#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৩৮
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
নুরশাদ ভিলার স্টাডি রুম। জেনিন নূরশাদ তার বিশাল মেহগনি টেবিলের পেছনে বসে আছে। তার সামনে রাখা এক গ্লাস কড়া ব্ল্যাক কফি, যা এখন বরফ শীতল হয়ে গেছে। জেনিনের চোখের নিচে হালকা কালচে দাগ, যা তার বিনিদ্র রজনীর সাক্ষী। কিন্তু তার চিবুক এবং চোয়ালের দৃঢ়তা বলছে, সে ভেঙে পড়ার পাত্র নয়।
জেনিন তার ডায়েরিটা খুলল। গত রাতের রক্তাক্ত কারবারের পর আজ তার প্রতিটি পদক্ষেপ হতে হবে অত্যন্ত মাপা। সে জানে নানামি তাকে ছেড়ে দিলেও পুলিশের নজরদারি কমবে না। ড্রাগন লিউ এবং সাকলাইনের পতন এই শহরের অপরাধ জগতে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে। আর যখনই কোনো বনে বাঘ মারা যায়, তখন শেয়াল আর হায়েনারা গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে সেই রাজত্ব দখল করতে। জেনিন তা হতে দিতে পারে না। তার শত্রুর পরিমাণ আর বাড়তে দেওয়া যাবেনা।
ঠিক তখনই ইউজির পাঠানো একটি সিগন্যাল জেনিনের ল্যাপটপে বেজে উঠল। জেনিন দ্রুত কানে ব্লুটুথ হেডসেটটা গুঁজে দিল।
“ইউজি?” জেনিনের গলায় আতঙ্ক!
“বস…” ওপাশ থেকে ইউজির কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হলেও তাতে এক ধরণের তেজ আছে। “আমি আইসিইউ-র নার্সকে ঘুষ দিয়ে আমার ট্যাব আনিয়ে নিয়েছি। আপনি কি ভেবেছিলেন আমি শুধু সিলিং ফ্যান গুনে সময় কাটাব?”
জেনিন একটু হাসল। এই তো তার ইউজি। “আমি জানি তুমি বিশ্রাম নিতে চাও না, কিন্তু তোমার শরীরটা আগে ঠিক হওয়া দরকার।”
“শরীরের চেয়ে আপনার সাম্রাজ্য বেশি জরুরি বস,” ইউজি দ্রুত টাইপিং-এর শব্দ শোনাচ্ছিল। “আমি গত এক ঘণ্টায় ডার্ক ওয়েবের তিনটে বড় ফোরামে ঢুকেছিলাম। ড্রাগন লিউয়ের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়েছে। থাইল্যান্ড আর মায়ানমারের গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের সিন্ডিকেটগুলো নড়েচড়ে বসেছে। ওরা ভাবছে আপনি এখন দুর্বল।”
জেনিনের চোখে এক হিংস্র বিদ্যুৎ খেলে গেল। সে তার চুরুটটা ধরালো। “ওরা ভুল ভাবছে। ওরা জানে না যে জেড যখন আঘাত পায়, তখন সে আরও বেশি ভয়ংকর হয়ে ওঠে। ড্রাগন লিউ তো কেবল একটা শুরু ছিল। আমি চাই না এই শহরে আর কোনো দ্বিতীয় সিন্ডিকেট মাথা চাড়া দিয়ে উঠুক। যারা আমার ভিলার দিকে নজর দেবে, তাদের বংশ আমি উপড়ে ফেলব।”
ইউজি ওপাশ থেকে জানালো, সে ভিলার সিকিউরিটি অ্যালগরিদম পুরোপুরি চেঞ্জ করে দিয়েছে। “বস, আমি এবার ‘প্রজেক্ট আইজিস’ অ্যাক্টিভেট করেছি। এখন থেকে ভিলার পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে যেকোনো অপরিচিত সিগন্যাল বা আন-অথরাইজড ড্রোন প্রবেশ করলেই আমার সার্ভার তা অটোমেটিক জ্যাম করে দেবে। আর নূরশাদ ভিলার নিচে যে ল্যাবটা আছে, ওটার পাওয়ার সাপ্লাই আমি মেইন গ্রিড থেকে আলাদা করে দিয়েছি। কেউ হ্যাক করতে পারবে না।”
“চমৎকার ইউজি,” জেনিন ধোঁয়া ছেড়ে বলল। “তুমি কি ড্রাগন লিউয়ের কোন গোপন সুইস অ্যাকাউন্টের হদিস পেয়েছ?”
“পেয়েছি বস। লিউয়ের প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের একটা অফশোর অ্যাকাউন্ট আছে যা সে তার ভবিষ্যৎ এর জন্য হোল্ড করছিল। আমি সেই টাকাগুলো এখন ‘শ্যাডো অ্যাকাউন্টস’-এ ডাইভার্ট করছি। এই টাকা দিয়ে আমরা আমাদের প্রাইভেট মিলিশিয়া ফোর্সকে আরও বড় করব। আমাদের এখন আরও বেশি অস্ত্র আর আরও বেশি অনুগত মানুষ দরকার।”
জেনিন মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। ইউজি বিছানায় শুয়েও জেনিনের সাম্রাজ্যের খুঁটিগুলো মজবুত করছে। জেনিন বুঝতে পারল, সে যদি এখন পালিয়ে যেত, তবে এই বিশাল নেটওয়ার্ক তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ত। আর তখন নোবারাকে রক্ষা করার মতো কেউ থাকত না। জেনিনকে এই মাফিয়া জগতের সম্রাট হয়েই থাকতে হবে, কারণ ক্ষমতা ছাড়া এই পৃথিবীতে ভালোবাসার কোনো দাম নেই।
“ইউজি, নানামির ব্যাপারে কী ভাবছো?” জেনিন হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল।
“নানামি স্যার আপনার বন্ধু বস, কিন্তু তিনি এখন আপনার সবচাইতে বড় কাঁটা। তিনি ডকইয়ার্ডের ঘটনাটা সহজে হজম করবেন না। তিনি হয়তো ইন্টারপোলের সাহায্য নেবেন। আমার কাছে খবর আছে, তিনি আজ সকালে সিআইডি-র এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে দেখা করেছেন। তারা আপনার ব্যবসার সাপ্লাই চেইন ব্লক করার চেষ্টা করবে।”
জেনিন একটু পায়চারি করতে লাগল। “করুক। আমার সাপ্লাই চেইন কোনো সাধারণ বন্দর দিয়ে চলে না। আমি চাই তুমি নানামির ওপর চব্বিশ ঘণ্টা নজর রাখবে। ওর ফোনে কোনো সফটওয়্যার ইনস্টল করতে পারবে?”
“অলরেডি ডান বস,” ইউজি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল। “ওনার ফোনের মাইক্রোফোন আর ক্যামেরা এখন আমার নিয়ন্ত্রণে। তিনি কখন কার সাথে কথা বলছেন, আমি সব শুনতে পাচ্ছি।”
জেনিন কথা বলতে বলতে ধীর পায়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। নিচে বাগানে নোবারা হাঁটছে। তার পরনে আজ একটা সাদা গোলাপি শাড়ি। নোবারার শান্ত মুখটা দেখে জেনিনের মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এল। সে জানে নোবারা এই রক্তের জগৎ পছন্দ করে না, কিন্তু জেনিন তাকে এই জগতের রানী বানিয়ে রাখতে চায়, যাতে কেউ তাকে স্পর্শ করার সাহস না পায়।
“ইউজি, তুমি কালকের মধ্যে নূরশাদ ভিলার জন্য আরও দশজন নতুন শ্যুটার রিক্রুট করো। এবার যেন কোনো ভুল না হয়। আর শোনো, তুমি যদি সুস্থ হয়ে ফিরে না আসো, তবে এই সিংহাসন আমার কাছে অর্থহীন।” জেনিনের গলার স্বর হঠাৎ খুব ভারী হয়ে গেল।
“আমি আসব বস। মৃত্যুর পরোয়ানা হ্যাক করে হলেও ফিরে আসব,” ইউজি হাসল।
ফোনটা রাখার পর জেনিন অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। সে স্টাডি রুমের ড্রয়ার থেকে একটি ম্যাপ বের করল। এটি ঢাকার ম্যাপ নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রাগ রুটের ম্যাপ। সে দেখল কীভাবে ড্রাগন লিউয়ের পতনের পর ছোট ছোট গ্যাংগুলো মাথা তুলছে। জেনিন ঠিক করল, সে এদের কাউকেই বাড়তে দেবে না। সে এই পুরো চেইনটা নিজের হাতে নেবে। সে হবে এই অঞ্চলের একমাত্র নিয়ন্ত্রক।
জেনিন তার হাতে থাকা কফির মগটা এক চুমুকে শেষ করল। তার ভেতর এখন এক নতুন শক্তির জন্ম হয়েছে। সে জানে সামনে অনেক বড় লড়াই। নানামি তাকে তাড়া করবে, নতুন শত্রুরা জন্ম নেবে, কিন্তু জেনিন নূরশাদ দমে যাওয়ার পাত্র নয়।
সে আবার তার ডায়েরিতে লিখতে শুরু করল। এবার কবিতার কোনো চরণ নয়, এবার সে লিখল তার আগামী সাত দিনের রণকৌশল। কীভাবে সে ড্রাগন লিউয়ের বাকি লোকগুলোকে তার নিজের দলে টানবে, কীভাবে সে পুলিশ প্রশাসনকে ঘুষ দিয়ে নিজের পকেটে রাখবে—সবকিছুর এক নিখুঁত হিসাব।
<><><><><><><><><>
বিকেল হয়ে এলো। জেনিন নোবারার সাথে লাঞ্চ করে এসে আবারো তার স্টাডি রুমে বসে একটি কালো চামড়ার ডায়েরিতে কিছু নাম কাটাছেঁড়া করছিল। ড্রাগন লিউয়ের পতনের পর তার অনুগত শ্যুটারদের একাংশ এখন লক্ষ্যভ্রষ্ট। জেনিন তাদেরই নিজের শিকারে পরিণত করতে চায়। সে জানে, শত্রুর অস্ত্রকে নিজের ঢাল বানানোই হলো রাজনীতির শ্রেষ্ঠ চাল।
ঠিক তখনই ইউজির একটি এনক্রিপ্টেড ভিডিও কল এল। ইউজি এখন একটু সুস্থ, সে উঠে বসতে পারছে। তার পেছনে নার্সদের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে, কিন্তু ইউজির চোখেমুখে সেই চিরচেনা ধূর্ততা।
“বস, আমি ‘ব্ল্যাক সার্কেল’ থেকে তিনজনের প্রোফাইল শর্টলিস্ট করেছি,” ইউজি ফিসফিস করে বলল। “এরা ড্রাগন লিউয়ের সবচাইতে বিশ্বস্ত ছিল না, বরং লিউ এদের ভয় পেত। এদের নাম, ‘দ্য ট্রিপল শ্যাডো’। এরা গত দুই বছর ধরে আন্ডারগ্রাউন্ডে আছে। আমি এদের হদিস পেয়েছি বুড়িগঙ্গার ওপারে এক পরিত্যক্ত কারখানায়।”
জেনিন চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে মনিটরের দিকে তাকাল। স্ক্রিনে তিনজনের ছবি ভেসে উঠল। এদের চোখে কোনো মায়া নেই, কেবল এক শূন্যতা। জেনিন মাথা নাড়ল। “আর ইউ শিউর? এরা কি আমার অনুগত থাকবে? নাকি সুযোগ বুঝে পিঠে ছুরি মারবে?”
“আপনি ঠিক বলেছেন বস,” ইউজি টাইপ করতে করতে বলল। “এরা টাকার জন্য কাজ করে না, এরা কাজ করে এক ধরণের পৈশাচিক আনন্দের জন্য। কিন্তু আমি এদের ব্যক্তিগত কিছু দুর্বলতা খুঁজে পেয়েছি। এদের পরিবার বা এমন কিছু যা দিয়ে এদের ব্ল্যাকমেইল নয়, বরং ‘সুরক্ষা’র লোভ দেখানো যায়। আপনি নিজে এদের সাথে দেখা করতে চাইলে আমি লোকেশন পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
জেনিন একটু হাসল। “ওকেহ! আমি নিজেই যাব। তুমি জাস্ট ডকইয়ার্ডের ড্রোনগুলো রেডি রাখো।”
জেনিন যখন ঘর থেকে বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন করিডোরে নোবারার সাথে তার দেখা হলো। নোবারার হাতে এক কাপ চা, যা সে সম্ভবত জেনিনের জন্যই নিয়ে আসছিল। নোবারা জেনিনের পরনের কালো ট্যাকটিক্যাল জ্যাকেট আর কোমরের হোলস্টারে রাখা গানটির দিকে তাকাল। নোবারার চোখের নীল শান্ত সাগর মুহূর্তেই এক বিষণ্ণ ঝড়ে রূপ নিল।
“আবার যাচ্ছেন?” নোবারার কণ্ঠস্বরটা বরফের মতো ঠান্ডা।
জেনিন থমকে দাঁড়াল। সে নোবারার চোখের দিকে তাকাতে পারল না। সে জানে নোবারা কী বলতে চায়। “নূরা, এটা জরুরি। আমার সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য কিছু নতুন লোক দরকার। আমি চাই না কালকের মতো দুর্ঘটনা আবার ঘটুক।”
নোবারা চায়ের কাপটা পাশের একটা কনসোল টেবিলের ওপর রাখল। সে জেনিনের খুব কাছে এসে দাঁড়াল। জেনিন অনুভব করল নোবারার গায়ের সেই পরিচিত বেলি ফুলের ঘ্রাণ, যা জেনিনের হৃদপিণ্ডকে এক মুহূর্তের জন্য দুর্বল করে দেয়। সে ডান হাত নোবারার কোমড় জড়িয়ে নিজের আরো কাছে নিয়ে এলো।
“নিরাপত্তা?” নোবারা খুব নিচু স্বরে বলল। “জেনিন, আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না যে আপনি যত বেশি নিরাপত্তা বাড়াচ্ছেন, আমরা তত বেশি একটা খাঁচায় বন্দি হয়ে যাচ্ছি? আপনি কি আমাকে নিয়ে এই শহর ছেড়ে কোথাও শান্তিতে থাকতে পারেন না?”
জেনিন নোবারার চিবুকটা স্পর্শ করল। তার আঙুলগুলো এখন নোবারার ত্বকে এক পরম মায়া এঁকে দিচ্ছে। “নূরা, আপনি অবুঝের মতো কথা বলছেন। আমি যদি আজ এই সিংহাসন ছেড়ে দেই, তবে কাল আমাদের লাশের ওপর দিয়ে সবাই হেঁটে যাবে। আপনি কেবল আমার ছায়াতলে থাকুন, বাইরের রোদ আপনাকে স্পর্শ করতে পারবে না।”
“আপনার এই ছায়াটা বড্ড বেশি অন্ধকার” নোবারা এক পা পিছিয়ে গেল। “আমি আর আপনার এই রক্তের নেশা সহ্য করতে পারছি না। আপনি যাচ্ছেন, যান। কিন্তু মনে রাখবেন, আপনি যত বেশি মানুষের রক্ত মাখবেন, আমার জেনিন তত বেশি আমার থেকে দূরে সরে যাবে।”
নোবারা আর কথা না বাড়িয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। জেনিন করিডোরে একা দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো তার পায়ের নিচে থাকা এই বিশাল শ্বেতপাথরের প্রাসাদটা যেন তাকে গিলে খেতে আসছে। কিন্তু জেনিন তো জেনিন। সে তার দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দিতে জানে না। কিংবা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে তার গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
রাত তখন দশটা। বুড়িগঙ্গার ওপারে পরিত্যক্ত কারখানা। জেনিন একা গাড়ি চালিয়ে সেখানে পৌঁছাল। ইউজি ড্রোন দিয়ে আকাশ থেকে পুরো এলাকা পর্যবেক্ষণ করছে। জেনিন ভেতরে ঢোকার সময় দেখল তিনটে অবয়ব আগুনের কুণ্ডলীর পাশে বসে আছে। তারা জানত জেনিন আসবে।
তাদের মধ্যে একজন এগিয়ে এল। তার মুখটা একপাশে পোড়া। “আমরা ভাবিনি ‘জেড’ নিজে আমাদের সাথে দেখা করতে আসবেন।”
জেনিন কোনো কথা না বলে সরাসরি তাদের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। সে তার পকেট থেকে এক ব্যাগ হিরে বের করে আগুনের পাশে ছুড়ে মারল। হিরেগুলোর উজ্জ্বলতা আগুনের আলোতে এক পৈশাচিক রূপ নিল।
“টাকা বা হিরে তো কেবল শুরু,” জেনিন শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ গলায় বলল। “আমি জানি তোমরা ড্রাগন লিউয়ের সাথে কেন কাজ করতে না। সে তোমাদের শুধু সোলজার মনে করত। কিন্তু আমি তোমাদের আমার ‘জাস্টিস’ মনে করব। যারা নূরশাদ ভিলার দিকে তাকাবে, তাদের চোখ তোমরা উপরে আনবে। বিনিময়ে আমি তোমাদের পরিবারকে এমন সুরক্ষা দেব যা এই দেশের রাষ্ট্রপতিও দিতে পারবে না।”
সেই তিন কিলার একে অপরের দিকে তাকাল। তারা জেনিনের চোখের সেই গভীর অন্ধকার দেখতে পেল, যা তাদের নিজেদের অন্ধকারের চেয়েও বিশাল।
“আমরা রাজি বস,” পোড়া মুখের লোকটি মাথা নত করল।
ঠিক তখনই জেনিনের কানে ইউজির কণ্ঠস্বর বেজে উঠল। “বস! পুলিশ মুভমেন্ট! নানামি স্যার সম্ভবত এই লোকেশন ট্র্যাক করেছে। আপনার ফোন থেকে সিগন্যাল লিক হচ্ছে না, কিন্তু ড্রাগন লিউয়ের কোনো পুরনো ট্র্যাকার হয়তো এখানে অ্যাক্টিভ আছে। দ্রুত বেরোন!”
জেনিন দ্রুত তার জিপে গিয়ে উঠল। পুলিশ সবসময় তার পিছনে পড়ে আছে! সে দেখল দূরে পুলিশের সাইরেনের আলো দেখা যাচ্ছে। জেনিন গাড়ি স্টার্ট দিল। তার পেছনে সেই নতুন তিন কিলার তাদের বাইকে করে মিলিয়ে গেল অন্ধকারের গোলকধাঁধায়।
ভিলাতে ফিরে জেনিন তার শোবার ঘরে ঢুকল না। সে সরাসরি চলে গেল তার ব্যক্তিগত ব্যালকনিতে, যেখান থেকে পুরো ভিলাকে দেখা যায়। সে দেখল নিচে বাগানে নোবারা দাঁড়িয়ে আছে। এতোক্ষণ এ তো ঘরে থাকার কথা মেয়েটার! সে বের হওয়ার সময় তো খুব দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। জেনিন দেখলো, শীতের রাতের হিমেল বাতাস নোবারার শাড়িটাকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইছে, কিন্তু নোবারা অটল। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন কোনো এক হারানো নক্ষত্র খুঁজছে। জেনিন দ্রুত নিচে নেমে এল। তার পায়ের শব্দে নোবারা ফিরে তাকাল না। সে জানে, এই পৃথিবীতে জেনিন ছাড়া আর কারো সাহস নেই এই অসময়ে তার নিভৃত চারণভূমিতে প্রবেশ করার।
“রাত অনেক হয়েছে নূরা। ঘুমাবেন চলুন।” জেনিন খুব শান্ত স্বরে বলল।
নোবারা এবার ধীরে ধীরে ঘাড় ফেরাল। তার চোখের কোণে শুকনো জলের দাগ। সে কোন ভনিতা ছাড়াই বলতে লাগল, “আপনি যখনই আমাকে ছেড়ে দূরে কোথাও যান, আমি ভাবি আপনি হয়তো আর ফিরে আসবেন না। আর যদি ফিরে আসেন, তবে কোন জেনিন হয়ে আসবেন? সেই জেনিন, যার হাতে আমার প্রিয় বেলী ফুল থাকত, নাকি সেই জেনিন, যার হাতে এখন মানুষের রক্তের দাগ? আচ্ছা, এতো ভয় নিয়ে কি আদৌও বেঁচে থাকা যায়?”
জেনিন নোবারার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সে নোবারার দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। নোবারার হাত আজ বরফের মতো ঠান্ডা। জেনিন তার হাতের উষ্ণতা দিয়ে সেই বরফ গলাতে চাইল।
“আমি যে রূপেই ফিরি না কেন নূরা, আমি আপনারই। এই সাম্রাজ্য, এই অস্ত্র, এই রক্ত, সবকিছুর কেন্দ্রে শুধু আপনি। আপনি কি বুঝতে পারছেন না, আমি যদি এসব না করি, তবে কাল সকালে এই ভিলা অন্য কারোর দখলে থাকবে? আপনি কি চান আমি আবার লন্ডনের মতো নির্বাসনে চলে যাই?”
“হ্যাঁ! আমি চাই!” নোবারা হঠাৎ চিৎকার করে উঠল। তার কণ্ঠস্বরে এতদিনের জমে থাকা সমস্ত আর্তি বেরিয়ে এল। “আমি চাই আপনি একজন সাধারণ মানুষ হোন। আমি চাই আমরা ছোট একটা ঘরে থাকব যেখানে কোনো সিসিটিভি থাকবে না, কোনো গার্ড থাকবে না। যেখানে আপনি রাতে ঘুমানোর সময় বালিশের নিচে গান (Gun) রাখবেন না। ভালো লাগছে না আমার এসব।”
জেনিন স্তব্ধ হয়ে গেল। নোবারার এই হাহাকার তার হৃদপিণ্ডকে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে। সে নোবারাকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে ধরল। নোবারা প্রথমে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু জেনিনের সেই আদিম আকুলতার কাছে সে হার মানল। নোবারা জেনিনের বুকের ওপর মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
“কেন আমাদের জীবনটা এমন হলো? কেন আমরা স্কুলের বটতলার বিকেলে ফিরে যেতে পারছি না?”
জেনিন নোবারার চুলে নিজের মুখ লুকালো। “কারণ আমরা বড় হয়ে গেছি নোবারা। পৃথিবীটা বটতলার মতো ছোট নয়। এখানে টিকে থাকতে হলে বন্য হতে হয়। আমি চাইলেও আর সাধারণ হতে পারব না।”
নোবারা জেনিনের মুখটা নিজের হাতের মধ্যে নিল। সে দেখল জেনিনের চোখের মণিগুলো আজ কতটা ক্লান্ত। “জানেন, আমার ভয় হয়, খুব ভয় হয়, একদিন এই অন্ধকার জগতটাই আমাদের দুজনের মাঝে এক বিশাল দেওয়াল তুলে দেবে। আপনি তখন ওই পাশে থাকবেন, আর আমি এই পাশে!”
জেনিন নোবারার কপালে এক দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিল। “সেই দেওয়াল আমি কখনো উঠতে দেব না। যদি দেওয়াল ওঠে, তবে আমি তা নিজের হাতে গুঁড়িয়ে দেব।”
জেনিন নোবারাকে কোলে তুলে নিয়ে ঘরের ভেতরে এল। সে নোবারাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজে তার পাশে বসল। সে নোবারার পায়ের নূপুরটা আলতো করে নেড়ে দিল। রূপোর নূপুরের সেই রিনিঝিনি শব্দ যেন জেনিনের হৃদয়ে এক অদ্ভুত শান্তি বয়ে আনল।
নোবারা জেনিনের হাতের আঙুলগুলো নিয়ে খেলতে লাগল। সে দেখল জেনিনের আঙুলের অগ্রভাগে এখনো সেই কড়া দাগ, যা ট্রিগার চাপতে চাপতে তৈরি হয়েছে। নোবারা সেই আঙুলগুলোতে চুমু খেল।
“আপনি বড্ড পাগল” নোবারা বিড়বিড় করল। “আপনি জানেন না, আপনার এই পাগলামি আমাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।”
“আমি ধ্বংস হতে রাজি আছি নূরা, যদি তার বিনিময়ে আপনাকে আজীবনের নিরাপত্তা দিতে পারি!” জেনিন নোবারার হাতটা নিজের ঠোঁটের কাছে নিল।
রাত গভীর হচ্ছে। ভিলার বাইরে গার্ডদের টহল চলছে ঠিকই, কিন্তু এই ঘরের ভেতরে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। জেনিন আর নোবারা আজ কোনো অভিযোগ করল না, কোনো মাফিয়া জগতের কথা বলল না। তারা শুধু একে অপরের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনে পার করে দিল এক নিভৃত প্রহর। জেনিন অনুভব করল, এই এক টুকরো শান্তিই তার সমস্ত যুদ্ধের প্রেরণা। সে নোবারাকে আগলে ধরে ঘুম পাড়িয়ে দিল।
নোবারা যখন ঘুমিয়ে পড়ল, জেনিন আজ আর বিছানা ছেড়ে উঠল না। সে শুধু নোবারার মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। সে ভাবল, যদি কাল সকালে পুলিশ বা সিআইডি তাকে ধরে নিয়ে যায়, তবে নোবারার কী হবে? যদি এই সাম্রাজ্য সত্যি সত্যিই ধ্বংস হয়, তবে নোবারা কি একা টিকে থাকতে পারবে? জেনিন মনে মনে এক নতুন সংকল্প নিল। সে নোবারার জন্য এমন এক ট্রাস্ট ফান্ড এবং সেফ-প্যাসেজ বানিয়ে রাখবে যা জেনিন মরে গেলেও নোবারাকে সসম্মানে এবং নিরাপত্তায় বাঁচিয়ে রাখবে। নোবারার ব্যাপারে সে কোন রিস্ক নিতে পারবে না।
চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।।

