Soulmate_to_Enemy #পর্ব_২৫

0
2

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_২৫
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

সকাল ১০টা। জেনিন তার স্টাডি রুমে বসে একটি গ্লোবাল শিপমেন্টের ম্যাপ দেখছিল। নোবারা কফির কাপ হাতে নিয়ে ভেতরে ঢুকল। জেনিন তাকে দেখেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। সে দ্রুত এগিয়ে এসে নোবারার কোমর জড়িয়ে ধরল। জেনিনের এই সান্নিধ্য পাওয়ার ধরনটা খুব উগ্র। সে নোবারার ঘাড়ে নিজের মুখ গুঁজে দিয়ে এক দীর্ঘ শ্বাস নিল।

“এত দেরি করলেন কেন? আমি তো আপনার অপেক্ষায় ছিলাম,” জেনিনের কণ্ঠে এক ধরণের অভিযোগ মেশানো উগ্রতা।

“আমি মাত্র নিচ থেকে আসলাম জেনিন। আপনার জন্য কফি বানাচ্ছিলাম,” নোবারা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।

“আপনার কফি বানানোর দরকার নেই। আমি দশজন শেফ রেখেছি। আপনার কাজ শুধু আমার সামনে বসে থাকা। আমি যখন কাজ করি, আমার ফোকাস নড়ে যায় যদি আপনি চোখের আড়ালে থাকেন। আমার চিন্তা হয় আপনাকে নিয়ে।” জেনিন নোবারার হাতটা শক্ত করে ধরল, যেন সে পালিয়ে যাবে।

“জেনিন, আপনি আমাকে ব্যথা দিচ্ছেন,” নোবারা মৃদু কণ্ঠে বলল।

জেনিন তৎক্ষণাৎ হাত ছেড়ে দিল, কিন্তু তার চোখে সেই পসেসিভ নেশা কমল না। “ব্যথা? আমি আপনাকে কোনোদিন ব্যথা দিতে চাইনি নূরা। আমি শুধু চাই আপনি আমার অস্তিত্বের সাথে মিশে থাকুন। শুনুন, আজ থেকে আপনি এই রুমের বাইরে কোথাও যাবেন না। আমি আপনার জন্য এখানেই ল্যাপটপ আর বইয়ের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।”

নোবারা মনে মনে হাসল। জেনিন তাকে নিজের কাছে আটকে রাখতে চায়, আর এটাই নোবারার জন্য সবচাইতে বড় সুযোগ। জেনিনের নাকের ডগায় বসেই সে তার গোপন নথিপত্র ঘেঁটে দেখবে।
“ঠিক আছে। আমি আপনার পাশেই থাকব,” নোবারা মেকি মিষ্টি করে হাসল।

জেনিন আবার তার কাজে মগ্ন হলো। সে ল্যাপটপে একটি এনক্রিপ্টেড কোড টাইপ করছিল। নোবারা খুব কৌশলে জেনিনের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো। সে দেখল জেনিন একটি ফোল্ডার ওপেন করেছে যার নাম ‘প্রজেক্ট টাইটান’। নোবারা জানে এই প্রজেক্টটি জেনিনের স্বপ্নের প্রজেক্ট, যা দিয়ে সে পুরো এশিয়ান আন্ডারওয়ার্ল্ডের একচ্ছত্র অধিপতি হতে চায়।

নোবারা জেনিনের কাঁধে হাত রাখল। “আচ্ছা, এই ‘টাইটান’ জিনিসটা কী? আপনি ইদানিং এটা নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকেন।”

জেনিন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। সে ঘুরে নোবারার দিকে তাকালো। তার চোখে এক পলক সন্দেহ উঁকি দিলেও নোবারার মায়াবী হাসির কাছে তা হেরে গেল। “এটি একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যা দিয়ে বিশ্বের প্রতিটি অবৈধ লেনদেন আমার সার্ভারের ভেতর দিয়ে হবে। প্রতিটি ডিল থেকে আমি ৫% কমিশন পাব, আর কেউ জানবেও না আমি কে!”

নোবারা বুঝতে পারল এটিই সেই চূড়ান্ত প্রমাণ। যদি এই সার্ভারের এক্সেস কোড সে জোগাড় করতে পারে, তবে সে পুরো সিস্টেমটা কলাপ্স করে দিতে পারবে। সে জেনিনের ডেস্কে রাখা তার ব্যক্তিগত স্মার্টফোনের দিকে তাকালো। ফোনের স্ক্রিন লক করা, কিন্তু নোবারা লক্ষ্য করেছে জেনিন তার আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে।

দুপুরবেলা জেনিন যখন একটি কনফারেন্স কলে ব্যস্ত, নোবারা তখন বই পড়ার ভান করে জেনিনের প্রতিটি নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করছিল। জেনিন তার ফোনটি টেবিলের ওপর রেখে ল্যাপটপে ডেটা এন্ট্রি করছিল। হঠাৎ জেনিনকে ইউজি ডাকতে এল।

“বস, ইউরেশিয়ান ক্লায়েন্টরা লাইনে আছে। আপনার সিকিউর লাইনটা নিচে কাজ করছে না, আপনাকে কন্ট্রোল রুমে যেতে হবে।” ইউজি ভেতরে ঢুকেই নোবারার দিকে এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিল। ইউজি এখনো নোবারাকে এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্বাস করে না।

জেনিন বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালো। সে নোবারার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি পাঁচ মিনিটে আসছি। আপনি এখান থেকে এক চুলও নড়বেন না।”

জেনিন বেরিয়ে যেতেই নোবারা বিদ্যুৎবেগে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। জেনিন তার ফোনটি নিয়ে যেতে ভুলে গেছে। নোবারার হৃদপিণ্ডটা সজোরে ড্রাম পেটাচ্ছিল। সে জানে ইউজি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। সে দ্রুত জেনিনের ল্যাপটপটা দেখল। সেখানে লগ-ইন সেশন এখনো অ্যাক্টিভ।

নোবারা তার নিজের ফোন বের করল। সে দ্রুত ‘প্রজেক্ট টাইটান’-এর মেইন কনফিগারেশন পেজের ছবি তুলতে শুরু করল। এক পাতা, দুই পাতা… প্রতিটি পাতায় হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির ইতিহাস। নোবারার হাত কাঁপছে। সে জানে একবার ধরা পড়লে জেনিন তাকে হয়তো মেরে ফেলবে না, কিন্তু সে তাকে এমন জায়গায় পাঠাবে যেখান থেকে কোনোদিন ফেরা সম্ভব নয়।

হঠাৎ করিডোরে পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। নোবারা দ্রুত নিজের ফোনটি শাড়ির ভাঁজে লুকিয়ে ফেলল এবং একটি গল্পের বই হাতে নিয়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।

দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল ইউজি। তার হাতে একটি আইপ্যাড। সে জেনিনের টেবিলের কাছে গিয়ে দেখল ল্যাপটপটি খোলা। ইউজি সন্দেহজনক চোখে নোবারার দিকে তাকালো।

“আপনি কি টেবিলের কাছে গিয়েছিলেন ম্যাম?” ইউজি খুব কর্কশ গলায় জিজ্ঞেস করল।

নোবারা শান্তভাবে বইয়ের পাতা উল্টে বলল, “আমি কেন টেবিলের কাছে যাব? আমি তো আপনার বসের হুকুম পালন করছি। জানালার বাইরে বৃষ্টির ছাঁট দেখছিলাম।”

ইউজি টেবিলের কাছে গিয়ে ল্যাপটপের মাউসটা নাড়ালো। সে দেখল ‘প্রজেক্ট টাইটান’-এর পেজটি খোলা। ইউজির চোখ সরু হয়ে এল। সে জানে জেনিন সাধারণত কাজ শেষ না করে স্ক্রিন খোলা রাখে না।

“বস তার ফোনটি নিয়ে যেতে বলেছিলেন,” ইউজি ফোনটি হাতে নিল। সে ফোনটি উল্টেপাল্টে দেখল নোবারার কোনো আঙুলের ছাপ সেখানে আছে কি না। “আপনি খুব চালাক ম্যাম। কিন্তু মনে রাখবেন, বস আপনার প্রেমে অন্ধ হলেও আমি কিন্তু চোখ খোলা রাখি। আমি জানি আপনি এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন।”

নোবারা বইটা বন্ধ করে ইউজির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। তার চোখে এখন এক অপ্রতিরোধ্য তেজ। “আপনার সমস্যার শেষ নেই ইউজি। আপনার কি মনে হয় আমি জেনিনের ব্যবসার ওপর নজর রাখছি? আমি তো জেনিনকে এই পথ থেকে বের করতে চাই। আপনিই তো ওকে এই অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।”

“আমি ওনাকে রাজা বানাচ্ছি!” ইউজি চেঁচিয়ে উঠল। “আর আপনি ওনাকে ভিখারি বানাতে চান। আপনি ওনার এই সিংহাসনটা কেড়ে নিতে চান।”

“সিংহাসন?” নোবারা উপহাস করে হাসল। “এই রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সিংহাসন জেনিনের কোনো কাজে আসবে না ইউজি। যেদিন পুলিশ ওর দরজায় কড়া নাড়বে, সেদিন আপনার এই বীরত্ব কোথায় থাকবে?”

ইউজি এক পা এগিয়ে এল। সে আঙুল উঁচিয়ে বললো, “পুলিশ আসার আগে আমি আপনার গলা টিপে ধরব নোবারা। আপনি যদি বসের কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করেন—”

“কী করবে তুমি ইউজি?”
জেনিনের গম্ভীর কণ্ঠস্বর দরজার ওপাশ থেকে ভেসে এল। জেনিন ভেতরে ঢুকল। তার চোখ দুটো এখন রাগে জ্বলছে। সে ইউজিকে নোবারার এত কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সহ্য করতে পারছে না।
ইউজি তৎক্ষণাৎ পিছিয়ে গেল। “বস, আমি কেবল…”

জেনিন গর্জে উঠল। “নোবারার সাথে আঙুল নামিয়ে কথা বলো, ইউজি। নোবারা জেনিন নুরশাদ এর স্ত্রী। ওর সম্মান রক্ষা করা আমার দায়িত্ব।”

ইউজির মনক্ষুণ্ণ হলো ঠিকই, কিন্তু এই মুহূর্তে জেনিনকে কিছুই বোঝানো যাবেনা। সে অগত্যা মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেল, কিন্তু যাওয়ার আগে সে নোবারার দিকে এমন এক দৃষ্টি দিল যা বলে দিচ্ছিল, ‘যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।’

জেনিন নোবারার কাছে এল। সে নোবারার দুহাত ধরে তার নিজের মুখে রাখল। “ওর কথায় আপনি কি কষ্ট পেয়েছেন নূরা?”

নোবারা জেনিনের বুকে মাথা রাখল। সে অনুভব করল তার ব্লাউজের ভাঁজে থাকা ফোনটি তার গায়ের সাথে বিঁধছে। সেখানে আছে জেনিনের পতনের প্রথম অকাট্য প্রমাণ। নোবারার মনে এক বিচিত্র হাহাকার শুরু হলো। সে জেনিনকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আমি ভয় পাচ্ছি জেনিন। আমি এই জগতটাকে ভয় পাচ্ছি। আপনি কেন সব ছেড়ে দিয়ে সাধারণ হতে পারেন না?”

জেনিন নোবারাকে আরও নিবিড়ভাবে জাপটে ধরল। “আমি সাধারণ হতে পারি না নোবারা, কারণ আমি সাধারণ নই। আমি আপনার জন্য এই পৃথিবীর সবচাইতে শক্তিশালী মানুষ হতে চাই। আর কেউ আপনার দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারবে না।”

জেনিন নূরশাদ আজ তার উন্মাদ ভালোবাসায় অন্ধ। সে বুঝতে পারছে না তার বুকেই নোবারা লুকিয়ে রেখেছে তার কালনাগিনীর বিষ। নোবারা প্রমাণ সংগ্রহ করছে, সে জেনিনের প্রতিটি গোপন ডিল রেকর্ড করছে। সে জানে, এই পথটা তাকে হয়তো জেনিনের থেকে চিরতরে দূরে সরিয়ে দেবে, কিন্তু জেনিনকে বাঁচানোর জন্য এর চেয়ে বড় কোনো পথ তার সামনে খোলা নেই।

<><><><><><><><><>

বাইরে শ্রাবণের অবিরাম ধারা নূরশাদ ভিলার প্রতিটি ইটে এক বিষণ্ণ সুর তুলে চলেছে। মেঘের বুক চিরে মাঝে মাঝে বিজলী চমকাচ্ছে, আর সেই ক্ষণিক আলোয় জানালার কাঁচের গায়ে গড়িয়ে পড়া জলের ফোঁটাগুলোকে মনে হচ্ছে গলিত রূপোর অশ্রু। জেনিন নূরশাদের বিশাল বেডরুম আজ এক মায়াভরা আলোয় আবছা হয়ে আছে। ঘরের কোণে রাখা অ্যারোমা ডিফিউজার থেকে চন্দন আর কস্তুরীর এক মৃদু সুবাস ভেসে আসছে, যা জেনিনের উগ্র জগতকেও যেন খানিকটা শান্ত করে দিয়েছে।

জেনিন আজ কোনো ফাইলে হাত দেয়নি। সে গত কয়েক ঘণ্টা ধরে কেবল নোবারার দিকে তাকিয়ে আছে। নোবারা জানালার পাশের ডিভানে আধশোয়া হয়ে একটি কবিতা পড়ছিল। জেনিন ধীর পায়ে এগিয়ে এসে নোবারার পায়ের কাছে মেঝের ওপর বসল। একজন মাফিয়া ডন, যার এক ইশারায় আন্ডারওয়ার্ল্ড কাঁপে, সে আজ তার স্ত্রীর পায়ের কাছে এক সাধারণ প্রেমিকের মতো নতজানু।

জেনিন নোবারার পায়ের তলায় নিজের হাতের তালু রাখল। নোবারার পা কাঁপছে না, কিন্তু তার হৃদস্পন্দন জেনিনের স্পর্শে দ্রুত হয়ে উঠেছে।

নোবারা কবিতার বই থেকে চোখ সরিয়ে জেনিনের দিকে তাকালো। জেনিনের চোখের কুচকুচে কালো মণিগুলোতে আজ কোনো বরফ নেই, আছে এক সমুদ্র সমান তৃষ্ণা। নোবারা জেনিনের মাথায় হাত রাখল, তার আঙুলগুলো জেনিনের সিল্কি চুলের ভাঁজে হারিয়ে গেল। জেনিন চোখ বন্ধ করে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস নিল।

“আপনি কি জানেন নূরা?” জেনিন ফিসফিস করে বলল, “লন্ডনের সেই কনকনে শীতের রাতে যখন আমি ফুটপাতে রক্তমাখা হাত নিয়ে বসে থাকতাম, তখন আমি কেবল আপনার এই আঙুলের ছোঁয়া কল্পনা করতাম। আমি ভাবতাম, যদি একবার এই হাতের ছোঁয়া পাই, তবে আমি আমার পুরো অন্ধকার জগতটা এক নিমিষে বিসর্জন দেব।”

নোবারার বুকের ভেতরটা কামড়ে ধরল। এই জেনিনকে সে চেনে না। এই জেনিন তো তার সেই ছোটবেলার জেনিন, যে নোবারার একটি চোট লাগলে পুরো স্কুল মাথায় তুলত। নোবারা জেনিনের কপালটা নিজের দিকে টেনে আনল এবং খুব আলতো করে সেখানে একটি চুমু আঁকল। জেনিন যেন এক যন্ত্রণাকাতর শিশু, যে আজ কেবল শান্তি খুঁজে পেয়েছে।

“জেনিন,” নোবারা খুব নিচু স্বরে ডাকল, “আপনি কেন এই পথে হাঁটলেন? আপনি তো কবি হতে পারতেন, আপনি তো আকাশের নক্ষত্র গুনতে পারতেন। কেন আপনার হাতে সবসময় রক্তের ঘ্রাণ থাকে?”

জেনিন নোবারার হাতটা নিজের গালের সাথে ঘষে বলল,
“শহর যখন কসাইখানায় পরিণত হয় নোবারা,
তখন কলম তুলে নেওয়া বিলাসিতা মাত্র।
আমি হাত রাঙিয়েছি যাতে তোমার হাত সাদা থাকে,
আমি নরকবাস করছি যাতে তুমি স্বর্গের স্বপ্ন দেখতে পারো।”

নোবারার চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল। সে জেনিনের ঠোঁটের কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এল। তাদের নিঃশ্বাস এক হয়ে মিশে যাচ্ছে। জেনিন নোবারার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। জেনিনের স্পর্শে আজ কোনো জবরদস্তি নেই, আছে এক গভীর আর্তি। সে নোবারার কাঁধে জেনিনের তপ্ত নিঃশ্বাস পড়তে নোবারা চোখ বুজে ফেলল।

জেনিন নোবারার ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিয়ে মৃদুস্বরে বলতে লাগল, “লোকে বলে আমি ‘জেড’, আমি নিষ্ঠুর। কিন্তু ওরা জানে না, আমার প্রতিটি নৃশংসতার পেছনে কেবল একটাই উদ্দেশ্য ছিল, নিজেকে এত শক্তিশালী করা যাতে কেউ কোনোদিন আমাকে তোমার থেকে আলাদা করতে না পারে। আমি তোমাকে একটি সোনার খাঁচায় বন্দি করেছি নোবারা, কারণ বাইরের পৃথিবীটা বড় নোংরা। ওখানে তোমার মতো এক ফোঁটা শিশির ম্লান হয়ে যাবে। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম একজন সাধারণ মানুষের মতো!”

নোবারা জেনিনকে জড়িয়ে ধরল। তার মনে হলো সে এক বিশাল আগ্নেয়গিরিকে আলিঙ্গন করে আছে, যা যে কোনো সময় তাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারে, অথচ যার উষ্ণতা ছাড়া সে আজ বাঁচতেও পারছে না। নোবারা জেনিনের কানে কানে বলল, “জেনিন, আমি কি আপনার মুক্তি হতে পারি না? আমি কি পারি না আপনাকে এই শিকল থেকে বের করে আনতে?”

জেনিন নোবারার ঠোঁটে আঙুল রাখল। “মুক্তি? আপনিই তো আমার সবচাইতে সুন্দর বন্দিত্ব নূরা। আমি আপনার এই মায়ার কাছে সারাজীবন বন্দি থাকতে চাই।”

জেনিন নোবারাকে পাজাকোলা করে তুলে নিয়ে বিছানার ওপর শুইয়ে দিল। ঘরের আলো একদম নিভে গেছে, কেবল বাইরের বিজলীর চমক মাঝেমধ্যে তাদের অবয়বকে আলোকিত করছে। জেনিন নোবারার ওপর ঝুঁকে পড়ে তার কপালে, চোখে আর চিবুকে অগুনতি ছোট ছোট চুমু এঁকে দিতে লাগল। প্রতিটি স্পর্শে মিশে ছিল এক বুক হাহাকার আর অপ্রকাশিত ভালোবাসা।

নোবারা অনুভব করছিল জেনিনের শরীরটা আগুনের মতো গরম। জেনিন নোবারার হাতের তালুতে নিজের মুখ ঘষতে ঘষতে আওড়ালো,
“তেরে ইশক মে হাম ইস কদর খো গায়ে হ্যায়,
কি খোদ কো হি তেরে পাস ছোড় আয়ে হ্যায়।”

নোবারার মনে হলো তার শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে জেনিনের অস্তিত্ব মিশে যাচ্ছে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে তার মনের এক কোণে সেই নীল ফাইলের কথা ভেসে উঠল। সেই রক্তমাখা জমি, সেই আর্তনাদ। নোবারা নিজেকে শক্ত করল।

জেনিন যখন নোবারার ঘাড়ে নিজের ঠোঁট রাখল, নোবারা জেনিনকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। সে জেনিনকে জড়িয়ে ধরে তার কান্নার শব্দ লুকানোর চেষ্টা করল। জেনিন ভাবল এটা আবেগের কান্না, সে জানত না এটা ছিল এক চরম বিশ্বাসঘাতকতার আগাম ক্ষমা প্রার্থনা।

“আপনি কাঁদছেন নূরা? আমার স্পর্শ এ আপনার খারাপ লাগছে? লাগলে বলুন, দ্বিতীয় বার আপনার ইচ্ছা র বিরুদ্ধে যাবো না।” জেনিন মুখ তুলে তাকালো। তার চোখে এক বিচিত্র অস্থিরতা।

“না জেনিন,” নোবারা হাসার চেষ্টা করল, “আমি শুধু ভাবছিলাম, সময় যদি এখানেই থেমে যেত! যদি কাল সকালে কোনো বন্দুকের আওয়াজ না থাকত, কোনো সন্দেহ না থাকত… শুধু আপনি আর আমি।”

জেনিন নোবারার চোখের জল মুছে দিয়ে বলল, “কাল সকালে কী হবে আমি জানি না। কিন্তু আজ রাতটা কেবল আমাদের। আজ রাতে ‘জেড’ মারা গেছে নূরা, আজ রাতে কেবল তোমার সেই পুরনো জেনিন জেগে আছে।”

জেনিন নোবারার বুকে মাথা রেখে শান্ত হয়ে শুয়ে পড়ল। তার ভারী নিঃশ্বাসগুলো এখন ছন্দে ফিরে এসেছে। নোবারা জেনিনের চুলে হাত বুলাতে বুলাতে জানালার বাইরে তাকালো। অন্ধকারের মেঘগুলো যেন আরও ঘনীভূত হচ্ছে। সে জানে, এই রাতের পর এক ভয়ংকর সকাল আসবে। সে জানে, ইউজি বাইরে ওত পেতে আছে।

জেনিন নূরশাদ আজ শান্তিতে ঘুমাচ্ছে, কারণ সে বিশ্বাস করে সে তার ভালোবাসাকে জয় করেছে। কিন্তু সে জানে না, তার শ্রেষ্ঠ বন্ধু আর তার শ্রেষ্ঠ শত্রু এখন একই ছাদের নিচে। নোবারার এই আদরটুকু জেনিনের জন্য ছিল এক শেষ বিদায়ের মহড়া, যা জেনিন কোনোদিন টেরও পাবে না যতক্ষণ না পুরো পৃথিবী তার পায়ের তলা থেকে সরে যায়।

<><><><><><><><><>

নূরশাদ ভিলার সুউচ্চ ছাদের ওপর এখন মধ্যরাত। নিচের তলায় নোবারা হয়তো শান্তিতে ঘুমাচ্ছে, কিংবা নিজের সংগৃহীত প্রমাণের বোঝা নিয়ে অস্থিরতায় ভুগছে, সে খবর ওপরের এই ছাদে পৌঁছায় না। এখানে কেবল হু হু করে বাতাস বইছে, আর আকাশের মেঘের আড়ালে চাঁদটা যেন এক রক্তাক্ত সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জেনিন নূরশাদ ছাদের রেলিং ধরে একা দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে পাতলা একটি শার্ট, যা বাতাসের ঝাপটায় উড়ছে। তার হাতে চুরুট নেই, নেই কোনো অস্ত্র। সে এখন কেবল এক নিঃসঙ্গ মানুষ। নোবারাকে ঘুম পাড়িয়ে সেই চলে এসেছে এখানটায়।

পেছনের দরজায় মৃদু ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ হলো। জেনিন না ফিরেই বুঝতে পারল কে এসেছে। এই পায়ের শব্দ, এই নিঃশ্বাসের ছন্দ জেনিন গত পনেরো বছর ধরে চেনে। ইউজি এসে জেনিনের থেকে ঠিক তিন হাত দূরে দাঁড়ালো। তাদের মধ্যে এখন কোনো বস আর কর্মচারীর সম্পর্ক নেই; এখানে দাঁড়িয়ে আছে দুটি আত্মা, যারা একসাথে নরক দর্শন করে ফিরে এসেছে।

ইউজি একটা জ্যাকেট জেনিনের দিকে বাড়িয়ে দিল। “বস, রাত বাড়ছে। কুয়াশা আপনার পুরনো ক্ষতটায় ব্যথা বাড়াতে পারে।”

জেনিন জ্যাকেটটা নিল না, বরং এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকালো। “ইউজি, তোমার মনে আছে লন্ডনের সেই হ্যাকনি ডিস্ট্রিক্টের ওই ছোট গলিটার কথা? যেখানে আমরা একটা ডাস্টবিনের আড়ালে তিন রাত লুকিয়ে ছিলাম?”

ইউজি মৃদু হাসল। সেই হাসিতে কোনো তিক্ততা নেই, আছে এক বুক ভরা স্মৃতি। “মনে থাকবে না কেন বস? আমাদের কাছে তখন একটা পিস্তল ছিল আর মাত্র দুটি বুলেট। আপনি বলেছিলেন, ‘ইউজি, যদি ওরা আমাদের ধরে ফেলে, তবে একটা বুলেট আমার জন্য, একটা তোমার জন্য।”

জেনিন ঘুরে ইউজির দিকে তাকালো। জেনিনের চোখের মণিগুলো আজ আর্দ্র। সে ইউজির কাঁধে হাত রাখল। “সেদিন আমি তোমাকে মরতে বলিনি ইউজি, আমি তোমাকে আমার সাথে যেতে বলেছিলাম। আজ যখন আমি এই প্রাসাদের চূড়ায় দাঁড়িয়ে নিচে তাকাই, আমি কেবল তোমাকে দেখি। এই বিশাল নূরশাদ ভিলা, এই হাজার হাজার কোটি টাকার বিজনেস, এসবের কোনো মানে থাকত না যদি না তুমি আমার পাশে থাকতে। তার চেয়ে বড় কথা, আমি হয়তো বেঁচেই থাকতাম না!”

ইউজি মাথা নিচু করল। তার গলায় এক অদ্ভুত আবেগ দলা পাকিয়ে এল। “বস, আমার মতো একটা রাস্তার ছেলেকে আপনি সম্মান দিয়েছেন, নাম দিয়েছেন। আপনি যখন লন্ডনের ওই বড় গ্যাংস্টারদের সামনে আমার জন্য বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, সেদিনই আমি আমার জীবনটা আপনার নামে লিখে দিয়েছিলাম।”

জেনিন ইউজিকে টেনে রেলিংয়ের কাছে নিয়ে এল। “লোকে বলে জেনিন নূরশাদ নিষ্ঠুর। লোকে বলে আমি পিশাচ। কিন্তু কেউ জানে না, এই পিশাচটাকে বাঁচিয়ে রাখতে তুমি কতবার নিজের রক্ত ঝরিয়েছ!”

ইউজি জেনিনের দিকে মুখ তুলে তাকালো। তার চোখে এক অগাধ বিশ্বস্ততা। “বস, আমি জানি আপনি এখন ম্যামের প্রেমে অন্ধ। আমি তাকে ঘৃণা করি না বস, আমি কেবল তাকে ভয় পাই। আমি ভয় পাই যে আপনার এই লুকিয়ে রাখা কোমল হৃদয়টা আবার কেউ ভেঙে না দেয়। আপনি পনেরো বছর পর হাসতে শিখেছেন, আমি চাই না সেই হাসি কোনো বিশ্বাসঘাতকতার আগুনে পুড়ে যাক।”

জেনিন হাসল। এক করুণ বিষণ্ণ হাসি। “আমি জানি ইউজি। আমি জানি ও আমাকে হয়তো কোনোদিন ক্ষমা করবে না। আমি জানি ও হয়তো আড়ালে কোনো চাল চালছে। কিন্তু জানো তো? আমি ওকে ছাড়া বাঁচতে পারব না। ও আমার সেই হারানো কৈশোর, ও আমার সেই একমাত্র আলো যা আমি লন্ডনের অন্ধকার গলিগুলোতে খুঁজে বেড়াতাম।”

ইউজি জেনিনের হাতটা শক্ত করে ধরল। “আমি থাকতে আপনার কোনো ক্ষতি হতে দেব না বস। এমনকি যদি আমাকে ম্যামের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়, আমি পিছপা হব না। কথা দিল এই উদয় গালিব।”

জেনিন ইউজিকে জড়িয়ে ধরল। এই এক আলিঙ্গনে মিশে ছিল পনেরো বছরের লড়াই, না খেয়ে থাকা রাতগুলো, আর শত শত বুলেটের আঘাত থেকে একে অপরকে বাঁচানোর ইতিহাস। জেনিন খুব নিচু স্বরে বলল,
“দুনিয়া যখন থুতু দিয়েছিল আমাদের কপালে,
তখন আমরাই ছিলাম একে অপরের ঘর।
আজ যদি পৃথিবী হয়ে যায় পর,
তবুও তোর হাত ছাড়ব না ভাই,
হোক তা যতই প্রলয়ঙ্কর।”

ইউজির চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল, যা সে দ্রুত মুছে ফেলল। “বস, আপনি রোমান্টিক হয়ে গেছেন। ম্যাম কি আপনাকে কবিতা শেখাচ্ছেন নাকি?”

জেনিন হো হো করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে কোনো মাফিয়া ডনের দম্ভ ছিল না, ছিল এক বড় ভাইয়ের প্রশান্তি। “শোনো ইউজি, তুমি কাল সকালে একটু বিশ্রাম নাও। অনেক ধকল গেছে তোমার ওপর। পোর্টের কাজটা আমি নিজে হ্যান্ডেল করব।”

“কখনোই না!” ইউজি জিদ ধরল। “আপনার সাথে আমি থাকব। আপনি একা গেলে আমার ঘুম হবে না। আপনি বরং ম্যামের সাথে কফি খান, আমি পোর্টের সিকিউরিটি লেভেল চেক করে আসছি।”

জেনিন ইউজির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে ইউজিকে আটকানো অসম্ভব। সে পকেট থেকে একটি ছোট স্টেইনের চেইন বের করল, যার লকেটে জেনিন আর ইউজির সেই পুরনো দিনের একটি অস্পষ্ট ছবি। “এটা লন্ডনে থাকাকালীন বানিয়েছিলাম। আজ তোমাকে দিচ্ছি। এটা মনে করিয়ে দেবে যে জেনিন নূরশাদ তার জীবনের শ্রেষ্ঠ ডিলটা করেছিল যেদিন সে ইউজিকে নিজের ভাই হিসেবে গ্রহণ করেছিল।”

ইউজি চেইনটি হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইল। সে জেনিনের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে গেল, কিন্তু জেনিন তাকে টেনে বুকে নিল। “সালাম নয় ইউজি, সম্মান আর ভালোবাসা হৃদয়ে থাকে। চল, নিচে যাই। বৃষ্টির ঘ্রাণ বাড়ছে।”

ছাদ থেকে নামার সময় তারা দুজন পাশাপাশি হাঁটছিল। তাদের ছায়াগুলো যখন চাঁদের আলোয় এক হয়ে মিশে যাচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল নূরশাদ ভিলার দেয়ালগুলোও তাদের এই ভ্রাতৃত্বের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেনিন বুঝতে পারল, নোবারা হয়তো তার হৃদয়ের রানী, কিন্তু ইউজি হলো তার অস্তিত্বের ভিত্তি। এই ভিত্তি ভেঙে গেলে জেনিন নূরশাদের পতন নিশ্চিত।

নিচে নেমে ইউজি তার রুমের দিকে যাওয়ার আগে শেষবার ঘুরে তাকালো। “বস, সাবধানে থাকবেন। ভালোবাসা মানুষকে শক্তিশালী করে ঠিকই, কিন্তু অতি ভালোবাসা মানুষকে অন্ধ করে দেয়। আমি চাই না আপনি অন্ধ হয়ে যান।”

জেনিন শুধু হাসল। সে জানত ইউজি ঠিক বলছে। কিন্তু সে এও জানত যে, জেনিন নূরশাদ আজ ধ্বংস হতেও রাজি আছে, যদি সেই ধ্বংসের নাম হয় নোবারা নুরশাদ।

চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here