Soulmate_to_Enemy #পর্ব_২৭

0
2

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_২৭
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

রাতের ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে। পোর্টের জিরো পয়েন্টে ঘন কুয়াশা আর নোনা বাতাসের এক অভেদ্য দেয়াল। চারিদিকে শুধু বিশাল বিশাল কন্টেইনারের সারি, যা এই অন্ধকারে কোনো এক দানবীয় গোলকধাঁধার মতো মনে হচ্ছে। জেনিন নূরশাদ তার কালো এসইউভির ভেতরে বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রাখছে। তার পাশে ইউজি, যার হাতে একটি M-4 রাইফেল এবং চোখে নাইট-ভিশন গগলস।

জেনিন আজ ‘জেড’ রূপে। সে পরেছে একটি টেকটিক্যাল জ্যাকেট এবং তার মুখে একটি কালো মাস্ক। সে জানে, নানামি জায়দান এখানে উপস্থিত। নানামি এখনো জেনিনকে চেনে না, সে চেনে কেবল ‘Z’-কে, সেই কাল্পনিক মাফিয়া ডন যাকে ধরা প্রায় অসম্ভব। জেনিন চায় না আজ তার পরিচয় ফাঁস হোক; সে চায় নানামিকে একটি শিক্ষা দিয়ে নিজের মালগুলো নিয়ে বেরিয়ে যেতে।

নূরশাদ ভিলার কন্ট্রোল রুমে বসে নোবারা আকারি। তার সামনে আটটি বিশাল মনিটর। জেনিন আর ইউজির বডি-ক্যাম থেকে আসা লাইভ ফিড তার চোখের সামনে ভাসছে। নোবারার কানে হেডফোন, সে জেনিনের কন্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছে।

“নোবারা, সেক্টর থ্রি ক্লিয়ার? ড্রোনের রিপোর্ট কী?” জেনিনের শান্ত কিন্তু গম্ভীর প্রশ্ন।

নোবারা কি-বোর্ডে আঙুল চালাল। সে দেখল নানামির পুলিশের টিম সেক্টর থ্রি-র কন্টেইনারগুলোর পেছনে পজিশন নিয়েছে। নোবারার হৃদপিণ্ড সজোরে আছড়ে পড়ছে তার বুকের পাঁজরে। সে যদি জেনিনকে সঠিক তথ্য দেয়, তবে জেনিন নানামির ওপর হামলা করবে। আর যদি ভুল তথ্য দেয়, তবে জেনিন ধরা পড়বে।
নোবারা একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“সেক্টর থ্রি-তে মুভমেন্ট আছে। কিন্তু সেক্টর টু ফাঁকা। আপনি যদি ওই দিকের কন্টেইনারগুলোর আড়ালে যান, তবে আপনি পুলিশের রেঞ্জের বাইরে থাকবেন,” নোবারা খুব স্থির গলায় বলল।

আসলে সেক্টর টু-তেই নানামি নিজে দাঁড়িয়ে আছে। নোবারা চায় না জেনিন অন্য দিকে গিয়ে পুলিশের সাথে সরাসরি গোলাগুলিতে জড়াক। সে চায় জেনিন এমন জায়গায় যাক যেখানে নানামি তাকে দেখতে পাবে, কিন্তু জেনিন সেখান থেকে সহজে পালানোর পথ পাবে। এটি এক বিচিত্র দাবার চাল।

জেনিন ইশারায় ইউজিকে নিয়ে সেক্টর টু-র দিকে এগোতে লাগল। অন্ধকারে জেনিনের পা পড়ছে বিড়ালের মতো নিশব্দে। পোর্টের বিশাল লাইটগুলো কুয়াশায় ম্লান হয়ে গেছে। নানামি জায়দান তখন একটি নীল কন্টেইনারের আড়ালে দাঁড়িয়ে তার টিমকে ইনস্ট্রাকশন দিচ্ছিল। নানামির পরনে পুলিশের জ্যাকেট, চোখে সেই পরিচিত তীক্ষ্ণতা।

“মনে রাখবে, ‘Z’ আজ এখানে নিজে আসবে। আমাদের টার্গেট শুধু মাল উদ্ধার করা নয়, ওকে সামনাসামনি দেখা। কাউকে ফায়ার করার দরকার নেই যদি না ওরা আগে শুরু করে,” নানামির গম্ভীর কণ্ঠস্বর জেনিনের খুব কাছে পৌঁছে গেল।

জেনিন কন্টেইনারের কোণে থেমে গেল। সে খুব কাছ থেকে নানামির কণ্ঠ শুনতে পেল। জেনিনের চোখে এক মুহূর্তের জন্য সেই পুরনো স্টেশনের স্মৃতি ভেসে উঠল। নানামি,‌তার ছোটবেলার বন্ধু, তার শৈশব, কৈশোর সব। আজ সেই বন্ধুই তার শত্রু হিসেবে হাত বাড়িয়ে আছে। জেনিন মাস্কের নিচ থেকে মৃদু হাসল। তার চোখের কোণে এক ফোঁটা জল আসলেও সে সন্তর্পণে তা আড়াল করে নিল। জেনিন কখনো দুর্বল হতে জানে না। বিশেষত রণক্ষেত্রে তো নয়ই!

ইউজি জেনিনের কানে ফিসফিস করল, “বস, ওরা খুব কাছে। আমি কি স্নাইপার পজিশন নেব?”

“না,” জেনিন হুকুম দিল। “নোবারা, ড্রোন ফিডে দেখুন তো ওই ব্লু কন্টেইনারের ওপাশে যাওয়ার শর্টকাট কী?”

নোবারা দেখল নানামি জেনিন থেকে মাত্র দশ ফুট দূরত্বে। সে দ্রুত ড্রোন দিয়ে একটি কৃত্রিম সংকেত তৈরি করল। “ডানে একটি সরু গলি আছে। ওটা দিয়ে গেলে আপনি মেইন গেটের দিকে যেতে পারবেন। কিন্তু সাবধান, ওখানে সেন্সর থাকতে পারে।”

নোবারা আসলে নানামিকে একটি সিগন্যাল পাঠালো নিজের হ্যাকিং সিস্টেম ব্যবহার করে। সে চাইল নানামি যেন জেনিনকে দেখতে পায়, কিন্তু ধরতে না পারে। জেনিন যখন ওই গলিতে ঢুকল, হঠাৎ পোর্টের একটি বিশাল ফ্লাডলাইট তার ওপর এসে পড়ল।

“ওখানে কে? হ্যান্ডস আপ!” নানামির কণ্ঠ বাজের মতো গর্জে উঠল।

জেনিন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার পিঠ নানামির দিকে। কুয়াশায় জেনিনের অবয়ব এক অস্পষ্ট দানবের মতো দেখাচ্ছে। নানামি বন্দুক উঁচিয়ে এগোতে লাগল। ইউজি আড়াল থেকে গুলি চালাতে যাচ্ছিল, কিন্তু জেনিন হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল।

“Z? থামো ওখানেই” নানামি খুব সতর্কভাবে এগোচ্ছে।

জেনিন কোনো কথা বলল না। সে ধীরে ধীরে মাথা ঘুরালো। কিন্তু তার মুখে মাস্ক এবং চোখে গগলস থাকায় নানামি তার চেহারা দেখতে পেল না। জেনিন কেবল তার হাতের গ্লাভস পরা আঙুল দিয়ে একটি বিদায়ের সংকেত দিল।

ঠিক সেই মুহূর্তে নোবারা কন্ট্রোল রুম থেকে একটি ইমার্জেন্সি ফ্লেয়ার জ্বালিয়ে দিল পোর্টের ফিউজ বক্স হ্যাক করে। একটি তীব্র শব্দে পোর্টের সব আলো নিভে গেল এবং চারিদিকে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ল।

“ফায়ার! ফায়ার!” পুলিশের দিক থেকে বিশৃঙ্খলা শুরু হলো।

ধোঁয়ার আড়ালে জেনিন আর ইউজি অদৃশ্য হয়ে গেল। নানামি দৌড়ে এসে ওই জায়গায় পৌঁছালো, কিন্তু সেখানে কেবল জেনিনের পায়ের ছাপ পড়ে আছে। নানামি রাগে মাটিতে একটা লাথি মারল। “আবারও! আবার ও চোখের সামনে থেকে পালিয়ে গেল!”

গাড়িতে ফিরে এসে জেনিন মাস্ক খুলে ফেলল। তার সারা শরীর ঘামছে। সে ল্যাপটপের স্পিকারে বলল, “নোবারা, ওই ফ্লেয়ারটা কি আপনি জ্বালিয়েছেন?”

নোবারা হাঁপাচ্ছিল। “হ্যাঁ। পোর্টের ফিউজ বক্সে শর্ট সার্কিট করে দিয়েছিলাম। আপনারা ঠিক আছেন?”

জেনিন হাসল। এক মুগ্ধতার হাসি। “আপনার টাইমিং ছিল নিখুঁত। আপনি আজ আমাকে আর ইউজিকে নিশ্চিত ধরা পড়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। ইউজি, দেখলে তো? আমি কেন ওকে ট্রেনিং দিয়েছি?”

ইউজি এবার আর তক্ক করল না। সে জেনিনের দিকে তাকিয়ে শুধু মাথা নিচু করল ,তবে মুখ ভেংচি কাটতে ভুললো না। কিন্তু ইউজির মনে একটা সন্দেহ দানা বাঁধল, পোর্টের আলো নিভে যাওয়ার ঠিক আগে নানামি যেভাবে জেনিনের দিকে এগোচ্ছিল, তা কি কাকতালীয় ছিল? না কি নোবারা আগে থেকেই জানত নানামি কোথায় আছে?

জেনিন বাড়ির দিকে ফিরছে। তার মনে আজ নানামির কণ্ঠস্বর বারবার বাজছে। সে বুঝতে পারছে নানামি তাকে ধরার জন্য কতটা মরিয়া। কিন্তু এতো সহজেই কি সে ধরা দিবে?

তখন রাত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আকাশের পূর্ব কোণে একফালি ম্লান আলো ফুটে উঠেছে, যা কুয়াশাকে আরও ধোঁয়াটে করে তুলেছে। গাড়ির ভেতরে এক গভীর নিস্তব্ধতা। জেনিন জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে, তার চোখে সেই দৃশ্যটা বারবার ভেসে উঠছে, কন্টেইনারের আড়ালে দাঁড়ানো সেই পুলিশ অফিসার, যার কণ্ঠস্বরটা এত পরিচিত, অথচ যার অবস্থান আজ জেনিনের ঠিক বিপরীতে। কিন্তু কোথাও যেন গিয়ে নানামির পুলিশ হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় জেনিনের মনে আনন্দ অনুভূত হলো!

গাড়ি থামতেই ইউজি নেমে দরজা খুলে দিল। ইউজির মুখটা শ্রাবণের মেঘের মতো কালো হয়ে আছে। সে পোর্টে নোবারার ওই অদ্ভুত টাইমিং আর নিখুঁত ডিরেকশন দেখে খুশি হওয়ার বদলে আরও বেশি শঙ্কিত হয়ে পড়েছে। সে মনে মনে হিসেব মেলাচ্ছে, একজন সাধারণ মেয়ে, যে মাত্র কয়েকদিন আগে গান লোড করতে পারছিল না, সে কীভাবে এত নিখুঁতভাবে ড্রোন কন্ট্রোল আর ফিউজ বক্স হ্যাক করল? আর এই জেনিন কি করে এসব মেনে নিচ্ছে? যেখানে জেনিন নুরশাদের IQ-148! নাকি জেনিন সব জেনেও এড়িয়ে চলছে!

ভিলার ভেতরে ঢুকতেই জেনিন দেখল নোবারা কন্ট্রোল রুমের চেয়ারে মাথা নিচু করে বসে আছে। তার শরীরটা অবসাদে ভেঙে পড়ছে। গত কয়েক ঘণ্টা সে যে মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে গেছে, তা কেবল সে-ই জানে। জেনিন ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে নোবারার কাঁধে হাত রাখল।

নোবারা ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়ালো। জেনিনকে অক্ষত দেখে তার চোখে জল চলে এল। সে কোনো কথা না বলে জেনিনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। জেনিনের গায়ের সেই নোনা বাতাস আর ধোঁয়ার ঘ্রাণ নোবারার নাকে লাগতেই সে বুঝতে পারল জেনিন ফিরে এসেছে। তার জেনিন, তার সেই অন্ধকার জগতের অধিপতি।

“শান্ত হোন নূরা। আমি ফিরে এসেছি,” জেনিন নোবারার চুলে মুখ গুঁজে দিয়ে ফিসফিস করে বলল।

নোবারা নিজেকে জেনিনের থেকে একটু ছাড়িয়ে নিয়ে তার মুখের দিকে তাকালো। “আমি খুব ভয় পাচ্ছিলাম।”

ইউজি একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে জেনিনের জেনিনের চোখের দিকে তাকালো। “বস, ৫ মিনিট কথা বলতে পারি?”

জেনিন ভ্রু কুঁচকে তাকালো। “এখন না। উই আর সো টায়ার্ড!”

“জরুরি বস।”

জেনিন নোবারার কপালে একটি চুমু দিয়ে বলল, “আপনি নিজের ঘরে যান নূরা। আমি আসছি।”

নোবারা চলে যাওয়ার পর জেনিন আর ইউজি লিভিং রুমে একা হয়ে গেল। জেনিন সোফায় হেলান দিয়ে বসল।
“বলো কী বলতে চাও।”

ইউজি জেনিনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। “বস, আপনি কি একবারও ভেবে দেখেছেন ম্যাম কীভাবে জানতেন যে সেক্টর টু-তে পুলিশ আছে? ড্রোন ফিডে ওই কন্টেইনারের পেছনের দৃশ্য পরিষ্কার ছিল না। অথচ তিনি আপনাকে ওদিকেই যেতে বললেন। আর ঠিক যখন ওই অফিসার আপনাকে দেখতে পেল, তখনই ফিউজ বক্স ব্লাস্ট হলো। টাইমিংটা কি আপনার কাছে একটু বেশিই ‘পারফেক্ট’ মনে হচ্ছে না?”

জেনিন শান্তভাবে ইউজির দিকে তাকালো। “তুমি বলতে চাও নোবারা আগে থেকেই জানত পুলিশ কোথায় আছে?”

“আমি বলতে চাই,” ইউজি একটু ঝুঁকে পড়ল, “তিনি হয়তো জেনিন নূরশাদকে বাঁচাতে চাননি, তিনি হয়তো এই পুরো নাটকটা সাজিয়েছিলেন যাতে আপনি পুলিশকে না মারেন আর পুলিশও আপনাকে না পায়। তিনি মাঝখানে থেকে খেলাটা নিয়ন্ত্রণ করছেন বস।”

জেনিন উচ্চস্বরে হেসে উঠল। তার হাসিটা পুরো হলরুমে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। “ইউজি, তুমি সারাজীবন ষড়যন্ত্র দেখেছো বলে আজ ভালোবাসার মধ্যেও ষড়যন্ত্র খুঁজছো। নোবারা আমাকে ভালোবাসে। আর ওকে তো আমিই ট্রেনিং দিয়েছি। ও একজন ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট।”

“বস! ১৫ বছরে আমি আপনাকে কোনোদিন অন্ধ হতে দেখিনি। আজ আপনি হচ্ছেন,” ইউজি রাগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। এই লোকের সাথে কথা বলাই বোকামি। প্রেমে অন্ধ হয়ে বসে আছে।

জেনিন সোফায় বসে রইল একা। ইউজির কথাগুলো তার কানে বাজছে। সে জানে ইউজি ভুল কিছু বলেনি, কিন্তু তার মন বলছে নোবারা তাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না। জেনিন উঠে নোবারার ঘরের দিকে এগোল।

নোবারা তখন বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ছিল। কুয়াশা কেটে গিয়ে সূর্য উঠছে। নোবারার হাতে তখনো সেই গোপন ফোনটা ছিল না, ওটা সে ভেন্টিলেটরের ভেতরে লুকিয়ে রেখেছে।

জেনিন পেছন থেকে এসে নোবারাকে জড়িয়ে ধরল। “কী ভাবছেন নূরা?”

“ভাবছি,” নোবারা জেনিনের হাতের ওপর নিজের হাত রাখল, “এই লড়াইটা কি কোনোদিন শেষ হবে না? এই যে আজ আপনি পালিয়ে আসলেন, কাল কি আবার অন্য কেউ আপনার সামনে গান নিয়ে দাঁড়াবে না?”

জেনিন নোবারাকে নিজের দিকে ঘুরালো। ভোরের আলোয় জেনিনের মুখটা আজ ম্লান দেখাচ্ছে। সে নোবারার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“যে পথে নেমেছি নোবারা, সে পথের কোনো শেষ নেই। আমার সাম্রাজ্য না থাকুক, শুধু তুমি পাশে থেকো। আমার আর কিছু চাই না।”

নোবারা জেনিনের বুকে মুখ লুকালো। তার মনে এক তীব্র অপরাধবোধ কাজ করছিল। জেনিন তাকে কতটা বিশ্বাস করে, আর সে সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে জেনিনের প্রতিটি গোপন ডিল রেকর্ড করছে। সে জানে তাকে এভাবেই চলতে হবে। সে জেনিনকে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেবে না, কিন্তু সে জেনিনকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাবে যেখানে জেনিনকে নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।

“জেনিন,” নোবারা খুব নিচু স্বরে বলল, “আপনি যদি কোনোদিন জানতে পারেন যে আমি আপনাকে ছোট কোনো মিথ্যা বলেছি, তবে কি আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন?”

জেনিন নোবারার চিবুক ধরে মুখটা উপরে তুলল। জেনিনের চোখের দৃষ্টিতে আজ এক উগ্র ভালোবাসা। সে নোবারার ঠোঁটের খুব কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আপনার প্রতিটি মিথ্যা আমার কাছে এক একটি কবিতার মতো নূরা। আমি আপনাকে ক্ষমা করব না, আমি আপনাকে দণ্ড দেব—সারাজীবন আমার বাহুবন্দি হয়ে থাকার দণ্ড।”

জেনিন নোবারাকে জাপটে ধরল। তাদের এই আলিঙ্গনে আজ কোনো দম্ভ ছিল না, ছিল এক ধরণের আর্তি। জেনিন নোবারার শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে দিতে দিতে তার গলায় নিজের মুখ ডোবাল। নোবারা জেনিনকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

জেনিনের আলিঙ্গনের ভারে নোবারা যেন নিজের অস্তিত্বই হারিয়ে ফেলছিল। জেনিনের প্রতিটি স্পর্শে এক অদ্ভুত অস্থিরতা, যেন সে নোবারাকে তার শরীরের ভেতরে কোথাও লুকিয়ে ফেলতে চায়, যাতে বাইরের পৃথিবীর কোনো আঁচ তাকে স্পর্শ করতে না পারে।

জেনিন তার মুখ নোবারার ঘাড় থেকে তুলে নিয়ে আলতো করে নোবারার কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। তারপর খুব নিচু, ভারী গলায় উর্দুতে আওড়ালো,

“Main ladunga har dushman se, chhahe woh maut hi kyun na ho,
Par tumhare bina jeena, mere liye hai meri hi barbaadi ka aagaz.”

নোবারা জেনিনের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে আজ কোনো মাফিয়া ডনের নিষ্ঠুরতা নেই, আছে শুধু এক অসহায় প্রেমিকের আকুতি। নোবারার অপরাধবোধের দহন তখন আরও বেড়ে গেল। সে জেনিনের শার্টের কলার মুচড়ে ধরে তার বুকের স্পন্দন শুনতে চাইল।

“আপনি কি সত্যিই আমার জন্য নিজের এই সবকিছুর মায়া ত্যাগ করতে পারবেন?” নোবারা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল।

জেনিন নোবারার কপালে আলতো করে টোকা দিয়ে মৃদু হাসল। তার সেই হাসিটা আজ বড় বিষাদময়। সে নোবারার চুলগুলো সরিয়ে কানের পেছনে গুঁজে দিল। “তুমি যদি চাও, আজই এই অস্ত্র, এই সিংহাসন, এই নূরশাদ সাম্রাজ্য সব ধূলিসাৎ করে দিতে পারি। তুমি আমার কাছে কোনো সাম্রাজ্যের চেয়ে কম নও, নূরা।”

জেনিন তাকে আরও নিবিড়ভাবে কাছে টেনে নিল। তাদের মাঝখানে বাতাসের ছিটেফোঁটাও যেন প্রবেশের জায়গা নেই। নোবারা জেনিনের বক্ষে নিজের কান পেতে রাখল। সে জানে, এই মানুষটা তাকে আগলে রাখার জন্য আগুনের নদীতেও ঝাঁপ দিতে পারে, অথচ সে এই মানুষটারই সাম্রাজ্য ধ্বংস করার নীল নকশা কষছে।

“আপনি খুব পাগল, জেনিন,” নোবারা ফিসফিস করে বলল, তার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল জেনিনের শার্টের ওপর।

জেনিন সেই জলবিন্দুটা নিজের আঙুল দিয়ে মুছে দিল। তার কণ্ঠস্বরে এবার একটু শাসন আর প্রচুর সোহাগ। “পাগল তো আপনিই করেছেন। এখন কাঁদছেন কেন? আমি কি আপনার মন খারাপ করার মতো কিছু বলেছি?”

নোবারা জেনিনের বুকের সাথে নিজের মুখ ঘষল। “আপনার এই শায়েরিগুলো… খুব মায়াবী। এগুলো কি অন্য কাউকে কখনো শুনিয়েছেন?”

জেনিন নোবারার চিবুক ধরে তাকে সোজা করে দাঁড় করাল। তার চোখে এবার এক গভীর অধিকারবোধ। “এই শায়েরি শুধু তোমার জন্য। আমার এই অন্ধকার জীবনে তুমিই একমাত্র আলো। আজ থেকে এই আলো নিভে যেতে আমি দেব না, আর তোমাকে ছাড়া অন্য কোনো ছায়া আমি সহ্যও করব না।”

সে আবারো নোবারার ঠোঁটের কাছে ঝুঁকে এল। এই মুহূর্তটা যেন এক থমকে যাওয়া সময়। নোবারা চোখ বন্ধ করল। সে জানে, এই মানুষটাকে সে ঠকাচ্ছে, কিন্তু তার এই মুহূর্তের আদরটুকু সে কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারছে না। জেনিনের ঠোঁটের উষ্ণতা আর তার প্রতি এই অন্ধ বিশ্বাস নোবারার ভেতরের অটলতাকে বারবার নাড়িয়ে দিচ্ছে।

<><><><><><><><><>

ডিবি সদর দপ্তরের কনফারেন্স রুমে তখন যেন শ্মশানের নিস্তব্ধতা। টেবিলের ওপর রাখা কফির কাপ থেকে ধোঁয়া ওঠা বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা এসি নানামি জায়দানের চোয়াল শক্ত, কপালে ঘাম আর চোখের মণি দুটো রাগে ও হতাশায় ধিকিধিকি জ্বলছে। গতরাতের পোর্টের ব্যর্থতা তার ক্যারিয়ারে কেবল একটি কালিমাই লেপন করেনি, বরং তার আত্মসম্মানে এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।

পুলিশ কমিশনারের করা তিরস্কার নানামির কানে এখনো বাজছে। “মিস্টার জায়দান, আপনি কি ঘুমাচ্ছিলেন? আপনার টিমের চোখের সামনে দিয়ে Z তার মাল নিয়ে উধাও হয়ে গেল আর আপনি বলছেন ধোঁয়ার কারণে কিছু দেখতে পাননি?”

নানামি টেবিলের ওপর রাখা পোর্টের ম্যাপটা এক ঝটকায় সরিয়ে মেঝেতে ফেলে দিল। তার চিৎকারে ঘরের দেয়ালগুলো যেন কেঁপে উঠল।

“কে এই জেড? কোন মাটি দিয়ে তৈরি এই মানুষটা?” নানামি নিজের মনেই বিড়বিড় করল।

তার দুহাতে নিজের চুল খামচে ধরল সে। এক ধরণের উন্মাদনা তাকে গ্রাস করছে। সে এক দুর্ধর্ষ পুলিশ অফিসার, যার নাম শুনলে শহরের ছিঁচকে অপরাধীরা এলাকা ছাড়ে। অথচ এই এক ‘জেড’ তাকে বারবার নাস্তানাবুদ করছে। এতো বছর ধরে সে অপরাধীদের মনস্তত্ত্ব পড়ছে, কিন্তু এই লোকটার কোনো হদিস সে পাচ্ছে না।

নানামি চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ল। সে চোখ বন্ধ করলেই গতরাতের সেই দৃশ্যটা দেখতে পাচ্ছে। কুয়াশার ভেতর দিয়ে একটা ছায়া, দীর্ঘদেহী, রহস্যময়। যখন সে পিস্তল উঁচিয়ে লোকটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, যখন সে চিৎকার করে বলেছিল ‘হ্যান্ডস আপ’, তখন ওই লোকটা কেন পালাল না? কেন সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল?

সবচাইতে বড় যন্ত্রণার জায়গাটা হলো ওই মুহূর্তটি। নানামি যখন লোকটার খুব কাছে পৌঁছালো, তখন তার বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠেছিল। তার হাত কেঁপেছিল। এমনটা তো হওয়ার কথা নয়। সে একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অফিসার, তার আঙুল ট্রিগারে থাকে সবসময় স্থির। কিন্তু গতরাতে যখন সে ওই ছায়াটার মুখোমুখি হয়েছিল, তার মনে হয়েছিল সে কোনো এক অতি পরিচিত মানুষকে দেখছে।

“কেন আমার ভেতরে ওই দুর্বলতা কাজ করল?” নানামি আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। তার লাল হয়ে থাকা চোখগুলোর দিকে তাকিয়ে সে নিজেকেই প্রশ্ন করল। “কেন ওই লোকটার শরীরী ভাষা আমাকে আগের কোনো এক স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল? কেন আমার অবচেতন মন আমাকে গুলি চালাতে বাধা দিল?”

নানামির মনে পড়ে গেল তার শৈশবের সেই প্রিয় বন্ধুর কথা, তার নুরশাদের কথা। পনেরো বছর আগে স্টেশনে যে ছেলেটাকে সে বিদায় জানিয়েছিল, সেই জেনিন কি আজ এই ‘জেড’ হতে পারে? নানামি মাথা নাড়ল। অসম্ভব। জেনিন কীভাবে এই রক্তপিচ্ছিল জগতের অধিপতি হবে? আর যদি সে জেনিন হয়ও, তবে সে নানামির সাথে এমন লুকোচুরি খেলছে কেন?

নানামি ড্রয়ার থেকে একটি ফাইল বের করল। এটি ‘জেড’-এর ওপর তৈরি করা তার ব্যক্তিগত ডায়েরি। সে দেখল গত পাঁচ বছরে জেড যতবার পুলিশের সামনে পড়েছে, ততবারই সে কোনো না কোনো কৌশলে পুলিশকে বিভ্রান্ত করেছে, কিন্তু কোনো পুলিশ অফিসারের ওপর সে সরাসরি গুলি চালায়নি। এটা জেনিন ছাড়া আর কারো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হতে পারে না, এই ধারণাটা নানামিকে পাগল করে দিচ্ছে।

নানামি তার ডেস্কে থাকা ল্যাপটপটা আবার খুলল। পোর্টের সিসিটিভি ফুটেজগুলো সে বারবার জুম করে দেখছে। হঠাৎ সে লক্ষ্য করল, ফিউজ বক্স ব্লাস্ট হওয়ার ঠিক এক সেকেন্ড আগে পোর্টের একটি ড্রোন খুব বিচিত্রভাবে মুভ করেছিল।
“এটা কোনো পুলিশের ড্রোন ছিল না,” নানামি চিৎকার করে তার সহকারীকে ডাকল। “সামসু! এদিকে এসো! এই ড্রোনটার আইপি ট্র্যাক করো। এটা কে অপারেট করছিল?”

সহকারী দৌড়ে এল। “স্যার, এটা তো প্রাইভেট নেটওয়ার্ক। ট্র্যাক করা প্রায় অসম্ভব।”

“অসম্ভব বলে কিছু নেই!” নানামি টেবিল চাপড়ালো। “এই ড্রোনের মাধ্যমেই জেডকে কভার দেওয়া হচ্ছিল!”

নানামি তার ডেকোরেশন বোর্ডে একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন আঁকল। সে বুঝতে পারছে, জেডের আশেপাশে এমন একজন আছে যে তাকে রক্ষা করছে, আবার নানামির মতো অফিসারদের কাজও সহজ করে দিচ্ছে না।

নানামির উন্মাদনা এখন চরমে। সে রাতে ঘুমোতে পারছে না। যদিও নিজের ঘরেই সে সুখ পায় না। ঘরে পড়ে থাকা মেয়েটার দিকে তার নজর ও পড়ে না কখনো! তার ঘরে এখন শুধু জেডের ছবি আর পোর্টের ম্যাপ। তার পুরো পৃথিবী এখন আবর্তিত হচ্ছে এক অদৃশ্য শত্রুকে ঘিরে। সে জানে, এই লড়াইটা এখন আর পেশাগত নয়; এটি ব্যক্তিগত।

“আমি তোমাকে ধরবই জেড,” নানামি অন্ধকার জানালার দিকে তাকিয়ে প্রতিজ্ঞা করল। “যদি তুমি আমার নুরশাদ হও, তবে আমি তোমাকে এই অন্ধকার থেকে টেনে আনব। আর যদি তুমি জেড হও, তবে আমি তোমাকে এই পৃথিবীর বুক থেকে মুছে দেব।”

চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here