলচে আভা। বাতাসের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত হলেও সেখানে গান-পাউডার আর পরিষ্কার করা তেলের এক তীক্ষ্ণ গন্ধ মিশে আছে। জেনিন আজ তার স্যুট-টাই ছেড়ে কালো রঙের একটি স্লিম-ফিট ট্যাকটিক্যাল শার্ট আর ট্রাউজার পরেছে। পেশীবহুল হাত দুটো উন্মুক্ত, যেখানে ১৫ বছরের অসংখ্য যুদ্ধের দাগ স্পষ্ট।
নোবারা তার পাশে দাঁড়িয়ে। জেনিন জোর করে তাকেও একটি কালো ফিটিং ড্রেস পরিয়েছে। নোবারার লম্বা চুলগুলো উঁচু করে পনিটেইল করা, যা তার তীক্ষ্ণ নাক আর চোয়ালের রেখাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। জেনিন চায় না নোবারা কেবল তার রানী হয়ে প্রাসাদে বন্দি থাকুক; সে চায় নোবারা যেন নিজের সুরক্ষা নিজেই করতে পারে, অথবা জেনিনের ভাষায়, ‘একজন মাফিয়া সম্রাজ্ঞীর মতো কামড় দিতে জানে।’
জেনিন টেবিলের ওপর থেকে একটি সেমি-অটোমেটিক গ্লক-১৭ তুলে নিল। সে নোবারার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো। নোবারার পিঠে জেনিনের বুকের উষ্ণতা অনুভূত হতেই সে সামান্য শিউরে উঠল। জেনিন খুব শান্তভাবে নোবারার দুহাত ধরে পিস্তলটির ওপর রাখল।
“অস্ত্র কেবল লোহা নয় নূরা, এটি আপনার শরীরের একটি অংশ,” জেনিন ফিসফিস করে নোবারার কানে বলল। তার দাড়ি নোবারার গাল স্পর্শ করতেই নোবারা চোখ বুজে ফেলল।
“লক্ষ্যস্থির রাখুন। আপনার নিশ্বাস যেন ট্রিগারের সাথে মিতালি করে। যখন গুলি ছুঁড়বেন, মনে করবেন আপনি আপনার সবচাইতে বড় ভয়কে বুক চিরে বের করে দিচ্ছেন।”
নোবারা পিস্তলটি শক্ত করে ধরল। জেনিন তার হাতের আঙুলগুলো ঠিক করে দিচ্ছে। জেনিনের স্পর্শে আজ কোনো নিষ্ঠুরতা নেই, আছে এক গভীর আদিম প্রেম। সে নোবারার কাঁধের ওপর নিজের থুতনি রেখে লক্ষ্যভেদের দিকে মনোযোগ দিল।
“এখন, ফায়ার করুন।”
নোবারা ট্রিগার চাপল। ধাম! ধাম! ধাম! তিনটি গুলি লক্ষ্যভেদের ঠিক মাঝখানে বিঁধল। জেনিন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সে ভাবেনি নোবারা প্রথমবারই এতটা নিখুঁত হবে। জেনিন নোবারাকে নিজের দিকে ঘুরালো। তার চোখে বিস্ময় আর মুগ্ধতা।
“আমি ভেবেছিলাম আপনাকে অনেক কসরত করে শেখাতে হবে, কিন্তু আপনার গ্রিপ… আপনার রিফ্লেক্স… এটা অবিশ্বাস্য।” জেনিন নোবারার কপালে একটি ঘর্মাক্ত চুমু খেল। “আপনি কি আগেও কখনো বন্দুক ধরেছেন?”
নোবারার হৃদপিণ্ড দ্রুত নাচছিল। সে আসলে কি, তার পরিচয় কি, সেটা জেনিনের কাছে প্রকাশ করা মানেই মহাবিপদ। সে ম্লান হাসল, চোখে এক রহস্যময় মাদকতা নিয়ে বলল, “হয়তো আপনার পাশে থাকতে থাকতে আপনার গুণগুলো আমার ভেতরেও চলে এসেছে!”
জেনিন হো হো করে হেসে উঠল। “জানেন, আমি আপনার এই রূপটিরই প্রেমে পড়েছি নূরা। এই যে আপনার ভেতরে লুকানো আগুন, আমি এটাকে প্রজ্জ্বলিত করতে চাই।”
ট্রেনিং জোনের এক কোণে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে ছিল ইউজি। তার হাতে একটি ট্যাবলেট পিসি। সে জেনিন আর নোবারার এই ঘনিষ্ঠতা দেখলেও তার তীক্ষ্ণ নজর ছিল নোবারার পায়ের পজিশন আর গান রিকোয়েল সামলানোর ধরনের দিকে। ইউজি অপরাধ জগতের মানুষ; সে জানে কোনো আনকোরা মানুষের পক্ষে প্রথমবারই গান রিকোয়েল এত সহজে সামলানো অসম্ভব। নোবারার হাতের পেশীগুলো যেভাবে সংকুচিত হচ্ছিল, তা ছিল অনেক অভ্যস্ত কোনো হাতের মতো।
ইউজি এগিয়ে এল। “বস, ৫ মিনিট সময় হবে? পরের কনসাইনমেন্টের কিছু রিপোর্ট এসেছে।”
জেনিন নোবারার হাত ছেড়ে দিয়ে ইউজির দিকে ফিরল। “বলো ইউজি।”
ইউজি নোবারার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল, “মিসেস নূরশাদ তো দারুণভাবে গান হ্যান্ডেল করছেন। কিন্তু বস, ওনার হোল্ডিং স্টাইলটা কি আপনার মনে হচ্ছে না একটু বেশি… প্রফেশনাল? একজন সাধারণ মানুষের তো পিস্তল ছোঁড়ার পর হাত কেঁপে ওঠার কথা।”
জেনিনের চোখে এক মুহূর্তের জন্য সন্দেহের ছায়া পড়ল। সে নোবারার দিকে তাকালো। নোবারা তখন খুব শান্তভাবে টেবিলের ওপর থেকে একটি ম্যাগাজিন তুলে নিয়ে সেটা লোড করার চেষ্টা করছিল, পুরোপুরি আনাড়ির মতো। সে ম্যাগাজিনটা উল্টো করে ঢোকানোর ভান করল এবং জেনিনের দিকে তাকিয়ে অসহায়ভাবে হাসল।
“জেনিন, লোহার টুকরোটা ভেতরে ঢোকাব কীভাবে?,” নোবারা খুব নিস্পাপ গলায় বলল।
জেনিন ইউজির দিকে ফিরে এক বিদ্রূপের হাসি দিল। “দেখলে ইউজি? ও কেবল আমার হাতের ছোঁয়ায় ওই তিনটি পারফেক্ট শট মেরেছে। ওটা আমার ট্রেনিংয়ের গুণ, ওর অভিজ্ঞতার নয়। তুমি কি এখন আমার ওয়াইফ এর মেধা নিয়ে সন্দেহ করছ?”
ইউজি মাথা নত করল, কিন্তু তার মনের খটকা গেল না। “না বস। আমি কেবল নিরাপত্তার দিকটা ভাবছিলাম।”
“নিরাপত্তা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। আমি নিজে ওকে গান এক্সেস দিচ্ছি। আজ থেকে ওর হ্যান্ডব্যাগে একটি রিভলভার থাকবে। আমার অবর্তমানে যদি কেউ এই প্রাসাদে ঢোকে, তবে নোবারা তাকে স্বাগত জানাবে সিসার গুলিতে,” জেনিন হুকুম দিল।
জেনিন আবার নোবারার কাছে ফিরে এল। সে নোবারার কোমরের বেল্টে একটি ছোট পিস্তল গুঁজে দিল। তারপর খুব কাছে এসে তার কানে ফিসফিস করল, “এই অস্ত্রটি কেবল শত্রুদের জন্য নয় মিসেস নুরশাদ। যদি কোনোদিন মনে হয় আমি আপনার ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছি, তবে এটি ব্যবহার করতে দ্বিধা করবেন না।”
নোবারা জেনিনের চোখের দিকে তাকালো। সে জেনিনের এই উন্মাদ ভালোবাসা দেখে একদিকে মুগ্ধ, অন্যদিকে আতঙ্কিত। সে জানে এই গান এক্সেস তাকে জেনিনের সবচাইতে গোপন তথ্যগুলোর আরও কাছে নিয়ে যাবে। নোবারা জেনিনের ঘাড় জড়িয়ে ধরল। তার ঠোঁটে এক মরণপণ হাসি।
“আমি আপনাকে মারব কেন জেনিন? আমি তো আপনাকে নিজের জালে বন্দি করব,” নোবারা খুব আদুরে গলায় বলল, কিন্তু তার কথার ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংকর সত্য।
জেনিন নোবারার এই দ্ব্যর্থবোধক কথাগুলো বুঝল না। সে তাকে পাজাকোলা করে তুলে নিল। “আজকের জন্য ট্রেনিং শেষ। এখন আমাদের উদযাপনের সময়।”
জেনিন যখন নোবারাকে নিয়ে উপরে উঠে গেল, ইউজি নিচে দাঁড়িয়ে সেই পরিত্যক্ত ম্যাগাজিনটি তুলে নিল। সে দেখল ম্যাগাজিনটির স্ক্র্যাচ মার্কগুলো বলছে নোবারা ওটা ভুলভাবে ঢোকানোর নাটক করলেও তার আঙুলের ছাপগুলো ছিল একদম নিখুঁত জায়গায়। ইউজির সন্দেহ এবার দ্বিগুন বেড়ে গেল!
<><><><><><><><><>
বিকেল বেলা। জেনিন নূরশাদ তার বিশাল চামড়ার সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে, হাতে একটি দামী চুরুট, যার ধোঁয়া সিলিংয়ের দিকে নীলচে বলয় তৈরি করছে। জেনিনের ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি। সে উপভোগ করছে তার জীবনের দুই সবচাইতে ঘনিষ্ঠ মানুষের মধ্যকার এক বিচিত্র লড়াই। একপাশে তার ছায়াসঙ্গী ইউজি, অন্যপাশে তার হৃদপিণ্ডের স্পন্দন নোবারা।
ঝগড়ার সূত্রপাত খুব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে। জেনিন আজ সন্ধ্যায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মিটিঙে যাবে, যেখানে ইউজিকে সাথে নেওয়ার কথা। কিন্তু জেনিন গত রাতে কথা দিয়েছে সে নোবারাকে নিয়ে যাবে এবং নোবারাই আজ জেনিনের সিকিউরিটি ব্রিফিং ফাইলটা হ্যান্ডেল করবে।
ইউজি টেবিলের ওপর ফাইলটা ঠক করে রাখল। তার চোখেমুখে বিরক্তি।
“বস, এই ফাইলটা মিসেস নূরশাদের হাতে দেওয়া ঠিক হবে না।” ইউজি খুব কড়া গলায় বলল।
নোবারা তখন সোফায় বসে পায়ের ওপর পা তুলে কফি খাচ্ছিল। সে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। “কেন ইউজি? আমার হাতে দিলে কী সমস্যা?”
“এটা টেকনিক্যাল বিষয়। আপনি কেবল গান লোড করতে শিখেছেন, স্ট্র্যাটেজি বোঝেন না।” ইউজি সরাসরি আক্রমণ করল।
“ওহ্ সত্যিই?” নোবারা কফির কাপটা রাখল। “আর আপনি বুঝি সব বোঝেন? পনেরো বছর ধরে বসের পেছনে ছায়ার মতো ঘুরে আপনি নিজেকে কী ভাবেন? জেনিনের মগজ কি আপনার হাতে?”
ইউজি জেনিনের দিকে তাকালো। “বস, আপনি ওকে বলুন। এই মিশনে কোনো আবেগের জায়গা নেই।”
নোবারা উঠে দাঁড়ালো। সে জেনিনের কাছে গিয়ে তার সোফার হাতলে বসল। জেনিনের কাঁধে হাত রেখে সে ইউজির দিকে তাকালো। “জেনিন, আপনি কি আমাকে কাল কথা দেননি? আপনি কি বলেননি যে আজ থেকে আমিই আপনার ডান হাত হব?”
জেনিন চুরুটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল। সে কোনো কথা বলল না, শুধু চোখের ইশারায় দুজনকে দেখল।
“জেনিন!” নোবারার গলার স্বর তীক্ষ্ণ হলো। “আপনি কি ইউজিকে আমার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন? ও কেবল একজন কর্মচারী।”
ইউজির মুখ রাগে লাল হয়ে গেল। “আমি কর্মচারী নই! আমি বসের জীবন বাঁচাই। আপনি কেবল ওনার সময় নষ্ট করেন।”
“আমি সময় নষ্ট করি?” নোবারা চেঁচিয়ে উঠল। “আমি ওনার স্ত্রী! ওনার ব্যক্তিগত জীবনের পুরোটা আমার। আর আপনি? আপনি তো কেবল ওনার মাথা নষ্ট করার লোক!”
“মুখ সামলে কথা বলুন!” ইউজি চিৎকার করল। “আমি না থাকলে আপনার এই জেনিন নূরশাদ কবেই লাশে পরিণত হতো।”
নোবারা এবার জেনিনের দিকে ফিরল। “জেনিন, দেখুন ও কত অহংকারী! ও মনে করে ও না থাকলে আপনার দুনিয়া চলবে না।”
ইউজি এবার জেনিনের পায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। “বস, আপনিই বিচার করুন। আমি আপনার সাথে লন্ডনের সেই ঠান্ডায় না খেয়ে দিন কাটিয়েছি। আর ও? ও তো ১৫ বছর লাপাত্তা ছিল। এখন এসে অধিকার দেখাচ্ছে!”
“লাপাত্তা ছিলাম মানে?” নোবারা ইউজির দিকে তেড়ে গেল। “আপনি জানেন আমি কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছি? আপনি কেবল জেনিনকে অস্ত্র আর রক্ত শিখিয়েছেন। আমি ওনাকে শান্তি দেব। জেনিন, ওকে বলুন এখান থেকে চলে যেতে!”
ইউজি হাসল। এক বিদ্রূপের হাসি। “বস আমাকে ছাড়া এক পা-ও নড়বে না। আপনি ট্রেনিং গ্রাউন্ডে গান লোড করতে পারছিলেন না, আপনার ওপর ভরসা করা মানে মৃত্যুকে দাওয়াত দেওয়া।”
“আমি ভয় পাচ্ছিলাম, তাই লোড করতে পারি নি। কিন্তু জেনিন আমাকে শিখিয়েছে। আমি ওনার স্টুডেন্ট, আপনি নন!”
“আপনি স্টুডেন্ট নন, আপনি আপদ!” ইউজি তক্ক শুরু করল।
“আপনি আপদ! আপনি একটা রোবট! আপনার কোনো ফিলিংস নেই!” নোবারা হাত পা নেড়ে বাচ্চার মতো ঝগড়া করতে লাগল।
“আমি রোবট? আর আপনি? আপনি তো একটা ড্রামা কুইন!” ইউজি পাল্টা জবাব দিল।
“জেনিন! দেখুন ও আমাকে কী বলছে!” নোবারা জেনিনের হাত ধরে টানতে লাগল। “ওকে এখনই ফায়ার করো!”
“ফায়ার করবেন?” ইউজি এবার জেনিনের অন্য হাত ধরল। “বস, আপনি এই মেয়ের কথায় আমাকে বের করে দেবেন? যে পনেরো বছর আপনার পাশে ছিল তাকে?”
জেনিন এবার আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে উচ্চস্বরে হাসতে শুরু করল। তার এই অট্টহাসিতে ড্রয়িংরুমের কাঁচের বাসনগুলো পর্যন্ত কাঁপতে লাগল। সে তার দুই প্রিয় মানুষের এই কাণ্ড দেখে বিমোহিত।
“থামো তোমরা দুজন!” জেনিন হাসি থামিয়ে বলল।
ইউজি আর নোবারা দুজন দুদিকে মুখ ঘুরিয়ে গাল ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দুজনেই হাপুস নয়নে হাফাচ্ছে, যেন অনেক বড় কোনো যুদ্ধ করে এসেছে।
“তোমরা কি জানো তোমাদের দেখতে কেমন লাগছে?” জেনিন উঠে দাঁড়ালো। সে নোবারার কপালে একটা চুমু খেল এবং ইউজির কাঁধে হাত রাখল। “দুটো ছোট বাচ্চা যারা একটা খেলনা নিয়ে লড়াই করছে। আর সেই খেলনাটা হলাম আমি।”
“ও আমাকে ফালতু বলেছে!” নোবারা নালিশ করল।
“ও আমাকে কর্মচারী বলেছে!” ইউজি অভিযোগ করল।
“ইউজি,” জেনিন গম্ভীর গলায় বলল। “নোবারা আমার স্ত্রী। ওর সম্মান মানে আমার সম্মান। তুমি ওকে অসম্মান করবে না।”
ইউজি মাথা নিচু করল। নোবারা বিজয়ী হাসি দিল।
“আর নোবারা,” জেনিন এবার নোবারার চোখের দিকে তাকালো। “ইউজি কেবল আমার কর্মচারী নয়, ও আমার ভাই। ও না থাকলে আমি আজ এই সিংহাসনে বসে থাকতে পারতাম না। ওকে তুমি অবজ্ঞা করবে না।”
এবার ইউজি নোবারার দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হাসি দিল। নোবারার মুখটা আবার বাংলা পাঁচের মতো হয়ে গেল।
“আজকের মিটিঙে তোমরা দুজনেই যাবে।” জেনিন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিল। “ইউজি বাইরে থাকবে পেরিমিটার চেক করতে, আর নোবারা আমার সাথে ভেতরে বসবে। ফাইলটা নোবারার কাছেই থাকবে, কিন্তু ইউজি সেটা আগে থেকে এনক্রিপ্ট করে দেবে।”
“কিন্তু জেনিন…” নোবারা কিছু বলতে চাইল।
“কোনো কিন্তু নয়। তোমরা দুজন যদি নিজেদের মধ্যে এভাবে কামড়াকামড়ি করো, তবে আমার শত্রুরা তার সুযোগ নেবে। আমি চাই আমার বাঘ আর আমার বাঘিনী একসাথে গর্জন করুক।”
জেনিন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার মনে আজ এক অদ্ভুত প্রশান্তি। সে বুঝতে পারছে নোবারা তাকে পাওয়ার জন্য কতটা মরিয়া, আর ইউজি তাকে হারানোর ভয়ে কতটা তটস্থ। এই ঈর্ষা, এই অধিকারবোধ, এসবই জেনিনকে এক ধরণের অতিমানবীয় আনন্দ দিচ্ছে।
নোবারা ইউজির দিকে তাকিয়ে জিভ বের করে ভেংচি কাটল। “শুনলেন তো? বাঘিনী! আমি ভেতরে থাকব, আপনি বাইরে গার্ড দেবেন।”
ইউজি চোখ পাকিয়ে তাকালো। “বাঘিনী হতে হলে নখ থাকতে হয় মিসেস নূরশাদ। আপনার তো কেবল নূপুর আছে। সাবধানে থাকবেন, ভেতরে যেন আবার ভয় পেয়ে বসের পেছনে লুকিয়ে না পড়েন।”
“আপনি যান তো! নিজের পিস্তল পরিষ্কার করুন গে!” নোবারা গটগট করে উপরে চলে গেল।
ইউজি বিড়বিড় করে বলল, “মেয়েটা সত্যিই ডেঞ্জারাস। বসকে যেভাবে নিজের আঙুলে নাচাতে শুরু করেছে…আমাকে আরও সতর্ক হতে হবে।”
উপরে নিজের ঘরে গিয়ে নোবারা আয়নার সামনে দাঁড়ালো। তার মনের ভেতরটা এখন ঝড়ের মতো তোলপাড় হচ্ছে। জেনিনের জন্য তার এই মায়া কি কেবল প্রতিশোধের অংশ? নাকি জেনিন আর ইউজির এই অটুট বন্ধন তাকে সত্যিই হিংসেয় পোড়াচ্ছে? সে বুঝতে পারল জেনিনকে কব্জা করতে হলে আগে ইউজিকে তার পথ থেকে সরাতে হবে, না হলে ইউজিই কোনোদিন তার মুখোশ খুলে দেবে।
<><><><><><><><><>
সাউথ জোনের একটি পরিত্যক্ত গুদামঘরে আজ জেনিন নূরশাদের সেই বিশেষ মিটিং। বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে, যা চারপাশের ঘুটঘুটে অন্ধকারকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। গুদামের ভেতর নীলচে হ্যালোজেন লাইটের ম্লান আলোয় জেনিন বসে আছে তার চিরচেনা গম্ভীর ভঙ্গিতে। তার দুপাশে দুটি মেরু, বামে ইউজি, ডানে নোবারা। জেনিন আজ ডার্ক গ্রে রঙের একটা ওভারকোট পরেছে, যার ভেতরে ট্যাকটিক্যাল আর্মার লুকানো।
মিটিং শুরু হওয়ার আগে থেকেই ইউজি আর নোবারার মধ্যে ঠাণ্ডা যুদ্ধ চলছে। ইউজি বারবার নোবারার হাতে থাকা সেই ব্রিফকেসটির দিকে তাকাচ্ছে, যেন নোবারা ওটা বহন করার যোগ্যই নয়।
“ব্রিফকেসটা যেভাবে ধরেছেন, ওটা দেখে যে কেউ ভাববে আপনি বাজারের ব্যাগ নিয়ে যাচ্ছেন,” ইউজি নিচু স্বরে নোবারার কানের কাছে ফিসফিস করল।
নোবারা তেরছা চোখে ইউজির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বেঁকাল। “আমি কীভাবে ধরেছি সেটা আমার ব্যাপার। আপনি বরং আপনার ওই সস্তা পিস্তলটা ঠিকমতো কোমরে গুঁজেছেন কি না দেখুন, প্যান্ট থেকে না আবার খসে পড়ে।”
“সস্তা পিস্তল?” ইউজি দাঁত কিড়মিড় করে বলল। “এটা কাস্টম-মেড বেরেটা। আর আপনি যে সেন্সরটা ব্যাগে রেখেছেন ওটা উল্টো দিকে সিগন্যাল দিচ্ছে। একটু বুদ্ধি খাটালে বুঝতেন।”
“বুদ্ধি আমার আপনার চেয়ে অনেক বেশি। জেনিন আমাকে পাশে বসিয়েছে, আপনাকে বাইরে পাহারাদার বানিয়ে রেখেছেড়, এটাই আপনার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ,” নোবারা এক চিলতে হাসি দিয়ে জেনিনের দিকে একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে বসল।
জেনিন চুরুট টানতে টানতে তাদের এই বিড়বিড়ানি শুনছিল। সে উপভোগ করছিল এক ধরণের পৈশাচিক আনন্দ। জেনিন খুব শান্ত গলায় বলল, “ইউজি, গেটে সিগন্যাল দাও। ওরা আসছে।”
ইউজি বাইরে যাওয়ার আগে নোবারার দিকে তাকিয়ে আঙুল দিয়ে নিজের চোখ দেখালো, যার মানে ‘আমি তোমার ওপর নজর রাখছি’। নোবারা পালটা উত্তর হিসেবে নিজের হাত দিয়ে জেনিনের কোটের স্লিভটা একটু টেনে ঠিক করে দিল, যেন সে ইউজিকে দেখাচ্ছে জেনিন কার বেশি আপন।
জাপানিজ প্রতিনিধিদের সাথে মিটিং শুরু হতেই পরিবেশ গম্ভীর হয়ে গেল। নোবারা আজ ট্রান্সলেটর হিসেবে তার কাজ শুরু করল। তার জাপানি ভাষার ওপর দখল দেখে জেনিন নিজেও অবাক। জেনিন এক মুহূর্তের জন্য ভাবল, নোবারা কি তবে সত্যিই এই ১৫ বছরে নিজেকে এতটা শানিত করেছে?
মিটিংয়ের মাঝপথে হঠাৎ ইউজি ইয়ারপিসে সিগন্যাল দিল। “বস! রেড অ্যালার্ট! লোকাল গ্যাংস্টাররা পেরিমিটার ব্রেক করেছে। ওরা আপনার ব্যাকআপ ফোর্সের ওপর হামলা করেছে!”
জেনিন এক সেকেন্ডে উঠে দাঁড়ালো। তার হাতে থাকা চুরুটটা সে মেঝেতে পিষে ফেলল। “নোবারা, আমার পেছনে থাকবেন! ইউজি, পজিশন নাও!”
ঠিক তখনই গুদামের ওপরের কাঁচের ছাদ ভেঙে দুজন সশস্ত্র আক্রমণকারী নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ল। জেনিন বিদ্যুৎবেগে তার কোটের ভেতর থেকে পিস্তল বের করে লক্ষ্যভেদ করল। নোবারা এক মুহূর্তের জন্য ঘাবড়ে গেলেও পরক্ষণেই তার হাতে থাকা সেই ব্রিফকেসটা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করল।
ইউজি পেছন থেকে দৌড়ে এসে একটি স্লাইডিং কিক মেরে নোবারার সামনে থাকা একজনকে কুপোকাত করল। “দেখলেন তো? আমি না থাকলে আপনার সুন্দরী মুখটা এতক্ষণে ফুটো হয়ে যেত!” ইউজি গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে চেঁচিয়ে বলল।
“আমি নিজেই সামলাতে পারতাম! আপনার এই বীরত্ব দেখানোর দরকার ছিল না!” নোবারা চিৎকার করে উত্তর দিল। সে নিচু হয়ে জেনিনের ফেলে দেওয়া একটি ব্যাকআপ গান তুলে নিল।
লড়াই যখন তুঙ্গে, তখন জেনিন দেখল ইউজির পেছনে একজন ঘাতক চুরিকা হাতে এগোচ্ছে। জেনিনের বন্দুকের ম্যাগাজিন তখন খালি। জেনিন চেঁচিয়ে উঠল, “ইউজি, পেছনে!”
ইউজি যখন ফিরল, ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। কিন্তু আচমকা এক তীব্র শব্দের গুলিতে সেই ঘাতকটি ছিটকে পড়ল। জেনিন আর ইউজি দুজনেই অবাক হয়ে দেখল, নোবারা নূরশাদ দুই হাতে পিস্তল ধরে স্থির দাঁড়িয়ে আছে। তার লক্ষ্য ছিল নিখুঁত।
লড়াই শেষ হলো। গুদামঘরে এখন পোড়া বারুদ আর লাশের স্তূপ। জেনিন শান্ত হয়ে নিজের কোটটা ঝেড়ে ফেলল। ইউজি হাপাচ্ছিল, সে নোবারার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
“ভাগ্য ভালো আমি গান লোড করতে পারছিলাম,” নোবারা পিস্তলটা ইউজির দিকে এগিয়ে দিল। “কী যেন বলছিলেন ইউজি? আমি কেবল নূপুর পরতে জানি?”
ইউজি এক মুহূর্ত থমকে রইল। তারপর সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও মাথা নিচু করল। “ঠিক আছে, শটটা খারাপ ছিল না। কিন্তু পজিশন ভুল ছিল। আপনি যে স্টাইলে গুলি করেছেন ওতে আপনার কব্জি মচকে যেতে পারত।”
“কব্জি মচকাবে না আপনার মাথা মচকাবে?” নোবারা আবার ঝগড়া শুরু করল। “প্রাণ বাঁচালাম তাও জ্ঞান দিচ্ছেন? জেনিন, দেখুন ও কী অকৃতজ্ঞ!”
জেনিন হো হো করে হাসতে হাসতে ইউজির কাঁধে হাত রাখল। “ইউজি, মেনে নাও। আজ বাঘিনীই তোমাকে বাঁচিয়েছে।”
ইউজি গাল ফুলিয়ে বলল, “বস, আপনি ওকে লাই দিছেন বেশি। কাল থেকে ও আর আমাকে পাত্তাই দিবে না।”
“দিব না তো!” নোবারা জেনিনের হাত ধরে হেঁচকা টান দিল। “জেনিন, চলুন এই নোংরা জায়গা থেকে। আর ইউজি, আপনি এই ময়লাগুলো পরিষ্কার করুন, এটাই তো আপনার কাজ!”
নোবারা জেনিনকে টেনে নিয়ে গাড়ির দিকে হাঁটা দিল। ইউজি পেছনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করতে লাগল। “বিয়ে করলেই মেয়ে মানুষ বদলে যায়। পনেরো বছর ধরে বসের জন্য জান দিয়ে দিলাম, আর এই এক মাসের বউ এসে আমাকে সুইপার বানায়ে দিল! হায়রে কপাল!”
চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।।।।

