#Soulmate_to_Enemy #পর্ব_৩৯

0
2

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৩৯
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

জেনিন যখন ভিলার আন্ডারগ্রাউন্ড বেসমেন্টে নামল, সেখানে পরিবেশটা ছিল একদম ভিন্ন। জেনিনের ব্যক্তিগত অস্ত্রাগার আর কন্ট্রোল রুম যেন আজ আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। মাঝখানে রাখা একটি বড় হোলোগ্রাফিক টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই তিন নতুন কিলার, পোড়া মুখের রায়ান, দীর্ঘদেহী জিবরান এবং নিঃশব্দ ঘাতক মায়া। তাদের সামনে বসে আছে ইউজি।

হ্যাঁ, ইউজি ফিরে এসেছে। যদিও তার পেটে এখনো ব্যান্ডেজ এবং সে হুইলচেয়ারে বসা, কিন্তু তার চোখের সেই উজ্জ্বলতা বলছে সে যুদ্ধের জন্য তৈরি।

“বস, আপনি আসায় ভালো হলো,” ইউজি কি-বোর্ডে আঙুল চালাতে চালাতে বলল। “আমি এদের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করেছি। এরা কেবল কিলার নয়, এরা প্রত্যেকেই একেকটা স্পেশালিটি নিয়ে জন্মেছে।”

ইউজি আবার বলা শুরু করল,
“জিবরান হলো লং-রেঞ্জ স্নাইপার, মায়া হলো ক্লোজ-কমব্যাট স্পেশালিস্ট আর রায়ান হলো বিস্ফোরক এক্সপার্ট। আমাদের নতুন ফোর্সের নাম দিয়েছি, ‘দ্য ভেনম কোর’।”

জেনিন ধীর পায়ে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। তার হাতে একটা রুপালি রঙের লাইটার, এই লাইটার তার বাবা আশফাক নুরশাদ এর। যা সে আনমনে ঘষছিল। আগুনের ফুলকিগুলো তার চোখের মণিতে প্রতিফলিত হচ্ছে।

“ইউজি তোমাদেরকে সব বলেছে নিশ্চয়ই,” জেনিন শান্ত কিন্তু বজ্রকণ্ঠে বলল। “আমার এখানে কাজ করার একটাই শর্ত, আনুগত্য। যদি বিশ্বাসঘাতকতা করো, তবে মৃত্যু হবে তোমাদের সবচাইতে ছোট শাস্তি। আর যদি অনুগত থাকো, তবে এই জেনিন নূরশাদ তোমাদের এমন উচ্চতায় নিয়ে যাবে যা তোমরা স্বপ্নেও দেখোনি।”

রায়ান এক পা এগিয়ে এল। তার পোড়া মুখটা ল্যাম্পের আলোয় আরও ভয়ংকর দেখাচ্ছে। “বস, আমরা ড্রাগন লিউয়ের মতো বেইমানদের সাথে কাজ করেছি। আমরা জানি ক্ষমতা কী। আপনি আমাদের সুরক্ষা দিয়েছেন, আমাদের পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছেন। আমাদের জীবন এখন থেকে আপনার।”

জেনিন একটু হাসল। “জীবন নয়, আমার তোমাদের দক্ষতা দরকার। ইউজি, বলো আমাদের প্রথম মিশন কী?”

ইউজি টেবিলের ওপর একটি বড় ম্যাপ প্রজেক্ট করল। এটি চট্টগ্রামের একটি প্রাইভেট জেটি।
“বস, নানামি স্যার খুব স্মার্টলি খেলছেন,” ইউজি পয়েন্টার দিয়ে দেখালো। “তিনি জানেন সরাসরি নূরশাদ ভিলাতে হানা দেওয়া এখন অসম্ভব। তাই তিনি আপনার সাপ্লাই চেইনের মূল পয়েন্টে আঘাত করতে যাচ্ছেন। আজ রাতে আপনার একটি বড় ওষুধের কনসাইনমেন্ট আসার কথা ছিল, যার আড়ালে আমাদের প্রয়োজনীয় কিছু লজিস্টিকস আসছিল। নানামি সিআইডি-র সাথে হাত মিলিয়ে সেখানে রেইড দেওয়ার প্ল্যান করেছেন। যদি ওই চালান ধরা পড়ে, তবে আপনার ব্যবসায়িক লাইসেন্স ক্যানসেল হয়ে যাবে।”

জেনিন চুরুটটা ধরালো। ধোঁয়াগুলো কুণ্ডলী পাকিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে। “নানামি…! ও এখনো ভাবছে ও আমাকে আইনের খাঁচায় ভরতে পারবে। ও কি জানে না যে, আইনের হাত যেখানে পৌঁছাতে পারে না, জেনিন নূরশাদের হাত তার চেয়েও লম্বা?”

“বস, আমার মনে হয় এবার নানামি স্যারকে একটু ভয় দেখানো দরকার,” জিবরান তার স্নাইপার রাইফেলটা লোড করতে করতে বলল।

“না!” জেনিন গর্জে উঠল। “নানামির গায়ে কেউ হাত দেবে না। ও আমার বন্ধু, আর শত্রু হিসেবেও ও অনেক সম্মানিত। আমরা ওকে বিপদে ফেলব না, আমরা ওর চোখের সামনে থেকে আমাদের লক্ষ্য ছিনিয়ে নিয়ে আসবো। ইউজি, আমাদের কি অন্য কোনো রুট আছে?”

“আছে বস,” ইউজি ধূর্ত হাসি হাসল। “জেটি নম্বর সেভেন হলো একটা টোপ। আমি নানামির ফোনের কল রেকর্ড হ্যাক করে জেনেছি সে ওই জেটিতেই তার পুরো ফোর্স নিয়ে থাকবে। কিন্তু আমাদের আসল জাহাজটা ভিড়বে ইনানি বিচের কাছে একটা সিক্রেট পয়েন্টে। কিন্তু সমস্যা হলো, জেটিতে যদি পুলিশ কিছু না পায়, তবে নানামি বুঝে যাবে যে কেউ লিক করেছে।”

জেনিন একটু পায়চারি করল। তার মস্তিষ্ক এখন সুপার কম্পিউটারের মতো কাজ করছে। “তাহলে আমাদের জেটিতে কিছু একটা রাখতে হবে। এমন কিছু যা নানামিকে ব্যস্ত রাখবে কিন্তু আমাদের ক্ষতি করবে না।”

জেনিন এরপর মায়ার দিকে তাকালো। মায়া এতক্ষণ চুপচাপ এক কোণে দাঁড়িয়ে তার ছোট ছুরিটা দিয়ে নখ পরিষ্কার করছিল। তার বয়স খুব কম মনে হলেও তার চোখে রয়েছে হাজার বছরের ক্লান্তি।

“মায়া, তুমি যাবে জেটি নম্বর সেভেনে। ওখানে তুমি কিছু ডামি(খালি) বক্স রাখবে। পুলিশ যখন আসবে, তখন তুমি এমনভাবে রিঅ্যাক্ট করবে যেন ওগুলো খুব দামী কিছু। নানামি যখন ওগুলো চেক করতে ব্যস্ত থাকবে, তখন আমি নিজে ইনানিতে থাকব আসল চালানের জন্য।”

মায়া মাথা নোয়ালো। “হয়ে যাবে বস। কিন্তু পুলিশ যদি ফায়ার ওপেন করে?”

“তবে তুমি ধোঁয়া ব্যবহার করে বেরিয়ে আসবে,” জেনিন কঠোর গলায় বলল। “মনে রেখো, কাউকেই মারার দরকার নেই। আমাদের লক্ষ্য রক্ত নয়, আমাদের লক্ষ্য হলো নানামিকে এটা বিশ্বাস করানো যে সে আমাদের হারিয়েছে, কিন্তু আদতে সে কেবল ধুলো বালি ধরবে।”

ইউজি হুইলচেয়ারে বসেই আনন্দে হাততালি দিল। “পারফেক্ট বস! নানামি স্যার ভাববেন তিনি আপনার বড় একটা লস করেছেন, আর ওদিকে আমাদের লজিস্টিকস ভিলাতে পৌঁছে যাবে। এটাকে বলে, দ্য পারফেক্ট ডিভারশন।”

জেনিন তার জ্যাকেটটা টেনে নিল। “ইউজি, তুমি ভিলাতে থাকো। নোবারার ওপর নজর রাখবে। ও যদি জাগে এবং আমাকে খোঁজে, তবে বলবে আমি কোনো মিটিং-এ আছি। খেয়াল রাখবে, ও যেন জানতে না পারে আমি মিশনে গিয়েছি। অযথা চিন্তা করবে!”

জেনিন যখন বেসমেন্ট থেকে বেরোচ্ছিল, তার মনে হলো সে তার জীবনের সবচাইতে বড় জুয়াটা খেলতে যাচ্ছে। একদিকে তার ছোটবেলার বন্ধু নানামি, আর অন্যদিকে তার তিল তিল করে গড়া এই রাজত্ব। জেনিন জানে নানামি তাকে সহজে ছাড়বে না। নানামি হয়তো জেটিতে গিয়ে যখন দেখবে বাক্সের ভেতরে কিছু দামী পাথরের বদলে কেবল কয়লা বা মাটি আছে, তখন তার রাগ আকাশছোঁয়া হবে। কিন্তু জেনিনকে এই পথটাই বেছে নিতে হচ্ছে।
<><><><><><><><><>

রাতের অন্ধকার গভীর হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের নোনা বাতাসের আর্দ্রতা শরীরের রোমকূপে বিঁধছে। চট্টগ্রাম বন্দরের জেটি নম্বর সেভেন আজ অস্বাভাবিকভাবে স্তব্ধ। সব লাইট অফ করে দেওয়া হয়েছে, কেবল দূরে নোঙর করা একটা জাহাজের ফ্লাডলাইট মাঝে মাঝে আকাশের বুক চিরে যাচ্ছে। জেনিনের নতুন ঘাতক মায়া এখন একটি অন্ধকার কন্টেইনারের ওপরে শুয়ে আছে। তার কানে ছোট একটা ইয়ারপিস, যেখান থেকে ইউজির শান্ত কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে।

“মায়া, দশ মিনিটের মধ্যে নানামির ফোর্স পজিশন নেবে। ওরা ড্রোন ব্যবহার করছে না, কারণ নানামি জানে বস ড্রোন জ্যাম করে দেবেন। ওরা ইনফিল্ট্রেশন পদ্ধতিতে আসছে। রেডি থেকো।”

ইউজির গলার স্বর শুনে মনে হচ্ছে সে কোনো ভিডিও গেম খেলছে, অথচ সে পরিচালনা করছে জীবনের এক ভয়ংকর লড়াই!

মায়া তার বেল্ট থেকে একটা ছোট রিমোট বের করল। জেটির মাঝখানে স্তূপ করে রাখা দশটা কাঠের বাক্সের চারপাশে সে খুব সতর্কভাবে স্মোক-বম্ব এবং ফ্ল্যাশ-গ্রেনেড বসিয়ে রেখেছে। জেনিনের নির্দেশ স্পষ্ট, রক্ত ঝরানো যাবে না, কেবল সময় নষ্ট করতে হবে।

হঠাৎ জঙ্গল আর বালির ঢাল চিরে ডজনখানেক কালো পোশাকধারী পুলিশ অফিসার বেরিয়ে এল। সবার সামনে নানামি। তার হাতে একটা গ্লক-17। নানামি তার হাত দিয়ে ইশারা দিতেই শ্যুটাররা কন্টেইনারগুলোর আড়ালে পজিশন নিল।

“জেড… আমি জানি তুমি এখানে আছো,” নানামি নিচু স্বরে বিড়বিড় করল। সে ডামি বক্সগুলোর দিকে তাকিয়ে তার অফিসারদের নির্দেশ দিল, “কভার দাও! আমি আগে বক্সগুলো চেক করব। মনে রেখো, জেড থাকলে ফায়ার করবে না যতক্ষণ না সে ট্রিগার চাপে।”

নানামি যখন বাক্সের কাছাকাছি পৌঁছাল, ঠিক তখনই মায়া রিমোটের বোতাম টিপল।
‘ধুম!’, এক বিশাল বিস্ফোরণ নয়, বরং এক তীব্র সাদা আলো আর ঘন ধোঁয়ায় পুরো জেটি এলাকা ছেয়ে গেল। পুলিশ অফিসাররা দিশেহারা হয়ে পড়ল। কেউ কেউ এলোপাথাড়ি লাঠি ঘোরাতে লাগল। ঠিক সেই ধোঁয়ার মাঝখান থেকে মায়া এক ছায়ার মতো বেরিয়ে এল। সে তার সিল্কের রোপ ব্যবহার করে নানামির হাত থেকে পিস্তলটা এক ঝটকায় ফেলে দিল।

“কে ওখানে?” নানামি চিৎকার করে উঠল। সে অন্ধকারের মধ্যেই মায়াকে আক্রমণ করতে চাইল, কিন্তু মায়ার গতি ছিল বিদ্যুতের মতো। সে নানামির পিঠের পেছনে গিয়ে তাকে একটা হালকা ধাক্কা দিল এবং কানে ফিসফিস করে বলল,
“বস আপনাকে সালাম জানিয়েছেন, এসি সাহেব। কিন্তু আজকের রাতটা আপনার জন্য না।”

কথাটা শেষ করেই মায়া আবার ধোঁয়ার ভেতরে মিলিয়ে গেল। নানামি যখন চোখ কচলে ধোঁয়া পরিষ্কার করল, সে দেখল মায়া গায়েব। কিন্তু বাক্সের স্তূপগুলো তখনো সেখানে। নানামি ক্ষিপ্ত হয়ে একটা বাক্সের ওপর লাথি মারল।

“বাক্সগুলো খোলো! এখনই!” নানামি গর্জে উঠল।
অফিসাররা কুড়াল দিয়ে বাক্সগুলো ভাঙতে শুরু করল। তারা ভাবছিল ভেতরে কোনো অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র বা অবৈধ ড্রাগস থাকবে। কিন্তু প্রথম বাক্সটি খুলতেই নানামির মুখ চুন হয়ে গেল। বাক্সের ভেতরে রাখা আছে কেবল সাধারণ সিমেন্ট আর কয়লার বড় বড় টুকরো। তার ওপর একটা সাদা খাম।

নানামি খামটা ছিঁড়ে দেখল ভেতরে জেনিনের হাতের লেখা একটি চিরকুট,
“বন্ধু, কয়লা দিয়ে হিরে হয় না, কিন্তু হিরে খুঁজতে গিয়ে কয়লা মাখতে হয়। শুভ রাত্রি।”

নানামি চিরকুটটা হাতের মুঠোয় পিষে ফেলল। তার চোখ দিয়ে যেন আগুন বেরোচ্ছে। সে বুঝতে পারল জেনিন তাকে একটা সস্তা ফাঁদে ফেলেছে। সে তার রেডিও বের করল। “কন্ট্রোল! কন্ট্রোল! জেটি সেভেনে কিছু নেই! ইনানি বিচের দিকে ফোর্স পাঠাও! জেড আমাদের ডাইভার্ট করেছে!”

কিন্তু ইউজি ততক্ষণে পুরো ডিস্ট্রিক্টের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি জ্যাম করে দিয়েছে। নানামির রেডিওতে এখন কেবল স্থবির শোরগোল শোনা যাচ্ছে।

ওদিকে ইনানি বিচের এক নির্জন পয়েন্টে জেনিন এসইউভি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সমুদ্রের গর্জন ছাড়া সেখানে আর কোনো শব্দ নেই। দূরে একটা ছোট মাছ ধরার ট্রলার থেকে টর্চলাইটের সংকেত এল। জেনিন নিজের লাইটার জ্বালিয়ে পাল্টা সংকেত দিল।

ট্রলার থেকে চারজন মজবুত লোক নামল। তারা খুব সাবধানে একটা কালো ট্রাঙ্ক জেনিনের সামনে এনে রাখল। এটাই সেই ‘লজিস্টিকস’, যা জেনিনের ড্রোনগুলোর জন্য নতুন এআই চিপ এবং ভিলার সিকিউরিটি গ্রিডের জন্য স্যাটেলাইট এনক্রিপশন মডিউল।

“বস, ডেলিভারি কমপ্লিট। পুলিশ এখনো জেটিতে আপনার কয়লা গুনছে,” পোড়া মুখের রায়ান এক কোণ থেকে বেরিয়ে এসে বলল। সে আগে থেকেই এখানে পাহারায় ছিল।

জেনিন ট্রাঙ্কটা খুলে দেখল। নীল আলোয় জ্বলজ্বল করছে সেই ছোট চিপগুলো। এগুলো সাধারণ অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী। এগুলো জেনিনের সাম্রাজ্যকে ডিজিটালি অপরাজেয় করে তুলবে।

“ইউজি, আমাদের মাল হাতে এসেছে,” জেনিন ইন্টারকমে বলল। “মায়াকে বলো পিছু হটতে।”

জেনিন ট্রাঙ্কটা গাড়ির ডিকিতে রাখল। সে যখন ফেরার পথ ধরল, তখন তার মনে হলো জয়টা সহজ ছিল না। সে জানত নানামি তার ফোনে ট্র্যাকার লাগিয়ে রেখেছিল, যেটা ইউজি আগে থেকেই বুঝতে পেরে মায়ার ব্যাগে ট্রান্সফার করে দিয়েছিল। জেনিন আজ নানামিকে কেবল হারায়নি, তাকে অপমানও করেছে। কিন্তু এটাই জেনিনের টিকে থাকার একমাত্র পথ।

গাড়ি চালানোর সময় জেনিনের নজর গেল ফোনের স্ক্রিনে। নোবারার দশটা মিসড কল। জেনিন জানে নোবারা নিশ্চয়ই ভয়ে আছে। সে দ্রুত ডায়াল করল। নোবারা অল রিসিভ করতেই জেনিন বললো,
“নূরা? আমি আসছি। আমি ঠিক আছি।”

ওপাশ থেকে নোবারার কান্নভেজা কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “জেনিন…আপনি যেখানেই থাকেন, তাড়াতাড়ি আসুন। ইউজির আইসিইউ রুমের বাইরে থেকে নার্সরা ভয় পাচ্ছে। ইউজি নাকি ঘুমের মধ্যে কার নাম ধরে চিৎকার করছে। আপনি না থাকলে ওরা ভেতরে ঢুকতে সাহস পাচ্ছে না।”

জেনিনের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। ইউজি? ইউজির কী হয়েছে? সে কি তবে কোনো নতুন চক্রান্তের শিকার? জেনিন গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল। ১৬০ কিমি প্রতি ঘণ্টা। আজ রাতটা শেষ হওয়ার আগে আরও কত নাটক বাকি আছে?

<><><><><><><><><>

রাতের নিস্তব্ধতা চিরে জেনিনের ফেরারি যখন নূরশাদ ভিলার গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল, চাকা ঘষার শব্দে পুরো আঙিনা প্রকম্পিত হয়ে উঠল। জেনিন গাড়ি থেকে নেমেই দেখল ভিলার ভেতর এক অদ্ভুত বিশৃঙ্খলা। সচরাচর যে গার্ডরা স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে থাকে, আজ তাদের চোখেমুখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ। জেনিন কোনো দিকে না তাকিয়ে সরাসরি ভিলার ভেতরে অবস্থিত আইসিইউ সেন্টারের দিকে ছুটল।

নোবারা করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিল, তার দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে রেখেছে। জেনিনকে দেখেই সে দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। নোবারার শরীর থরথর করে কাঁপছে।
“জেনিন! ইউজি…ও নিজেকে আঘাত করছে! ও কাউকে চিনতে পারছে না। ও শুধু একটা নাম ধরে চিৎকার করছে, ‘জিরো’! কে জিরো জেনিন?”
নোবারার কান্নায় জেনিনের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

জেনিন নোবারাকে শান্ত করার সময় পেল না। সে আইসিইউ রুমের গ্লাসের দেয়ালের ওপাশে তাকাল। ইউজি, সেই শান্ত এবং ধূর্ত ছেলেটা, আজ বিছানার ওপর এক উন্মাদ পশুর মতো আচরণ করছে। তার হাতের স্যালাইনের পাইপ ছেঁড়া, রক্ত মেঝেতে লেপটে আছে। সে তার মাথা বারবার দেয়ালে ঠুকছে আর বিড়বিড় করছে। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে গেছে।

“ইউজি! শান্ত হও!” জেনিন ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করল।

“বস, যাবেন না!” রায়ান তাকে বাধা দিল। “ওর কাছে একটা সার্জিক্যাল স্ক্যালপেল (ছুরি) আছে। ও নার্সদের অ্যাটাক করার চেষ্টা করেছে। ও যেন কোনো এক গভীর ঘোরের মধ্যে আছে।”

জেনিন কারও কথা শুনল না। সে ঝটকা দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। ইউজি তখন এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে ছিল। জেনিনকে দেখে সে দাঁত বের করে এক পৈশাচিক হাসি দিল।
“আপনি এসেছেন জেনিন নূরশাদ? আপনার সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়ে গেছে। ‘জিরো’ ফিরে এসেছে। আপনি আমাদের সবাইকে বাঁচাতে পারবেন না।” ইউজির কণ্ঠস্বর আজ আর তার নিজের নয়, যেন অন্য কেউ তার ভেতর থেকে কথা বলছে।

জেনিন ইউজির খুব কাছে গিয়ে বসল। সে ইউজির রক্তাক্ত হাত দুটো চেপে ধরল। “ইউজি, তাকাও আমার দিকে! আমি তোমার বস। কে জিরো? কে তোমাকে এই অবস্থা করেছে?”

ইউজি হঠাৎ স্থির হয়ে গেল। তার চোখের মণিগুলো যেন ওপরের দিকে উঠে গেল। সে গোঙাতে গোঙাতে বলল, “লজিস্টিকস…চিপ…ইনানি… সব…সব ওদের কাছে…”

জেনিনের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সে আজ যে চিপগুলো ইনানি বিচ থেকে উদ্ধার করে এনেছে, সেগুলো কি তবে কোনো ট্রোজান হর্স? জেনিন দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তার ড্যাশবোর্ড চেক করল। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। ভিলার প্রতিটি স্ক্রিনে একটা ডিজিটাল টাইমার চলতে শুরু করেছে।

ইউজির অবস্থা দেখে জেনিন বুঝতে পারল, ড্রাগন লিউ বা সাকলাইন কেউ আসল মাস্টারমাইন্ড ছিল না। পর্দার আড়ালে অন্য কেউ আছে, যাকে ইউজি ‘জিরো’ বলে ডাকছে। এই জিরো কোনোভাবে ইউজির সিস্টেমে এমন এক ড্রাগ ঢুকিয়ে দিয়েছে, যা লজিস্টিকসগুলো ভিলার সার্ভারে কানেক্ট করার সাথে সাথেই ইউজিকে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে বাধ্য করেছে।

“ইউজিকে সেডেশন (ঘুমের ইনজেকশন) দাও!” জেনিন ডাক্তারদের নির্দেশ দিল। “রায়ান, ভিলার সব পাওয়ার অফ করে দাও! এখনই! আমরা অ্যানালগ মোডে যাব।”

ভিলার আলো নিভে গেল। জেনিন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে অনুভব করতে পারল তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। নোবারা অন্ধকারে জেনিনের হাতটা শক্ত করে ধরল।
“জেনিন, আমি খুব ভয় পাচ্ছি। আমাদের কি এখান থেকে পালিয়ে যাওয়া উচিত নয়?” নোবারা কাঁপা গলায় বলল।

জেনিন অন্ধকারে নোবারার কপালে চুমু খেল। “না নূরা। পালানোর রাস্তা এখন বন্ধ। ওরা আমাদের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। কিন্তু ওরা জেনিন নূরশাদকে চেনে না। আমি আমার সাম্রাজ্যকে ধ্বংস হতে দেব না।”

জেনিন তার ব্যক্তিগত টর্চলাইট জ্বালিয়ে ইউজির ল্যাপটপটা নিজের হাতে নিল। সে দেখল ইউজি শেষ যে কোডটা লিখেছে, তা হলো একটা ‘শাটডাউন প্রোটোকল’। ইউজি নিজের শেষ সচেতন মুহূর্তগুলোতে চেষ্টা করেছে ভিলার সিকিউরিটি সিস্টেমকে লক করে দিতে যাতে বাইরের কেউ ভেতরে হ্যাক করতে না পারে।

ল্যাপটপের এক কোণে একটা ছোট ভিডিও ফাইল প্লে হলো। স্ক্রিনে একটা ছায়াভরা মুখ দেখা গেল। লোকটির কণ্ঠস্বর যান্ত্রিক এবং শীতল।
“জেনিন নূরশাদ, তুমি ভেবেছিলে এসি নানামিকে বোকা বানিয়ে তুমি জিতে গেছ? ইনানি বিচের ওই চিপগুলো আমার উপহার ছিল। এখন তোমার নূরশাদ ভিলার প্রতিটি ইনফরমেশন, প্রতিটি কোণ আমার নিয়ন্ত্রণে। ইউজি তোমার শক্তি ছিল, এখন সে আমার অস্ত্র। তুমি যদি তোমার বাবাকে এবং তোমার স্ত্রী নোবারাকে বাঁচাতে চাও, তবে আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ‘প্রজেক্ট নূরশাদ’-এর মূল ফাইল আমার হাতে তুলে দেবে। নতুবা, তোমার ভিলা তোমারি কবর হবে।”

ভিডিওটি শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ল্যাপটপটি চিরতরে ডেড হয়ে গেল।

জেনিন ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তার চোখের সেই নিষ্ঠুরতা এখন এক পৈশাচিক তেজে রূপান্তরিত হয়েছে। সে তার নতুন তিন কিলার, জিবরান, মায়া এবং রায়ানকে সামনে ডাকল।

“শোনো সবাই। ইউজি এখন লড়াই করতে পারছে না। আজ থেকে তোমাদের কমান্ড আমি নিজে নেব। জিবরান, তুমি ছাদে যাও, কোনো কিছু নড়াচড়া করলেই শ্যুট করবে। মায়া, তুমি নোবারার সাথে থেকো। আর রায়ান, তুমি আমার সাথে আসবে। আমরা ইউজির মস্তিষ্কের ভেতরে যে জট পাকানো হয়েছে, তা খুলব।”

জেনিন নোবারার দিকে তাকাল। নোবারার চোখ থেকে এখন জল পড়ছে না, বরং সেখানে এক ধরণের কাঠিন্য দেখা দিচ্ছে। সে জেনিনের হাতে একটা পিস্তল তুলে দিল।
“নিন জেনিন। আজ আর শান্তির কথা বলব না। আজ অস্তিত্বের লড়াই। আপনি আমার আর ইউজির জন্য যা করার করুন। তবে মনে রাখবেন, অন্যায় করবেন না।”

নোবারার এই পরিবর্তন জেনিনকে এক নতুন শক্তি দিল। জেনিন বুঝতে পারল, এই ‘জিরো’ নামক শত্রুটি ড্রাগন লিউয়ের মতো স্থূল নয়। সে জেনিনের মতোই মেধাবী এবং নিষ্ঠুর। জেনিন তার লাইটারটা জ্বালাল। আগুনের আলোয় জেনিনের ছায়াটা ভিলার দেয়ালে এক বিশাল দানবের মতো দেখাল।

জিরোর এই চক্রান্তটি জেনিনকে এক নতুন সঙ্কটে ফেলে দিল। সে আজ অস্ত্র দিয়ে নয়, বরং মেধা দিয়ে হারতে বসেছিল। ইউজির এই অবস্থা জেনিনের ডান হাত কেটে ফেলার মতো। কিন্তু জেনিন আজ প্রমাণ করবে যে সে কেবল ইউজির বুদ্ধিতে ডন হয়নি, সে নিজেই একাধারে যোদ্ধা এবং সম্রাট। জেনিন কি পারবে এই ডিজিটাল ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে? কে এই জিরো? আর প্রজেক্ট নূরশাদ আসলে কী?

চলবে ইংশাআল্লাহ………….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here