#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৩২
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
রাত তখন আনুমানিক তিনটা। পুরো শহর যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, জেনিন নোবারাকে নিয়ে ভিলার একটি গোপন আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল দিয়ে বেরিয়ে আসলো। সেখানে আগে থেকেই একটি সাধারণ মানের পুরনো জিপ রাখা ছিল, যা কোনোভাবেই জেনিন নূরশাদের আভিজাত্যের সাথে মেলে না। তবুও আজ নোবারা সাথে থাকায় সে জিপ এ উঠে বসে, এবং নিজেই ড্রাইভিং করে।
তারা ঢাকা থেকে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছায় চট্টগ্রামের বাঁশখালী সংলগ্ন এক নির্জন উপকূলীয় এলাকায়। সেখান থেকে জেনিনের অতি বিশ্বস্ত এক মাঝির ট্রলারে করে তারা বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে পাড়ি দেয় প্রায় দুই ঘণ্টা। তাদের গন্তব্য ছিল ‘নূরাদ্বীপ’, এটি জেনিনের সদ্যই নোবারার নামে কেনা একটি ব্যক্তিগত ছোট দ্বীপ, যা মানচিত্রে কোনো সাধারণ পর্যটকের পক্ষে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।
জেনিন এই দ্বীপটি তৈরি করে রেখেছিল তার অবসরে নোবারার জন্য, যেখানে কোনো নেটওয়ার্ক নেই, কোনো স্যাটেলাইট ট্র্যাকার কাজ করে না। কেবল নোবারার কনফেশন এর খুশিতে আজ সে মাফিয়া হোক বা সিইও, সব পরিচয় ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে এই দ্বীপে চলে এসেছে তার অর্ধাঙ্গিনীকে নিয়ে।
সকালবেলা যখন দ্বীপের দিগন্তরেখা নীল থেকে ধীরে ধীরে কাঁচা সোনার রোদে স্নান করে উঠল, তখন জেনিন আর নোবারা দাঁড়িয়ে ছিল বেলাভূমির ঠিক মাঝখানে। জেনিনের পরনে আজ কোনো কালো কোট নেই, নেই কোনো কালো মাস্ক। অতি সাধারণ একটি ধবধবে সাদা লিনেন শার্ট, যার হাতাগুলো কনুই পর্যন্ত গোটানো। ভোরের অবাধ্য নোনা বাতাস তার অবিন্যস্ত চুলগুলোকে কপালে এসে বারবার ছুঁয়ে যাচ্ছিল। জেনিনকে আজ কোনো মাফিয়া ডন নয়, বরং মনে হচ্ছিল কোনো এক নিঃসঙ্গ দ্বীপের নির্বাসিত রাজপুত্র। আর নোবারা? সমুদ্রের নীলিমা থেকে ছিঁড়ে আনা এক টুকরো শিফন শাড়িতে তাকে দেখাচ্ছিল জলপরী আর মানবী’র এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। বাতাসের ঝাপটায় তার নীল আঁচলটা যখন উড়ছিল, জেনিন মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে ভাবছিল, এই নারী কি সত্যিই রক্ত-মাংসের, নাকি তার কল্পনাপ্রসূত কোনো মরীচিকা?
সকালটা শুরু হয়েছিল এক অভাবনীয় চপলতায়। জেনিনকে স্তম্ভিত করে দিয়ে নোবারা হঠাৎ করেই তার হাত ছেড়ে দিয়ে বালুচরের ওপর দৌড়াতে শুরু করল। তার খিলখিল হাসির শব্দ সমুদ্রের গর্জনের সাথে মিশে এক অপার্থিব সিম্ফনি তৈরি করছিল। জেনিন প্রথমে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সেই দুর্লভ, স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ হাসি, যা কেবল নোবারাই এই পাথরের বুক থেকে ছিনিয়ে নিতে পারে।
“Hubby! ধরুন আমাকে! যদি পারেন তবেই আমি আপনার!” নোবারা পেছন ফিরে চিৎকার করে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল।
জেনিন তার দৌড়ের গতি বাড়াল। পনেরো বছরের কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ আর অমানুষিক ক্ষিপ্রতা তার রক্তে মিশে আছে, কিন্তু আজ সে নোবারাকে ধরতে চাইল না। সে চাইল এই পলায়নপর মুহূর্তটি অনন্তকাল ধরে চলুক। বালুর ওপর দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে তারা একসময় সমুদ্রের অগভীর জলে গিয়ে আছড়ে পড়ল। নোনা জলের ঝাপটা জেনিনের বুক ভিজিয়ে দিল। নোবারা দুহাতে জল ছিটিয়ে জেনিনকে ভিজিয়ে দিতে লাগল।
জেনিন জল আড়াল করার ভান করে হাসতে হাসতে বলল, “আমি সারাজীবন রক্তের হোলি খেলেছি, আর আপনি আমাকে সামান্য এই নোনা জল দিয়ে ভয় দেখাচ্ছেন! এটা কি মানানসই, জলকন্যা?”
নোবারা থামল না। সে আরও বেশি করে জল ছিটাতে লাগল। জেনিন এবার এক নিমেষে নোবারার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে পাজাকোলা করে শূন্যে তুলে নিল। সমুদ্রের স্বচ্ছ নীলাভ জলের মাঝে জেনিন নোবারাকে নিয়ে এক চক্কর ঘুরল। নোবারার ভেজা শাড়ি তার শরীরের সাথে লেপ্টে আছে, কিন্তু তার মনে আজ এক অদ্ভুত মুক্তি। জেনিন তাকে নামিয়ে দিল ঠিকই, কিন্তু তার বলিষ্ঠ হাতের বাঁধন আলগা করল না। ঢেউয়ের আঘাতে তারা দুজনেই টাল সামলাতে না পেরে একে অপরকে জাপটে ধরল।
|||সূর্য যখন মধ্যগগন ছাড়িয়ে বিকেলের দিকে হেলে পড়ল, তখন আকাশ জুড়ে শুরু হলো রঙের মহোৎসব। জেনিন আর নোবারা এক বিশাল ঝাউগাছের ছায়ায় বালির ওপর পাশাপাশি শুয়ে আছে। দুজনের শরীরই বালু আর নোনা জলে মাখামাখি, যেন তারা এই দ্বীপেরই অংশ। জেনিন এক হাত দিয়ে নিজের মাথাটা উঁচু করে নোবারার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। নোবারার দীর্ঘ চোখের পাতায় নোনা জলের বিন্দুগুলো সূর্যের শেষ আলোয় হিরের মতো ঝিলমিল করছিল।
নোবারা আজ খুব শান্ত, কিন্তু তার সেই নীরবতা ছিল হাজারো শব্দের চেয়ে বেশি মুখর। সে জেনিনের দিকে পাশ ফিরে শুয়ে তার শার্টের বোতামগুলো নিয়ে আনমনে খেলতে লাগল। নোবারার নমনীয় আঙুলগুলো যখন জেনিনের হাতের সেই পুরনো গুলির ক্ষতর ওপর এসে থামল, তখন তার চোখের মণি দুটো আর্দ্র হয়ে উঠল।
নোবারা ফিসফিস করে বলল, “আমরা কি এই দ্বীপটাকেই আমাদের নীড় বানিয়ে নিতে পারি না? যেখানে কোনো জেনিন নূরশাদ থাকবে না, কোনো জেড থাকবে না… শুধু থাকবে আমার সেই হারিয়ে যাওয়া জেনিন!”
জেনিন নোবারার কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ালো। তার স্পর্শে আজ এক অদম্য হাহাকার আর তৃষ্ণা ছিল। সে নোবারার অবাধ্য চুলগুলো কানের পেছনে সরিয়ে দিয়ে বলল, “আমি তো কবেই এই পৃথিবীর বাইরে চলে গেছি, নূরা। আপনার ওই চোখের তারায় যে গভীরতা, সেখানেই তো আমার আসল ঘর। আমি যদি সব হারিয়ে ভিখারিও হয়ে যাই, তবে আপনার এই বাহুডোরে আমি হাজার বছর নির্দ্বিধায় কাটিয়ে দিতে পারব।”
নোবারা হঠাৎ জেনিনের চওড়া বুকের ওপর নিজের মুখটা চেপে ধরল। সে শুনতে পাচ্ছিল জেনিনের হৃদস্পন্দন, ধুকপুক, ধুকপুক। প্রতিটি স্পন্দন যেন নোবারাকেই ডাকছে। নোবারার মনের কোণে সেই অপরাধবোধের কাঁটাটা এখনো আছে, সে জানে সে জেনিনকে ঠকাচ্ছে। তবুও আজ সে সব নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে কেবল জেনিনের প্রেমে ডুবতে চাইল।
সন্ধ্যা নামল এক রক্তিম আভা নিয়ে। জেনিন নিজ হাতে শুকনো কাঠ কুড়িয়ে তটভূমিতে আগুন জ্বালাল। আগুনের সেই লেলিহান শিখা জেনিনের পৌরুষদীপ্ত মুখমণ্ডলকে আরও তীব্র আর রহস্যময় করে তুলেছে। নোবারা জেনিনের কাঁধে মাথা রেখে আগুনের দিকে তাকিয়ে ছিল।
আগুনের উত্তাপ আর সমুদ্রের শীতল হাওয়া মিলে এক মায়াবী সম্মোহন তৈরি করল। নোবারা হঠাৎ জেনিনের গলার কাছে মুখ নিয়ে আলতো করে দংশন করল, যা জেনিনের শিরদাঁড়া দিয়ে এক বিদ্যুচ্চমক বয়ে নিয়ে গেল। নোবারা যখন জেনিনের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট রাখল, সেই চুম্বনে কোনো দ্বিধা ছিল না। সেখানে ছিল এক চরম সমর্পণ, এক দীর্ঘ তৃষ্ণা আর দহনের গল্প।
জেনিন নোবারাকে নিজের ভেতর মিশিয়ে নিতে চাইল। এই প্রথম নোবারা নিজে থেকে তাকে চাচ্ছে। জেনিনের চোখ বুজে এল এক অসীম তৃপ্তিতে। সে ভাবছিল, মৃত্যু যদি এখনই আসে, তবে সে হাসিমুখে বরণ করে নেবে।
রাত গভীর হলো। পূর্ণিমার চাঁদ রুপোলি চাদর বিছিয়ে দিয়েছে সারা সমুদ্রে। জেনিন আর নোবারা বালুর ওপর শুয়ে আকাশের নক্ষত্র গুনছিল। একসময় নোবারা জেনিনের বলিষ্ঠ হাতের ওপর মাথা রেখে চোখ বন্ধ করলো। জেনিন অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নোবারার ওই নিষ্পাপ মুখটির দিকে, নোবারার ঠোঁটের কোণে এই প্রথম এক চিলতে হাসি দেখছে জেনিন।
তবে আজ এই একটা দিন জেনিন নুরশাদ সত্যিই বেঁচেছে। সে নোবারার সাথে সাধারণ মানুষের মতো ঝগড়া করেছে, বালু নিয়ে খেলেছে, আর নোবারার ওই উত্তপ্ত নিশ্বাসে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে। জেনিন বুঝতে পারছিল, সে যত বেশি নোবারার গভীরে প্রবেশ করছে, ততই সে তার মাফিয়া সাম্রাজ্যের জন্য দুর্বল হয়ে উঠছে। কারণ, একজন সম্রাট যখন কারোর প্রেমে দেউলিয়া হয়ে যায়, তখন তার পতন অনিবার্য।
|||চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া সেই নির্জন দ্বীপের বালুচরে এখন আগুনের লেলিহান শিখা নাচছে। বোধহয় রাত তখন একটা। জেনিন আর নোবারা আজ পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়া এক জোড়া আদিম মানব-মানবীর মতো। সারাদিন তাদের তেমন খাওয়া দাওয়া হয়নি বললেই চলে।
জেনিন নূরশাদ, যার টেবিলে প্রতিদিন বিশ্বের দামী সব কুইজিন সাজানো থাকে, আজ সে প্যান্টের হাতা গুটিয়ে সমুদ্রের হাঁটু সমান জলে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটি ধারালো বর্শা সদৃশ লাঠি, যা সে দ্বীপের ঝাউগাছ থেকে নিজেই তৈরি করে নিয়েছে।
নোবারা বালুচরে ছোট ছোট পাথর দিয়ে একটা অস্থায়ী উনুন বানিয়েছে। তার নীল শিফন শাড়িটা কোমরে শক্ত করে গোঁজা, কপালে জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। আগুনের তাপে তার মুখটা লালচে হয়ে আছে, যা দেখে জেনিনের মনে হচ্ছে সে কোনো প্রাচীন রাজকুমারী ক্রিস্টিনা কে দেখছে!
“এই মি:! মাছ কি পাওয়া যাবে? নাকি ড্রাই ফ্রুটস খাবেন আবার?” নোবারা উনুন থেকে ধোঁয়া সরাতে সরাতে চিৎকার করে বলল।
জেনিন জলের ভেতর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মাছের সামান্যতম নড়াচড়া অনুভব করার জন্য তার স্নায়ুগুলো এখন ইস্পাতের মতো শক্ত। সে ঘাড় ঘুরিয়ে এক চিলতে হাসল। “মাফিয়া ডনরা কখনো খালি হাতে ফেরে না নূরা। তাঁদের শিকার বাঘের মুখ থেকে হলেও ছিনিয়ে আনে তারা। যাস্ট ওয়েট এন্ড সিই!”
ঠিক সেই মুহূর্তে জলের তলায় একটি রুপোলি আভা চমকে উঠল। জেনিনের হাত ক্ষিপ্র গতিতে নিচে নেমে গেল। সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে সে একটি বড় মাপের সামুদ্রিক মাছ গেঁথে ফেলল তার বর্শায়। মাছটা তখনো ছটফট করছে। জেনিন বিজয়ী বীরের মতো জল থেকে উঠে এল। তার পেশিবহুল শরীর ভেজা শার্টের নিচ দিয়ে স্পষ্ট ফুটে উঠছে, বুকের কাছে শার্টের বোতাম খোলা থাকায় নোনা জল আর আগুনের আলো মিলে এক অদ্ভুত দ্যুতি ছড়াচ্ছে।
নোবারা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। এই জেনিনকে সে চেনে না। এই জেনিন নূরশাদ বড় বেশি জ্যান্ত, বড় বেশ পুরুষালি। সে যখন মাছটা নিয়ে নোবারার সামনে এসে দাঁড়ালো, নোবারা এক মুহূর্তের জন্য তার চোখের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। সেই চোখে আজ কোনো অন্ধকার নেই, আছে শুধু এক আদিম শিকারির উল্লাস।
“এই নিন আপনার শিকার,” জেনিন মাছটা নোবারার কাছে রাখা পাথরের ওপর রাখল।
নোবারা ছুরি হাতে মাছটা পরিষ্কার করতে বসল। জেনিন তার পাশেই বালুর ওপর বসে পড়ল। সে নোবারার প্রতিটি কাজ গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছে। নোবারা খুব নিপুণভাবে মাছের আঁশ ছাড়াচ্ছে, মশলা মাখাচ্ছে। জেনিন ভাবছিল,এই হাতগুলোই তো তাকে মারার জন্য ড্রাইভ কপি করেছিল, আবার এই হাতগুলোই আজ তার জন্য পরম মমতায় খাবার রাঁধছে। মানুষের মন কি বিচিত্র!
“কী দেখছেন ওভাবে?” নোবারা আড়চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“দেখছি… কীভাবে আমার ধ্বংস আর আমার শান্তি, দুটোই একই হাতে বন্দি হয়ে আছে,” জেনিন খুব নিচু স্বরে বলল।
নোবারার হাত এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে বুঝতে পারল জেনিন কী ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু আজ সে কোনো তর্কে গেল না। সে শুধু মাছটা মশলায় মাখিয়ে আগুনের ওপর বসিয়ে দিল। আগুনের তাপে মাছের চমৎকার সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। রাত যত বাড়ছে, সমুদ্রের গর্জন তত গম্ভীর হচ্ছে।
মাছটা যখন আধা-পোড়া হয়ে এল, নোবারা একটা বড় পাতা ছিঁড়ে তাতে জেনিনকে পরিবেশন করল। জেনিন প্রথম টুকরোটা মুখে দিয়ে চোখ বন্ধ করল। “বিশ্বাস করুন নূরা, আমার সাত সমুদ্র তেরো নদীর সাম্রাজ্যে আমি এত সুস্বাদু খাবার কোনোদিন খাইনি।”
নোবারা হাসল। সে জেনিনের নাক টিপে দিয়ে বললো, “ক্ষিধে লেগেছে তো, তাই ঘাস দিলেও সুস্বাদু মনে হতো মি:।”
খাওয়া শেষ করে তারা আগুনের পাশে পাশাপাশি বসল। জেনিন একটা বড় চাদর বিছিয়ে দিয়েছে বালুর ওপর। নোবারা জেনিনের কাঁধে মাথা রাখল। আগুনের শিখা এখন একটু স্তিমিত, কিন্তু তার লালচে আভা জেনিনের মুখে এক রহস্যময় মায়া তৈরি করেছে।
“জেনিন,” নোবারা ফিসফিস করে বলল, “আমরা যদি আজ রাতে এখানেই থেকে যাই? আর কোনোদিন ফিরে না যাই?”
জেনিন নোবারার চিবুক ধরে মুখটা উপরে তুলল। তার চোখে এক বিষাদময় প্রেম। “ফিরে তো যেতেই হবে নূরা। অন্ধকার কখনো আলোকে বেশিক্ষণ আটকে রাখতে পারে না। কিন্তু আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, এই একটা রাত আমি আপনাকে এমন এক স্বর্গ দেব, যা আপনি সারাজীবনেও ভুলবেন না।”
জেনিন নোবারাকে নিজের বাহুবন্দি করে বালুর ওপর আলতো শুইয়ে দিল। ওপরের আকাশটা আজ নক্ষত্রের মেলায় ভরে গেছে। জেনিন নোবারার কানের কাছে মুখ নিয়ে আলতো করে কামড় দিল, তারপর তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মেলাল। সেই চুম্বনে কোনো তাড়া ছিল না, ছিল এক দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। নোবারা জেনিনকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার মনে হলো, জেনিনের এই শরীরের উষ্ণতা, তার এই ঘ্রাণ—এগুলোই তার আসল পৃথিবী।
জেনিন নোবারার শাড়ির আঁচলটা আলতো করে সরিয়ে তার কাঁধে নিজের মুখ ডোবাল। নোবারা অনুভব করল জেনিনের শরীরের প্রতিটি কাঁপুনি। জেনিন যেন আজ নোবারার ভেতরে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চায়, যাতে কালকের ওই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে সে আর নিজেকে খুঁজে না পায়।
রাত যখন শেষ প্রহরে, তখন ক্যাম্পের আগুন নিভে এসেছে। জেনিন নোবারাকে বুকে আগলে রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। নোবারা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তার মুখে এক প্রশান্তির ছায়া। জেনিন ভাবছিল—সে কি পারবে নোবারার এই বিশ্বাস ভেঙে দিতে? সে কি পারবে কাল সকালে তাকে আবার সেই যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে যেতে?
জেনিন বিড়বিড় করে বলল, “I was never the monster, Nura! The world just made me one! But you…you are the only reason I want to be a man again.”
জেনিন দেখল নোবারা তার আঙুলগুলো জেনিনের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রেখেছে। জেনিন বুঝতে পারল, নোবারাও আজ তার লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। সে হয়তো আর কোনোদিন জেনিনকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে পারবে না। কারণ, যে হাত জেনিনকে ভালোবেসে ধরেছে, সেই হাত কখনো তার গলায় ফাঁসির দড়ি পরাতে পারে না।
হঠাৎ, তখনই সমুদ্রের দিক থেকে আসা একটি যান্ত্রিক শব্দ জেনিনের কানে বিঁধল। এটি কোনো ঢেউয়ের শব্দ নয়। এটি স্পিডবোটের ইঞ্জিনের গুঞ্জন, যা খুব সন্তর্পণে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। জেনিনের শরীর মুহূর্তের মধ্যে শক্ত হয়ে উঠল। দীর্ঘ পনেরো বছরের বেঁচে থাকার লড়াই তার স্নায়ুকে এতটাই তীক্ষ্ণ করেছে যে, ঘুমের ঘোরেও সে বিপদের গন্ধ পায়।
“নোবারা, উঠুন!” জেনিন নিচু কিন্তু কঠোর স্বরে বলল।
নোবারা চোখ কচলাতে কচলাতে চাইল, “কী হয়েছে?”
জেনিন উত্তর দিল না। সে দ্রুত চারপাশটা একবার দেখে নিল। দক্ষিণ দিক থেকে চার-পাঁচটি ছায়া দ্রুতপদে এগিয়ে আসছে। চাঁদের আলোয় তাদের হাতে থাকা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের নলগুলো চকচক করে উঠল। জেনিন বুঝতে পারল, এরা সাধারণ কোনো চোর নয়। এরা তার পুরনো শত্রু, হয়তো ইগর পেত্রোভের বেঁচে যাওয়া কোনো লোক অথবা স্থানীয় কোনো প্রতিপক্ষ যারা এই নির্জন দ্বীপের সুযোগ নিতে এসেছে।
“চলুন! ঝাউবনের দিকে!” জেনিন নোবারার হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টান দিল।
জেনিন আজ একদমই অপ্রস্তুত। তার সাথে কোনো পিস্তল নেই, কোনো বডিগার্ড নেই। নোবারাকে নিয়ে সে বালুর ওপর দিয়ে দৌড়াতে শুরু করল। ঝাউবনের ঘন অন্ধকারের ভেতরে তারা যখন ঢুকল, তখন পেছন থেকে প্রথম গুলির শব্দ শোনা গেল। ‘ট্যাঁ-ট্যাঁ’ করে কয়েকটা বুলেট তাদের মাথার ওপর দিয়ে ঝাউগাছের কাণ্ড বিদীর্ণ করে চলে গেল।
“আমি….আমি আর পারছি না!” নোবারা হাঁপাচ্ছিল। তার নীল শাড়ি ঝোপের কাঁটায় আটকে ছিঁড়ে যাচ্ছে।
“একদম থামবেন না। আমি থাকতে আপনার কিচ্ছু হবে না,” জেনিন নোবারাকে একটি বিশাল পাথরের আড়ালে বসিয়ে দিল।
শত্রুরা এখন মাত্র পঞ্চাশ গজ দূরে। জেনিন দেখল তারা সংখ্যায় অন্তত দশজন। জেনিনের হাতে শুধু একটি ছোট সুইস আর্মি নাইফ, যা সে সবসময় পকেটে রাখে। সে পাথরের আড়াল থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিল। সে জানে, তাকে আজ মরতে হবে অথবা মারতে হবে। কিন্তু তার চেয়েও বড় ভয়, নোবারার কী হবে?
শত্রুপক্ষ কাছাকাছি আসতেই তাদের লিডারের কর্কশ কণ্ঠ শোনা গেল, “জেড, আমরা জানি তুমি এই পাথরের পেছনে লুকিয়ে আছো। বেরিয়ে এসো।”
জেনিন যখন একটা মরণপণ ঝাঁপ দেওয়ার জন্য পেশি শক্ত করল, ঠিক তখনই আকাশ চিরে এক অদ্ভুত শব্দ শোনা গেল। একটি নয়, তিনটি অত্যাধুনিক ড্রোন ওপর থেকে লাল লেজার লাইট ফেলল শত্রুদের বুক লক্ষ্য করে।
মুহূর্তের মধ্যে চারপাশটা নরক গুলজার হয়ে উঠল। সমুদ্রের দিক থেকে নয়, বরং দ্বীপের ভেতরের ঝোপঝাড় থেকে একদল সাইলেন্ট কিলার বেরিয়ে এল। তাদের পরনে ব্ল্যাক কমান্ডো ড্রেস। নিখুঁত নিশানায় তারা শত্রুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মাত্র দুই মিনিটের ‘সুইফট অপারেশন’। শত্রুদের দশজনই নিথর হয়ে বালুর ওপর লুটিয়ে পড়ল।
জেনিন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে। ধোঁয়া আর বারুদের গন্ধের মাঝখান থেকে একজন এগিয়ে এল। তার হাতে একটি ট্যাবলেট কম্পিউটার আর অন্য হাতে গ্লক-১৭ পিস্তল। মানুষটি আর কেউ নয়, ইউজি।
ইউজি জেনিনের সামনে এসে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। জেনিনের চোখে তখন অগ্নিদৃষ্টি। সে নোবারাকে নিয়ে এখানে এসেছিল ব্যক্তিগত একান্ত সময়ের জন্য, আর ইউজি সেই গোপনীয়তা লঙ্ঘন করেছে। কিন্তু জেনিন কি ইউজি কে আর বকাঝকা করতে পারবে?
ইউজি জেনিনের সামনে এসে মাথা নিচু করে হাঁটু গেড়ে বসল। এটি তার চরম আত্মসমর্পণের ভঙ্গি।
“বস, আ’ম সরি” ইউজি খুব নিচু স্বরে বলল। “আমি জানতাম আপনি কোনো প্রটোকল ছাড়াই বেরিয়েছেন। কিন্তু আপনার শত্রু তালিকা এতটাই দীর্ঘ যে, আমি আপনাকে এক মুহূর্তের জন্যও অরক্ষিত রাখার ঝুঁকি নিতে পারিনি।”
নোবারা পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। সে থরথর করে কাঁপছিল। ইউজিকে দেখে সে যেন প্রাণ ফিরে পেল। পরক্ষনেই তার আবার হালকা লজ্জা লাগলো! তার মানে এতোক্ষণ জেনিনের সাথে কাটানো কিছু মুহুর্ত তো ইউজি দেখেছেই! নোবারা অপ্রস্তুত হয়ে জেনিনের শার্টের হাতা ধরে থাকলো।
অপরদিকে জেনিন এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে সমুদ্রের দিকে তাকালো। সে বুঝতে পারল, জেনিন নূরশাদ চাইলেই সাধারণ মানুষ হতে পারে না। তার জীবনটা এই বারুদের গন্ধের সাথেই জড়িয়ে গেছে। সে ইউজির কাঁধে হাত রাখল। কিন্তু কিছু বলার ভাষা ছিল না তার!
“ইউজি,” জেনিন খুব নিচু স্বরে ডাকল। তার কন্ঠস্বর আজ ভারী, কোনো চিৎকার নেই, কিন্তু তাতে এক ধরণের ভয়ংকর গাম্ভীর্য।
ইউজি উঠে দাঁড়িয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর খুব শান্তভাবে বলল, “বস, আমি জানি আপনি আমাকে আজ ক্ষমা করবেন না। কিন্তু আপনার জীবন আমার কাছে আপনার হুকুমের চেয়ে বড়। আমি চেয়েছিলাম আপনি এই কয়েকটা দিন শান্তিতে কাটান, তাই আমি দূর থেকে নজর রাখছিলাম। কিন্তু ওরা যখন বোট নিয়ে এল…”
জেনিন মাঝপথে থামিয়ে দিল ইউজিকে। সে বালুর ওপর পড়ে থাকা লাশের দিকে তাকাল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল। “ওরা কারা?”
“লোকাল গ্যাং, বস। আপনার মাথার ওপর যে মোটা অংকের বাউন্টি আছে, সেটার লোভে এসেছিল। ইন্টারনাল সোর্স থেকে লিক হয়েছে আপনার লোকেশন,” ইউজি উত্তর দিল।
জেনিন এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল। সে বুঝতে পারল, সে পালিয়ে থাকতে চাইলেও তার ছায়া তাকে পিছু ছাড়বে না। সে নোবারার কাছে ফিরে গেল। নোবারা জেনিনের রক্তাক্ত হাতের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠল।
“জেনিন, আপনার হাত… আপনি কি আহত?” নোবারা কাঁপা হাতে জেনিনের ক্ষতটা ছুঁতে চাইল।
জেনিন নোবারার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তার স্পর্শ এখন আর উগ্র নয়, বরং এক ধরণের তীব্র আকুতিতে ভরা। সে নোবারার চোখের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “আমি ঠিক আছি নূরা। কিন্তু এই পৃথিবীটা ঠিক নেই। আমি চেয়েছিলাম আপনাকে এক টুকরো স্বর্গ দিতে, অথচ আমি আপনাকে এক নরকের মাঝখানে এনে দাঁড় করিয়েছি।”
জেনিন নোবারাকে বুকের কাছে টেনে নিল, কিন্তু এবার তাতে কোনো দম্ভ ছিল না। ছিল এক ধরণের নীরব আত্মসমর্পণ। সে নোবারার কপালে মাথা ঠেকিয়ে বলল, “আমি জানি আপনি এখন আমাকে ঘৃণা করছেন। আপনি ভাবছেন আমি শুধু অশান্তি নিয়ে আসি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি আপনাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না, আবার আপনাকে সাথে রাখলে আপনার জীবনটা প্রতিমুহূর্তে বিপন্ন হবে। আমি কোন দিকে যাব নূরা?”
নোবারা জেনিনের শার্টের ভিজে থাকা কলারটা শক্ত করে ধরল। ইউজি পাশেই দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু নোবারার আজ কোনো লজ্জা নেই। সে জেনিনের বুকের ধুকপুকানি শুনতে পাচ্ছিল। সে বুঝতে পারল, এই ভয়ংকর মানুষটা আসলে ভেতর থেকে কতটা ভেঙে গেছে।
“জেনিন,” নোবারা ফিসফিস করে বলল। “আপনি একা নন। আমি জানতাম এই পথটা সহজ হবে না। কিন্তু আপনি এভাবে নিজেকে দোষ দেবেন না। ইউজি ঠিকই করেছে। ও না থাকলে আজ হয়তো আমরা দুজনেই এই বালুচরে মিশে যেতাম।”
জেনিন ইউজির দিকে তাকালো। ইউজি তখনো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। জেনিন বুঝতে পারল, ইউজিই তার জীবনের একমাত্র ধ্রুবক যে তাকে সত্যিটা দেখানোর ক্ষমতা রাখে। সে ইউজির কাঁধে হাত রাখল।
“ইউজি, বোট তৈরি করো। আমরা এখনই ফিরব। আর এই লাশগুলো… সমুদ্রের অতলে হারিয়ে যেতে দিবে। আমি চাই না এই পবিত্র দ্বীপে এদের কোনো চিহ্ন থাকুক,” জেনিন শান্ত কিন্তু অটল স্বরে বলল।
ইউজি মাথা ঝুকিয়ে কাজ শুরু করল। জেনিন নোবারার হাত ধরে সমুদ্রের কিনারায় গিয়ে দাঁড়াল। ঢেউগুলো তখনো আগের মতোই আছড়ে পড়ছে, যেন কিছুক্ষণ আগে এখানে কোনো রক্তপাত হয়নি।
নোবারা জেনিনের বাহু জড়িয়ে ধরে তার কাঁধে মাথা রাখল। সে জানত, তাদের এই রূপকথা কোনো সাধারণ গল্পের মতো শেষ হবে না। তাদের ভালোবাসাটা বারুদের মতো দাহ্য, আগুনের মতো উত্তপ্ত। কিন্তু এই আগুনেই তারা দুজন পুড়তে রাজি।
পূর্ণিমার চাঁদটা তখন মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। তারা যখন বোটে উঠল, জেনিন একবার পেছন ফিরে দ্বীপটার দিকে তাকালো। তার মনে হলো, সে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কয়েকটা মুহূর্ত এই বালুচরে ফেলে যাচ্ছে। এখন সামনে শুধু অন্ধকার শহর আর এক অন্তহীন যুদ্ধ।
চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।

