#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_২৯
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
মস্কোর শেরেমেতিয়েভো বিমানবন্দরের রানওয়েতে যখন জেনিন নূরশাদের প্রাইভেট জেটটি উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন ভোরের আলো বরফের ধুলোয় মিশে এক ধোঁয়াটে রূপ নিয়েছে। জেটের ভেতরে রাজকীয় বিলাসিতা থাকলেও পরিবেশটা ছিল থমথমে। জেনিন তার সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে, কিন্তু তার চোয়ালের শক্ত পেশিগুলো বলে দিচ্ছে সে ভেতরে ভেতরে কতটা অশান্ত। তার কোলের ওপর রাখা এনক্রিপ্টেড ল্যাপটপটি মাঝে মাঝেই বিপ দিচ্ছে, ইউজি বাংলাদেশ থেকে অনবরত ডেটা অ্যানালাইসিসের আপডেট পাঠাচ্ছে।
নোবারা জেনিনের ঠিক উল্টো দিকের সিটে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। তার পরনে দীর্ঘ একটি কালো ওভারকোট, হাতে এক কাপ গরম কফি। কফির ধোঁয়া তার চশমার কাঁচে ঝাপসা আস্তরণ তৈরি করছে, যা তার চোখের অস্থিরতাকে ঢেকে রাখার জন্য যথেষ্ট। নোবারার ওভারকোটের ভেতরের গোপন পকেটে সিলভার রঙের ফ্ল্যাশ ড্রাইভটি তার শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। প্রতিটি সেকেন্ডে তার মনে হচ্ছে ওটা বুঝি উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, যেন ওটা কোনো মেমোরি স্টিক নয়, বরং একটা টাইম বম্ব যা যেকোনো মুহূর্তে ফেটে জেনিন আর তার সাজানো এই অভিনয়কে ধ্বংস করে দেবে।
জেটটি যখন মেঘের রাজ্য ছিঁড়ে উপরে উঠে এল, তখন জেনিন চোখ খুলল। সে ল্যাপটপটা একপাশে সরিয়ে রেখে নোবারার দিকে তাকালো। জেনিনের চোখের দৃষ্টিতে আজ এক বিচিত্র সংমিশ্রণ, গভীর প্রেম আর তীক্ষ্ণ সন্দেহ।
“নূরা, আপনি খুব শান্ত হয়ে আছেন। মস্কোর ঠান্ডা কি আপনার রক্তকেও বরফ করে দিল?” জেনিন খুব নিচু স্বরে কথাটি বলল।
নোবারা কফির কাপে এক চুমুক দিয়ে মৃদু হাসল। “শান্ত থাকাই তো ভালো। আপনার এই ঝোড়ো পৃথিবীতে আমি যদি অশান্ত হই, তবে আমরা দুজনই তো ডুবে যাব!”
জেনিন কোনো উত্তর দিল না। সে নোবারার হাতটা তুলে তার তালুতে একটি দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিল। কিন্তু তার চোখ তখনো নোবারার চেহারার সূক্ষ্মতম পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করছিল। জেনিন জানে, ইউজি ইতিমধ্যে বিমানবন্দরের সিকিউরিটি সিসিটিভি হ্যাক করে নোবারার প্রতিটি নড়াচড়া বিশ্লেষণ করছে। ইউজি তাকে মেসেজ পাঠিয়েছে, “বস, ম্যাম যখন আপনার কোট নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তিনি তার ফোন দিয়ে একবার ল্যাপটপের এনএফসি সেন্সর টাচ করেছিলেন। এটা কোনো সাধারণ ভুল হতে পারে না।”
জেনিন ল্যাপটপটি আবার হাতে নিল। সে ফাইল সিস্টেমের গভীরে ঢুকে দেখল ‘প্রজেক্ট টাইটান’-এর মেইন রুট ফোল্ডারে একটি ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট রয়ে গেছে। কেউ একজন সিস্টেমের গেটওয়ে দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করেছে এবং জেনিনের ব্যক্তিগত এনক্রিপশন-কি কপি করার কমান্ড দিয়েছে। জেনিন জানে এই কাজটি করতে হলে প্রোগ্রামিংয়ের গভীর জ্ঞান লাগে। নোবারার মতো সাধারণ পিএ এসব জানলো কিভাবে? জেনিন হিসেব মেলাতে পারলো না।
জেনিন ল্যাপটপটি বন্ধ করে দিল। তার রাগ নোবারার প্রতি নয়, তার রাগ হচ্ছে এই পরিস্থিতির প্রতি! সে যদি আজ একজন সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতো, হয়তো সে তার নূরাকে পেয়ে যেত, নোবারা তাকে ভালোবাসতো কোন বিশ্বাসঘাতকতা করা ছাড়া! অথচ এক জীবনে জেনিন কেবল বিশ্বাসঘাতকতা করাকেই ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ হিসেবে দেখে। বিশ্বাসঘাতকদের ডার্ক সেল এ নির্মম মৃত্যু দিয়ে কবরের মাটি ও দেয় না সে, সাগরের অতল জলে তিমির খাবার হিসেবে ফেলে দেয়! সেখানে তার প্রেয়সী তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে!
জেনিনের মাথার রগগুলো তপ্ত হয়ে উঠছে। এক তীব্র অসহ্য যন্ত্রণা তার কপালের দুপাশ দিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। এই ব্যথাটা নতুন নয়, কিন্তু আজকের তীব্রতা অবর্ণনীয়। সে ল্যাপটপটা দূরে সরিয়ে দিয়ে দুহাতে নিজের মাথা চেপে ধরল। তার মনে পড়ল সেই ছোট্ট জেনিনের কথা, যে তার মায়ের মৃত্যুর পর একফোঁটা আশ্রয়ের জন্য হাহাকার করেছিল। মনে পড়ল তার বাবার কথা, যিনি তাকে ভালোবাসার বদলে শাসনের বেড়াজালে আটকে তাকে রিহ্যাব এ পাঠিয়েছিলেন, আপন দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে লন্ডনের এক নির্জন বোর্ডিং কলেজে নির্বাসিত করেছিলেন। সেই কনকনে ঠান্ডায়, অন্ধকার ঘরে জেনিন একা একা কেঁদেছিল। কেউ ছিল না তার চোখের জল মোছার। সে নিজেই নিজের চোখের জল মুছতে শিখেছে, নিজেই নিজের দানব হয়ে ওঠার কারিগর হয়েছে।
“Villains are not born, they’re made,” জেনিন মনে মনে আওড়ালো। সমাজ তাকে দানব বানিয়েছে, পরিস্থিতি তাকে নিষ্ঠুর হতে শিখিয়েছে। কিন্তু নোবারা? তার জন্যই তো জেনিনের সেই কঠোর খোলসের ভেতরে লুকিয়ে থাকা শেষ মানুষটাকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিল। আজ সেই মানুষটাকেও কি তবে মরতে হবে?
নোবারা জেনিনের অস্থিরতা দেখে কিছুটা বিচলিত হয়ে উঠল। সে হাতের কফির কাপটা রেখে দ্রুত জেনিনের কাছে এগিয়ে এল। জেনিনের মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, ঘাম জমছে কপালে।
“জেনিন! আপনার কী হয়েছে? আমার দিকে তাকান!” নোবারা ব্যাকুল হয়ে জেনিনের কাঁধ ধরল।
জেনিন চোখ খুলল। তার চোখের মণি আজ টকটকে লাল। সেই চোখে না আছে কোনো শাসন, না আছে কোনো আক্রোশ; আছে কেবল এক অতল গহ্বর সমান শূন্যতা। সে হঠাৎ এক ঝটকায় নোবারাকে নিজের কোলের ওপর টেনে নিল। এই টানটা আর পাঁচটা রোমান্টিক আলিঙ্গনের মতো ছিল না, এটা ছিল এক মুমূর্ষু মানুষের শেষ খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো আকুতি।
“জেনিন, আপনি কাঁপছেন কেন? শান্ত হোন!” নোবারা জেনিনের দুপাশে হাত রেখে তাকে স্থির করার চেষ্টা করল।
জেনিন কোনো কথা বলল না। সে তার মুখ নোবারার পেটে গুঁজে দিয়ে তাকে শক্ত করে জাপটে ধরল। তার দীর্ঘদেহী শরীরটা যেন আজ ছোট হয়ে যেতে চাইছে। সে নোবারার ওভারকোটের ওপর দিয়ে তার শরীরকে অনুভব করতে লাগল। জেনিন জানত, ঠিক ওই ওভারকোটের গোপন পকেটেই লুকিয়ে আছে তার সর্বনাশের চাবিকাঠি। কিন্তু সে আজ জেনিন নূরশাদ হতে চায় না। সে আজ কেবল জেনিন হতে চায়, যে ভালোবাসতে জানে, যে হার মানতে জানে।
“নূরা… আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবেন না, প্লিজ।” জেনিনের কণ্ঠস্বর আজ অস্বাভাবিক রকমের ধরা।
নোবারার বুকের ভেতরটা ছলাৎ করে উঠল। সে কি তবে কিছু টের পেয়েছে? না, জেনিনের এই ভেঙে পড়াটা কি স্রেফ শারীরিক অসুস্থতা? নোবারা জেনিনের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। তার আঙুলের মৃদু স্পর্শে জেনিন আরও উন্মাদ হয়ে উঠল। সে নোবারার গলায়, কাঁধে, চিবুকে অগণিত আদর করতে লাগল। প্রতিটি চুম্বনে ছিল এক ধরণের হাহাকার, এক ধরণের মরিয়া চেষ্টা, যেন এই আদরের নেশায় সে ভুলে যেতে পারে যে নোবারা তাকে ঠকাচ্ছে।
“জেনিন, আপনি খুব অসুস্থ। প্লিজ, একটু শুয়ে পড়ুন। আমি ইউজিকে কল দিচ্ছি…”
“না!” জেনিন প্রায় গর্জে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই তার কন্ঠ খাদে নেমে গেল। “ইউজিকে লাগবে না। কাউকে লাগবে না। শুধু আপনি থাকুন। আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখুন, নূরা। আমি আর পারছি না। আমার মাথা ফেটে যাচ্ছে!”
জেনিন হঠাৎ নোবারার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। এক দীর্ঘ, গভীর এবং বিষাদময় চুম্বন। নোবারা বুঝতে পারছিল জেনিনের এই পাগলামির পেছনে কোনো এক বিশাল দহন কাজ করছে। জেনিন আজ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। সে নোবারার ঘাড়ে নিজের তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়তে লাগল। তার আঙুলগুলো নোবারার পিঠে এক অদ্ভুত অস্থিরতায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।
জেনিনের মাথায় তখন তার জীবনের ফেলে আসা দিনগুলো চলচ্চিত্রের মতো ভাসছিল। তার বেস্ট ফ্রেন্ড জায়দান, যাকে সে নিজের ভাইয়ের চেয়েও বেশি জানত, তাকে সে হারিয়েছে। জেনিন সেদিন একা দাঁড়িয়ে ছিল বৃষ্টির মাঝে, নিজের চোখে দেখেছিল নিজের সর্বনাশ! পৃথিবী সেদিনও চুপ ছিল। আজ আবার জেনিন সেই একই একাকীত্ব অনুভব করছে। সে বিড়বিড় করে বলছে,
“I was never the monster. The world needed someone to blame for the darkness, so I became the shadow.”
জেনিন এবার একটু থামলো। নোবারার মুখটার দিকে খুব মন দিয়ে তাকালো। কত মায়াবী এই চেহারা। এই চেহারা নিয়ে কেউ কিভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করে? জেনিন এখনো বুঝতে পারছে না। সে নোবারার কানে কানে ফিসফিস করে বলতে লাগল,
“আপনি জানেন নূরা? আমি যখন ছোট ছিলাম, আমার মা আমাকে বলতেন যে আমি নাকি চাঁদের মতো সুন্দর। কিন্তু আমি যখন বড় হলাম, দেখলাম চাঁদ তো একা। তার চারপাশে কোটি কোটি নক্ষত্র থাকলেও সে একা। আমি সেই নিঃসঙ্গ চাঁদ হতে চাইনি। আমি চেয়েছিলাম আমার একটা পৃথিবী থাকুক। আপনি আমার সেই পৃথিবী ছিলেন।”
‘ছিলেন’ শব্দটা নোবারার কানে তীরের মতো বিঁধল। সে জেনিনের গাল দুটো হাত দিয়ে ধরে নিজের চোখের সমান্তরালে আনল। জেনিনের চোখে জল! জেনিন নূরশাদের চোখে জল!
“কেন এসব বলছেন? আমি তো আপনার পাশেই আছি।” নোবারা মিথ্যেটা গুছিয়ে বলল, কিন্তু তার নিজের গলাও আজ কেঁপে গেল।
জেনিন একটা শুকনো হাসি হাসল। সে নোবারার হাতের তালুতে নিজের মুখ ঘষতে ঘষতে বলল,
“আচ্ছা নূরপরী, আমি কি খুব খারাপ মানুষ? আমি কি আপনাকে খুব কষ্ট দিয়েছি? আপনি আমাকে ঘৃণা করেন? আমাকে একটু ও কি ভালোবাসেন না? আমাকে কেন এতো একা করে দিলেন?”
নোবারা জেনিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল। সে জেনিনের কপালে ছোট ছোট চুমু খেল। জেনিন আজ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। তার এই ভেঙে পড়াটা নোবারার কাছে অবিশ্বাস্য। সে জেনিনকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরল। জেনিনের এই কষ্ট তার নিজেরই সহ্য হচ্ছে না। সে কি বলবে ভেবে পেল না! জেনিন কি তবে সব জেনে গেল?
জেনিন তখনো নোবারার শরীরের ঘ্রাণ নিচ্ছিল প্রাণভরে। সে ভাবছিল, যদি এই জেটটি কোনোদিন রানওয়ে স্পর্শ না করে? যদি এই মেঘের রাজ্যেই তারা সারাজীবনের জন্য আটকে যায়? তাহলে হয়তো তাকে আর নোবারার শাস্তি দিতে হতো না। তাকে আর নিজের হাতে নিজের ভালোবাসাকে খুন করতে হতো না।
“Not all monsters are evil, some are just tired of being broken. আমি আজ খুব ক্লান্ত, নূরা। আমাকে একটু ঘুমোতে দেবেন আপনার কোলে?”
নোবারার চোখের জল আর বাধা মানল না। সে জেনিনকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। জেনিন তার হাতের ওপর মাথা রাখল, কিন্তু তার চোখ খোলা। সে জানালার বাইরে অসীম শূন্যতার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল, এই শূন্যতাই তার আসল গন্তব্য। বিশ্বাসঘাতকতার বিষ জেনিন নূরশাদের রক্তে মিশে গেছে আগেই, আজ শুধু সেই বিষ তার হৃদপিণ্ডে আঘাত করল।
নোবারার মাথার চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে জেনিন বিড়বিড় করে বলল, “নোবারা আকারি, যদি কোনোদিন আপনি দেখেন যে আমি আর নেই… তবে জানবেন, জেনিন নূরশাদ আপনাকে ঘৃণা করতে পারেনি। সে কেবল নিজেকে ঘৃণা করতে করতে শেষ হয়ে গেছে।”
জেটটি তখন মেঘের ওপর দিয়ে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে উড়ে যাচ্ছিল, আর জেনিন নূরশাদ তার জীবনের সবচেয়ে বড় হারের গ্লানি নিয়ে তার ‘বিশ্বাসঘাতক’ প্রিয়ার বুকেই এক টুকরো শান্তি খুঁজে পাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।
জেটটি এখন বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে উড়ছে। ঢাকার আকাশ দেখা যাচ্ছে। নোবারা বুঝতে পারছে আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করবে। সেখানে ইউজি তার পুরো টিম নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। ইউজি নিশ্চিতভাবেই তাকে তল্লাশি করার জন্য জেনিনকে উস্কানি দেবে। নোবারাকে এখন দ্রুত কিছু একটা করতে হবে।
সে বাথরুমে যাওয়ার অজুহাতে উঠে দাঁড়ালো। জেনিন তাকে বাধা দিল না, শুধু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। নোবারা বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। তার হাত কাঁপছে। সে ব্যাগ থেকে ফ্ল্যাশ ড্রাইভটি বের করল।
নোবারা বাথরুমের একটি বিশেষ ভেন্টের দিকে তাকালো। না, সেখানে রাখা নিরাপদ নয়। সে ড্রাইভটি তার চুলের খোঁপার ভেতরে থাকা একটি ক্লিপের সাথে খুব কৌশলে আটকে দিল। তারপর আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে মুখ ধুয়ে নিল।
বাথরুমের সরু আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে নোবারা এক মুহূর্তের জন্য শিউরে উঠল। আয়নায় যে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে, তাকে সে নিজেই চিনতে পারছে না। এই চোখে কি অপরাধবোধ, নাকি কর্তব্যবোধের কাঠিন্য?
কপালে জমে থাকা জলবিন্দুগুলো টিস্যু দিয়ে মুছতে মুছতে নোবারা একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জেটের ইঞ্জিনের মৃদু গুঞ্জন বাথরুমের নিস্তব্ধতায় আরও প্রকট হয়ে বাজছে। তার হাতের তালুতে রাখা সিলভার রঙের ফ্ল্যাশ ড্রাইভটি। এই ছোট যন্ত্রটার ভেতরেই জেনিনের সারাজীবনের অন্ধকার কারবার, তার সাম্রাজ্যের প্রতিটি দুর্বল সংযোগ আর ‘প্রজেক্ট টাইটান’-এর সব গোপন কোড লুকিয়ে আছে।
নোবারার মস্তিষ্ক বলছে, সে ঠিক কাজটাই করছে। এই ডিলগুলো বন্ধ হওয়া মানে হাজার হাজার মানুষের জীবন বেঁচে যাওয়া। সে তো এই কাজ করতেই এসেছিল নুরশাদ ভিলায়! তার ছোটবেলার ভালোবাসার রেশ কাটিয়ে মাফিয়া জেড কে ধ্বংস করতে! কিন্তু তার হৃদয়? সেটা তো জেনিনের ওই বিষাদমাখা চোখ দুটোর কাছে বন্দি হয়ে আছে। এমনটা কেন হচ্ছে তার সাথে! সে তো দুর্বল হওয়ার মেয়ে নয়। অনন্ত তার ব্যাক রেকর্ড তো তাই বলবে। তাহলে আজ কেন…কেন আবারো জেনিনের প্রতি তার দুর্বলতা উপছে পড়ছে। সে তো পথভ্রষ্ট হয়ে যাচ্ছে। উপরমহলে কি উত্তর দিবে সে?
“আমি জেনিনকে ধ্বংস করছি, নাকি নিজেকে?”
নোবারা বিড়বিড় করে নিজেকেই প্রশ্ন করল।
জেনিনের ওই অসহায় আকুতি, তার শৈশবের সেই একাকীত্বের, সবকিছু নোবারার ভেতরের অটল দেয়ালটাতে ফাটল ধরিয়ে দিচ্ছে। সে তো কিশোর জেনিনের সকল দহনের সাক্ষী ছিল। জেনিন কে রিহ্যাব এ পর্যন্ত দেখে এসেছে সে। জেনিন নানামির বন্ধুত্ব দেখে এসেছে। এতো কিছুর পরেও আজ তাকে জেনিনের ধ্বংস হয়ে ফিরতে হয়েছে!
জেনিন তাকে ভালোবেসেছে এক অন্ধ বিশ্বাসে। যে জেনিন কাউকে বিশ্বাস করতে ভয় পায়, সে নোবারার কোলে মাথা রেখে শান্তির ঘুম খুঁজেছে। আর নোবারা? সে সেই শান্তির ঘরে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে!
নোবারার মনে হলো, জেনিন যদি এখন দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাকে জাপটে ধরে বলে, “নূরা, আপনি কি আমাকে ঠকাচ্ছেন?”, তবে হয়তো সে মুহূর্তেই সব সত্যি বলে দিত। জেনিনের ওই উগ্র ভালোবাসার কাছে তার সব পরিকল্পনা খড়কুটোর মতো উড়ে যেত। সে বলতো, আমি আপনাকে বাঁচাতেই আপনাকে ধ্বংস করবো। এর শাস্তি হিসেবে আপনি আমাকে যা দিবেন, আমি মাথা পেতে নেব। কিন্তু জেনিন তো আসেনি। সে বাইরে বসে নিজের অন্তদহনে পুড়ছে, আর নোবারা ভেতরে বসে নিজের অস্তিত্বের সাথে লড়াই করছে।
নোবারার হাত কাঁপছিল যখন সে ড্রাইভটি চুলের খোঁপার গভীরে লুকালো। সে জানত, ইউজি তাকে ছাড়বে না। ইউজির ওই শ্যেন দৃষ্টি তার প্রতিটি পদক্ষেপ মেপে দেখছে। শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর যদি সে ধরা পড়ে যায়, জেনিন কি তাকে নিজ হাতে শাস্তি দেবে? নাকি সে আবারো ওই করুণ চোখে তাকিয়ে বলবে, “আপনিও শেষ পর্যন্ত অন্য সবার মতোই হলেন নূরা?”
নোবারা আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। সে ফিসফিস করে বলল, “ক্ষমা করবেন জেনিন। আপনার এই সাম্রাজ্য ধ্বংস হওয়া দরকার। কিন্তু আমি চাই না আপনি ধ্বংস হোন। আমি আপনাকে এক নতুন জীবনে নিয়ে যেতে চাই, যেখানে কোনো রক্ত থাকবে না, কোনো বন্দুকের আওয়াজ থাকবে না। কিন্তু আপনার এই নূরা অবশ্যই থাকবে।”
অথচ সে নিজেও জানত, জেনিন নূরশাদকে ছাড়া নূরশাদ সাম্রাজ্যের কোনো অস্তিত্ব নেই। জেনিনকে এই পথ থেকে সরানো মানে তাকে জ্যান্ত কবর দেওয়া। এই মাফিয়া হওয়ার পথে একবার যে আসে, তার ফিরে যাওয়ার কোন বিকল্প নেই। হয় শাসন, নয় মৃত্যু!
জেটটি যখন ল্যান্ড করল, তখন ঢাকার আকাশে কালো মেঘের আনাগোনা। কুয়াশার মতো বৃষ্টি পড়ছে। বিমানের সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় নোবারা দেখল কালো স্যুট পরা একদল মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। সবার সামনে ইউজি। ইউজির চোখে আজ কোনো শ্রদ্ধা নেই, আছে কেবল এক শিকারি উল্লাস।
জেনিন আর নোবারা নিচে নামতেই ইউজি এগিয়ে এল। সে জেনিনকে স্যালুট করে নোবারার দিকে এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিল।
“স্বাগতম বস। সফর সফল হয়েছে আশা করি,” ইউজি কর্কশ গলায় বলল।
জেনিন কিছু বললো না। কেবল ইউজির কাঁধে হাত রেখে তপ্ত এক নিঃশ্বাস ছাড়লো।
“কিছু ব্যক্তিগত তল্লাশি দরকার বস। আমাদের সিস্টেম বলছে মস্কোর হোটেল থেকে কিছু তথ্য বাইরে গেছে। আর ওই সময় রুমে কেবল ম্যাম ছিলেন,” ইউজি সরাসরি নোবারার দিকে আঙুল তুলে বলল। সে কোন ভনিতা করতে চাইলো না আজ।
নোবারা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ইউজির সরাসরি এই আক্রমণ একেবারে অপ্রকাশিত ছিল তার কাছে। নোবারা জেনিনের হাত ধরে তার পেছনে একটু আড়াল হওয়ার অভিনয় করল। “জেনিন, ইউজি কি বলছে এসব?” নোবারার কণ্ঠে কান্নাভেজা এক আর্তি।
জেনিন ইউজির দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। ইউজি আবার বলতে লাগল,
“বস, ম্যামের ব্যাগটা একবার চেক করতে দিন,”
জেনিন মাথা নাড়ল। সে জানে ইউজি ব্যাগে কিছু পাবে না। নোবারার ওয়াশ রুমে যাওয়ার বাহানা দেখেই জেনিন বুঝে গিয়েছিল। এখন সে যা হবার, তা হতে দেখছে শুধু। কিছু বলার মুখ নেই তার।
ইউজি নোবারার হাত থেকে ব্যগটা নিল। সে নোবারার চোখের দিকে তাকালো। নোবারার চোখ স্থির। ইউজি ব্যাগটি খুলে মেঝেতে সব জিনিস ঢেলে দিল। পাসপোর্ট, লিপস্টিক, ছোট আয়না, রুমাল—সবই বেরিয়ে এল। কিন্তু সেখানে কোনো ফ্ল্যাশ ড্রাইভ বা সন্দেহজনক কিছু নেই।
ইউজি অবাক হয়ে জিনিসগুলো দেখতে লাগল। “অসম্ভব! আমি নিশ্চিত ছিলাম…”
“যথেষ্ট হয়েছে ইউজি!” জেনিন এবার রাগে গর্জে উঠল। “আর এসব চেক করার দরকার নেই!”
জেনিন নোবারাকে জড়িয়ে ধরে নিজের গাড়ির দিকে নিয়ে গেল। নোবারা আড়চোখে ইউজির দিকে তাকালো। ইউজি তখনো মাটির দিকে তাকিয়ে রাগে ফুঁসছে। নোবারা জানত সে জিতে গেছে, কিন্তু সে এও জানত যে এই জয় সাময়িক। জেনিনের অন্দরে যে সন্দেহের বীজ বপন হয়েছে, তা যেকোনো সময় বিশাল মহীরুহ হয়ে তাদের দুজনকে গ্রাস করবে।
গাড়িতে ওঠার পর জেনিন নোবারার মাথাটা নিজের কাঁধে টেনে নিল। এতো কিছুর পরেও এই মেয়েটার সান্নিধ্য ছাড়া যেন সে এক জীবন্ত লাশ।
নোবারা কোনো কথা বলল না। সে জেনিনের বুকে মাথা রেখে বাইরের বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল। তার চুলের খোঁপার ভেতরে সেই ড্রাইভটি তখনো এক বিষাক্ত উত্তরাধিকারের মতো লুকিয়ে আছে। জেনিনের ভালোবাসা আজ তাকে বাঁচিয়ে দিল, কিন্তু এই ভালোবাসাই একদিন জেনিনের সবচাইতে বড় কাল হয়ে দাঁড়াবে।
গাড়ি যখন গুলশানের নূরশাদ ভিলার গেট দিয়ে ঢুকল, তখন বৃষ্টি থেমে গেছে। ইউজি বাইক নিয়ে আগেই পৌঁছে গিয়েছিল। সে গেটে দাঁড়িয়ে জেনিনকে স্যালুট দিল, আর নোবারার দিকে তাকালো এক ‘দেখে নেব’ ভঙ্গিতে।
নোবারা গাড়ি থেকে নেমে জেনিনের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে ইউজির সামনে এসে থামল। সে খুব মিষ্টি করে হাসল। “ইউজি, আমি মস্কো থেকে আপনার জন্য একটা গিফট আনতে চেয়েছিলাম। জানেন কী?”
ইউজি ভ্রু কুঁচকালো। “কী?”
“এক জোড়া বিশাল বড় চশমা। যাতে মানুষের ব্যাগ চেক করার আগে আপনি অন্তত নিজের চরিত্রটা আয়নায় পরিষ্কার দেখতে পান,” নোবারা এক ঝটকায় জেনিনকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল।
চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।

