Soulmate_to_Enemy #পর্ব_৩৪

0
2

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৩৪
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

ঢাকা ডিবি সদর দপ্তরের কনফারেন্স রুম। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নূরশাদ ভিলার ড্রোন ফুটেজ, জেনিন নূরশাদের বিজনেস প্রোফাইল এবং কিছু পুরনো সাদা-কালো ছবি। এসি নানামি জায়দান জানালার কাছে দাঁড়িয়ে বাইরে শ্রাবণের অঝোর ধারা দেখছে। তার হাতে এক কাপ কফি যা অনেক আগেই বরফ শীতল হয়ে গেছে। তার চোখের নিচে কালি জমেছে, গত তিন রাত এক পলকের জন্যও সে ঘুমাতে পারেনি।

তার পেছনের দেওয়ালে পিন দিয়ে আটকানো আছে জেনিন নূরশাদের একটি বিশাল ছবি, যেখানে জেনিন তার ট্রেডমার্ক সেই দামি চশমা পরে মৃদু হাসছে। আর তার ঠিক পাশেই আঁকা আছে একটি অস্পষ্ট কালো অবয়ব, যার ওপর বড় করে লেখা ‘Z’।

কিরারা হাইজেন ঘরে ঢুকল। তার হাতে একগুচ্ছ নতুন ফাইল। তার হাঁটার শব্দে এক ধরণের জেদ আছে। সে ফাইলের বাণ্ডিলটা নানামির টেবিলের ওপর সজোরে রাখল।

“মিস্টার জায়দান, আপনি কি এখনো জানালার বাইরে বৃষ্টি দেখছেন নাকি আমাদের সামনে যে সত্যটা পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে সেটাকে স্বীকার করার সাহস সঞ্চয় করছেন?” কিরারার কণ্ঠস্বর বরফের মতো ঠান্ডা।

নানামি ঘুরল। তার গলায় এক অদ্ভুত বিষাদ। “সত্যিটা কী কিরারা? আপনি কি বলতে চাচ্ছেন আমার বন্ধু জেনিন নূরশাদই সেই কুখ্যাত খু|নি জেড? যে জেনিন নূরশাদ এই শহরের অর্থনীতির চাকা ঘোরায়, যে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করে, সে-ই রাতে মাস্ক পরে মানুষের রক্ত ঝরায়?”

কিরারা এক পা এগিয়ে এল। সে জেনিনের ছবির ওপর একটি লাল মার্কার দিয়ে গোল দাগ দিল। “বন্ধুত্বের চশমাটা খুলে একবার পুলিশের চশমাটা পরুন নানামি। আমরা সেদিন যার বাড়িতে গিয়েছিলাম, তিনি সিইও জেনিন নূরশাদ। কিন্তু আপনার কি মনে পড়ে না, আপনার ট্র্যাকার কেন ওই ভিলার বাগানে গিয়েই সিগন্যাল হারালো? কেন ওই ভিলার সিকিউরিটি সিস্টেম সাধারণ কোনো সিকিউরিটি নয়, বরং মসাড গ্রেডের প্রটোকল ব্যবহার করে? একজন সাধারণ ব্যবসায়ীর কেন ‘এলিট ফোর’ নামে একদল ব্যক্তিগত খু|নি বাহিনী দরকার হয়?”

নানামি ধীর পায়ে টেবিলের কাছে এসে বসল। সে একটি পুরনো বাৎসরিক ম্যাগাজিন বের করল, সেন্ট জুড হাই স্কুলের ২০০৭ সালের এডিশন। সেখানে কিশোর জেনিন আর কিশোর নানামির ফুটবল জেতার একটি ছবি আছে।

“কিরারা, নুরশাদ আর আমি এক বেঞ্চে বসে বড় হয়েছি,” নানামি ধরা গলায় বলল। “হঠাৎ নুরশাদ নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল। কারো সাথে যোগাযোগ ছিল না ওর। পনেরো বছর পর সে ফিরে এসেছে এক সফল বিজনেসম্যান হয়ে। আমি জানি তার জীবনে অনেক রহস্য আছে, কিন্তু সে ‘জেড’ হতে পারে না। জেড একজন মনস্টার, আর জেনিন…”

“আর জেনিন একজন এক্টর!” কিরারা কথাটি কেড়ে নিল। সে ল্যাপটপ অন করল। “দেখুন নানামি। এই যে দেখুন ‘জেড’-এর শিপমেন্টের সময়গুলো। যখনই আন্তর্জাতিক বাজারে জেডের অস্ত্র ঢোকে, ঠিক তার ৪৮ ঘণ্টা আগে জেনিন নূরশাদ কোনো না কোনো বিজনেস ট্রিপে মস্কো বা দুবাই যান। এটা কি কেবলই কাকতালীয়?”

নানামি ছবিগুলোর দিকে তাকাল। তার অবচেতন মন জেনিনকে বাঁচাতে চাচ্ছে, কিন্তু তার প্রফেশনাল সত্তা কিরারার প্রতিটি কথাকে অকাট্য যুক্তি হিসেবে গ্রহণ করছে। নানামির মনে পড়ে গেল নূরশাদ ভিলায় জেনিনের সেই শীতল চোখগুলো। ওই চোখের গভীরে জেনিন যেন নানামিকে কিছু বলতে চেয়েছিল, যা সে মুখে বলতে পারেনি।

কিরারা আবার শুরু করল, “সবচাইতে বড় প্রমাণ কী জানেন? জেনিন নূরশাদের স্ত্রীর নাম, নোবারা। ওই নোবারা মেয়েটি কে? তার ব্যাকগ্রাউন্ডে কেন এক বিশাল শূন্যতা? জেনিন কেন তাকে পৃথিবীর সবার কাছ থেকে আড়াল করে রেখেছে? কারণ নোবারাই হয়তো জেডের সবচাইতে বড় দুর্বলতা।”

নানামি চমকে উঠলেন। নোবারার কথা মনে আসতেই তার হৃদপিণ্ডটা মোচড় দিয়ে উঠল। নোবারা…নোবারা আকারি! সেই মেয়েটি যাকে নানামি নিজেও একদিন পছন্দ করত। যার কারণে তার আর জেনিনের বন্ধুতের বিচ্ছেদ হয়েছিল

“কিরারা,” নানামি নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “আমি ইমোশনাল হচ্ছি না। আমি শুধু লজিক খুঁজছি। জেনিন যদি জেড হয়, তবে সে আমাকে সেদিন তার ভিলার ভেতরে ঢুকতে দিল কেন? সে তো পারত আমাদের ওখানেই শেষ করে দিতে।”

“কারণ সে আপনাকে ভালোবাসে, কিন্তু ও আপনাকে বোকা বানাচ্ছে। আর আপনি বোকা বনে যাচ্ছেন ও!” কিরারা হাসল, তবে সেই হাসিতে ঘৃণা ছিল।

নানামি টেবিলের ওপর রাখা কফি কাপটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিল। তার দুচোখে এখন এক অদ্ভুত সংকল্প। “ওকে ফাইন, কিরারা। আপনি যদি মনে করেন জেনিনই জেড, তবে আমি তা প্রমাণ করব। কিন্তু যদি সে নির্দোষ হয়, তবে আপনাকে এই ডিপার্টমেন্ট ছেড়ে চলে যেতে হবে।”

কিরারা চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করলেন। “ডিল। কিন্তু আমার প্রথম শর্ত, আমাদের জেনিন নূরশাদের ওপর চব্বিশ ঘণ্টা নজরদারি করতে হবে। আমাদের এমন একজনকে দরকার যে ওই ভিলার ভেতরকার খবর আনতে পারবে। আপনার কি এমন কেউ আছে?”

নানামি চুপ করে রইল। সে জানে জেনিনের ভিলাতে ঢোকা মানেই মৃত্যুর মুখে পা দেওয়া। ইউজির মতো এক দুর্ধর্ষ হ্যাকার যেখানে সিকিউরিটি সামলায়, সেখানে কোনো গোপন স্পাই টিকবে না।

নানামি অসম্মতি দেওয়ায় কিরারা এবার একটি ব্লু-প্রিন্ট বের করল। “নানামি, আপনি যেহেতু তার বন্ধু, আপনিই তাকে ফোন করে দেখা করার প্রস্তাব দেবেন। আপনি তাকে ডিনার বা অন্য কিছুর বাহানায় ভিলার বাইরে আনবেন, আর সেই ফাঁকে আমার টিম ভেতরে ঢুকবে।”

এরপর তৎক্ষণাৎ কিরারা নানামিকে জেনিন নুরশাদের ফোন নাম্বার দিয়ে দিল। নানামি কিছু বুঝে উঠার আগেই ফোনের ওপাশ থেকে জেনিনের কন্ঠস্বর ভেসে আসছিল। তাই নানামি আর কিছু না ভেবেই ফোনটা কানে দিল। তার গলা কিছুটা কেঁপে গেল। সে ধরা গলায় তার পুরনো বন্ধুকে ডাকলো,
“নুরশাদ?”

ওপাশ থেকে জেনিনের সেই গভীর কন্ঠ ভেসে এল। তার এই প্রিয় পরিচিত কন্ঠ চিনতে এক মুহুর্ত ও সময় লাগলো‌ না।
“জায়দান? এত রাতে? সব ঠিক আছে তো?”

“হ্যাঁ, আসলে অনেকদিন আমাদের আড্ডা দেওয়া হয় না। কাল কি তুই ফ্রি আছিস?” নানামি যখন কথাগুলো বলছিল, তার চোখের সামনে জেনিনের সেই কিশোর বয়সের মুখটা ভেসে উঠছিল। তবুও কিরারা সামনে থাকায় সে নিজেকে দ্রুত সংযত করে নিল।

জেনিন ওপাশ থেকে একটু চুপ করে থাকল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, “ইয়াহ! আমার সময় আছে।”

“তাহলে কাল সন্ধ্যায় দেখা হচ্ছে।”

এই বলেই ফোনটা কেটে দেওয়ার পর নানামি বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিরারা তার দিকে তাকিয়ে একটি সার্থকতার হাসি দিল। কিন্তু নানামি জানে, কাল সন্ধ্যায় সে কোনো বন্ধুর সাথে দেখা করতে যাচ্ছে না। সে যাচ্ছে এক কালজয়ী মিস্ট্রির মুখোমুখি হতে।

<><><><><><><><><>

পরদিন সন্ধ্যা। ঢাকার আকাশ আজ এক অদ্ভুত তামাটে রঙ ধারণ করল। শহরের বুক চিরে বয়ে চলা ঠাণ্ডা বাতাসটা যেন কোনো এক আসন্ন ঝড়ের বার্তা দিচ্ছিল। জেনিন নূরশাদ আজ তার রোলস রয়েস নিয়ে শহরের এক বিলাসবহুল রুফটপ রেস্তোরাঁর দিকে রওনা দিল। তার পরনে আজ মধ্যরাতের মতো কালো একটি স্যুট, চোখে সেই রহস্যময় চশমা।

অন্যদিকে, এসি নানামি জায়দান আজ এক বিশাল ঝুঁকি নিল। সে জেনিনের অনুপস্থিতিতে নূরশাদ ভিলায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত টানাপোড়েন। সে কি সেখানে জেনিনের অপরাধের প্রমাণ খুঁজতে যাচ্ছে, নাকি নোবারাকে একবার চোখের দেখা দেখতে?

রেস্তোরাঁর ছাদটা খালি রাখা হয়েছে। জেনিন একা বসে এক গ্লাস পুরনো ওয়াইন উপভোগ করছিল। ঠিক তখনই হিল জুতো খটখট শব্দে তার সামনে এসে দাঁড়াল কিরারা হাইজেন। তার পরনে একটি গাঢ় লাল রঙের ফর্মাল ব্লেজার, চুলগুলো নিখুঁতভাবে পনিটেইল করা। কিরারা কোনো অনুমতি ছাড়াই জেনিনের উল্টো দিকের চেয়ারে বসল।

“মিস্টার নূরশাদ, আপনি যে এত পাংচুয়াল, সেটা জানতাম না,” কিরারা তার তীক্ষ্ণ গলায় বলল। তার চোখে জেনিনকে ব্যবচ্ছেদ করার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা।

জেনিন তার গ্লাসটা নামিয়ে রাখল। সে মৃদু হাসল, যে হাসিতে কোনো উষ্ণতা ছিল না। সে জানতোই নানামির নাম করে কিরারাই তার সাথে দেখা করতে আসবে। অন্তত তার আইকিউ এই হাইজেনের চিন্তাধারার অনেক উপরে। এসব চাল চালা জেনিনের বা হাতের খেলা! তবে আজ সে নোবারাকে জানিয়েই এসেছে যে, সে কিরারা মেয়েটার সাথে দেখা করতে যাচ্ছে। প্রথমে শুনেই নোবারা কিঞ্চিত মুখ ফুলিয়েছিল, তবে জেনিনের উপর সম্পূর্ণ আস্থা থাকায় সে আর না করলো না।

কিরারা এবার টেবিলের ওপর ঝুঁকে এল। জেনিনের দিকে তাকিয়ে সে সরাসরি বললো,
“জেনিন নুরশাদ, আপনি খুব সুন্দর করে নিজের সাম্রাজ্য সাজিয়েছেন। কিন্তু আপনার ওই ‘এলিট ফোর’ আর আপনার ওই মসাড সিকিউরিটি, এগুলো একজন সাধারণ ব্যবসায়ীর সাজে না। আপনি কি ভয় পান? নাকি আপনি কাউকে পাহারা দিচ্ছেন?”

জেনিন এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে এক টুকরো স্টেক মুখে দিয়ে খুব ধীরেসুস্থে চিবালো। “আমি আমার পার্সোনাল লাইফ নিয়ে বাইরের কাউকে কোন কথাই আমি শেয়ার করি না। আপনি বলুন আপনি আমার সাথে দেখা করতে এসেছেন কেন?”

“আমি এসেছি আপনাকে একটা হুঁশিয়ারি দিতে। আমি জানি আপনি কে। আমি জানি আপনার বিজনেজ এর আড়ালে কোন রক্তাক্ত ইতিহাস লুকিয়ে আছে। আপনি নানামিকে ধোঁকা দিতে পারেন, কিন্তু আমাকে না।”

জেনিন হঠাৎ তার চশমাটা টেবিলের ওপর রাখল। তার চোখ দুটো এখন উন্মুক্ত। সেই চোখে এক গভীর সমুদ্রের মতো নিস্তব্ধতা।
“সত্যিই কি আপনি জানেন আমি কে? নাকি আপনি এক অদৃশ্য ছায়ার সাথে যুদ্ধ করছেন? মিস হাইজেন, মনে রাখবেন, যেই সত্য আপনি খুঁজছেন, তা আপনাকে জ্বালিয়ে ছাই করে দিতে পারে।”

ওদিকে একই সময়ে, নানামি তার প্রাইভেট কার নিয়ে নূরশাদ ভিলার গেটে এসে পৌঁছাল। জেনিন যেহেতু আগেই ইউজিকে বলে দিয়েছিল নানামি তার বন্ধু, তাই সিকিউরিটি তাকে আটকালো না। বরঞ্চ জেনিনই চাইলো, নানামিকে আরেকটু পথভ্রষ্ট করতে। নানামি ভেতরে ঢুকে সোজা দোতলার করিডোরের দিকে এগোল। তার বুক ধরফড় করছে। সে জানে জেনিন এখন ভিলার বাইরে, আর এই সুযোগেই তাকে নোবারার ঘরে পৌঁছাতে হবে। এই ভেবে যে, নোবারা হয়তো জেনিনের আসল সত্যটা তাকে বলবে।

নানামি নোবারার ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজাটা সামান্য ফাঁক হয়ে ছিল। সে দেখল নোবারা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। এতো বছর পরও নোবারা কে চিনতে নানামির এক মুহুর্ত ও সময় লাগলো‌ না। নানামির পা এবার আর সরল না। সে ডাকতে চাইল, “নোবারা!” কিন্তু তার গলা দিয়ে স্বর বের হলো না। সে কি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে? এমনটা তো হতে পারে না। নোবারা এখন জেনিনের লিগ্যাল ওয়াইফ। নোবারার প্রতি অন্য কোন চিন্তা নানামির মাথায় আসা উচিত না। এতোক্ষণ ধরে নিজেকে এটাই বুঝিয়ে যাচ্ছিল সে। কিন্তু তার ভেতরের মনটা যেন আজ মানতে চাইলো না এই নির্মম সত্য যে, নোবারাকে সে কখনো নিজের করে পাবে না!

হঠাৎ তখনই ভিলার পেছনের দিক থেকে একদল সশস্ত্র লোক প্রাচীর টপকে ভেতরে ঢুকল। এরা জেনিনের সেই পুরনো শত্রুদের অবশিষ্টাংশ, যারা জেনিনকে মারার জন্য আজ এই মোক্ষম সুযোগ বেছে নিয়েছে। তারা এক মুহুর্ত ও বিলম্ব না করে সরাসরি নোবারার রুম লক্ষ্য করে গুলি চালাতে শুরু করল। একমাত্র নোবারাকে শেষ করে দিতে পারলেই জেড দুর্বল হয়ে যাবে, এটা আজ পুরো পৃথিবী জানে!

“নোবারা! নিচু হও!” গুলির শব্দ শুনেই নানামি চিৎকার করে ঘরের ভেতর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

কিন্তু নানামি নোবারার কাছে পৌঁছানোর আগেই দেখল ঘরের ছাদ থেকে চারজন কমান্ডো দড়িতে ঝুলে নিচে নামল। এরা জেনিনের ‘এলিট ফোর’ এর সদস্য। এদের উপর জেনিনের কমান্ড রয়েছে নোবারার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার। তারা সাথে সাথে কাউন্টার ফায়ার শুরু করল। ভিলার চারদিকে সাইরেন বেজে উঠল। ভয়ে সকল স্টাফ, ম্যানেজার সবাই দৌড়াদৌড়ি শুরু করলো।

নোবারা কোণঠাসা হয়ে গিয়েছিল। সে চেয়েছিল নিজ দক্ষতা দিয়ে নিজেকে বাঁচাতে। কিন্তু জেনিনের ফোর্স দের সামনে এখন তার পরিচয় বের হওয়া মানে আরো বড় ঝামেলা! একটি বুলেট নোবারার কানের পাশ দিয়ে চলে গেল। ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে ইউজি ঝড়ের গতিতে ঢুকল। ইউজির হাতে তখন দুটি অটোমেটিক পিস্তল। তার চোখে এখন এক আদিম হিংস্রতা।

“মি: নানামি! নিচে শুয়ে পড়ুন!” ইউজি গর্জে উঠল।

ইউজি একা সেই পাঁচজন হামলাকারীকে ঘরের ভেতরই রুখে দিল। তার গুলির নিখুঁত নিশানায় দুজন সেখানেই শেষ হয়ে গেল। বাকিরা পালানোর চেষ্টা করলে ইউজি তাদের পেছনে ধাওয়া করল। নানামি তখনো নোবারার ঘরের কোণে পড়ে ছিল।

নানামি নোবারার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। তার চোখে এক সমুদ্র শূণ্যতা!
“নোবারা, আমি আছি! চলো আমার সাথে, এখানে থাকা সেইফ নয়!”

নোবারা নানামির দিকে তাকালো। নানামি এখানে কখন এলো তার জানা নেই। উপরন্তু এতো বছর পর নিজের ছোটবেলার ভাই সমান বন্ধু কে দেখে নোবারা আবেগী হয়ে পড়লো। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো সে নানামির হাত ধরে এই অপরাধের জগত থেকে পালিয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক তখনই তার চোখে ভেসে উঠল জেনিনের চেহারা! নোবারা তার হাত বাড়িয়ে দিতে গিয়েও সরিয়ে নিল। সে নানামির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।
“না নানামি ভাইয়া। আমি এখানেই থাকব। জেনিনকে ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না।”

নানামি স্তব্ধ হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল জেনিন নূরশাদ কেবল নোবারার শরীর নয়, তার আত্মাটাকেও শৃঙ্খলিত করে ফেলেছে!

বাইরে তখন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ইউজি তার ফোর্স নিয়ে বাগানজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শত্রুদের একে একে খতম করছিল। ইউজি আজ কোনো দয়া দেখাচ্ছিল না। সে প্রতিটি শত্রুর মাথায় গুলি করছিল। জেনিনের অনুপস্থিতিতে এই ভিলার সুরক্ষার ভার তার ওপর, আর সে জানে নোবারার সামান্য ক্ষতি মানেই জেনিনের হাতে তার নিজের মৃত্যু।

দশ মিনিট পর। পুরো বাগান লাশে ভরে গেছে। ইউজি হাঁপাতে হাঁপাতে নোবারার ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। সে দেখল নানামি এখনো সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। এই দৃশ্য জেনিন দেখলে রাগে বোধহয় ভিলা জ্বালিয়ে দিত!

ইউজি নানামির কাছে গিয়ে তার পিস্তলটা হোলস্টারে ভরল। সে খুব ঠান্ডা গলায় বলল, “এসি নানামি, আপনি বসের বন্ধু বলে আজ বেঁচে গেলেন। কিন্তু আপনি যদি আবার অনুমতি ছাড়া ম্যামের কাছে আসার চেষ্টা করেন, তবে আমার বুলেট আপনার ড্রেস দেখবে না। এখন এখান থেকে চলে যান।”

নানামি কোনো কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার চোখ আজ ভিজে উঠেছে। সে প্রমাণ করতে চেয়েছিল জেনিন অপরাধী, কিন্তু সে আজ দেখল জেনিন নোবারাকে কত যত্ন করে আগলে রেখেছে! নোবারা তার সাথে আসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে! এই সত্যটা তার বুকটাকে ক্ষত বিক্ষত করে দিচ্ছে।

ওদিকে রেস্তোরাঁয় তখন জেনিনের কাছে একটি টেক্সট মেসেজ এল, “Attack neutralised. Mam is safe.”

জেনিন শান্তভাবে তার ফোনটা পকেটে রাখল। ইউজির উপর তার সম্পূর্ণ আস্থা আছে। জেনিন কিরারার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
“মিস হাইজেন, আমার মনে হয় আপনার টিমের ব্যাকআপ প্ল্যানটা ফেইল হয়েছে। আমার ভিলাতে যারা ঢুকেছিল, তারা আর কোনোদিন সূর্য দেখবে না।”

কিরারা চমকে উঠল। সে বুঝতে পারল জেনিন শুরু থেকেই সব জানত। জেনিন নিজেই নানামিকে সুযোগ দিয়েছিল ভিলাতে যাওয়ার জন্য, যাতে সে নিজের চোখে জেনিনের নিরাপত্তা আর নোবারার প্রতি তার আনুগত্য দেখতে পায়। কিরারার নিজের উপর নিজেরই রাগ হলো। তার বুঝা উচিত ছিল, জেনিন নুরশাদ কখনো এতো কাঁচা খেলা খেলে না!

<><><><><><><><><>

নূরশাদ ভিলার বাতাস তখন বারুদের গন্ধে ভারী। বাগানের ঘাসে জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো আজ রক্তে রঞ্জিত। রেস্তোরাঁ থেকে জেনিন ফিরে এসে নোবারাকে জাপটে ধরে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি আর এক আদিম আক্রোশ একসাথে খেলা করছে। জেনিন জানে, এই হামলা জেনিনকে মারার জন্য ছিল না; এটা ছিল জেনিনকে মানসিকভাবে পঙ্গু করার একটা চাল। আর এই চালের পেছনে কার হাত আছে, সেটা জেনিনের অজানা নয়।

জেনিন নোবারাকে আলতো করে কোলে তুলে নিয়ে ঘরের বিছানায় শুইয়ে দিল। সে তার হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে নোবারার গাল ছুঁয়ে দিল। জেনিনের চোখের মণি তখন এক স্থির আগুনের শিখার মতো জ্বলছে। সে কোনো কথা বলল না, শুধু নোবারার কপালে এক দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

করিডোরে ইউজি দাঁড়িয়ে আছে। তার সাদা শার্টে রক্তের দাগ, হাতে তখনো সেই রক্তাক্ত গ্লক পিস্তল। জেনিন ইউজির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। দুজনের মধ্যে কোনো কথা হলো না, শুধু চোখের ইশারায় এক বিশাল দফারফা হয়ে গেল।

“সবাইকে শেষ করেছ?” জেনিন খুব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল।

“জি বস। কোনো প্রমাণ বাকি নেই। তবে একজন বেঁচে আছে। ওটা আপনার জন্য রাখা হয়েছে,” ইউজি ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল।

“নিচে নিয়ে এসো।”

ভিলার মাটির নিচে এক গোপন ডার্ক টর্চার সেল আছে, যা জেনিন ছাড়া আর কেউ জানে না। সেখানে একটি চেয়ারে বেঁধে রাখা হয়েছে এক মধ্যবয়সী লোককে। লোকটির মুখ থেঁতলে গেছে ইউজির ঘুসিতে। জেনিন ধীর পায়ে ঘরে ঢুকল। তার হাতে এখন একটি দামী চুরুট, যা সে খুব আয়েশ করে ধরালো।

“তোমাকে কে পাঠিয়েছে, সেটা আমি জিজ্ঞেস করব না,” জেনিন চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে বলল। “আমি শুধু জানতে চাই, কিরারা হাইজেন তোমাকে ঠিক কত টাকা দিয়েছিল আমার ঘরের ভেতরে ঢুকে আমার ওয়াইফ কে ভয় দেখাতে?”

লোকটি কাঁপতে কাঁপতে মাথা তুলল। “আমি… আমি জানি না আপনি কার কথা বলছেন।”

জেনিন হাসল। এক পৈশাচিক হাসি। সে চুরুটের জ্বলন্ত অংশটা লোকটির হাতের তালুতে চেপে ধরল। লোকটির আর্তনাদে পুরো প্রকোষ্ঠ কেঁপে উঠল। জেনিন তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আমি জেনিন নূরশাদ। আমি যখন জেনিন থাকি, তখন আমি ক্ষমা করি। কিন্তু যখন আমি ‘Z’ হয়ে যাই, তখন আমি কাউকে রেহাই দিই না। বলো, কিরারা তোমাকে কী বলেছিল?”

লোকটি জেনিনের এই ভয়ঙ্কর কন্ঠ শুনে ভয়ে গড়গড় করে বলে দিল,
“সে… সে বলেছিল জেনিন নূরশাদকে মানসিকভাবে ভাঙতে হলে তার স্ত্রীকে অ্যাটাক করতে হবে। নানামি স্যারকে ভেতরে ঢোকানোর সুযোগ করার জন্যই এই ফেইক অ্যাটাকটা প্ল্যান করা হয়েছিল,”

জেনিন সোজা হয়ে দাঁড়ালো। সে বুঝতে পারল নানামি আজ বন্ধু হিসেবে আসেনি, সে এসেছিল কিরারার দাবার চালের ঘুঁটি হিসেবে। নানামি জানত না যে তাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিরারা চেয়েছিল জেনিন যখন নোবারাকে বাঁচাতে ব্যস্ত থাকবে, নানামি তখন জেনিনের পার্সোনাল ভল্ট থেকে প্রমাণ চুরি করবে। কিন্তু কিরারা জানত না, জেনিনের ভল্ট তার মগজে থাকে, কোনো লোহার বাক্সে নয়। জেনিন লোকটাকে ইউজির হাতে ছেড়ে দিল। এবার হয়তো লোকটার শরীরের টুকরোগুলো সমুদ্রের জলে তিমির খাবার হিসেবে ফেলে দেওয়া হবে! কারণ জেনিনের ডার্ক সেলে যেই যায়, তার পরিণতি ঠিক এমনই হয়!

চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here