#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_২৪
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
ঢাকা শহরের ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুম। বাইরে রাস্তার প্রতিটি মোড়ে কালো পোশাকধারী, কানে ইয়ারপিস লাগানো পেশীবহুল সশস্ত্র পুরুষদের টহল। কেবল আমন্ত্রণপত্র থাকলেই ভেতরে ঢোকা যাচ্ছে না; তিনটি স্তরের বায়োমেট্রিক সিকিউরিটি আর মেটাল ডিটেক্টর পার হয়ে তবেই ভেতরে প্রবেশের অনুমতি মিলছে। আজ ‘নূরশাদ ফাউন্ডেশন’-এর বার্ষিক গালা নাইট, কিন্তু শহরের আন্ডারওয়ার্ল্ড আর রাজনৈতিক মহলের সবাই জানে, এটি আসলে জেনিন নূরশাদ ওরফে ‘জেড’-এর ক্ষমতার এক প্রকাশ্য মহড়া।
হোটেলের সামনে দীর্ঘ সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের দামী সব এসইউভি। কিন্তু সবচাইতে বড় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলো যখন কালো রঙের এক ডজন সাঁজোয়া মার্সিডিজের একটি কনভয় পোর্ট-কচেরে এসে থামল। মাঝখানের গাড়িটি থেকে যখন জেনিন নূরশাদ নামল, তখন চারপাশের বাতাসের চাপ যেন এক নিমেষে বেড়ে গেল। জেনিনের পরনে আজ চারকোল ব্ল্যাক টক্সিডো, সাদা শার্টের কলারটি শানিত খঞ্জরের মতো ধারালো। তার চোখে সেই চেনা গোল্ডেন ফ্রেমের সাদা কাঁচের সানগ্লাস, যার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ক্রূর শিকারি।
জেনিনের ঠিক পেছনেই নেমেছে নোবারা নূরশাদ। নোবারার পরনে আজ মধ্যরাতের মতো গাঢ় নীল রঙের একটি সিল্কের শাড়ি, আঁচলে রূপালী সুতোর কাজ যেন অন্ধকার আকাশে নক্ষত্ররাজি। তার গলায় জেনিনের দেওয়া দুর্লভ ব্লু ডায়মন্ডের নেকলেসটি জ্বলজ্বল করছে। নোবারা যখন জেনিনের হাত ধরে হোটেলের সিঁড়িতে পা রাখল, কয়েকশ ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একসাথে জ্বলে উঠল।
কিন্তু সেই আলোর ঝটকায় নোবারার চোখ ধাঁধিয়ে গেলেও সে বুঝতে পারল, সে এক একনায়কের সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী হিসেবে আজ বিশ্বের সামনে দাঁড়াচ্ছে।
কনভয়ের চারপাশ ঘিরে রেখেছে অন্তত ৫০ জন বডিগার্ড। তারা সবাই ‘নূরশাদ সিকিউরিটিজ’-এর সেরা এজেন্ট। তাদের কোটের ভেতরে সাব-মেশিনগান আর পিস্তলগুলো প্রস্তুত। ইউজি আজ কোনো স্যুট পরেনি, সে পরেছে জেনিনের পার্সোনাল প্রোটেকশন ইউনিটের প্রধানের ইউনিফর্ম। তার বেল্টে ঝোলানো স্টান গান আর গান-হলস্টারের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, সে আজ এক মূর্ত আতঙ্ক। ইউজি জেনিন আর নোবারার সামনে ছায়ার মতো এগোচ্ছে, তার চোখ প্রতিটি কোণ, প্রতিটি ছাদ আর প্রতিটি মানুষের হাতের মুভমেন্ট স্ক্যান করছে।
“কভার টু, পেরিমিটার ক্লিয়ার। জেনিন নূরশাদ এন্টারিং দ্য লবি,” ইউজি তার ইয়ারপিসে চাপা গলায় কমান্ড দিল।
লবিতে পা রাখতেই উপস্থিত আমন্ত্রিত অতিথিরা, যাদের মধ্যে এমপি, রাষ্ট্রদূত আর মাল্টি-মিলিয়নেয়াররা আছেন, সবাই কথা বলা থামিয়ে জেনিনের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। এটা কেবল সম্মান নয়, এটি এক ধরণের আদিম ভয়। জেনিন যখন হেঁটে যাচ্ছিল, ভিড়টা আপনাআপনি দুপাশে সরে যাচ্ছিল, যেন কোনো রাজা তার প্রজাদের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।
নোবারা অনুভব করল তার পা কাঁপছে। সে হ্যাপিনেসের ভান করলেও তার ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। এত ক্ষমতা, এত মানুষ, এত অস্ত্র, সবই কেবল একজনকে কেন্দ্র করে। সে জেনিনের হাতের বাঁধন শক্ত করে ধরল। জেনিন নিচু হয়ে নোবারার কানে ফিসফিস করল, “ঘাবড়াবেন না নূরা। আজ থেকে এই শহর দেখবে আপনি কার। মাথা উঁচু করে হাঁটুন।”
হোটেলের বলরুমে ঢোকার মুখে ইউজি নোবারার ব্যাগটি একবার চেক করল। নোবারা বিরক্ত হয়ে দাঁত এ দাঁত চেপে বলল, “ইউজির বাচ্চা, আমি ওনার স্ত্রী। আমার ব্যাগ চেক করার কী আছে?”
ইউজি কোনো কথা না বলে ব্যাগটি ফিরিয়ে দিয়ে বলল, “শত্রু কোনো আত্মীয় চেনে না ম্যাম। আর আজ রাতে আপনার চারপাশটা বসের শত্রুদের দিয়ে ভর্তি।”
বলরুমের ভেতরে এলাহী কাণ্ড। সোনার পাত মোড়ানো দেয়াল, ক্রিস্টালের ঝাড়লণ্ঠন আর কয়েক হাজার মোমবাতির আলো। জেনিনকে এক বিশেষ মঞ্চে বসানো হলো। তার চারপাশটা কাঁচের দেয়াল দিয়ে ঘেরা, যা বুলেটপ্রুফ। ইউজি তার পজিশন নিল জেনিনের ঠিক পেছনে। তার হাত সারাক্ষণ কোমরের অস্ত্রের খুব কাছাকাছি।
নোবারাকে এখন হোস্টেস হিসেবে সব সামলাতে হচ্ছে। জেনিনের প্রতিটি বিজনেস পার্টনারের সাথে তাকে কথা বলতে হচ্ছে। নোবারা আজ প্রথম বুঝতে পারল ‘নূরশাদ সম্রাজ্যের’ গভীরতা কতখানি। কেউ একজন এসে তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলল, “ম্যাম, জেনিন স্যারের হুকুমে আপনার জন্য আইসল্যান্ডে একটি রিসোর্ট কেনা হয়েছে।” অন্য একজন এল জেনিনের এক অবৈধ শিপমেন্টের কোড নিয়ে। নোবারা হিমশিম খাচ্ছিল। তাকে একইসাথে একজন লাবণ্যময়ী স্ত্রী এবং একজন চতুর পলিটিশিয়ানের মতো আচরণ করতে হচ্ছে।
“ম্যাম, ড্রিঙ্কস নেবেন?” এক ওয়েটার ট্রে এগিয়ে দিল।
নোবারা গ্লাস নিতে যাবে, অমনি ইউজি ওয়েটারের হাতটা চেপে ধরল। ইউজি তার সেন্সর দিয়ে গ্লাসটি স্ক্যান করল। ওয়েটার ভড়কে গেল। ইউজি গ্লাসটি চেক করে আবার নোবারার দিকে ফেরালো।
“ইউজি! আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন?” নোবারা দাঁতে দাঁত চিপে বলল। “সবাই দেখছে!”
“দেখলে দেখুক,” ইউজি নির্লিপ্ত। “এই ড্রিংকে যদি এক ফোঁটা ঘুমের ওষুধও থাকত, তবে কাল সকালে আপনি এই শহরে থাকতেন না।”
নোবারা রাগে লাল হয়ে জেনিনের দিকে তাকালো। জেনিন তখন এক বিদেশি রাষ্ট্রদূতের সাথে কথা বলছে, কিন্তু তার এক চোখ সারাক্ষণ নোবারার ওপর। জেনিন চুটকি বাজাতেই তার বডিগার্ডরা মুহূর্তের মধ্যে একটি মানব দেয়াল তৈরি করল যাতে জেনিন আর রাষ্ট্রদূতের কথা কেউ শুনতে না পারে। এটিই জেনিনের পাওয়ার। সে যেখানে দাঁড়ায়, সেখানেই সে একটি ব্যক্তিগত দুর্গ তৈরি করে ফেলে।
নোবারা দেখল লবির এক কোণে কয়েকজন বড় অফিসার দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের ইউনিফর্ম দেখে তার বুক ধক করে উঠল। তারা কি পুলিশ? নোবারার মনে হলো এই রাজকীয়তা আসলে এক ধরণের খাঁচা। বাইরে থেকে দেখলে এটা হীরের সিংহাসন, কিন্তু ভেতরে বসলে বোঝা যায় প্রতিটি হীরেই রক্ত লেগে আছে।
মিটিঙের মাঝপথে জেনিন মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালো। পুরো হলে পিনপতন নীরবতা। জেনিনের কণ্ঠস্বর ছিল শান্ত কিন্তু ভয়ংকর। “আজকের এই সন্ধ্যা নূরশাদ ফাউন্ডেশনের জন্য নয়, আজকের এই সন্ধ্যা একটি বার্তার জন্য। যারা মনে করেন এই শহর আইনের ওপর চলে, তাদের জন্য আমার একটিই কথা, আইন কেবল তারাই লেখে যাদের হাতে কলম থাকে, আর আমি জেনিন নুরশাদ সেই কলম তৈরি করি।”
সবাই হাততালি দিয়ে উঠল, কিন্তু সেই করতালিতে এক অদ্ভুত বিস্বাদ ছিল। নোবারা স্টেজ থেকে জেনিনকে দেখছিল। জেনিনের এই দাপট, এই কয়েকশ বডিগার্ডের নিরাপত্তা, এই হাজারো মানুষের ভয়, সবই তাকে এক ধরণের অতিমানবীয় রূপ দিচ্ছে। কিন্তু নোবারা দেখল ইউজির চোখ এখনো স্থির। ইউজি হঠাৎ করে জেনিনের কানে কিছু বলল।
জেনিনের চেহারায় কোনো পরিবর্তন হলো না, কিন্তু সে নোবারার দিকে ইশারা করল। ইউজি দ্রুত নোবারার কাছে এল। “ম্যাম, পেছনের দরজা দিয়ে বের হতে হবে। সিকিউরিটি ব্রিচ হয়েছে।”
নোবারা অবাক হলো। “সিকিউরিটি ব্রিচ? এত পাহারার মধ্যেও?”
“পাহারা থাকলে আক্রমণের ধরনও বদলে যায় ম্যাম,” ইউজি নোবারার বাহু ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই বলরুমের আলো নিভে গেল। বিশৃঙ্খলা শুরু হলো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, জেনিনের বডিগার্ডরা প্যানিক করল না। তারা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নাইট-ভিশন গগলস পরে চারপাশ ঘিরে ফেলল। জেনিন মঞ্চের ওপর স্থির দাঁড়িয়ে। ইউজি নোবারাকে নিয়ে একটি সিকিউর ফ্লোরের দিকে এগোচ্ছে। নোবারা দেখল জেনিনকে ঘিরে থাকা বডিগার্ডরা তাদের অস্ত্র বের করেছে।
“জেনিন কোথায়?” নোবারা চিৎকার করে উঠল।
“বস নিজের সুরক্ষা নিজে করতে জানেন। আপনি শুধু নিজের কথা ভাবুন,” ইউজি তাকে টেনে লিফটে ঢোকালো।
নোবারা বুঝতে পারল জেনিনের জীবনটা কতটা ভঙ্গুর। এই কয়েকশ কোটি টাকার বৈভব আর দাপটের আড়ালে প্রতিটি সেকেন্ডে মৃত্যুর অপেক্ষা। সে জেনিনের ক্ষমতার এই বীভৎস রূপ আগে কোনোদিন দেখেনি। জেনিন নূরশাদ আজ কেবল একজন সিইও নন, সে এক জ্বলন্ত টার্গেট। যেখানে জেনিন এক সম্রাট, ইউজি তার সবচাইতে শক্তিশালী ঢাল, আর নোবারা সেই রাজত্বের এক দিশেহারা রানী। ক্ষমতার শিখরে বাস করা যে কতটা বিপজ্জনক, তা আজ নোবারা নিজের চোখে দেখতে পারছে।
ওদিকে অন্ধকার হলে হাজার হাজার মানুষের কানফাটানো চিৎকার শোনা যাচ্ছিল, কিন্তু সেই বিশৃঙ্খলার মাঝেও জেনিন নূরশাদের পার্সোনাল প্রোটেকশন ইউনিট (PPU) কাজ করছিল ঘড়ির কাঁটার মতো নিখুঁতভাবে। নাইট-ভিশন গগলসের সবুজ আলোয় প্রতিটি এজেন্টকে মনে হচ্ছিল কোনো এক ভিনগ্রহের যোদ্ধা। জেনিন মঞ্চের ওপর থেকে এক চুলও নড়েনি। তার হাতে এখন একটি কম্প্যাক্ট সাব-মেশিনগান, যা সে তার ওভারকোটের নিচ থেকে বের করেছে।
“ইউজি, পজিশন?” জেনিনের ইয়ারপিসে কণ্ঠস্বর ছিল বরফের মতো শীতল।
“বস, মিসেস নূরশাদকে সেফ-রুমে পাঠানো হয়েছে। সেক্টর ফোর ব্রীচ হয়েছে। চারজন ঘাতক ভেন্টিলেশন দিয়ে ঢুকেছে,” ইউজির উত্তর এল ওপার থেকে। তার কণ্ঠস্বরের পেছনে ধস্তাধস্তি আর হাড় ভাঙার শব্দ স্পষ্ট।
জেনিন ম্লান হাসল। অন্ধকারে তার দাঁতগুলো চকচক করে উঠল। “ওদের জানাজা এখানেই হবে। কাউকে জীবিত ছাড়বে না।”
এদিকে নোবারা সেফ-রুমে অবরুদ্ধ হয়ে আছে। ঘরটি পুরোপুরি স্টিলের তৈরি, ভেতরে সিসিটিভি মনিটরের এক বিশাল দেওয়াল। ইউজি দরজার বাইরে পাহারায়। নোবারা মনিটরে দেখছিল নিচের বলরুমের অবস্থা। সে দেখল জেনিনকে। অন্ধকারে জেনিন যেন এক পিশাচ। সে কোনো লুকোচুরি খেলছে না, বরং সে নিজেই টোপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ তিনজন ঘাতক জেনিনের দিকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ল। কিন্তু জেনিন আগেই মঞ্চের ওক কাঠের টেবিলটা উল্টে দিয়ে আড়াল নিল। পাল্টা গুলিতে জেনিন একজনের কপাল এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল।
নোবারার বুকটা ধক করে উঠল। সে দেখল জেনিনের এজেন্টরা কীভাবে সাধারণ অতিথিদের আড়াল করে ঘাতকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এটা কোনো গ্যাং-ওয়ার নয়, এটা এক পেশাদার খুনিদের মহড়া।জেনিনের এই এলাহী আয়োজন কেবল প্রদর্শনের জন্য ছিল না, এটি ছিল শত্রুদের গর্ত থেকে বের করে আনার একটি মরণফাঁদ।
“ইউজি! দরজা খুলুন!” নোবারা ইন্টারকমে চিৎকার করল।
“সম্ভব নয় ম্যাম। বাইরে পরিস্থিতি এখনো ক্লিন নয়,” ইউজির কণ্ঠস্বর কর্কশ।
“আমি জেনিনের কাছে যেতে চাই! ওনি একা!”
“বস একা নন, বসই এখন এই বিল্ডিংয়ের সবচাইতে ভয়ংকর মানুষ। আপনি ভেতরে থাকুন,” ইউজি সংযোগ কেটে দিল।
নোবারা মনিটরে আবার চোখ রাখল। সে দেখল জেনিন এখন হলরুমের মাঝখানে। তার চারপাশটা রক্তে ভিজে গেছে। জেনিন তার হাতের অস্ত্রটা ফেলে দিয়ে একটি ট্যাকটিক্যাল নাইফ বের করল। সে যেন আজ বন্দুকের চেয়ে নিজের হাতের পেশীর ওপর বেশি ভরসা করতে চায়। জেনিন যখন শেষ ঘাতকটির টুঁটি চেপে ধরে দেয়ালে আছড়ে মারল, সেই মুহূর্তের জেনিনের চোখের উন্মাদনা দেখে নোবারা শিউরে উঠল। এই সেই জেনিন, যে গত রাতে তার চুলে বিলি কেটে দিয়েছিল? নাকি এই সেই ‘জেড’, যার গল্পে পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ড কেঁপে উঠত?
দশ মিনিট পর। হোটেলের জেনারেটর চালু হলো। আলো আসতেই দেখা গেল এক বীভৎস দৃশ্য। রাজকীয় ডেকোরেশনের ওপর এখন চাপচাপ রক্ত। জেনিন তার কোটটা খুলে মেঝেতে ফেলে দিল। তার সাদা শার্টের হাতা এখন লাল হয়ে আছে। সে খুব ধীরস্থিরভাবে মঞ্চ থেকে নামল। তার মুখে কোনো ভয়ের ছাপ নেই, বরং এক ধরণের তৃপ্তি।
“ইউজি, নোবারাকে নিয়ে আসো,” জেনিন হুকুম দিল।
ইউজি নোবারাকে নিয়ে হলরুমে ঢুকল। নোবারা যখন জেনিনের সামনে এসে দাঁড়ালো, সে দেখল জেনিনের পায়ের কাছে একটি নিথর দেহ পড়ে আছে। নোবারা বমি চেপে জেনিনের দিকে তাকালো।
“আপনি… আপনি ঠিক আছেন?” নোবারার গলা ধরে এল।
জেনিন নোবারার গালটা আলতো করে স্পর্শ করল। তার হাতে লেগে থাকা উষ্ণ রক্ত নোবারার গালে লেপ্টে গেল। “আমি বলেছিলাম না নূরা, এই শহর কলম দিয়ে চলে না। এই শহর চলে রক্ত দিয়ে। আজ যারা আমাকে মারতে এসেছিল, তারা জানত না যে জেনিন নূরশাদ তার নিজের প্রাসাদে কোনোদিন পরাজিত হয় না।”
ইউজি এক পাশে এসে দাঁড়ালো। তার কপালে একটা গভীর কাটা দাগ, যেখান থেকে রক্ত ঝরছে। “বস, ঘাতকদের শরীরে যে ট্যাটু দেখা গেছে, ওটা ‘ব্ল্যাক কোবরা’ গ্যাংয়ের। ওরা কারো হয়ে কন্ট্রাক্ট নিয়েছিল।”
জেনিনের চোখ দুটো ছোট হয়ে এল। “ইউজি, আজকের ইভেন্ট এখানেই শেষ করো। প্রতিটি গেস্টকে তাদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব এজেন্টদের। আর ওই লাশগুলো… সরানোর ব্যবস্থা করো।”
নোবারা স্তম্ভিত হয়ে দেখছিল কীভাবে জেনিন আর ইউজি কয়েক মিনিটের মধ্যে পুরো পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে ফেলল। হোটেলের ম্যানেজার থেকে শুরু করে পুলিশ কমিশনার, সবাই জেনিনের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো মামলা নেই, কোনো জিজ্ঞাসাবাদ নেই। জেনিন নূরশাদের ক্ষমতা আজ আইনের ঊর্ধ্বে চলে গেছে।
জেনিন নোবারার হাত ধরল। “আপনাকে আমি বলেছিলাম না, আজ থেকে আপনি এই সাম্রাজ্যের সাক্ষী হবেন? এই হলো আমার আসল জগত। চলুন এবার।”
গাড়িতে ফেরার পথে নোবারা একটি কথাও বলতে পারল না। সে কেবল তার গালে লেগে থাকা সেই রক্তটুকু অনুভব করছিল। জেনিন তার পাশের সিটে বসে ল্যাপটপে কী যেন দেখছিল। সে ইউজিকে ফোন করে বলল, “ইউজি, কাল সকালের মধ্যে ব্ল্যাক কোবরা গ্যাংয়ের লিডারের মাথা আমার টেবিলে চাই। কোনো এক্সকিউজ চলবে না।”
নোবারা জেনিনের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল, “আপনি কি সত্যিই মানুষ জেনিন? এতগুলো প্রাণ চলে গেল, আর আপনি এখনই পরবর্তী খুনের পরিকল্পনা করছেন?”
জেনিন ল্যাপটপ বন্ধ করে নোবারার দিকে ফিরল। তার চোখের চশমাটা সে খুলে ফেলল। জেনিনের চোখের সেই গভীর নীল মণিগুলো এখন এক অদ্ভুত অন্ধকারে ঢাকা। “আমি মানুষ হওয়ার চেষ্টা ছেড়ে দিয়েছি যেদিন আমাকে ওই ট্রেনের কামরায় একা ফেলে আসা হয়েছিল নূরা, যেদিন আমার বাবাই আমাকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে রিহ্যাব এ পাঠিয়েছিল। আমি এখন কেবল এক পাহাড়, যাকে সরিয়ে দেওয়ার সাধ্য কারো নেই। আপনি কি ভয় পাচ্ছেন?”
নোবারা জানালার বাইরে তাকালো। “আমি ভয় পাচ্ছি না জেনিন। আমি ঘৃণা করছি এই ক্ষমতাকে, যা আপনাকে একটা পাথরে পরিণত করেছে।”
জেনিন হাসল। সে নোবারার হাতটা নিজের হাতের ভেতর নিল। “ঘৃণা করুন নূরা। ঘৃণাই তো আপনাকে আমার কাছে আটকে রাখবে। কারণ আপনি চাইলেও এই জগত থেকে এখন আর বের হতে পারবেন না। আপনি এখন আমার অন্ধকারের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।”
নোবারা বুঝতে পারল, সে এক এমন সমুদ্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে তীরের কোনো নামগন্ধ নেই। জেনিন আর ইউজির এই যুগলবন্দী তাকে এক এমন জালে জড়িয়েছে, যেখান থেকে মুক্তি মানেই নিশ্চিত মৃত্যু।
<><><><><><><><><>
নূরশাদ ভিলার প্রধান শয়নকক্ষটি এখন নিঝুম। বাইরে ঝোড়ো হাওয়ার শব্দ আর বৃষ্টির ঝাপটা কাঁচের জানালায় আছড়ে পড়ছে, যেন প্রকৃতির ক্ষোভ এই অটল প্রাসাদকে গুঁড়িয়ে দিতে চায়। কিন্তু ভেতরের পরিবেশটা একদম বিপরীত। হোটেলের সেই বীভৎস রক্তারক্তি আর বারুদের গন্ধ পেছনে ফেলে জেনিন এখন এক অন্য মানুষ। সে তার রক্তমাখা শার্ট বদলে একটি সাধারণ ধূসর রঙের টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে বিছানার এক কোণে হেলান দিয়ে বসে আছে। তার হাতের সেই শানিত অস্ত্রটি এখন ড্রয়ারে বন্দি, আর তার দুর্ধর্ষ ‘জেড’ সত্তাটি যেন মুহূর্তের জন্য অবসাদে ঢাকা পড়েছে।
নোবারা একটি ছোট কাঁচের বাটিতে গরম পানি আর তুলা নিয়ে জেনিনের পাশে এসে বসল। জেনিনের কপালে একটি ছোট আঁচড় লেগেছে, সম্ভবত কোনো কাঁচের টুকরো ছিটকে এসেছিল। নোবারা খুব সন্তর্পণে তুলা দিয়ে সেই ক্ষতটি পরিষ্কার করে দিচ্ছে। জেনিন চোখ বন্ধ করে এই স্পর্শটুকু অনুভব করছে। পনেরো বছরের পাথুরে জীবনে সে অনেক আঘাত পেয়েছে, কিন্তু এমন মমতা তার ভাগ্যে জোটেনি।
নোবারার হাত কাঁপছিল। জেনিনের শান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। এই সেই মানুষ, যে একটু আগে একাই তিনজনকে উপরে পাঠিয়েছে। কিন্তু এখন তার চোখে কোনো হিংস্রতা নেই। নোবারার মনে পড়ে গেল তার বেনারসির ভাঁজে লুকানো সেই ছোট রেকর্ডারটির কথা, যেখানে জেনিনের ধ্বংসের প্রমাণ জমা হচ্ছে। সে কি সত্যিই পারবে জেনিনকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে? জেনিন যে তাকে আগলে রেখেছে, এই যে এক পৈশাচিক দুনিয়া থেকে তাকে রক্ষা করার জন্য জেনিন নিজের রক্ত ঝরাচ্ছে, এসবই কি কেবল অধিকারবোধ? নাকি এর গভীরে কোনো পবিত্র প্রেম লুকিয়ে আছে?
নোবারার চোখে জল চলে এল। এক ফোঁটা লোনা জল জেনিনের কপালে পড়ল। জেনিন চোখ খুলল। সে নোবারার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
“আপনি কি আমাকে ঘৃণা করছেন নূরা? আজকের ওই দৃশ্য দেখে আমাকে ঘিন্না হচ্ছে?” জেনিনের কণ্ঠস্বর ছিল ভাঙা এবং অত্যন্ত শান্ত।
নোবারা মাথা নিচু করল। সে অস্ফুট স্বরে বলল, “আমি জানি না। আমি কেবল ভাবছি, এই জীবনের শেষ কোথায়? কেন আমাদের চারপাশটা কেবল লাশে ভরে থাকে? কেন আপনি সাধারণ হতে পারেন না?”
জেনিন নোবারার হাতটা ধরে নিজের বুকের ওপর রাখল। নোবারা অনুভব করল জেনিনের হৃদপিণ্ড খুব দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে। “আমি তো সাধারণ হতে চেয়েছিলাম। ওই স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে আমি যখন আপনার দিকে তাকিয়েছিলাম, আমি কেবল এক কিশোর ছিলাম। কিন্তু এই সমাজ, আমার বাবা আর এই অপরাধ জগত আমাকে সেই জেনিন থাকতে দেয়নি। আজ যদি আমি সাধারণ হতে যাই, তবে এই শত্রুরা আপনাকে এক মুহূর্ত বাঁচতে দেবে না। আমি অমানুষ হয়েছি কেবল আপনাকে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে দেওয়ার জন্য।”
নোবারার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। এক তীব্র অপরাধবোধ তাকে গ্রাস করল। সে ভাবল, ‘আমি কি সত্যিই জেনিনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি? ও তো আমাকে ভালোবাসার জন্যই আজ শয়তানের সাথে লড়াই করছে!’
নোবারা হঠাৎ জেনিনকে জড়িয়ে ধরল। সে জেনিনের বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। “সরি জেনিন…আমি খুব খারাপ। আমি অনেক ভুল ভাবি আপনাকে নিয়ে।”
জেনিন অবাক হলো। সে নোবারার চুলে বিলি কেটে দিয়ে কপালে একটি দীর্ঘ চুমু আঁকল। “আপনি ভুল ভাবেন না নোবারা। আমি সত্যিই খারাপ। আমি এক নরকের সম্রাট। কিন্তু আপনার জন্য এই নরকের আগুনও আমি শীতল করে দিতে পারি।”
সেই মুহূর্তের নিস্তব্ধতায় মনে হলো জেনিন আর নোবারা পৃথিবীর সব সংঘাত ভুলে এক অদ্ভুত মোহময় রাজ্যে হারিয়ে গেছে। কিন্তু শান্তি এই ভিলায় বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। দরজায় এক কর্কশ টোকা পড়ল।
“বস! ডিস্টার্ব করার জন্য দুঃখিত, কিন্তু আপনার ব্যান্ডেজটা চেক করা দরকার।”
দরজার ওপাশ থেকে ইউজির কণ্ঠস্বর শুনে নোবারার আবেগ মুহূর্তেই উবে গেল। সে জেনিনকে ছেড়ে দিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। জেনিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ভেতরে এসো ইউজি।”
ইউজি ভেতরে ঢুকল। তার হাতে একটি ফার্স্ট এইড বক্স। সে নোবারার দিকে এমনভাবে তাকালো যেন নোবারা জেনিনের মাথার ওপর বসে থাকা কোনো এক বিষাক্ত মশা।
“ম্যাম, আপনি কি ওনার ক্ষত পরিষ্কার করছিলেন? না কি আপনার চোখের জলে বসকে আরও অসুস্থ করার পরিকল্পনা করছিলেন?” ইউজি তচ্ছিল্য করে বলল।
নোবারা ঝট করে উঠে দাঁড়ালো। “আপনার সমস্যা কী ইউজি? আমি আমার স্বামীর সেবা করছি, আপনার তাতে কেন জ্বলছে?”
“জ্বলছে?” ইউজি ফার্স্ট এইড বক্সটা টেবিলের ওপর দড়াম করে রাখল। “বসের কপালে যেটা লেগেছে ওটা তুলা দিয়ে ঘষলে হবে না, ওটা অ্যান্টিসেপটিক দিয়ে ক্লিন করতে হবে। আপনি তো ড্রামাকুইন, কেবল ড্রামা করতে জানেন। সরুন এখান থেকে!”
“আমি সরব না!” নোবারা জেনিনের হাত আঁকড়ে ধরল। “জেনিন, আপনি ওকে বলুন এখান থেকে যেতে। ও আমার ওপর হুকুম চালানোর কে?”
জেনিন আধশোয়া অবস্থা থেকে এক চিলতে হাসি দিয়ে দৃশ্যটা উপভোগ করতে লাগল। তার জীবনের দুই গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ এখন বাচ্চার মতো ঝগড়া করছে।
“ইউজি,” জেনিন শান্ত গলায় বলল। “নোবারা ঠিকই করছিল। তুমি এত হাইপার হচ্ছ কেন?”
“বস! আপনি কি বোঝেন না?” ইউজি প্রায় আর্তনাদ করে উঠল। “এই মেয়েটা আপনাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। আপনি আগে কোনোদিন চোট পেলে এভাবে বিছানায় শুয়ে থাকতেন না। আর এখন আপনি এক চিমটি আঁচড় খেয়ে রোমান্স করছেন? শত্রু যদি এখন হানা দেয়, আপনি তো বন্দুকের বদলে ফুলের মালা খুঁজবেন!”
“মুখ সামলে কথা বলুন ইউজি!” নোবারা এবার জেনিনের সামনের গ্লাস থেকে একটু পানি নিয়ে ইউজির মুখে ছিটিয়ে দিল। “এই নিন, আপনার মাথা ঠান্ডা করুন। সারাক্ষণ যুদ্ধ যুদ্ধ করে আপনার মগজটা বারুদে ভরে গেছে।”
ইউজি ভিজে মুখে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে যেন আগুন বেরোচ্ছে। “বস! আপনি কি দেখলেন ও কী করল? ও নূরশাদ সম্রাজ্যের সেকেন্ড-ইন-কমান্ডের মুখে পানি দিল?”
জেনিন এবার আর হাসি থামাতে পারল না। সে বিছানায় শুয়ে হেসে কুটিপাটি। “ইউজি… তোমার এই রূপটা আমি ১৫ বছরে দেখিনি। নোবারা, আপনি সত্যিই জাদুকর।”
“জাদুকর না ছাই!” ইউজি নিজের তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে গজগজ করতে লাগল। “বস, আপনি এই মেয়ের প্রেমে অন্ধ হয়ে একদিন আমাকেও সুইমিং পুলে চুবিয়ে মারবেন। আমি চললাম! আপনার ক্ষত আপনি নিজেই সারান।”
ইউজি হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দরজায় জোরে লাথি মারল। নোবারা পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলল, “আগামীকাল জেনিনের টিফিন আমি প্যাক করব, আপনি খাবেন না ওটা!”
“আমি স্যারের বিষ হলেও খাব, কিন্তু আপনার হাতের রান্না থেকে বসকে দূরে রাখব! দেখে নিবেন।” ইউজির কণ্ঠস্বর করিডোর থেকে শোনা গেল।
নোবারা আবার জেনিনের পাশে বসল। জেনিন তখনো হাসছে। নোবারা মিছেমিছি রাগের ভান করে বলল, “আপনি হাসছেন? ও আমাকে কতটা অপদস্থ করল দেখলেন?”
জেনিন নোবারার গাল টেনে দিল। “ও তোমাকে হিংসে করে। কারণ ও জানে, ১৫ বছর ও আমার কাছে থাকলেও, আমার হৃদয়ের যে কুঠুরিটা তোমার জন্য সংরক্ষিত ছিল, সেখানে ও কোনোদিন ঢুকতে পারেনি। আর তুমি এসেই সেই কুঠুরিটা দখল করে নিয়েছ।”
নোবারা জেনিনের কাঁধে মাথা রাখল। বাইরে ঝড় থেমে গেছে, কিন্তু নোবারার মনের ভেতরে অন্য এক ঝড় শুরু হয়েছে। সে ভাবল, ‘ইউজি হয়তো ঠিকই বলেছে। আমি জেনিনকে দুর্বল করে দিচ্ছি। কিন্তু এই দুর্বলতাই হয়তো জেনিনকে এক নতুন জীবন দেবে!”
জেনিন নোবারার চোখের দিকে তাকিয়ে একটু দুষ্টুমিভরা হাসি হাসল। সে জানত নোবারাকে কীভাবে একটু রাগিয়ে দিলে পরিবেশটা আরও জমে উঠবে। নোবারার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে জেনিন গভীর স্বরে বলতে শুরু করল,
“Mohabbat mein humne khud ko gawa diya, Aur tumne aate hi sara nizam badal diya… Ab log kehte hain ke Zenin kamzor ho gaya hai, Shayad tumne mere dil mein koi jaadu chala diya!”
নোবারা ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “আপনি কি এখন কবি হয়ে গেলেন? নাকি আমাকে খোঁচা দিচ্ছেন?”
জেনিন হাসল! এবার একটু বেশি ঝুকে এসে ওর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“Itna guroor mat karo ae haseen-e-wafa, Ke hum ne tumhein sar pe bitha rakha hai… Warna hum toh wo aatish hain, Jisne dunya ko jala rakha hai!”
শায়েরিটা শেষ করে জেনিন নিজেই একটু লজ্জা পেল কি? না, সে জেনিন। তার ইগো তাকে লজ্জিত হতে দেয় না। বরং সে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে নোবারাকে নিজের দিকে আরও টেনে নিল।
“বেবিডনের জন্য আমার মতো নির্দয় লোককেও এখন শায়েরি আওড়াতে হচ্ছে। ইউজি দেখলে নির্ঘাত নিজেকে গুলি করে দিত এই দৃশ্য দেখার আগে!”
বলেই জেনিন শব্দ করে হেসে উঠল। নোবারা অবাক হয়ে ওর বুকের ওপর থেকে মাথা তুলে তাকাল। ওর চোখে মুখে রাজ্যের বিস্ময়। অবশ্য জেনিনের শায়েরি কাজে দিয়েছে! নোবারার মন গলতে শুরু করেছে। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি…আপনি শায়েরিও জানেন? একজন মাফিয়া সিইও-র মুখে উর্দু কবিতা? বিশ্বাস হচ্ছে না!” নোবারার গলায় তখনো ঘোর।
জেনিন একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। ওর সেই চিরচেনা অহংকারী চাউনি ফিরে এল। সে নোবারার চুলের একটা গোছা আঙুলে জড়াতে জড়াতে ঠান্ডা গলায় বলল,
“শুনুন মিসেস নুরশাদ, জেনিন কোনো কাজ বিনা কারণে করে না। তিন বছর আগে করাচির এক ড্রাগ লর্ডকে বাগে আনতে আমাকে টানা ছ’মাস তার সাথে ‘আদব’ আর ‘তহজিব’ নিয়ে নাটক করতে হয়েছিল। সেই বুড়ো খবিশটা শায়েরি ছাড়া কথা বলত না। তাকে ইমপ্রেস করে তার সাম্রাজ্য দখল করার জন্য আমাকে আস্ত এক ডজন দিউয়ান-এ-গালিব মুখস্থ করতে হয়েছিল।”
জেনিন একটু থামল, ওর চোখের মণিটা চিকচিক করে উঠল একটা নিষ্ঠুর তৃপ্তিতে।
“আমি ওগুলো শিখেছিলাম শত্রুর বুকে ছুরি বসানোর জন্য। কিন্তু আজ বুঝলাম, ওই জ্ঞানটাও তোমার মতো জেদি মেয়েকে সামলানোর জন্যও বেশ কাজে দেয়। মাফিয়া সিইও হওয়া মানে শুধু গান চালানো নয়, নোবারা, কাকে কোন ভাষায় ঘা দিতে হয়, সেটা জানাও একধরণের আর্ট।”
নোবারা থমকে গেল। সে ভাবছিল জেনিন হয়তো মনের টানে কবিতা বলছে, কিন্তু এর পেছনেও যে এমন একটা রক্তাক্ত ইতিহাস আছে, সেটা ভাবেনি। সে আরো কিছু বলতেই যাবে, কিন্তু জেনিন সে সুযোগ আর দিল না। নোবারার কোলে মাথা রেখে সে শুয়ে পড়লো। শরীরটা যেন এই ধকলগুলো আর সইতে পারছে না।
নোবারা চুপচাপ বসে রইল। জেনিনের মতো পাহাড়সম দৃঢ় একজন মানুষ যখন এভাবে কারো কোলে মাথা রাখে, তখন সেই দৃশ্যটা ভয়ংকর সুন্দর লাগে। ওর কপালে দু-একটা অবাধ্য চুল এসে পড়েছে, সেই চুলে হাত বুলিয়ে দিতে গিয়েও নোবারা থমকে গেল।
বাইরে বৃষ্টির ঝাপটা তখনো জানলায় আছড়ে পড়ছে। জেনিনের নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে এল। ঘুমের ঘোরেও জেনিনের ভ্রু দুটো সামান্য কুঁচকে আছে, যেন অবচেতন মনেও সে কোনো এক অদৃশ্য শত্রুর সাথে লড়াই করছে। নোবারা ভাবল, ‘এই মানুষটার বাইরের খোলসটা কত কঠিন, কত রুক্ষ! অথচ ভেতরে সে কতটা নিঃসঙ্গ যে, একটু শান্তির খোঁজে আমার মতো একটা মেয়ের আশ্রয়ে এভাবে লুটিয়ে পড়ল!’
চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।।।।।
(মন্তব্য করছেন না যে! রিচ তো একদম তলায়!☹️💔)

