#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_২৬
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
জেনিন নুরশাদ সাধারণত খুব ভোরে উঠে নিজের জিমের কাজে ব্যস্ত থাকে, কিন্তু আজ সে ডাইনিং টেবিলে বসে আছে। তার পরনে একটা সাদা হাফ-স্লিভ শার্ট, চুলগুলো কপালে এসে পড়েছে, সব মিলিয়ে তাকে একজন মাফিয়া ডন নয়, বরং কলেজের কোনো শান্ত মেধাবী ছাত্রের মতো দেখাচ্ছে। বয়সটা যেন হুট করেই কমে গিয়েছে তার। হয়তো মনে খুশি থাকলে চেহারায় বয়সের ছাপ পড়েই না!
নোবারা রান্নাঘর থেকে ট্রেতে করে নাস্তা নিয়ে এল। জেনিনকে দেখে সে নিজের মনের মেঘগুলোকে ঢেকে ফেলল এক চিলতে মিষ্টি হাসিতে। ইদানিং তার জেনিনকে খুব ভালো লাগে। লোকটা অতটাও খারাপ না। যদিও বা সেটা কেবল তার ক্ষেত্রে। সে জেনিনের সামনে কফির কাপটা রাখল।
“আজ হঠাৎ টেবিলে বসে কী ভাবছেন মি: নূরশাদ? জিম কি আজ ছুটি?” নোবারা চেয়ার টেনে জেনিনের ঠিক পাশে বসল।
জেনিন কফির কাপে চুমুক দিয়ে নোবারার দিকে তাকালো। তার চোখে এক দুষ্টুমিভরা দৃষ্টি। সে কফিটা টেবিলের ওপর রেখে হঠাৎ নোবারার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল। জেনিনের হাতের স্পর্শে নোবারা সামান্য শিউরে উঠল।
“ভাবছিলাম, এই ভোরের আলোয় আমার সামনে যদি শুধু কফি থাকে, তবে দিনটা অসম্পূর্ণ। কিন্তু যদি কফির সাথে একরাশ অভিমানী হাসি থাকে, তবে দিনটা সার্থক,” জেনিন খুব নিচু স্বরে কথাগুলো বলল।
নোবারা হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা না করে বরং জেনিনের আরও কাছে ঘেঁষে দাঁড়ালো। সে জেনিনের শার্টের কলারটা একটু ঠিক করে দিতে দিতে বলল, “খুব তো কাব্য করছেন! ইউজি শুনলে বলবে বস বোধহয় পাগল হয়ে গেছে। ওনার তো সারাক্ষণ আপনার নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা।”
“ইউজিকে বাদ দিন তো!” জেনিন এবার নোবারার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের হাঁটুর ওপর বসিয়ে নিল। “আজকের পুরো সকালটা শুধু আপনার আর আমার, নূরপরী। অফিসেও যেতে ইচ্ছে করেনা আপনাকে ফেলে। এইচআর সব সামলে নিবে ক্ষণ!
নোবারার বুকের ভেতরটা আবার কাঁপতে লাগল। এই জেনিন ও না! তাকে এতো এতো ডাকনাম দেয়! নোবারা এখনো ঠিকই করতে পারলো না, তার প্রিয় ডাকনাম কি। কারণ জেনিনের সকল ডাকই কেমন যেন নেশা ধরিয়ে দেয় তার ভেতরে। অজান্তেই যেন সে লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছে। জেনিনের এই আদরটুকু তাকে বারবার দুর্বল করে দেয়। তার তো এই উদ্দেশ্যে নিয়ে নুরশাদ ভিলায় আসা হয়নি!
নোবারা জেনিনের চিবুকটা ছুঁয়ে বলল, “আপনি কি আমাকে সত্যিই এতটা ভালোবাসেন জেনিন? না কি এটা আপনার কোনো নতুন স্ট্র্যাটেজি?”
জেনিন নোবারার কপালে নিজের কপাল ঠেকালো। তাদের নিঃশ্বাস এক হয়ে মিশে যাচ্ছে। “স্ট্র্যাটেজি আমি পৃথিবীর সাথে করি বেবিডন, আপনার সাথে নয়। আপনি আমার সেই একমাত্র জায়গা, যেখানে আমি জেনিন নূরশাদ হয়ে বাঁচতে পারি, ‘জেড’ হয়ে নয়।”
নোবারা হাসল। সে জেনিনের নাকটা একটু টিপে দিয়ে বলল, “জানেন, আপনি খুব পসেসিভ। সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখেন আমাকে!”
জেনিন একটু অপ্রস্তুত হলো, কিন্তু পরক্ষণেই সে হেসে ফেলল। তারপর বললো, “আপনি যেটাকে পসেসিভ বলেন, আমি সেটাকে আপনাকে হারানোর ভয় মনে করি। এই ভয়ের প্রকোপ আপনি বুঝবেন না নূরা, যতদিন না পর্যন্ত আপনি আমাকে আমার মতো করে ভালোবাসছেন।”
নোবারার হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। সে কি সন্দেহ করছে? নোবারা বুদ্ধি খাটিয়ে জেনিনের বুকে মাথা রাখল এবং তার শার্টের বোতাম নিয়ে খেলতে খেলতে বলল, “এতো ভালোবাসা ভালো না মি: নুরশাদ। অতি ভালোবাসা মানুষকে শুধু কষ্টই দেয়।”
জেনিন হো হো করে হাসল। সে নোবারাকে জাপটে ধরে তার কাঁধে মুখ ঘষল। “পুরো মাফিয়া এম্পায়ার আর বিসনেজের ভার নিজের কাঁধে নেওয়ার পরও, আমার নূরার কাঁধে মাথা রাখলেই সব ক্লান্তি আর অবসাদ নিমেষেই দূর হয়ে যায়! হার্টলেস আমিই এক অদ্ভুত শান্তি খুঁজে পাই আমার ওয়াইফ কে জড়িয়ে ধরে!”
তারপর নোবারার কাঁধ থেকে মুখ তুলে সরাসরি চোখে চোখ রেখে বললো, “তোমার প্রতি অতি ভালোবাসা যদি আমাকে কষ্ট দেয়, তাহলে জেনে রাখো নূরা, এই পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী মানুষটা আমি জেনিন নুরশাদই হবো।”
নোবারার বুকটা ধক করে উঠলো। সে কি আফসোস করছে? নাকি অপরাধবোধ হচ্ছে তার? তার প্রতি এত পবিত্র অনুভূতি জেনিন নুরশাদের আছে! সে কিভাবে এসেছিল জেনিনকে ধ্বংস করতে? সে কিভাবে পারবে জেনিনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে? নোবারা চোখের কোনে একফোঁটা তপ্ত অশ্রু জ্বল জ্বল করে উঠল। তার ইচ্ছা করলো জেনিনকে জড়িয়ে ধরে বলতে, চলুন আমরা কোথায় হারিয়ে যাই। আপনার আমার আসল পরিচয় বিলীন করে দিয়ে। কিন্তু নোবারা পারলো না। তার মুখ দিয়ে কোন কথাই বের হলো না। সে কেবল অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ঠিক সেই মুহূর্তে ইউজি ড্রয়িংরুমে ঢুকল। হাতে একটা আইপ্যাড আর চোখে সেই চিরচেনা বিরক্তি। জেনিন আর নোবারাকে ওভাবে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখে সে মাঝপথে থমকে দাঁড়ালো। আমতা আমতা করে মাথা চুলকে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল সে। তার বস বিয়ের পর কান্ড জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে মনে হয়। আবিয়াত্তা একটা ছেলে এই বাড়িতে থাকে। তারও কি এই দুই জামাই বউয়ের রোমান্স দেখে নিজের ও করতে ইচ্ছে করে না? এই প্রথম ইউজি মনে মনে নিজেরই বসকে কয়েক দফা গালি দিল। এবং মনে মনে এও ভেবে নিল যে, সে যাকে এতো বছর ধরে খুঁজে চলেছে, তাকে একবার পেয়ে গেলে বসের সামনে এর চেয়েও বেশি রোমান্টিক হবে।
আপাতত সে নিজেকে সামলে খুব কড়া গলায় বললো,
“বস! পোর্টের শিপমেন্টে একটা সমস্যা হয়েছে। আপনাকে একবার ম্যাপটা দেখতে হবে!”
নোবারা জেনিনের বুক থেকে মাথা না তুলেই আড়চোখে ইউজির দিকে তাকালো। সে জেনিনকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল, “জেনিন, আপনি বলেছিলে না আজ পুরো সকালটা শুধু আমার? ইউজিকে বলুন ওটা নিজেই সামলাতে। এমনিতেও ওকে বাড়াবাড়ি করা ছাড়া কোন কাজ করতে দেখি না আমি।”
ইউজির মুখ রাগে লাল হয়ে গেল। “ম্যাম! এটা কোনো খেলা নয়। কয়েকশ কোটি টাকার মাল মাঝপথে আটকে আছে।”
জেনিন নোবারার হাতে একটা আলতো চুমু দিয়ে হাসিমুখে ইউজির দিকে তাকালো। “ইউজি, তুমি কি জানো তোমার বড় সমস্যা কী? তুমি টাইমিং বোঝো না। নোবারা যখন পাশে থাকে, তখন কয়েকশ কোটি টাকাও আমার কাছে তুচ্ছ মনে হয়। যাও, আধা ঘণ্টা পর এসো।”
ইউজি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না যে জেনিন নূরশাদ ব্যবসার চেয়ে একটা মেয়েকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। সে রাগে গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “একদিন এই আদরের মাসুল আপনার পুরো সাম্রাজ্যকে দিতে হবে বস।”
ইউজি চলে যাওয়ার পর নোবারা খিলখিল করে হেসে উঠল। “দেখলেন? বেচারা কী রকম নাটক করে গেল! একটা রামগরুরের ছানা ও। আরো আমাকে ড্রামাকুইন বলে!”
জেনিন হালকা একটা হাসি দিয়ে নোবারার উচ্ছ্বসিত চেহারা দেখতে লাগলো। আজও তার কাছে নোবারাকে সেই নবম শ্রেণীর চটপটে আদুরে নোবারা মনে হয়! যাকে দেখে প্রথমবার প্রেমে পড়েছিল সে। এবং আজ বউ বানিয়ে নিজের কোলের উপর বসিয়ে রেখেছে!
<><><><><><><><><>
পরদিন সকাল সাতটা। নূরশাদ ভিলার পেছনে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত জেনিনের নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এটি সাধারণ কোনো জিম বা শুটিং রেঞ্জ নয়। এখানে কৃত্রিম জঙ্গল, কংক্রিটের গোলকধাঁধা এবং একটি বিশাল হ্যাঙ্গার রয়েছে যা পার্সোনাল হেলিকপ্টার এর জন্য ব্যবহৃত হয়। ভোরের আলো এখনো পরিষ্কার হয়নি, কুয়াশা চাদরের মতো ঘিরে রেখেছে চারপাশ। জেনিন আজ পুরোপুরি যুদ্ধসাজে সজ্জিত, কালো ট্যাকটিক্যাল গিয়ার, পায়ে ভারী বুট, আর কোমরে বাঁধা বিভিন্ন ধরনের ছোট-বড় অস্ত্র।
নোবারার পরনেও একই ধরনের কালো কম্ব্যাট স্যুট। তার চুলগুলো শক্ত করে পনিটেইল করা। সকাল সকাল জেনিনের আবার তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ভূত চেপেছে মাথায়। অথচ নোবারার আসল দক্ষতা যদি জানতো সে, নিজেই নোবারার কাছে প্রশিক্ষণ নিতো। তাই আপাতত নোবারা ভালোভালা নাজুক মেয়ে হওয়ার অভিনয় করছে।
অপরদিকে জেনিনের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে, সামনে এক প্রলয়ংকরী ঝড় আসছে। সেই ঝড়ে জেনিন যদি কোনোভাবে হারিয়েও যায়, নোবারা যেন একা পুরো নূরশাদ সাম্রাজ্য সামলাতে পারে। তাই সে নিজের অর্ধাঙ্গিনীকে কে সম্পুর্ন নিজের লেভেলে নিয়ে আসতে চায়। তার এই মাফিয়া জীবনের উপর কোন ভরসা নেই। কখন যে না বলেই পরপারে পাড়ি দিয়ে দিবে! তখন নোবারার কি হবে তার চিন্তায় ঘুম আসে না তার।
জেনিন নোবারার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। তার দুহাত নোবারার কাঁধে রেখে খুব গভীর এবং গম্ভীর গলায় বলল, “নোবারা, আজ থেকে আপনি কেবল আমার ওয়াইফ নন। আজ থেকে আপনি জেনিন নূরশাদের প্রতিচ্ছবি। শত্রু যখন আক্রমণ করে, তখন সে আপনার জেন্ডার দেখবে না, দেখবে আপনার দুর্বলতা। আমি চাই না আপনার কোনো দুর্বলতা থাকুক। আপনি কি প্রস্তুত?”
নোবারা জেনিনের চোখের দিকে তাকালো। সেই চোখে আছে এক কঠোর শিক্ষকের কাঠিন্য। নোবারা মাথা নাড়ল। “আমি প্রস্তুত।” অথচ জেনিন হলে হয়তো বলতো, আমার দুর্বলতা তো আপনি। এই দুর্বলতা কাটানোর শক্তি আমার না আসুক!
জেনিন নোবারাকে একটি বিশেষ স্নাইপার রাইফেলের কাছে নিয়ে গেল। রাইফেলটি ওজনে ভারী, কিন্তু এর প্রতিটি অংশ মরণঘাতী।
“কিপ ইট” জেনিন হুকুম দিল। “লক্ষ্যস্থির করুন ওই ৫০০ গজ দূরের লাল বিন্দুটির ওপর।”
নোবারা রাইফেলটি পজিশনে নিল। জেনিন নোবারার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়ালো। সে নোবারার কনুই আর কাঁধের পজিশন ঠিক করে দিতে দিতে বলতে লাগল, “নিশ্বাস ছাড়ুন। যখন আপনি ট্রিগার চাপবেন, মনে করবেন ওই লাল বিন্দুটি আপনার সবচাইতে বড় শত্রু। যদি আপনি আজ তাকে না মারেন, তবে সে আপনাকে মারবে।”
নোবারা লক্ষ্যস্থির করল। জেনিনের শরীরের উষ্ণতা তার পিঠে অনুভূত হচ্ছে, কিন্তু সে আজ বিচলিত হলো না। সে ট্রিগার চাপল। ধাম! শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল, কিন্তু গুলিটি লক্ষ্যের একটু বাইরে দিয়ে চলে গেল। যদিও নোবারা ইচ্ছা করেই এমনটা করেছে। তার আবারো মিথ্যা বলার ইচ্ছে নেই আর!
জেনিন নোবারার কান আলতো ধরে নিজের দিকে ফেরালো। “মনোযোগ কোথায় হু? আমি কি আপনাকে আদর করছি?”
জেনিন তার শীতল, মাফিয়া সুলভ ব্যক্তিত্ব ধরে রাখার প্রাণপন চেষ্টা করছিল, তার নোবারাকে বকা দেওয়ার কোন ইচ্ছেই ছিল না। কিন্তু নোবারার চোখে আজ এক অন্যরকম জেদ। রাইফেলটা আবার নতুন করে লোড করতে করতে নোবারা জেনিনের বুকের খুব কাছাকাছি সরে এল। জেনিনের বুকের ধুকপুকানি স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
নোবারা হঠাৎ জেনিনের গলার টাইটা আলতো করে টেনে তাকে নিজের দিকে ঝুঁকিয়ে আনল। জেনিনের নাকের ডগায় নাক ঘষে ফিসফিস করে বলল, “শত্রুকে মারার আগে কি একটু রিফ্রেশমেন্ট পাব না? আমার তো মনোযোগ আপনার ওই গম্ভীর চেহারায় আটকে আছে।”
জেনিন চোখ সরু করে কঠোর স্বরে বলল, “কাজের সময় এসব আবেগ সরিয়ে রাখুন। আমি আপনাকে এখানে প্রেম করতে আনিনি। ঘরের ভেতর করবেন এসব।”
নোবারা হাসল, এক মায়াবী হাসি। সে জেনিনের কলারটা ঠিক করে দিতে দিতে তার গালের ওপর হাত রাখল। “কিন্তু আপনি তো জানেন, আপনিই আমার একমাত্র লক্ষ্য। আর আমার এই টার্গেটটা ভীষণ গোলমেলে।”
জেনিন এবার আর পারল না। নোবারার হাতের কবজিটা শক্ত করে ধরল সে। যদিও তার চোখে আগের সেই কঠোরতা, কিন্তু কন্ঠস্বর সামান্য কেঁপে গেল। “খুব বেশি সাহস দেখাচ্ছেন আজ। এমনিতে তো আমার কাছেও আসেন না, আজ যখন কাজের কাজ করতে দিচ্ছি তো ফ্লার্টিং করা হচ্ছে? এসব ফাঁকিবাজি জেনিন নুরশাদের সাথে চলবে না মিসেস নুরশাদ।”
“তাহলে গুলিটা অন্যভাবে করুন।” নোবারা জেনিনের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আমাকে শেখান কীভাবে ওই লাল বিন্দুটা না, বরং ঠিক আপনার হৃদপিণ্ডটা নিশানায় নিতে হয়।”
জেনিনের নিয়ন্ত্রণ এবার পুরোপুরি শিথিল হয়ে এল। সে নোবারার কোমর জড়িয়ে এক ঝটকায় তাকে নিজের কাছে টেনে নিল। জেনিনের গভীর শ্বাস নোবারার ঘাড় স্পর্শ করল। “আপনি কি জানেন আপনি কার সাথে খেলছেন? এই খেলা কিন্তু প্রাণঘাতী হতে পারে।”
নোবারা একটুও না দমে জেনিনের কাঁধে চিবুক রেখে রাইফেলের স্কোপে চোখ রাখল। “আপনার জীবনটাই তো প্রাণঘাতী, জেনিন। সেখানে আমি একটু ঝুঁকি নিলে কী আর এমন ক্ষতি হবে? হ্যাঁ?”
জেনিন এবার আর নিজেকে আটকাল না। সে নোবারার হাতের ওপর নিজের বড় হাতটা রাখল। তার স্পর্শে একটা অদ্ভুত কর্তৃত্ব আর প্রশান্তি ছিল। সে নিচু স্বরে বলল, “ঠিক আছে। তবে আজ লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে সাজা কিন্তু আমিই দেব।”
নোবারা দুষ্টুমি ভরা কণ্ঠে বলল, “সাজা পেতেও আমার আপত্তি নেই, যদি সেটা আপনার হাত থেকে আসে।”
জেনিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাইফেলের ব্যারেলটা ঠিক করে দিল। “আর মজা নয় নূরা। নিশ্বাস নিন। এবার গুলি করুন..!”
ধাম!
এবার আর লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো না। ঠিক ৫০০ গজ দূরের লাল বিন্দুটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। জেনিন নোবারার পিঠে হাত রেখে আলতো চাপ দিল। “গুড। তবে মনে রাখবেন, শত্রুকে মারার সময় আপনি যতটা ঠান্ডা থাকবেন, ততটাই পারফেক্ট আপনার শট হবে।”
পরের দুঘণ্টা জেনিন নোবারাকে দিয়ে বিভিন্ন পজিশন থেকে ফায়ারিং করালো। নোবারার কাঁধ ব্যথায় নীল হয়ে গেছে রাইফেলের রিকোয়েলে, কিন্তু জেনিন তাকে এক মুহূর্তের বিশ্রাম দিল না।
ইউজি দূর থেকে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার চোখে এক বিচিত্র সংশয়, জেনিন কি সত্যিই নোবারাকে নিজের সমান বানাতে চায়? না কি সে ভুল করছে? আর এরা এসব তার সামনেই কেন করে? স্টাফরা না হয় এদিকটায় আসে না, সিকিউরিটি গার্ড আর এজেন্টরা না হয় কালো সানগ্লাস পরে থাকে জেনিনের ভয়ে, যাতে নোবারার দিকে কেউ অন্য দৃষ্টিতে না থাকায়। কিন্তু সে নিজে উদয় গালিব? তার কি হবে? একে তো নোবারার উপর থেকে তার সন্দেহ এখনো যায় নি, উপরন্তু তার মতো বিয়ের উপযুক্ত একটা ছেলের সামনে এরা যত্তসব ভালোবাসা-বাসি করছে! ইউজির এবার প্রচন্ড বিরক্ত লাগলো।
***বেলা বাড়ার সাথে সাথে জেনিন নোবারাকে নিয়ে একটি ছোট প্রাইভেট জেটের দিকে এগোল। নোবারা বুঝতে পারল জেনিন কী করতে যাচ্ছে। তার বুকটা ভয়ে ঢিপঢিপ করতে লাগল।
“আমরা কি…আমরা কি লাফ দেব?” নোবারার কণ্ঠে মেকি জড়তা। কিন্তু তার কাছে তো এই জাম্প দেওয়াটাই সবচেয়ে বেশি পছন্দের স্ট্র্যাটেজি ছিল।
“হ্যাঁ,” জেনিন শান্তভাবে প্যারাশুট চেক করতে করতে বলল। “আপনার জীবনের নিয়ন্ত্রণ আপনার নিজের হাতে। দশ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে যখন আপনি নিচে নামবেন, তখন আপনার কেবল নিজের ওপর বিশ্বাস ছাড়া আর কিছু থাকবে না। আমি থাকব আপনার পাশে, কিন্তু আপনার প্যারাশুট আপনাকে নিজেকেই খুলতে হবে।”
বিমানে ওঠার পর জেনিন নোবারার খুব কাছে বসল। বিমানের যান্ত্রিক শব্দের মাঝে জেনিন নোবারার হাতটা ধরল। “ভয় পাচ্ছেন?”
“ভীষণ,” নোবারা সত্যিটা স্বীকার করল না। তার তো বরং আনন্দই হচ্ছে!
“ভয়কে আলিঙ্গন করুন নোবারা। ভয় না থাকলে সাহসের জন্ম হয় না।” জেনিন নোবারার কপালে একটি চুমু খেল, যা এই কঠোর ট্রেনিংয়ের মাঝে একমাত্র কোমল মুহূর্ত ছিল।
বিমানের দরজা যখন খুলে গেল, বাতাসের প্রবল ঝাপটা নোবারাকে প্রায় উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। নিচে মেঘের সমুদ্র। জেনিন নোবারার প্যারাশুটের ক্লিপ নিজের সাথে আটকে নিল, এটি একটি ট্যান্ডেম জাম্প নয়, এটি প্যারালাল জাম্প। তারা একসাথে লাফ দেবে কিন্তু নিয়ন্ত্রণ থাকবে আলাদা।
“ওয়ান… টু… থ্রি! জাম্প!” জেনিন চিৎকার করে উঠল।
পরের কয়েক সেকেন্ড নোবারার মনে হলো সে মহাকাশে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বাতাসের গর্জনে সে কিছুই শুনতে পাচ্ছিল না। কিন্তু জেনিন তার ঠিক পাশেই উড়ছে। জেনিন ইশারায় তাকে শান্ত থাকতে বলল। বাতাসের চাপে নোবারার মুখ দিয়ে কথা সরছিল না, কিন্তু সে জেনিনের চোখ দেখে সাহস পেল।
উচ্চতা যখন ৪০০০ ফুট, জেনিন ইশারা করল। নোবারা কাঁপা হাতে নিজের প্যারাশুটের কর্ডটি টানল। এক তীব্র ঝাঁকুনিতে সে আকাশে স্থির হয়ে গেল। উপরে তাকিয়ে দেখল তার নীল রঙের প্যারাশুটটি খুলে গেছে। পাশেই জেনিনের কালো প্যারাশুট। জেনিন তার দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করল।
মাটিতে নামার পর নোবারা ক্লান্তিতে ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ল। জেনিন তার পাশে এসে বসল। “আপনি পেরেছেন নূরা। আপনি পেরেছেন!”
নোবারা হাসল। “আমি ভেবেছিলাম আমি মারাই যাব।”
“আমি থাকতে আপনাকে মরতে দেব না। কিন্তু আমি যদি না থাকি, তবে আপনি এভাবেই আকাশ থেকে নেমে আসবেন নূরশাদ সম্রাজ্য রক্ষা করতে।” জেনিনের কথার ভেতরে এক গভীর বার্তা ছিল, যা নোবারার মনে খটকা সৃষ্টি করল।
***বিকেলে জেনিন নোবারাকে একটি অন্ধকার ঘরের ভেতরে নিয়ে গেল। ঘরের মাঝখানে একটি বড় ডিজিটাল স্ক্রিন। সেখানে জেনিনের ব্যবসার গ্লোবাল ম্যাপ এবং সিকিউরিটি গ্রিডগুলো দেওয়া আছে।
“এটি হলো আমাদের এম্পায়ার এর সেন্টার পয়েন্ট” জেনিন পয়েন্টার দিয়ে দেখালো। “এখানে শত্রু কে আর বন্ধু কে, তা চিনতে হয় চোখের পলকে। ধরুন, ইউজি কোনো এক মিশনে নিখোঁজ। আমি পোর্টে অবরুদ্ধ। আপনার কাছে কেবল একটি ফোন আছে। আপনি কীভাবে আমাদের উদ্ধার করবেন?”
নোবারা স্ক্রিনের দিকে তাকালো। সে তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ব্যবহার করে একে একে প্রতিটি পয়েন্ট বিশ্লেষণ করল। জেনিন অবাক হয়ে দেখল, নোবারার রণকৌশল জেনিনের চেয়েও অনেক সময় বেশি সৃজনশীল। নোবারা দেখাচ্ছিল কীভাবে ড্রোন ব্যবহার করে শত্রুকে বিভ্রান্ত করে পেছনের দিক দিয়ে পালানো যায়। জেনিন মুগ্ধ হয়ে নোবারার দিকে তাকালো। সে নোবারার এই দক্ষতাকে সহজাত দক্ষতা হিসেবে মনে করলো। অথচ নোবারা জানে, এই দক্ষতা অর্জন করতে তাকে মাসের পর মাস কত পরিশ্রমই না করতে হয়েছিল!
ঠিক সেই সময় ইউজি ঘরে ঢুকল। তার হাতে একটি জরুরি ফাইল। “বস, পোর্টে বড় সমস্যা। আমাদের একটা কনসাইনমেন্ট পুলিশ আটকে দিয়েছে। আর শুনলাম নানামি জায়দান নিজে ওই টিম লিড করছে।”
জেনিন আর নোবারা দুজন দুদিকে তাকালো। নোবারার হৃদপিণ্ড যেন এক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল। নানামি? নানামি কি জেনিনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে?
জেনিন খুব শান্তভাবে তার ড্রয়ার থেকে একটি কালো গ্লাভস বের করে হাতে পরল। তারপর নোবারার দিকে ঘুরে কিছু একটা ভেবে ওকে বললো, “নোবারা, আজ আপনার চূড়ান্ত পরীক্ষা। পোর্টের এই সমস্যাটা আমি আর ইউজি সামলাব, কিন্তু আপনি ব্যাক-অ্যান্ড থেকে আমাদের গাইড করবেন। আপনার ম্যাপ রিডিং আর ড্রোন ফিড যদি ভুল হয়, তবে আজ হয়তো আমি আর ফিরব না।”
নোবারা শক্ত হয়ে দাঁড়ালো। সে বললো,
“আপনি ফিরবেন জেনিন। আপনাকে ফিরতেই হবে। আমি আপনাদের কভার দেব,” নোবারা দৃঢ় কণ্ঠে বলল।
জেনিন ইউজির দিকে তাকিয়ে বলল, “গেট রেডি, মাই ম্যান।”
ইউজি অনিচ্ছাসত্ত্বেও নোবারার দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করল। “ম্যাম, আজ যদি আপনার বুদ্ধিতে আমাদের কোনো ক্ষতি হয়, তবে মনে রাখবেন…”
“ইউজি!” জেনিন ধমক দিল। “ওর ওপর আমার বিশ্বাস আছে। তোমারও থাকা উচিত।”
ইউজি জেনিনের কথা শুনে মুখ ভেংচি কেটে তাকালো নোবারার দিকে। এই বিশ্বাস যেদিন বিশ্বাসঘাতকতায় রূপান্তর হবে, সেদিন ইউজির কাছেই ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে ফিরে যাবে জেনিন। সেদিন ইউজি আর পাত্তা দিবে না বলে মনে মনে ঠিক করলো। যদিও জেনিন কে পাত্তা না দেওয়ার সাধ্য তার নেই। জেনিনকে দেখলেই তার বড় ভাই বলে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে!
জেনিন আর ইউজি যখন বেরিয়ে যাচ্ছিল, নোবারা জেনিনের হাতটা ধরল। “সাবধানে থাকবেন। আমি আপনার অপেক্ষায় থাকবো।”
জেনিন নোবারার হাতের তালুতে একটি চুমু দিয়ে বলল, “আমি ফিরব নোবারা। নিজের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ মুহূর্তে হলেও আমি ফিরে আসবো আপনার কাছে।”
জেনিন চলে যাওয়ার পর নোবারা কন্ট্রোল রুমের চেয়ারে বসল। তার সামনে ডজনখানেক মনিটর। সে দেখল জেনিনের গাড়িগুলো পোর্টের দিকে ছুটছে। নোবারা তার গোপন ফোনটি বের করল। সে জানে, জেনিন তাকে ট্রেনিং দিয়েছে তাকে রক্ষা করতে, কিন্তু নোবারা এই ট্রেনিং ব্যবহার করবে জেনিনকে এক বড় বিপদে ফেলে তাকে সংশোধন করার জন্য।
চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।।

