Soulmate_to_Enemy #পর্ব_৩৬

0
2

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৩৬
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

ঢাকার উত্তরের এক নির্জন বনাঞ্চলের ভেতরে অবস্থিত এক গোপন আস্তানা। চারদিকে ঘন জঙ্গল, আর মাঝখানে আধুনিক প্রযুক্তিতে গড়া এক দুর্গ। এখানে গত দশ বছর ধরে আশফাক নূরশাদ এক জীবন্ত লাশের মতো পড়ে আছেন। তার চারপাশে ২৪ ঘণ্টা নিয়োজিত থাকে জেনিনের সবচাইতে বিশ্বস্ত চারজন বডিগার্ড, যারা জেনিনের জন্য হাসতে হাসতে জীবন দিতে পারে।

ভোর রাত তখন তিনটা। নূরশাদ ভিলার স্টাডি রুমে জেনিন একা বসে এক অদ্ভুত অস্বস্তিতে ভুগছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে তার সুরক্ষিত স্যাটেলাইট ফোনে একটি এনক্রিপ্টেড মেসেজ এল।

মেসেজটি ছিল এক লাইনের, “The Vault is compromised.”

জেনিনের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। ‘ভল্ট’ হলো তার বাবার আস্তানার কোডনেম। সে দ্রুত তার ল্যাপটপ অন করল। স্ক্রিনে দেখল সেফ-হাউসের থার্মাল ক্যামেরাগুলো একের পর এক অফলাইন হয়ে যাচ্ছে। জেনিন বুঝতে পারল, কেউ তার সবচাইতে গোপন খবরটি জেনে গেছে!

জেনিন ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে করিডোরে চিৎকার করে উঠল, “ইউজি! এখনই সব গানম্যানকে রেডি করো! আমরা নর্থ সাইডে যাচ্ছি!”

ইউজি করিডোরেই ছিল। সে জেনিনের চোখে এমন এক ভয়ংকর রূপ দেখল যা সে গত দশ বছরেও দেখেনি।

“বস, কী হয়েছে? নর্থ সাইডে তো শুধু আপনার বাবার…” ইউজির কথা শেষ করার আগেই জেনিন তার কলার চেপে ধরল।

“ওরা পৌঁছে গেছে ইউজি! এখনই গাড়ি বের করো! আই স্যুয়ার, বাবার কিছু হলে আমি ওদের কাউকে জ্যান্ত রাখবো না।”

ইউজি দ্রুত তার কি-বোর্ডে আঙুল চালিয়ে ভিলার গেট খুলে দিল। সে জেনিনকে শান্ত করার চেষ্টা করল, “বস, আপনি ওখানে গেলে ভিলার সিকিউরিটি কমে যাবে। ম্যাম এখানে একা। আমি সাথে যাচ্ছি না, ভিলাতেই থাকছি।”

জেনিন এক মুহূর্ত থামল। তার হৃদয়ের একপাশে নোবারা, অন্যপাশে তার জন্মদাতা পিতা। সে জানে তার শত্রুরা এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চাইছে। কিন্তু জেনিনের মনে হলো নোবারার জন্য ভিলার এই সাত স্তরের নিরাপত্তা আর ইউজির মতো প্রফেশনাল ফাইটার যথেষ্ট। কিন্তু তার বাবার ওখানে এখন মৃত্যু হানা দিচ্ছে।

“ঠিক বলেছো, তুমি এখানে থাকো। নোবারার জানের জিম্মাদার তুমি। যদি আমি এক ঘণ্টার মধ্যে না ফিরি, তবে তুমি ভিলা লকডাউন করে দিবে।”

জেনিন তার ব্ল্যাক লেদার জ্যাকেটটা গায়ে জড়িয়ে নিল। তার কোমরে দুটি ‘ডেজার্ট ঈগল’ পিস্তল এবং হাতে একটি ট্যাকটিকাল নাইফ। সে তার রোলস রয়েস নয়, বরং একটি ব্ল্যাক এসইউভি নিয়ে একাই বনের দিকে ছুটে চলল। তার পেছনে তিনটি গাড়িবোঝাই জেনিনের এলিট শ্যুটাররা অনুসরণ করছে।

জেনিনের গাড়ি যখন বনের কাছাকাছি পৌঁছাল, সে দেখল মূল রাস্তার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। গাছ কেটে রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে শত্রুরা। জেনিন গাড়ি থেকে লাফিয়ে নামল। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তার চোখে মুখে বিঁধছে, কিন্তু জেনিনের স্নায়ু আজ ইস্পাতের মতো শক্ত।

সে তার শ্যুটারদের ইশারা দিল জঙ্গল ঘিরে ফেলার জন্য। জেনিন নিজে একা প্রধান ফটকের দিকে এগোল। সে দেখল তার চারজন গার্ডের নিথর দেহ গেটের সামনে পড়ে আছে। জেনিনের ভেতরে আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়ার উপক্রম হলো।

সেফ-হাউসের ভেতরে তখন তাণ্ডব চলছে। জেনিনের চিরশত্রু ‘গ্যাংস্টার কালাম’, যে জেনিনের ভয়ে গত পাঁচ বছর আন্ডারগ্রাউন্ডে ছিল, আজ সে এসেছে তার সব শক্তি নিয়ে। সে জানত জেনিনকে সরাসরি হারানো অসম্ভব, তাই সে জেনিনের পঙ্গু বাবার ওপর হামলা করেছে।

কালাম আশফাক নূরশাদের ঘরের দরজা লাথি মেরে ভেঙে ভেতরে ঢুকল। হুইলচেয়ারে বসে থাকা বৃদ্ধ আশফাক নূরশাদ শান্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। তার চোখে ভয় নেই, আছে কেবল এক অবজ্ঞা। তিনি জানতেন এমন দিন আসবেই। একারণেই তো ছোটবেলা থেকেই জেনিনকে অনাদরে রেখে নিষ্ঠুর করে তুলেছেন, যাতে জেনিন কে কখনো হারতে না হয়!

“আপনার ছেলে অনেক ক্ষমতা দেখিয়েছে আশফাক সাহেব,” কালাম তার বন্দুকের নল আশফাক নূরশাদের কপালে ঠেকাল। “আজ আপনি মরবেন, আর জেড তার নিজের চোখের সামনে তার সাম্রাজ্য ছাই হতে দেখবে।”

ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের জানালার কাঁচ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। একটি স্মোক গ্রেনেড ঘরের মাঝখানে এসে পড়ল। ধোঁয়ার কুয়াশার মাঝখান থেকে এক জোড়া জ্বলন্ত চোখ দেখা গেল। জেনিন নূরশাদ ছাদ থেকে দড়ি বেয়ে সরাসরি ঘরের ভেতরে ল্যান্ড করেছে।

জেনিন এক মুহূর্ত সময় দিল না। সে দুই হাতে তার পিস্তল থেকে গুলি চালাতে শুরু করল। ধোঁয়ার আড়ালে জেনিন এক অদৃশ্য ঘাতকের মতো কাজ করছিল। কালামের চারজন বডিগার্ড এক নিমিষেই মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। কালাম ভয় পেল! এতো তাড়াতাড়িই যে জেনিনের আগমন ঘটবে, তা তার কল্পনাতীত ছিল! এই জেড কি আলোর গতিতে চলাফেরা করে নাকি! কালাম এবার জানলা দিয়ে লাফিয়ে পালানোর চেষ্টা করল, এই মুহূর্তে জেনিনের সাথে একলা পাল্লা দেওয়া মানে মৃত্যু কে নিয়ন্ত্রন জানানো! কিন্তু তখনই জেনিন তার পায়ে নিখুঁতভাবে একটি গুলি করল।

কালাম যন্ত্রণায় চিৎকার করে মেঝেতে পড়ে গেল। জেনিন ধীর পায়ে তার কাছে এগিয়ে গেল। সে কালামের চুলের মুঠি ধরে তার মাথাটা মেঝেতে আছড়ে মারল।

“জেড… আমাকে মেরে ফেলো না… আমি শুধু টাকার জন্য…” কালামের কথা শেষ হওয়ার আগেই জেনিন তার গলার নলিটা তার ট্যাকটিকাল নাইফ দিয়ে চিরে দিল। রক্তের ফোয়ারা জেনিনের স্যুটে ছিটকে পড়ল, কিন্তু জেনিন সেদিকে তাকালো না।

সে দ্রুত তার বাবার কাছে গেল। আশফাক নূরশাদ জেনিনের হাতটা শক্ত করে ধরলেন। তার চোখে জল। জেনিন তার বাবার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসল।

“বাবা, আপনি ঠিক আছেন তো?” জেনিনের গলায় সেই নিষ্ঠুরতা আর নেই, আছে এক অবুঝ সন্তানের আর্তি।

আশফাক নূরশাদ শুধু ইশারায় জেনিনকে বললেন তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে। তিনি চাইলেন না জেনিন এখানে আর বেশিক্ষণ থাকুক। জেনিনের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে সতর্ক করে দিচ্ছে। সে বুঝতে পারছে এটা কেবল একদিকের হামলা নয়। কালাম তো কেবল একটা ঘুঁটি ছিল। আসল খেলাটা হয়তো নূরশাদ ভিলায় শুরু হয়ে গেছে।

জেনিন তার স্যাটেলাইট ফোন বের করল ইউজিকে কল করার জন্য, কিন্তু সে দেখল সিগন্যাল জ্যাম করে দেওয়া হয়েছে। জেনিনের বুকটা ধক করে উঠল। নোবারা! তার নূরা এখন একা!

জেনিন তার বাবাকে তার এলিট শ্রেণীর গার্ডদের নিরাপত্তায় রেখে ঝড়ের বেগে বাইরে বেরিয়ে এল। সে তার শ্যুটারদের নির্দেশ দিল, “এখানে পাহারা দাও! কেউ যেন ভেতরে না ঢোকে! আমি ভিলায় যাচ্ছি!”

জেনিন বুঝতে পারল তাকে নূরশাদ ভিলা থেকে দূরে সরিয়ে আনার জন্যই এই সাজানো নাটক। সে গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল। সে এখন আর জেনিন নূরশাদ নয়, সে এখন এক বিধ্বংসী ঝড়। যে ঝড় তার পথে আসা সবকিছু তছনছ করে দিবে।

জেনিন যখন বনের অন্ধকার চিরে তার এসইউভি নিয়ে পাগলের মতো ভিলার দিকে ছুটছে, তখন নূরশাদ ভিলার প্রধান ফটকে নরক নেমে এসেছে। জেনিনকে তার বাবার সেফ-হাউসে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাটি ছিল এক বিশাল দাবার চালের প্রথম অংশ মাত্র। শত্রুপক্ষ জানত, জেনিন থাকলে এই দুর্গে প্রবেশ করা অসম্ভব। তাই তারা জেনিনের সবচাইতে বড় দুর্বলতা, তার বাবাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করেছিল। আর এখন, সেই সুযোগে তারা হানা দিয়েছে জেনিনের হৃদপিণ্ডে, অর্থাৎ নোবারার ওপর।

নূরশাদ ভিলার ড্রয়িংরুমে নোবারা একা বসে ছিল। জেনিন চলে যাওয়ার পর থেকেই তার মনে এক অজানা আতঙ্ক দানা বেঁধেছে। সে জানে জেনিন বিপদে পড়েছে, কিন্তু ইউজি তাকে আশ্বস্ত করেছিল যে জেনিন ফিরে আসবে। ইউজি এখন তার কনট্রোল রুমে বসা, তার চোখগুলো মনিটরে স্থির। হঠাৎ, ভিলার বাইরের দিকের সব সিসিটিভি ক্যামেরা একসাথে ব্ল্যাক-আউট হয়ে গেল। ইউজির অভিজ্ঞ আঙুল কি-বোর্ডে বিদ্যুৎগতিতে চলল, কিন্তু সে দেখল পুরো সিস্টেম জ্যাম করে দেওয়া হয়েছে। এটি কোনো সাধারণ হ্যাক নয়, এটি বাইরের কোনো উচ্চশক্তির কারিগরি।

“ম্যাম! এখনই আন্ডারগ্রাউন্ড বাঙ্কারে যান! সিকিউরিটি ব্রিচ হয়েছে!” ইউজি তার ইন্টারকম দিয়ে চিৎকার করে উঠল।

কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ভিলার পেছনের কাঁচের দেয়াল চুরমার করে এক বিশাল ট্রাক সজোরে ভেতরে ঢুকে পড়ল। ভিলার বাকি এলিট গার্ডরা পজিশন নেওয়ার আগেই বৃষ্টির মতো গ্রেনেড চার্জ করা হলো। আগুনের লেলিহান শিখা আর ধোঁয়ায় পুরো ড্রয়িংরুম ছেয়ে গেল। নোবারা তাড়াহুড়ো করে তার রুমে চলে গেল। এই মুহূর্তে না তো সে ফাইট করতে পারবে না তো নিজেকে নিজেই সুরক্ষা দিতে পারবে!

ইউজি তার কেবিন থেকে বেরিয়ে এল। তার হাতে দুটি স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। সে জানত আজ তাকে একা একাই এই দুর্গ রক্ষা করতে হবে। “টিম লিডার! ব্যাকআপ নাও! নর্থ গেট দিয়ে ওরা ঢুকছে!” ইউজি কমান্ড দিচ্ছিল, কিন্তু তার কানে আসছিল কেবলই তার নিজের লোকজনের মৃত্যুর আর্তনাদ।

হামলাকারীরা সাধারণ কোনো গ্যাংস্টার নয়। এরা জেনিনের দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষ ‘ড্রাগন লিউ’-এর ভাড়াটে কিলার গ্রুপ। তারা সংখ্যায় অন্তত চল্লিশজন। তারা একে একে জেনিনের গার্ডদের খতম করে দিচ্ছিল। ইউজি করিডোরের আড়াল থেকে গুলি চালিয়ে চার-পাঁচজনকে খতম করল ঠিকই, কিন্তু সে দেখল তারা ক্রমশ নোবারার রুমের দিকে এগোচ্ছে।

নোবারা তার ঘরে গিয়ে বাথরুমে ঢুকে দরজা লক করে দিল। তার হাতে একটি ছোট পিস্তল যা জেনিন তাকে আত্মরক্ষার জন্য দিয়েছিল, কিন্তু নোবারার হাত আজ এতটাই কাঁপছে যে সে ট্রিগার টানার সাহস পাচ্ছে না। বাথরুমের বাইরে সে শুনতে পাচ্ছিল ভারী বুটের শব্দ।

“কোথায় তুমি সুন্দরী? জেডের রানী কি আজ ইঁদুরের মতো গর্তে লুকিয়ে থাকবে?” এক কর্কশ কন্ঠস্বর ভেসে এল।

এটি জেনিনের আরেক শত্রু, নাম তার সাকলাইন। যে মস্কো তে জেনিনের হাতে একবার চরম মার খেয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ড ছেড়েছিল। আজ সে প্রতিশোধের নেশায় মত্ত। সাকলাইন নোবারার রুমের আসবাবপত্র ভাঙচুর করতে লাগল। তার হাসিতে এক পৈশাচিক লালসা ছিল। সে জানত জেনিনকে মারার চেয়ে তার স্ত্রীকে অপমান করা অনেক বড় প্রতিশোধ।

“দরজা খোলো সুন্দরী! আমি জানি তুমি ভেতরে আছো। জেনিন তো তার বাপে নিয়ে ব্যস্ত, সে আজ তোমাকে বাঁচাতে আসবে না। আজ রাতটা হবে আমাদের,” সাকলাইন অট্টহাসি দিয়ে উঠল।

ইউজি তখনো লড়াই করছিল সিঁড়ির কাছে। তার শরীরে দুটি বুলেটের ক্ষত, কিন্তু সে থামছে না। সে বুঝতে পারল সে নোবারার কাছে পৌঁছাতে পারবে না। সে তার রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে ভিলার পাওয়ার গ্রিড অফ করে দিল। পুরো ভিলা নিমেষেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে গেল। ইউজি আশা করেছিল এই অন্ধকারে সে শত্রুদের বিভ্রান্ত করতে পারবে।

কিন্তু সাকলাইনের দলের কাছে ছিল নাইট-ভিশন গগলস। তারা অন্ধকারেই নোবারার বাথরুমের দরজা লক্ষ্য করে গুলি চালাল। কাঠের দরজাটা ঝাঁঝরা হয়ে গেল। সাকলাইন সজোরে এক লাথি মারল দরজায়। দরজাটা ভেঙে মেঝেতে পড়ে গেল।

নোবারা কোণঠাসা হয়ে মেঝেতে বসে ছিল। সাকলাইন তাকে চুলের মুঠি ধরে হিড়হিড় করে টেনে ঘরের মাঝখানে নিয়ে এল।
“বাহ! জেড এর রুচি তো দারুণ!” সাকলাইন নোবারার মুখের ওপর তার নোংরা হাত বুলাল। নোবারা ঘৃণা আর ভয়ে চিৎকার করে উঠল। সে সাকলাইনের হাতে কামড় দিয়ে পালানোর চেষ্টা করল, কিন্তু সাকলাইন তাকে এক চড় মেরে মেঝেতে ফেলে দিল।

“এত তেজ ভালো না সুন্দরী। আজ জেড এর দম্ভ আমি ধুলোয় মিশিয়ে দেব। সবাই শোনো!” সাকলাইন তার দলের লোকদের দিকে তাকাল। “আজ এই মেয়েটিকে দিয়ে আমরা সেলিব্রেট করব। লেটস ইনজয়!”

সাকলাইনের দলের বাকি কিলাররা নোবারাকে ঘিরে ধরল। তাদের চোখেমুখে পশুত্বের ছাপ। নোবারার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো আর জেনিনের নাম ধরে সে বিড়বিড় করছিল, “জেনিন…. জেনিন…”

ইউজি করিডোর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে আসছিল নোবারার ঘরের দিকে। তার এক পা অকেজো হয়ে গেছে। সে দেখল সাকলাইন নোবারার শাড়ির আঁচল ধরে টান দিল। নোবারার আর্তনাদে পুরো ভিলা প্রকম্পিত হয়ে উঠল। ইউজি আর সহ্য করতে পারল না। সে শেষবারের মতো শক্তি সঞ্চয় করে ঘরের ভেতরে ঢুকে গুলি চালাতে লাগল।

কিন্তু সাকলাইনের লোকেরা তাকে দেখে ফেলল। “ওই তো সেই হ্যাকার ছোকরা! মার ওকে!”

ইউজির ওপর বৃষ্টির মতো গুলি চলল। সে রক্তাক্ত অবস্থায় দরজার কাছে পড়ে গেল। তার চোখের সামনেই সাকলাইন নোবারাকে বিছানায় ছুড়ে ফেলল। সাকলাইন তার বেল্ট খুলতে শুরু করল। তার দলের বাকিরা নোবারার হাত-পা চেপে ধরে হাসতে লাগল।

সাকলাইন নোবারার ওপর ঝুঁকে পড়ল। নোবারা চোখ বন্ধ করে ফেলল নিমিষেই। ঘৃণায় লজ্জায় সে বুঝতে পারল তার পৃথিবী শেষ হয়ে যাচ্ছে। সে তার মনের ভেতরে জেনিনের সেই শেষ চুম্বনের কথা ভাবল। সে চাইল সে যেন মারা যায় এই মুহূর্তেই। সাকলাইনের হাত যখন নোবারার শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে পৌঁছাতে চাইল, ঠিক তখনই ভিলার বাইরের নিস্তব্ধতা চিরে এক ভয়ংকর গর্জন শোনা গেল।

এটি কোনো বজ্রপাত নয়। এটি ছিল জেনিন নূরশাদের সেই এসইউভির ইঞ্জিনের শব্দ, যা ভিলার গেট চুরমার করে ভেতরে ঢুকে পড়েছে। জেনিন এসে গেছে।

গাড়ির হেডলাইটের তীব্র সাদা আলো অন্ধকারের বুক চিরে সরাসরি সাকলাইনের চোখে গিয়ে পড়ল। জেনিন গাড়ি থেকে নামল না, বরং স্টিয়ারিং হুইল থেকে হাত সরিয়ে সরাসরি তার কোলের ওপর রাখা এম-ফোর কারবাইনটি হাতে নিল। সে গাড়ির কাঁচ নামিয়ে সাকলাইনের দলের চারজন কিলারকে এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে মাথার খুলি উড়িয়ে দিল। গাড়ির গর্জন আর স্বয়ংক্রিয় রাইফেলের শব্দে পুরো ঘরটা এক নরক গুলজারে পরিণত হলো।

জেনিন যখন গাড়ি থেকে নামল, তার সারা শরীর তখন তার বাবার সেফ-হাউসে হওয়া যুদ্ধের রক্তে ভেজা। তার সাদা শার্টটা লালের এক বীভৎস মানচিত্রে পরিণত হয়েছে। তার চোখ দুটো আজ আর মানুষের নয়; সেখানে জ্বলছে দাবানলের মতো আগুন। সে দৌড়ে যখন নিজের ঘরে এসে দেখল সাকলাইন নোবারার ওপর ঝুঁকে আছে আর তার দলের হায়েনারা নোবারার হাত চেপে ধরে আছে, তখন জেনিনের মাথার ভেতরে শেষ যে মনুষ্যত্বটুকু ছিল, তাও পুড়ে ছাই হয়ে গেল।

“সাকলাইন!” জেনিনের কণ্ঠস্বর কোনো মানুষের চিৎকার নয়, এটি ছিল এক আদিম দানবের হাহাকার।

জেনিন দৌড়ে গিয়ে সাকলাইনের পিঠের ওপর এক ভয়ংকর লাথি মারল। সাকলাইন ছিটকে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার ওপর পড়ল। আয়নার কাঁচগুলো হিরের মতো চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে সাকলাইনের শরীরে বিঁধে গেল। সাকলাইনের দলের বাকিরা যখন জেনিনকে গুলি করতে উদ্যত হলো, জেনিন বিদ্যুৎগতিতে তার ট্যাকটিক্যাল নাইফ বের করে সামনের জনটির গলায় আমূল বসিয়ে দিল। রক্তের উষ্ণ ফোয়ারা জেনিনের মুখে ছিটকে এল, কিন্তু সে চোখের পলক ফেলল না।

জেনিন আজ কোনো গুলি খরচ করতে চাইল না। সে চাইল এই হায়েনাদের হাড় মড়মড় করে ভাঙার শব্দ শুনতে। সে দ্বিতীয় লোকটির হাত ধরে এক ঝটকায় হাড় থেকে আলাদা করে দিল। তার আর্তনাদ শেষ হওয়ার আগেই জেনিন তার মাথার খুলিটা দেয়ালের সাথে আছড়ে চূর্ণ করে দিল। মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে নোবারার ঘরের মেঝে লাশের স্তূপে ভরে গেল।

সাকলাইন তখন কাঁচের টুকরো নিয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। জেনিন ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে গেল। জেনিনের প্রতিটি পদক্ষেপের শব্দ সাকলাইনের কানে আজ মৃত্যুদূতের ঘণ্টার মতো বাজছে।
“জেড… প্লিজ… আমাকে ক্ষমা কর… আমি শুধু টাকার জন্য…” সাকলাইন গোঙাতে গোঙাতে বলল।

জেনিন সাকলাইনের চুলের মুঠি ধরে তাকে টেনে তুলে আনল। জেনিনের চোখের মণি তখন স্থির। “টাকা? তুই আমার জান এ হাত দিয়েছিস শু|য়োরের বাচ্চা। তুই ভেবেছিস আমি তোকে মেরে ফেলব? না… মৃত্যু তো তোর জন্য এক উপহার হবে। আমি তোকে এমন এক জাহান্নাম দেখাব, যা শয়তানও কল্পনা করতে পারে না।”

জেনিন সাকলাইনের একটা হাত মেঝেতে চেপে ধরল এবং তার ট্যাকটিক্যাল নাইফ দিয়ে সাকলাইনের আঙুলগুলো একটা একটা করে কেটে আলাদা করতে লাগল। সাকলাইনের আকাশ কাঁপানো আর্তনাদ নূরশাদ ভিলার প্রতিটি দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। নোবারা তখনো বিছানায় কুকড়ে পড়ে আছে, সে তার দুই কানে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে চিৎকার করছে। জেনিন আজ উন্মাদ।

“এই চোখ দিয়ে তুই আমার নোবারাকে দেখেছিস না?” জেনিন শীতল গলায় বলল। “আজ থেকে তোর পৃথিবী শুধুই অন্ধকার।” সে তৎক্ষণাৎ সাকলাইনের দুই চোখ সেই ট্যাকটিক্যাল নাইফ দিয়ে দিয়ে উপড়ে ফেলল! রক্তের ছিটে ফোঁটা পড়লো তার সারা শরীরে।

জেনিন সাকলাইনের চুলের মুঠি ধরে আধা-মৃত অবস্থায় জানলা দিয়ে নিচে ছুড়ে ফেলে দিল, যেখানে ইউজির পোষা অ্যালসেসিয়ান কুকুরগুলো ক্ষুধার্ত হয়ে অপেক্ষা করছিল। সাকলাইনের শেষ আর্তনাদটা রাতের বাতাসে মিলিয়ে গেল। পুরো রূমে আর কোনো ঘাতক নেই।

হত্যাকাণ্ড শেষ। ঘরে এখন নিস্তব্ধতা। জেনিন তার হাতের রক্তাক্ত ছুরিটা মেঝেতে ফেলে দিল। তার সারা শরীর কাঁপছে। অনেকদিন পর সে আবারো এই নৃশংসতা চালিয়েছে। তার গা গুলিয়ে আসছিল। সে ধীর পায়ে নোবারার বিছানার দিকে এগোল। নোবারা তখনো শাড়ির আঁচল জড়িয়ে বিছানার কোণে জড়োসড়ো হয়ে কাঁদছে। জেনিন তার কাছে গিয়ে তার হাতটা ধরতে চাইল।

“নূরা…” জেনিনের গলার সেই রুদ্রমূর্তি এখন নেই, আছে এক বুকফাটা হাহাকার।

কিন্তু জেনিন যখন নোবারার কাঁধে হাত রাখল, নোবারা আঁতকে উঠে পিছিয়ে গেল। সে জেনিনের রক্তের মাখামাখি রূপ দেখে ভয়ে চিৎকার করে উঠল। “না! আমাকে ছোঁবেন না।”

জেনিন স্তব্ধ হয়ে গেল। সে নিজের হাতের দিকে তাকালো। তার নখ থেকে তখনো সাকলাইনের রক্ত টপটপ করে পড়ছে। সে আজ নোবারাকে বাঁচিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সে নিজেও এক দানবে পরিণত হয়েছে।

জেনিন নোবারার থেকে সামান্য দূরে সরে মেঝেতে বসে পড়ল। পুরো ভুবন কে অবাক করে দিয়ে সে কেঁদে উঠল। যে জেনিন নূরশাদকে এই শহর যমদূত বলে জানে, সে আজ তার স্ত্রীর পায়ের কাছে বসে শিশুর মতো কাঁদছে! এই দৃশ্য বড়ই বিরল!

“আমি ক্ষমা চাইছি নূরা… আমি দেরি করে ফেলেছি… আমি আপনার মর্যাদা রক্ষা করতে পারিনি…” জেনিনের কান্নায় আজ এক অন্যরকম সুর। সে তার দুহাত মুখ ঢেকে ফেললো।

নোবারা টলতে টলতে এগিয়ে এল এবং জেনিনকে সামনে থেকে জড়িয়ে ধরল। নোবারার শাড়িতে জেনিনের গায়ের রক্ত লেগে গেল, কিন্তু আজ নোবারার তাতে কোনো ঘৃণা নেই।

জেনিন নোবারার স্পর্শ পেয়ে আরও ডুকরে কেঁদে উঠল। সে নোবারাকে নিজের বুকের মধ্যে এমনভাবে চেপে ধরল যেন সে কোনো এক অমূল্য হিরে, যা একবার হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল।

কিছুক্ষণ পর জেনিন নোবারাকে নিয়ে তার ওয়াশ রুমে গেল। সে নিজে হাতে নোবারার গায়ের রক্ত ধুয়ে দিল। নোনা জল আর রক্তের মিশেলে এক অদ্ভুত গন্ধ তৈরি হলো। জেনিন নোবারাকে গরম জলে গোসল করিয়ে তার সবচাইতে প্রিয় রেশমি শাড়িটা পরিয়ে দিল।

***ওদিকে ভিলার দেয়ালগুলো থেকে রক্তের দাগ মুছে ফেলা হয়েছে, চূর্ণবিচূর্ণ আসবাবপত্র সরিয়ে নতুন করে ঘর সাজিয়েছে ইউজির লোকাল ক্লিনিং টিম। কিন্তু বাতাসের ভারী বারুদের গন্ধ আর নোবারার আর্তনাদ কি অত সহজে মুছে যায়? জেনিন তখনো তার নূরাকে পরম মমতায় নিজের বুকের মাঝে আগলে রেখে বিছানায় শুয়ে ছিল।

বাইরে শ্রাবণের ঝোড়ো হাওয়া বইছে, জানালার কাঁচে বৃষ্টির শব্দগুলো যেন সহস্র নখের আঁচড় কাটছে। জেনিন নোবারার কপালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। তার আঙুলগুলো তখনো সামান্য কাঁপছে। জেনিন নূরশাদ, যাকে সারা শহর এক নিষ্ঠুর জল্লাদ হিসেবে চেনে, সে আজ এক অসহায় পাহারাদারের মতো নিজের প্রেয়সীর ঘুমের অপেক্ষা করছে। সে নোবারার কানের কাছে মুখ নিয়ে বিড়বিড় করে বলছে, “আমি আছি নূরা… আর কেউ আসবে না। কেউ আপনার ছায়াটাও স্পর্শ করতে পারবে না।”

নোবারা চোখ বন্ধ করে আছে ঠিকই, কিন্তু তার চোখের পাতাগুলো বারবার কেঁপে উঠছে। সে ঘুমানোর ভান করছে জেনিনকে আশ্বস্ত করার জন্য। কিন্তু তার মস্তিষ্কের ভেতরে তখনো সাকলাইনের পৈশাচিক হাসি আর ছিঁড়ে যাওয়া কাপড়ের শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। জেনিনের বুকের উষ্ণতা তাকে শান্তি দেওয়ার বদলে এক অদ্ভুত অপরাধবোধে দগ্ধ করছে। নোবারার মনে হচ্ছে, তার এই লাঞ্ছিত শরীরটা কি জেনিনের এই পবিত্র ভালোবাসার যোগ্য? জেনিন কেন তাকে ঘৃণা করছে না? কেন তাকে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে না?

রাত তখন তিনটে। জেনিন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। তার হাতটা শিথিল হয়ে নোবারার কোমরের ওপর রাখা। ঘরটা আবছা নীল আলোয় ডুবে আছে। হঠাৎ, জানালার বাইরে একটা গাছের ডাল বাতাসের তোড়ে কাঁচে সজোরে ধাক্কা দিল, ‘খটখট’।

সেই শব্দটা নোবারার কানে সাকলাইনের বুটের শব্দের মতো বিঁধল। নোবারার মনে হলো, ঘরের অন্ধকার কোণ থেকে কেউ একজন বেরিয়ে আসছে। সে অনুভব করল তার শরীরের ওপর কারোর নোংরা হাত কিলবিল করছে। তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। বাতাসের অক্সিজেন যেন হঠাৎ শেষ হয়ে গেল।

নোবারা হঠাৎ ছিটকে জেনিনের কোল থেকে দূরে সরে গেল। সে বিছানার এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে বড় বড় নিঃশ্বাস নিতে লাগল। তার সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। জেনিন চমকে জেগে উঠল। সে দেখল নোবারার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেছে, মণিগুলো স্থির। সে কাঁপছে, এক ভয়ংকর কম্পন, যা তার হাড়ের ভেতর থেকে আসছে।

“নূরা! কী হয়েছে? আমি এখানে!” জেনিন তাড়াতাড়ি নোবারার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।

কিন্তু জেনিনের হাত যখন নোবারার কাঁধ স্পর্শ করল, নোবারা এক আর্তনাদ করে উঠল। “না! আমাকে ধরবেন না! আমাকে ছেড়ে দিন! জেনিন… বাঁচান আমাকে! ওরা আমাকে মেরে ফেলছে!”

জেনিন স্তব্ধ হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল নোবারা এক তীব্র প্যানিক অ্যাটাক-এর শিকার হয়েছে। সে এখন বর্তমানে নেই, সে ফিরে গেছে সেই কয়েক ঘণ্টা আগের নরককুণ্ডে। নোবারার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে, ঠোঁট দুটো নীল হয়ে গেছে। সে জেনিনকে চিনতে পারছে না। তার কাছে এখন প্রতিটি স্পর্শই সাকলাইনের স্পর্শ।

“নূরা, আমার দিকে তাকান! আমি জেনিন! আপনার জেনিন!” জেনিন মরিয়া হয়ে উঠল।

নোবারা তার নিজের চুল টানছে, নখ দিয়ে নিজের হাত আঁচড়াচ্ছে। সে বিড়বিড় করছে, “আমি অপবিত্র… আমি নোংরা… জেনিনকে আমি কি বলবো?…”

জেনিনের বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। যে মেয়েটিকে সে পবিত্রতার প্রতীক বানিয়ে হৃদয়ে বসিয়ে রেখেছে, সে আজ নিজেকে ‘অপবিত্র’ ভাবছে। জেনিন নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। সে এক ঝটকায় নোবারাকে নিজের দুই বাহুর মাঝে জড়িয়ে ধরল। নোবারা হাত-পা ছুড়ছিল, জেনিনের বুকে কিল মারছিল, কিন্তু জেনিন তাকে ছাড়ল না। সে লোহার শিকলের মতো নোবারাকে আটকে ধরল।

“মারুন আমাকে নূরা! যদি রাগ হয় তবে আমাকে মারুন! কিন্তু নিজেকে কষ্ট দেবেন না!” জেনিন নোবারার কানের কাছে চিৎকার করে বলল। “আপনি অপবিত্র নন! আপনি আমার আকাশ, আপনি আমার অস্তিত্ব! আপনার শরীরে কোনো দাগ নেই নূরা, যা আছে তা কেবল আমার ভালোবাসার চিহ্ন।”

জেনিন নোবারার ঘাড়ে, কপালে, হাতে বারবার পাগলের মতো চুমু খেতে লাগল। সে তার গায়ের সেই রক্তাক্ত শার্টটা খুলে দূরে ছুড়ে ফেলে দিল। সে চাইল নোবারা যেন তার হৃদপিণ্ডের ধকধকানি শুনতে পায়। জেনিন নোবারার হাত দুটো নিজের গালের ওপর চেপে ধরল।

“অনুভব করুন নূরা! এটা আমি। এই যে আপনার জেনিন। আমি বেঁচে আছি আপনার জন্য। আপনি যদি নিজেকে এভাবে ভেঙে ফেলেন, তবে আমি এই পুরো শহরটাকে শ্মশান বানিয়ে দেব। প্লিজ নূরা… আমার দিকে একবার তাকান।”

নোবারার কম্পন ধীরে ধীরে কমতে শুরু করল। জেনিনের গলার সেই চেনা গাম্ভীর্য আর কান্নার মিশেল তাকে ধীরে ধীরে বর্তমানে ফিরিয়ে আনল। নোবারার দৃষ্টি স্বচ্ছ হতে লাগল। সে দেখল জেনিনের চোখ দিয়ে অবিরত জল পড়ছে। যে মানুষটি আজ দশজন কিলারকে একাই খতম করেছে, সে আজ তার সামনে এক পরাজিত সৈনিকের মতো বসে কাঁদছে।

নোবারা ধীরে ধীরে জেনিনের মুখটা নিজের দুই হাতের তালুতে নিল। জেনিন নোবারার হাতের তালুতে মুখ গুঁজে দিয়ে শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠল।

“আমার মনে হচ্ছিল আমি আর কোনোদিন আপনার চোখের দিকে তাকাতে পারব না।” বলতে গিয়েই নোবারা ঢুকরে কেঁদে উঠলো!

জেনিন নোবারাকে আবার জাপটে ধরল। সে নোবারাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তার ওপর নিজের চাদরটা টেনে দিল। জেনিন নোবারার শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি এমনভাবে আগলে রাখল যেন কোনো বাতাসও সেখানে ঢুকতে না পারে। জেনিন নোবারার চুলে বিলি কেটে দিতে লাগল।

“আমি আপনাকে কক্ষনো ছেড়ে যাব না নূরা। আপনি যা দেখেছেন, যা সয়েছেন, তা সব আমি আমার স্মৃতিতে নিয়ে নিলাম। আপনি আজ থেকে কেবল আমাদের সেই সুন্দর দিনগুলোর কথা ভাববেন। আমি আছি আপনার পাহারাদার হয়ে।”

নোবারা জেনিনের বুকের লোমশ অংশে নিজের মুখ লুকালো। জেনিনের গায়ের সেই পরিচিত পুরুষালী ঘ্রাণ আর তামাকের হালকা গন্ধ তাকে এক অমোঘ নিশ্চয়তা দিল। নোবারার ভারী হয়ে আসা চোখের পাতাগুলো এবার সত্যিই ঘুমে বুজে আসতে লাগল। জেনিন তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রইল, যেন এক মুহূর্তের জন্য আলগা করলেই নোবারা আবার সেই অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।

ভোর হওয়ার ঠিক আগে নোবারা শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল। জেনিন তখনো জাগা। সে জানালার বাইরে আকাশের সেই রক্তিম আভার দিকে তাকিয়ে রইল। জেনিন নূরশাদ আজ মনে মনে এক নতুন শপথ নিল। এই শহরের প্রতিটি কোণ থেকে সে সেই সব বিষাক্ত কীটপতঙ্গদের খুঁজে বের করবে যারা নোবারার এই শান্তির ঘুমের অন্তরায় হতে পারে।

<><><><><><><><><>

ভিলার ব্যক্তিগত অপারেশন থিয়েটারে এখন পিনপতন নিস্তব্ধতা। জেনিন নোবারাকে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে সরাসরি এখানে ছুটে এসেছে। তার পরনের শার্টে এখনো নোবারার চোখের জল আর শত্রুদের রক্তের দাগ লেগে আছে। কাঁচের দেয়ালের ওপাশে জেনিনের ব্যক্তিগত সার্জনরা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন ইউজিকে ফিরিয়ে আনতে। ইউজির শরীরে সাতটা বুলেটের ক্ষত, একটি কাঁধে, একটি পেটের বাঁ দিকে আর অন্যটি তার ডান পায়ে, এভাবে করে পুরো শরীরেই কেবল বুলেটের আঘাত। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তার শরীর এখন বরফের মতো সাদা হয়ে গেছে।

জেনিন দেয়ালের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে আজ এক অদ্ভুত শূন্যতা। ইউজি কেবল তার হ্যাকার বা বডিগার্ড নয়, ইউজি ছিল জেনিনের নিঃসঙ্গ রাজত্বের একমাত্র বিশ্বস্ত সাক্ষী। জেনিন ভাবছে, যদি আজ ইউজি না ফিরত, তবে নোবারার কী হতো? ইউজি নিজের বুক দিয়ে আগলে রেখেছিল জেনিনের স্বপ্নকে।

প্রায় চার ঘণ্টা পর অপারেশনের আলো নিভে গেল। প্রধান সার্জন বেরিয়ে এসে জেনিনকে আশ্বস্ত করলেন, “বস, বুলেটগুলো বের করা হয়েছে। ইউজি ইয়াং ছেলে। ওর বাঁচার অদম্য ইচ্ছা ওকে ফিরিয়ে এনেছে। তবে ওর অনেক বিশ্রামের প্রয়োজন।”

জেনিন ধীর পায়ে আইসিইউ-র ভেতরে ঢুকল। ইউজির সারা শরীরে ব্যান্ডেজ, নাকে অক্সিজেনের মাস্ক। জেনিন তার পাশে থাকা চেয়ারটায় বসল। জেনিনের মতো কঠিন হৃদয়ের মানুষ আজ ইউজির হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। ইউজি ধীরে ধীরে চোখ মেলল। আবছা আলোয় সে জেনিনকে দেখতে পেল। তার প্রথম কথাটিই ছিল—
“ম্যাম… ম্যাম কি ঠিক আছেন বস?” ইউজির কণ্ঠস্বর খুবই ক্ষীণ, যেন দূর থেকে আসা কোনো প্রতিধ্বনি।

জেনিন এক মুহূর্তের জন্য চুপ করে রইল। ইউজি নিজের জীবনের মায়া না করে আগে নোবারার খবর নিচ্ছে। জেনিনের চোখের কোণটা চিকচিক করে উঠল। সে ইউজির কপালে হাত রাখল।
“নোবারা ঠিক আছে ইউজি। তুমি শান্ত হও!”জেনিনের গলার স্বর ভারী হয়ে এল।

“আমাকে ক্ষমা করবেন বস, আমি ওদের আটকাতে পারিনি।”

জেনিন ইউজির হাতটা একটু জোরে চাপ দিল। “ক্ষমা নয় ইউজি, আজ থেকে জেনিন নূরশাদ তোমার কাছে ঋণী। এখন শুধু বিশ্রাম নাও। যারা তোমার এই অবস্থা করেছে, আমি তাদের বংশের প্রদীপ নিভিয়ে দিয়ে আসছি।”

জেনিন আইসিইউ থেকে বেরিয়ে কনট্রোল রুমে এল। ভিলার বাকি গার্ডরা যারা বেঁচে আছে, তারা জেনিনের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। জেনিনের চোখে এখন সেই বিধ্বংসী ‘জেড’ রূপটা ফিরে এসেছে। সে মনিটরের দিকে তাকাল, যেখানে ইউজির সাজানো ডাটাবেসগুলো এখনো জ্বলজ্বল করছে।

“শোনো সবাই,” জেনিন গর্জে উঠল। “ইউজি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত এই ভিলার সিকিউরিটি কমান্ড আমি নিজে নেব। আজ থেকে ‘ড্রাগন লিউ’ আর তার সব চ্যালাদের ওপর ওপেন হান্টিং শুরু হলো। কোনো ওয়ার্নিং নেই, শুধু ডেড বডি চাই।”

চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here