Soulmate_to_Enemy #পর্ব_৩৭

0
2

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৩৭
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

ভোরের আলোটা আজ নূরশাদ ভিলার জানালায় এসে লেগেছে ঠিকই, কিন্তু সেই আলোতে কোনো স্নিগ্ধতা নেই। ভিলার বাগানে তখনো জমাটবদ্ধ রক্তের কালচে দাগগুলো রোদে শুকিয়ে এক বীভৎস রূপ নিয়েছে। জেনিন নূরশাদ তার বিশাল স্টাডি রুমে বসে ছিল। সারা রাত সে এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বন্ধ করেনি। নোবারা এখন গভীর ঘুমে, কিন্তু জেনিনের ভেতরের রাক্ষসটা এখন জেগে উঠেছে। সে জানে, সাকলাইন কেবল একটা ঘুঁটি ছিল। এই হামলার পেছনে ছিল এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র।

হঠাৎ স্টাডি রুমের ভারী ওক কাঠের দরজাটা খুলে গেল। জেনিন ভ্রু কুঁচকে তাকালো। সে ভেবেছিল হয়তো কোনো গার্ড এসেছে, কিন্তু দরজায় যা দেখল তাতে সে স্তম্ভিত হয়ে গেল।

ইউজি দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে হাসপাতালের সেই হালকা নীল রঙের ঢিলেঢালা পোশাক, যার ওপর দিয়ে সাদা ব্যান্ডেজগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পেটের বাঁ দিকের ব্যান্ডেজটা লাল হয়ে উঠেছে, বোঝাই যাচ্ছে সে জোর করে বিছানা ছেড়ে উঠেছে এবং তার সেলাই ছিঁড়ে রক্ত বেরোচ্ছে। তার এক হাতে একটা স্যালাইনের স্ট্যান্ড, যেটা সে লাঠির মতো ব্যবহার করে নিজেকে ধরে রেখেছে। তার মুখটা ফ্যাকাশে, কপালে ঘামের বিন্দু, কিন্তু চোখে সেই একই পাগলামি, জেনিনের প্রতি আনুগত্য।

“ইউজি! তুমি এখানে কেন? তোমাকে না বলা হয়েছে বেড থেকে না উঠতে?” জেনিন দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ইউজির হাত ধরল। জেনিনের কণ্ঠে আজ ধমক নয়, এক গভীর উদ্বেগ ছিল।

ইউজি দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথার ঢেউটা সামলে নিল। সে জেনিনের চোখের দিকে তাকিয়ে খুব ক্ষীণ স্বরে বলল, “আপনি কি ভেবেছেন এই উদয় গালিব বিছানায় শুয়ে শুয়ে আপনার জন্য অপেক্ষা করবে যখন আপনি মরণের মুখে পা বাড়াচ্ছেন?”

জেনিন ইউজিকে ধরে সোফায় বসিয়ে দিল। “তোমার শরীর এখন ধকল সইবার মতো নয় ইউজি। তুমি জানো তোমার সাতটা বুলেট লেগেছে? ডাক্তার বলেছে আরও কয়েক ঘণ্টা দেরি হলে তোমাকে বাঁচানো যেত না।”

ইউজি এক পৈশাচিক হাসি হাসল। “বুলেট আমার শরীর ছিঁড়েছে বস, কিন্তু আমার জিদ নয়। ওরা ম্যামের ঘরে ঢুকেছিল, ওরা আমার যোগ্যতার উপর প্রশ্ন তুলেছে। এর উত্তর না দেওয়া পর্যন্ত আমার ক্ষত সারবে না। আপনি আমাকে বেডে ফেরত পাঠাবেন না প্লিজ। আমি লোকেশন বের করেছি।”

জেনিন এক মুহূর্ত স্থির হয়ে ইউজির দিকে তাকিয়ে থাকল। সে জানে ইউজিকে আটকানো অসম্ভব। এই ছেলেটার রক্তে বিষের বদলে জেনিনের প্রতি বিশ্বস্ততা বইছে। জেনিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের আলমারি থেকে একটি কালো রঙের ট্যাকটিক্যাল জ্যাকেট বের করল।

“ঠিক আছে ইউজি। তুমি যখন ঠিক করেই ফেলেছ, তখন তোমাকে আটকানোর সাধ্য আমার নেই।” জেনিন ইউজির কাঁধে হাত রেখে বলল, “বলো, কোথায় ওরা?”

ইউজি তার সাথে থাকা একটি ট্যাব বের করল। তার আঙুলগুলো কাঁপছে ঠিকই, কিন্তু কি-বোর্ডের ওপর তাদের গতি কমেনি। সে গত কয়েক ঘণ্টায় আইসিইউ-র বেডে শুয়েই ভিলার ব্যাকআপ সার্ভার হ্যাক করে সাকলাইনের ফোনের শেষ সিগন্যাল ট্র্যাক করেছে।

“বস, সাকলাইন মারা যাওয়ার ঠিক দশ মিনিট আগে একটি এনক্রিপ্টেড কল পেয়েছিল। কলটা এসেছিল বুড়িগঙ্গার তীরের এক পরিত্যক্ত ডকইয়ার্ড থেকে। আমি সেই লোকেশনের স্যাটেলাইট ইমেজ রিট্রিভ করেছি। ওখানে শুধু সাকলাইনের লোক নেই, ওখানে ‘ড্রাগন লিউ’-এর পুরো সিন্ডিকেট এখন জমায়েত হয়েছে। ওরা ভাবছে আপনি নোবারা ম্যামকে নিয়ে ব্যস্ত, আর ইউজি মৃত। তাই ওরা ওখানে আজ রাতে একটা সাকসেস পার্টি থ্রো করেছে।”

জেনিন স্ক্রিনের দিকে তাকালো। ডকইয়ার্ডের থার্মাল ইমেজে দেখা যাচ্ছে প্রায় পঞ্চাশ-ষাট জন সশস্ত্র লোক সেখানে পাহারায় আছে। জেনিনের ঠোঁটের কোণে এক নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠল।
“পার্টি? ওরা কি জানে না যে জেনিন নূরশাদ কারো খুশিতে জল ঢালতে ওস্তাদ?” জেনিন তার কোমরে রাখা সিলভার রঙের কোল্ট গানটি বের করে চেক করল। “ইউজি, তুমি নিশ্চিত তো যে তুমি এই অবস্থায় গাড়ি চালাতে পারবে? নাকি আমি অন্য কাউকে নেব?”

ইউজি এক ঝটকায় তার স্যালাইনের পাইপটা হাত থেকে ছিঁড়ে ফেলল। রক্তের একটা সরু ধারা তার হাত বেয়ে মেঝেতে পড়ল, কিন্তু সে সেদিকে লক্ষ্যই করল না। সে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল।
“আমি ড্রাইভ করব বস। আপনার পাশে বসার অধিকার শুধু আমার। যারা নূরশাদ ভিলার দেয়ালে একটা আঁচড় কেটেছে, তাদের কলিজা আমি আপনার সামনে এনে দেব।”

জেনিন মুগ্ধ হয়ে ইউজিকে দেখল। সে বুঝতে পারল, ইউজির প্রতিটি পদক্ষেপ এর মধ্যে যে ঘনিষ্ঠতা আছে, তা অন্য কারো সাথে নেই।

জেনিন এবং ইউজি ভিলার আন্ডারগ্রাউন্ড গ্যারেজে নামল। জেনিন আজ তার পরিচিত কোনো দামী গাড়ি নিল না। সে বেছে নিল একটি কালো রঙের বুলেটপ্রুফ জিপ, যার ভেতরে রাখা আছে অত্যাধুনিক সব মারণাস্ত্র। ইউজি ড্রাইভিং সিটে বসল। তার মুখটা যন্ত্রণায় নীল হয়ে গেছে, কিন্তু সে স্টিয়ারিং এমনভাবে ধরল যেন সে কোনো যুদ্ধের রথের সারথি।

“বস, যাওয়ার আগে কি ম্যামের সাথে একবার দেখা করবেন না?” ইউজি জিজ্ঞেস করল।

জেনিন জানালার বাইরে তাকালো। নোবারার সেই বিধ্বস্ত মুখটা তার মনে পড়ল। সে জানে, সে যদি এখন নোবারার সামনে যায়, তবে সে আর বের হতে পারবে না। ভালোবাসা তাকে দুর্বল করে দেয়, আর আজ জেনিনের প্রয়োজন তার সবচাইতে নিষ্ঠুর ‘জেড’ রূপটা।

“না ইউজি। নূরা ঘুমোচ্ছে। ওর ঘুম যেন না ভাঙে। আমি চাই না ও জানুক যে আমি আবার রক্ত ঝরাতে যাচ্ছি। ও যখন জাগবে, আমি চাই এই শহরটা যেন একটু বেশি পরিষ্কার থাকে।”

গাড়িটা গর্জন করে ভিলার গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। জেনিনের পেছনে আরও দুটি কালো এসইউভি ছিল জেনিনের এলিট শ্যুটারদের নিয়ে। কিন্তু জেনিন আর ইউজি ছিল সবার আগে। রাস্তার কুয়াশা চিরে জিপটা যখন বুড়িগঙ্গার দিকে ছুটছে, জেনিন তখন তার হাতের গ্লাভসগুলো পরছিল।
“ইউজি, তোমার পেটে ব্যথা করছে?” জেনিন হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

ইউজি একটু হাসল। “বস, যখন আপনার পাশে থাকি, তখন সামান্য ব্যথা আমাকে থামাতে পারবে না।”

“তুমি বড় বেশি কথা বলো ইউজি,” জেনিন মৃদু হাসল, কিন্তু তার চোখে তখন মৃত্যুর পরোয়ানা। “আজ আমি চাই না কেউ জ্যান্ত থাকুক। ড্রাগন লিউকে আমি নিজে শেষ করব। ওর ওই আঙুলগুলো আমি স্যুভেনিয়ার হিসেবে সাথে নিয়ে আসব, যেগুলো দিয়ে ও আমার নোবারার ওপর হামলার অর্ডার দিয়েছিল।”

***শহর পেরিয়ে যখন তারা নদীর তীরের সেই নির্জন ডকইয়ার্ডে পৌঁছালো, তখন সূর্য পুরোপুরি ওঠেনি। আকাশটা এক রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে, যেন প্রকৃতিও বুঝতে পেরেছে আজ প্রচুর রক্ত ঝরবে। ডকইয়ার্ডের চারদিকে মরচে ধরা জাহাজের কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে। মাঝখানে একটি বিশাল গুদামঘর, যেখান থেকে উচ্চস্বরে মিউজিক আর মানুষের হাসির শব্দ আসছে।

ইউজি গাড়িটা এক ঝোপের আড়ালে পার্ক করল। সে তার ট্যাব বের করে গুদামঘরের সিকিউরিটি অ্যালার্ম আর জ্যামারগুলো ডিসেবল করে দিল। “বস, ওদের মেইন গেটের সেন্সর অফ করে দিয়েছি। এখন ওরা অন্ধ। আপনি ভেতরে ঢুকলে ওরা টের পাবে না যতক্ষণ না আপনি প্রথম গুলিটা চালাবেন।”

জেনিন গাড়ি থেকে নামল। তার হাতে তখন এক জোড়া অত্যাধুনিক সাব-মেশিনগান। সে ইউজির দিকে তাকালো। ইউজিও তার সিট থেকে নামল, যদিও তার পা একটু টলছিল।
“ইউজি, তুমি গাড়িতে থাকো। ব্যাকআপ দাও। আমি ভেতরে যাচ্ছি,” জেনিন আদেশ দিল।

“না বস! আপনি জানেন আমি আপনার পেছনে থাকব,” ইউজি জেদ ধরল। “আমি ড্রোন ওড়াব। আপনি ভেতরে যেদিকে যাবেন, আমার ড্রোন আপনাকে গাইড করবে। কেউ আপনার পেছন থেকে অ্যাটাক করতে পারবে না।”

জেনিন আর কথা বাড়াল না। সে জানে ইউজিকে আটকানো মানে সময় নষ্ট করা। জেনিন তার শ্যুটারদের ইশারা দিল গুদামঘর ঘিরে ফেলার জন্য। তারপর সে নিজে একাই প্রধান দরজার দিকে এগোল। জেনিন নূরশাদ আজ কোনো মুখোশ পরেনি। সে আজ সরাসরি জেনিন হয়েই মৃত্যু নিয়ে এসেছে।

সে যখন গুদামের ভেতরে পা রাখল, দেখল প্রায় বিশ-ত্রিশ জন লোক মদ আর অস্ত্র নিয়ে উৎসব করছে। মাঝখানে সোফায় বসে আছে ড্রাগন লিউ—এক কুখ্যাত চীনা মাফিয়া ব্রোকার।

জেনিন সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে এক রাউন্ড গুলি চালাল। মুহূর্তের মধ্যে সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মিউজিক বন্ধ হয়ে গেল। সবাই বিস্ময়ে আর আতঙ্কে দরজার দিকে তাকালো। ধোঁয়ার আড়াল থেকে জেনিন নূরশাদ ধীর পায়ে হেঁটে আসছে। তার জ্যাকেটে নূরশাদ ভিলার রক্তের দাগ তখনো শুকায়নি।

“উৎসব কি শেষ হয়ে গেল ড্রাগন?” জেনিন খুব শান্ত গলায় বলল, কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা ডকইয়ার্ডের বাতাসের চেয়েও শীতল।

ড্রাগন লিউ তার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। তার হাতে একটা পিস্তল। “জেনিন নূরশাদ! তুমি বেঁচে আছো? সাকলাইন তো বলল…”

“সাকলাইন এখন কুকুরদের খাবার হচ্ছে,” জেনিন এক পা এগিয়ে এল। “আর এবার তোর পালা!”

“মারো একে! এখনই শেষ করো!” লিউ চিৎকার করে উঠল।

ইউজি বাইরে থেকে ড্রোন কন্ট্রোল করছিল। ড্রোনের লেজার গাইডেন্স জেনিনকে বলে দিচ্ছিল শত্রুরা কোথায় লুকিয়ে আছে। জেনিন এক গুদামঘরের মাঝখান দিয়ে হাঁটছে আর তার হাতের মেশিনগান থেকে আগুনের ফুলকি বেরোচ্ছে। প্রতিটি গুলি নিখুঁতভাবে শত্রুদের মাথায় গিয়ে বিঁধছে। জেনিন আজ কোনো দয়া দেখাচ্ছে না। সে প্রতিটি লাশের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।

ইউজি ট্যাবে দেখছে জেনিনের প্রতিটি মুভমেন্ট। সে মুগ্ধ হয়ে দেখছে জেনিন যখন কাউকেও মারছে, তখন তার চোখে কোনো উত্তেজনা নেই, আছে কেবল এক ভয়াবহ ক্লান্তি আর ঘৃণা। ইউজি ভাবল, “আপনিই সেরা বস। এই দুনিয়া আপনার যোগ্য নয়।”

হঠাৎ একজন কিলার জেনিনের পেছনে আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। জেনিন তাকে দেখেনি। ইউজি চিৎকার করে উঠল ইন্টারকমে, “বস! আপনার ছয়টার দিকে! নিচু হোন!”

জেনিন সাথে সাথে মেঝেতে ডাইভ দিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই ড্রোনের নিচ থেকে একটি ছোট গ্রেনেড ড্রপ করল ইউজি। বিস্ফোরণে সেই কিলারটি ছিঁড়ে টুকরো হয়ে গেল।

জেনিন মেঝে থেকে উঠে ইউজির ড্রোনের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। “ধন্যবাদ ইউজি। এবার ড্রাগন লিউকে আমার জন্য ছেড়ে দাও।”

জেনিন লিউয়ের দিকে এগিয়ে গেল। লিউ তখন ভয়ে কোণঠাসা হয়ে জাহাজের একটা মরচে ধরা কন্টেইনারের পেছনে লুকিয়ে আছে। জেনিন তার মেশিনগানটা ফেলে দিয়ে নিজের ট্যাকটিক্যাল নাইফটা বের করল।

“গুলির শব্দ বড্ড একঘেয়ে, লিউ। আমি চাই তুই অনুভব করিস তোর মৃত্যুটা কেমন হবে,” জেনিন লিউয়ের কলার ধরে তাকে বাইরে টেনে আনল।
লিউ তখন হাউমাউ করে কাঁদছে। “জেনিন, আমি তোমাকে টাকা দেব… অনেক টাকা… আমাকে ছেড়ে দাও!”

জেনিন লিউয়ের কানে ফিসফিস করে বলল, “টাকা দিয়ে তুই আমার নোবারার হাসি দিতে পারবে? পারবে ওর ভয়টা মুছতে?” জেনিন লিউয়ের একটা কান এক ঝটকায় কেটে ফেলল।

ডকইয়ার্ডের আকাশ তখন চিৎকারে ভরে গেছে। জেনিন আজ এক নির্মম শিল্পীর মতো লিউয়ের শরীরে আঘাত করতে লাগল। প্রতিটি আঘাত ছিল নোবারার অপমানের প্রতিশোধ। জেনিন যখন কাজ শেষ করল, তখন লিউ আর মানুষ ছিল না, ছিল এক রক্তাক্ত মাংসপিণ্ড।

ইউজি গাড়ি থেকে নেমে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে ভেতরে ঢুকল। সে দেখল জেনিন তার হাতের রক্তগুলো রুমালে মুছছে। জেনিন ইউজির দিকে তাকালো। ইউজি যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল, তার সেলাই থেকে রক্ত চুইয়ে পড়ছে।

“কাজ শেষ ইউজি। চলো, নূরশাদ ভিলায় ফিরে যাই,” জেনিন ইউজির কাঁধে হাত রাখল। “তুমি আজ আবার আমার প্রাণ বাঁচালে।

জেনিন আর ইউজি যখন ডকইয়ার্ড থেকে বেরোচ্ছে, তখন পেছনে গুদামঘরটায় আগুন লেগেছে। লেলিহান শিখাগুলো আকাশের রক্তিম আলোর সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। জেনিন নূরশাদ আজ তার সাম্রাজ্যকে আবার রক্ত দিয়ে ধুয়ে নিলো। সে জানে, এই শহর এখন আবার শান্ত হবে। কারণ জেনিন নূরশাদ ফিরে এসেছে।

গাড়িতে ওঠার সময় জেনিন ইউজিকে ড্রাইভিং সিটে বসতে দিল না। “এখন আমি ড্রাইভ করব। তুমি ঘুমাও ইউজি। তোমার বিশ্রাম দরকার।”

গাড়ির ভেতরে এসি চলছে ঠিকই, কিন্তু জেনিনের গায়ের থেকে আসা বারুদ আর রক্তের গন্ধ সেই কৃত্রিম শীতলতাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। ইউজি পেছনের সিটে আধশোয়া হয়ে আছে। তার ফ্যাকাশে ঠোঁট আর কপালে জমে থাকা ঘাম জেনিনকে বারবার চিন্তিত করছে। জেনিন স্টিয়ারিং ধরে আছে এক প্রবল শক্তিতে, যেন সে জীবনের সাথে পাল্লা দিয়ে ভিলার দিকে ছুটছে।

গাড়ি যখন নূরশাদ ভিলার প্রধান ফটকে এসে পৌঁছাল, তখন সকাল আটটা। ভিলার গার্ডরা দ্রুত গেট খুলে দিল। জেনিন গাড়ি থামিয়েই পেছনের দরজা খুলল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে ইউজি তখন প্রায় জ্ঞান হারানোর পথে। তার সাদা ব্যান্ডেজটা এখন পুরোপুরি লাল হয়ে গেছে। জেনিন ইউজিকে সজোরে কোলে তুলে নিল।
“ইউজি! চোখ খোলো! আমরা পৌঁছে গেছি!” জেনিন চিৎকার করে উঠল।

মেডিক্যাল টিমের লোকজন স্ট্রেচার নিয়ে দৌড়ে এল। জেনিন ইউজিকে তাদের হাতে সঁপে দিয়ে শান্ত হতে পারল না। সে ইউজির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “তুমি বেঁচে থাকবে ইউজি। এটা তোমার বসের অর্ডার।”

ইউজিকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়ার পর জেনিন সিঁড়ির কাছে এসে থমকে দাঁড়াল। তার নিজের শরীরের অবস্থা করুণ। রক্তমাখা শার্ট, হাতে কালচে দাগ, আর চোখে এক আদিম ক্লান্তি। সে জানে নোবারা এখন জেগে আছে। সে কি এই অবস্থায় নোবারার সামনে যাবে? কিন্তু নোবারাকে এক মুহূর্ত না দেখে সে শান্তি পাচ্ছে না।

জেনিন ধীর পায়ে দোতলায় নোবারার ঘরের দিকে এগোল। ঘরের দরজাটা আধখোলা ছিল। জেনিন ভেতরে ঢুকে দেখল নোবারা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে বাইরে বাগানটার দিকে তাকিয়ে আছে। বাগানে এখনো ফরেনসিক টিম কাজ করছে, রক্তের দাগগুলো পরিষ্কার করা হচ্ছে। নোবারা সেই দৃশ্যটা দেখছিল।

“নূরা…” জেনিন খুব মৃদু স্বরে ডাকল।
নোবারা চমকে পেছনে ফিরল। জেনিনকে দেখেই তার চোখ দুটো আতঙ্কে বড় বড় হয়ে গেল। নোবারা এক পা পিছিয়ে গেল। জেনিনের সারা শরীরে লেগে থাকা রক্ত নোবারার কালকের রাতের সেই ক্ষতকে আবার তাজা করে তুলল। নোবারার মনে হলো জেনিন কোনো মানুষ নয়, সে এক জমাটবদ্ধ ধ্বংসলীলা।

“আপনি… আপনি আবার কোথায় গিয়েছিলেন?” নোবারার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল।

জেনিন নিজের হাতের দিকে তাকাল। সে বুঝতে পারল সে ভুল করেছে। “আমি… আমি শুধু আমাদের শত্রুদের শেষ করতে গিয়েছিলাম নূরা। ওরা আপনার ক্ষতি করতে চেয়েছিল। আমি ওদের আর কোনোদিন ফিরে আসতে দেব না।”

নোবারা হঠাৎ চিৎকার করে উঠল। তার চোখ দিয়ে জল পড়ছে। “শত্রু কারা জেনিন? যারা আপনার ওপর হামলা করেছে তারা, নাকি আপনি নিজে? আপনি যখন এভাবে রক্ত মেখে আমার সামনে দাঁড়ান, তখন আমার আপনাকে দেখে ভয় লাগে! আমি যে জেনিনকে ভালোবাসতাম, সে কি এই কিলার ছিল?”

জেনিন স্তব্ধ হয়ে গেল। সে নোবারার দিকে এক পা এগিয়ে গেল। “আমি আপনাকে বাঁচানোর জন্যই তো এই ‘জেড’ হয়েছি নূরা। আমি যদি নরম হতাম, তবে ওরা আপনাকে আজ আমার কাছ থেকে কেড়ে নিত। আপনি কি চান না আমি প্রতিশোধ নেই?”

“প্রতিশোধের কোনো শেষ নেই জেনিন!” নোবারা মেঝেতে বসে পড়ল। “আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না? আপনি শহর পরিষ্কার করছেন ঠিকই, কিন্তু আমাদের জীবনটাকে এক শ্মশান বানিয়ে ফেলছেন। আমি এই রক্ত আর নিতে পারছি না। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে এই ভিলাতে।”

জেনিন কোনো উত্তর দিল না। সে নোবারাকে জড়িয়ে ধরতে চাইল, কিন্তু নোবারা হাত সরিয়ে নিল। জেনিন বুঝতে পারল, সে যত বেশি রক্ত ঝরাবে, নোবারা তার থেকে তত দূরে চলে যাবে। জেনিন নূরশাদ আজ তার নিজের সিংহাসনের ওপর একাই দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ভালোবাসা আছে কিন্তু কোনো আশ্রয় নেই। নোবারা তাকে পাত্তা না দিয়েই হনহন করে রুমে চলে গেল।

এদিকে ইউজির অবস্থা আবার খারাপ হতে শুরু করেছে। ডকইয়ার্ডে ধকল সহ্য করার কারণে তার সেলাইগুলো পুরোপুরি ফেটে গিয়েছিল এবং ইন্টারনাল ব্লিডিং শুরু হয়েছে। জেনিন আইসিইউ-র বাইরে কাঁচের ওপাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল ইউজিকে। ইউজির মুখে তখনো সেই অক্সিজেনের মাস্ক।

জেনিন ভাবল, তার জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দুজন মানুষ আজ তার থেকে দূরে। নোবারা তাকে দেখে ভয় পাচ্ছে, আর ইউজি মৃত্যুর সাথে লড়ছে। জেনিন তার হাতের মুঠি শক্ত করল।

“ইউজি, তোমাকে ফিরতেই হবে,” জেনিন বিড়বিড় করল। “আমি একা এই যুদ্ধ সামলাতে পারব না।”

এরপর জেনিন খুব ধীর পায়ে নোবারার ঘরের দিকে এগোল। যাওয়ার পথে ফুলদানি থেকে হাতে নিল এক তোড়া তাজা সাদা গোলাপ। নোবারা এই ফুলগুলো খুব পছন্দ করে। জেনিন দরজার কাছে গিয়ে দেখল নোবারা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে একটা হালকা ল্যাভেন্ডার রঙের শাড়ি, চুলগুলো পিঠের ওপর ছাড়া। নোবারাকে দেখে মনে হচ্ছে সে কোনো বিষাদ-পাথর, যে তার সমস্ত বেদনা নিয়ে একাই দাঁড়িয়ে আছে এই বিশাল সাম্রাজ্যের মাঝে।

জেনিন শব্দ না করে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। নোবারা ফিরে তাকাল না। সে জানে এই পায়ের শব্দ কার। সে জানে এই নিস্তব্ধতার মানে কী।
“নূরা…” জেনিন খুব মৃদু স্বরে ডাকল।

নোবারা এবার ধীরে ধীরে ফিরল। তার চোখের নিচে কালি জমেছে, মুখটা ফ্যাকাশে। জেনিনের হাতে সাদা গোলাপগুলো দেখে নোবারার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটে উঠল, কিন্তু তা চোখের গভীরে পৌঁছাল না।

জেনিন এক পা এগিয়ে এল। সে ফুলের তোড়াটা পাশের টেবিলে রেখে নোবারার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল। জেনিনের হাত এখন পরিষ্কার, কোনো রক্তের দাগ নেই, কিন্তু নোবারার মনে হলো সেই হাতের উষ্ণতায় এখনো আগুনের আঁচ রয়ে গেছে।

নোবারা হাতটা ছাড়িয়ে নিল না, বরং জেনিনের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। “আমি আপনার উপর রেগে থাকতে পারি না কেন? আপনার চোখ দুটোতে কি আছে? আমার সমস্ত রাগ অভিমান এর ধ্বংস!”

ক্ষণিক থেমে নোবারা আবারো বললো,
“আপনি কি জানেন না যে আপনার এই নিরাপত্তার দেয়ালগুলো আমাকে মাঝে মাঝে দমবন্ধ করে ফেলে? জেনিন, আপনি কি পারবেন আমাকে সেই পুরোনো জেনিনকে ফিরিয়ে দিতে? যে জেনিন আমার সাথে খেলতো, দৌড়াদৌড়ি করতো, যে জেনিন বটতলায় বসে আমার অংক বুঝিয়ে দিত?”

জেনিনের বুকে এক তীব্র চিনচিনে ব্যথা অনুভব হলো। সে জানে সেই কিশোর জেনিন অনেক আগেই মারা গেছে। লন্ডনের নির্বাসন আর ক্ষমতার এই সিংহাসন তাকে এক দানবে পরিণত করেছে। সে চাইলেও আর পেছনে ফিরতে পারবে না।

“সেই জেনিন হয়তো হারিয়ে গেছে নূরা,” জেনিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল। “কিন্তু সেই জেনিনের ভেতরে নোবারার জন্য যে ভালোবাসা ছিল, তা আজও অটুট।”

নোবারা হঠাৎ জেনিনের বুকের ওপর মাথা রাখল। সে শুনতে পাচ্ছে জেনিনের হৃদপিণ্ডের দ্রুত স্পন্দন। এই মানুষটি পুরো শহরকে শাসন করে, কিন্তু এই এক ইঞ্চি জায়গার কাছে সে কতটা অসহায়। নোবারা অনুভব করল জেনিনের হাত দুটো তাকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরছে।
“আপনি খুব স্বার্থপর জেনিন,” নোবারা বিড়বিড় করে বলল। “আপনি আমাকে ভালো রাখার নামে নিজেকে পুড়িয়ে শেষ করে ফেলছেন। আমার ভ। হয়, আপনার এই ‘জেড’ রূপটা একদিন আমাদের সবকিছু কেড়ে নেবে।”

জেনিন নোবারার চুলে আলতো করে চুম্বন করল। “এটাই আমাদের নিয়তি নূরা। আপনি শুধু আমার সাথে থাকুন। এই পৃথিবীর সমস্ত ঝোড়ো হাওয়া আমি একাই রুখে দেব।”

জেনিন নোবারাকে কোলে তুলে নিয়ে ঘরের বিছানায় বসাল। সে নিজে মেঝেতে নোবারার পায়ের কাছে বসল। জেনিন আজ কোনো ডন নয়, সে আজ এক প্রেমিক।

“আপনি জানেন নূরা?” জেনিন খুব আবেগী কণ্ঠে বলল। “আমি যখন প্রথমবার কাউকে মারতে হাত তুলেছিলাম, তখন আমার কানে আপনার সেই হাসির শব্দ বেজেছিল। আমি চেয়েছিলাম সেই হাসিটা চিরস্থায়ী করতে। আমার অপরাধ কেবল এই যে, আমি আপনাকে বড্ড বেশি ভালোবাসি।”

নোবারা জেনিনের মুখটা নিজের দুই হাতের মধ্যে তুলে নিল। সে দেখল জেনিনের চোখের কোণে এক ফোঁটা জল। জেনিন কাঁদছে, এই দৃশ্যটি পৃথিবীর আর কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। নোবারা জেনিনের কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল।

“আপনার এই ভালোবাসা আমার কাছে এক অভিশাপ আবার এক পরম আশীর্বাদ। আপনি অপরাধী হোন বা যাই হোন, আপনি তো কেবল আমারই। কিন্তু কথা দিন, আর কোনো রক্ত নয়। আর কোনো মৃত্যু নয়। এসব আমার সহ্য হয়না!”

জেনিন কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু নোবারার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। সে জানে এই কথা সে রাখতে পারবে না। কারণ জেনিন নূরশাদের রাজত্বে শত্রু কখনো শেষ হয় না। কিন্তু এই মুহূর্তে, এই শান্ত সকালে সে নোবারাকে কোনো মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে কষ্ট দিতে চাইল না।

নোবারা জেনিনের চুলের ভাজে বিলি কেটে দিতে দিতে হঠাৎ খুব মায়াবী চোখে তার দিকে তাকাল। জেনিনের চোখের ওই বিষাদ আজ নোবারাকে সাহস জোগাচ্ছে। সে জেনিনের চিবুকটা সামান্য উঁচিয়ে ধরে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা জেনিন, আপনি আমাকে ঠিক কবে থেকে এত ভালোবাসেন? মানে, এই পাগলামিটা শুরু হলো কবে থেকে?”

জেনিন একটু হাসল। সেই হাসিতে কোনো দম্ভ নেই, কেবল হাজার দিনের পুরনো এক স্মৃতি ভেসে উঠল। সে নোবারার দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে একটু ধরা গলায় বলল, “পাগলামি? এটা তো শুরু হয়েছিল সেই তখন, যখন আমরা জীবনের মানেই বুঝতাম না। সেন্ট জুড স্কুলের করিডোর, ক্লাসরুম, সেই মাঠটা, সব আজও আমার চোখের সামনে ভাসে।”

জেনিন নোবারার চোখের গভীরে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে যেন গানের সুরে স্মৃতি রোমন্থন করতে লাগল:
“Class-এর ফাঁকে তোমায় দেখে
প্রথম প্রেমে পড়া…
তোমায় দেখে ভালো-লাগা
তোমায় ঘিরে সব চাওয়া!”
“তুমি দূর থেকে কেন হাসো?
আড়াল থেকে আমায় কাছে ডাকো…”

জেনিনের কণ্ঠে আজ কোনো মাফিয়া ডনের কঠোরতা নেই, আছে সেই কিশোর জেনিনের আকুতি। সে নোবারার হাতের তালুতে একটি দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিয়ে বলল, “আমি সেদিনও আপনার ছায়া হয়ে ঘুরতাম, আজও ঘুরি। ওই যে দশম শ্রেণিতে শুরু হয়েছিল প্রেমের পড়া, আজও আমি সেই ক্লাসের ছাত্র হয়েই রয়ে গেলাম নূরা। আপনার ভালোবাসার পাঠশালা থেকে আমার আর কোনোদিন ছুটি হলো না।”

নোবারার চোখের জল আর বাধা মানল না। সে বুঝতে পারল, জেনিন নূরশাদ একদিনে ‘জেড’ হয়ে ওঠেনি। তার এই পাহাড়সম ভালোবাসার ভিত গড়া হয়েছিল সেই কৈশোরের অমলিন দিনগুলোতে। জেনিন তাকে শুধু প্রেয়সী বানায়নি, তাকে নিজের অস্তিত্বের প্রথম আর শেষ পাঠ বানিয়ে নিয়েছে। সে জেনিনের বুকে মাথা রেখে ভাবল, যে মানুষটি পনেরো বছর ধরে একটি হাসির শব্দ বুকে বয়ে বেড়াতে পারে, সে মানুষটি সত্যিই পৃথিবীর আর সবার চেয়ে আলাদা। সে ঠিক করলো, আর কখনো এই মানুষটি কে নিয়ে অভিযোগ করবে না। এবার থেকে সে কেবল নোবারা নুরশাদ হয়েই বাকি জীবনটা এভাবেই জেনিনের বুকে কাটিয়ে দিবে।

কিন্তু তাদের ভাগ্য কি আসলেই সুপ্রসন্ন হবে?

চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here