#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৩৫
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
নূরশাদ ভিলার আন্ডারগ্ৰাউন্ড এর কনট্রোল রুম। বাইরে তখনো ভোরের ধূসর আলো ফুটে ওঠেনি, কেবল অন্ধকারের শেষ প্রহরটা এক বিষণ্ণ চাদরের মতো ঢাকাকে জড়িয়ে রেখেছে। কনট্রোল রুমের ভেতরে ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের স্থির শীতলতা।
দেয়ালজুড়ে থাকা বারোটি বিশাল 4K মনিটরে এখন হাজার হাজার কোডিং লাইন, এনক্রিপ্টেড ফাইল আর গ্লোবাল পুলিশ ডাটাবেসের নীলচে আলো খেলা করছে।
ইউজি তার চেয়ারে এমনভাবে স্থির হয়ে বসে আছে, যেন সে কোনো জড় পদার্থ। তার লালচে হয়ে যাওয়া চোখগুলো মনিটর থেকে এক সেকেন্ডের জন্যও সরছে না। তার আঙুলগুলো কি-বোর্ডের ওপর দিয়ে যখন চলছে, তখন মনে হচ্ছে কোনো দক্ষ পিয়ানোবাদক তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সুরটি তুলছে। জেনিন নূরশাদ তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। জেনিনের হাতে আজ এক কাপ কড়া ব্ল্যাক কফি, যার ধোঁয়া তার চশমার কাঁচে আলতো বাষ্প তৈরি করছে। জেনিন শান্ত, কিন্তু তার চোখের গভীরে এক শিকারি নেকড়ের তীক্ষ্ণতা। সে মুগ্ধ হয়ে দেখছে তার ডান হাত ইউজিকে, যেই ছেলেটি কেবল একটি কি-বোর্ড ব্যবহার করে পৃথিবীর যেকোনো দেয়াল গুঁড়িয়ে দিতে পারে!
“কতদূর এগোলে?” জেনিন খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল।
ইউজি এক মুহূর্তের জন্য থামল না। সে এন্টার বাটনে শেষ একটি ক্লিক করে চেয়ারটা জেনিনের দিকে ঘোরালো। তার মুখে এক ক্লান্ত কিন্তু পৈশাচিক জয়ের হাসি। “বস, কিরারা হাইজেন নিজেকে যতটা ধোয়া তুলসী পাতা ভাবেন, ততটা তিনি নন। তিনি নিজেকে জাপানিজ ইন্টারপোল ব্যাকগ্রাউন্ডের একজন ক্লিন অফিসার হিসেবে পরিচয় দেন ঠিকই, কিন্তু টোকিও সাইবার সেলের ‘ব্ল্যাক লগার’ প্রজেক্টের সেই পুরনো ফাইলগুলো তিনি ডিলিট করতে ভুলে গেছেন।”
জেনিন কফিতে এক চুমুক দিয়ে মনিটরের দিকে তাকালো। “খুলে বলো। আমি শুনতে চাই এই বিষাক্ত সাপটির গর্ত কত গভীর।”
ইউজি স্ক্রিনের একটি ফোল্ডার ওপেন করল, যার নাম ‘Project Amaterasu’। “বস, কিরারা হাইজেন আসলে একজন ইন্টারপোল অফিসার নন। তিনি ছিলেন টোকিও মেট্রোপলিটন পুলিশের একজন ডিসমিসড ইনভেস্টিগেটর। সাত বছর আগে তাকে একটি চুরির দায়ে বহিষ্কার করা হয়। তিনি পুলিশের প্রোপার্টি ব্যবহার করে ব্ল্যাক মার্কেটে তথ্য বিক্রি করতেন। এরপর তিনি নিজের পরিচয় জালিয়াতি করে ইন্টারপোলে ঢোকেন। আর মজার ব্যাপার কী জানেন? ঢাকায় আসার জন্য তিনি যে রিকমেন্ডেশন লেটার ব্যবহার করেছেন, সেটিও একটি ডার্ক ওয়েব সাইট থেকে কেনা।”
জেনিন মনিটরের দিকে ঝুঁকে পড়ল। সে দেখল কিরারার সেই পুরনো সাদা-কালো ছবি, যেখানে তার ইউনিফর্মের ওপর একটি লাল ক্রসের চিহ্ন দেওয়া। জেনিন একটু হাসল। “আইরন লেডি! অথচ ভেতরের মরিচাটা কেউ দেখেনি। এসি নানামি কি এটা জানে?”
“না বস,” ইউজি দ্রুত টাইপ করতে করতে বলল। “কিরারা এখানে এসেছেন আপনার ‘জেড’ প্রোফাইলটি দখল করার জন্য। তার মূল উদ্দেশ্য আপনাকে গ্রেফতার করা নয়, বরং আপনার নেটওয়ার্কের এক্সেস পয়েন্টগুলো চুরি করা যাতে সে নিজেই একজন ইন্টারন্যাশনাল ব্রোকার হতে পারে।”
ইউজি স্ক্রিন এ আঙুল দেখিয়ে আবারো একটানা বলতে লাগলো, “এই যে দেখুন, সে অলরেডি রাশিয়ান মাফিয়াদের সাথে একটি এনক্রিপ্টেড চ্যানেলে যোগাযোগ করেছে। সেখানে সে প্রমিজ করেছে যে সে ‘Z’ এর কন্ট্রোল তাদের হাতে তুলে দেবে বিনিময়ে দশ মিলিয়ন ডলার নেবে।”
জেনিন তার কফির কাপটা পাশের টেবিলে রাখল। সে মুগ্ধ হয়ে ইউজির দিকে তাকিয়ে থাকল। ইউজি যে কেবল হ্যাকার নয়, সে যে একজন পূর্ণাঙ্গ গোয়েন্দা, তা জেনিন আজ আবার নতুন করে অনুভব করল। জেনিন ইউজির কাঁধে হাত রাখল। জেনিনের স্পর্শে ইউজি একটু চমকে উঠল। জেনিনের চোখে আজ সেই বিরল মমতা।
“ইউজি, মাঝে মাঝে মনে হয় তুমি না থাকলে এই জেনিন নূরশাদ হয়তো অনেক আগেই কোনো এক অন্ধকার গলিতে হারিয়ে যেত। প্রাউড অফ ইউ, মাই ম্যান!”
ইউজি মাথা নিচু করল। জেনিনের এই সামান্য প্রশংসা তার কাছে পৃথিবীর সব সম্পদের চেয়ে দামী।
জেনিন আবার স্ক্রিনের দিকে তাকালো। “কিরারার প্রতিটি ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ওর এই চ্যাট হিস্ট্রি আর ওই ফেক রিকমেন্ডেশন লেটার, সবকিছুর একটা ফিজিক্যাল ফাইল তৈরি করো। আমি চাই না এটা ইন্টারনেটে ফাঁস হোক। আমি চাই এই বিষটা আমি নিজে জায়দানের হাতে দেব।”
ইউজি দ্রুত প্রিন্ট কমান্ড দিল। লেজার প্রিন্টার থেকে এক একটি করে পাতা বেরিয়ে আসতে লাগল, যাতে লেখা আছে কিরারা হাইজেনের পুরো জীবনের প্রতিটি কলঙ্কিত অধ্যায়। জেনিন একেকটি পাতা হাতে নিয়ে দেখল। সেখানে কিরারার ব্যক্তিগত সম্পর্কের কিছু তথ্যও আছে, যা তাকে সামাজিকভাবেও পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
ইউজি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল জেনিনের চোয়াল শক্ত হয়ে আসছে। জেনিন ফাইলগুলো এক জায়গায় গুছিয়ে একটি কালো চামড়ার ফোল্ডারে রাখল।
“কাজ শেষ। তুমি এখন বিশ্রাম নাও,” জেনিন দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলল। “আমি আজ সন্ধ্যায় এসি নানামির সাথে দেখা করব। তবে ক্যাফেতে নয়, সরাসরি ডিবি সদর দপ্তরে।”
ইউজি তার চেয়ারে হেলান দিল। সে দেখল জেনিন যখন কনট্রোল রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, তার হাঁটার মধ্যে এক অদ্ভুত রাজকীয় দম্ভ কাজ করছে। জেনিন জানে সে আজ জিতে গেছে। সে জানে যে কিরারা হাইজেন নামের এই উপদ্রবটি আজ থেকে ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাবে।
ইউজি মনে মনে ভাবল, জেনিন বসকে সে যতটা চেনে, তার চেয়েও অনেক বেশি জেনিন তাকে চমকে দেয়। জেনিনের এই নিখুঁত শান্ত মেজাজটাই হলো তার সবচাইতে বড় অস্ত্র। জেনিন যখন কাউকে মুগ্ধ করে, তখন সে আসলে তাকে তার জালে বন্দি করে ফেলে। ইউজি নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করল, “বস, আপনি এই যুগের শতরঞ্জির সবচাইতে বড় খেলোয়াড়। স্যালুট ইউ!”
নূরশাদ ভিলার কনট্রোল রুম থেকে বেরিয়ে জেনিন যখন তার শোবার ঘরে ফিরল, তখন তার ভেতরে এক অদ্ভুত শীতলতা। ইউজির বের করা তথ্যগুলো কেবল কিরারাকে ধ্বংস করার অস্ত্র নয়, এগুলো জেনিনের কাছে এক ধরণের মানসিক তৃপ্তি। সে জানত কিরারা নোংরা খেলবে, কিন্তু সে যে এতটা নিচু স্তরের অপরাধী হতে পারে, তা জেনিনের কল্পনারও বাইরে ছিল। জেনিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের টাইটা ঠিক করল। আজ সে কোনো ক্যাজুয়াল পোশাক পরেনি; পরনে চারকোল গ্রে রঙের থ্রি-পিস স্যুট, চোখে সেই ধ্রুব তারার মতো স্থির দৃষ্টি।
|||সকাল ১০টা। ডিবি সদর দপ্তরে আজ সাধারণের চেয়েও বেশি ব্যস্ততা। এসি নানামি জায়দান তার ডেস্কে বসে গত রাতের হামলার ফুটেজগুলো বারবার দেখছিল। তার মাথায় এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে জেনিনের সেই শীতল চাহনি আর ইউজির বন্দুকের নল। কিরারা হাইজেন তার কেবিনে বসে কারো সাথে নিচু স্বরে কথা বলছিল। তার চোখেমুখে এক ধরণের অস্থিরতা ছিল, যা নানামি খেয়াল করেনি।
ঠিক তখনই সদর দপ্তরের প্রধান ফটকে একটি রাজকীয় কালো রোলস রয়েস এসে থামল। জেনিন নূরশাদ গাড়ি থেকে নামল। তার সাথে কোনো বডিগার্ড নেই, আজ সে একা। জেনিনের এই নিঃসঙ্গতা আসলে তার সবচাইতে বড় শক্তির বহিঃপ্রকাশ। সে যখন লিফটে চড়ে নানামির ফ্লোরে পৌঁছালো, পুরো করিডোর যেন মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সাধারণ পুলিশ অফিসাররা থমকে দাঁড়িয়ে দেখল এই শহরের সবচাইতে শক্তিশালী মানুষটি আজ তাদের ডেরায়।
জেনিন সরাসরি নানামির কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। নানামি চমকে উঠে দাঁড়ালো। “নুরশাদ!” সে আপনমনে বিড়বিড় করলো।
জেনিন কোনো কথা না বলে নানামির উল্টো দিকের চেয়ারে বসল। সে পকেট থেকে একটি চুরুট বের করে ধরালো। ডিবি অফিসের ভেতরে ধূমপান নিষেধ, কিন্তু জেনিনকে বাধা দেওয়ার সাহস যেন কারো নেই।
“শুনেছি তুই গত রাতে আমার বাড়িতে গিয়েছিলি জায়দান” জেনিন ধীর লয়ে বলল। “পুরোনো বন্ধুর সাথে দেখা করার একটা দারুণ অজুহাত ছিল তোর কাছে!”
নানামির মুখ অপমানে লাল হয়ে গেল। “মি: নুরশাদ, আমার কাছে ইনফরমেশন ছিল যে সেখানে অবৈধ কিছু হচ্ছে। আমি আমার দায়িত্ব পালন করছিলাম।”
“দায়িত্ব?” জেনিন একটু হাসল। “নাকি তুই কারো হাতের পুতুল হিসেবে কাজ করছিলি জায়দান?”
ঠিক সেই মুহূর্তে কিরারা হাইজেন কেবিনে ঢুকল। জেনিনকে দেখে তার শরীর মুহূর্তের জন্য জমে গেল, কিন্তু সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। “মি: নূরশাদ, আপনি এখানে কোন সাহসে এসেছেন? আমাদের কাছে আপনার বিরুদ্ধে সার্চ ওয়ারেন্ট আছে।”
জেনিন কিরারার দিকে না তাকিয়েই তার হাতের সেই কালো চামড়ার ফোল্ডারটা টেবিলের ওপর রাখল। “সাহস আমার অনেক আছে মিস হাইজেন। কিন্তু আপনার কি আছে? সততা? নাকি শুধু এক মুখ মিথ্যে আর জালিয়াতি?”
কিরারা থমকে গেল। “আপনি কী বলতে চাচ্ছেন?”
জেনিন ফোল্ডারটা খুলে প্রথম পাতাটা নানামির দিকে এগিয়ে দিল। “ইন্সপেক্টর নানামি, আপনি যার সাথে কাজ করছেন, তার পরিচয়টা একবার দেখে নিন। টোকিও মেট্রোপলিটন পুলিশের বহিষ্কৃত অফিসার কিরারা হাইজেন। যার ওপর চুরির দায়ে চার্জশিট হয়েছিল। যে তার নিজের দেশের পুলিশ ডাটাবেস হ্যাক করে তথ্য বিক্রি করত।”
নানামির চোখ বড় বড় হয়ে গেল। সে দ্রুত ফাইলটা হাতে নিয়ে পাতাগুলো উল্টাতে লাগল। কিরারার মুখ তখন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। সে নানামির হাত থেকে ফাইলটা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু জেনিন তার কবজিটা এক প্রবল শক্তিতে চেপে ধরল। জেনিনের আঙুলগুলো যেন লোহার সাঁড়াশি।
জেনিন এবার ঘুরে নানামির চোখে চোখ রেখে বলল, “ইন্সপেক্টর নানামি, পরের পাতাগুলো দেখুন। এই মহিলা ঢাকার ডিবি অফিসে রিকমেন্ডেশন লেটার জমা দিয়েছিল ইন্টারপোল থেকে। অথচ ইন্টারপোলের কোনো রেকর্ডেই তার নাম নেই। সে ডার্ক ওয়েব থেকে কেনা ফেক ডকুমেন্টস দিয়ে আপনাদের ডিপার্টমেন্টকে ধোঁকা দিয়েছে।”
কিরারা চিৎকার করে উঠল, “এসব মিথ্যে! জেনিন নূরশাদ আমাকে ফাঁসানোর জন্য এসব তৈরি করেছে!”
“ইউজিকে চেনেন তো কিরারা?” জেনিন খুব শান্ত গলায় বলল। “সে যখন কারো পেছনে লাগে, তখন তার কবরের মাটি খুঁড়েও সত্য বের করে আনে। আপনার রাশিয়ার মাফিয়াদের সাথে সেই ১০ মিলিয়ন ডলারের ডিল, সবকিছুর এনক্রিপ্টেড চ্যাট এই ফাইলে আছে।”
নানামি একে একে সব প্রমাণ দেখল। কিরারার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্ট, তার ছদ্মনামে করা পাসপোর্ট, সবকিছুই অকাট্য। নানামির পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে যাচ্ছিল। সে যে মেয়েটির জন্য নিজের বন্ধুর বিরুদ্ধে গিয়ে লড়াই করছিল, সে-ই আসলে একজন জঘন্য অপরাধী।
নানামি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তার দুচোখে এখন প্রবল ঘৃণা। সে কিরারার দিকে তাকিয়ে খুব নিচু কিন্তু তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, “আপনি আমাকে ব্যবহার করেছেন কিরারা? আপনি পুলিশ ডিপার্টমেন্টের সাথে ছলনা করেছেন?”
কিরারা এখন আর অস্বীকার করার জায়গা পাচ্ছিল না। সে টেবিলের ওপর রাখা তার ব্যাগটা নেওয়ার চেষ্টা করল, হয়তো সেখানে কোনো অস্ত্র ছিল। কিন্তু তার আগেই জেনিন তার চেয়ারটা এক লাথিতে সরিয়ে দিল। কিরারা মেঝেতে পড়ে গেল।
“আপনার সময় শেষ কিরারা,” জেনিন দালান কাঁপিয়ে বলল। “আপনার এই জালিয়াতির খবর ইউজি অলরেডি টোকিওতে পাঠিয়ে দিয়েছে। তারা আপনাকে আজীবনের জন্য বরণ করতে প্রস্তুত।”
এর মিনিট দশেক পর, পুরো করিডোর তখন অফিসারের ভিড়ে ঠাসা। দুজন কনস্টেবল কিরারাকে ধরে বেঁধে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিরারা জেনিনের দিকে তাকিয়ে অকথ্য ভাষায় গালি দিচ্ছিল, কিন্তু জেনিনের কানে তা পৌঁছাচ্ছিল না। নানামি ও কোন বাঁধা দেওয়ায় মুখ রাখলো না।
জেনিন নানামির খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। নানামি মাথা তুলল না। তার চোখের কোণে জমে থাকা জলটা সে লড়াকু সৈনিকের মতো আড়াল করতে চাইল, কিন্তু জেনিনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির কাছে তা ধরা পড়ে গেল। জেনিন দেখল, নানামির টেবিলের এক কোণে এখনো সেই পুরনো মেডেলটা পড়ে আছে, যেটা তারা স্কুলে থাকতে ফুটবল টুর্নামেন্টে জিতেছিল।
“উঠে দাঁড়া জায়দান,” জেনিন খুব শান্ত গলায় বলল। তার কণ্ঠে আজ কোনো ব্যঙ্গ নেই। “একজন বিশ্বাসঘাতক অপরাধীর জন্য এসি নানামি জায়দান মাথা নিচু করে থাকবে, এটা মানায় না।”
নানামি ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার চোখে আজ একরাশ হাহাকার। “তুই জানতিস নুরশাদ? তুই আগে থেকেই জানতিস কিরারা আমাকে ব্যবহার করছে?”
“আমি জানতাম না, ইউজি জেনেছে,” জেনিন সোফায় হেলান দিয়ে বসল। “আমি তোকে আগেই বলেছিলাম, তোর এই ‘ভালো মানুষ’ হওয়ার চেষ্টা তোকে অন্ধ করে দেয়। তুই সবসময় প্রলেপ খুঁজতে চাস, কিন্তু আমি ক্ষতটা কেটে বাদ দিতে জানি। দ্যাটস হোয়াই, উই আর ডিফরেন্ট!”
নানামি দীর্ঘশ্বাস ফেলে জেনিনের চোখের দিকে তাকালো। “১৫ বছর..১৫ বছর হয়ে গেল নুরশাদ। আমি অপেক্ষা করছিলাম তুই ফিরে আসবি। তুই ফিরেছিস ঠিকই, কিন্তু আমার নুরশাদ হয়ে নয়, ‘জেড’ হয়ে। তুই কেন এমন করলি ভাই?”
জেনিনের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। তার মনে পড়ে গেল সেই তামাটে বিকেলের কথা। সেন্ট জুডের পেছনের বটতলা, যেখানে সে নিজের কব্জি কেটে নানামিকে অভিশাপ দিয়েছিল।
“তুই তো জানতিস আমি কেন এমন করেছি,” জেনিন দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
নানামি আজ আর চুপ করে থাকল না। সে টেবিলের ওপর সজোরে চাপড় মারল। “তুই তখন নোবারার জন্য পাগল ছিলি, আর আমি চেয়েছিলাম আমার বেস্ট ফ্রেন্ড যেন খুশি থাকে। কিন্তু সে ঠিকই আমাকে ভুল বুঝলো!”
দুই বন্ধুর কণ্ঠস্বর এখন ডিবি অফিসের করিডোরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। অফিসের বাইরে থাকা কনস্টবলরা অবাক হয়ে শুনছে যে, এই শহরের নামকরা বিজনেসম্যান জেনিন নুরশাদ’ আর তাদের কঠোর অফিসার একসময় ‘তুই’ করে কথা বলত।
জেনিন জানালার কাঁচের দিকে তাকিয়ে রইল। বাইরের বৃষ্টি এখন আর অঝোর নয়, ঝিরঝিরে। তার মনে পড়ে গেল লন্ডনের সেই কনকনে শীতের রাতগুলো, যেখানে সে একা একাই নারকেলের নাড়ু খুঁজত, কিন্তু পেত না।
“মনে আছে জায়দান?” জেনিন খুব নিচু স্বরে বলল। “স্টেশনে তুই আমাকে নাড়ু আর ইলিশ মাছ ভাজা দিয়েছিলি। আমি ট্রেনে ওগুলো খাওয়ার সময় হাউমাউ করে কেঁদেছিলাম। আমি তখনো চাইছিলাম ট্রেন থেকে ঝাঁপ দিয়ে তোর কাছে ফিরে আসি। কিন্তু আমার ইগো আমাকে আসতে দেয়নি। সেদিন ফিরতে পারলে আমাদের বন্ধুত্বটা হয়তো আজ এই জঘন্য রুপ নিত না!”
নানামি উঠে জেনিনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। সে জেনিনের শার্টের কলারটা আগের মতো খামচে ধরল না, বরং জেনিনের কাঁধে হাত রাখল। “তুই ক্ষমতা পেয়েছিস নুরশাদ, কিন্তু শান্তি পাসনি। তুই নোবারাকে পেয়েছিস, কিন্তু তাকে কি বিশ্বাস করাতে পেরেছিস যে তুই সেই পুরোনো জেনিন? তুই তো এখন ওকে একটা সোনার খাঁচায় বন্দি করে রেখেছিস। তুই ওকে পাহারা দিস, ভালোবাসিস না।”
জেনিন এক ঝটকায় নানামির হাত সরিয়ে দিল। তার চোখে আবার সেই রক্তবর্ণ আভা ফুটে উঠল। “খবরদার জায়দান! নোবারার ব্যাপারে কোনো কথা বলবি না। ও আমার। ও যেভাবে খুশি থাকবে, আমার কাছে থাকবে। তোকে সেদিনও বলেছিলাম, আজও বলছি, নোবারা আর জেনিনের মাঝখানে যদি কেউ আসে, সে আমার জানের দোস্ত হলেও আমি রেহাই দেব না।”
নানামি হাসল। এক করুণ হাসি। “তোর সমস্যা কি জানিস? তুই অল্পতেই রেগে যাস! কিন্তু তুই ভুলে গেছিস আমি একজন পুলিশ অফিসার। তুই আজ কিরারাকে সরিয়েছিস বলে ভাবছিস আমি তোকে ছেড়ে দেব? কক্ষনো না। আমি তোকে জেনিন হিসেবে ভালোবাসি, কিন্তু জেড হিসেবে তোকে আমি ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলাব। ইটস মাই ডিউটি।”
জেনিন জেনিন তার চশমাটা আবার পরে নিল। তার সেই মায়াবী কিশোর চেহারাটা আবার মুখোশের আড়ালে হারিয়ে গেল। সে দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলল, “তাহলে যুদ্ধ শুরু হোক জায়দান। তুই তোর ইউনিফর্ম নিয়ে থাক, আর আমি আমার সাম্রাজ্য নিয়ে। দেখি কে জেতে।”
জেনিন যখন করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, নানামি এবার পেছন থেকে চিৎকার করে বলল, “নুরশাদ! সেই মেডেলটা এখনো আমার কাছে আছে। যেদিন তোকে অ্যারেস্ট করব, সেদিন ওটা তোকে ফেরত দেব।”
জেনিন থামল না। সে শুধু একবার হাত তুলে ইশারা করল। সে যখন গাড়িতে উঠল, তার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। সে চেয়েছিল নানামিকে জড়িয়ে ধরে একবার বলতে, “জায়দান, আমাকে বাঁচা! আমি এই অন্ধকারের ক্লান্ত হয়ে গেছি।” কিন্তু তার দম্ভ তাকে তা করতে দিল না।
জেনিন তবুও একবার পেছনে তাকালো। ডিবি ভবনের বিশাল অট্টালিকাটা আজ তার কাছে খুব ক্ষুদ্র মনে হলো। সে ইউজিকে ফোন করল। “ইউজি, বিষ দাঁত উপড়ে ফেলা হয়েছে। এবার আমরা আমাদের আসল কাজে মনোযোগ দেব। কিরারার চ্যাপ্টার ক্লোজড।”
ইউজি ওপাশ থেকে হাসল। “কনগ্ৰাচুলেশন বস। বাট, ম্যাম তো আপনার অপেক্ষায় আছে। তাড়াতাড়ি আসুন। এই ড্রামাকুইন আমার মাথা খেয়ে ফেলছে!”
চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।

