Soulmate_to_Enemy #পর্ব_২৮

0
1

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_২৮
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

মস্কো, রাশিয়া। বাইরে মাইনাস 15° সেলসিয়াস তাপমাত্রা, চারপাশ তুষারের চাদরে ঢাকা। বাতাসের তীব্র আর্তনাদ ক্যাসলের পাথুরে দেয়ালে আছড়ে পড়ছে। কিন্তু ক্যাসলের ভেতরের হলরুমটি আজ উত্তপ্ত। বিশাল বিশাল ফায়ারপ্লেসে পাইন কাঠের গুড়ি পুড়ছে, যার চটচট শব্দ আর আগুনের লালচে আভা পুরো ঘরকে এক রহস্যময় রূপ দিয়েছে।

জেনিন নূরশাদ আজ তার জীবনের সবচাইতে বড় খেলা খেলতে বসেছে। তার পরনে কালো ভেলভেট এর ওভারকোট, গলায় সিল্কের স্কার্ফ। তার চোখে সেই চেনা গোল্ডেন ফ্রেমের সাদা কাঁচের সানগ্লাস, যার আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো মানুষের ধ্বংসের নীল নকশা। জেনিনের ডানে বসে আছে নোবারা। নোবারার পরনে ভেলভেটের গাঢ় লাল একটি গাউন, তার ওপর সাদা পশমি স্টোল। তার মুখে কোনো মেকআপ নেই, কিন্তু ঠান্ডায় তার নাক আর গালের ডগাগুলো লাল হয়ে আছে, যা তাকে এক অপূর্ব কিন্তু মরণঘাতী সৌন্দর্যে মণ্ডিত করেছে।

টেবিলের অন্য পাশে বসে আছে রাশিয়ার ড্রাগ কিং ইগর পেত্রোভ। ইগরের মুখে এক গভীর কাটা দাগ, তার পেশীবহুল শরীরে অগণিত ট্যাটু। তার চারপাশে সশস্ত্র রুশ বডিগার্ডরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জেনিন আজ কোনো বডিগার্ড আনেনি, ইউজি কেও না! কেবল তার পাশে আছে নোবারা। এটি জেনিনের এক চরম আত্মবিশ্বাস অথবা চরম উন্মাদনা।

Mr. Nurshad” ইগর তার ভরাট গলায় বলল। “You’re claiming an 80 percent share of the Asian market. But what are you giving us in return? Just access to your ‘Titan’ server? Is that enough?”

(“আপনি এশিয়ান মার্কেটের ৮০ শতাংশ শেয়ার দাবি করছেন। কিন্তু বিনিময়ে আপনি আমাদের কী দিচ্ছেন? কেবল আপনার ওই ‘টাইটান’ সার্ভারের এক্সেস? এটা কি যথেষ্ট?”)

জেনিন খুব শান্তভাবে তার গ্লাসের ওয়াইনে এক চুমুক দিল। সে নোবারার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল, তারপর ইগরের দিকে ফিরল! “Igor, power is not just in shares, power is in information. The Titan server will encrypt your every transaction in such a way that even Interpol will not be able to trace you. And what I want in return is your power.”

(“ইগর, ক্ষমতা কেবল শেয়ারে থাকে না, ক্ষমতা থাকে তথ্যে। টাইটান সার্ভার আপনার প্রতিটি লেনদেনকে এমনভাবে এনক্রিপ্ট করবে যে এমনকি ইন্টারপোলও আপনার ছায়া খুঁজে পাবে না। আর বিনিময়ে আমি যা চাইছি, তা আপনার ক্ষমতার তুলনায় কিছুই নয়।”)

নোবারা টেবিলের নিচ দিয়ে তার হাতটা জেনিনের উরুর ওপর রাখল। তার ব্যাগের ভেতরে লুকানো আছে একটি ছোট হাই-ফ্রিকোয়েন্সি জ্যামার এবং একটি ফ্ল্যাশ ড্রাইভ। সে আজ জেনিনের এই মিটিং রেকর্ড করছে। জেনিন নোবারার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল এবং খুব আলতো করে চাপ দিল।

মিটিং যখন তুঙ্গে, ইগর হঠাৎ নোবারার দিকে তাকালো। সে এক শিকারীর দৃষ্টি, হয়তো বা কামনার ও! “Your wife is very calm, Z. But I see a kind of predatory shadow in her eyes. Is she really your partner, or is she your weakness?”

(“আপনার স্ত্রী খুব শান্ত, জেড। কিন্তু ওনার চোখে আমি এক ধরণের শিকারির ছায়া দেখতে পাচ্ছি। উনি কি সত্যিই আপনার পার্টনার, না কি আপনার দুর্বলতা?”)

জেনিন নোবারার হাতটা তুলে তার তালুতে একটি চুমু আঁকল। জেনিনের ঠোঁটের উষ্ণতা নোবারার শরীরে এক বিদ্যুৎ প্রবাহ তৈরি করল। “Nobara is not my weakness, Igor, she is my inspiration. And if you talk about hunters, then know this—the tigress is only calm when she is waiting to grab the tail of her prey.”

(“নোবারা আমার দুর্বলতা নয় ইগর, ও আমার প্রেরণা। আর শিকারির কথা যদি বলেন, তবে জেনে রাখুন—বাঘিনী তখনই শান্ত থাকে যখন সে তার শিকারের টুঁটি চেপে ধরার অপেক্ষায় থাকে।”)

“Very well. Before finalizing the deal, I want to take an examination of your wife. According to our Russian rules, to witness a big deal, you have to taste blood.”

(“বেশ। ডিল ফাইনাল করার আগে আমি আপনার স্ত্রীর একটি পরীক্ষা নিতে চাই। আমাদের রাশিয়ার নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বড় ডিলের সাক্ষী হতে হলে রক্তের স্বাদ নিতে হয়।”)

ইগর ইশারায় একটি ছোট বাক্স টেবিলের ওপর রাখল। ভেতরে দুটি গ্লাস। একটিতে সাধারণ ভদকা, অন্যটিতে মেশানো আছে রাশিয়ার বিখ্যাত ‘অ্যাকোনিট’ বিষ, যা খুব ধীরগতিতে কাজ করে কিন্তু একবার শরীরে ঢুকলে তার কোনো অ্যান্টিডোট নেই।

“If your wife chooses one of these two glasses and survives, then I will know that your luck is with you. And we will sign the deal,”

(“যদি আপনার স্ত্রী এই দুটি গ্লাসের মধ্যে একটি বেছে নেন এবং বেঁচে যান, তবে আমি বুঝব আপনার ভাগ্য আপনার সাথে আছে। আর আমরা ডিল সাইন করব”) এই বলে ইগর ক্রূর হাসল।

হলরুমের তাপমাত্রা যেন এক নিমেষে হিমাঙ্কে পৌঁছে গেল। জেনিনের চোখের মণি দুটো ছোট হয়ে এল। সে জানে ইগর তাকে পরীক্ষা করছে না, সে জেনিনকে অপমান করছে। জেনিন তার হাতের চুরুটটা অ্যাশট্রেতে পিষে ফেলল।

“Igor, you are crossing your limit!”

(“ইগর, আপনি সীমা লঙ্ঘন করছেন,”) জেনিনের কণ্ঠস্বর ছিল সাপের ফণার মতো স্থির।

কিন্তু নোবারা জেনিনের হাতটা চেপে ধরল। সে জানে, এই ডিলটা জেনিনের জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ। সে এও জানে, যদি আজ সে পিছিয়ে যায়, তবে জেনিনের ইমেজ ধুলোয় মিশে যাবে। নোবারা সোজা হয়ে বসল। তার চোখে এক বিচিত্র তেজ।

“I agree,”(“আমি রাজি,”) নোবারা বলল।

জেনিন আঁতকে উঠল। “নূরা, না! আমি আপনাকে এটার অনুমতি দেব না!”

নোবারা জেনিনের চোখের দিকে তাকিয়ে হাসল। “জেনিন, আপনিই তো আমাকে শিখিয়েছেন, ভয়কে আলিঙ্গন করতে। আপনি পাশে থাকলে আমার কিছু হবে না।”

নোবারা টেবিলের ওপর রাখা দুটি গ্লাসের দিকে তাকালো। তার ট্রেনিংয়ের সেই মূহূর্তটি মনে পড়ল যেখানে জেনিন তাকে শিখিয়েছিল কীভাবে তরলের ঘনত্ব আর রঙের সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখে রাসায়নিক শনাক্ত করতে হয়। সে দেখল বাম পাশের গ্লাসটির ওয়াইন একটু বেশি স্বচ্ছ, যেন কোনো বাড়তি রাসায়নিক তার প্রাকৃতিক তৈলাক্ততা কেড়ে নিয়েছে।

নোবারা খুব ধীর হাতে ডান পাশের গ্লাসটি তুলে নিল। পুরো ঘর তখন নিস্তব্ধ। জেনিনের হাতের তালু ঘামছে। সে তার পকেটের পিস্তলটির দিকে হাত বাড়াল। যদি নোবারার কিছু হয়, তবে এই ক্যাসল থেকে কেউ আজ জীবিত বের হবে না।

নোবারা এক চুমুকে গ্লাসটি খালি করে দিল।
কয়েক সেকেন্ড কাটল। নোবারার শরীরে কোনো কাঁপুনি নেই, কোনো নীলচে ছায়া পড়ল না তার মুখে। সে শান্তভাবে গ্লাসটি নামিয়ে রাখল। ইগর স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। নোবারার সাহস দেখে তার রুশ বডিগার্ডরাও মনে মনে শ্রদ্ধা জানালো।

“You are truly lucky, Z,”(“আপনার ভাগ্য সত্যিই সুপ্রসন্ন, জেড”) ইগর দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার ল্যাপটপটি এগিয়ে দিল। “Sign. Asia is yours from now on.” (“সাইন করুন। এশিয়া এখন থেকে আপনার।”)

জেনিন দ্রুত ডিল সাইন করল। কিন্তু তার পুরো মনোযোগ ছিল নোবারার ওপর। সে নোবারাকে জড়িয়ে ধরে দ্রুত ক্যাসল থেকে বেরিয়ে এল। বাইরে বরফের ঝাপটা তাদের মুখে লাগছে।
গাড়িতে ওঠার সাথে সাথে জেনিন নোবারার মুখটা নিজের দুই হাতের মধ্যে নিল। “আপনি পাগল? আপনি জানতেন ওটা বিষ ছিল না?”

নোবারা জেনিনের কাঁধে মাথা রাখল। সে খুব দুর্বল বোধ করছিল। “আমি শুধু আপনার ওপর বিশ্বাস রেখেছিলাম। আপনার দেওয়া ট্রেনিং আমার কাজে লেগেছে।”

জেনিন নোবারাকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। তার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা লোনা জল গড়িয়ে পড়ল নোবারার চুলে। নোবারা জেনিনের বুকের ধুকপুকানি শুনতে পাচ্ছিল। সে জানত সে ঝুঁকি নিয়েছে, কিন্তু এই ঝুঁকির মাধ্যমেই সে জেনিনের সবচাইতে গোপন সার্ভারের এক্সেস পেয়ে গেছে আজ। ইগরের ল্যাপটপে যখন জেনিন সাইন করছিল, নোবারা খুব কৌশলে তার জ্যামার ব্যবহার করে জেনিনের পাসওয়ার্ড কোডটি কপি করে নিয়েছিল।

নোবারার মনে এক বিচিত্র দহন শুরু হলো। জেনিন তাকে জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, তার জন্য কাঁদছে, অথচ নোবারা এই মুহূর্তেই জেনিনের ধ্বংসের সবচাইতে বড় অস্ত্রটি নিজের কব্জায় নিয়েছে। এ কেমন ভালোবাসার খেলা!

<><><><><><><><><>

হোটেল মেট্রোপোল। ঘড়িতে রাত প্রায় একটা। রাশিয়ার এই হাড়কাঁপানো শীতে চারপাশটা যেন স্থবির হয়ে গেছে। রাস্তাঘাটে কোনো মানুষ নেই, কেবল মাঝে মাঝে পুলিশের প্যাট্রোল কারের নীল আলো বরফের ওপর প্রতিফলিত হয়ে এক বিচিত্র পরিবেশ তৈরি করছে।

জেনিন আর নোবারা মস্কোতে পা রেখেছিল ঠিক দুদিন আগে। নূরশাদ ভিলা থেকে প্রাইভেট জেটে করে তারা যখন মস্কোর শেরেমেতিয়েভো বিমানবন্দরে নামে, তখন থেকেই এক রহস্যময় উত্তেজনায় জেনিন ফুটছিল। রাশিয়ার এই আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাথে জেনিনের সম্পর্ক অনেক পুরনো, কিন্তু এবারের সফরটি ছিল ভিন্ন। সে নোবারাকে সাথে এনেছে কেবল তার সঙ্গী হিসেবে নয়, বরং তাকে জেনিন নূরশাদের ‘শক্তির উৎস’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে দিতে। গত দুদিন তারা মস্কোর লাল স্কোয়ারে হেঁটেছে, সেন্ট বাসিলস ক্যাথেড্রালের সামনে ছবি তুলেছে, যেখানে জেনিনকে দেখে মনেই হয়নি সে কোনো মাফিয়া ডন। কিন্তু আজ রাতের সেই ইগর পেত্রোভের মিটিং নোবারাকে আবার বাস্তবের মাটিতে আছড়ে ফেলেছে।

হোটেলের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুটে ঢোকার পর জেনিন নিজেই নোবারার পশমি স্টোলটা খুলে দিল। রুমের ভেতর সেন্ট্রাল হিটিং সিস্টেম চলায় বাইরে তুষারঝড় থাকলেও ভেতরে বসন্তের আমেজ। জেনিন নোবারাকে একটি আরামদায়ক সোফায় বসিয়ে তার জুতোজোড়া খুলে দিল।

জেনিন নোবারার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে তার হাতদুটো নিজের গালে ঘষতে লাগল। “আমি আপনাকে বিপদে ফেলেছি। ওই ইগর বাস্টার্ড টা যে এমন কোনো চাল চালবে, আমি ভাবতেও পারিনি।”

নোবারা জেনিনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। জেনিনের চোখে আজ জল। যে জেনিন শত মানুষের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে হাসতে পারে, সে আজ নোবারার এক ফোঁটা বিপদের সম্ভাবনায় ভেঙে পড়ছে। নোবারার অপরাধবোধ আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। তার ব্যাগের ভেতর থাকা সেই ফ্ল্যাশ ড্রাইভটি যেন আগুনের মতো জ্বলছে। ওই ড্রাইভে জেনিনের ‘টাইটান’ সার্ভারের এনক্রিপশন কোড আছে, যা নোবারা আজ কৌশলে চুরি করেছে।

নোবারা জেনিনের কপালে হাত বুলাতে বুলাতে বলল। “আপনি তো আমাকে বলেছিলেন, ভয়কে জয় করতে। তাহলে এতো চিন্তা কিসের?”

জেনিন হঠাৎ নোবারাকে পাজাকোলা করে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। সে নোবারার ওপর ঝুঁকে পড়ে তার দুপাশে হাত রেখে স্থির হয়ে রইল। মস্কোর এই নিস্তব্ধ রাতে তাদের দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। জেনিনের চোখের কুচকুচে বোবা পার্ল এর মতো মণিগুলো এখন এক অদ্ভুত গভীরতায় ডুবে আছে। ঠোঁটের নিচের তিলটা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

জেনিন নোবারার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট রাখল। সেই স্পর্শে কোনো উগ্রতা ছিল না, ছিল এক আত্মসমর্পণ। নোবারা চোখ বুজে ফেলল। তার মনে হলো সে এক বিশাল মিথ্যের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে জেনিনের পবিত্র ভালোবাসা উপভোগ করছে। সে জেনিনের পিঠ আঁকড়ে ধরল। জেনিনের স্পর্শে আজ এক ধরণের শান্তি ছিল, যেন এই তুষার ঢাকা মস্কোতে তারা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই।

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে জেনিনের ল্যাপটপে একটি নোটিফিকেশন বেজে উঠল। জেনিন বিরক্ত হয়ে উঠে বসল। সে ল্যাপটপটি খুলে দেখল ইউজি বাংলাদেশ থেকে ভিডিও কল দিচ্ছে।

“বস, কথা বলা দরকার। আর্জেন্ট।” ইউজির কণ্ঠস্বর ছিল উত্তেজিত।

জেনিন নোবারার দিকে একবার তাকিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে জানালার পাশে গেল। তার চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ! ছেলেটা আজও টাইমিং সেন্স শিখলো না! যখন তখন যেখানে সেখানে তার আর নোবারার মাঝে চলে আসবে!
“হ্যাঁ বলো…বলো ইউজি, কি বলবে?” জেনিন খেচিয়ে জিজ্ঞেস করলো।

“বস, ভিলার মেইন সার্ভারে একটা ব্রিচ ধরা পড়েছে। কেউ একজন আপনার পার্সোনাল ল্যাপটপ থেকে ‘টাইটান’ প্রজেক্টের ম্যাপ কপি করার চেষ্টা করেছে,” ইউজি এক নিঃশ্বাসে বলে গেল। “আমি আইপি ট্র্যাক করছি। সিগন্যালটা দেখাচ্ছে মস্কোর ওই হোটেলের ভেতর থেকেই।”

জেনিনের হাত শক্ত হয়ে এল। সে আড়চোখে বিছানার দিকে তাকালো। নোবারা তখনো ওভাবেই শুয়ে আছে, কিন্তু তার কান সজাগ। জেনিনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে ইউজিকে নিচু স্বরে বলল, “তুমি কি নিশ্চিত? আমি এখানে আমার পার্সোনাল ল্যাপটপ ছাড়া অন্য কিছু ব্যবহার করছি না।”

“100% নিশ্চিত বস। ওই হ্যাকিংটা হয়েছে ঠিক যখন আপনারা ইগরের ক্যাসলে ছিলেন। ওই সময় আপনার ল্যাপটপ কার কাছে ছিল?” ইউজি প্রশ্ন করল।

জেনিন মনে করার চেষ্টা করল। ল্যাপটপটি গাড়িতে ছিল, আর গাড়ির চাবি ছিল জেনিনের কাছে। কিন্তু তার আগে নোবারা জেনিনের কোটটি ধরে রেখেছিল যখন জেনিন হ্যান্ডশেক করছিল। জেনিনের মনে এক বজ্রপাত হলো। সে বিশ্বাস করতে পারল না যে নোবারা, যে আজ তার জন্য বিষ পান করতে রাজি ছিলেন, সেই তার পিঠে ছুরি মারছে?

“ইউজি, আমি চেক করছি। তুমি এই কথাটা আর কাউকে জানাবে না,” জেনিন সংযোগ কেটে দিল।

সে আবার বিছানার কাছে ফিরে এল। নোবারা উঠে বসেছে। সে বুঝতে পারছে জেনিনের মুড বদলে গেছে।

“কী হয়েছে জেনিন? ইউজি কী বলল?” নোবারা খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল।

জেনিন নোবারার চোখের দিকে তাকালো। সে চাইল নোবারার চোখে কোনো ভয়ের ছাপ দেখতে, কিন্তু নোবারা এক দুর্ধর্ষ অভিনেত্রীর মতো স্থির। জেনিন ভাবল, ‘হয়তো ইউজি ভুল করছে। হয়তো ইগরের কোনো লোক আমার সিস্টেম হ্যাক করেছে।’ জেনিন তার সন্দেহকে দমিয়ে রাখল। সে আজ নোবারাকে অবিশ্বাস করে এই সুন্দর রাতটা নষ্ট করতে চায় না।

“নাথিং মাই বেবিডন। ইউজি বরাবরের মতোই প্যানিক করছে। পোর্টের কিছু ঝামেলা নিয়ে কথা বলছিল,” জেনিন আবার নোবারার পাশে বসল।

রাত বাড়তে লাগল। মস্কোর তুষারঝড় আরও তীব্র হলো। জেনিন নোবারাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ল, কিন্তু নোবারার চোখে ঘুম নেই। সে জানে ইউজি তার হদিস পেয়ে গেছে। তাকে এখন আরও সাবধানে এগোতে হবে।

কিন্তু জেনিন নূরশাদের চোখে এখন আর ঘুম নেই। নোবারা ঘুমিয়ে পড়তেই সে পাশের রুমে চলে গেল। সে তার হাতে থাকা ওয়াইনের গ্লাসটি নিয়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। বাইরে মস্কোর আকাশ এখন গাঢ় বেগুনি আর ধূসর রঙের এক বিচিত্র মিশ্রণ। তুষারপাত কিছুটা কমেছে, কিন্তু বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ এখনো কানের পর্দায় বিঁধছে।

জেনিন তার চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল। চশমা ছাড়া তার চোখ দুটোকে বড় বেশি ক্লান্ত আর বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। পৃথিবীর কাছে সে ‘জেড’, এক দুর্ধর্ষ মাফিয়া সম্রাট, যার ইশারায় শেয়ার বাজার কাঁপে, যার কোড নেম শুনলে পুলিশ অফিসারদের কপালে ঘাম জমে। কিন্তু এই চার দেয়ালের ভেতরে, যেখানে কোনো নোবারা নেই, কোনো ইউজি নেই, সেখানে সে কেবলই এক একা মানুষ। এক এমন মানুষ, যে নিজের তৈরি করা গোলকধাঁধায় নিজেই হারিয়ে গেছে।

সে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। আয়নায় প্রতিফলিত জেনিনকে সে চিনতে পারছে না। এই কি সেই জেনিন, যে এক সময় নদীর পাড়ে বসে সূর্যাস্ত দেখত? এই কি সেই কিশোর, যে নানামির সাথে ভাগ করে টিফিন খেত? জেনিন আয়নার ওপর হাত রাখল। ঠান্ডা কাঁচের স্পর্শ তার শরীরের উত্তাপ যেন শুষে নিল।

“তুই কি সত্যিই ভালো আছিস, নুরশাদ?” সে নিজেকেই প্রশ্ন করল। তার কণ্ঠস্বর ঘরের শূন্যতায় প্রতিধ্বনিত হলো। যেন এই প্রশ্নটা সে তার আত্মার বন্ধু জায়দানের কাছ থেকে শুনতে চাইছে!

জেনিন হাসল। এক করুণ, উপহাসমাখা হাসি। সে জানে, ইউজি তাকে আজ যে তথ্যটা দিল, সার্ভারে ব্রিচ হওয়ার খবর, তা কোনো ভুল নয়। ইউজি ভুল করে না। ওর ইনফরমেশন এ কোনদিন খামতি থাকে নি। জেনিনও জানে ওই ব্রিচটা কে করেছে। সে বুঝতে পেরেছে নোবারা তার কোট ধরার অছিলায় ল্যাপটপের পাসওয়ার্ড চুরি করার চেষ্টা করছিল। সে দেখেছে নোবারার চোখের সেই অস্থিরতা, যা কেবল একজন অপরাধীর চোখেই থাকে যখন সে কোনো গোপন কাজ করে।

“জানেমান, আপনি ভাবছেন আমি অন্ধ,” জেনিন বিড়বিড় করে বলতে লাগল, যেন নোবারা তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। “আপনি ভাবছেন আপনার ওই কাঁপাকাঁপা হাতের কারসাজি আমি লক্ষ্য করিনি? আমি জেনিন নূরশাদ। আমি মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনে বলে দিতে পারি সে মিথ্যা বলছে কি না। অথচ আপনি যখন আমার পাশে বসে ওই রাশিয়ার বিষ পান করার সাহস দেখাচ্ছিলেন, তখন আমি নিজেকেই মিথ্যা বলছিলাম। আমি বলছিলাম, না, নোবারা আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে না।”

জেনিন গ্লাসের পুরো ওয়াইন এক চুমুকে শেষ করল। তরল আগুন যেন তার গলা দিয়ে নেমে গিয়ে হৃদপিণ্ডে জ্বালা ধরিয়ে দিল। সে আজ এক বিচিত্র দ্বন্দ্বে ভুগছে। এক দিকে তার পনেরো বছরের কঠোর পরিশ্রমে গড়া এই সাম্রাজ্য, অন্য দিকে তার জীবনের একমাত্র ভালোবাসা। ইউজি ঠিকই বলেছিল, ভালোবাসা মানুষকে দুর্বল করে দেয়। জেনিন আজ সেই দুর্বলতার চরম শিখরে। এই মুহূর্তে ইউজিকে কিছু বলা ও যাবে না। তৎক্ষণাৎ নোবারার উপর আক্রমণ করবে ছেলেটা!

জেনিন টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটি ছোট ডায়েরি বের করল। এটি সেই ডায়েরি যা সে সবসময় সাথে রাখে। ডায়েরির পাতায় পাতায় রক্তের দাগ নেই, আছে কিছু শুকনো ফুলের পাপড়ি আর কিছু অসমাপ্ত কবিতা। সে একটি পৃষ্ঠা ওল্টালো। সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা— “ক্ষমতা মানেই নিঃসঙ্গতা।”

“আমি আজ ক্ষমতার চূড়ায় বসে আছি, কিন্তু আমার পাশে কেউ নেই!”

জেনিন ঘরের লাইটগুলো নিভিয়ে দিল। এখন কেবল বাইরের রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের ম্লান আলো ঘরে ঢুকছে। সে অন্ধকারের মাঝখানে সোফায় গিয়ে বসল। এই অন্ধকার তার চিরচেনা বন্ধু। সে ভাবছিল তার বাবার কথা। তার বাবা তাকে শিখিয়েছিলেন, “কাউকে বিশ্বাস করবে না জেনিন, এমনকি নিজের ছায়াকেও নয়।” জেনিন তার বাবার কথা শোনেনি। সে নোবারাকে বিশ্বাস করেছে। আর আজ সেই বিশ্বাসের মাসুল তাকে দিতে হচ্ছে রাশিয়ার এই শীতল রাতে।

সে আবার তার ল্যাপটপটি খুলল। ইউজির পাঠানো সেই এনক্রিপ্টেড রিপোর্টটি সে আবার দেখল। ডেটা ট্রান্সফারের লোকেশন দেখাচ্ছে এই রুমটিই। জেনিন চাইলে এখনই পাশের ঘরে গিয়ে নোবারার ব্যাগ চেক করতে পারে। সে চাইলে এখনই নোবারাকে জেরা করতে পারে তার নিজস্ব কায়দায়। কিন্তু সে তা করছে না। কেন?

“কারণ আমি হারতে চাই,” জেনিন নিজের মনেই বলল। “আমি দেখতে চাই আপনার এই ঘৃণার গভীরতা কতটুকু। আপনি যদি আমাকে ধ্বংস করেও শান্তি পান, তবে আমি সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আপনাকে অভিবাদন জানাব। কিন্তু নূরা, আপনি কি পারবেন এই রক্তের বোঝা সারাজীবন বয়ে বেড়াতে? আমি যখন থাকব না, তখন এই জগত আপনাকে ছিঁড়ে খাবে। ইউজি আপনাকে ছেড়ে দেবে না।”

জেনিন ল্যাপটপটি বন্ধ করে দিল। সে তার পিস্তলটি বের করে টেবিলের ওপর রাখল। রুপোলি রঙের পিস্তলটি চাঁদের আলোয় চকচক করছে। জেনিন পিস্তলটির নলের ওপর নিজের আঙুল বোলাতে লাগল। এই একটি ট্রিগার চাপলে সব যন্ত্রণার শেষ হতে পারে। কিন্তু সে তা করবে না। সে লড়াই করবে। সে নোবারাকে জয় করবে, অথবা নোবারার হাতে পরাজিত হবে।

জেনিন উঠে আবার জানালার কাছে গেল। দূরে মস্কোর রেড স্কোয়ার দেখা যাচ্ছে। সে ভাবছিল, যদি এই পনেরো বছর সে মাফিয়া না হয়ে সাধারণ একজন মানুষ হতো, তবে আজ হয়তো সে নোবারাকে নিয়ে কোনো ছোট ক্যাফেতে বসে গরম কফি খেত। তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলত, তাদের সন্তানদের নাম ঠিক করত। কিন্তু আজ তারা এই বিলাসবহুল নরকে বসে একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে।

জেনিন তার শার্টের বোতামগুলো ঢিলে করে দিল। তার বুকের সেই পুরনো ক্ষতটা আজ আবার চুলকাচ্ছে। লন্ডনের সেই বৃষ্টির রাতের ক্ষত। সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখ এখন ছলছল করছে। পৃথিবীর কেউ কোনোদিন জেনিন নূরশাদকে কাঁদতে দেখেনি। আজ এই অন্ধকার ঘর তার সেই গোপন অশ্রুর সাক্ষী হয়ে রইল।

“আমি আপনাকে ভালোবাসি নোবারা। এই একটি সত্য আমাকে তিল তিল করে শেষ করে দিচ্ছে। আমি জানি আপনি আমার মৃত্যু পরোয়ানা লিখছেন, তবুও আমি আপনাকে আগলে রাখব। আমি জানি আপনি আমাকে ঘৃণা করেন, তবুও আমি আপনাকে নিজের অস্তিত্বে ধারণ করব। কারণ জেনিন নূরশাদ একবার যাকে নিজের করে নিয়েছে, তাকে সে জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করবে।”

জেনিন আবার ওয়াইনের বোতলটি হাতে নিল। সে জানে কাল সকালে যখন সে নোবারার সামনে দাঁড়াবে, তখন তার মুখে আবার সেই পাথুরে গাম্ভীর্য ফিরে আসবে। সে আবার হবে দুর্ধর্ষ ‘জেড’। নোবারা টেরও পাবে না যে গত রাতে জেনিন কতটা ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। কতটা কষ্ট পেয়েছিল নোবারার এই বিশ্বাসঘাতকতার খবর পেয়ে! সে কি আফসোস করছে?

জেনিন গ্লাসে ওয়াইন ঢালতে ঢালতে একটি উর্দু শায়েরি মনে মনে বিড়বিড় করল,
“হামনে তো মোহাব্বত কি থি উনসে জান দে কর,
ওহ তো নিকলে কাসাই জো জান লে কর হি মানে।”

জেনিন হাসল। এক বিদ্রূপের হাসি। সে গ্লাসটি তুলে ধরল জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে। “আপনার জয়ের জন্য এই টোস্ট, নোবারা। আপনি আমাকে হারাতে চাইছেন, কিন্তু আপনি জানেন না যে জেনিন নূরশাদ আপনাকে হারানোর আগেই নিজে হেরে বসে আছে।”

রাত তিনটে। জেনিন এখনো সোফায় বসে আছে। তার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে না। সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পাশের ঘরের দরজার দিকে। সে ভাবছে, কাল যখন তারা বাংলাদেশে ফিরবে, তখন কী হবে। ইউজি নিশ্চিতভাবে বিমানবন্দরেই নোবারাকে আক্রমণ করবে। জেনিনকে তখন কার পক্ষ নিতে হবে? তার পনেরো বছরের বিশ্বস্ত ছায়া ইউজি, নাকি তার নিঃশ্বাস সমতুল্য নোবারা?

“সময় ফুরিয়ে আসছে,” জেনিন বিড়বিড় করল। “দেখা যাক, শেষ রক্তটুকু কার ঝরে।”

জেনিন নূরশাদ আজ রাতে তার সব দম্ভ, সব ক্ষমতা আর সব অহংকার বিসর্জন দিয়ে কেবল এক প্রেমিকের আর্তনাদে নিজেকে পুড়িয়ে মারছে। সে জানে সে এক ভয়ংকর ফাঁদে পা দিয়েছে, কিন্তু সেই ফাঁদটি তার কাছে কোনো স্বর্গের চেয়ে কম নয়। কারণ এই ফাঁদটি পেতেছেন স্বয়ং তার স্ত্রী, নোবারা নুরশাদ!

চলবে ইংশাআল্লাহ………….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here