#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৩৩
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
রাত আনুমানিক বারোটা! নোবারা তার বিশাল শয়নকক্ষের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরের ঝোড়ো হাওয়া তার রেশমি চুলগুলোকে অবিন্যস্ত করে দিচ্ছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় ঝড় বইছে নোবারার মনের ভেতর।
নোবারার হাতে একটি ছোট কাঁচের গ্লাস, তাতে রাখা জল আজ বরফের চেয়েও শীতল মনে হচ্ছে। সে নিচের বাগানের দিকে তাকিয়ে দেখল জেনিনের নির্দেশে মোতায়েন করা সশস্ত্র প্রহরীরা যান্ত্রিকভাবে টহল দিচ্ছে। ড্রোনের লাল আলো মাঝে মাঝে অন্ধকারের বুক চিরে নোবারার চোখে পড়ছে। এই সবকিছু, এই বিশাল দুর্গ, এই মরণপণ নিরাপত্তা, এই উন্মাদনা, সবই নোবারার জন্য। আর এখানেই নোবারার হৃদপিণ্ডটা ব্যথায় মুচড়ে উঠছে।
সে আজ প্রথমবারের মতো নিজেকে এক নির্দয় কাঠগড়ায় দাঁড় করালো। সে জেনিনের সাথে কাটিয়ে দেওয়া শেষ কয়েকটা মাসের প্রতিটি মুহূর্তকে ব্যবচ্ছেদ করতে লাগল। জেনিন যখন তাকে জড়িয়ে ধরে, তখন জেনিনের সারা শরীর কাঁপে তাকে হারানোর ভয়ে। জেনিন যখন তার কপালে চুমু দেয়, তখন সেই স্পর্শে থাকে এক পবিত্র শ্রদ্ধা, যেন সে কোনো মাটির মানবী নয়, বরং পবিত্র কিছু!
কিন্তু নোবারা?
নোবারা নিজেকে প্রশ্ন করল, “আমি কি জেনিনকে আসলেই ভালোবেসেছি? নাকি আমি কেবল তার ভালোবাসার উষ্ণতায় নিজেকে সেঁকে নিয়েছি?”
সে বুঝতে পারল, তার ভালোবাসায় এক বিশাল খামতি রয়ে গেছে। সে জেনিনকে ভালোবেসেছে শর্ত সাপেক্ষে। সে জেনিনকে ভালোবেসেছে একজন ‘উদ্ধারকারী’ হিসেবে, কিন্তু জেনিন তাকে ভালোবেসেছে তার ‘অস্তিত্ব’ হিসেবে।
“আমি কত বড় অপরাধী,” নোবারা বিড়বিড় করল। তার দুচোখ বেয়ে অবিরত জল পড়তে লাগল। “জেনিনের ভালোবাসা এক মহাসমুদ্রের মতো নিখাদ, যাতে কোনো খাদ নেই। আর আমার ভালোবাসা? আমার ভালোবাসা এক পঙ্কিল ডোবা, যেখানে স্বার্থ আর সন্দেহের শেওলা জমে আছে।”
নোবারার মনে পড়ে গেল গত রাতের একটি কথা। জেনিন যখন তাকে কোলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিল, নোবারার পোশাকটা কিছুটা অগোছালো হয়ে পড়েছিল। জেনিন চাইলে সেই মুহূর্তে যেকোনো পুরুষের মতো তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারত, তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারত। কিন্তু জেনিন কী করেছিল? জেনিন খুব পরম মমতায় নোবারার গায়ের চাদরটা ঠিক করে দিয়ে তার কপালে একটি দীর্ঘ চুমু দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। আজ পর্যন্ত নোবারার ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়েও কোনদিন জেনিন তাকে স্পর্শ করেনি। নোবারা সামান্যতম বিরক্তিতেই জেনিন শিউরে উঠে!
জেনিন নূরশাদ ওরফে ‘জেড’ পৃথিবীর কাছে সো কলড মনস্টার হতে পারে, কিন্তু নোবারার কাছে সে এক আর্তমানব। যে মানুষটি হাজারো মানুষের রক্ত ঝরিয়েছে, সে নোবারার সামান্য আঙুল কাটাতে বিচলিত হয়ে পড়ে। জেনিন নোবারার সবটুকু জানে না, তবুও সে নোবারার সবটুকুকে আপন করে নিয়েছে। সে নোবারাকে একবার ও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস ও করেনি, আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন কেন নূরা!
নোবারা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে তার নিজেরই ঘৃণা হতে লাগল। “এই মুখ নিয়ে আমি জেনিনের সামনে দাঁড়াই কীভাবে? ও আমাকে যে সম্মান দেয়, তার এক কণা পাওয়ার যোগ্যও কি আমি?”
হঠাৎ ঘরের দরজা খোলার শব্দ হলো। জেনিন ঘরে ঢুকেছে। তার চোখে মুখে এখনো সেই দ্বীপে ঘটে যাওয়া ঘটনার আতঙ্ক আর ক্লান্তি লেগে আছে। জেনিন নোবারাকে ব্যালকনিতে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দ্রুত তার কাছে এগিয়ে এল।
“নূরা? আপনি এখনো ঘুমাননি?” জেনিনের কণ্ঠে এক অসীম উদ্বেগ। সে নোবারার হাত ধরল। “আপনার হাত এত ঠান্ডা কেন? আপনি কি অসুস্থ? আমি কি ডাক্তার ডাকব?”
নোবারা কোনো উত্তর দিতে পারল না। সে শুধু জেনিনের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল। ওই চোখ দুটোর গভীরতা আজ তাকে দগ্ধ করছে। জেনিন নোবারার চোখের জল দেখে বিচলিত হয়ে উঠল। সে নোবারার মুখটা নিজের দুহাতের তালুতে তুলে নিল।
“কাঁদছেন কেন নূরপরী? আমি তো বলেছি, আমার জীবন দিয়ে হলেও আমি আপনাকে আগলে রাখব,” জেনিন ফিসফিস করে বলল।
নোবারা এবার জেনিনের বুকে আছড়ে পড়ল। সে জেনিনকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। এই কান্না জেনিনের জন্য নয়, এটি তার নিজের ক্ষুদ্রতার জন্য।
জেনিন নোবারার চুলে মুখ গুঁজে দিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু নোবারার কান্নার বেগ আরো বাড়তে লাগলো।
কিছু মুহূর্ত পর নোবারা জেনিনের বুক থেকে মুখ তুলল। সে জেনিনের ডান হাতটা মুখের সামনে নিয়ে এসে ছোট্ট একটা চুমু দিল। তার চোখের পানি র একফোঁটা জেনিনের হাতেও পড়লো। নোবারা এবার বললো,
“আচ্ছা, আপনি আমাকে এত সম্মান কেন দেন? আমি তো খুব সাধারণ এক মেয়ে। আমার মধ্যে তো অনেক খুঁত আছে।”
জেনিন হাসল। সেই হাসিতে কোনো দম্ভ নেই, কেবল এক অতল ভালোবাসা আছে। সে নোবারার মাথায় এলোমেলো হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,
“খুঁত? হিরের মধ্যেও তো খুঁত থাকে নূরা, তাই বলে কি তার মূল্য কমে যায়? আমার অন্ধকার জীবনে আপনিই একমাত্র আলো। আর আলোর কি কোনো খুঁত থাকে?”
জেনিন নোবারাকে পাজাকোলা করে তুলে নিল। সে নোবারাকে বিছানায় নিয়ে পরম যত্নে শুইয়ে দিল। জেনিন নোবারার গায়ের ওপর ঝুঁকে পড়ে তার কপালে তিলক আঁকার মতো একটি চুমু দিল। জেনিনের এই স্পর্শে কামনার চেয়ে শ্রদ্ধা বেশি ছিল।
নোবারা চোখ বন্ধ করল ঠিকই, কিন্তু তার মনের ভেতরে এক বিশাল হাহাকার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করার পর ও তার চোখে ঘুম এলো না!
নোবারা ধীর পায়ে ঘরের কোণে থাকা বড় আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নার ভেতরে যে মানবীকে সে দেখছে, তাকে সে চিনতে পারছে না। জেনিন নূরশাদকে ধ্বংস করার সেই অদম্য জেদ, সবকিছু আজ কেমন যেন ঝাপসা মনে হচ্ছে। নোবারা নিজের হাতগুলোর দিকে তাকাল। এই হাতগুলো দিয়ে সে জেনিনকে জড়িয়ে ধরেছে, আবার এই হাতগুলো দিয়েই সে জেনিনের গোপন নথি হ্যাক করার চেষ্টা করেছে।
“আমি কে?” নোবারা ফিসফিস করে নিজেকেই প্রশ্ন করল।
“জেনিন, আপনি আমাকে এত বড় অপরাধী কেন বানিয়ে দিলেন?” নোবারার চোখ দিয়ে জল টপটপ করে গালিচার ওপর পড়তে লাগল।
সে তার অপরাধবোধ কাটানোর এক অদ্ভুত পথ খুঁজতে লাগল। সে ভাবল, সে যদি জেনিনের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবে অন্তত একবার নিজের সবটুকু স্বার্থ বিসর্জন দিতে পারে, তবে কি তার মনের এই বোঝাটা হালকা হবে? সে আলমারি থেকে সেই ফ্ল্যাশ ড্রাইভটি বের করল। এটিই সেই প্রমাণ, যা দিয়ে জেনিন নূরশাদ ওরফে ‘জেড’ চিরতরে শেষ হয়ে যাবে। নোবারার আঙুলগুলো কাঁপছে। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো সে ড্রাইভটি এই মুহূর্তেই ভেঙে ফেলবে।
নোবারা এক বিশাল দ্বিধার যাঁতাকলে পিষ্ট হতে লাগল। সে বুঝতে পারল, সে না পারছে জেনিনকে পুরোপুরি ভালোবাসতে, না পারছে তাকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে। তার ভালোবাসায় যে খামতি আছে, সেটা হলো ‘সম্পূর্ণ সমর্পণ’। জেনিন তাকে তার অন্ধকার জীবনের ধ্রুবতারা বানিয়েছে, আর নোবারা জেনিনকে তার সফল মিশনের সিঁড়ি বানাতে চেয়েছিল।
নোবারা জেনিনের ঘুমানো শরীরের দিকে এগিয়ে গেল। সে জেনিনের পায়ের কাছে মেঝেতে বসে পড়ল। নোবারা জেনিনের পায়ের পাতায় হাত রাখল। জেনিনের পায়ে থাকা সেই পুরোনো ক্ষতের দাগগুলো সে স্পর্শ করল।
নোবারার এই অপরাধবোধ এক আত্মঘাতী রূপ নিচ্ছে। সে চাইছে জেনিন তাকে একবার সন্দেহ করুক, জেনিন তাকে একবার আঘাত করুক, যাতে সে নিজের প্রতি এই ঘৃণা থেকে মুক্তি পায়। কিন্তু জেনিন তা করবে না। জেনিন তাকে আরও বেশি আদরে, আরও বেশি সম্মানে জর্জরিত করবে। আর এটাই নোবারার
সবচাইতে বড় শাস্তি।
সে জেনিনের বিছানার এক কোণে মাথা রেখে কাঁদতে লাগল। সে ঠিক করল, আজ থেকে সে জেনিনকে আর ধোঁকা দেবে না। সে যদি জেনিনকে ধ্বংস করতেও চায়, তবে সেটা হবে সরাসরি। কিন্তু এই আড়ালে থাকা বিশ্বাসঘাতকতা সে আর সহ্য করতে পারছে না।
সে জেনিনের হাতটা নিজের গালের ওপর রাখল। সে ঠিক করল, সে আর কোন প্রমাণ জোগাড় করবে না। অন্তত যতক্ষণ পর্যন্ত না সে জেনিনের এই ভালোবাসার ঋণ শোধ করতে পারছে। নোবারার এই অপরাধবোধ কাটার বদলে আরও ঘনীভূত হলো। সে বুঝতে পারল, এক সম্রাটের ভালোবাসার ভার বইবার মতো ক্ষমতা তার ক্ষুদ্র হৃদয়ের নেই।
রাত শেষ হয়ে আসছে। ভিলার পেছনের বাগানে ভোরের পাখি ডাকছে। নোবারা জেনিনের পাশে শুয়ে তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। জেনিনের গায়ের উষ্ণতা নোবারার অপরাধবোধকে আজ এক পাক্ষিক শান্তিতে রূপান্তর করল। সে আজ নিজেকে জেনিনের চরণে সঁপে দিল, হয়তো কাল সে আবার এজেন্ট হয়ে উঠবে, কিন্তু আজ এই মুহূর্তে সে কেবল এক অনুতপ্ত প্রেমিকা।
<><><><><><><><><>
সকালের ম্লান আলো যখন নূরশাদ ভিলার ভারি পর্দা ভেদ করে ঘরের ভেতর এসে পড়ল, তখন জেনিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের টাই ঠিক করছিল। তার পরনে নেভি ব্লু রঙের একটি শার্প বিজনেস স্যুট, চোখে চিরাচরিত পেশাদারিত্বের গাম্ভীর্য। দ্বীপে ঘটে যাওয়া সেই বিভীষিকা আর রাতের আবেগী দহনকে সে যেন এক নিমিষেই দক্ষ জাদুকরের মতো মনের কোনো এক সিন্দুকে তালাবদ্ধ করে ফেলেছে। সে এখন আবার সেই কর্মব্যস্ত, প্রভাবশালী বিজনেসম্যান জেনিন নূরশাদ।
নোবারা বিছানায় আধশোয়া হয়ে অপলক দৃষ্টিতে জেনিনের প্রতিটি নড়াচড়া লক্ষ্য করছিল। রাতের অপরাধবোধের মেঘগুলো ভোরের আলোয় কিছুটা ফিকে হলেও পুরোপুরি কাটেনি। সে আজ জেনিনকে একটু অন্যভাবে অনুভব করতে চায়, একটু সাধারণ মানুষের মতো আবদার করতে চায়।
জেনিন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল, “উহ! আজকের বোর্ড মিটিংটা খুব ক্রুশিয়াল।”
নোবারা আলসেমি ভেঙে বিছানা ছাড়ল। সে ধীরপায়ে জেনিনের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নায় জেনিনের চোখের সাথে তার চোখাচুখি হতেই নোবারা আলতো করে জেনিনের বাহু ধরল।
“আজ কি অফিসে যাওয়া খুব জরুরি?” নোবারার কণ্ঠে এক ধরণের অভিমানী সুর।
জেনিন আয়নায় নোবারার প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে নোবারার কপালে একটা চটজলদি চুমু দিয়ে বলল, “খুবই জরুরি নূরা। আমি অনেকদিন অফিসে না যাওয়ার এইচআর সবকিছু সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। হি নিড মি। আপনি বরং আজ রেস্ট নিন।”
নোবারা ঠোঁট উল্টে মুখটা ফিরিয়ে নিল। “রেস্ট নিতে নিতে আমি হাঁপিয়ে উঠেছি। আমার আজ কিছু চাই।”
জেনিন পকেট থেকে চেক বই বের করতে করতে বলল, “কী চাই আমার নূরপরীর? ইউজিকে বলে দিচ্ছি, ও সব ব্যবস্থা করে দেবে।”
জেনিনের এই উত্তর নোবারার বুকে তীরের মতো বিঁধল। সে জেনিনের হাত থেকে চেক বইটা কেড়ে নিয়ে সরিয়ে দিল।
“আমার রেশমি চুড়ি চাই। গাঢ় লাল আর আসমানি রঙের রেশমি চুড়ি। আর সেটা ইউজি এনে দিলে হবে না, আপনাকে নিজের হাতে কিনে দিতে হবে। এখনই!”
জেনিন আকাশ থেকে পড়ল। সে হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলল, “নূরা, এই অসময়ে রেশমি চুড়ি আমি কোথায় পাব? আর আমার মিটিংটা…”
“মিটিং বড় নাকি আমি?” নোবারার চোখে জল টলমল করে উঠল। সে জেনিনের বুক থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে বিছানার এক কোণে গিয়ে বসল। “আমি জানতাম। আপনার কাছে আপনার ওই মাফিয়াগিরি আর ব্যবসাই সব। আমি তো কেবল আপনার একঘেয়েমি কাটানোর একটা মাধ্যম। যান, চলে যান আপনার অফিসে। আমার সাথে আর কথা বলবেন না। আজ থেকে আপনার সাথে আমার আড়ি!”
নোবারা বালিশে মুখ গুঁজে কান্নার অভিনয় শুরু করল। জেনিন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে জানে নোবারার এই জেদ কতটা ভয়ানক হতে পারে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে টাইটা একটু ঢিল করল। ইউজীর কথা মনে পড়তেই তার মেজাজটা একটু চড়ল, কিন্তু নোবারার ওই কান্নার শব্দে তার সব কঠোরতা এক লহমায় ধূলিসাৎ হয়ে গেল।
জেনিন ধীরপায়ে বিছানার কাছে গিয়ে বসল। সে নোবারার কাঁধে হাত রাখল, কিন্তু নোবারা এক ঝটকায় হাতটা সরিয়ে দিল।
“নূরা… শুনুন… ঠিক আছে, আমি হার মানলাম,”
জেনিন খুব নরম গলায় বলল। “মিটিং গোল্লায় যাক। আমার নূরপরীর অভিমানের চেয়ে বড় কোনো ডিল এই পৃথিবীতে নেই।”
নোবারা মুখ তুলল। “সত্যি?”
“হ্যাঁ, সত্যি। তবে শর্ত একটাই, আপনাকে আমার সাথে যেতে হবে। আমি একা চুড়ি চিনতে পারব না।” জেনিন হেসে ফেলল।
পনেরো মিনিটের মধ্যে জেনিন তার গম্ভীর রূপ বদলে একটা ক্যাজুয়াল পোলো শার্ট পরে নিল। ইউজি নিচে জেনিনকে দেখে চমকে উঠল। “বস, মিটিংয়ের সময় তো হয়ে গেছে! গাড়ি রেডি।”
জেনিন গম্ভীর মুখে ইউজিকে বলল, “মিটিং ক্যানসেল করো। আজকের এজেন্ডা পাল্টে গেছে। আজ জেনিন নূরশাদ চুড়ি কিনতে যাচ্ছে।”
ইউজি স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। জেনিন নূরশাদ চুড়ি কিনবে? সে কি ঠিক শুনল? কিন্তু জেনিনের চোখের ইশারা দেখে সে আর কথা বাড়াল না।
ঢাকার ব্যস্ত রাস্তার জ্যাম ঠেলে জেনিনের গাড়িটা এসে থামল ধানমন্ডির এক নামী বুটিক শপের সামনে। জেনিন আর নোবারা যখন ভেতরে ঢুকল, দোকানের কর্মচারীরা জেনিনকে দেখে তটস্থ হয়ে উঠল। জেনিন নূরশাদকে তারা টিভিতে দেখেছে, কিন্তু সামনাসামনি তার এই শান্ত রূপ দেখে তারা অবাক।
চুড়ির সেকশনে গিয়ে নোবারা আর পাঁচটা সাধারণ কিশোরীর মতো খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়ল। কাঁচের ওপর সাজানো হাজারো রঙের রেশমি চুড়ি। নোবারা একটা একটা করে চুড়ি দেখছে আর জেনিনের দিকে তাকাচ্ছে।
“এটা কেমন?” নোবারা নীল রঙের এক সেট চুড়ি জেনিনের হাতের কাছে ধরল।
“সুন্দর।”
“সুন্দর মানে কী? এটা কি আমার হাতে মানাবে?” নোবারা আবার ঝগড়া শুরু করল।
জেনিন এবার হাল ছেড়ে দিয়ে নোবারার খুব কাছে সরে এল। সে নোবারার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। “আপনার ওই ফর্সা হাতে এই আসমানি রঙটা তারার মতো জ্বলবে নূরা। আর লালটা পরলে মনে হবে আমার হৃদপিণ্ডের সবটুকু রক্ত আপনার হাতে শোভা পাচ্ছে।”
জেনিনের এই রোমান্টিক কথায় নোবারার গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে গেল। জেনিন নিজের হাতে ডজনখানেক চুড়ি বেছে নিল। সে নিজেই নোবারার কবজিতে এক এক করে চুড়িগুলো পরিয়ে দিতে লাগল। চুড়ির সেই টুংটাং শব্দ জেনিনের কানে কোনো মধুর সংগীতের মতো বাজছিল।
শপিং শেষ করে ফেরার পথে জেনিন নোবারাকে নিয়ে এক ক্যাফেতে ঢুকল। নোবারার দুহাত এখন রেশমি চুড়িতে ভর্তি। সে বারবার হাত নাড়িয়ে চুড়ির শব্দ শুনছে আর জেনিনের দিকে তাকিয়ে হাসছে। জেনিন দেখছিল নোবারার এই নিষ্পাপ আনন্দ। সে ভাবছিল, এই মেয়েটির হাসির জন্য সে শুধু মিটিং নয়, পুরো দুনিয়াকে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষায় রাখতে পারে।
নোবারা জেনিনের কফি কাপের ওপর নিজের চুড়ি পরা হাতটা রাখল। “ধন্যবাদ মি;! আজকের দিনটা আমার জীবনের অন্যতম সেরা দিন।”
জেনিন নোবারার হাতটা আলতো করে টিপে দিল। তার চোখে এখন কোনো মাফিয়া ডনের নিষ্ঠুরতা নেই। সে মৃদু স্বরে বলল, “আপনার প্রতিটি ইচ্ছে আমার কাছে হুকুম নূরা। শুধু মনে রাখবেন, এই চুড়ির বাঁধন যেন কোনোদিন আলগা না হয়।”
নোবারার বুকের ভেতরটা আবার একটু কেঁপে উঠল। সেই অপরাধবোধের ছায়াটা আবার যেন ফিরে আসতে চাইল। কিন্তু সে আজ আর ভাবতে চায় না। সে আজ কেবল জেনিনের দেওয়া ওই রেশমি চুড়ির শব্দে নিজের অস্তিত্বকে বিলীন করে দিতে চায়। জেনিন নূরশাদ আজ অফিসের ফাইল নয়, তার প্রিয়ার হাসির মাঝে নিজের সার্থকতা খুঁজে পেল।
চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।।।

